নবরূপা
পর্ব_১৯
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
নীহারিকা বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে ইরফানের মুখোমুখি হলো। ইরফানের পোশাকে বোঝা গেলো লোকটা সেই তখন থেকে একই কাপড়ে রয়েছে, তার মানে ঘরে আর যায়নি। সোফাতে বসে অপেক্ষা করছিল ইরফান। নীহারিকা কে বাড়িতে ঢুকতে দেখে সাথে সাথে সে উঠে দাঁড়ালো। নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফানকে দেখে। আজ এই প্রথমবার ইরফানের দৃষ্টি কোমল মনে হলো না তার কাছে। নীহারিকা কোলে ঘুমিয়ে থাকা ইনায়াকে চেপে ধরে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলো,
—” আপ-আপনি কখন এলেন?”
ইরফানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সে এক পা দু পা করে এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়লো নীহারিকার সামনে। গম্ভীর মুখ করে জিজ্ঞেস করল পাল্টা
—” কোথায় গিয়েছিলে?’
নীহারিকার কপাল ঘেমে উঠছে। লোকটা এমন অদ্ভুত সুরে কথা বলছে কেনো। আগে তো এমন ভাবে কথা বলতো না। অদ্ভুত কন্ঠস্বর! নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” মিরপুরে।”
—” কেনো?” কড়া গলা ইরফানের। জবাবদিহিতা চাইছে সে কথাতেই বোঝা গেলো। নীহারিকা এবারে চোখ সরু করে বলল
—” আপনি এমন করছেন কেনো? বান্ধবীর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ইনায়াকে নিয়ে কি একটু ঘুরতেও পারিনা আমি?”
ইরফান সাথে সাথে জবাব দিলো,
—” না পারো না। কারন তুমি মিথ্যে বলছো’
নীহারিকা আবারো কিছু বলতে চাইলে ইরফান গলার স্বর আরেকটু উঁচু করে জিজ্ঞেস করে,
—” কোথায় গিয়েছিলে আর কেনো?”
নীহারিকার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। এই সুরে ইরফানকে সে কখনো কথা বলতে শোনেনি।ঘরটা অদ্ভুতভাবে নীরব। দূরে দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দও যেন কানে বিঁধছে। নীহারিকা একটু শক্ত করে ইনায়াকে কোলে চেপে ধরল। মেয়েটা গভীর ঘুমে, কিছুই টের পাচ্ছে না।
—” আমি তো বললাম, বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছিলাম!” নীহারিকা এবার ঠান্ডা গলায় বলল। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর হঠাৎ খুব তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
—” মিথ্যে বলার আগে অন্তত একটু প্র্যাকটিস করে নিতে পারতে নীহারিকা! “
নীহারিকা থমকে গেল। প্রথমবার আজ পুরো নামে ডাকলো তাকে ইরফান। সে অবাক হয়েই বলল,
—”মানে?”
ইরফান এক পা এগিয়ে এল। এত কাছে যে তার শ্বাস নীহারিকার মুখে লাগছে।
—” মানে তুমি খুব বাজে মিথ্যে বলো।”
নীহারিকার কপালে ঘাম জমে উঠলো।
—” আপনি আজ এমন কথা বলছেন কেনো?”
ইরফানের চোখে তখন অদ্ভুত এক আগুন।
—” আমি প্রশ্ন করেছি। কোথায় গিয়েছিলে?”
নীহারিকার ভেতরেও রাগ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
—” আপনি কি আমাকে জেরা করছেন?”
—” যদি দরকার পড়ে, করবো।”
নীহারিকার চোখ বড় হয়ে গেল। বলল
—” আপনি কি বুঝতেই পারছেন না আপনি কীভাবে কথা বলছেন আমার সাথে?”
ইরফান হঠাৎ গর্জে উঠলো,
—” তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কী করেছো?”
এবার সত্যিই চমকে উঠল মেয়েটা,
—” আমি কী করেছি?”
ইরফান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
তারপর নিচু কিন্তু বিষাক্ত গলায় বলল,
—” ঘর উল্টোপাল্টা করেছো কেন?”
নীহারিকার বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরলো। সে কিছু বলার আগেই ইরফান আবার বলল,
—” আমার আলমারি কে খুলতে বলেছিল তোমাকে?”
তার কণ্ঠে এবার আর রাগ নেই, একটা ঠান্ডা হুমকি। নীহারিকার ঠোঁট শুকিয়ে গেল। সে নিজেকেই মনে মনে গালি দিলো। সেই সময় তাড়াহুড়োতে সেভাবেই ডায়েরি ফেলে এসেছে সে। কোনো কিছু ঠিক করে আসা হয়নি।
—” আমি…আমি তো—”
ইরফান হঠাৎ হাত তুলে সোফার দিকে ইশারা করলো।
—” মিথ্যে বলার আগে বসে বসে ভালো করে ভেবে নাও।”
তার চোখে এমন দৃষ্টি, যেন সে সবই জানে। নীহারিকা ধীরে বলল,
—” আমি কিছু খুঁজছিলাম।”
—”কী খুঁজছিলে?” ইরফানের গলা কাঁপছে।
—” আপনার ডায়েরি।”
এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস জমে গেল। ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
—” কে দিয়েছে তোমাকে এই সাহস?”
এই প্রথমবার তার গলা এতটা উঁচু হলো যে ইনায়া নড়েচড়ে উঠল। নীহারিকা তাড়াতাড়ি মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর মাথা তুলে তাকালো ইরফানের দিকে।
—” আমি আপনার স্ত্রী।”
—” স্ত্রী বলে কি তোমাকে আমার জীবনে নাক গলানোর লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে?”
কথাটা এত কড়া যে নীহারিকা কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারলো না। তার চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস।
—” আপনি..আপনি এমন কথা বলছেন?”
ইরফান হেসে উঠলো। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই—শুধু তিক্ততা।
—” তুমি কি ভেবেছিলে? দুদিনের মধ্যে আমার সব গোপন দরজা খুলে ফেলবে?”
নীহারিকার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। তবুও বলল,
—”আমি গোপন কিছু খুঁজতে যাইনি। আমি শুধু—”
—”চুপ!”
ইরফানের কণ্ঠ বজ্রের মতো নামলো।
—”তুমি আমার ডায়েরির পাতা ছিঁড়েছো।”
নীহারিকা এবার সত্যিই হতভম্ব।
—” কি??”
—” নাটক করার দরকার নেই!” ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—” আমি দেখেছি। সব ওলটপালট করা হয়েছে।”
নীহারিকার বুকের ভেতরটা মোচড় দিল।
—” আমি কিছু ছিঁড়িনি।”
—”মিথ্যে!”
নীহারিকার চোখে এবার জল চলে এলো কিন্তু সে কাঁদলো না। বরং ধীরে বলল,
—” আপনি আমার সাথে যেই ব্যবহার টা করছেন, সেই ব্যবহার টা আমার করা উচিত ছিল মিস্টার কবির।মিথ্যে বলেছেন আপনি। মিথ্যেবাদী আপনি। ঠকিয়েছেন আমায়। আজ পর্যন্ত আমায় সত্যি টা জানান নি। জানতেও দেন নি। আপনি আমায় জেরা করছেন, খারাপ ব্যবহার করছেন। অথচ, আমার আপনাকে জেরা করা উচিত যে কেনো আপনি নিজের প্রথম স্ত্রীকে খুন করেছেন!”
ইরফান সাথে সাথে চড় মারলো নীহারিকাকে, গর্জে উঠলো,
—” শাটাপ নীহারিকা। কী বলছো তুমি এসব হ্যাঁ? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?”
নীহারিকা গালে হাত রেখে তপ্ত শ্বাস ফেলল। সে এবারে জেদ করে বসলো। বড় বড় শ্বাস ফেলে দ্রুত ইনায়াকে সোফায় শুইয়ে দিয়ে ইরফানের বাহু শক্ত করে ধরলো। এরপর তাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। ইরফান বারবার করে বলতে থাকলো,
—” কোথায় যাচ্ছো? হোয়াট দ্যা হেল নীহারিকা!”
নীহারিকা শুনলো না। বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে আয়েশা বেগম কে কল করে বলল,
—” ইনায়াকে সোফায় শুইয়ে রেখে এসেছি মা। আপনি দয়া করে ওকে একটু ঘরে নিয়ে যাবেন। আমি আর আপনার ছেলে কয়েক ঘন্টার জন্য বাইরে কাজে যাচ্ছি। রাতের মধ্যে ফিরে আসব।”
বলেই কল কেটে ইরফানের গাড়িতেই ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে ইরফানকে বসালো নীহারিকা। ইরফান বিরক্ত হয়ে বলল,
—” তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কী করছো?’
নীহারিকা আঙুল ঠোঁটে রেখে বলল,
—” শাটাপ। আমাকে আমার কাজ করতে দিন।” বলে সে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। আর মেইন রোডে গাড়ি উঠিয়ে মাঝারি স্পিডে গাড়ি চালাতে শুরু করলো। ইরফান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—” কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
নীহারিকা জবাব দিলো না। পাল্টা জিজ্ঞেস করলো,
—” আপনি কেনো তাহিয়া কে মেরেছেন?”
ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে গুরুতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” আই সোয়ার, আমি ওকে মারিনি নীহা। তুমি পাগলের মত কথাবার্তা বোলো না। কে তোমাকে এসব আজগুবি কথাবার্তা বলেছে হ্যাঁ? আমি কেনো আমার স্ত্রীকে মারতে যাব? তাও আবার আমার সন্তানের মা! ওকে মেরে আমার কী লাভ হবে?”
নীহারিকা কিছু বললো না। মাথা নেড়ে শুধু শুনলো। এরপর ফাঁকা রাস্তা দেখে ব্রিজের উপরে সাইড করে গাড়ি থামালো। গাড়ির ডোর লক করে দিয়ে ইরফানের দিক করে বসে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল এক নিঃশ্বাসে,
—” আপনি কি জানেন, আপনার উপর কালো জাদু করা হয়েছে? আপনার গায়ে যে জ্বিন ভর করেছিল তা কি আদৌও জানেন আপনি? আপনি যে স্বাভাবিক না, তা কি বোঝেন?’
ইরফান এ পর্যায়ে থমকে তাকালো নীহারিকার দিকে। ফিসফিস করে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” কীহ? কী বলছো এসব?”
নীহারিকা হাসলো। চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
—” ভেবেই বলছি। আমি আপনাকে যা যা প্রশ্ন করব সবগুলোর ঠিক উত্তর দিন, তারপর আপনাকে ব্যাখ্যা দিচ্ছি আমি।”
ইরফান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নীহারিকার দিকে। নীহারিকা এবারে ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো। সবকিছু মনে মনে সাজিয়ে নিয়ে বলতে থাকলো,
—” কোনো কথা ছাড়া সরাসরি সব প্রশ্নের জবাব দেবেন। আপনি কি প্রতি রাতেই স্বপ্ন দেখেন?”
ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়লো, যার অর্থ হ্যাঁ। নীহারিকা আবারো বলল,
—” নামায পড়ার সময় জায়নামাজের উপরে অনেক উদ্ভট জিনিস দেখতে পান?”
ইরফান আবারো যন্ত্রের মত উপর-নিচে মাথা নেড়ে বলল,
—” তুমি কীভাবে…
নীহারিকা কথা থামিয়ে আবারো বলল,
—” খাওয়ার সময় মাঝে মাঝে রক্ত দেখতে পান!”
—” হ্যাঁ!”
—” ইনায়াকে কোলে নিলে ভীষণ ভারি মনে হয়!”
—” হ্যাঁ।”
—” রাতে ওয়াশরুমে মাঝে মাঝে উদ্ভট প্রাণী দেখতে পান!”
—” হুম।”
—” প্রতিদিন খুব দুর্বল লাগে নিজেকে?”
—” হুম!”
একটু থেমে নীহারিকা এবারে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
—” একটু আগে আপনি যে আমায় চড় মারলেন, মনে আছে?”
ইরফান রীতিমতো যেন আঁতকে উঠলো। তড়িঘড়ি করে বলল,
—” মানে? আমি তোমায় মেরেছি নীহা ? কখন?”
নীহারিকা বাঁকা হেসে ফেলল। যা ভেবেছিল তাই। সে এবারে ইরফানের গলা জড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে এসব কমে যাচ্ছে? উল্টোপাল্টা জিনিসগুলো কম দেখছেন আর আগের থেকে কম অসুস্থ হচ্ছেন! তাইনা?’
চলবে…
- সমস্ত রহস্য আগামী পর্বেই উন্মোচন হতে যাচ্ছে। 🔥
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ২০
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ৩০
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ২০
-
নবরূপা পর্ব ১২
-
নবরূপা পর্ব ২৯
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ২৪