Golpo romantic golpo তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৪


লেখনীতে, Atia Adiba – আতিয়া আদিবা

সুইজারল্যান্ডের লাউটারব্রুনেন উপত্যকায় যখন সামাইরা পা রাখল, তখন তার মনের ভেতরে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি প্রকৃতির বিশালতার কাছে মুহূর্তেই হেরে গেল। কেমন নিভু নিভু হয়ে এলো ক্রমশ।

সকালের সেই তিক্ততা, শেহজাদের রূঢ় ব্যবহারের
বিপরীতে সামাইরার নীরব আর্তনাদ সবই যেন এই উপত্যকার জলপ্রপাতের শব্দের নিচে চাপা পড়ে গেল। সামাইরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এখানে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু চোখের সামনে যখন ৭২টি জলপ্রপাতের সেই ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্যপট একে একে উন্মোচিত হলো, তার চোখের অবাধ্য বিস্ময় আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না!

লাউটারব্রুনেন যেন কোনো অমর কবির কাব্যের শরীরী রূপ। দুই পাশে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড়ের দেয়াল, আর সেই বিশাল পাথুরে বুক চিরে নেমে আসছে ঝর্ণার ধারা। শীতের তীব্রতায় অনেকগুলো জলপ্রপাত মাঝপথে জমে গিয়ে স্ফটিকের স্তম্ভের ন্যায় ঝুলে আছে। স্টাবাক জলপ্রপাতটি প্রায় ৩০০ মিটার উপর থেকে কুয়াশার চাদর ভেদ করে নিচে আছড়ে পড়ছিল। সামাইরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসের ঝাপটায় সেই জলকণাগুলো সামাইরার মুখে ছিটে আসছিল বার বার।

তার মনে হলো সে কোনো এক নাক্ষত্রিক স্নান করছে। চারদিকের সবুজ ঘাসের ওপর বরফের হালকা প্রলেপ। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট কাঠের সুইস বাড়ি আর দূরে দেখা যাওয়া তুষারাবৃত আল্পসের শৃঙ্গ। সব মিলিয়ে কি অপরূপ এই সুইজারল্যান্ড!

শেহজাদ রহমান একটু দূরত্ব বজায় রেখে সামাইরাকে দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে মিটমিটে হাসি। সামাইরার এই শিশুসুলভ বিস্ময়, তার ওই বিস্ফারিত চোখের মণি আর ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া মুখের অভিব্যক্তি শেহজাদের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিচ্ছে।
যে মেয়েটি একটু আগে তাকে খুন করার হুমকি দিচ্ছিল, সে এখন প্রকৃতির রূপের কাছে কী নিদারুণ অসহায়!

সামাইরা যখন একটি বড় ঝর্ণার পাদদেশে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করছিল, শেহজাদ তখন পকেট থেকে তার ফোনটা বের করল।

সে সাধারণত নিজের ছবি তোলা কিংবা অন্য কারো ছবি নিজের কাছে জমিয়ে রাখার মানুষ নয়। কিন্তু আজ কী মনে করে এক অজানা তাড়নায় সে সামাইরার কিছু ক্যান্ডিড ছবি তুলতে লাগল।

লেন্সের ওপারে হু হু বাতাসের তোড়ে সামাইরার অবাধ্য চুলের উড়ন্ত লহরি, তার শীতকালীন ওভারকোটের কলারের ফাঁক দিয়ে দেখা যাওয়া গোলাপি গাল আর বিষণ্ণ চোখগুলো শেহজাদের ফোনে ডিজিটাল স্মৃতি হিসেবে বন্দি হতে লাগল।

শেহজাদ নিজেও জানে না কেন সে এই কাজটা করছে। হয়তো সে চায় না এই অদ্ভুত সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাক। কিংবা হয়তো সে চাইছে সামাইরার এই বিস্ময়টুকু একান্তই নিজের করে নিজের মাঝে গচ্ছিত রাখতে।

ঠিক সেই মুহূর্তে শেহজাদের ফোনে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ ভাইব্রেট করে উঠল। শেহজাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তার টিমের প্রধানের কাছ থেকে আসা টেক্সট,

  • Sir, Target IP traced. Origin confirmed: Dhaka, Badda area. We’ve got some sensitive call logs and the source folder of the Deepfake rendering. Information is heavy. Waiting for your final signal.

মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে শেহজাদের চোখের সেই নরম দৃষ্টি মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখ হিংস্রতায় সরু হয়ে উঠল। বাড্ডা এলাকা? সেখান থেকেই এই নোংরা খেলাটা শুরু হয়েছে তবে!

তবে শেহজাদ চাইল না এই মনোরম পরিবেশে সামাইরা সেই হিংস্রতার আঁচটুকুও পাক। কাজেই সে খুব নিপুণভাবে নিজের অভিব্যক্তি পরিবর্তন করল।

ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সে স্বাভাবিক গলায় ডাকল,

-সামাইরা, চলো। আবহাওয়া খারাপের দিকে যাচ্ছে।আমাদের শ্যলেতে ফিরতে হবে।

সামাইরা একবার ফিরে তাকাল। তার চোখে তখনো ঝর্ণার সেই মুগ্ধতা লেগে আছে। সে কোনো প্রতিবাদ না করে শেহজাদের পিছু নিল।

কিন্তু আল্পসের আবহাওয়া যেন আজ ঘটনার অন্য কোনো মোড় লিখে রেখেছিল। গাড়ি যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে ফিরতে শুরু করল। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রলয়ংকরী তুষারঝড় শুরু হলো। বাতাসের বেগ এতটাই বাড়ল যে গাড়িও তুষারের দেয়াল ভেদ করে এগোতে পারছিল না।
উইন্ডশিল্ডের ওপর তুষারের স্তূপ এত দ্রুত জমছে যে ওয়াইপারগুলো আর্তনাদ করেও পথ দেখাতে পারছে না।

ড্রাইভার কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

-স্যার, সামনের রাস্তা পুরোপুরি হোয়াইট-আউট। এক ইঞ্চি এগোনো মানেই খাদে পড়া।

শেহজাদ জানালার বাইরে দেখার চেষ্টা করল।
কুয়াশা আর বরফের ধুলোর নিচে চেনা পৃথিবীটা যেন হারিয়ে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বাঁক ঘেঁষে আবছা হলদেটে আলোর আভা দেখা গেল। একটি ছোট কাঠের বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই জনশূন্য পাহাড়ের বুকে যেন এক চিলতে প্রাণ। শেহজাদ সামাইরার দিকে না তাকিয়েই বলল,

-আমাদের আজ রাতটা এখানেই থেকে যেতে হবে, সামাইরা।

সামাইরা ভ্রুঁ কুচকে বলল,
-এখানে কোথায়?

শেহজাদ আঙুল দিয়ে ইশারা করে সেই ছোট্ট কাঠের বাড়িটি দেখালো। সামাইরা অবাক হয়ে বলল,

-এ বাড়ি কার? আর বাড়ির মালিক কেনই বা আমাদের থাকতে দিবেন?

শেহজাদ হতাশামিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-গাড়ি থেকে নামো।

সামাইরা কোনো কথা না বলে গাড়ি থেকে নামল।গাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্রই কনকনে শীতল বাতাসের ঝাপটা সামাইরাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। শেহজাদ নিজের লম্বা কোটের আড়ালে সামাইরাকে আগলে ধরে সেই কাঠের বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজার ওপরের কাচঘেরা লন্ঠনটি টিমটিম করে জ্বলছে। দরজায় সজোরে করাঘাত করতেই ভেতর থেকে ভারী পদশব্দ শোনা গেল। দরজা খুললেন একজন বৃদ্ধ, তার নাম হ্যান্স। পরনে স্থুল উলের জ্যাকেট আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হ্যান্সের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন তার স্ত্রী এলিসা। শেহজাদ কিছু বলার আগেই হ্যান্স বলে উঠলেন,

-জিসাস! এই ঝড়ের মধ্যে তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন?

হ্যান্স কিছুটা অবাক হয়েই ভেতরে আসার জায়গা করে দিলেন।

-তাড়াতাড়ি ভেতরে এসো, নয়তো হাইপোথার্মিয়া হতে দেরি হবে না।

ভেতরে পা রাখতেই সামাইরা এক নরম উষ্ণতার ছোঁয়া পেল। ঘরটি বেশ ছিমছাম। পাইন কাঠের সুবাসে আমোদিত। আভিজাত্যের সেই চোখ ধাধানো চাকচিক্য এখানে নেই। বরং আছে এক ধরণের ঘরোয়া পবিত্রতা। এলিসা এগিয়ে এসে সামাইরার ভেজা ওভারকোটটা খুলে নিতে নিতে সুইস-জার্মান এ বললেন,

-আহা রে বাছা! একদম জমে গেছিস। হ্যান্স, ফায়ারপ্লেসে আরও কিছু কাঠ দাও তো। আমি এদের জন্য হট চকোলেট নিয়ে আসছি!

শেহজাদ হ্যান্সের দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সাথে বলল,

-ধন্যবাদ আপনাকে। আমাদের গাড়িটা তুষারঝড়ে রাস্তায় আটকে গেছে। আজকের রাতটা যদি এখানে থাকতে দিতেন!

হ্যান্স হাসলেন। বললেন,

-অবশ্যই! এই পাহাড়ে কেউ বিপদে পড়লে আমরা তাকে ফিরিয়ে দেই না। তবে আমাদের ঘরটা বড্ড ছোট, একটু মানিয়ে নিতে হবে। তোমাদের জন্য ওপরের অ্যাটিক রুমটা গুছিয়ে দিচ্ছি।

সামাইরা লণ্ঠনের মৃদু শিখার দিকে তাকিয়ে ছিল। এলিসা এক মগ ধোঁয়া ওঠা হট চকোলেট সামাইরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সুইস-জার্মানে বললেন,

-খা তো মা, শরীরটা গরম হবে। তোরা কি হানিমুনে এসেছিস?

সামাইরা বিস্মিত চোখে এলিসার দিকে তাকিয়ে রইল। জার্মান ভাষা সে বোঝে না। শেহজাদ পাশ থেকে উত্তর দিল,

-জি, আমরা ঘুরতে এসেছি। তবে প্রকৃতির এমন রূপ দেখব তা ভাবতে পারিনি।

হ্যান্স ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে শেহজাদের দিকে এক টুকরো শুকনো কাঠ বাড়িয়ে দিয়ে গল্প শুরু করলেন।

-সুইজারল্যান্ডের এই পাহাড়গুলো এমন অনেক রহস্যে ঘেরা, বন্ধু। তোমরা এসেছো কই থেকে?

শেহজাদ ফায়ারপ্লেসে কাঠটি ছুঁড়ে ফেলে উত্তর দিল,
-বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার নাম শেহজাদ রহমান আর ও আমার স্ত্রী সামাইরা রহমান।

অন্য কথাগুলো বুঝতে না পারলেও নিজের নাম সামাইরা রহমান শোনার সাথে সাথে সে প্রতিবাদ করে উঠল।

-আমার নাম সামাইরা বিনতে হক।

শেহজাদ সাথে সাথে চোখ পাকিয়ে সামাইরার দিকে তাকাল। সামাইরা অতি সন্তপর্ণে ভেংচি কেটে চোখ সরিয়ে নিল। তাদের দুজনের এই খুনসুটি বৃদ্ধ দম্পতির দৃষ্টি এড়ালো না। তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

হ্যান্স বলল,

-আমার পরিচয় তো দেওয়া হল না। আমি হ্যান্স এবং ও আমার স্ত্রী এলিসা। আমাদের পয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে কত লক্ষ বার যে ঝগড়া হয়েছে তা অগুনিত। কিন্তু কখনো আমরা বিছানা আলাদা করি নি। রাতে স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে তবেই ঘুমিয়েছি। তুমিও এ কাজটি করো, বন্ধু। দেখবে এর চেয়ে শান্তির কোনো অনুভূতি হয় না।

শেহজাদ হেসে মাথা নাড়াল।

রাতের ডিনারে এলিসা তাদের জন্য ঐতিহ্যবাহী ‘বার্লি স্যুপ’ আর পাহাড়ি পনির দিয়ে তৈরি ‘রুইশটি’ পরিবেশন করলেন। কাঠের ছোট টেবিলে বসে লণ্ঠনের আলোয় খাওয়ার এই অভিজ্ঞতা সামাইরার নিকট বেশ রোমাঞ্চকর লাগল।

শেহজাদ খেতে খেতে হ্যান্সের সাথে কথা বলছিল পাহাড়ি মানুষের জীবন নিয়ে। সামাইরা অবাক হয়ে দেখছিল, এই দাপুটে মানুষটা কীভাবে অতি সহজভাবে এদের সাথে মিশে যাচ্ছে!

খাবার শেষে আরোও ক্ষণিককাল গল্প করে শেহজাদ এবং সামাইরা এটিকে চলে গেলো।

কিছু সময় যাবার পর তাদের দরজায় টোকা দিলেন হ্যান্স। তার হাতে দুটো মাটির মগ। সে বলল,

-এই নাও, তোমাদের জন্য তৈরি বিশেষ ‘হট স্পাইসড অ্যাপেল পাঞ্চ’। ডিসেম্বরের রাতের এই কনকনে হিমেল হাওয়া হতে শুধুমাত্র কম্বল তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না, বুঝলে? এটা পান করলে ভেতরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হবে। শরীর গরম থাকবে।

শেহজাদ মগ দুটো নিয়ে নিল। দরজা লাগিয়ে সামাইরার দিকে একটি মগ এগিয়ে দিল। সামাইরা কোনো কথা না বলে মগে ছোট্ট একটি চুমুক দিল। পানীয়টির স্বাদ বেশ কড়া। টক-মিষ্টির আড়ালে এক ধরণের কড়া ঝাঁঝ। স্বাদ তেমন মজা না হলেও দ্বিতীয় চুমুক থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারল না তারা। এরপর তৃতীয় চুমুক। চতুর্থ। কিছুক্ষণের মাঝেই দুজনের মগই খালি হয়ে গেলো।

তারা জানত না, এই পাহাড়ি দম্পতির কাছে এটি অত্যন্ত সাধারণ ঘরোয়া দাওয়াই হলেও এতে মেশানো থাকে স্থানীয় ভেষজ রস এবং সামান্য স্পিরিট। যেকোনো মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে তোলে। পুরো মগ শেষ করার পরই সামাইরার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,

-আমি ঘুমাবো।

শেহজাদ চোখের ইশারায় তাকে বিছানায় ঘুমাতে বলল।

ঘরে একটিমাত্র কাঠের বিছানা। তাও আবার দুজনের জন্য বেশ সংকীর্ণ। ঘরে কোনো হিটিং সিস্টেম নেই। কোণের ছোট্ট জায়গাটিতে ফায়ারপ্লেসের মত আছে।
ঠান্ডার তীব্রতায় দুজনকে একদম গা ঘেঁষেই শুতে হলো।

বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই সামাইরা অনুভব করল তার শরীরের ভেতরটা অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। প্রতিটি শিরায় শিরায় এক ধরণের অদ্ভুত শিহরণ। শেহজাদের অবস্থাও তথৈবচ। নেশাজাতীয় সেই পানীয়ের প্রভাবে তার চিরচেনা গাম্ভীর্য কেমন যেন বিলীন হয়ে গেছে। এক ধরণের অপার্থিব ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

শেহজাদ পাশ ফিরে সামাইরার দিকে তাকাল। বিছানার পাশে রাখা লণ্ঠনের মৃদু শিখা আর বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ মিলে বেশ রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়েছে। শেহজাদ নিজের অজান্তেই সামাইরার গালের খুব কাছে হাত নিয়ে গেল। সামাইরা আজ সজাগ থেকেও অন্য ঘোরের জগতে। সেও এই প্রথমবার শেহজাদকে বাধা দিল না।

সামাইরা…
শেহজাদের গলার স্বর বড্ড বেশি গভীর শোনাল।

-তুমি হয়ত নিজেও জানো না তুমি কত সুন্দর! আমার মা ঠিকই বলেছিল একদম পিওর বাঙালি বিউটি।
এই লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভীষণ মায়াবী লাগছে জানো? মনে হচ্ছে কোনো এক প্রাচীন রূপকথার রাজকুমারী আমার সামনে শুয়ে আছে!

সামাইরা চোখ খুলে শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের ঘৃণাগুলোও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! সে নিজেও নেশার ঘোরের বশবর্তী হয়ে শেহজাদের চোখের গভীরে হারিয়ে গেল। সে দেখল, শেহজাদ ধীরে ধীরে তার মুখটা কাছে নিয়ে আসছে। তাদের উষ্ণ নিঃশ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে আলতোভাবে।

সামাইরা এই প্রথমবার তাকে কোনো বাধা দিল না। পানীয়ের প্রভাবে তার হৃদপিণ্ড এখন ধুকপুক করে বাজছে।

শেহজাদ নিজের ঠোঁট সামাইরার ঠোঁটে আলতো করে চেপে ধরল। সামাইরার গোটা শরীর সামান্য কেঁপে উঠল। সেও এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল। এই হিমশীতল রাতের দংশন হতে বাঁচতে সামাইরা যেন আজ নিজেকে সঁপে দিতে চাইছে স্বামীর উষ্ণ আলিঙ্গনে।

শেহজাদ পরম আবেগে সামাইরাকে নিজের বাহুর নিচে বন্দি করল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া কাঠের দেয়ালের ফাঁক-ফোকর দিয়ে প্রবল বেগে ঢুকে পড়ছে। সেই শীতল বাতাস সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়ছে ছোট্ট ফায়ারপ্লেসে। আগুন দপদপ করে জ্বলে উঠছে। সেই অনিশ্চিত আলো-ছায়া সামাইরা আর শেহজাদের চোখেমুখে এক আদিম সৌন্দর্য এঁকে দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

সামাইরা নিজের নখগুলো পরম আবেগে বিঁধিয়ে দিল শেহজাদের পিঠে। সামাইরার নখের আঁচড়গুলো শেহজাদকে আরও বেশি উন্মাদ বানিয়ে দিল। যন্ত্রণার চেয়েও এক তীব্র সুখের অনুভূতি শেহজাদের প্রতিটি স্নায়ুকে জাগিয়ে তুলল। সে তার স্ত্রীকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে চাইল পুরোপুরি।সামাইরাও একই আদিম আকাঙ্ক্ষায় শেহজাদের আলিঙ্গনে বিলীন হয়ে যেতে থাকল। তাদের শরীরের উত্তাপকে বাইরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর কাবু করতে পারল না।

কতক্ষণ তারা এই আদিম খেলায় মত্ত ছিল, কারোরই খেয়াল ছিল না। সময় যেন এই ক্ষুদ্র বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে থমকে গিয়েছিল। ঝড়ের গর্জন আর কাঠের পুড়তে থাকা পটপট শব্দ, সবই যেন তাদের নিবিড় মিলনের এক একটা নেপথ্য সুর হয়ে উঠেছিল।

অবশেষে ক্লান্তিতে আর নেশার চরম ঘোরে সামাইরা শেহজাদের প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা রেখে এলিয়ে পড়ল। শেহজাদ সামাইরাকে পরম মমতায় নিজের বাহুপাশে আগলে ধরল। তার মাথায় একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

-তুমি শুধু আমার, সামাইরা! তোমার প্রতিটি নিশ্বাসে শুধুমাত্র আমার অধিকার। আর কারোও নয়!

শেহজাদও হারিয়ে গেল এক গভীর ঘুমে।

(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply