#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫৬
যাত্রার দিন অবশেষে চলে এলো। আলো এখনো ভালো মত ফোটেনি। নদীর বুক জুড়ে হালকা কুয়াশা দেখা যায়। ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে সাহাবাদের জমিদার পরিবার, প্রহরী আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তাদের সামনে নোঙর করা বিশাল জাহাজ। বাইজিদ অন্য রাজ্য থেকে আনিয়েছে। যদিও পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি করে যাওয়া যেত। কিন্তু সেদিক টায় নাকি রাত বিরেত ডাকাত হামলা হয়। পরিবার নিয়ে ভ্রমণ কালে কোনো শঙ্কা রাখতে চায় না বাইজিদ। জান্নাত তো জাহাজটা দেখেই হাঁ হয়ে গেল। তোতা পাখির মত চিকন কন্ঠে বলল
“ও বাবা, এটা কি সত্যিই পানিতে ভাসে?”
বাইজিদ হেসে বললো।
“হ্যা মা। এটা পানিতে ভাসে। আর আমরা এখন এটাতেই চড়বো।”
জাহাজটা প্রাচীন রাজকীয় বাণিজ্যিক জাহাজের আদলে নির্মিত। মোটা শাল আর সেগুন কাঠের গায়ে সময়ের মাধুর্য দেখা যায়। অবশ্য গাম্ভীর্য এতটুকুও কমেনি। জাহাজের নাকের অংশে খোদাই করা এক ডানা মেলা বাজপাখি। দূর থেকে মনে হয় পাখিটা নদীর বুকে উড়ে চলেছে।
তিনটি বিশাল মাস্তুল আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা পালগুলো গুটিয়ে বাঁধা। হাওয়ায় দুলছে লম্বা দড়িগুলো। পিতলের তৈরি রিং আর বন্ধনীতে আলো পড়ে সোনালি আভা ছড়াচ্ছে।
উপরের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিকরা ব্যস্ত হাতে সব বন্দোবস্ত করছে। যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে নিখুঁত ভাবে। জাহাজের তলদেশ বিশাল প্রশস্ত। সেখানে সহজেই ঘোড়া, মালপত্র এবং কয়েক ডজন মানুষ অবস্থান করতে পারে। বাইজিদ জান্নাতকে কোলে তুলে বলল
“চলুন শাহজাদি, অভিযান শুরু। পছন্দ হলো তো আমার মায়ের?”
জান্নাত খিলখিল করে হেসে উঠলো। সাহারা গম্ভীর মুখে জাহাজটার দিকে তাকিয়ে আছে।
মনে হচ্ছে আগে পরীক্ষা করে দেখবে জাহাজ তার পছন্দের যোগ্য কিনা। শাখা ভয়ে আবিদের কোলে গুটিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরই শিঙ্গার দীর্ঘ শব্দ ভেসে উঠলো। নাবিকেরা একসাথে চিৎকার করলো।
“পাল খোলো!”
ধীরে ধীরে বিশাল সাদা পালগুলো খুলে গেল।
বাতাস এসে সেগুলো ফুলিয়ে তুললো। মোটা দড়িগুলো টানটান হয়ে উঠলো। নোঙর তোলা হলো। ধীরে ধীরে নদীর বুকে এগিয়ে চললো জাহাজ। সাহাবাদের ঘাট ক্রমশ ছোট হতে লাগলো। দূরে মিলিয়ে গেল প্রাসাদের মিনারগুলো। নদীটা বিশাল। এত বিশাল যে মাঝনদীতে এসে দুই তীরই প্রায় অস্পষ্ট হয়ে গেল। চারদিকে শুধু অথৈ পানি আর পানি।
আজ নদী বড্ড অশান্ত। বাতাসের তাড়নায় বড় বড় ঢেউ উঠছে। একেকটা ঢেউ এসে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ছে। ছিটকে উঠে আসছে সাদা ফেনা। বাতাসে কাঁচা পানির গন্ধ নাকে লাগে।
দূরে জেলেদের ছোট ছোট নৌকা ভাসছে। আকাশ জুড়ে উড়ছে অসংখ্য সাদা পাখি। জান্নাত ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বাইরে টা দেখছে। সুনেহেরা মেয়েকে নিয়ে দেখছে মাঝ নদীর সৌন্দর্য। জান্নাত ছোট্ট আঙুল দেখিয়ে বলল
“ওইটা মাছ না, কচ্ছপ?”
সুনেহেরা চোখ সরু করে তাকায়
“তুই কচ্ছপ চিনিস?”
“হ্যা”
“কোথায় দেখলি?”
জান্নাত হেসে বলল
“বাগান বাড়ির ঘাটে। ওই যে সেনাপতি টা আছে না? ও দেখিয়েছে”
মেহেরুন্নেসা দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
জীবনের প্রথম রাজ্যের বাইরে যাচ্ছে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারগুলো একটু একটু করে হালকা হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের পর থেকে স্বামীর সাথে সুন্দর মূহুর্ত কাটানো হয়েই ওঠেনি মেয়েটার। একের পর এক অশান্তি লেগেই থাকতো। অবশেষে একটু সুখের সন্ধান মিলেছে যেন। বাইজিদ এসে পাশে দাঁড়ালো।
“ভালো লাগছে?”
মেহেরুন্নেসা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল
“অনেক।”
জাহাজ চলছে নদীর বুকে গর্জন তুলে। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা এলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে আবার সকাল। দীর্ঘ নদীপথ অতিক্রম করে অবশেষে দ্বিতীয় দিনের দুপুরে দূরে দেখা গেল অসংখ্য ঘাট। উঁচু উঁচু দালান, রঙিন পতাকা। বাণিজ্যিক জাহাজের সারি। গমগমে জনসমাগম। একজন নাবিক জানিয়ে দিয়ে গেল এটা আমিরাবাদ এর সীমানা। সবাই সামনে এগিয়ে এলো। জান্নাত তো উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠলো। সাহারার সুনেহেরার কোলে ঘুমন্ত অবস্থায় আছে। ধীরে ধীরে জাহাজ এগিয়ে গেল বিশাল পাথরের ঘাটের দিকে। আমিরাবাদের ঘাট সবসময় মানুষের কোলাহলে মুখর। বণিকেরা মাল নামাচ্ছে।
ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি সহ ঠেলা গাড়িও দেখা যায়। দূর দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে আসে ব্যাবসার কাজে। সাহাবাদ সহ আরও ৬ টি রাজ্য আমিরাবাদ এর অধীন।
জাহাজের পাটাতন নামানো হলো।বহুদিন পর সাহাবাদের রাজপরিবার নতুন এক অঞ্চলের মাটিতে পা রাখলো। ঘাটে নামার কিছুক্ষণ পরই সম্রাটের দূত এসে হাজির। লোকটার পড়নে সোনালি কারুকাজ করা পোশাক। কোমরে রাজকীয় প্রতীক খচিত তলোয়ার। ভদ্রলোক সম্মানের সাথে মাথা নত করে বললেন,
“আমিরাবাদের সম্রাট আপনাদের স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আপনাদের জন্য একটি বাগানবাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। যতদিন ইচ্ছা অবস্থান করতে পারবেন।”
বাইজিদ হাসিমুখে ধন্যবাদ জানালেন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি সবার শরীরে। তাই আর দেরি না করে ঘোড়ার গাড়িতে রওনা হলো তারা। শহর পেরিয়ে, বাজার পেরিয়ে মানুষের কোলাহল পেরিয়ে ধীরে ধীরে পথটা নির্জন হতে লাগলো। পাকা রাস্তা শেষ হয়ে এলো। শুরু হলো পুরোনো পাথরের পথ।
চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ, শতবর্ষী বটগাছ অজানা নামের অতিকায় বৃক্ষ সহ চেনা অচেনা গাছ গাছালি তে ভরপুর। সূর্যের আলো পর্যন্ত ঠিকমতো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। জান্নাত গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে বলল,
“আমরা কি জঙ্গলে যাচ্ছি?”
সুনেহেরার মন টাও কেমন খুঁতখুত করছে
“মনে তো হচ্ছে তাই।”
আরও প্রায় এক ঘণ্টা পথ চলার পর অবশেষে তারা পৌঁছালো জমিদার এর ব্যবস্থাপণায় থাকা বাড়িতে। বাড়ি বললে কম বলা হয়, একটা বিশাল প্রাসাদসদৃশ্য বাগানবাড়ি। এ যেন অতীতের পুরোনো কোনো যুগ থেকে উঠে এসেছে। সবাই নেমে কিছুক্ষণ হয়ে তাকিয়ে দেখলো বাড়িটা।
বাড়িটার দেয়াল মোটা ধূসর পাথরে তৈরি। কয়েক জায়গা শ্যাওলা জমে সবুজ হয়ে গেছে। উঁচু খিলান, বড় বড় জানালা। লোহার তৈরি পুরোনো বারান্দা। দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটা বহু পুরোনো। বহু মানে সত্যিই বহু পুরোনো। হয়তো কয়েকশো বছরেরও বেশি। বাগানবাড়ির চারপাশ জুড়ে বিশাল এলাকা। কিন্তু যত্নের অভাবে একসময় সব জঙ্গল হয়ে গিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে তাদের আসার আগে তড়িঘড়ি করে পরিষ্কার করা হয়েছে। কাটা ঘাসের গন্ধ এখনো টের পাওয়া যায়। চারিদিকে অগণিত পুরোনো ফোয়ারা, শুকিয়ে যাওয়া বাগান, ভেঙে পড়া পাথরের মূর্তি। জায়গাটার মধ্যে অদ্ভুত এক রহস্যময় সৌন্দর্য। সাহারার ঘুম ভেঙেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। চারপাশ দেখে গম্ভীর গলায় আধো আধো মিঠা সুরে বলল
“বাড়িটা আমার ভালো লেগেছে।”
সুনেহেরা সঙ্গে সঙ্গে বলল
“আমারও”
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বিশাল হলঘর। উঁচু ছাদে ঝোলানো বিশালাকার ঝাড়বাতি। কাঠের তৈরি প্রশস্ত সিঁড়ি। দেয়ালে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পুরোনো চিত্রকর্ম। অনেক কক্ষ, করিডোর।
অনেক গুলো দরজা। ছোটখাটো একটা গোলকধাঁধা। দিনভর যাত্রার ক্লান্তিতে সবাই প্রায় বিধ্বস্ত।
সুনেহেরা নিজের পছন্দ মত একটা কক্ষে চলে গেল। বাইজিদও মেয়েদের নিয়ে বিশ্রাম নিতে গেল। রাতের খাবার খেয়ে সবাই ঠিক করলো আগামীকাল সকাল থেকে আমিরাবাদ ঘুরে দেখা হবে। আজ আর কেউ কোথাও যাবে না। কিন্তু মেহেরুন্নেসার একটু বাড়িটাই ঘুরে দেখতেনমন চাইল। নতুন জায়গায় এলে কৌতূহল চেপে রাখা একটু কঠিন। সবাই বিশ্রামে চলে যাওয়ার পর একটা প্রদীপ হাতে নিয়ে সে একাই বের হলো।
বাগানবাড়িটা ঘুরে দেখবে। আলোর ব্যাবস্থা বলতে বেশ কিছু হারিকেন আর মোমের ব্যাবস্থা করে দিয়েছে সম্রাট।
পুরনো করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেহেরুন্নেসার গা ছমছমে একটা অনুভুতি আসে। পুরোনো কাঠের মেঝে মাঝে মাঝে কড়মড় শব্দ করে পায়ের চাপে। বাতাস ঢুকছে ভাঙা কাঁচের ফাঁক দিয়ে। দেয়ালের কিছু অংশে অদ্ভুত সব নকশা খোদাই করা। বোধহয় পুরোনো রাজাদের প্রতিকৃতি। একটা করিডোর পেরিয়ে সে পৌঁছালো পশ্চিম দিকের অংশে। এখানে মানুষের আসা-যাওয়া অনেক কম হয়েছে মনে হয়।
ধুলোর বালি প্রচন্ড বেশি। কাঠের দরজাগুলোও পুরোনো। মেহেরুন্নেসা একটা জানালার সামনে দাঁড়ালো। বাইরে শুধু অন্ধকার জঙ্গল। গাছের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
দেখেই বোঝা যায় এই বাড়িতে একসময় অনেক মানুষের বসবাস ছিল। হয়তো আমিরাবাদ এর ই রাজপরিবার। নয়তো কোনো অভিজাত বংশ। ভেবে পায় না এত বড় বাগান বাড়ি সম্রাট পরিত্যক্ত কেন রেখেছে। এটা বনিক কেন্দ্র বানাতে পারে। তাছাড়াও যা দেখা গেল ঘাটে যেই পরিমান বণিক এদিকে বানিজ্য করতে আসে। ভাড়া ব্যাবস্থা করলেও মোটা অঙ্কে অর্থ পাবে। মেহেরুন্নেসা ঠোঁট উল্টায়। কে জানে সম্রাটের ভাব গতি। তার চোখ গেল করিডোরের শেষ মাথার দিকে। সেখানে অন্ধকারের মধ্যে একটা বন্ধ দরজা। দরজা টা অন্য সব দরজার চেয়ে আলাদা। মোটা লোহার পাত বসানো। দরজার ওপর অচেনা ভাষায় কিছু খোদাই করা।
আর অদ্ভুত ব্যাপার দরজাটার সামনে দেখে স্পষ্ট বোঝায় যাচ্ছে এটা নতুন বসানো হয়েছে।
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল। এই নির্জন বাগানবাড়িতে কে আসবে? আর কেনই বা আসবে? বন্ধ দরজাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসা। আবার ভাবলো হয়তো মেরামত করাচ্ছে।
বাগানবাড়িটা যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই রহস্যময়। রাত নামার পর সেই রহস্য যেন আরও চেপে বসছে। করিডোরের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে। আাইরে বিদঘুটে অন্ধকার। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। বোধহয় মানুষজন এদিকে আসেই না। এমন নির্জন বাড়িতে তার কেন জানি খুত খুত করতে লাগলো মনের ভিতর। নিজের অজান্তেই প্রদীপটা শক্ত করে ধরলো।
ঠিক তখনই তার কাঁধে একটা হাত পড়লো।
“আহ!”
চমকে প্রায় লাফিয়ে উঠলো সে। হাত থেকে প্রদীপটা পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল। দ্রুত পিছনে ফিরে তাকাতেই বুকের ভেতরের আতঙ্ক মিলিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা লম্বা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।
“আল্লাহ! আপনি?”
বাইজিদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।
“তোমাকে খুঁজে খুঁজে পুরো বাড়ি ঘুরে ফেললাম।”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই বাড়িটা আমার ভালো লাগছে না।”
“কেন?”
“কেমন যেন…”
সে জানালার বাইরে তাকালো। বাইজিদ পিছন থেকে স্ত্রী কে জড়িয়ে ধরে কাঁধে চুমু খেয়ে সেখানে থুঁতনি ঠেকালো
“ভালোই তো। বেশ প্রেম করা যাবে।”
মেহেরুন্নেসা কনুই দিয়ে মৃদু গুঁতা দেয় বাইজিদ এর বুকে
“খালি অসভ্য কথা না?”
বাইজিদ হেসে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেহেরুন্নেসা কে। ঘাড়ে মুখ গুজে বলল
“এক যুগ কাছে আসা হয় না বেগম। এবার এই দূরত্ব ঘোচানো হোক। জমিদার যে আর পারছে না”
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে রইলো। সত্যিই জানৃনাত আর সাহারা কে নিয়ে একটু বেশিই ব্যাস্ত থাকে মেহেরুন্নেসা। বাইজিদ কে সেভাবে সময়ই দেওয়া হয় না। বাইজিদ শান্ত গলায় বলল
“দীর্ঘ ভ্রমণ হয়েছে। আমার বেগম ক্লান্ত। তাই আজ ছাড় দিলাম। কাল মোটেও দেব না। জমিদার কে এত ভালো ভাববেন না”
মেহেরুন্নেসা কিছু বললো না। বাইজিদ তার হাত ধরলো।
“চলো। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। জান্নাত আর সাহারা তোমাকে খুঁজছে।”
মেয়েদের কথা মনে পড়তেই মেহেরুন্নেসা আর আপত্তি করলো না। কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগলো। যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে তাকালো সেই অন্ধকার করিডোরের দিকে।
কেন জানি মনে হলো এই বাড়িতে সম্রাট কিছু লুকিয়ে রেখেছে। খুব বড় কোনো গোপন রহস্য।
মেহেরুন্নেসা কক্ষে ঢুকে যাওয়ার পর বাইজিদ দাঁড়িয়ে রইলো জানালার পাশে। বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে সে। সেনাপতি না হলেও বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার। অনেকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে। আর সেই অভিজ্ঞতা তাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে, অনেক সময় বিপদ চোখে দেখা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায়। আজ ঠিক তেমনই লাগছে। অযথাই মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। বাইজিদের চোখ সরু হয়ে এলো। নিচতলায় এসে দেখলো আবিদ এখনো জেগে আছে।
কয়েকজন প্রহরীর সাথে কথা বলছে। বাইজিদ গম্ভীর গলায় বলল,
“আবিদ।”
“জ্বি শাহজাদা?”
“আজ রাতে সবাই সতর্ক থাকবে।”
আবিদ অবাক হলো।
“কিছু হয়েছে?”
“না।”
বাইজিদ জানালার বাইরে তাকালো।
“তবু আমার ভালো লাগছে না। সাথে আনা সব প্রহরীকে জাগিয়ে রাখো। পাহারা দ্বিগুণ করো। আর আমাদের সাথে আসা সব পুরুষদেরও প্রস্তুত থাকতে বলো।”
আবিদের মুখও গম্ভীর হয়ে গেল। সে বাইজিদকে বহু দিন ধরে চেনে। বিনা কারণে এমন নির্দেশ তিনি দিবেন না।
“চিন্তা নাই শাহজাদা। আমি সব ব্যবস্থা করছি।”
কিছুক্ষণ পর পুরো বাগানবাড়ির চারপাশে পাহারা বসানো হলো। মশাল জ্বালানো হলো। প্রহরীরা টহল দিতে শুরু করলো। রাতটা যেন শেষই হতে চাইছিল না।
মেহেরুন্নেসা জমিদার বাড়ি এসে বহু রহস্য দেখেছে। কিন্তু এই বাগানবাড়ির রাতের মতো অদ্ভুত অনুভূতি খুব কমই হয়েছে তার। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলো। মনে হলো দূরে কোথাও ধুপ করে কিছু একটা পড়লো। সে আধো ঘুমে চোখ খুলে তাকালো। কক্ষের কোণে হারিকেনের আলো জ্বলছে। বাইজিদ জানালার পাশে বসে আছে।
হাতে তলোয়ার, একটুও ঘুমায়নি। মেহেরুন্নেসা কে দেখে বলল
“কি হয়েছে?”
ঘুমজড়ানো গলায় মেহেরুন্নেসা বলল
“কিসের শব্দ হলো”
বাইজিদ মাথা নাড়লো।
“কিছু না। ঘুমাও।”
মেহেরুন্নেসা আবার শুয়ে পড়লো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার।
এবার যেন করিডোর দিয়ে কারও হাঁটার শব্দ। মেহেরুন্নেসা উঠে বসে। কান পেতে শোনে। তারপর আর সেই শব্দ নেই। ভোররাতের দিকে আবার একবার জেগে উঠলো সে। বাইজিদ তখনও একইভাবে বসে। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে বললো,
“আপনি এখনো জেগে?”
বাইজিদ শুধু ছোট্ট করে বললো,
“হুম।”
চন্দ্রপ্রভা আর শাখার কক্ষেও একই অবস্থা। নেওয়াজ বিছানার পাশে বসে ছিল তলোয়ার হাতেই। যদিও প্রভা বহুবার বলেছে,
“আপনি গিয়ে ঘুমান।”
কিন্তু নেওয়াজ যায়নি। শাখা গভীর ঘুমে। চন্দ্রার চোখেও ঘুম নামছে না। কে জানে হয়তো অপরিচিত পরিবেশ তার জন্যে। এই বাড়ির অদ্ভুত পরিবেশ তারও ভালো লাগছে না।
আর সুনেহেরা তো ছাদেও এক চক্কর দিয়ে এসেছে রাতে। এ মেয়ে ভয় টয় পাবে না কোনোদিন। প্রহরীরা পর্যন্ত তাকে দেখে হতভম্ব।
ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসে তার সোনালি চুল উড়ছিল। দেখলে মানুষ ভূত ভেবে ভয় পেয়ে মরে টরেও যেতে পারতো।
অবশেষে দীর্ঘ রাতের সমাপ্তি হলো। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করলো। জঙ্গলের অন্ধকার একটু একটু করে সরে গেল। পাখির ডাক শোনা যেতে লাগলো। সকালের আলোয় বাগানবাড়িটাকে আবার আগের মতই স্বাভাবিক লাগছে। যেন রাতের সব অদ্ভুত ব্যাপার কেবল কল্পনা ছিল। জান্নাত সবচেয়ে আগে ঘুম থেকে উঠলো। দৌড়ে গিয়ে সুনেহেরার কক্ষে ঢুকলো।
“মনি মা! মনি মা”
“কি?”
“আমার খিদে পেয়েছে।”
সুনেহেরা উঠে না বলে বালিশ ছুড়ে মারলো। মাত্র ভোরে ঘুমলো মেয়েটা। ঘুম জড়ানো কন্ঠে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল
“সকাল সকাল আমি খাবার কোথায় পাব মা?”
বাইরে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ শোনা গেল। সুনেহেরা হকচকিয়ে উঠে বসে। এত সকালে কারা এল?
একজন প্রহরী এসে খবর দিল,
“আমিরাবাদের সম্রাটের পক্ষ থেকে উপঢৌকন এসেছে।”
সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো। একটা না দুইটা না।
মোট ছয়টা ঘোড়ার গাড়ি ভর্তি খাবার, ফলমূল, শুকনো ফল, মধু, দুধ, মাখন, রুটি, বিভিন্ন ধরনের মাছ মাংস আরও কত কি।
দূত মাথা নত করে বললো,
“সম্রাট মহোদয় আপনাদের স্বাগত জানিয়ে এই সামান্য উপঢৌকন পাঠিয়েছে।”
জান্নাত একটা বড় লাল আপেল হাতে নিয়ে খেতে লাগল। সাহারা মুখে ফলের ঝুড়ি নিয়ে খেলতে লাগলো। শাখা মায়ের কোলে বসে আঙুর খাচ্ছে।
আবিদের রাত জেগে মাথা ধরে গেছে। এখন ঘুমিয়ে একটু পর উঠে খাবে। জান্নাত লক্ষিটি হয়ে বসে খেলেও সাহারা কে সামলাতে সুনেহেরার কাল ঘাম বেড়িয়ে যাচ্ছে। এটা ওটা ধরছে বারবার। ফেলেও দিচ্ছে ফলমূল। মাখনের পাত্র টা উল্টে দিল সুনেহেরার জামায়। মেহেরুন্নেসার কোলে দিয়ে সে গেল মহলের বাইরের চাপকলে। সেখান থেকে ধুয়ে নেবে জামা। তারপর পাল্টে ফেলবে না হয়। কল টা দেখে অবশ্য অকেজো মনে হচ্ছে। মনে হয় না পানি পড়বে। তবুও চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি। কল এর হাতল ধরে চাপ দিতেই পায়ের তলা কেপে উঠলো সুনেহেরার। সামনের পাকা করা শান টা দুই ভাগে সরে গিয়ে বেরোলো বিশাল সুরঙ্গের মুখ।
ভূতূড়ে বাড়ি ঘুরে এসে অনুভূতি কেমন
পাঠিকারা । কেমন হয়েছে বলিও হুমম। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করিও। রেসপন্স কমিয়ে দিচ্ছো কিন্তু তোমরা
। সবাই রিয়্যাক্ট দিও আর জানিও কেমন হয়েছে
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৮ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৪ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২১ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ