কাজরী পর্ব ৪৬
#সাবিকুন_নাহার_নিপা
আল্পনা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আখতারউজ্জামান বেডে আধশোয়া অবস্থায় আছেন। কাজরী, ইশান, আল্পনা ছাড়াও শিরিন চৌধুরী উপস্থিত আছেন। তিনি আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“এখন কেমন আছেন? আগের থেকে কী একটু ভালো লাগছে শরীর? “
আখতারউজ্জামান মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“আপনাকে একটা অনুরোধ করব। আপনি চৌধুরী প্যালেসে থাকুন এখন কিছুদিন। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নাহয় নিজের বাসায় ফিরলেন। আপনি ওখানে সেফ থাকবেন। “
কাজরী বিস্মিত হলো। একবার ইশানের দিকে তাকালো আড়চোখে। ইশান ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে আছে।
শিরিন আরও বললেন,
“সবার মধ্যে থাকলে আপনার ভালো লাগবে। “
আখতারউজ্জামান স্মিত হেসে বললেন,
“আপনার আন্তরিকতায় খুশি হলাম। দরকার নেই, বাসায় আমি ভালো থাকব। আমার আত্মীয়রা আছেন, তারা থাকবে। কোনো সমস্যা হবেন না।”
“ভাই পুরোনো সবকিছু ভুলে যান। আমরা এখন আত্মীয়। আপনার মেয়ের বাসায় যাবেন তাতে এতো সংকোচ এর কিছু নেই। আমার এই অনুরোধ রাখবেন প্লিজ। “
শিরিনের অনুরোধে আন্তরিকতার সাথে বেশ জোরও আছে। কাজরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ডক্টর রিলিজ কবে করবেন আমাকে জানিও। “
কাজরী হ্যাঁ, না কিছু বলল না। শিরিন বিদায় নিলেন। সুযোগ করে দিলেন রোগীকে তার আপনজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর। ইশান আখতারউজ্জামান এর কাছেই আছে। টুকটাক কথা বলছে। কাজরী আল্পনাকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে গিয়ে বলল,
“বাবার কাছে যাও আল্পনা। “
আল্পনা স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তুমি আছ, ইশান আছ তাতেই তো হচ্ছে।”
“আল্পনা আমাদের দুজনের দ্বন্দ মতোবিরোধ এই মুহুর্তে বাবাকে বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না। তিনি সুস্থ হলে অনেক তর্ক করার সুযোগ পাওয়া যাবে। “
আল্পনা স্মিত হাসলো। এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
“এখন আপনার শরীর কেমন? “
আখতারউজ্জামান হঠাৎ যেন চমকে উঠলেন। আল্পনার গলা তার কাছে অচেনা লাগলো প্রথমে।
“আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? তোমার শরীর ভালো? ওষুধ খাচ্ছ ঠিক করে? “
এক নি:শ্বাসে অনেকগুলো প্রশ্ন করলো। আল্পনা বলল,
“আমি ভালো আছি। আমার মনে হয় আন্টির ডিসিশন মেনে নেয়া উচিত। চৌধুরী প্যালেসে থাকলে আপনার জন্য ভালো হবে। কাজরী চিন্তামুক্ত থাকবে। ও আপনাকে নিয়ে অনেক ভাবে। “
আখতারউজ্জামান খেয়াল না করলেও কাজরী আর ইশান খেয়াল করলো যে আল্পনার কথাগুলো রুক্ষ শুনাচ্ছে।
আখতারউজ্জামান বললেন,
“দেখা যাক কী হয়। “
“আচ্ছা। আমি তাহলে এখন যাই?”
আখতারউজ্জামান এবার ওর অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেন। বললেন,
“তুমি ঠিক আছ?”
“হ্যাঁ। আমার কোনো সমস্যা নেই। চৌধুরী প্যালেসে আমি খুব ভালো আছি। “
“আচ্ছা। সাবধানে যেও। “
আল্পনা বেরিয়ে এলো। কাজরী তাকিয়ে রইলো ওর যাবার পথে। ইশান প্রশ্ন করলো,
“পুলিশ আপনার স্টেটমেন্ট রেকর্ড করতে চাইছে। আপনি কী এখন পারবেন নাকি আরও কিছুদিন সময় নিবেন?”
“আমি প্রস্তুত। আমি জানি এই কাজ তরফদার পরিবার ছাড়া আর কেউ করে নি। “
কাজরী প্রশ্ন করলো,
“আপনি এতো নিশ্চিত কেন হচ্ছেন? “
“ওরা চাইছিল আল্পনা ওদের পরিবারে যাক বিয়ে করে। আল্পনাকে হাতিয়ার বানিয়ে আমার উপর শো*ধ নেবার চেষ্টা। সেটা সফল হবে না, তাই অন্য পথ দেখলো। “
“জাহিদ তোমার সঙ্গে বেইমানী করলো। “
আখতারউজ্জামান হাসলেন। বললেন,
“আপন মানুষ স্বার্থের জন্য বেইমান হয়ে যায়, আর এতো সামান্য কর্মচারী। “
ইশান জিজ্ঞেস করলো,
“যারা আপনার উপর আ*ক্রমন করেছিল তাদের আপনি কাউকে চিনতে পেরেছেন? আইমিন পরিচিত ফেস ছিলো কেউ?”
“না। লোকাল লোকজন সম্ভবত। “
কাজরী ইশানকে থামতে বলল।
“ইশান এই টপিক থাক আপাতত। “
“ওকে। আমি উঠি এখন। কিন্তু আর্জেন্ট কলব্যাক করতে হবে। কাজরী তুমি বেরোনোর সময় আমাকে কল কোরো। “
ইশান চলে যাবার পর কাজরী বলল,
“আপনার সমস্যা না হলে চৌধুরী প্যালেসে চলুন। “
“না। আমি বাসায় যাব। আল্পনার কিছু হয়েছে কী?”
কাজরী নিভলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার উপর একটু আপসেট। নাথিং সিরিয়াস। “
“আচ্ছা। তুমি চলে যাও এখন। সাবধানে থেকো। “
“আচ্ছা। কোনো দরকার হলে কল করবেন। ম্যানেজার আঙ্কেল আছেন যদিও… তবুও কিছু প্রয়োজন হলে কল করবেন। “
আখতারউজ্জামান মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। আজ তিনি আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন। ইশান ও কাজরীর স্বাভাবিক সম্পর্ক। কাজরীর বেশ পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করেছেন কয়েকদিন ধরে। তবে আজ আরও বেশী নজরে এলো। শান্ত, ঘরোয়া স্বভাব এসেছে খানিকটা। ইশানের সঙ্গে সম্পর্কটাও সহজ মনে হচ্ছে। কতটুকু সহজ তিনি জানেন না। এক ছাদের নিচে থাকতে থাকতে দুজনের দাম্পত্য স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা। বাবা হয়ে তিনি এই প্রশ্ন মেয়েকে করতে পারেন না। তবুও আগে যতটুকু দেখেছিলেন তাতে দুজনকে সহজ মনে হয় নি। ইশানের প্রটেক্টিভ ন্যাচার এর আগে তার নজরে এসেছিল বটে, তবে কাজরীর পরিবর্তন টা নজরে আসে নি।
****
আখতারউজ্জামান ধানমন্ডির বাসায় এসে উঠলেন হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে। পরিচিত আত্মীয়রা সবাই দেখতে আসছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি পরিচিত, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভীড় লেগেই থাকে। আল্পনার দু:সম্পর্কের চাচী ময়নাও এসে হাজির হলেন। তিনি রান্নাঘরের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে হেল্পিং হ্যান্ডদের কাজের অর্ডার দিচ্ছেন। আল্পনা বাসায় এলো না, ও প্যালেসেই আছে। কাজরী সকালে এসে সন্ধ্যেবেলা চলে যায়। আজ সন্ধ্যায় ইশান আসলো কাজরীকে নিতে।
বাসায় রান্নাবান্নার এলাহি আয়োজন করা হচ্ছে। জামাই রাতে খাবে বলে ময়না চাচীর বেশ উত্তপ্ত। তিনি কাজরীকে বিশেষ পছন্দ করতেন না, তবে খানিকটা ভয় পেতেন। এখনো করেন না, কিন্তু বড়লোক বাড়ির বউ, ক্ষমতাবান সম্পদশালী পরিবারের মানুষজনের সাথে একটু আহ্লাদ করতে হয়।
আল্পনা আজ এলো। ব্যাগপত্র কিছু নেই। কাঁধের ছোট ব্যাগটা নিয়ে যখন ঢুকলো তখন ময়না চাচী কপাল কুঁচকে বলল,
“আসলি তবে? তোর কী বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? বাপ হাসপাতাল থেকে আসছে আর তুই বোনের শ্বশুর বাড়ি বেড়াচ্ছিস। “
আল্পনা শান্তস্বরে বলল,
“আপনাকে একটা থা*প্পড় দেব। এইভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছেন কেন? এটা আমার বাসা। “
ময়না চাচী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বোকাসোকা, রোগ ব্যধিতে জর্জরিত মেয়েটাকে নিয়ে অনেক কথা বলেন। সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেন। কখনো প্রতিবাদ করতে পারে না। ছোট থেকে দেখে আসছেন। হঠাৎ এই রুদ্রমূর্তি দেখে তিনি আতঙ্কিত বোধ করলেন। আমতা আমতা করে বললেন,
“তোর বাপ অসুস্থ, তোরে দেখি না তাই জিজ্ঞেস করলাম। “
কাজরী আওয়াজ শুনে এসে বলল,
“কী হয়েছে?”
ময়না চাচী কাজরীকে নালিশের সুরে কথাটা বলল। আল্পনা আবারও বলল,
“আপনি কাল এই বাসা থেকে বেরিয়ে যাবেন। নাহলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করব। আর আমাকে নিয়ে একটা উল্টাপাল্টা কথা বলে দেখুন। “
কাজরী ময়না চাচীকে বলল,
“আপনি আপনার কাজ করুন। আর আল্পনা যেহেতু পছন্দ করছে না, ওর ব্যাপারে আপনি কথা বলবেন না। “
ময়না চাচী ভোতা মুখে চলে গেলেন। বাসার সব কাজের লোকের সামনে অপমানিত হয়ে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আল্পনা নিজের ঘরে গেল। কাজরী ও’কে কিছু বলল না আর।
***
টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। আখতারউজ্জামানও বসেছেন। তিনি হালকা ধরনের খাবার নিবেন। অনেকদিন বাদে মেয়েদের সঙ্গে এক টেবিলে বসতে পেরে তার ভালো লাগছে। ইশানও প্রথম তার সঙ্গে ডিনার করতে বসেছে। আল্পনা খাওয়া শুরু করার আগে বলল,
“বাবা আমার একটা কথা আছে। “
“হ্যাঁ বলো। “
আল্পনা কাজরীর দিকে তাকালো। কাজরীর কৌতুহলী চেহারা। ইশান স্বাভাবিক ভাবেই খাচ্ছে। আখতারউজ্জামান জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন। আল্পনা বলল,
“আমার বিয়ের ব্যবস্থা করুন। আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত। “
কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ। ঠোঁটে এক চিলতে কৌতুক মেশানো হাসি। আল্পনা খানিকটা লজ্জিত বোধ করছে। কিংবা হেজিটেট ফিল করছে। ইশান পারিবারিক আলোচনায় কোনো মতামত দেবার প্রয়োজন মনে করলো না। আখতারউজ্জামান বেশ অপ্রস্তুত হলেন। কথাটা হজম করতে তার এতো অসুবিধা কেন হচ্ছে কে জানে!
পরের প্রশ্নটা অবান্তর হতে পারে ভেবেও করে ফেললেন,
“তোমার পছন্দের কেউ আছে? “
“হ্যাঁ। আপনার চেনা একজনই । আপনি শুনলে খুশি হবেন সেই সঙ্গে নিশ্চিন্তও। “
“কার কথা বলছ?”
কাজরী এবার সরু চোখে তাকাচ্ছে। ইশানেরও বোধহয় কৌতূহল হচ্ছে। কাজরীর মনে বোধহয় দুর্জয়ের নামটা এলো। কিন্তু ও’কে সারপ্রাইজড করে আল্পনা বলল,
“নিশান। আমি নিশানকে বিয়ে করতে চাই। ওর মত আছে। আপনি আন্টির কাছে প্রোপোজাল পাঠান। “
আখতারউজ্জামান সঙ্গে সঙ্গে তাকালো কাজরীর দিকে। ইশানও তাকিয়েছে কাজরীর দিকে। আল্পনা পমফ্রেট ফ্রাই তুলে নিলো প্লেটে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খাবার মুখে দিচ্ছে। ওর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে কাজরী।
চলবে….
(আন্তরিক ভাবে দু:খিত, এতো অপেক্ষার করিয়ে ছোট পর্ব দেবার জন্য। পরের পর্ব খুব শিগগিরই আসছে ইনশাআল্লাহ)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ৩৩
-
কাজরী পর্ব ৩৮
-
কাজরী পর্ব ১৪
-
কাজরী পর্ব ৪১+৪২
-
কাজরী পর্ব ১৮
-
কাজরী পর্ব ৪৩
-
কাজরী পর্ব ১৫
-
কাজরী পর্ব ২৫
-
কাজরী পর্ব ২০