Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১১


বাঁধন রূপের অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ১১

রূপা কলেজে যাওয়ার জন্য একদম ফিটফাট হয়ে নিচে নামল। তার চিরচেনা সেই দুই বেণি আজও দুই কাঁধের ওপর দুলছে, যা তাকে এক স্নিগ্ধ মায়া দিচ্ছে। নিচে আসতেই সে দেখল তার বাবা, কাকা আর দাদামশাই গম্ভীর মুখে অফিসের জরুরি সব ফাইলপত্র নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। রূপা হালকা হাসি মুখে সবার সাথে কুশল বিনিময় করল এবং শান্তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্তা এসে হাজির হলো এবং দুজনে মিলে চটজলদি সকালের নাস্তা সেরে কলেজের পথে বেরিয়ে পড়ল।

[সকাল ১০:০০ | আনন্দ মোহন কলেজ]

ক্লাসরুমের এক কোণায় বসে রূপা, কেয়া, বৃষ্টি আর নাদিয়া জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু রূপার মনটা যেন ঠিক এখানে নেই। কাল রাতে ওই রহস্যময় এক জোড়া চোখের ছবি আঁকার পর থেকে সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছে। সারা রাত এক ফোঁটা ঘুমানো সম্ভব হয়নি চোখ বন্ধ করলেই সেই তী*ক্ষ্ণ চাহনি আর ভ্রুর মাঝখানের ওই ছোট্ট কাটা দাগটা ভেসে উঠছে। রূপার চেহারায় এক ধরণের অস্থিরতা দেখে বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল,

“কিরে, কী হয়েছে তোর? এমন দেখাচ্ছে কেন যেন অনেক বড় কোনো চিন্তায় ডুবে আছিস।”

রূপা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ফ্যাকাসে হাসল।

“আরে না, ওসব কিছু না। এমনিই শরীরটা আজ একটু ম্যাচম্যাচ করছে, ভালো লাগছে না।”

“ওহ, তাই বল।”

ঠিক তখনই ক্লাসে প্রিন্সিপাল স্যার ঢুকলেন। পিনপতন নীরবতা নেমে এল সবার মাঝে। কিন্তু সবার নজর আটকে গেল প্রিন্সিপাল স্যারের ঠিক পেছনে থাকা দীর্ঘদেহী যুবকটির ওপর। পরনে নেভি ব্লু শার্ট আর সাদা প্যান্ট, বাম হাতে দামি ঘড়ি আর চোখে সানগ্লাস। জেল দেওয়া চুলে তাকে একদম নিখুঁত কোনো মডেলের মতো লাগছে। আকাশকে দেখামাত্রই রূপার চোখ কপালে উঠল। আকাশ ভাইয়া তাঁদের কলেজে হঠাৎ। সবচেয়ে অদ্ভুত অবস্থা হলো বৃষ্টির। আকাশকে দেখামাত্রই তার বুকের ভেতর সেই পরিচিত ‘ধকধক’ শুরু হয়ে গেল। কেন জানি এই মানুষটাকে সামনে দেখলেই তার হার্টবিট বাতাসের বেগে বাড়তে থাকে। প্রিন্সিপাল স্যার গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিলেন।

“আমার প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আলাপ করিয়ে দিচ্ছি। ইনি আকাশ। আজ থেকে তোমাদের নতুন ইংলিশ টিচার। আকাশ এখন থেকে তোমাদের নিয়মিত ক্লাস নিবে। একটা কথা মনে রেখো, ক্লাসে অযথা কথা বলা বা শব্দ করা উনি একদম পছন্দ করেন না। আশা করি, আমার এই সতর্কবার্তা যেন দ্বিতীয়বার বলতে না হয়।”

প্রিন্সিপাল স্যার চলে যাওয়ার পর আকাশ ধীর পায়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখতেই তার সেই তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া সবার সামনে স্পষ্ট হলো। সে গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত মার্জিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল।

“Good morning, class. As your Principal sir mentioned, I am Akas Rahman, and I’ll be leading your English sessions from today onward. I believe English isn’t just a subject; it’s a language of expression, and I expect each of you to approach it with discipline.”

সে এক মুহূর্ত থেমে সবার ওপর দিয়ে একবার নজর বুলিয়ে নিল। তারপর বলল।

“I have a zero-tolerance policy for noise. In this classroom, silence is not just appreciated it’s mandatory. I hope we are on the same page. Is that clear to everyone।”

রূপা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। তার মানে এখন থেকে তার ইংলিশ টিচার আর কেউ নয়, স্বয়ং তার আকাশ ভাইয়া। বৃষ্টির অবস্থা আরও শোচনীয়; তার বুকের ভেতরে যেন কেউ অবিরত হাতুড়ি পেটাচ্ছে। যে লোকটার থেকে সে সবসময় ১০০ হাত দূরে থাকতে চাইত, আজ সেই লোকটাই তার ক্লাস টিচার। প্রতিদিন সামনাসামনি ক্লাস করতে হবে ভেবেই তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। প্রবাদ আছে না, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়’—বৃষ্টির জীবনের গল্পটা যেন আজ সেখানেই এসে দাঁড়িয়েছে।

আকাশ অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে একে একে সবার পরিচয় নিতে লাগল। এক সময় সে রূপার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“And you? What’s your name?”

রূপা কিছুটা আমতা আমতা করে বলল।

“আকাশ ভাইয়া, তুমি তো আমার নাম জানোই।”

বাকিটুকু বলার সুযোগ না দিয়েই আকাশ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। অত্যন্ত পেশাদার কণ্ঠে সে উত্তর দিল।

“Excuse me? I am not your ‘Bhaiya’ in this premises. Inside this classroom, I am your teacher and you are my student. Is that clear।”

রূপা মুখটা একটু ভেংচিয়ে বিড়বিড় করে বলল।

“হ মনে থাকবে, তুমি আমার উগান্ডা থেকে আসা নতুন স্যার।”

পুরো ক্লাসের সবাই রূপার এমন উত্তর শুনে হো হো করে হেসে উঠল। আকাশ ডাস্টার দিয়ে রূপার বাম কাঁধে হালকা করে একটা বাড়ি মেরে শাসানোর স্বরে বাংলায় বলল।

“নতুন বলে আজ কিছু বললাম না। এরপর এমন বেয়াদবি করলে এখানেই মেরে চামড়া তুলবো, আর বাসায় গিয়েও চাচ্চুর কাছে বিচার দিবো। মনে থাকে যেন।”

বিচারের কথা শুনেই রূপা মুহূর্তের মধ্যে চুপ হয়ে গেল। বাড়িতে বিচার দেওয়া মানেই মহা বিপদ। সে ঠোঁট উল্টে ব্যথার জায়গায় হাত ডলতে ডলতে নিঃশব্দে নিজের সিটে সেঁধিয়ে গেল। আকাশ এবার ধীর পায়ে বৃষ্টির সামনে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখেই বৃষ্টির বুকটা আবার কেঁপে উঠল। আকাশ নির্লিপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“And what about you? May I have your name, please।”

বৃষ্টি মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোমতে উত্তর দিল।

“জ্বি… জ্বি স্যার, আমার নাম বৃষ্টি।”

আকাশ বৃষ্টির দিকে এক পা এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে বেশ বুঝতে পারছে মেয়েটা তাকে দেখে কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি সবসময় এমন কেঁপে কেঁপে কথা বলো।”

বৃষ্টির অবস্থা তখন শোচনীয়। সে আমতা আমতা করে বলল,

“মা-মানে।”

আকাশ এবার ডেস্কের ওপর দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে এসে বলল,

“মানে এটাই এইভাবে কাঁপছো কেন? শরীর খারাপ নাকি? যদি অসুস্থ বোধ করো তবে সেটা পরিষ্কার করে জানাও।”

বৃষ্টি দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার মাথায় তখন হাজারটা খিস্তি ঘুরছে। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“আরে হালার ঘরের হালা। তোরে দেইখা আমার পুরো শরীর নার্ভাস হয়ে কাঁপছে, আর উনি আসছে ডাক্তারি করতে। আমার শরীর একদম ঠিকই আছে, শুধু তুই সামনে থাকলে আমার হার্টবিট জিলা স্কুল মাঠের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো দৌড়ায়।”

“কী হলো? উত্তর দিচ্ছ না কেন।”

আকাশের হঠাৎ কড়া কণ্ঠস্বরে বৃষ্টি একদম বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠল। সে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,

“না না স্যার। আমি একদম ঠিক আছি। কোনো সমস্যা নেই আমার।”

আকাশ আরও কয়েক সেকেন্ড বৃষ্টির চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখল। তার চাহনি যেন বৃষ্টির মনের ভেতরটা পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

“ঠিক আছে, বসো। ক্লাসে মনোযোগ দাও, মন যেন অন্য কোথাও না থাকে।”

বৃষ্টি ধপ করে নিজের সিটে বসে পড়ল আর টেবিলের নিচে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে পেঁচাতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল, এই লোকের সামনে প্রতিদিন ক্লাস করা মানে নিজের আয়ু দশ বছর কমিয়ে ফেলা।

_________________

বিকেলের ম্লান আলোয় ডিআইজি কার্যালয় তখন এক থমথমে দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে করিডোরে সারি সারি পুলিশ সদস্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে বাঘের মতো পায়চারি করছে এসপি বাঁধন। পরনে হাফ হাতা শর্ট ইউনিফর্ম, যা তার শক্তপোক্ত পেশিবহুল হাত দুটোকে আরও বেশি জাঁদরেল দেখাচ্ছে। তার দুই হাত পিঠের পেছনে শক্ত করে ধরা, চাহনি যেন কোনো খাপখোলা তলোয়ার। সামনেই বিশাল রাজকীয় ওক কাঠের টেবিলের ওপাশে বসে আছেন এই শহরের রক্ষক, ডিআইজি আলতাফ মাহাবুব। তিনি বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বাঁধনের চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন। স্তব্ধতা ভেঙে তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল।

“তার মানে এখনো আসামীর খোঁজ নেই। দেশে দিনে অন্তত একটা হলেও নারী নিখোঁজ হচ্ছে। বাঁধন, এইভাবে চলতে থাকলে দেশটা কতটা ভয়াবহ নরক হবে, তার কি কোনো ধারণা আছে তোমার।”

বাঁধন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল পাহাড় সমান দৃঢ়তা। সে ধীরস্থিরভাবে বলল।

“স্যার, আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছি। অপরাধীরা খুব ধূর্ততার সাথে তাদের রুট পাল্টাচ্ছে, তবে আমরা ওদের একদম লেজের ডগায় পৌঁছে গিয়েছি। আমাকে আর কিছুটা সময় দিন স্যার। ইনশাআল্লাহ, বিজয় আমাদেরই হবে। আমি কথা দিচ্ছি, নিজের সবটুকু দিয়ে এই নোংরা সিন্ডিকেট আমি গুঁড়িয়ে দেব।”

আলতাফ মাহাবুব ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করলেন। বাঁধনের চোখে যে জেদ তিনি দেখছেন, তা তাকে কিছুটা আশ্বস্ত করল। তিনি নিচু স্বরে বললেন।

“আশা করি এই তেজ যেন শুধু কথায় না থাকে, আর হ্যাঁ নেক্সট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে প্রগ্রেস রিপোর্ট চাই।

কলেজ ছুটির পর রূপা আজ আর সোজা বাড়ি ফিরল না। রিকশাওয়ালার কাছে গন্তব্য বদলে দিয়ে সে রওয়ানা দিল ডিআইজি কার্যালয় অভিমুখে। উদেশ্য আলতাফ মাহাবুবের সাথে দেখা করবে। আলতাফ মাহবুব সাহেবের সাথে রূপার এক অদ্ভুত আর মধুর সম্পর্ক, যা সময় হলেই প্রকাশ পাবে। অফিসের মেইন গেটে ঢুকতেই রূপার হার্টবিট বেড়ে গেল। এখানে ডিআইজি কার্যালয়ের বিশেষ দুই সিকিউরিটি ডগ আছে, যাদের রূপা ‘যমদূত’ মনে করে। গতবার তো একটা তাকে প্রায় কামড়েই দিয়েছিল। রূপা সন্তর্পণে পা ফেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, একটা কুকুর গাছের সাথে মোটা রশি দিয়ে বাঁধা। কুকুরটাকে বাঁধা দেখে রূপার সাহস হঠাৎ ১০০ গুণ বেড়ে গেল। সে ভাবল বেটা, আজকে তোকে সাইজ করছি। রূপা কুকুরের একদম নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

“কী রে কাল্লু? খুব তো ঘেউ ঘেউ করতি, এখন কী হলো? রশিতে বাঁধা পড়ে একদম বিড়াল হয়ে গেছিস।”

কুকুরটা রাগে গরগর করতে লাগল। রূপা ভেংচি কেটে বলল।

“বেয়াদব কুকুর। সরকারি অফিসে থাকিস বলে কি নিজেকে বাঘ ভাবিস? তোর মতো ১০টা কুকুরকে আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি। আয় না, দেখি কেমন দৌড়ানি দিতে পারিস।”

কুকুরটা এবার বিকট স্বরে ‘ঘেউ’ করে উঠল। রূপা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বলল।

“চুপ। একদম চুপ। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকে দিয়ে আজকে ডাল-ভাত খাওয়াবো। তোর তো কপালে আজ শনি আছে…”

ঠিক এই চরম অপমানের মুহূর্তে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। কুকুরটা এমন এক হ্যাঁচকা টান দিল যে পচা রশিটা গাছ থেকে খুলে গেল। রূপার চোখের সামনে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে দেখল রশি খোলা, আর কুকুরটা দাঁত বের করে ঠিক তার দিকেই লক্ষ্য স্থির করেছে।

“ওরে মা রে। খেয়ে ফেলল রে।”

এক সেকেন্ড দেরি না করে রূপা তার কাদের ব্যাগ শক্ত করে ধরে অলিম্পিক লেভেলের এক দৌড় শুরু করল। পেছনে কুকুরটা ‘বৌ বৌ’ করে একটার পর একটা লাফ দিচ্ছে। রূপা সোজা অফিসের সিঁড়ি দিয়ে ঝড়ের বেগে উপরে উঠতে লাগল। করিডোরে দাঁড়ানো পুলিশরা দেখল একটা মেয়ে বুলেটের গতিতে দৌড়াচ্ছে আর তার পেছনে একটা পাগলা কুকুর। বাঁধন তখন আলতাফ মাহবুবের রুমের ঠিক সামনে তার টিমের সাথে অত্যন্ত সিরিয়াস কোনো এক ইনভেস্টিগেশন নিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ দেখল পাশ দিয়ে ধোঁয়া ওড়ানোর মতো কিছু একটা উড়ে গেল। রূপা কাউকে দেখার সময় পায়নি, সে সোজা আলতাফ মাহবুবের রুমে ঢুকে পড়ল। আলতাফ সাহেব তখন একটা ফাইলে সই করছিলেন। হঠাৎ দেখলেন রূপা ঝড়ের বেগে ঢুকে তার টেবিলের ওপর দিয়ে একটা উড়াল দিয়ে সরাসরি তার চেয়ারের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল। তার হাফানি আর কান্নাকাটি মিশিয়ে একাকার অবস্থা।

“বাঁচাও আঙ্কেল। ওই রাক্ষসটা আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।”

আলতাফ মাহবুব নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে রূপার হাঁপানো দেখে হোহো করে হেসে দিলেন। তিনি ভালো করেই জানেন এই মেয়ে আর ওই কুকুরের আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। রূপা তখনো ডিআইজি সাহেবের চেয়ারের এক কোণায় সেঁধিয়ে আছে। আলতাফ মাহবুব বললেন,

“আরে রূপা। তুই হঠাৎ এই অসময়ে? আর এইভাবে জান হাতে নিয়ে দৌড়ে আসলি কেন।”

রূপা তখনো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে সেই কুকুরটা জিব বের করে ‘হাঃ হাঃ’ করে হাঁপাচ্ছে আর রূপাকে দেখে মাঝেমধ্যে গরগর করছে। রূপা কাঁপাকাঁপা আঙুল উঁচিয়ে কুকুরটাকে দেখিয়ে নালিশের সুরে বলল,

“দেখো আঙ্কেল। ওই বেয়াদব কাল্লুটা আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাওয়ার জন্য পিছু নিয়েছে। সরকারি অফিসের কুকুর বলে কি যা তা করবে।”

আলতাফ মাহবুব দরজার দিকে তাকিয়ে কুকুরটার অবস্থা দেখে আবারও হাসলেন। তিনি রূপার দিকে তাকিয়ে একটু রহস্য করে বললেন, “সত্যি করে বল তো মা, তুই কি আবারও ওই কুকুরটার সাথে কোনো দুষ্টামি করেছিস।”

রূপা এবার একদম ভিজে বেড়ালের মতো মাথা চুলকাতে চুলকাতে অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। তার এই অসহায় ভঙ্গি দেখে আলতাফ মাহবুব আর কথা বাড়ালেন না তিনি পিয়নকে ডেকে কুকুরটাকে সরিয়ে নিয়ে আবারও শক্ত করে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন।

ঘরের বাইরে তখন বাঁধন আর অখিল দাঁড়িয়ে ছিল। অখিল কনুই দিয়ে বাঁধনকে একটা গুঁতো মেরে ফিসফিস করে বলল,

“কিরে বাঁধন, খেয়াল করলি। মনে হলো একটা মেয়ে ঝড়ের বেগে দৌড়ে স্যারের কেবিনে ঢুকল। ব্যাপারটা কী।”

বাঁধন কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে অখিলকে বলল, “তুই এখানে দাঁড়া, আমি দেখে আসছি।”

বাঁধন ধীর পায়ে আলতাফ মাহবুবের রুমে প্রবেশ করতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে দেখল, একটু আগে যে ডিআইজি সাহেব কঠিন মুখে তাকে আসামীর খোঁজ না পাওয়ায় ঝাড়ি দিচ্ছিলেন, তিনি এখন রূপার সাথে খোশগল্পে মেতে আছেন। রূপা আলতাফ মাহবুবের পাশের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে আছে আর তাঁর কোনো একটা কথায় খিলখিল করে হাসছে।

রূপার সেই ঘ্যাঁচ দাঁত বের করা হাসি আর চোখের কোণের চপলতা দেখে বাঁধনের বুকের ভেতর আবারও সেই চেনা ঝড় শুরু হয়ে গেল। এই মেয়েটা কেন সবসময় তার আশেপাশে এসে তার সব গাম্ভীর্য ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। রূপা তখনো বাঁধনকে খেয়াল করেনি। বাঁধন নিজেকে সামলে নিয়ে লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিল। সে ভাবল, এখনই এই পাগলীটার সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। সে উল্টো ঘুরে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে নিলেই পেছন থেকে আলতাফ মাহবুবের ভরাট গলা শোনা গেল।

“আরে বাঁধন। এসে আবার চলে যাচ্ছো কেন? ভেতরে এসো।”

‘বাঁধন’ নামটা কানে যেতেই রূপার হাসিতে ব্রেক পড়ল। সে চমকে পেছনে তাকাল। ইউনিফর্মে থাকা এক দীর্ঘদেহী যুবককে পেছন থেকে দেখে রূপার মনে কৌতূহল জাগল। বাঁধন খুব ধীরে ধীরে সামনে ঘুরে দাঁড়াল। সে আলতাফ মাহবুবের সামনে এসে সটান স্যালুট দিল এবং হাত দুটো পিঠের পেছনে নিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল।

“জ্বি স্যার।”

বাঁধনকে পুরোপুরি সামনাসামনি দেখে রূপা একদম স্থবির হয়ে গেল। তার চোখের পলক যেন পড়ছেই না এই তো সেই চোখ। এই তীক্ষ্ণ চাহনিটাই তাকে তাড়া করে বেরাচ্ছে, আর যে চোখ দুটো সে নিজের অজান্তেই ডায়েরির পাতায় এঁকে ফেলেছিল। বাঁধন আজ যেন কোনো গ্রিক দেবতাকে হার মানাতে এসেছে। তার তীক্ষ্ণ নাক, পাতলা আর চিকন এক জোড়া ঠোঁট আর চোয়ালের শক্ত হাড়ের গঠন তাকে এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য দিচ্ছে। রূপার বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় শুরু করল। বাঁধনের গায়ে আজ নেভি ব্লু রঙের শর্ট হাতার ইউনিফর্ম, যার ফিটিং এতটাই নিখুঁত যে তার সুঠাম কাঁধ আর পেশিবহুল হাত দুটোর প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ইউনিফর্মের হাফ হাতা থেকে বেরিয়ে আসা তার ফর্সা আর বলিষ্ঠ হাতের কবজিতে শোভা পাচ্ছে কালো ফিতার এক দামি ঘড়ি। তার কোমরের চামড়ার চওড়া বেল্টের ডান পাশে খুব নিপুণভাবে রাখা আছে সরকারি সিলভার রঙের রিভলবারটি। রিভলবারটি যেন তার ব্যক্তিত্বের কঠোরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তার শার্টের বাঁ পাশের পকেটে রাখা আছে একটি স্টাইলিশ স্মার্টফোন, যার অর্ধাংশ বাইরে থেকে উঁকি দিচ্ছে। বুকের ডান পাশে তার নামের নেমপ্লেটটা রোদে চিকচিক করছে। ‘এসপি বাঁধন’। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা আর ক্লান্তিতে বাঁধনের চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে কপালে এসে লেগে আছে, যা তার ব্যক্তিত্বে এক ধরণের বন্য আবেদন যোগ করেছে। রূপা আজ খুব কাছ থেকে দেখল বাঁধনের বাম ভ্রুর সেই স্লিট করে কাটা দাগটা। এর আগে দুবার সে হেলমেটের নিচে দাগটা ঝাপসা দেখেছিল, কিন্তু আজ দেখল দাগটা বেশ লম্বা এবং গায়ের ফর্সা চামড়া ভেদ করে একবারে সাদা কাগজের মতো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। রূপাকে আবারও এমন হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাঁধন বিরক্তি আর অস্বস্তি মেশানো এক অনুভূতিতে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। এই মেয়েটা কেন বারবার তাকে দেখলেই এভাবে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকে, তা সে ভেবে পায় না। তাদের এই নীরবতার মাঝেই আলতাফ মাহবুব বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“বাঁধন, ও হচ্ছে রূপা, ধরতে পারো আমার মেয়ে। আর রূপা, ও হচ্ছে বাঁধন, পেশায় এসপি, নতুন জয়েন করেছে।”

‘বাঁধন’ নামটা শুনেই রূপার মনের ভেতর এক বিশাল খটকা লাগল। তার সৎ ভাইয়ের নামও তো বাঁধন। তবে কি এই রুক্ষ মেজাজের এসপি সাহেবই তার সেই ভাই। পরক্ষণেই সে নিজেকে নিজে ধমক দিল ছিঃ ছিঃ, কী সব আবোল-তাবোল ভাবছে। নাম তো একই হতেই পারে, আর নিজের ভাই হলে কি বাঁধন তাকে চিনতে পারতো না। রূপা কোনোমতে নিজের দীর্ঘশ্বাস চেপে বাঁধনের দিকে তাকাল।

“আসসালামু আলাইকুম স্যার, ভালো আছেন।”

বাঁধন শান্ত গলায় উত্তর দিল,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো।”

রূপা যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে বলল,

“জ্বি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ।”

এরপর সে আলতাফ মাহবুবের দিকে ফিরে বলল।

“তাহলে আঙ্কেল আমি এখন যাই, আবার একদিন আসবো। এখন সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।”

আলতাফ মাহবুব তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বললেন,

“না, একা একদম নয়। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে আর দেশের পরিস্থিতিও ভালো না।”

তিনি বাঁধনের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন,

“বাঁধন, তুমি ওকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আসো।”

রূপা অনেক মানা করা সত্ত্বেও আলতাফ মাহবুব কোনো কথাই শুনলেন না। শেষমেশ বাধ্য হয়ে রূপা বাঁধনের পিছু পিছু ঘর থেকে বের হলো। করিডোরে বের হয়েই বাঁধন তার পুরো টিমের উদ্দেশ্যে গর্জে উঠল।

“আমি ওকে একটু ড্রপ করে আসছি। তোমরা যার যার কাজে যাও। আর মনে রেখো, কাজের বেলায় আমি কোনো ফাঁকি চাই না। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামির কোনো ছোট তথ্য হলেও আমার টেবিলে রিপোর্ট চাই।”

পুরো টিম একযোগে স্যালুট দিয়ে বিদায় নিল। অখিল একটু পিছিয়ে থেকে বাঁধনের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

“কিরে, স্যারের রুমে গিয়ে কি মেয়ে পটিয়ে নিয়ে আসলি। দেখতে তো মাশাআল্লাহ। বানিয়ে ফেললি নাকি আমার ভাবি।”

বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল।

“বেয়াদব।”

বলেই বাঁধন তার বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। রূপা তার বিশাল বাইকটা দেখে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“বাইক দিয়ে যাবো স্যার।”

বাঁধন বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল,

“না, আমার মাথা দিয়ে যাবে। উঠো।”

রানিং..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply