Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.১


#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৪.১]

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

[প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত]

পূর্ণতা হেলেদুলে জাওয়াদের সামনে এসে বসে পড়ে। জাওয়াদের দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে গালে এক হাত রেখে ন্যাকা গলায় বলল–

—আয় হায়! আমার মশাই পড়লো কি করে? সে তো কাজ করছিল ল্যাপটপে।

—আশেপাশে এমন মধুর খনি থাকলে, ভ্রমরকে সব কাজ ফেলে মধু আহরণের জন্যে বের হতেই হয়। মধু আহরণ পথে যতটাই কণ্টক পূর্ণ হয়ে থাকে, তার বেশি বহুগুণ তৃপ্তিতা অনুভব করা যায় আহরণের সময়।

জাওয়াদ চোখে নেশা, কণ্ঠে বেহায়াপনা, নিঃশ্বাসে পূর্ণতাকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। পূর্ণতা তাঁকে জ্বালাতন করতে চায় আরেকটু। তাই বসা থেকে উঠে গিয়ে পুনরায় নিজের চুল মুছতে মুছতে বলল–

—মধু আহরণ আরেক দিনও করা যাবে, আজ কাজ করুন। সামনে ঈদ, কত কাজ অফিসে। জেদ করে না লক্ষীটি।

কি মিষ্টি প্রতিশোধই না নিচ্ছে জাওয়াদের বউ। মিনিট বিশ আগে বলা জাওয়াদের কথাই পূর্ণতা তাকে ফিরিয়ে দিল, কিন্তু এমন তীক্ষ্ণ অথচ মিষ্টিভাবে যা জাওয়াদ সত্যি কখনো ভাবেনি।

জাওয়াদ ততক্ষণে নিচ থেকে উঠে গিয়েছে। সে একপা একপা করে এগোয় বউয়ের কাছে। বউয়ের এমন আবেদনময়ী রূপকে অগ্রাহ্য করে অফিসের কাজ করার মতো দুঃসাহস বা ধৈর্য অন্তত জাওয়াদের নেই। সে ঘোর লাগা গলায় বলল–

—বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য যেই কাজটি করা লাগে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর দু’টি খুঁজে পাচ্ছি না।

তাছাড়া, আমি আমাদের ছেলেকে কথা দিয়েছি খুব শীঘ্রই তার জন্য বোন নিয়ে আসবো। ছেলে আমার কাছে প্রথম কিছু একটা আবদার করেছে, সেই আবদার পূরণ না করা অব্দি আমি নিজেই শান্তি পাবো না।

কথা বলতে বলতেই জাওয়াদ হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় প্রিয় নারীর দেহখানা, কিন্তু পূর্ণতা তা হতে দেয় না। নিজেকে খুবই নিপুণতার সাথে জাওয়াদের স্পর্শ থেকে বাঁচিয়ে সরো যায়। যেন সে, আড়াল করে নিতে চায় জাওয়াদের আদুরে স্পর্শ থেকে। অনেকটা লুকোচুরি খেলতে চাওয়ার মতো বিষয়টা।

পূর্ণতা বেলকনির দিকে যেতে যেতে আলসেমি নিয়ে বলেন–

—ছেলে আরেকটু বড় হোক, তারপর ওর বোন আনবো। দু’টো বাচ্চাকে একা সামলাতে পারব না আমি।

জাওয়াদও তার পেছন পেছন হাঁটা দেয়। যেন সে পণ করেছে খুব শীঘ্রই প্রেয়সীকে নিজের বাহু বন্দি করবেই করবে।

—ছেলের বোন আসতে আসতে ছেলে আরো একটু বড় হয়ে যাবে। আর একা কোথায় তুমি? আমি আছি না।

“আমি আছি না” তিনটি শব্দ, অথচ এর গভীরতা সমুদ্রের ন্যায় ব্যাপক। পূর্ণতার মতো আপনজন হীন ভাবে বড় হওয়া মানুষদের কাছে এই তিনটি শব্দ এতটাই মূল্যবান যে, তারা এই শব্দ গুলোর মূল্য বুঝাতে গিয়ে কখনো কখনো নিজেদেরকেও বিলীন করে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবে না।

পূর্ণতা জাওয়াদের আড়ালে আবারও হেঁসে ওঠে। পরম তৃপ্তির সেই হাসি।

— অ্যাঁই পূর্ণ, এমন পালাই পালাই করছো কেনো? কাছে আসো না রে সোনা।

—উহুম, একদমই নয়। আপনি গিয়ে কাজ করুন। আমি বেলকনিতে বসবো কিছুক্ষণ। ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মাখতে চাই ।

—আগে আমার আদর মাখোঁ তোমার অঙ্গে, তারপর ঠাণ্ডা হাওয়া মাখার জন্য আমিই নাহয় নিয়ে আসব তোমায় বেলকনিতে।

এবার আর পূর্ণতা ছলচাতুরী সফল হয় না। জাওয়াদ ক্ষিপ্ততার সাথে পূর্ণতাকে নিজের বাহুতে বন্দি করে নেয়। এর পরপরই নিজের শক্ত হাতের কোমল স্পর্শ একে দিতে থাকে পূর্ণতার উন্মুক্ত উদর ও তলানো কোমরে। তার অন্য হাতটি দিয়ে খুব সন্তর্পণে পূর্ণতার কাঁধের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়। তারপর ধীরেসুস্থে নিজের মুখ গুঁজে দেয় সেখানটায়। ঠোঁটের উষ্ণ আর্দ্র স্পর্শ পূর্ণতার সেই অঙ্গখানা ভরিয়ে দিতে থাকে।

পূর্ণতা সুবোধ বধূর ন্যায় স্বামীর আদর নিতে থাকে চোখ বন্ধ করে নিজের মাথাটা পেছনে জাওয়াদের বক্ষে এলিয়ে দিয়ে। তার সবচাইতে প্রশান্তিময়, নিরাপদ, ভালোবাসার একটি স্থান এটি। এখানে মাথা রাখতেই তার নিজেকে কেমন হালকা মনে হয়। পরিপূর্ণ লাগে নিজেকে।

জাওয়াদটা আজকাল তার বধূর সংস্পর্শে এসে বড্ড বেপরোয়া হয়ে যায়। আদর করবে, নাকি কাঁদাবে নাকি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থেকে নিজের বুকের তৃষ্ণা মেটাবে? সে নিজেই বুঝতে পারে না। আর এই অবুঝপনা থেকেই একটু বেশিই পাগলামি করে বসে সে। তার সেই পাগলামিগুলো একসময় পূর্ণতার কোমল সফেদ ত্বকে নিজের নিশানি রেখে যায়।

কাঁধে চিনচিনে ব্যথায় পূর্ণতা চোখ বন্ধ রেখেই নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে আর্তনাদ করে বসে আনমনেই।

—ব্যথা পাই তো জাওয়াদ।

গভীর শ্বাস টেনে ফিসফিসিয়ে বলে পূর্ণতা। জাওয়াদ তার কোমল ত্বকের অন্য একটি স্থানে আবারও দাঁত দ্বারা চিহ্ন রেখে যায়। তারপর জায়গাগুলোতে উষ্ণ চুমুতে ভরিয়ে দিতে দিতে বলল–

—সামান্য একটু শাস্তি দিলাম আমায় ইগনোর করার জন্য।

মুহূর্তেই পূর্ণতা ক্ষেপে ওঠে। সে শক্তি খাটিয়ে জাওয়াদের থেকে নিজেকে নিতে চায়। কিন্তু জাওয়াদ যেহেতু আগে থেকেই তাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করে রেখেছিল, তাই পূর্ণতা ছাড়াতে পারে না তাকে নিজের থেকে।

পূর্ণতা মিছে রাগ দেখিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল–

—আমি ইগনোর করেছিলাম নাকি আপনি? আজ সন্ধ্যা থেকেই লক্ষ্য করেছি, আপনি প্রতিদিনের মতো অফিস থেকে এসে আমায় জ্বালাতন করেন নি। রান্না করার সময় ডিস্টার্ব করেন নি। ছেলের সাথেও দুষ্টুমি করে আমার বকা খান নি।

দুই বাপ-বেটা পাল্লা দিয়ে মন খারাপ করতে বসেছে। মন খারাপ না করতে বললেও আমার কথা শুনেন নি। আর এখন এসে অভিযোগ করছেন আমি আপনাকে ইগনোর করছি? সরুন তো সরুন। ভালো মেজাজটা খারাপ করে দিলেন। ছাড়ুউউন…..

জাওয়াদ হাসে বউয়ের এমন মেকি রাগ দেখে। বউটা আগের মতো আহ্লাদ করে এখন। রাগ দেখায়। প্রচণ্ড অভিমান করে। কিন্তু দিনশেষে তার বুক ছাড়া ঘুমায়নি একবারও গত কয়েকদিনে।

জাওয়াদ পূর্ণতার হুড়োহুড়ি মাঝেই তাকে কোলে তুলে নেয়। রুমে ঢুকতে ঢুকতে পূর্ণতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল–

—ছেড়েই দিবো, ধরে রাখব না বেশিক্ষণ। কিন্তু ছাড়ার পর তোমার অবস্থান হবে আমার বুকের নিচে। এলোমেলো ভাবে। আদর নেওয়া অবস্থায়।

জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। তার পুরো অঙ্গে লজ্জারা ছুটোছুটি করতে শুরু করে দেয়। পূর্ণতা হাসফাস শুরু করে নিজের এই অস্বাভাবিক লাল হয়ে যাওয়া মুখখানা লুকোতে। কোন কুল-কিনারা না পেয়ে একহাত দিয়ে জাওয়াদের কাঁধ চেপে ধরে তার বুকেতেই মুখ লুকায়।

পূর্ণতার কাণ্ডে জাওয়াদ হেঁসে দেয় সশব্দে।

—আমার দেওয়া লজ্জা থেকে বাঁচতে, আমাকেই আঁকড়ে ধরছো। নারী তুমি বড়ই নাটকীয়।

পূর্ণতা জাওয়াদের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকা অবস্থাতেই হেঁসে দেয়। টুকুস করে ছোট একটা কা”ম”ড় দেয় জাওয়াদের বুক্ষে। জাওয়াদ পূর্ণতাকে বেডে শুয়ে দিতে দিতে বাঁকা হেঁসে বলল–

—আমায় যেখানটায় কামড় দিলে, আমি যদি দেই সইতে পারবে? আমি দিলে আস্তে দিবো না কিন্তু, একদম নিশানা রেখে যাওয়ার মতো করে দিবো।

পূর্ণতা খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিয়ে পাশ থেকে একটা বালিশ উঠিয়ে সেটা জাওয়াদের দিকে ফিকে মা”রে। বালিশটি গিয়ে পরে জাওয়াদের মুখে। তাও জাওয়াদ হাসতে থাকে। মনে আর এক বিন্দুও বিষাদ নেই। বরং তার অবাধ্য মনটা বড়ই অস্থির হয়ে রয়েছে নিজের সুন্দরী, আবেদনময়ী বউয়ের সানিধ্য পেতে।

জাওয়াদ তার মনের অস্থিরতা কমাতে লেগে পড়ে। হাত বাড়িয়ে বেডসাইডে থাকা সুইচ টিপ দিয়ে পুরো ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়। শুধু জ্বালিয়ে রাখে তাদের বেডের পাশের ল্যাম্পটি। তারপর কোমলতা, ভালোবাসা ও যত্ন নিয়ে প্রেয়সী রূপী বউয়ের সারা অঙ্গে নিজের আদরের ঝড় বইয়ের দিতে থাকে। পূর্ণতাও পুরোটা সময় নিজের সর্বোচ্চ সাপোর্ট দেয় স্বামীকে।

_______________________________

সময়টা এখন রাত্রের শেষ প্রহর। পূর্ণতার ক্লান্ত দেহে নিজের বক্ষের মাঝে চেপে রেখে আলতো হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে জাওয়াদ। পূর্ণতা ঘুমিয়ে পড়লেও, ঘুমায়নি জাওয়াদ। তার বুকের ভেতরটা এখনও কেমন দাউদাউ করছে দুপুরের সেই বিশ্রী ঘটনার কারণে। তার সন্তানকে পিতৃ পরিচয়হীন বলা সেই মানবীটির কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে মন চাচ্ছে তার।

জাওয়াদ অতি সাবধানে বালিশের পাশ থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নেয়। তারপর একটা নাম্বারে সুনিপুণ হাতে টাইপ করে “কাল সকাল সকালই যেন মিস আভিরার আসল রূপ পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টা আগামী সাতদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরলে, তুমি নিজের জন্য অন্য কোম্পানিতে চাকরি খুজতে শুরু করে দিও।”

টেক্সটটা সেন্ড করে জাওয়াদ সন্তর্পণে ফোনটা পূর্বের জায়গায় রেখে দেয়। তারপর নিজের মাথাটা বালিশ থেকে একটু উঠিয়ে পূর্ণতার মাথার তালুতে একটা চুমু দিয়ে পুনরায় নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে চোখের উপর ডান হাত রাখতে রাখতে বিরবিরিয়ে বলল–

—পূর্বের যা করেছি, তার জন্য নিজের চামড়া কেটে তোমার জন্য জুতো বানিয়ে দিলেও কম হবে। কিন্তু আই প্রমিজ, তোমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের মতো সুন্দর করার প্রচেষ্টা আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চালিয়ে যাবো। আর তোমায় কষ্ট দেওয়া প্রতিটি ব্যক্তির ঘুম হারাম করে দিবো।

শেষোক্ত কথাটি জাওয়াদ চোয়াল শক্ত করে বলে।

_______________________________

“সফলতা পাওয়ার নতুন ফাঁদ উদ্ভাবন।”

“তাড়াতাড়ি সফলতা পেতে বাবা-মেয়ের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ফাঁস।”

ইত্যাদি হেডলাইন গুলোর সাথে আভিরা ও তার পিতা অভিকের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুলোতে ভাসছে। কমেন্ট বক্সে তাদের দু’জনকে তিরস্কার, ভর্ৎসনা করছে আমজনতা। সবার মুখে একটা কথা, শিক্ষক যখন বাবা হয়, তখন সন্তানের এমন অধঃপতন বড় কোন ব্যাপার নয়।

গাড়িতে বসে এসব নিউজ দেখছে পূর্ণতা। যতই দেখছে ততই অবাক হয়ে যাচ্ছে। একজন বাবা কি করে দ্রুত সফল হওয়ার জন্য নিজের কন্যাকে একজন পরপুরুষের বেডে পাঠাতে পারে এটা ভেবেই পূর্ণতার মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে।

আভিরা ও তার বাবা অভিক নোংরা চরিত্রে লোক। অভিক সাহেব পূর্বে বিভিন্ন ফ্যাশন ডিজাইনিং কোম্পানি গুলোতে সাধারণ কর্মচারী হয়ে চাকরি করতেন। এমন এক কোম্পানিতে চাকরি করতে গিয়ে সেখানের বসের মেয়ের সাথে সে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তার বসের একটি মাত্র সন্তান ছিল তার মেয়ে। তাই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অভিক সাহেবকে মেয়ে জামাই হিসেবে মেনে নিয়ে তাদের দু’জনের বিয়ে দেন এবং নিজের কোম্পানি অভিক সাহেবের হাতে তুলে দেন।

কিন্তু অভিক সাহেব ছিলে একজন অকালকুষ্মাণ্ড ও অযোগ্য লোক। তার কারণেই কোম্পানি একসময় লসে ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়। সে সেই ধ্বংস অবস্থা থেকে কোম্পানিকে উদ্ধার করতে ব্যবহার করেন নিজের কিশোরী মেয়েকে।

বিভিন্ন ফ্যাশন ডিজাইনিং কোম্পানিগুলোর ওনারদের কাছে মেয়েকে পাঠিয়ে বড় বড় প্রজেক্ট হাতাতেন। কোন কোম্পানি যদি তার সাথে কাজ করতে না চাইত, তাহলে মেয়েকে মিথ্যে বলতে বলতেন যে, সেই কোম্পানির ওনার তার মেয়ের সাথে বাজে কাজ করেছে বা করার অফার দিয়েছে। নিজেদের সম্মান বাঁচানোর দায়ে কোম্পানি গুলোর ওনাররা কখনো-সখনো তাদের সাথে কাজ করতে রাজি হয়ে যেত।

এমন করে করে বেশ কয়েক বছর কাটান তারা। তারপর তাদের নজর পরে জাওয়াদের ঐতিহ্যের উপর। জাওয়াদ অবশ্য তাদের বাজে প্রস্তাবের ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের যোগ্যতা দেখেই তাদের সাথে কাজ করতে রাজি হয়েছিল। তাও এবার তাদের আকাঙ্খা ছিলো একটু বেশিই।

অভিক সাহেব চেয়েছিলেন জাওয়াদের সাথে কোনমতে তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ঐতিহ্য ক্রিয়েশনসও তাদের হস্তগত করতে। কিন্তু তারা একে অপরের সাথে ডিল সাইন করার কয়েকদিন পরই আভিরা জানতে পারে জাওয়াদ বিবাহিত। এরপরও সে হাল ছাড়ে না। নানান অজুহাতে সে জাওয়াদের অফিসে আসা-যাওয়া শুরু করে। আকারে-ইঙ্গিতে জাওয়াদকে বুঝাতে চায় সে পছন্দ করে জাওয়াদকে। কিন্তু জাওয়াদ বুঝি ঘরে মণ্ডা-মিঠাই রেখে বাহিরের বাতাসার দিকে তাকায়?

জাওয়াদকে হাত না করতে পেরে আভিরা মাহবুবকে হাত করার চেষ্টা করে। মাহবুব জাওয়াদের মতো এতটা তীক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন নয়। সে আরিয়ানের মতোই সদা হাস্যোজ্জ্বল, মিশুক ও মজার মানুষ। আভিরা ভাবে জাওয়াদকে ফাঁসানোর চেয়ে মাহবুবকে ফাঁসানো সহজ হবে।

এই ভাবনা মাথায় নিয়ে ৪/৫ দিন আগে সে মাহবুবের সাথে দেখা করতে কেবিনে আসে। লাঞ্চের সময় সে মাহবুবের কেবিনে গিয়ে তাকে অনৈতিক সম্পর্কে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। মাহবুব রেগে গিয়ে একবাক্যে তাকে মানা করে দেয়। এরপর সে নিজের জামা-কাপড় ছিঁড় এবং একসময় সে নিজেই মাহবুবের কাছে গিয়ে ধস্তাধস্তি করতে থাকে। বিষয়টা দূর থেকে দেখলে বুঝা যাবে, মাহবুব হয়ত আভিরাকে জোর করছে। কিছুক্ষণ পর সে নিজেই সরে গিয়ে মাহবুবের কেবিনের টেবিলের এক কর্ণারে রাখা তার ফোনটি তুলে নেয়। আর মাহবুবকে হুমকি দেয় সে যদি আভিরার প্রস্তাবে রাজি না হয়, তাহলে আভিরা এই ভিডিও এডিটিং করে সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে দিয়ে মাহবুবকে বদনাম করবে।

মাহবুব তার কথায় ভয় পেয়ে যায়। কারণ, সে তখনও জানত না জাওয়াদ সে সহ পুরো অফিসের স্টাফদের কেবিনগুলোয় মাস কয়েক আগেই হিডেন ক্যামেরা লাগিয়েছে।

মাহবুব তৎক্ষনাৎ ছুটে যায় তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু জাওয়াদের কাছে। পুরুষ মানুষ হয়েও, সম্মান ও আপন মানুষের ভরসা হারানোর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে জাওয়াদকে পুরো ঘটনা খুলে বলে। জাওয়াদ মাহবুবকে কেবিনে হিডন ক্যামেরা লাগানোর কথা জানায় এবং বলে সেই আভিরাকে কঠিন শাস্তি দিবে।

গতকাল আভিরাদের ডাকার একটাই কারণ ছিলো, জাওয়াদ ও মাহবুব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা “ঐতিহ্যবাহী আভরণ” নামক যেই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল সেটা বন্ধ করে দিবে। মূলত গতকাল একটা আনঅফিশিয়াল মিটিং হয়েছে জাওয়াদ ও অভিক সাহেবের মাঝে। এই মিটিং শেষেই পূর্ণতাকেও অফিশিয়ালি কাজ বন্ধের কথা জানাবো হতো। আভিরা তখন জাওয়াদের কেবিনে বসে অপেক্ষা করছিল মিটিং শেষ হওয়ার। আর তখনই পূর্ণতা ও তাজওয়াদ আসে।

বন্ধুকে হেনস্তা করার জন্য আভিরার উপর জাওয়াদের একটা ক্ষোভ তো ছিলোই, কিন্তু নিজের স্ত্রী-সন্তানের অপমানে তা প্রতিশোধের আগুনে রূপান্তরিত হয়। জাওয়াদ গোপনে আভিরাদের সাথে পূর্বে কাজ করা কোম্পানিগুলোয় খোঁজ চালিয়েছে। জাওয়াদের ফ্যাশন হাউস যেহেতু বর্তমানে শহরের যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে, তাই কয়েকজন ফ্যাশন হাউজের ওনাররা নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রেখে আভিরা ও তার পিতার কর্মকাণ্ড ফাঁসে জাওয়াদকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে।

“ঐতিহ্যবাহী আভরণ” প্রজেক্ট অফিশিয়ালি আজ স্থগিত করা হবে। তাই পূর্ণতাও আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রির হেড হিসেবে “ঐতিহ্য ক্রিয়েশনস”-এ যাচ্ছে। পূর্ণতা ও জাওয়াদের গন্তব্য এক হওয়ায়, পূর্ণতা জাওয়াদের সাথে করেই যাচ্ছে।

পূর্ণতা ফোনের স্ক্রিন অফ করে জাওয়াদের কাছে এগিয়ে যায়, যে কিনা বর্তমানে মনোযোগ সহকারে ড্রাইভিং করছে। পূর্ণতা জাওয়াদের বাহুতে নিজের মাথা ঠেকায়। জাওয়াদ রাস্তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি রেখে ড্রাইভিং করছে। পূর্ণতা কোমল গলায় জিজ্ঞেস করে–

—এই ডিলটা ক্যান্সেল করে দিলে তো আপনাদের প্রায় কোটি খানেকের মতো লস হবে। আউটলেটগুলো প্রায় রেডি। এখন ক্যান্সেল করে দিবেন?

জাওয়াদ নির্বিকার ভাবে বলল–

—কিছু করার নেই। আজ মাহবুবের সাথে বাজে কাজ করেছে, কাল আমার সাথে করবে। ওরা কতটা ভয়ানক তুমি আন্দাজ করতে পারছো? ওদের নাহয় মানসম্মানের ভয় নেই। কিন্তু আমার আছে।

তাছাড়া এমন টক্সিক মানুষ আশেপাশে থাকলেও টেনশন পিছু ছাড়ে না।

পূর্ণতা একমত হয় জাওয়াদের সাথে।

________________________

—পরশু কিন্তু তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি, তোমার মায়ের কাছে তোমাকে চাইতে। এতে তোমার কি মতামত?

আকস্মিক কথায় আরওয়ার হাত থেকে কলমটা পড়ে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের কেবিনের দরজার দিকে তাকালে, সেখানে আরিয়ানকে বুকে হাত গুঁজে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। এই অসময়ে আরিয়ানকে পূর্ণতার অফিসে দেখে আরওয়া অবাক হলেও, কোন প্রশ্ন করে না। তার মাথায় তখন ঘুরছে আরিয়ানের কথাটা।

পরশু অফ ডে। আর আরিয়ানরা পরশুই যাবে তাদের বাড়ি। বিষয়টা ভেবেই আরওয়া খানিকটা নার্ভাস ফিল করতে থাকে। তার জানা নেই, তার মা-ভাই আরিয়ানকে মেনে নিবে কিনা।

—কি হলো বললে না, তোমার মতামত কি?

আরওয়া বরাবরের মতোই নিজের অস্থিরতা, টেনশন নিজের মাঝেই চেপে রাখে। মেয়েটা এই বিষয়ে এতটা পটু যে, সামনের ব্যক্তি ঘুনাক্ষরেও টের পাবে না তার ভেতরে কি চলছে। সে শান্ত গলায় বলল–

—আমার আবার মতামত কিসের?যাবেন ভালো কথা।

—আর গিয়ে যদি খালি হাতে ফিরে আসতে হয়?

এই প্রশ্নটা তাঁকেও দুঃস্বপ্নের মতোই তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সত্যিই যদি ভাগ্য তাকে আরো একবার আলাদা করে দেয় আরিয়ানের থেকে? তাহলে সে কি নিজেকে সামলাতে পারবে? কথায় আছে, কায়া দেখলে মায়া বাড়ে। আরওয়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই কয়েকমাস আরিয়ানের আশেপাশে থাকতে থাকতে, তার সাথে দেখা করার পর থেকে আরওয়া তার প্রতি আরো আসক্ত হয়ে পড়েছে। সে জানে না, এই আসক্তি থেকে বের হবে কীভাবে? ভাগ্য সাথ দিলে সেও আজীবন এই আসক্তির মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু ভাগ্য কও সাথ দিবে আরওয়া ও আরিয়ানের? এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]

শব্দসংখ্যা~২২১৭

#চলবে?

[জুকার শালায়, আপডেটের নাটক করে পেইজের রিচ একদম তলানিতে নামিয়ে দিয়েছে। সবাই প্লিজ একটু বেশি বেশি রেসপন্স করিয়েন। যারা গল্পটা পড়বেন, একটা করে হলেও কমেন্ট করিয়েন। 🥺

আর হ্যাঁ, গল্পটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। শুধু মাত্র পূর্ণতার সাথে হওয়াটা ইন্সিডেন্টটা কিছুটা বাস্তবতা থেকে নেওয়া। তাই বলবো, কাল্পনিক গল্পে বাস্তবতা খুঁজতে আসবেন না।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply