Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ১৭


জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা১৭

“আলাদিন। মাঝে মাঝে তুমি এমনভাবে কথা বলো যে আমার মনে হয়….”

ইরাম নিজের কথাটা শেষ করতে পারলনা। শব্দগুলো দ্বিধান্বিত হয়ে গলার ভেতর আটকে গিয়েছে। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে সে দেখছে তার উপর ঝুঁকে থাকা সাইবানকে। তার আধো বুলি শুনে সাইবান তার গলার পাশের পালস বরাবর আলতো আঙুলের চাপ দিয়ে ফিসফিস করল,

“কি মনে হয়?”

“যে তুমি…”

“হুম। আমি?”

“তুমি আমাকে….!”

“উয়াআআআ!”

জমে গেল সাইবান আর ইরাম উভয়ে। ক্রিবে শুয়ে থাকা ইযান একেবারে হঠাৎ করেই চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠেছে। ছোট্ট হাত পা ছুঁড়ে এমনভাবে নাটকীয় ভঙ্গিতে কান্নাকাটি করছে যেন কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। ইরামের মাতৃমস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল। ধাক্কা দিয়ে সাইবানকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে ছুটে গেল সে সন্তানের কাছে। দ্রুত ইযানের ছটফট করতে থাকা শরীরটাকে নিজের বুকে তুলে নিয়ে দোলাতে লাগল,

“এইযে বাবাটা, এইযে আম্মু এখানে। কান্না কেন, হুম? ক্ষুধা পেয়েছে তোমার? পেটু ভরেনি?”

সাইবান কয়েক সেকেন্ড উপুড় হয়ে বিছানায় পরে রইল। তার হাতটা এখনো চাদর আঁকড়ে ধরে রেখেছে ঠিক যেখানে কয়েক সেকেন্ড আগ অবধিও ইরাম শুয়ে ছিল। চাদর মুঠ পাকিয়ে ফেলল সে, চোখমুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে নিজেকে নিজে বোঝাতে লাগল,

“কুল ডাউন, কুল ডাউন, কুল কুল কুল! পোটলাটাকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফালানো যাবে না, পোটলা উড়তে পারেনা। মাথা ঠান্ডা, মাথা ঠান্ডা, তামান্না ভাটিয়া, তামান্না ভাটিয়া!”

মনে মনে জপতে লাগল সাইবান। ইরাম ততক্ষণে ফিডারের দিকে হাত বাড়িয়েছে। সে পাম্প করে রেখেছিল, সেটা কোনোভাবে নিচের কিচেনে ফেলে এসেছে সকালের নাস্তা তৈরি করার সময়। নিজেকে নিজে মনে মনে খানিক অভিসম্পাত করে এখন ম্রিয়মাণ হয়ে আসা ইযানকে বিছানায় উপুড় হয়ে থাকা সাইবানের পাশে রাখল সে।

“একটু দেখে রাখো, আমি নিচ থেকে ফিডার নিয়ে আসছি, এই পাঁচ মিনিট।”

থ হয়ে রইল সাইবান, চোখ মেলে ইরামকে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যেতে দেখল। তারপরই তার করুণ চোখজোড়া এসে পড়ল ইযানের উপর। কান্নার বালাই নেই আর। তবে নয়ন দুটি অশ্রুতে ভিজে টলটল করছে। নাক টানছে আর অদ্ভুত ভঙ্গিতে সাইবানের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন ভ্রুকুটি করছে তাকে। ভ্রু তুলে খানিকটা সময় তাকিয়ে থেকে খপ করে ইযানের গলায় হাত রাখল সাইবান। নাজুক শরীরের অঙ্গ তার দুইখানা আঙুলেই সম্পূর্ণ জড়িয়ে গেল।

“পোটলা তোর কল্লাটা ২ ইঞ্চির, আর সাইরেন বাজাস ৬৯ ইঞ্চির! তোর ভোকাল কর্ড নাকি টাইটানিকের হর্ন? টাইম মতো পোঁৎ করে বাজিয়ে দিস!”

সাইবান ইযানের ছোট্ট গলা আলতোভাবে আঁকড়ে শাসাল। বিনিময়ে গুঙিয়ে উঠল ইযান। ছোট্ট শিশুটির ভ্রু এমনভাবে কুঁচকে এলো যেন পিতার উপর যারপরনাই বিরক্ত সে।

“এই চোওওওপ! চোখ পাকাস কাকে তুই? চিনিস আমাকে? আমি তোর বিনা শ্রমে হয়ে যাওয়া বাপ, বুঝতে হবে মামা! এমনিতেই কল্লার শক্তি দেখিয়ে আমার দুনিয়া নাড়িয়ে ফেলেছিস। এবার চু….!”

ঠাস!

সাইবানের মুখটা একদিকে হেলে গেল। চোয়াল ফাঁক হয়ে পড়ল কয়েক ইঞ্চি। মুখের কথা তার মুখেই আটকে রইল। কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারলনা কি হয়েছে এইমাত্র!

ইযানের ছোট্ট হাতটা সশব্দে আছড়ে পড়েছে তার বাম গাল বরাবর। সোজা বাংলায় বলা যায়, থাপ্পড়। সাইবান চোখে অফুরন্ত অবিশ্বাস নিয়ে তাকাতে না তাকাতেই চোখমুখ কুঁচকে এবার ছোট্ট পা তুলে পিতার থুতনি বরাবর লাথি ছুঁড়ে ইযান লাফিয়ে উঠল,

“উই…ব্যা!”

“ইউ লিটল পিস অব…শিইইইইট!”

আর্তনাদ করে উঠল সাইবান। ইযানের ছোট্ট দুহাত বিছানার সঙ্গে চেপে ধরল। বিপরীতে নিজের পা দুখানা তুলে দমাদম ছুঁড়তে আরম্ভ করল ইযান। সে লাথি তার বাবার মুখে পড়ছে কি বুকে দেখার কোনো সময় নেই তার।

“অ্যা…! অ্যা…আউই!”

“নাটকবাজ, ধড়িবাজ, চালবাজ, এক চটকানায় মুড়ি ভাঁজ!”

“এইযে আম্মু এসে পড়েছে পুচুকু!”

পিতা পুত্রের টি টুয়েন্টির মাঝেই রুমে প্রবেশ করে জমে গেল ইরাম। বিছানার উপর বসে আছে সাইবান। তার দুহাত তোলা উপরের দিকে, সেখানে ঝুলছে ইযান। ইযানের একটা পা এখনো সাইবানের ডান গাল বরাবর বসানো, আর সাইবানের হাত ইযানের মাথার অল্প বিস্তর চুলের মাঝে মুঠ করে রাখা। দুজনই থমকে গেল ইরামের কন্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সঙ্গে। ঘুরে তাকাল ওই অবস্থায়ই। ইরাম দৃশ্য দেখে হাসবে কি কাঁদবে ভুলে গেল। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল শুধু। ইযানই সর্বপ্রথম নিজের আধ লাথিটা পূর্ণ করে সাইবানের গালে ঠেটিয়ে কেঁদে উঠল,

“আই…উয়াআ!”

ইরাম ছুটে এসে ছেলেকে কোলে নিল। দ্রুত ফিডারটা মুখে দিয়ে দোলাতে লাগল। ইযান শান্ত হয়ে এলো তৎক্ষণাৎ। চুকচুক করে ভদ্র বাচ্চাটি হয়ে খাবারে মনোযোগ দিল। তখনো নিজের গাল চেপে ধরে রাখা সাইবান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল,

“কি সাংঘাতিক! চেঙ্গিস খান নামটা ওয়েস্ট না হলে এই পোটলাকে দেয়া অতি জরুরী হত! শালায় একটা ডিক্টেটর!”

এতক্ষণ না হাসলেও এবার আর হাসি রুখতে পারলনা ইরাম। হাসতে হাসতে বলল,

“তোমাদের দুজনকে এক রুমে ছেড়ে দেয়া আর বাঘেতে কুমিরে এক ঘাটে জল খাওয়া একই ব্যাপার দেখছি।”

সাইবান আর কিছু বললনা। এক হাতে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে অপলক নয়নে চেয়ে থাকল ইরামের অকৃত্রিম হাসির দিকে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

কয়েক ঘণ্টা পর।

দুপুর হয়ে এসেছে প্রায়। সাইবান খাওয়া – গোসল সেরে তৈরি হয়ে নিচ্ছে বেরোবার উদ্দেশ্যে। গাড়িতেই যাবে যেহেতু একটা ক্যাজুয়াল টি শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার পড়েছে। ডাফল ব্যাগ শেষবারের মত দেখে নিচ্ছে, সব ঠিকঠাক আছে কিনা। এমন সময়েই রুমে এলো ইরাম, হাতে সামিয়ার থেকে নিয়ে আসা ল্যাপটপ। ইযান সকালের পর আবার ঘুমিয়েছে আধ ঘণ্টা আগে। ধীরপায়ে প্রবেশ করে নাইটস্ট্যান্ডে ল্যাপটপ রেখে ইরাম ব্যস্ত সাইবানকে দেখল। কাজের সময় ছেলেটার মনোযোগ একেবারে অনন্য ধরণের। কিছুক্ষণ ইতস্তত করল রমণী। তার কিছু টাকা দরকার। হাত একেবারেই ফাঁকা। উপরন্তু সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামীকাল সুগন্ধার সাথে বাইরে গিয়ে কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হয়ে আসবে। সাইবান যেহেতু চলে যাচ্ছে তার সাথে আর কথা বলার সুযোগ হবেনা। কিন্তু টাকার ব্যাপারটা তুলতেও কেমন যেন লাগছে তার কাছে। সামিয়ার কাছে এই কারণেই চাইতে পারেনি। এমনিতেই তার জন্য অনেক করেছে বাড়ির মানুষগুলো। দেনমোহরের টাকাটাও সামিয়া ইরামের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ওটা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো পরিকল্পনা করবে ভাবছে ইরাম। সেখান থেকেই এখন তুলবে নাকি? অনেক কিছুই ভাবল সে। শেষমেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো।

সাইবানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল ইরাম,

“একটা কথা বলার ছিল।”

“ঝেড়ে কেশে ফেলুন, আমার তাড়া আছে।”

নিজের কাজ করতে করতেই বলল সাইবান। ইরাম খুব বেশি সময় আর নষ্ট করলনা। বলে উঠল,

“আমার কিছু টাকার দরকার। একটা কম্পিউটার কোর্স করতে চাচ্ছি। শুনেছি দুই মাসের কোর্স ফি পাঁচ হাজার।”

সাইবান এবার চোখ ঘুরিয়ে ইরামের দিকে তাকাল। ভ্রু তুলতেই তার আইব্রো পিয়ার্সিং জ্বলজ্বল করে উঠল।

“কিসের কোর্স?”

“আর্টিকেল রাইটিং আর ওয়ার্ডশিট ফর ফ্রিল্যান্সিং।”

“ফ্রিল্যান্সিং করবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?”

“আপাতত, হ্যাঁ।”

ইরাম প্রায় প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল যে একটা বেশ লম্বা চওড়া বিশ্লেষণ করবে, কেন এই কাজটা করতে ইচ্ছুক, কীভাবে করবে, মেয়ে বলে কেউ কাজ না দিলেও তাকে লড়াই করে যেতে হবে, কারও আপত্তি থাকলেও তার কিছুই করার নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সাইবান তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করলনা। ট্রাউজারের পকেট থেকে নিজের ওয়ালেট বের করে যতগুলো নোট ছিল, সবগুলোই বের করে আনল। গুণেও দেখলনা কত আছে। সরাসরি ইরামের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওয়ালেট আবার পকেটে ভরে রাখল। ইরাম অবশ্য গুণে দেখল। আটটা এক হাজার টাকার নোট, আর চারটা পাঁচশো টাকার নোট। মোট দশ হাজার টাকা।

“এটা তো অনেক বেশি। তোমার লাগবে না? ওয়ালেট তো পুরো ফাঁকা করে ফেলেছ দেখলাম।”

“আমার কার্ড আছে, ক্যাশ না হলেও চলবে।”

বলে সাইবান ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রুমের দরজার দিকে এগোল।

“আমার তো ৫ হাজার টাকা হলেই চলবে, ১০ হাজার কেন দিচ্ছ?”

ইরামের কন্ঠস্বরে সাইবান ঘুরে তাকিয়ে বলল,

“রেখে দিন। পরে কাজে লাগবে।”

“না। লাগলে আবার চাইব। আপাতত ঋণী করো না। টাকা কষ্ট করে উপার্জন করতে হয়, তোমার বাড়ির উঠানের গাছে ধরে না।”

ইরাম এগোল, বাকি ৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিতে গেল সাইবানের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা মুঠো করে চেপে ঝুঁকে এসে বান্দা তীর্যক হেসে জানাল,

“ইউ বেটার লার্ন টু স্পেন্ড অ্যায ফাস্ট অ্যায আই আর্ন।”

থমকে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল রমণী, তার চেহারায় সাইবানের তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল। ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা দেখে ইরাম না চাইতেও একটি ঢোক গিলতে বাধ্য হলো। সাইবানের হাসিটা তাতে আরেকটু বিস্তৃত হলো। ইরামের বাহু বেয়ে তার হাতটা উঠে এলো কানের লতিতে। কিছু এলোমেলো চুলের গোছা সযত্নে কানের পিছনে গুঁজে দিল সে। তারপর মুখ নামিয়ে সেই কানের কাছে আবেশমাখা মৃদু কন্ঠে বলল,

“পরের বার থেকে আর আমার কাছে টাকা চাইবেন না। এক্সট্রা ওয়ালেট ক্লোজেটের দ্বিতীয় ড্রয়ারে রাখা আছে। লক্ষ্মী বউয়ের মত যা লাগে নিয়ে খরচ করবেন। মাস শেষে ওটা ভর্তি করে রাখার দায়িত্ব আমার।”

ইরামের ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে রইল। সম্মোহিতের ন্যায় সে চেয়ে রইল সাইবানের দিকে। কেন যেন দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা নিজের। সাইবান তার চোখের দিকে তাকাল,

“হুম। তারপর? কীভাবে যেন বিদায় জানাতে হয়?”

“ওই…!”

ইরাম মুখ খুললেও কথা শেষ করতে পারলনা। সাইবান তার চিবুকে আঙুল জড়িয়ে মুখটা তুলে কপাল বরাবর নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল। তার ত্বকের মাঝে অস্ফুট স্বরে বলল,

“খুব জলদিই জ্বালাতে ফেরত চলে আসব। ট্রাই নট টু মিস মি টু মাচ, মাই প্রেশিয়াস।”

আর দাঁড়ালনা সাইবান। নিজের উষ্ণতাটুকু কেড়ে নিয়ে উল্টো ঘুরে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল। ইরাম তখনো নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল বরফের মত। অজান্তেই হাতে ধরে রাখা টাকায় তার আঙুলগুলো সজোরে চেপে বসল। সে ভুলেই গিয়েছিল অনুভূতি কীভাবে অনুভূত হয়। অথচ বহুদিন বাদে আজ তার উষ্ণ কিছু একটা ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে ফেলার অনুভূতি কেন হচ্ছে সেটা তার বোঝদার মস্তিষ্কও বুঝতে পারলনা।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

পরদিন।

গতকাল সিলেটে শো করতে চলে গিয়েছে সাইবান। ইরাম আজ সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিয়েছে। একটা হলুদ রঙের কামিজ আর সালোয়ার। ওড়নাটা পরিপাটি করে কাঁধের দুপাশে তুলে দেয়া। চুলগুলো বিনুনী পাকিয়ে নিয়েছে। ইযানকে নিয়েই বেরোবে আজ। কারণ সামিয়া, সারিকা কেউই বাড়িতে থাকবেনা। সুগন্ধাও তার সাথেই যাচ্ছে। সেহেতু রেখে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। নাস্তা তৈরি হচ্ছে কিচেনে। ইরাম কিছুক্ষণ আগেই সাহায্য করে এসেছে সুগন্ধাকে। মেয়েটা এখন গরম করে নিচ্ছে সবকিছু।

কেউই এখনো নাস্তার টেবিলে আসেনি। সময়টা ব্যবহার করার কথা ভাবল ইরাম। ল্যাপটপ নিয়ে বসে গেল। গতকাল থেকেই একটা বিশেষ কাজ করবে বলে ভেবে রেখেছে। যেটা এতদিন করার কথা মাথায় আসেনি। সুগন্ধার থেকেই টুকটাক খবর পেয়েছে সে। ইউটিউবে গিয়ে সার্চ দিল,

অ্যারাবিয়ান ডেইস (Arabian Days)

একটি চ্যানেল ভেসে উঠল। মিউজিক সম্পর্কিত সকল ভিডিও। বিভিন্ন আর্টিস্টিক এম ভি। সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি প্রায়। একটি বেশ জনপ্রিয় ভিডিও আছে, প্রায় ১০ মিলিয়ন ভিউ। এক বছর আগে আপলোড করা হয়েছে। ইরাম ভিডিওটা দেখল। ভাইরাল একটা গান, গত বছর টিভি চ্যানেলে আর এদিক সেদিক বেশ শোনা হয়েছে। মেট্রোরেলে শ্যু*ট করা হয়েছে। বেশ অ্যাস্থেটিক কায়দায়। ভিডিওতে দেখানো ভবঘুরে টাইপের ভ্রমণপিপাসু এক ছেলে, সেখানে অভিনয় করেছে সাইবান নিজে। একটি তরুণী মেয়েও রয়েছে। তারুণ্যের প্রেমকাহিনী ধরণের মিউজিক ভিডিও। ইরাম ডিস্ক্রিপশনে গেল। সেখানে সিঙ্গার, প্রোডাকশন, ইত্যাদি ক্রেডিটের সঙ্গে লিখা,

মিউজিক কম্পোজার: ডি. জে আলাদিন।

সাইবান কম্পোজার হিসাবেও কাজ করে এটা জানা ছিলনা ইরামের। সুগন্ধার গুপ্ত তথ্য অনুযায়ী তার ইনস্টাগ্রামও আছে। গুগল থেকে সেখানেও ঢুকল ইরাম। প্রোফাইল বের করে তার চোখ কপালে উঠে গেল। ৫ লাখ ফলোয়ার সংখ্যা। বেশিরভাগ তার বিভিন্ন শো এবং কম্পোজিং এর পোস্ট। হুট করে দেখলে মনে হয়না, কিন্তু সাইবান নিজের কাজ নিয়ে বেশ ভালোই এগিয়েছে। স্ক্রল করতে করতে প্রায় সাত – আট মাস আগেকার একটি পোস্টে চোখ আটকে গেল ইরামের। তেমন কিছু না, স্রেফ একটা ছবি। কিন্তু স্রেফ একটা ছবিই যেন রমণীর বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিল। জিমে তোলা একটা মিরর পিকচার। সাইবানের পরনে কোনো শার্ট নেই, উদাম শরীর। শুধু একটা ঢোলা কালো ট্রাউজার পরনে। পেটানো শরীর আবছায়া আলো আঁধারিতে ফুটে উঠেছে। শক্তিশালী মাংসপেশীর গড়ন আর উদরের কাঠামো বেশ চোখে লাগছে। ইরাম প্রথমটায় লজ্জা পেয়ে গেল, স্ক্রল করে চলে যাচ্ছিল কিন্তু কিছু কমেন্টে তার মনোযোগ আটকে গেল। বেশিরভাগ মেয়েদের কমেন্ট,

—লুক অ্যাট দোস ব্রেডস!
—অরা ফার্মিং!
—নিউ ড্যাডি ইন টাউন!

ইরাম হা করে তাকিয়ে রইল। ভাষার আগা মাথা কিছুই সে বুঝতে পারছেনা। যদিও ইংরেজিতে লিখা, তবুও। ব্রেড কোথায়? ছবির কোথাও তো ব্রেড দেখা যাচ্ছেনা। আবার ফার্মিং কোথায় হচ্ছে? সাইবান তো কৃষক না! আর ড্যাডি? প্রোফাইলে দেয়া এক তরুণীর ছবি।

“এত্ত বড় ধারী মেয়ে একটা ইয়াং ছেলেকে ডাকে ড্যাডি? এ কোন যুগ এসে পড়ল? বাবা জানে তোমার?”

আপনমনে বিড়বিড় করল ইরাম। বহু কষ্টে পাল্টা রিপ্লাই করার ইচ্ছাটা দমন করে নিল। ছবিটার দিকে চেয়ে ভ্রুকুটি করল সে। এমন একটা ব্যক্তিগত ছবি পাবলিকলি দেয়ার কি আছে? বিষয়টা যদিও তেমন কিছু নয়, তবে ইরামের কেন রাগ হচ্ছে সে বুঝতে পারছেনা। ঠাস করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে বসে রইল সে চুপচাপ।

কিছুক্ষণ বাদেই নাস্তার টেবিল ভরে উঠল। সামিয়া, সারিকা এবং আহমদ সকলে এসে বসলেন। সামিয়া, সারিকা দুজনেই রেডি। সামিয়া যাবেন হাসপাতালে, সারিকা চেম্বারে। সে পেশায় একজন ডেন্টিস্ট। ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে বেশ কয়েকদিন ছুটিতে ছিল। এখন আবার কাজ শুরু করেছে। সুগন্ধা আজ নাস্তা বেড়ে দিচ্ছে। ইরামকে পুরোদস্তুর বাইরের পোশাকে তৈরি দেখে সামিয়া শুধালেন,

“কোনো প্ল্যান আছে?”

ইরাম মাথা দোলালো।

“জি। কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হব।”

“ওয়াও। বেশ ভালো আইডিয়া।”

সামিয়া প্রশংসা করলেন। সকলেই নাস্তায় ব্যস্ত। নীরবতার মাঝে একেবারে হঠাৎ করেই আহমদ বলে বসলেন,

“বাড়ি ফেলে এখন বাইরে কাজ করার মতন নাটকটা করে সমাজে যতটুকু মুখ আছে, ততটুকুতে চুনকালি না মাখালেও চলে।”

পাউরুটি ছিঁড়ে মুখে তুলতে তুলতেও থমকে গেল ইরাম। হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল শ্বশুরের দিকে। আহমদ নির্বিকার। সামিয়া রীতিমত হাহাকার করে উঠলেন,

“মানে কি, আহমদ? ভদ্র ভাষায় কথা বলো। বাড়ির মেয়ে কোনো কাজ করতে পারবেনা? তুমি কি আদিম যুগের মানুষ?”

“মেয়ে তো নয়, অনাকাঙ্ক্ষিত বউ।”

“তো? আমিও তো বাইরে কাজ করি। হাসপাতালে রাত কাটাই। তুমি তো কোনোদিন আমাকে এমন কথা বলনি!”

আহমদ বুঝি এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন,

“ও তো আর ডাক্তার নয়। মেয়েমানুষ ডাক্তার হলে আলহামদুলিল্লাহ, বাকি সব নাউজুবিল্লাহ। সত্যটা যত জলদি মাথায় ঢোকাবে, ততই মঙ্গল তোমাদের।”

                                  —চলবে—

[ জানি পর্বটা একটু ছোট হয়ে গেছে। দুঃখিত। এই সপ্তাহ খুব ব্যস্ত যাচ্ছে। সুযোগ পেলে বড় পর্ব দিব। ভালোবাসা।🌻 ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply