মনবোঝেনা (০৩)
সানা_শেখ
বেলা বাজে বারোটার উপর। মাত্র ঘুম থেকে জাগ্রত হলো আবরার। চোখ বন্ধ রেখেই শোয়া থেকে উঠে বসল অলস ভঙ্গিতে। এলোমেলো চুলগুলো আছড়ে পড়েছে কপাল আর চোখের উপর। দুই হাতে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে চোখ মেলল। বিছানা ছেড়ে নেমে লাইট জ্বালিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। ঘুমিয়েছিল ভোরের দিকে, তাই ঘুম থেকে উঠতে এত দেরি। টেনশনে রাতে ঘুম আসছিল না তার। সারাহর সঙ্গে থাকা ছেলেটা কে এটা নিয়ে টেনশন করতে করতেই রাত প্রায় শেষ করে ফেলেছিল।
ফ্রেশ হয়ে গোসল সেরে বের হলো ওয়াশরুম থেকে। চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিয়েছে। কাবার্ড থেকে জিন্স প্যান্ট বের করে পরে নিল। গায়ে পারফিউম লাগিয়ে সাদা শার্ট পরে চুলগুলো পরিপাটি করে মানিব্যাগ আর বাইকের চাবি পকেটে ভরল। সানগ্লাস শার্টের সামনে ঝুলিয়ে ফোন হাতে নিয়ে বের হলো রুম থেকে।
ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখা হলো মহুয়া কবীরের সঙ্গে। তিনি টিভি দেখছেন সোফায় বসে। এই নারীকে একদম সহ্য হয় না আবরারের, সেই প্রথম থেকেই। সে তো এই নারীকে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী করতে কোনোভাবেই রাজি ছিল না। তার বাবা তার কথা না শুনে মহুয়া কবীরকে বিয়ে করেছিলেন, তখন থেকেই বাবা ছেলের সম্পর্ক ভাঙতে শুরু করেছিল। আবরার বাবাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে নিষেধ করেনি, কিন্তু সে চায়নি তার বাবা মহুয়া কবীরকে বিয়ে করুক।
ড্রয়িংরুম ডিঙিয়ে ডাইনিংরুমে প্রবেশ করল খাওয়ার জন্য। তার জন্য রাখা নাশতা এখনো আগের মতোই পড়ে রয়েছে প্লেটে। সে নাশতার প্লেট সরিয়ে রেখে দুপুরের খাবার খেতে ব্যস্ত হলো। খেয়েই বের হবে, বন্ধুরা অপেক্ষায় আছে।
*****
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে, আকাশ সেজে উঠেছে কমলা রঙে। রোদের তেজ এখন আর নেই।
সারাহ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল ফাইয়াজ সোফায় বসে ভিডিও গেম খেলছে। সারাহ সোজা রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে ঠান্ডা পানি খেলো। পুনরায় ড্রয়িংরুমে এসে দেখল ফাইয়াজ ফোন রেখে সোজা হয়ে বসে আছে। তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে সারাহর কপালে ভাঁজ পড়ল কয়েকটা। গেম না খেলে এভাবে বসে আছে কেন? এই ছেলেকে বকাবকি করেও ফোন থেকে দূরে রাখা যায় না, একমাত্র যখন তার মাথায় অন্য কোনো বুদ্ধি কিলবিল করে তখনই ফোন রেখে দেয়। নিশ্চই কোনো শয়তানি বুদ্ধি এঁটেছে তাকে খাটানোর জন্য। সে আজ আর পা দিবে না ফাইয়াজের কোনো চালে। সে এখানে থাকলে ফাইয়াজ কোনো না কোনোভাবে তাকে ঠিক গলিয়ে ফেলবে। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। ফাইয়াজ তাকে পিছু ডেকে বলল,
“সারাহ, এখানে আয়।”
না ভাইয়ের কাছে না গিয়েই বলল,
“কেন?”
“কথা আছে, আয়।”
“যাব না। যা বলার বলো, আমি শুনছি।”
ফাইয়াজ নিজেই বসা থেকে উঠে বোনের কাছে এগিয়ে এলো। সারাহর হাত ধরার জন্য হাত বাড়াতেই সারাহ নিজের দুই হাত পেছনে লুকিয়ে ফেলল। বলল,
“কী বলবে বলো।”
“আয় ক্রিকেট খেলি। তোর পাঁচ ওভার, আমার পাঁচ ওভার।”
সারাহ দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
“একদম না। আমি খেলব না তোমার সঙ্গে। তুমি সবসময় আগে আগে ব্যাটিং করো পরে আর আমাকে ব্যাটিং করার সুযোগ না দিয়ে কে’টে পড়ো। তোমার সঙ্গে খেলার চেয়ে ফাহিমের সঙ্গে খেলা ভালো।”
“আজকে এমন কিছু করব না, তোকে ব্যাটিং করার সুযোগ দিবো। সত্যি বলছি।”
“আমি তাও খেলব না।”
সারাহ সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে তাকে টেনে ধরল ফাইয়াজ। বলল,
“এমন করিস না বইন।”
সারাহ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে আমাকে আগে ব্যাট করতে দিতে হবে।”
“আগে আমি ব্যাট করব, তারপর তুই।”
“তুমি খেলো গিয়ে তোমার খেলা, আমি খেলব না তোমার সঙ্গে। নয়তো বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলো।”
“তুই জানিস এখন বাইরে খেলতে যেতে দিবে না। আয় না, সন্ধ্যা হয়ে যাবে।”
“হোক, আমি খেলব না তোমার সঙ্গে। হাত ছাড়ো আমার।”
“শ’য়’তা’নি এমন করছিস কেন? চল না।”
“তুমি শ’য়’তান আর তোমার বউ শ’য়’তানি।”
ফাইয়াজ কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নিয়েছিল, কিন্তু নিতু সুলতানা সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দুজনকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
“কী হয়েছে তোমাদের?”
সারাহ কিছু বলার আগেই ফাইয়াজ বলল,
“আম্মু, ওকে বলো না আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে। মাত্র পাঁচ ওভার করে খেলব।”
সারাহ বলল,
“না। ভাইয়া সবসময় আমার সঙ্গে বাটপারি করে। আগে নিজে ব্যাটিং করে, পরে আর আমাকে করতে দেয় না।”
“বলছি তো আজকে দিবো।”
“চলো ব্যাডমিন্টন খেলি।”
“না। ক্রিকেটই খেলব।”
“খেলো গিয়ে তোমার খেলা, আমাকে ছাড়ো এখন। আম্মু, ভাইয়াকে বলো আমাকে ছাড়তে।”
ফাইয়াজ বলল,
“বলছি তো আজকে তোকে ব্যাট করতে দিবো।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“যদি না দাও?”
“তোর যা ইচ্ছে হয় তাই করিস আমার সঙ্গে।”
“তোমার ব্যাট ভেঙে ফেলব।”
“আচ্ছা।”
“তুমি যখন ব্যাট করবে তখন বল আমি কুড়োবো, আর যখন আমি ব্যাট করব তখন তুমি কুড়াবে, একদম আমাকে কুড়িয়ে দিতে বলতে পারবে না।”
“আচ্ছা।”
“আমাকে পুরো পাঁচ ওভারের ব্যাট করতে দিতে হবে।”
“দিবো।”
“জোরে জোরে বল করতে পারবে না।”
“করব না।”
“ঠিক আছে।”
“তুই দুটো পানির বোতল নিয়ে বাগানে যা, আমি ব্যাট আর বল নিয়ে আসছি।”
ফাইয়াজ ব্যাট বল নিতে ছুটল। সারাহ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া যদি আজকে আমাকে ব্যাট করতে না দেয় তাহলে সত্যি সত্যিই ভাইয়ার ব্যাট ভেঙে ফেলব আমি।”
“তোমাদের ভাই-বোনের ব্যাপার তোমরা বোঝো গিয়ে, আমি কিছু বলব না। রাতে কী খাবে সেটা বলো।”
“যা ইচ্ছে রান্না করতে বলো।”
সারাহ পানির বোতল নেওয়ার জন্য রান্নাঘরের দিকে এগোল। ক্রিকেট খেলার সময় সবসময় ফাইয়াজ তার সঙ্গে বাটপারি করে। প্রতিবার নিজে আগে আগে ব্যাটিং করবে। যখন সারাহর সুযোগ আসবে তখন আর খেলবে না। যদি কখনো খেলেও তখন জোরে জোরে বল করবে, সেই বল ব্যাটে লাগাতেই পারে না সারাহ। যদি লাগেও, বল দূরে গেলে সেটা সারাহকে দিয়ে আনাবে নয়তো সে আর বল করবে না। অথচ নিজের বেলায় প্রত্যেকবার সারাহকেই বল নিয়ে আসতে হয় খুঁজে খুঁজে। এত জোরে জোরে ব্যাট করে যে বল অনেক দূরে চলে যায়, কখনো কখনো রাস্তায়ও চলে যায়। শেষে বিরক্ত হয়ে সারাহ নিজেই আর ব্যাট করে না। তখন ফাইয়াজ দাঁত কেলিয়ে হাসে।
ফাইয়াজ ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বল হাতে দাঁড়িয়ে আছে সারাহ। বল করার আগেই বলল,
“আস্তে আস্তে ব্যাট করবে, বল রাস্তায় গেলে আমি আনবো না।”
“আমিই নিয়ে আসবো। তুই বল কর।”
সারাহ বল করল, ফাইয়াজ বলটা ব্যাটে লাগিয়ে অনেক দূর পাঠিয়ে দিয়েছে।”
প্রায় দুই ওভার বল করা শেষ। দূর দূর থেকে বল আনতে আনতে ক্লান্ত সারাহ। আবার বল করার আগে বলল,
“ভাইয়া, আস্তে ব্যাট করো। এত জোরে জোরে মা’রো কেন?”
“তুইও জোরে মা’রিস।”
সারাহ বল ছুড়লো ভাইয়ের দিকে। ফাইয়াজ বলে সজোরে বাড়ি মে’রে দিলো, আর বল ঘুরে এসে সোজা সারাহর মুখে লেগে গেল। সারাহ চিৎকার করে দুই হাতে মুখ চেপে ধরে বসে পড়ল সঙ্গে সঙ্গেই।
ফাইয়াজের একটু সময় লাগল এটা বুঝতে যে বলটা সারাহর মুখে লেগেছে। বুঝতে পেরেই ব্যাট ফেলে দৌড়ে এলো বোনের কাছে। সারাহর সামনে বসে তার মুখের উপর থেকে হাত দুটো সরানোর চেষ্টা করে বলল,
“হাত সরা, দেখি কোথায় লেগেছে।”
সারাহ হাত সরাতে চাইল না, ফাইয়াজ জোর করে মুখের উপর থেকে হাত দুটো সরিয়ে নিল। অনেক ব্যথা করছে, মাথার মধ্যে কেমন করছে, চোখের সামনে সব ঘোলা হয়ে গেছে। উষ্ণ তরলের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজের নাকে হাত ছুঁইয়ে হাতের দিকে তাকাল সারাহ। হাতে র’ক্ত দেখে আবার নাকে হাত ছোঁয়াল। নাক থেকে গলগল করে র’ক্ত পড়ছে। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল ফাইয়াজ আতঙ্কিত হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল সারাহ।
ফাইয়াজ দিশেহারার মতো এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। ভয়ে ঘাবড়েও গেছে, মাথা কাজ করছে না কি করবে।
সারাহর ওড়না টেনে খুলতে না পেরে নিজের গায়ে থাকা সাদা রঙের টি-শার্ট খুলে বোনের মুখের র’ক্ত মুছিয়ে দিতে লাগল, কিন্তু র’ক্ত বের হয়ে তখনই আবার ভেসে যাচ্ছে।
টি-শার্ট নাকের উপর চেপে ধরে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“সারাহ, মুখ দিয়ে শ্বাস নে।”
সারাহ হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে কেঁদে কেঁদে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“তুমি ইচ্ছে করে মে’রেছো আমার মুখে।”
“আ আমি ইচ্ছে করে মা’রিনি, আমি ভেবেছিলাম আগের মতোই তোর মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে।”
সারাহ গলা ছেড়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদেই চলেছে। সে হচ্ছে ননীর পুতুল। ছোটো বেলা থেকেই ভীষণ আদরে আদরে বড়ো হয়েছে। এত জোরে আঘাত সে আজকের আগে কোনোদিন পায়নি। অবুঝ বয়সে বাবাকে হারানো, আর কিছু বছর মাকে ছেড়ে থাকার ব্যথা ছাড়া অন্য কোনো ব্যথা তাকে ছুঁতে পারেনি কখনো।
ফাইয়াজ সারাহর কান্না বন্ধ করার জন্য আদর করতে করতে বলল,
“আমার সোনা বোন, ভালো বোন, বাবু কান্না বন্ধ কর। চুপ কর নারে বোন। আমি ইচ্ছে করে তোর মুখে মা’রি’নি, ভুল করে লেগে গেছে, চুপ কর সোনা।”
ফাইয়াজ সারাহর কান্না বন্ধ করার জন্য এমন করছে যে মনে হচ্ছে সারাহ পাঁচ/সাত বছরের বাচ্চা। বেচারা ভয়ের কারণেই আরো এমন করছে। ফারিশ জানতে পারলে আজকে তার খবর আছে। সে সত্যিই ইচ্ছে করে মা’রেনি।
ভাইয়ের এত আদর খেয়েও সারাহর কান্না বন্ধ হচ্ছে না। বলটা এত জোরে লেগেছে যে সারাহর মাথা এখনো ভন ভন করছে।
ফাইয়াজ দৌড়ে পানির বোতল দুটো নিয়ে এলো। সারাহর মাথায় আধা বোতল পানি ঢেলে মুখ ধুইয়ে দিলো। র’ক্ত বন্ধ হচ্ছে না এখনো। ভয়ে ফাইয়াজের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কুলি করিয়ে পানি খাওয়াল। মাথাটা ধরে উপরের দিকে তুলে টি-শার্ট চেপে ধরল আবার। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“ভাইয়া আজকে আমাকে মে’রেই ফেলবে। আব্বু তো বাড়ি থেকেই বের করে দিবে। কেন খেলতে এলাম? ও আল্লাহ, ওরে তাড়াতাড়ি ঠিক করে দাও।”
সারাহ হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
“আম্মুকে ডাকো।”
“অনেক ব্যথা করছে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি সত্যি সত্যিই ইচ্ছে করে মা’রিনি তোর মুখে।”
বড়ো ভাইয়ের গলার আওয়াজ শুনে সামনে তাকাল ফাইয়াজ। ফারিশ ফাহিমের পেছন পেছন আসছে তাকে ডাকতে ডাকতে। ফাহিম তাদের দিকে দৌড়ে আসছে। ফাইয়াজ সারাহকে ছেড়ে গেইটের দিকে দৌড়। ফারিশ তাকে মা’রতে এলে সে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তাকে এভাবে গেইটের দিকে দৌড়ে যেতে আর সারাহ মাটিতে বসে থাকতে দেখে পা-জোড়া থেমে গেল তার। সারাহ উল্টো ফিরে বসে থাকায় সে বুঝতে পারছে না কিছু। কিন্তু যখন টি-শার্টের দিকে চোখ পড়ল সে দৌড়ে এলো সারাহর কাছে। তাকে ধরে আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
“সারাহ, কী হয়েছে তোমার? এত র’ক্ত কীসের?”
সারাহ বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারো ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল। মুখের উপর থেকে টি-শার্ট সরাতেই ফারিশের চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ব্লিডিং আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে এখন।
ফারিশ আগুন চোখে তাকাল মেঝ ভাইয়ের দিকে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে সারাহর এই অবস্থার জন্য ফাইয়াজ দায়ী, নয়তো তাকে দেখে এভাবে দৌড়ে পালাত না। নিজ হাতে টি-শার্ট চেপে ধরে ব্যথাতুর কন্ঠে বলল,
“কী হয়েছিল?”
সারাহ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বল লেগেছে।”
“ইচ্ছে করে লাগিয়েছে?”
“না।”
“ওঠো এখান থেকে।”
ফারিশ সারাহকে টেনে তুলে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বলল,
“তুমি শুধু ভেতরে এসো একবার।”
“ভাইয়া তো ইচ্ছে করে মা’রেনি, ভাইয়া।”
ফারিশ কিছু বলল না। কত র’ক্ত বেরিয়ে গেছে! ফাহিম আগে আগে দৌড়ে গেল বাড়ির ভেতরে। চিৎকার করে মাকে ডেকে বলল,
“আম্মু আম্মু, আপুর র’ক্ত বের হচ্ছে।”
নিতু সুলতানা রান্নাঘরেই রয়েছেন। ছোটো ছেলের জন্য খাবার বানাচ্ছিলেন। ছেলের কথা শুনে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন। দরজার দিকে চোখ পড়তেই দেখলেন ফারিশ সারাহকে ধরে ভেতরে প্রবেশ করছে। তিনিও আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এলেন মেয়ের কাছে। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল সারাহ।
বেশ অনেক্ষণ পর বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল ফাইয়াজ। মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এসেছে। তাকে কেউ কিছু বলার জন্য যায়নি, তাই সাহস করে ভেতরে এসেছে। সোফার উপর চোখ পড়তেই দেখল বাপ-ভাইয়েরা বসে আছে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল তিনজনের সামনে মাথা নিচু করে। সারাহ আর নিতু সুলতানা নেই এখানে।
ফুয়াদ হাসান ছেলের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বললেন,
“সারাহর মুখে বল মে’রেছো কেন?”
ফাইয়াজ অপরাধীর ন্যায় বলল,
“আমি ইচ্ছে করে মা’রিনি।”
“তিন ভাইয়ের একটি মাত্র বোন। বড়ো ভাই হয়ে একটা বোনকে আগলে রাখতে পারো না? উল্টো মে’রেধরে নাকমুখ ফাটিয়ে দিয়েছো!”
“ইচ্ছে করে তো মা’রিনি। আমি জানতাম নাকি বল গিয়ে সোজা ওর চাঁদ বদনে লেগে যাবে? জানলে কী ওদিকে মা’র’তাম?”
“আজকের পর আর একদিন ওকে কোনো আউট ডোর গেম খেলতে নিয়ে গেলে তোমাকে সোজা বাড়ি থেকে বের করে দিবো। পড়াশোনার কোনো খোঁজ খবর নেই, সারাদিন শুধু গেম আর গেম। যাও গিয়ে পড়তে বসো।”
ফাইয়াজ কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ফারিশ তাকে কিছু বলেনি, শুধু তাকিয়ে ছিল। ওই তাকিয়ে থাকা দিয়েই তার ভেতরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ফাইয়াজ নিজের রুমে না গিয়ে সারাহর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। সারাহ চিত হয়ে শুয়ে আছে, তার পাশেই বসে রয়েছেন নিতু সুলতানা। গলা খাকারি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল ফাইয়াজ। দুজনেই তাকাল তার দিকে। ফাইয়াজ এসে দাঁড়াল সারাহর শিয়রে। ব্লিডিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। নাকটা নীল নীল হয়ে গেছে। চোখজোড়ায় র’ক্ত উঠে রয়েছে এখনো। ফাইয়াজ মায়ের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর ন্যায় বলল,
“আমি ইচ্ছে করে সারাহর মুখে বল মা’রিনি, আম্মু। আমি সরি, আর কখনো এমন হবে না।”
নিতু সুলতানা বললেন,
“সরি বলছো কেন? একসঙ্গে খেললে একটু আধটু ব্যথা লাগবেই। ব্যথাটা তো তুমিও পেতে পারতে। কষ্ট পেও না আর। ফারিশ আর তোমার আব্বু কিছু বলেছে?”
“ভাইয়া কিছু বলেনি, শুধু আব্বু বলেছে।”
“যাও গিয়ে ফ্রেশ হও।”
ফাইয়াজ সারাহর মুখের দিকে তাকিয়ে চলে গেল রুম থেকে। নিতু সুলতানা আরো আগেই ফাইয়াজকে ডাকতে যেতে নিয়েছিলেন কিন্তু ফারিশ আর ফুয়াদ হাসান যেতে দেননি তাকে। নিতু সুলতানা উপরে আসার আগে দুজনকে বলে এসেছিলেন ফাইয়াজকে যেন কিছু না বলে। তিনি যখন ছোটো ছিলেন স্কুলে পড়তেন তখন একবার তার কাজিন তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল ব্যাট দিয়ে বাড়ি মে’রে। ইচ্ছে করে না, ভুল করেই মে’রেছিল।
*****
চারদিন হয়ে গেছে আবরার সারাহকে দেখে না। তাকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ অস্থির হয়ে আছে সে। সারাহর ভার্সিটিতে না আসার কারণ কী?
সারাহকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে আবরার। তার আশপাশে বসে আছে বা দাঁড়িয়ে আছে তার বন্ধুরা। বন্ধুরা নিজেদের মতো কথা বলছে, সেদিকে ধ্যান নেই আবরারের। তার তৃষ্ণার্ত চোখজোড়া তার চেরি ব্লসমকে এক নজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে রয়েছে।
গেইটের কাছাকাছি এসে ফারিশের বাইক দাঁড়াল। বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল সারাহ। আশপাশে না তাকিয়ে সোজা ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটা। ফারিশ নিজেও আশপাশে না তাকিয়ে বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল দ্রুত। আবরার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছু বলতে বা করতে পারল না। সারাহকে রেখে যাওয়া ছেলেটাকে নিয়ে তার বেশ মাথা ব্যথা হচ্ছে এখন। কে ছেলেটা? তাকে জানতেই হবে।
ক্লাস শেষে লাইব্রেরিতে গিয়েছিল সারাহ। সেখান থেকে বের হলো প্রায় চল্লিশ মিনিট পর। গেইটের দিকে পা বাড়াতেই তার কানে এলো গিটারের সুর। সে আশপাশে নজর বুলিয়ে দেখল সিনিয়রদের মধ্য থেকে সেই ছেলেটা গিটার বাজাচ্ছে যাকে সে ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল। গিটারের সুর তার কাছে বেশ ভালো লাগছে, তাই সে দাঁড়িয়ে গেল সেখানেই। আবরার তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে গান গাইতে শুরু করল।
“পড়লে মনে তোমাকে, আর কে আমাকে রাখে…. পাগলামি বলে থাকে লোকজনে…..
তাও তো তোমাকে খুঁজি….
অল্প আলোতে রোজই…..
ইচ্ছে তোমার বুঝি কে জানে….
তাই জানি, না জানি হয়ে অভিমানী.
হেরেছি জিতেছি কে কতখানি,
এভাবে স্বভাবে করেছি তোমায় আমার….”
পুরোটা গান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেল সারাহ। কী মারাত্মক কন্ঠ লোকটার! আবরার যে তার দিকেই তাকিয়ে আছে সেদিকেও খেয়াল নেই তার। আবরারের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিতে তাকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ছে একটু পর পর। আবরার দ্বিতীয় গান ধরল, কোনোদিকে তাকাল না, শুধু তাকিয়ে রইল সারাহর দিকে।
Gulabi aankhen jo teri dekhi
Sharabi ye dil ho gaya….
Sambhalo mujhko o mere yaaro
Sambhalna mushqil ho gaya….
Gulabi aankhen jo teri dekhi
Sharabi ye dil ho gaya….
সারাহ এখনো আসছে না দেখে ফারিশ নিজেই ভার্সিটির ভেতরে চলে এসেছে। সে হেলমেট পরে আছে এখনো। এক হাতে বাইকের চাবি, অন্য হাতে ফোন। সারাহকে দেখে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে তাকাল আবরারদের দিকে। আবরার কোলের উপর গিটার নিয়ে গিটার বাজাচ্ছে আর গান গাইছে। আবরারের দৃষ্টি সারাহর দিকে, আর সারাহ-ও সেদিকেই তাকিয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে।
ফারিশ ফোনটা পকেটে ভরে সারাহর এক হাত মুঠো করে ধরে থমথমে গলায় বলল,
“বাইরে না গিয়ে ওদিকে কী দেখছো?”
ফারিশের কথা শুনে হকচকিয়ে গেল সারাহ। বেচারি ভয় পেয়ে গেছে। ফারিশ ঘুরে গেইটের দিকে হাঁটা শুরু করেছে সারাহকে নিয়ে। সারাহ মিনমিন করে বলল,
“সরি, ভাইয়া। আমি শুধু গান শুনছিলাম।”
ফারিশ কিছু বলল না। পেছন থেকে চোয়াল শক্ত করে দুজনের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে আবরার।
চলবে………..
Share On:
TAGS: মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মন বোঝে না পর্ব ৭
-
মন বোঝে না পর্ব ৯
-
মন বোঝে না পর্ব ৬
-
মন বোঝে না পর্ব ১০
-
মন বোঝে না পর্ব ১১
-
মন বোঝে না পর্ব ৮
-
মন বোঝে না পর্ব ২
-
মন বোঝে না গল্পের লিংক
-
মন বোঝে না পর্ব ৪
-
মন বোঝে না পর্ব ৫