#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;২৯
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
–” আমাদের প্রেমের পরোয়ানা জারি,,
হয়ে গেছে অনেক ই আগে!
ও তরী রে তরী।
আয় না একটু কাছে!
ও তরীরে তরী একগুচ্ছ ভালোবাসা তোকে দেওয়ার আছে।”
তরঙ্গের মুখে এহেন গান শুনে; মুখে থাকা পানিটুকু মাথায় উঠে গেলো তরীর। নাক জ্বলতে জ্বলতে, কাঁশি উঠে গেলো তার। সবেই ড্রাইনিং টেবিলের কাছ থেকে পানি পান করে উপরের দিকে যাওয়ার নিমিত্তে পা বাড়িয়ে ছিলো তরী। মুখের পানি টাও গিলতে পারেনি সে। তখনি তরঙ্গ গানটা গেয়ে উঠলো। তরীকে কাঁশতে দেখে দ্রুত পায়ে সোফা ছেড়ে মেয়েটার কাছে এগিয়ে এলো তরঙ্গ। এক হাতে মাথার তালুতে হালকা চাপড় দিয়ে পিঠের মাঝ বরাবর হাত চালালো সে।
তাতে যেনো তরীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলো। কোনো মতে লাফিয়ে তরঙ্গের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় বসে পড়লো তরী। উফফ, নাকটা একেবারে জ্বলে যাচ্ছে তার। নিমেষেই মাথা ব্যথা শুরু করেছে। তরঙ্গ ও তরীর পাশে এসে বসলো। ট্রি-টেবিল থেকে গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে তরীর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো।
–” বরের মুখে, সামান্য কয়েক কলি গান শুনে এমন মরণ – বাঁচন যুদ্ধ কে শুরু করে তরকারি জান?”
মুহূর্তের ব্যবধানে তরীর প্রতিউত্তর করলো।
–” আমি করি! কারণ আপনার মতো অদ্ভুত বর ও আর কারো কপালে জুটেনি!”
–” আমাকে বর মানিস? তবে অধিকার দিস না কেন? ছুঁতে গেলেই লঙ্কা কান্ড বাঁধিয়ে ফেলিস কেন?”
তরঙ্গের দৃষ্টির পলক পড়ার আগেই তরীর মুখটা র*ক্ত শূন্যে হয়ে পড়লো। মন খারাপেরা বিষিয়ে তুললো তার হৃদয়। সে ও তো তরঙ্গ কে ভালোবাসে। তার সান্নিধ্য চায়। ছেলেটার পাগলামি গুলোকে ভালোবেসে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে রাখতে চায় নিজের সাথে। কিন্তু বিধাতার তৈরি করা এই সুন্দর পৃথিবীতে কিছু সুন্দর চামড়ার অপবিত্র হৃদয়ের মানুষ বাস করে। তাদের চামড়ার রঙ নিয়ে করা পার্থক্যের মাঝে; তরীর মতো ময়লা রঙের চামড়া নিয়ে জন্মানো সবার কি আর সব চাওয়া পূরণ হয়? সেই মানুষ গুলো ভাবে। এই পৃথিবী কেবল তাদের মতো সুন্দর চামড়ার কুণ্ঠিত হৃদয়ের মানুষদের জন্য।
আবার সব সুন্দর দেখতে মানুষ গুলোর হৃদয় নোংরা হয় না। কিছু সুন্দর চামড়ার দেখতে মানুষের হৃদয় ঠিক রজনীগন্ধা ফুল অনুরূপ সুন্দর। যেমন তার অসভ্য পুরুষ তরঙ্গের দেওয়ানের হৃদয়। কেবল মানুষের গায়ের চামড়ার রঙের দোষ না। মূল দোষ রয়েছে মানুষের ভাবনার মাঝে। না হলে কি আর এই দুই হাজার, ছাব্বিশ সালে এসে ও! মেয়ে দেখতে এসে মেয়ে হয়ে অন্য মেয়ের গায়ের রঙ নিয়ে খিল্লি উড়াতো মেয়েরা? তরীর মতো সাধারণ এক মেয়ে এসব নিয়ে ভেবে ও লাভ নেই। সে দেশের প্রধান কেউ না। তার ভাবনাতে ও কারো কিছু যায় আসে না। তবুও তার খুব ইচ্ছে। একবার যদি গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে সমাজের মানুষদের উদ্দেশ্যে বলতে পারতো।
–” বাজারের পণ্যের মতো মেয়েদের গায়ের রঙ, উচ্চতা, পড়া শোনা নিয়ে জার্জমেন্ট করবেন না। আমরা কালো বর্ণের দেখতে মেয়েরা ও র*ক্তে, মাংসে গড়া মানুষ। আমাদের ও বুকের বা’পাশে তিন ইন্ঞি মাংসের নিচে কোমল এক টুকরো হৃদয় আছে। আপনাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বুলেটের মতো কথা গুলো আমাদের হৃদয় ঝাঁঝড়া করে দেয়।”
তরীকে এমন গভীর ভাবনায় মশগুল হয়ে থাকতে দেখে তার মুখের সামনে দু’আঙুলের সাহায্যে তুড়ি মা*রলো তরঙ্গ। সুন্দর কপালের মাঝে অবস্থানরত তীক্ষ্ম ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে নিলো সে।
–” কি এতো ভাবছেন তরীজান?”
চমকে উঠলো তরী। এতক্ষণ ধরে মনে মনে চলতে থাকা ভাবনা গুলোতে ইতি টেনে বাস্তবে ফিরলো সে। ইতিমধ্যে নাক জ্বালাটা কমে এসেছে। মাথা ধরা ও মূহুর্তেই উধাও। তরঙ্গের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো তরী। ছেলেটা দেখতে অসম্ভব সুন্দর। তার সাথে একদম মানায় না। কিন্তু তবুও এই সুদর্শন ছেলে সে বলতেই পাগল। কি অদ্ভুত তার লীলা খেলা তাই না? তরীকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফের ইশারায় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো তরঙ্গ। বিনিময়ে কোমল হাসলো তরী।
–” আপনার বন্ধু কীভাবে জানতো আমি আজ আপনার হলে যাবো?”
–” কথা গুলো জানতে চাইলে। আমার একটা কন্ডিশন আছে!”
–” বলুন?”
–” আমার সাথে ছাদে যাবেন এখন? তবেই সব বলবো।”
মাথা নিচু করে নিলো তরী। ওষ্ঠের ক্ষীণতর মুচকি হাসিটুকু লুকানোর নিমিত্তে। কিন্তু তরঙ্গের চোখ থেকে আড়াল হলো না তা। সে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সেই হাসিটুকু ও পরোখ করে নিলো।
” আচ্ছা ” বলেই উঠে দাঁড়ালো তরী। সে আগে আগেই উপরে উঠে এলো। দোতলা পেরিয়ে ছাদের প্রবেশ করতেই এক পশলা শীতল স্নিগ্ধ হাওয়া এসে তরীকে ছুঁয়ে দিলো। রেলিংয়ে হাত রেখে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়লো দু’জনে। তরীর দৃষ্টি দূর আকাশ পানে। আর তরঙ্গের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ তরীর মুখপানে। আড়চোখে একবার তরঙ্গ কে দেখে নিয়ে আবার সামনে তাকালো তরী।
–” এইবার বলুন?”
–” আমিই বলেছিলাম।”
চমকে গেলো তরী, কিন্তু নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো;-
–” আপনাকে কে বলেছিলো?”
–” আমার হৃদয়! আমি জানতাম তুমি যাবেই যাবে।”
–” এতো কনফিডেন্স?”
দার্শনিকের মতো গম্ভীর ভাব ধরে আওড়ালো তরঙ্গ;-
–” বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর। এই কথাটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। টাইপ অফ অন্ধ বিশ্বাসের মতো।”
–” অতি বিশ্বাসে ধ্বংস নিশ্চিত।”
প্রাণোচ্ছল হাসলো তরঙ্গ।
–” আমি জানি তুমি আমাকে ধ্বংস হতে দিবে না। এখন আবার এই কথার ব্যাখা চেও না প্লিজ। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, এসব দার্শনিক টাইপ তর্ক তোমার সাথে আমার মানায় না।”
–” কেন কেন?”
–” আমাদের মাঝে কেবল প্রেমের তর্ক মানায়।”
নির্জন নিশিতের নিশ্চুপতাকে আপন করে চুপ করে রইলো দুজনে। এই নীরবতাতে ও তরী ভয় হলো না। বরং বেশ মিষ্টি লাগছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। চারপাশে কোনো কৃত্রিম বাতির আলো নেই। চাঁদের রুপোলি আলোতে চকচক করছে চারিপাশ। সামনের পুকুরের টলটলে পানি গুলো ও এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বইছে মিষ্টি বাতাস। এ যেন স্বপ্নময় এক রজনী। ছাদে আসার পর থেকে তরঙ্গ এক দৃষ্টিতে তরীকে অবলোকন করছে। এই বিষয়টা বেশ অস্বস্তিকর ঠেকছে তরীর নিকট। না পারছে সইতে না পারছে কোথাও লুকিয়ে পড়তে।
–” একটা মানুষ এতোটা সুন্দর হয় কীভাবে তরীজান? ভাগ্যিস আমার প্রাণ ভোমরাটাতে আর কারো নজর পড়েনি। না হয় আমি বাঁচতাম কি নিয়ে?”
–” আমি তো কালো তরঙ্গ। এই অন্ধকার রজনীর মাঝে। আরেক অন্ধকার আমার মাঝে আপনি কিসের রূপ খুঁজছেন শুনি?”
পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে তরীর আরেকটু ঘনিষ্ঠ হলো তরঙ্গ। কপালের উপর পড়ে থাকা অগোছালো চুল গুলো কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে সুধালো;-
–” আল্লাহ্ বাহ্যিক চোখ দিয়েছেন পৃথিবী দেখার জন্য। আর অন্তরের চক্ষু দান করেছেন প্রিয় মানুষ কে দেখার জন্য।”
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাঁদের আবছা আলোয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে দেখলো তরী। ছেলেটার বাহ্যিক অবয়ব যেমন নিখুঁত, তার চেয়েও বেশি সুন্দর তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোমল হৃদয়টা। অকারণেই বুকের ভেতর কেমন এক অচেনা ঢেউ উঠলো তরীর। তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। এই ছেলের চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব। মনে হয় তার গভীর দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে। যার দ্বারা এক নিমিষেই তরীর মনের গোপনতম কথা গুলো পড়ে ফেলতে পারে। আর যদি সত্যিই পড়ে ফেলে, তবে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে।
–” আমি রুমে যাবো। ঘুম পাচ্ছে তরঙ্গ।”
–” কটা চুমু টুমু ও তো দিয়ে যেতে পারেন। আপনার ঠোঁটের উষ্ণ চুমুর অভাবে আমার ঠোঁট জোড়া শুকিয়ে কড়ই গাছের কাঠ হয়ে যাচ্ছে। পরে দেখবেন আপনাকে আমি চুমু দিতে গেলেই আপনার গাল ছিলে যাচ্ছে। এ পাপ কীভাবে সহ্য করবো আমি?”
–” অসভ্য,”
( কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! রিচেক দেইনি।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ২৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
She is my Obsession golper link
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৩
-
She is my Obsession পর্ব ২৪