#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৩)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
তপ্ত দুপুরে আলো-আঁধারির ছায়ায় মেতেছে নিসর্গ। আগুন গরম উত্তাপ। সূর্যের তীব্র কিরণ সোজা মাথায় এসে লাগছে। কোলাহলপূর্ণ রাস্তাতে একের পর এক গাড়ি ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটছে আপন গতিতে। ফুটপাত ধরে হাঁটছে নৌমি। রোদের ঝলকে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না।ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। তার পাশেই শুভ্র। শুভ্র হাঁটতে হাঁটতে বারবার নৌমির দিকে দেখছে। কিন্তু নৌমির সেদিকে কোনো মনোযোগই নেই। শুভ্র হঠাৎই প্রশ্ন করল,”কি খাবে?”
নৌমি ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, ” এই ভরদুপুরে কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। চলো বাসায় চলে যায়। সন্ধ্যায় তামজিদ ভাইয়া, আন্নি, রাদ সবাইকে নিয়ে বের হবো। ঠিক আছে?”
“আরে না! সন্ধ্যার কিভাবে বের হবো। তাও আবার তোমাদের নিয়ে! আব্বু শুনলে ভীষণ রাগ করবে। “
“কেন? এখানে রাগ করার মতো কি হলো! তুমি, তামজিদ ভাইয়া, রাদ, রাফি এত মানুষ থাকতে আমি, আন্নি আর সুমির কি এমন হবে? তোমরা আমাদের দেখে রাখতে পারবে না?”
“না না। শুধু শুধু রিস্ক নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ঘুরলে দিনের বেলা ঘুরব। “
নৌমি সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ” এত ভীতু তুমি? আগে জানতাম না তো! এই তুমিই আবার মাঝরাতে আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে বলেছো! তোমার থেকে তামজিদ ভাইয়া শতগুণে ভালো। একবারের বেশি দুইবার জোর করলে বড়োজোর একটা ধমক দেয়। কিন্তু নিয়ে তো যায়!”
“দেখো তোমাকে নিয়ে একা টুকটাক বের হওয়া ঠিক আছে। কিন্তু বাড়ির সব মানুষকে নিয়ে সন্ধ্যার পর বের হওয়াটা বাড়াবাড়ি।”
“কোনো ব্যাপার না! আমাদের এলাকা খুবই ভালো। সন্ধ্যার পর কেন, মাঝরাতে আমি একা বের হলেও কিছুই বলবে না!”
“কেন বলবে না?”
নৌমি দুষ্টুমির স্বরে বলল, ” কারণ ওঁরা আমাকে দেখলেই সালাম দেয়। আমাদের এলাকার মানুষ আমার সাথে বেয়াদবি করার সাহসই পাবে না কখনো। যা করে সব বাইরের ছেলেপেলে। পড়াশোনার নামে শহরে এসে ভণ্ডামি করে! রাস্তায় মেয়ে দেখলে নিজের গার্লফ্রেন্ড ভেবে বসে।”
শুভ্র মলিন গলায় বলল, “ওঁদের পরে দেখা যাবে। এখন চলো কিছু খেয়ে নেয়!”
“ওকে।”
শুভ্র আর নৌমি একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল। খুব জমকালো না হলেও মোটামুটিভাবে সাজানো ছোটখাটো একটা রেস্টুরেন্ট। দ্বিতীয়তলার প্রায় প্রতিটা টেবিলেই লোকজন বসে আছে। ম্যানেজার এগিয়ে এসে খুব বিনয়ের সহিত বললেন,
” স্যার, ম্যামকে নিয়ে তৃতীয়তলায় চলে যান, প্লিজ।”
শুভ্র নৌমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ” তিনতলায় যাবে নাকি অন্য কোথাও যাব?”
নৌমি নিরেট জবাব, ” খেতে এসেছি খাব। তিনতলা, চারতলা এসব কোনো সমস্যায় না। চলো। “
তিনতলায় ওঠে গ্লাসে ধাক্কা দিয়ে যেইমাত্র ঢুকতে যাবে ওমনি একটা ছেলে ছুটে এলো। ছেলের এলোপাতাড়ি দৌড় দেখে নৌমি, শুভ্র দু’জনেই দুদিকে সরে দাঁড়াল। ছেলেটা কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে। অকস্মাৎ রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে কারো চেঁচানোর শব্দ শুনা গেল,
“আমার ফোন নিয়ে গেছে!”
মোটামুটি বয়সের এক ছেলের আর্তনাদ করতে করতে আসতে লাগল। ততক্ষণে সামনের ছেলে অর্ধেক সিঁড়ি নেমে গিয়েছে। শুভ্র সঙ্গে সঙ্গে বলল, ” আহারে! বেচারার ফোনটা নিয়ে গেল।”
শুভ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে নৌমি নেই। আশেপাশে কোথাও নৌমির অস্তিত্ব নেই। শুভ্র নৌমিকে ডাকতে ডাকতে নামতে লাগলো। কিছুটা নামতেই সিঁড়িতে হৈ-হুল্লোড় শুনতে পেল। শুভ্র দ্রুত দৌড়ে গিয়ে দেখল, নৌমি দুইহাতে ছেলেটার কলার চেপে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে ২-৩ টা ছেলে দাঁড়িয়ে বার বার জিজ্ঞেস করছে,
” কি হয়েছে আপু?”
নৌমি সেসব কথায় উত্তর না দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল, ” ফোন বের করো এখনি।”
ছেলেটা নিভু নিভু কন্ঠে বলল, ” আমার কাছে কোনো ফোন নেই।”
নৌমির কণ্ঠস্বর চারগুণ ভারী হলো, ” ফোন বের করবে কি না বলো!”
ছেলেটা অকস্মাৎ মাথা নিচু করে ফেলেছে। আশেপাশের মানুষজন ঠেলে শুভ্র ছুটে এসে নৌমিকে ডাকল,
” এই নৌমি, কি করছো তুমি? চলো এখান থেকে।”
নৌমি অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ” তুমি কি ফোন বের করবে নাকি পুলিশ ডাকব? দেখে মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতে জানো না। অথচ চুরি করে বেড়াচ্ছ! কলেজে পড়ে এসব শিখছো তুমি?”
শুভ্র আশপাশ অবেক্ষণ করে রাগী স্বরে বলল, ” নৌমি চলো এখান থেকে। আজেবাজে ঝামেলায় কেন জরাচ্ছ নিজেকে।”
মোবাইলের মালিক ঝটপট এসে ছেলেটাকে ধরল। চারপাশে লোকজন বাড়তে লাগল। অবশেষে বাধ্য হয়ে ছেলেটা পকেট থেকে ফোন বের করে নৌমির হাতে দিল। নৌমি ফোনের মালিককে ফোন দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল, ” বাকিটা আপনারা বুঝে নেন। “
নৌমি সবাইকে পাশ কাটিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে তিনতলায় গিয়ে একটা ফাঁকা টেবিলে বসল। নৌমির পেছন পেছন শুভ্রও ছুটে এসেছে। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
” তোমার কি এমন আচরণ করা ঠিক হয়েছে?”
নৌমি বক্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ” কেউ যদি তোমার চোখের সামনে থেকে তোমার ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় তুমি কি তখনও এভাবে কথা বলতে?”
“ছেলেটার হাতে অস্ত্র থাকলে কি হতো? তোমাকে যদি আঘাত করত?”
“বাহ! অসাধারণ কথা। কলেজ পড়ুয়া এক ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে দিনে দুপুরে চুরি করছে৷ কিছুদিন পর সন্ত্রাসী করবে! কোথায় ছেলেটাকে বুঝাবে তা না করে তুমি আমাকে বুঝাতে এসেছো! বাহ ভাই বাহ!”
“শহরের সব সন্ত্রাস দমন করার দায়িত্ব আশা করি তুমি নাও নি।”
” চোখের সামনে অঘটন ঘটলে প্রতিবাদ করার সাধ্য তো আছে। ছোট থেকে নৈতিকতা শিখে বড়ো হয়েছি। শিক্ষা কাজে লাগাব কখন? নাকি নৈতিকতার চোখ- কান আর হাত-পা বাড়িতে রেখে আসব?”
শুভ্র গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ” চুপচাপ বসো এখানে। ওয়েটার আসলে পছন্দ মতো খাবার অর্ডার দিও। আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
নৌমির মেজাজ গরম। রাগে শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে খারাপ কিছু ঘটলে প্রতিবাদ না করে একদমই থাকতে পারে না! তারজন্য তাজও কম বকা দেয় নি। নৌমি টেবিলের উপর মাথা এলিয়ে শুয়েছে৷ কয়েক মুহুর্তের মধ্যে পুরুষালি গমগমে কণ্ঠস্বর শুনা গেল,
” এইযে মিস, শরবত টা খেয়ে নেন। মারপিট করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন মনে হয়!”
নৌমি চমক তাকাল। টেবিলে কনুই ভর তাজ তাকিয়ে আছে। তাজকে দেখেই নৌমি হতভম্ব হয়ে গেল। থতমত খেতে বলল, ” তুমি এখানে?”
” বাহ রে! আমাকে দেখে খুশি হোসনি বুঝি?”
“না মানে! তুমি হঠাৎ.. কিভাবে?”
তাজ বলল, “আমি দোতলায় ছিলাম। চিৎকার চ্যাঁচামেচির শব্দ শুনে বেড়িয়ে এসে দেখি তুই। কি হয়েছে বুঝার আগেই তুই আর শুভ্র উপরে চলে এলি। নিচে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলাম। এত ভালো একটা কাজ করেছিস তাই ভাবলাম শরবত খাওয়ায়।”
“এখন ভালো কাজ বলছো অথচ দেখা যাবে একটু পরেই বকা দিচ্ছ। বাসায় গিয়ে আম্মুকে বিচারও দিবে।”
“একদমই না। আমি যেগুলোর বিচার দেয় সেগুলো অবশ্যই যৌক্তিক। প্রতিবাদ করা উচিত, অবশ্যই উচিত৷ কিন্তু সেটা অবস্থান বুঝে। নেশাখোরকে যদি নৈতিকতার জ্ঞান দিতে যাস তারা ঘোড়ার ডিমও বুঝবে না! বরং তোর পেছনে লাগবে৷ খারাপ কিছু করার চেষ্টা করবে! এখন কথা না বাড়িয়ে শরবতটা খেয়ে নে।”
নৌমি শরবত খেতে খেতে আবারও প্রশ্ন করল, ” তুমি এখানে এসেছো কেন?”
তাজ সহসা নৌমির বিপরীতে বসল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ” তুই কেন শুভ্রর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে এসেছিস, আমি কি একবারও জিজ্ঞেস করেছি?”
” আমি আসতে চাই নি। শুভ্র ভাইয়া কলেজ থেকে নিয়ে এসেছে আমাকে। আমি বলেছিলাম সন্ধ্যার পর তোমাদের সবাইকে নিয়ে আসব। কিন্তু ভাইয়া জোর করল তাই এসেছি।”
” সমস্যা নেই। আমি নিলুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।”
নৌমি হকচকিয়ে বলল, ” নিলু ভাবি আসবে?”
“বলেছিল আসবে। এখনও আসে নি। রাস্তায় আছে বোধহয়! শুভ্র কোথায়?”
“ওয়াশরুমে গেল।”
এরমধ্যে শুভ্র বেড়িয়ে এসেছে। তাজকে দেখে মৃদু হেসে বলল, ” কিরে ভাই, তুই এখানে?”
তাজ মেকি স্বরে বলল, ” তোদের দেখে শরীর চুলকাচ্ছিল তাই জ্বালাতে চলে এসেছি।”
নৌমি এক গাল হেসে বলল, ” ডাহামিথ্যে কথা!”
“মিথ্যে কথা কেন?”
” নিলু ভাবি আসতেছে না। একা একা ওয়েট করতে কষ্ট হচ্ছিল এজন্য এসেছে।”
শুভ্র তাজের পাশে বসে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, ” এসেছিস যখন কি আর করা যাবে। চল একসঙ্গে কিছু খায়!”
নৌমি বলল, ” ভাইয়ার সময় নেই৷ ভাবি আসবে।”
“তোকে বলেছি আমার সময় নেই?” তাজ গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল।
শুভ্র মৃদুস্বরে বলল, “সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলি। কি আর বলব!”
“টিউশনে ছিলাম।”
শুভ্র প্রশ্ন করল, ” এখানে বসবি নাকি অন্য কোথাও?”
তাজ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, ” এখানে বসলে সমস্যা কি? নিলু আসলে না হয় আমাদের সঙ্গেই বসবে।”
“ছিঃ।” নৌমির মুখের তিক্ত ভাবভঙ্গি দেখে তাজ আর শুভ্র দু’জনেই আহাম্মকের মতো চেয়ে রইল। তাজ প্রশ্ন করল, ” এমন ভাব করে আছিস কেন?”
নৌমি মুখ ভেংচি দিয়ে অদূরে তাকিয়ে বলল, ” সরি, আমি কারো প্রাইভেট কথোপকথনের সাক্ষী হতে চাই না।”
শুভ্রও সঙ্গে তাল দিল, ” নৌমি ঠিকই বলেছে। আমিও চাই না।”
নৌমি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ” তুমি আর তাল দিও না।”
চলবে….
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২১(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫