Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২৯


#মেজর_ওয়াসিফ

#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

পর্ব (২৯)

লুইপা যখন ঘরে ঢুকলো, দেখলো সামির নিজের গোছগাছ সারছে। দুজনের দৃষ্টি এক হতেই সামির আন্তরিক হেঁসে আবার নিজের কাজে মনোযোগী হয়। গতরাতের পর থেকে সামির ভীষণ চেষ্টা করছে এই মেয়েটার সঙ্গে সহজ হতে। আসলে জটিলতা সামিরের বরাবরই কখনো পছন্দ ছিলো না। ও আগাগোড়া যেমন সহজ, ও সর্বদা চায় সবকিছু ই ওর জন্য সহজ হোক, ও নিজেই সবকিছু সহজ করে নিতে পারুক এমন।

লুইপা এসেই চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে খাটের কাছে। সামির ব্যাগে সবকিছু গুছিয়ে নিতে নিতে বলে।

‘ সকালের চা টা চমৎকার ছিলো। অনেক দিন পর মনমতো এক কাপ চা খেলাম। চা টা কে বানিয়েছিলো’?

লুইপা আস্তে করে জবাব দেয় ‘ আমি’

সামির হেঁসে বলে ‘ মাশাল্লাহ, সত্যি চা চমৎকার ছিলো’

‘ ধন্যবাদ ‘

সামির উল্টো ওকে বলে ‘ আপনাকেও ধন্যবাদ ‘

‘ হঠাৎ আমাকে কেনো ধন্যবাদ ‘?

সামির সহজ করে উত্তর দিলো।

‘ এতো সুন্দর করে আমাকে এক কাপ চা করে খাওয়ানোর জন্য। পরেরবার আসলে সকাল -বিকেল নিয়ম করে দুইবার খাওয়াবেন, কেমন’?

‘ আচ্ছা ‘

সামির ওর ওয়ালেট থেকে তিনটে হাজার টাকার নোট বের করে লুইপার দিকে বাড়িয়ে দিতেই লুইপা জিজ্ঞেস করে।

‘ এটা কেনো’?

‘ জীবনের প্রথম সবকিছুর সূচনাতে উপহার দিতে দিতে যেতে হয়। এই যে আজ চা বানিয়ে খাওয়ালেন এটা ছিলো আমার আর আপনার সূচনা, এরপর থেকে প্রতিনিয়ত এটা চলবে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমি আর আপনাকে উপহার দেবোনা। সবকিছুর সূচনাতেই দেবো। এটা রাখবেন প্লিজ ‘

লুইপা হাত বাড়িয়ে ও বাড়াচ্ছে না, লজ্জা নাকি জড়তা ও ঠিক বুঝতে পারে না। সামির বুঝতে পেরে আলগোছ হাতটা টেনে হাতের মুঠোয় টাকাটা গুঁজে দেয়।

‘ এরপর আসলে, রান্না করে খাওয়াবেন। ওটার জন্য ও উপহার দেবো। ‘

ওদের কথোপকথনের মধ্যে বেশ তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে আরিয়ান ঘরে ঢুকতে গিয়েও ঢোকেনা। কোনোরকমে ঘরের দরজায় এক পা দিতেই চিংড়ি মাছের মতো চটকে আবার বাইরে চলে যায়। ‘ দূর! এটা তো বিবাহিত এখন, আমার এখন এর সঙ্গে ফর্মাল হতে হবে’ দুটো কাশি দিয়ে আরিয়ান ওদের মনোযোগ পেতেই গলা উঁচিয়ে বলে।

‘ আমরা সাড়ে দশটার দিকে বের হবো, কতদূর তুই ‘?

‘ হয়ে গেছে ‘

‘ তাহলে বের হচ্ছিস না কেনো? তোকে কি পাজাকোলে করে বের করতে হবে আমার’?

সামির গিয়ে দাড়ায় দরজার কাছে, আরিয়ান এবার ফিসফিস করে বলে।

‘ নতুন বিয়ে তো, সব বুঝি, বৌ রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু কি আর করার? চাকরি ভাই, পেট বাঁচাতে গেলে… ‘ মুখের কথা ওমনি গিলে ফেলে বলে।

‘ সুন্দর সুন্দর বৌ পেতে হলে চাকরি করতেই হবে’

সামির ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে।

‘ কয়টা লাগবে তোর বৌ’?

‘ আপাতত একটা হলেও হতো। কিন্তু সেই একটাই হচ্ছে না, কপাল খারাপ ‘

‘ তুই যতোদিন না শোধরাবি ততদিন তোর বৌ হবেও না’

আরিয়ান অবাক ভঙ্গিতে শুধায়।

‘ কি রে ভাই? এক রাইতেই পল্টি খেলি? একটা মানুষ এভাবে, কিভাবে পাল্টে যেতে পারে’?

সামির মাথা ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকায়, লুইপার মনোযোগ ওদের দিকে নেই, লুইপা বিছানা গোছাচ্ছে। সামির এবার আরিয়ানের মতো ফিসফিস করে বলে।

‘ বৌ হলো একটা সিরিয়াস বস্তু, এদের সামনে মোটেও ভ্যাবলা সাজা যাবেনা। অলওয়েজ সিরিয়াস মুডে থাকতে হবে। বুঝতে পেরেছিস’?

‘ হু হু’

‘ গুড, এবার কি বলবি জলদি বল’?

‘ আমাদের রওনা হতে হবে’

‘ স্যার কোথায় ‘?

‘ জানি না ‘

‘ তুই সবকিছু গুছিয়ে গাড়ির কাছে যা, আমরা আসছি’

‘ ওকে’

____________

আরিয়ান সবকিছুতে আগে থাকে। ধীরে সুস্থে সবার থেকে বিদায় নিয়ে যখন বড়ো উঠানে পা রাখে ঠিক তখন আচমকা পেছন থেকে লোপা চেচিয়ে উঠে বলে।

‘ ও আংকেল! আবার বেড়াতে আসবেন কিন্তু আমাদের বাড়িতে ‘

কপাল কুঁচকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে আরিয়ান ঘুরে দাঁড়ায়। কপাল থেকে বিরক্তির রেখা সরিয়ে সামান্য হেঁসে বলে।

‘ আর আসবো না, তোমরা ভালো থেকো’

‘ কেনো আংকেল? আমি আরো ভেবেছি পরেরবার আসলে আন্টি কে সাথে করে নিয়ে আসতে বলবো। আপনি বিয়ে করেছেন আংকেল’?

কথাগুলো বলতে বলতে লোপা উঠানে নেমে আরিয়ানের সামনাসামনি দাঁড়ায়। আরিয়ান দেখে মেয়েটাকে। বয়স ঐ ষোলো’র কোঠায় কিন্তু কথা আর চালচলনে বেশ মুরুব্বি টাইপ। গায়ের ওড়নার এক কোণায় কি যেনো বেঁধে রেখেছে। আরিয়ান ওর কথার জবাব না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করে।

‘ ওড়নায় কি বেঁধে রেখেছো পিচ্চি ‘?

‘ তেঁতুল। খাবেন আপনি ‘?

‘ না, ওসব খাই না’

লোপা নাছোড়বান্দা মেয়ে। ও মনে করে ওদের গ্রামের এমন সব খাবারদাবার শহরের ঐ মানুষ গুলো খায়না। কিন্তু একবার যদি একটু ছেঁকে দেখে তবে মুখে সেই সাধ লেগে থাকবে বহুদিন। ওড়নার কোনা থেকে গিট খুলে দুটো তেঁতুল বাড়িয়ে ধরলো আরিয়ানের সামনে।

‘ এই দুটো নিন, সময় করে লবন, মরিচ দিয়ে খেয়ে দেখবেন, খুব মজা’

আরিয়ান চেয়ে দেখে মেয়েটাকে, মুখটা জুড়ে সরলতার আভা ছড়িয়ে আছে। ও আর না করলোনা। হাত বাড়িয়ে নিলো। খাবে কি না সে পরের হিসাব।

‘ আচ্ছা নিলাম, খুশি তুমি ‘?

‘ হ্যা’

‘ আচ্ছা, ভালো থেকেও পিচ্চি, আসি’

‘ আমাকে পিচ্চি ডাকবেন না আংকেল’

‘ তবে আমাকেও আংকেল ডেকো না, নিজের কাছে নিজেকে বুড়ো ফিল হয়’

লুইপার সরল প্রশ্ন ‘ তবে কি ডাকবো’

‘ তোমাদের বাড়িতে আসা, যাওয়া করতে করতে পরিচিত হয়ে গেছি না? ভাইয়া ডেকো’

‘ আচ্ছা, পরেরবার আসলে ডাকবো। ‘

ওদের কথোপকথন এখানেই শেষ হয়। লোপা তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে বাড়ির মধ্যে ঢোকে আরিয়ান ওতটুকু সময় তাকিয়ে দেখে চোখ নামিয়ে চেয়ে থাকে তেঁতুল দুটোর দিকে। সামান্য হেঁসে ঐ দুটোকে পকেটে ভরে আবার তাকায় বাড়িটির দিকে। এরপর আর দাঁড়ায় না, চলে যায় রাস্তার মোড়ে, যেখানে গাড়ি এসে থেমেছে ওদের জন্য।

__________

ঘরের এক কোণায় দাড়িয়ে আছে ধারা। চুপচাপ দাড়িয়ে দেখছে মা-ছেলের আদুরে জোরজবরদস্তি। ওয়াসিফ তাড়াহুড়ো করছে বেরিয়ে যাবে বলে এদিকে শাহেনূর ভাতের প্লেট গুছিয়ে এনে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে একের পর এক বলেই চলছে।

‘ খেয়ে যা, শুধু চা খেয়ে এতো পথ যাওয়া যায় নাকি? পথে খিদে লাগবে’

ওয়াসিফ সে কথা শুনছেনা, শাহেনূর অধৈর্য্য হয়ে নিজের হাতে ভাত মেখে ছেলের মুখের সামনে ধরতেই ওয়াসিফ থামে। শাহেনূর বলে।

‘ তুই না খেয়ে গেলে আমার খারাপ লাগবে, এই কয়টা ভাত খেয়ে খুব বেশি দেরি হবেনা। আমি খাইয়ে দি। আয়’

ওয়াসিফ মায়ের মমতা ভরা অনুরোধ শোনে, চুপচাপ স্থির হয়ে বসে মায়ের পাশে। মিনিট পাঁচেক সময়ের মধ্যে খেয়ে উঠে মায়ের আঁচল টেনে মুখ মুছে নিতে নিতে বলে।

‘ তোমার মতো করে হয়তো আর কেউ কখনো এভাবে ভালোবাসবেনা আমাকে। আমাকে ভালোবাসার মতো পৃথিবীতে একমাত্র তুমি ই আছো। ‘

কথাটা ওয়াসিফ বললো ঠিকই তবে ধারার চোখ তখনো ওয়াসিফের দিকে। কথাটার মধ্যে ঠিক কি ছিলো ও জানেনা তবে মানুষটাকে কখনো এভাবে আবেগি হতে দেখেনি কখনো।

শাহেনূর এঁটো প্লেট হাতে বেরিয়ে যেতে যেতে ওয়াসিফও মায়ের পিছু পিছু হেঁটে বেরিয়ে যায়। ধারা যে এঘরেই ছিলো তবুও কেউ তাকে এসে বলে গেলোনা যে, সে চলে যাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ধারা দেখে মানুষটার চলে যাওয়া। মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারছেনা হঠাৎ এমন ব্যবহারের কারণ কি? যেই মানুষটা সকালে ও এক কাপ চা চেয়ে খেলো, ভালো মন্দ দুটো কথা বললো, সে চলে যাচ্ছে অথচ একবার বলেও গেলোনা।

ধারা বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকে না, বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওয়াসিফরা ইতিমধ্যে বাড়ি ছেড়ে উঠানে বেরিয়েছে। মা, বড়োমা, বাবা, আপা ওরা সবাই ওদের পিছুপিছু রাস্তার মোড় পরযন্ত এগিয়ে দিতে যাচ্ছে। শুধু যাচ্ছে না ধারা। ও দোতলার খোলা বারান্দার রেলিঙ ধরে দাড়িয়ে দেখছে সবকিছু।

ওয়াসিফ রাস্তা অব্ধি গেলোনা, কি যেনো মনে করে ওদের কিছু একটা বলে পুনরায় বাড়ির ভেতর ঢুকলো। ধারা ছুটে গিয়ে নিচে নামতে চায় তবে তার আগেই ওয়াসিফ দোতলায় উঠে সোজা নিজের ঘরে ঢোকে। মিনিট দুই পর ওয়াসিফ লম্বা কদমে আবার বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। এই পুরোটা সময় ধারা সিড়ির কাছেই দাড়িয়ে ছিলো, লোকটা ওর পাশ কাটিয়ে দুইবার আসা যাওয়া করলো অথচ একবারের জন্য তাকালোও না। হঠাৎ এই উপেক্ষার কারণ বোঝেনা ধারা। ও ছুটে গিয়ে উঠানে দাঁড়াতেই দেখলো বাড়ির সবাই ওদের রওনা করে ফিরে আসছে। তারমানে এবারের মতো চলে গেলো সে!

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply