Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ১


“তুমি আমার গলায় ইরাম আপুকে ঝুলিয়ে দিতে পারো না মম! উনি আমার থেকে ৭ বছরের বড়, তার উপর ওনার একটা বাচ্চা আছে, বাচ্চা! গড ড্যাম! আমি পারবনা ওনাকে বিয়ে করতে!”

“গলা নিচে। একদম চিৎকার চেঁচামেচি করবিনা। পরিস্থিতির জটিলতা বোঝার চেষ্টা কর।”

“কিচ্ছু বুঝতে চাইনা আমি, কিচ্ছু না। ফর গডস সেক, এটা আমার জীবন, সরকারি খেলার মাঠ না! তুমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সঙ্গে এইভাবে জবরদস্তি করতে পারবেনা। আমি কোনোদিন ইরাম আপুকে বিয়ে করবো না! কোনোদিন না!”

“আমার কথাটা একবার…”

“না, না, না, এবং না! নো, নেভার! নেভার এভার ইন মাই লাইফ আই উইল ম্যারি আ সিনিয়র উইম্যান!”

বদ্ধ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে চিৎকার করে বলা কথাগুলো। কোনো রাখঢাক নেই, সবটাই দিনের আলোর মতন পরিষ্কার, প্রকাশ্য। ডাইন ইন টেবিলের পাশে চেয়ারে নিশ্চুপ বসে আছে ইরাম। সামনে দুটো স্যান্ডউইচ এবং কফি রাখা। খাবার আর গলা দিয়ে নামবেনা তার। এবার কিছুটা ভাঙচুরের শব্দ আসছে। বাড়ির আদরের দুলাল হয়ত নিজের রাগ জড়বস্তুর ওপর মেটাচ্ছে। অস্বাভাবিক নয়, ভীষণ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তার জায়গায় ইরাম থাকলে হয়ত এমনটাই করত। কে বলতে পারে?

“তুই শুনবিনা তোর মায়ের কথা? আমি জীবনে কোনোদিন তোর কাছে কিছুই চাইনি। তুই আমার এই একটা ইচ্ছা পূরণ করতে পারবিনা?”

“ইচ্ছারও একটা লিমিট থাকে, মম!”

এবার শব্দগুলো এতটা জোরে হচ্ছে যে স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে। ইরাম চেয়ারে আর স্থির বসে থাকতে পারলোনা। হুট করে উঠে গেলো। লিভিং রুমের সোফার নরম গদিতে একটি তোয়ালে বিছিয়ে ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটিকে শুইয়ে রেখেছে সে। বেগুনী রঙের কাঁথায় মোড়ানো তুচ্ছপ্রায় এক অস্তিত্ব। মোমের মতন নরম শরীর। গোলাপ রাঙা মুখ। চোখদুটো বন্ধ, যখন খোলা থাকে তখন তাতে এক আকাশ সমান মায়া খেলা করে। ইরাম চুপটি করে নিজের অংশ, নিজের সন্তানের কাছে বসলো। আলতোভাবে দুহাতের দুটো আঙ্গুল নগণ্য শিশুটির দুই কানে ঠেকালো, যেন ঘুমন্ত অবস্থায় কিচ্ছুটি শুনতে না পায় সে। জননীর জীবনের নরক যে তার প্রাপ্য নয়!

তিন মাস আগে:-

মা— নারী শব্দের অলংকার। একজন নারীর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন, অমোঘ পরিপূর্ণতা। এতদিন এই শব্দটাকে শুধু পড়া হয়েছে, ডাকা হয়েছে, তবে কোনোদিন অনুভব করা হয়নি। আজ মাতৃত্বের প্রবল জোয়ারে ভেসে গিয়েছে ইরামের হৃদয়াঙ্গন। দুপুরের দিকে ডেলিভারি হয়েছে তার। এখন সন্ধ্যাবেলা। হাসপাতালের কেবিনের শীতল বাতাস আরামদায়ক চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে তাকে। মাত্রই দীর্ঘ এক ঘুম পেরিয়ে জেগে উঠেছে সে। বর্তমানে একদৃষ্টে চেয়ে আছে বিছানার ঠিক পাশেই লাগোয়া বেসিনেটে রাখা নবজাতকের দিকে। চেয়েই আছে সে, চোখ ফেরাতে পারছেনা। যতবার দেখছে, ততবার তার বুকটা আবেগের স্রোতে পূর্ণ হচ্ছে। একটা সময় নিজেকে আর রুখতে পারলোনা ইরাম। দুহাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বেসিনেটের কাছে গেলো। আশেপাশে কোনো নার্স নেই, ব্যাপারটা অদ্ভূত লাগলেও তেমন কিছু ভাবলো না আপাতত। তার সকল চিন্তা জুড়ে রয়েছে ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তান।

বেসিনেটের ভেতর থেকে ছোট্ট ছোট্ট হাত পা নাড়ছে নবজাতক। সাদা নরম তোয়ালেতে মোড়ানো নাজুক শরীরখানি তার। টকটকে লাল দুটো কান এবং নাক। চোখের পাতা আধখোলা। ত্বকের বর্ণটা লালচে। যেন দারুণ সুখে কিছু একটা নেচে উঠল ইরামের মাঝে। কাঁপা কাঁপা দুহাত বাড়িয়ে অতি সাবধানে সে নবজাতককে তুলে নিলো নিজের বুকে। তার ত্বকের উষ্ণতা পেতেই বিড়ালের মতন মৃদু একটা শব্দ করে শিশুটি গুটিশুটি দিয়ে রইলো। তীব্র আবেগের অশ্রু জমলো ইরামের চোখজোড়ায়। সন্তানকে বুকে চেপে সে কম্পিত গলায় ফিসফিস করে উঠল,

“আমার সোনা বাচ্চাটা, আমার মানিক, আমার কুচুপু! আম্মু তোমার আশায় কতকাল অপেক্ষার প্রহর গুনেছে! অবশেষে আসার সময় হলো তোমার, হুমম?”

দুহাতে হালকা শরীরটা তুলে ধরে তার কপালে চুমু এঁকে দিলো ইরাম। তার চোখ বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল নবজাতকের গাল বরাবর। তাতে নিজের ছোট্ট হাতটা তুলে অস্বাভাবিকভাবে নাড়তে থাকলো শিশুটি। না পারতে মৃদু হাসলো ইরাম।

“আমার দুষ্টু পাখিটা। আর কি নামে ডাকি বলো তো তোমায়?”

একদম নিজের মুখের কাছে তুলে নবজাতকের কানে ঠোঁট লাগিয়ে ইরাম ফিসফিস করলো,

“ইযান, আমার ইযান সোনা। আম্মুর লক্ষ্মী ছেলেটা।”

“আহ্হ্হ…উমমমম!”

ইরাম হঠাৎ করেই নিজের জায়গায় জমে গেলো। গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে কেবিনের ভেতর। এতক্ষণ যাবৎ হয়ত শোনা যায়নি, কিংবা ছেলেকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকার দরুণ ইরাম মনোযোগ দেয়নি। গোঙানির শব্দটা এবার তীব্রতর হয়েছে। ব্যাথাতুর কোনো ধ্বনি এটি নয়। বরং ভীষণ অন্তরঙ্গ, অশ্লীল ধরণের। মেয়েলী গলার সীৎকার! হাসপাতালের কেবিনের ভেতর? প্রথমটায় নিজেকেই নিজের বিশ্বাস হলোনা ইরামের। দুপুরেই ডেলিভারি হলো, নরমাল ডেলিভারি। শরীরের ধকলের কারণে হয়ত কল্পনা করছে।

“আহ্…বেবি, আস্তে প্লীজ.. আহ!”

নবজাতক ইযানকে পুনরায় বেসিনেটে নামিয়ে রাখতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় থমকাল ইরাম। কান খাঁড়া হয়ে রইল তার। নাহ, এবার কোনো ভুল নয়। সত্যিই এমন সুখের আহাজারি ভেসে আসছে তার কানে। কিন্তু ঠিক কেবিনের ভেতর থেকে নয়। শব্দের উৎসটা কান পেতে খেয়াল করতেই ইরাম বুঝতে পারল কেবিনের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দা থেকে এসব ধ্বনির উৎপত্তি। রাগের সীমা ছাড়িয়ে গেলো তার। কার এত বড় দুঃসাহস যে একজন পেশেন্টের কেবিনের ভেতর এমন অশ্লীল কর্মকান্ড করতে পারে? ছেলেকে বুকে চেপে রেখেই ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো ইরাম, সাবধানী ভঙ্গিতে। কেবিন থেকে বারান্দায় যাওয়ার দরজাটা চাপানো, ঠিক লাগানো নয়। গোঙানির শব্দ আরও পরিষ্কারভাবে কানে আসছে এবার, সঙ্গে ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ। একদম কিনারায় এসে থামলো ইরাম। ঠাস করে দরজা খুলে ঢুকে যেতে কেমন যেন সংকোচ হচ্ছে তার, যদিও মূল সংকোচ বারান্দায় উপভোগে ব্যস্ত থাকা যুগলের করা উচিৎ। যেকোনো জায়গায় শুরু হয়ে যায় এরা। কোনো ওয়ার্ড বয় আর নার্সকে একসাথে দেখলে একটুও অবাক হবেনা ইরাম। বুকে তার নিজের বাচ্চা, তাই এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেও হৃদয়ের প্রবল এক সন্দেহ থেকে দরজাটা নিঃশব্দে হালকা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিলো সে।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বারান্দায় রেলিংয়ের বদলে থাই গ্লাস দিয়ে বাঁধানো। তাই প্রথমটায় কিছু নজরে এলোনা ইরামের। চোখ পিটপিট করে ভালোমত তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলো, দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে রইলো ফুটবলের মতন।

বারান্দার দেয়ালের সঙ্গে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে ইরামের কেবিন নার্স। যুবতী মেয়েটির একটি পা তুলে রাখা সামনে দাঁড়ানো পুরুষটির কোমরে, জড়িয়ে ধরে রেখেছে তারা একে অপরের শরীরকে। নার্সের পোশাকের নিম্নাংশ অগোছালো, ঠিক তেমনভাবেই পুরুষটির পরনের সাদা শার্টের বোতাম খোলা। বুক বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়াচ্ছে। মেয়েটির ঘাড়ে মুখ গোঁজা, উভয়ে শিরশির করে কেঁপে উঠছে নিজেদের অভিসারের গভীরত্বে। ইরাম অবাক হলো না, সরেও গেলো না। শুধু স্থির দাঁড়িয়ে থাকল, নিষ্প্রাণ এক পুতুলের মতন। তার বুকে কুইকুই করে উঠল ইযান, অথচ নব্য জননী সেই শব্দটুকুও শুনতে পেলনা। তার দুই নয়ন আবদ্ধ এক যুগলের অভিসারপানে। যেখানে থাকা পুরুষটি….

তার স্বামী। তার সন্তানের জন্মদাতা পিতা।

অরণ্য মির্জা সওদাগর।

ইরাম যে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা অরণ্য টের পেয়েছে। লোকটা তার গায়ের গন্ধ অবধি কীভাবে যেন শুঁকে ফেলে। নার্সের ঘাড়ে গুঁজে রাখা মুখটা সে সামান্য একটু তুললো। একজোড়া শকুনে দৃষ্টি মিলিত হলো ইরামের সঙ্গে। অরণ্যর অসম্ভব সুদর্শন মুখমন্ডলজুড়ে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে মুক্তার দানার মতন। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকে অভিসারের তপ্ততায় ফুটে উঠেছে লালচে বর্ণ। চোখজোড়া কালোই, তবে তাতে জ্বলজ্বল করছে এক জনমের ক্ষুধা। সরাসরি ইরামের দিকে তাকিয়েই নার্সের শরীরে আরও গভীরভাবে ঝুঁকলো সে। তার গভীরতম ছোঁয়ায় উন্মাদ যুবতী নার্স ঢলে পড়ল, কেঁপে কেঁপে উঠে অরণ্যর পিঠ খামচে ধরল।

“আহ…ইয়েস বেবি..মার্ক মি..হাহা!”

অরণ্য ঠোঁটে তীর্যক হাসি ফুটিয়ে নার্সের ঠোঁটজোড়া দখল করে নিলো। চুম্বন নয়, রীতিমত কামড়ে ধরলো বহুদিন যাবৎ ক্ষুধার্ত থাকা হায়েনার মতন।

আর দেখতে পারলোনা ইরাম। তড়িঘড়ি করে সে বারান্দা ছেড়ে কেবিনের ভেতর চলে এলো। কোনমতে হাতের কাঁপুনি ঠেকিয়ে ছোট্ট ইযানকে সে পুনরায় বেসিনেটে রেখে দিলো। অতঃপর নিজের বিছানায় ধপাস করে বসে রইল, রোবটের মতন। ঠিক কতটা সময় একইভাবে পার হলো, ঠাওর করতে পারলোনা সে। মাথার ভেতর দপদপ করছে তার, ভারী নিঃশ্বাস ফেলছে, বুকটা চেপে আসছে ব্যথায়। আজকের দিনটা অন্তত তাকে রেহাই দেয়া যেত। আজ তাদের সন্তানের জন্মদিন!

কিছুক্ষণ বাদে কেবিনে ঢুকলো কেবিন নার্স। পরিষ্কার – পরিপাটি। ইরামকে ঘুমিয়ে থাকার বদলে বিছানায় বসে থাকতে দেখে নার্স এক লহমার মতন থমকাল। পরক্ষণেই অবশ্য কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“আপনি উঠে পড়েছেন? বেশ। আমি গিয়ে আপনার সন্ধ্যার নাস্তাটা নিয়ে আসছি। বিশ্রাম নিন।”

কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো নার্স। এরপরই বারান্দার দরজা ঠেলে ধীরপায়ে ভেতরে এলো অরণ্য। নার্স যতটা পরিপাটি ছিল, অরণ্য ততটাই অগোছালো। শার্টের সবগুলো বোতাম এখনো লাগানো হয়নি। প্যান্টের বেল্টটা টেনে টাইট করতে করতে কেবিনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো সে। ইরাম স্থির চেয়ে দেখলো নিজের স্বামীকে। লোকটাকে এখনো তার স্বামী বলে সম্বোধন করে যাওয়া উচিৎ কিনা সেটা নিয়ে অবশ্য দ্বিমত আছে তার।

অরণ্য আসলেই সুদর্শন। ছয় ফুট দুই ইঞ্চির উচ্চতার একটি সুগঠিত পেটানো শরীর। নিয়মিত জিম করার কারণে শরীরে কোনো মেদ নেই। শার্টের উপরেও তার মাংসপেশীর গড়ণ বোঝা যায়। প্রথম দফায় তাকিয়ে আন্দাজ করা কঠিন যে লোকটার বয়স ইতোমধ্যে ৩৫ ছুঁয়েছে। ঘন ভ্রু, পুরু ঠোঁট এবং তীক্ষ্ণ চিবুক। কালো বাদামীর মিশেল চুলের রঙে। ইরাম চেয়ে দেখল, এই সৌন্দর্যে তার বিতৃষ্ণার ঢেঁকুর উঠল। সৃষ্টিকর্তা কি নিপুণ হাতে এমন সৌন্দর্য তৈরি করেছেন! অথচ মনটা কি কদর্য! এরকম সুদর্শন আরও একটি মানুষকে চেনে ইরাম। অরণ্যর চোখ ধাঁধানো রূপ তাকে সেই সৌন্দর্যকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে।

অরণ্য নিজেকে পরিপাটি করে শীষ বাজাতে বাজাতে আশেপাশে তাকাল। বিছানায় বসে থাকা স্ত্রীর দিকে চেয়ে একগাল হাসলো সে।

“ওয়েল, গুড ইভনিং হানি।”

বেসিনেটের দিকে এগিয়ে গিয়ে ইযানকে এক হাতেই কোলে তুলে ফেলল অরণ্য। যত্নের বালাই নেই। হাতের তালুর উপর শরীরটাকে এমনভাবে ধরল যেন নিজের সন্তানকে নয় বরং ল্যাবরেটরির কোনো গিনিপিগকে পর্যবেক্ষণ করছে। ইযান পিতার হাতের শক্ত, রুক্ষ, অসচেতন স্পর্শে সাচ্ছন্দ্যবোধ করলনা। ছোট্ট হাত পা ছুঁড়ে কান্নার দমক তুলল। বাঁকা হাসি ফুটল অরণ্য মির্জা সওদাগরের ঠোঁটজুড়ে, যেটার কোণায় এখন একটা কামড়ের দাগ স্পষ্ট। অরণ্য নিজের অপর হাতটির বৃদ্ধাঙ্গুল এবং তর্জনী মেলে ইযানের শরীরের সাইজ মাপতে লাগল।

“আরিব্বাস! ইরাম, এই সাইজের জিনিস তোমার পেটে ফিট হলো কীভাবে? অ্যামেইজিং! তুমি যে ছোট, তাতে আমার জিনিসটাই তো ফিট খায়না।”

ইরাম লাফিয়ে উঠল বিছানা ছেড়ে। এতক্ষণ যাবৎ সে শীতল থাকলেও ইযানের কান্না তার হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। ছুটে এসে সে অরণ্যর হাত থেকে ইযানকে ছিনিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরল। খেঁকিয়ে উঠল,

“খবরদার বলে দিচ্ছি! আমার ছেলেকে ছোঁবেন না!”

অরণ্য এক মুহূর্তের জমে গেলো। মাথা কাত করে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। ইরামকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে। এত কষ্টকর ডেলিভারির পর মেয়েরা মুষড়ে পড়ে। অথচ ইরামের হয়েছে ঠিক উল্টোটা। অজানা এক শক্তিতে টগবগ করে ফুটছে সে। সদা নির্বিকার থাকা চোখজোড়ায় আজ আগুন জ্বলছে। যেন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে তার মাঝে। বোকা অরণ্যর ধারণায় নেই, আজকের আগে ইরাম ছিল শুধুমাত্র একজন নারী, আজ থেকে একজন মা! তাই অরণ্য ভাবল, তার ইরাম তো আগে এমন ছিলনা!

দুহাত তুলে সমর্পণের ভঙ্গিতে অরণ্য বলল,

“ওহ, চিল চিল! প্রোডাক্ট তো আমারও। আমি ছুঁয়ে না দিলে কে দেবে, শুনি?”

“কেউ না, আমি বাদে কেউ না। শুনেছেন আপনি?”

“এত তেজ কিসের?”

এবার অরণ্যর গলা শক্ত হয়ে এলো। লম্বা দুই পায়ে ইরামের কাছে পৌঁছে গেল সে। এক হাতে স্ত্রীর চুলের গোছা মুঠো পাকিয়ে ধরে এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে নিল। ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে ফেলল ইরাম, তবু একটা টু শব্দ করলনা। নিজের ছেলেকে বুকে আগলে রাখল, ঠিক যেমন করে সিংহী পাহাড়া দেয় নিজের শাবককে। অরণ্য ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,

“একটু বেশি প্রায়োরিটি দিয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে? কি ভেবে নিয়েছিস? তোকে ছাড়া আমার চলবেই না? একটা বাচ্চা পয়দা করে দিয়েছিস? সো হোয়াট? যদি আমি চাইতাম, আমার আন্ডারে বাচ্চাদের একটা ফুটবল টিম থাকত বুঝেছিস? তোকে একটু বেশি ভালোবাসি বউ বলে। সেটার এভাবে সুযোগ নিবি তুই বারবার, ইরাম?”

“আমি আপনার বউ না।”

আজ ইরামের মাঝে ভয়ের লেশমাত্র নেই। স্তব্ধ হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে এক পা দূরে সরে দাঁড়াল অরণ্য। কোমরে দুহাত রেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ চেয়ে রইল। পরমুহুর্তে আচমকা খিলখিল করে হেসে উঠল।

“আর ইউ সিরিয়াস রাইট নাউ, হানি? তোকে তিন কবুল বলে বিয়ে করেছি, তোর বুকে আমার ছেলে। আর তুই বলছিস তুই আমার বউ না? ডেলিভারির পর তোর মস্তিষ্কটাও ঢিলে হয়ে গিয়েছে নাকি? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে তো মামলা দিতে হবে আমার!”

ইযানকে অতি সাবধানে নিজের বিছানায় শুইয়ে রাখলো ইরাম। ছেলের কান্না থেমেছে এবং ঠিক আছে নিশ্চিত করার পরেই সে ঘুরে দাঁড়াল। অরণ্যর তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি মোকাবেলা করল দৃঢ়ভাবে।

“আপনাকে মনে করিয়ে দিই। আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস আগে আপনি নিজে আমাকে তালাক দিয়েছিলেন।”

অরণ্যর চেহারা থেকে ক্ষণিকের জন্য বিনোদনের ভাবটুকু উবে গেল। তবে নিজের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমা একটুও ছাড়লনা সে। ইরামের দিকে এগিয়ে এসে দুহাত রাখল রমণীর কাঁধে। অদ্ভূতভাবে সুর পাল্টে আদুরে গলায় বলল,

“ওহ কাম অন ডার্লিং! তুমি ওটা এখনো মনে ধরে বসে আছো? ওটা তো আমি মন খারাপ করে বলেছিলাম। তুমি জানো না, তোমাকে কত আদর করি আমি? তাছাড়া ধর্ম কর্ম আমি একটু হলেও জানি, বুঝেছ? ওই তালাক হবেনা। কারণ তুমি প্রেগন্যান্ট ছিলে।”

ক্ষীণ এক হাসি ফুটল ইরামের ঠোঁটে।

“অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। কে বলেছে আপনাকে ওই তালাক গণ্য হয়না? হয়। বাচ্চা জন্ম অবধি আমার ইদ্দতকাল চলেছে। আজ আমার ইদ্দত শেষ। স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে হলে আপনাকে তার সঙ্গে রুজু করতে হবে।”

প্রথমবারের মতন শঙ্কা দেখা গেল অরণ্যর মাঝে। দুই মিনিট চুপ থাকল সে। তারপর খানিকটা গম্ভীর গলায় নিজস্ব অহংকারটুকু চেপে বলল,

“বেশ তো। তবে রুজুই করলাম আমি তোমার সাথে।”

নিজের কাঁধের উপর থেকে একদম ধীরস্থিরভাবে অরণ্যর হাত দুখানা সরিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল ইরাম। আরও একবার অরণ্যর মনে হলো, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইরামকে দেখছে সে। দৃঢ় গলায় ইরাম জানালো,

“আমি আপনার সঙ্গে রুজু করব না, মিস্টার অরণ্য মির্জা সওদাগর। আজ থেকে আপনি আমার স্বামী নন, স্রেফ একজন পরপুরুষ।”

✿—চলবে—✿

আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

সূচনা_পর্ব

[ 🙂‍↕️অবশেষে চলে এলাম। আশা করি এই নতুন যাত্রায় আপনাদের সকলকে আরও বেশি করে পাশে পাব। যাত্রার শুরুর দিকে সবাই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, মন্তব্য করে কিংবা নিজেদের অনুভূতি জানিয়ে শেয়ার করে উদ্দীপনা দেবেন এই আশা রাখছি। পরিশেষে, কেমন লাগবে জানাবেন। আপনাদের ভালো সাড়া পেলে খুব শীঘ্রই আসবে দ্বিতীয় পর্ব। ভালোবাসা আপনাদের সবাইকে।❤️]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply