Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪১


বাঁধনরূপেরঅধিকারী

লেখিকাসুমিচৌধুরী [৪১]

আইসিইউ-এর ঝকঝকে গ্লাসের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশতিয়াক। কাচের ওপারে নিথর হয়ে বেডে শুয়ে আছে সীমা। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, কপালে আর মুখে কালশিটে দাগ, ফ্যাকাশে হাতে স্যালাইন আর রকমারি ভিজিটর মনিটরের সুতো জড়ানো।ইশতিয়াকের চোখ দুটো যেন ওই নিচ্ছল দেহটার ওপর আটকে গেছে। বহু কষ্টে নিজের মাকে বুঝিয়ে আর ডাক্তারদের পায়ে একপ্রকার ধরে এখানে এসেছে সে কেবল একটা পলক সীমাকে দেখার জন্য। ইশতিয়াক নিজেও বুঝতে পারছে না, এই মেয়েটার জন্য তার বুকের ভেতরের কলিজাটা কেন এভাবে ছটফট করছে! যেই সীমাকে সে কোনো দিন দু চোখে দেখতে পারত না, যার প্রতি তার কোনো ভালোবাসা ছিল না তবে কেন আজ তার জন্য এমন উন্মাদের মতো ছুটে আসা? কেন এই তীব্র টান, কেন এত হাহাকার আর অস্থিরতা? কিছুই নিজের মাথায় মেলাতে পারে না সে।বেশ কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আইসিইউ-এর সামনে থেকে সরে এলো ইশতিয়াক। তারপর ধীরপায়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল কোথায় যাচ্ছে, সে নিজেও জানে না।

দেখতে দেখতে কেটে গেল সাত-সাতটা দিন।এই সাত দিনে সীমার অবস্থা অনেকটাই শুধরেছে, শঙ্কামুক্ত হয়ে আইসিইউ থেকে তাকে সাধারণ কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই কয়দিনে ইশতিয়াক বহুবার এসেছিল সীমার সাথে একটু দেখা করতে, কিন্তু বিলকিস বানু যেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কিছুতেই ইশতিয়াককে সীমার ছায়াও ছুঁতে দেননি। মাকে হাজার বুঝিয়েও কোনো লাভ হয়নি, প্রতিবার ব্যর্থ আর অপমানিত হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে।এই কয়েক দিনে ইশতিয়াক যেন রীত্যিমতো অধঃপতনে গেছে খাওয়াদাওয়ার কোনো ঠিক নেই, নিজের শরীরের কোনো খেয়াল নেই, মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো। মনে হচ্ছে কোনো এক ছন্নছাড়া জ্যান্ত পাগল!আজ সকাল দশটা। আবার হাসপাতালে এসে হাজির হলো ইশতিয়াক। আজ যেকোনো মূল্যে সীমার মুখোমুখি তাকে হতেই হবে!হন্তদন্ত হয়ে সীমার কেবিনের দরজার সামনে আসতেই স্বভাববশত সেখানে ঢাল হয়ে এসে দাঁড়ালেন বিলকিস বানু। তিনি বরফশীতল কণ্ঠে শক্ত মুখে বললেন,
—-“তোকে আমি কতবার বলেছি না, ওই মেয়েটার ধারেকাছেও যেন তোকে না দেখি?”
ইশতিয়াক ব্যাকুল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে অনুনয় আর যন্ত্রণার কণ্ঠে বলে উঠল,
—-“মা! এমন কেন করছ তুমি? কী করেছি আমি কিসের এত বড় শাস্তি দিচ্ছ আমাকে?”
বিলকিস বানু কঠিন দৃষ্টিতে তাকাতেই তাঁর গলার স্বর রাগে থরথর করে কেঁপে উঠল,
—-“কী করেছিস মানে? এই কথা বলতে তোর মুখে একটু বাঁধল না, ইশতিয়াক? দিনের পর দিন ওই নিষ্পাপ মেয়েটার ওপর তুই কীভাবে পশুর মতো অত্যাচার চালিয়েছিস, সেসব কি তুই ভুলেই গেলি? আজ কোন মুখে জিজ্ঞেস করতে এসেছিস তুই কী পাপ করেছিস?”
মায়ের এই একেকটা বরফশীতল কথা যেন সোজা ইশতিয়াকের বুকে এসে বিঁধল। লজ্জা আর অপরাধবোধে মুহূর্তেই মাথাটা নুয়ে এলো তার। মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না সে। কী-ই বা বলবে? বিলকিস বানু তো একটুও মিথ্যে বলেননি! এই সীমাকে সে কত অচিন্তনীয় কষ্ট দিয়েছে, কত না যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে নিয়ে গেছে!
আর কথা বাড়াল না ইশতিয়াক। আজও ব্যাকুল মন নিয়ে ব্যর্থ হয়ে উল্টো ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে একজন নার্স বাইরে বেরিয়ে এসে বলে উঠলেন,
—-“মিস্টার ইশতিয়াক, পেশেন্ট আপনার সাথে দেখা করতে চান। ভেতরে আসুন।”
ইশতিয়াকের চলন্ত পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেল! সীমা,সীমা তার সাথে দেখা করতে চায়?বিলকিস বানু আর বাঁধ দিলেন না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ সেখান থেকে সরে গেলেন। ইশতিয়াকের বুকের ভেতরটায় হঠাৎ এক অজানা আনন্দের রেখা ফুটে উঠল। সে দ্রুত কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল।কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটা দেখে ইশতিয়াকের আত্মাটা যেন মুহূর্তেই ধড়ফড় করে কেঁপে উঠল! ধবধবে সাদা হাসপাতালের বেডে চুপচাপ একদম সোজা হয়ে শুয়ে আছে সীমা ফ্যাকাশে, নিস্তেজ। চোখ দুটো বন্ধ।ইশতিয়াক কাঁপাকাঁপা পায়ে ধীরগতিতে এগিয়ে এসে সীমার বিছানার পাশে বসল। দুজনকে একা কথা বলার সুযোগ করে দিতে কেবিনে থাকা সীমার মা, ইসরাত আর নার্স নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। ইশতিয়াক বুকের ভেতরের সবটুকু অপরাধবোধ আর আকুলতা এক করে অনেক কষ্টে জমানো ডাক দিল,
—-“সীমা…”
ডাকটা কানে পৌঁছাতেই খুব ধীরে ধীরে অক্ষিপট মেলল সীমা। তার ফ্যাকাশে, শুকনো নিথর মুখটা ঘুরিয়ে শান্ত চোখে চাইল ইশতিয়াকের মুখ পানে।কিছুক্ষণের ভারী নীরবতা ছেয়ে রইল পুরো কেবিনজুড়ে। তারপর নিজের শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো কসরত করে নাড়িয়ে খুব ধীরকণ্ঠে সীমা বলল,
—-“ইশতিয়াক, আপনার কাছে কি একটু সময় হবে? কিছু কথা ছিল…”
ইশতিয়াক বুকের ভেতরের অপরাধবোধ সামলে ব্যাকুল হয়ে বলল,
—-“এভাবে বলছো কেন সীমা?”
সীমা একদম শান্ত, ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে বলল,
—-“আপনার মূল্যবান সময় আমার জন্য ফালতু নষ্ট হোক, আমি আর তা চাই না। আসল কথায় আসি আমি একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ইশতিয়াক বুকটা ধড়ফড় করে উঠতেই শুধাল,
—-“কিসের সিদ্ধান্ত?”
সীমা এক মুহূর্তের জন্য থামল। দুর্বল বুকে একটা গভীর নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে আবার বলল,
—-“আমি আর আপনার ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আপনাকে চিরতরে মুক্তি দিতে চাই…”
কথাটা বলে একটু থেমে সীমা আবারও চোখ দুটো শক্ত করে বলল,
—-“আমি ডিভোর্স চাই।”
শব্দটা ইশতিয়াকের কানে পৌঁছানোমাত্রই মনে হলো কে যেন একটা বিষাক্ত ধারালো ছুরি সোজা তার বুকের ভেতর আমূল গেঁথে দিল! বুকের বাঁ পাশে এক অসহ্য, তীব্র চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে গেল তার। মাথাটা ফাঁকা হয়ে আসছে, মুখ থেকে একটা বাক্যও বের করতে পারল না সে।
ইশতিয়াককে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখে সীমা আবার নিচু কণ্ঠে বলল,
—-“আমি আজই হাসপাতাল থেকে নিজের বাড়িতে চলে যাব। সময়মতো ডিভোর্স পেপার আপনার কাছে পৌঁছে যাবে আপনাকে চিরদিনের জন্য মুক্ত করে দিলাম। আর কখনো এই অলক্ষ্মী চেহারাটা নিয়ে আমি আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়াব না, আই প্রমিস!”
সজোরে নিজের দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল ইশতিয়াক। তার বুকের ভেতরে যেন প্রলয়ংকরী এক ঝড়ের তাণ্ডব চলছে! মন চিৎকার করে বলতে চাইছে ‘না সীমা! আমি কোনো মুক্তি চাই না! আমি তোমাকেই চাই দয়া করে আমাকে ছেড়ে যেও না,আরেকটাবার আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দাও!
কিন্তু নিজের অতীত অপরাধের ভার এতটাই ভারী ছিল যে, মনের ব্যাকুল কথাটা আর কোনোভাবেই মুখ ফুটে বলতে পারল না সে। বিষাদ আর অনুশোচনায় মনের আকুতি মনেই ধাপা পড়ে রইল।ইশতিয়াকের এমন নিথর, নিশ্চুপ নীরবতা দেখে সীমা মনে মনে ভাবল ইশতিয়াক হয়তো খবরটা শুনে ভেতরে ভেতরে খুব খুশিই হয়েছে! চিন্তাটুকু মাথায় আসতেই সীমার বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমানো পানিগুলো উপচে আসতে চাইল, কিন্তু বহু কষ্টে সেগুলোকে আটকে রেখে শুকনো মুখে বলল,
—-“আমার শুধু এইটুকু বলারই ছিল। এখন আপনি চলে যেতে পারেন”
চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল ইশতিয়াক। বুকের ভেতরের অবরুদ্ধ হাহাকার সামলে কী ভেবে যেন ম্লান কণ্ঠে বলে উঠল,
—-“তুমি কি সত্যিই আমার মুক্তি চাইছ, নাকি নিজের মুক্তি নিচ্ছ সীমা?”
কথাটা শোনামাত্রই সীমার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় তাচ্ছিল্যের হাসি। হাসতে হাসতেই নিজের অস্ফুট স্বরে আওড়াল সে,
—-“নিজের মুক্তি নেওয়ার হলে অনেক আগেই নিয়ে নিতাম, ইশতিয়াক।”
ইশতিয়াক ব্যাকুল চোখে চেয়ে শুধাল,
—-“তাহলে আজ হঠাৎ কেন নিচ্ছ?”
সীমা একদম স্থির চোখে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
—-“আমি তো নিচ্ছি না দিচ্ছি।”
ইশতিয়াক নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, অধীর হয়ে বকে উঠল,
—-“কিন্তু আমার কোনো মুক্তি চাই না সীমা, আমি—”
পুরো কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ তীব্র কাশি উঠে গেল সীমার! কাশতে কাশতে বুক ধড়ফড় করে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে লাগল মেয়েটা। কাশির শব্দ বাইরে যেতেই দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ছুটে এলেন নার্স।ইশতিয়াক তীব্র আতঙ্কে সীমার মাথার কাছে গিয়ে চুলের ওপর আলতো হাত বুলিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলতে লাগল,
—-“সীমা! সীমা, ঠিক আছ তুমি? শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”
সীমা কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে, ইশতিয়াকের হাতটা এড়িয়ে ছিটকে সরে গিয়ে বলল,
—-“আমি আমি ঠিক আছি। আপনি এখন চলে যেতে পারেন এখান থেকে!”
—-“সীমা”
—-“দোহাই লাগে আপনার, চলে যান এখান থেকে! আর একটা মুহূর্তও দাঁড়াবেন না প্লিজ!”
নার্স দ্রুত সীমার পালস পরীক্ষা করে আর অক্সিজেন লেভেল দেখে চিন্তিত মুখে ইশতিয়াকের দিকে ফিরে তাকালেন। বেশ তাগিদ দিয়ে বললেন,
—-“মিস্টার ইশতিয়াক, আপনি দয়া করে এখন বাইরে যান! পেশেন্ট আপনাকে দেখে প্রচণ্ড প্যানিক করছেন, এত প্রেসার উনি সহ্য করতে পারছেন না।”
কথাটা শোনামাত্রই ইশতিয়াক তীব্র অবাক হয়ে সীমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তাকে দেখে মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে? তাকে দেখে মেয়েটা ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে?কিন্তু কেন?পরক্ষণেই সীমার শারীরিক অবনতির কথা ভেবে ইশতিয়াক আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের মনের সমস্ত উন্মাদনা আর হাহাকার দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিয়ে ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।


আধমরা হয়ে গত সাতদিন ধরে রূপাকে উন্মাদের মতো খুঁজে চলেছে বাঁধন। বাংলাদেশের এমন কোনো কোণা নেই যেখানে সে খোঁজ নেয়নি প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি জেলা চষে বেড়াচ্ছে সে। কিন্তু রূপাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, যেন হুট করেই দেশটা থেকে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে মেয়েটা!রজনী রহমানকে ইতোমধ্যে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, জাঁতাল রিমান্ড আর চাপের মুখেও রাখা হয়েছে তাকে, কিন্তু তার মুখে একই টেপ রেকর্ডার বাজছে সে নাকি কিছুই জানে না!রূপার এই আচমকা নিখোঁজ হওয়া নিয়ে বাঁধনের বুকের ভেতর প্রতি সেকেন্ডে ক্ষরণ হয়ে চলেছে। শান্তিতে একফোঁটা নিশ্বাস নেওয়ার মতো সামর্থ্যও আর অবশিষ্ট নেই তার। দীর্ঘ সাতটা দিন ধরে সে তার রূপকে দেখে না, তার সেই ঝরঝরে হাসি কিংবা খুদে খুদে অভিমানগুলো দেখে না! আর কতদিন এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সইবে সে? কিন্তু এখন ভেঙে পড়লে তো আর চলবে না, রূপকে ফিরিয়ে আনতে হলে তাকেই যে শক্ত হয়ে লড়তে হবে! জীবন বাজি রেখে হলেও সে তার রূপকে খুঁজে বের করবেই।

অন্য দিকে, আহসান রহমান এই কদিনে বাঁধনের সাথে বহুবার দেখা করার চেষ্টা করেছেন, ক্ষমা চাইতে চেয়েছেন… কিন্তু বাঁধন দেখা তো দূর, তার ছায়াও মাড়ায়নি। বাঁধনের এই চরম অবহেলায় আর বুকের জমে থাকা পস্তাভে আহসান রহমান একদম ভেঙে পড়েছেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তার ছেলের ইগো কতটা বিশাল আর জেদ কতটা ভয়াবহ।

সকাল সকাল রহমান ভিলার আবহাওয়ায় এক থমথমে নীরবতা। চারদিক যেন এক অশুভ নিস্তব্ধতায় থমকে আছে।
ড্রয়িংরুমে একদম নিথর হয়ে বসে আছেন হাজি রহমান, আহসান রহমান আর আতিক রহমান। ভঙ্গুর আহসান রহমানকে সান্ত্বনা দিয়ে আতিক রহমান ধীরকণ্ঠে বললেন,
—-“দাদা, তুমি মনকে বোঝাও! শান্ত হও বাঁধনের মানসিক অবস্থা এখন একদমই ভালো না, তাই ছেলেটা হয়তো এমন করছে। রূপকে হারিয়ে বাচ্চাটার কী দশা হয়েছে, দেখেছ তো?”
ঠিক তখনই বাড়ির মূল দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন বৃষ্টির বাবা হায়দার শেখ আর সাথে বৃষ্টি। হায়দার শেখ সবার সাথে কুশল বিনিময় করলেন। বৃষ্টিও নিচু কণ্ঠে সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল।তার কিছুক্ষণ পরেই ধীরপায়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো আকাশ।আকাশকে অতটা সামনে দেখা মাত্রই বৃষ্টির বুকের ভেতরটা ধক করে কেঁপে উঠল! মুহূর্তের মধ্যে ভীতি আর অজানা অনুভূতিতে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে মাথা নিচু করে ফেলল মেয়েটা।
আকাশ বৃষ্টির বাবা হায়দার শেখকে দেখে হালকা হেসে বলল,
—-“আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল! আজ এত সকালে আমাদের বাড়ি কোনো সুখবর আছে নাকি?”
হায়দার শেখও হেসে জবাব দিলেন,
—-“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আরে না বাবা, তেমন কিছু না৷ বসো।”
আকাশ ধীরপায়ে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল। হায়দার শেখ এবার উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,
—-“যাই হোক, আসল কথাটা বলি যার জন্য আজ এখানে আসা। আপনারা তো সবাই জানেন, আমার এই একটা মাত্র মাতৃহীন মেয়ে ছোটবেলা থেকে কত কষ্ট করে ওকে বড় করেছি। ওকে নিয়ে আমার তো অনেক স্বপ্ন! তাই আমি একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি বৃষ্টিকে নিয়ে আমি কানাডা চলে যাব। ওখানেই ওকে ভালো কোনো ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দেব। আমার সব আয়োজন করাই ছিল, পাসপোর্ট আর ভিসাও অনেক আগেই করা আছে। বিমানের টিকিটও কেটে ফেলেছি কাল সন্ধ্যা ছয়টায় আমাদের ফ্লাইট।”
কথাটা শোনামাত্রই এক নিমিষে আকাশের মুখের হাসিটা নিভে একবারে মিলিয়ে গেল! বুকের ভেতরটা যেন ভয়ঙ্কর এক যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল, নিশ্বাস নিতে গিয়ে মনে হলো বাতাস আটকে আসছে।সে চমকে উঠে দৃষ্টি তুলে তাকাল বৃষ্টির দিকে। কিন্তু মেয়েটা একদম নিশ্চুপ, পাথর হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।হাজি রহমান একটা আফসোসের নিশ্বাস ফেলে বললেন,
—-“মেয়েটাকে একদম বিদেশে নিয়ে চলে যাবে? খুব মিস করব রে বাবা ও তো আমাদের এই বাড়ির মেয়ের মতোই ছিল।”
হায়দার শেখ বললেন,
—-“কী করব বলুন, ওর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমাকে এই সিদ্ধান্তটা নিতে হলো।”
বলেই তিনি আকাশের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন,
—-“আকাশ বাবা, ওদের তো এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট এখনো দেয়নি। যখন রেজাল্ট আউট হবে, আমাকে একটু জানিও আমি এসে ওর রেজাল্ট শিট নিয়ে যাব।”
আকাশের গলা দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। সে অতি কষ্টে শুধু একবার ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ল।হায়দার শেখ আবার সবার সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আকাশ আর সেখানে এক মুহূর্তও বসে থাকতে পারল না! ড্রয়িংরুমের বাতাসটা তার কাছে হঠাৎ ভীষণ ভারী ঠেকছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। সে বসা থেকে উঠে সোজা বাইরে বেরিয়ে এলো।উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল আকাশ বুক চিরে যেন বিষাক্ত এক হাহাকার গুমরে উঠছে!বৃষ্টি বিদেশ চলে যাচ্ছে চিন্তাটা মাথার ভেতর আসতেই আকাশের শক্ত মনটাও বারবার কেমন যেন ভেঙে দুর্বল হয়ে পড়ছে।ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মৃদু, পরিচিত মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো আকাশের কানে,
—-“স্যার”
বৃষ্টির ওই ডাকটা শুনে প্রথমবারের মতো আকাশ এত বড় একজন পুরুষ মানুষ হয়েও ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। সে নিজের মনের ঝড় গোপন করে খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে ঘুরে বৃষ্টির দিকে তাকাল। থমথমে গলায় বলল,
—-“হ্যাঁ বৃষ্টি, কিছু বলবে?”
কথাটা শুনে অভিমানের এক চিলতে মেঘ জমে উঠল বৃষ্টির থমথমে মুখে। মেয়েটা মনে মনে কিঞ্চিৎ ওষ্ঠ ফুলাল। সে কালকে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আর এই লোকটা এখনও সেই একই রকম রাশভারী এটিটিউড দেখিয়ে যাচ্ছে!কিছুক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর নিজের কণ্ঠ সামলে নিয়ে বৃষ্টি বলল,
—-“স্যার রূপার তো এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর এমন একটা চরম পরিস্থিতিতেও বাবা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ ছিল রূপার কোনো খোঁজ পেলেই আপনি বাবার নম্বরে ফোন করে আমাকে একটু জানাবেন? প্লিজ স্যার, আমার এই অনুরোধটুকু রাখবেন”
মেয়েটার করুন, নিষ্পাপ মুখের দিকে থমকে গিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল আকাশ। ভেতর থেকে একটা তীব্র আকুতি দুমড়ে-মুচড়ে উঠে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। বলতে ইচ্ছে করছে, ‘বৃষ্টি, যেয়ো না! তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও যেয়ো না!’কিন্তু নিজের দ্বিধা আর সাহসের অভাবে কথাটা মুখ থেকে ফুটল না। বিষাদে ভরা চোখে নিঃশব্দে তাকিয়ে আস্তে করে শুধু বলল,
—-“আচ্ছা।”
ভেতরে খুব কষ্ট পাচ্ছে বৃষ্টি। মনটা হু হু করে উঠছে তার লোকটা একবারও আটকালো না? এতটাও পাথর মানুষটা?
বৃষ্টির সেই ভাবনার মাঝেই হুট করে আকাশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
—-“আর কিছু বলবে?”
বুকের গভীর থেকে একরাশ বিষাদ মেশানো নিশ্বাস টেনে নিল বৃষ্টি। তারপর ওষ্ঠ কামড়ে বলল,
—-“না স্যার আজকেই হয়তো আপনার সাথে আমার শেষ দেখা। ভালো থাকবেন স্যার। এতদিন আপনাকে অনেক জ্বালিয়েছি, অনেক মেজাজ খারাপ করিয়েছি সেগুলোর জন্য মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আর হ্যাঁ, আমি যখন বহুদিন পর দেশে ফিরব, তখন বোধহয় আমি ফুপি হয়ে যাব!”
ভ্রু দুটি কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল আকাশ,
—-“মানে?”
বৃষ্টি হালকা এক চিলতে ফিচেল হাসি হেসে বলল,
—-“না মানে স্যার, আমি তো অনেকদিন পর দেশে আসবো! এতদিন কি আপনি আর সিঙ্গেল থাকবেন? নিশ্চিত আপনার বিয়ে হয়ে যাবে, সংসার হয়ে যাবে এমনকি বাচ্চার বাবাও হয়ে যাবেন! তো আপনার বাচ্চা হলে আমি সম্পর্কে তো ফুপিই হব, তাই না?”
কথাটা শোনামাত্রই আকাশের দু হাত রাগে-ক্ষোভে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো! চোখ দুটো জ্বলে উঠল তার। এই মেয়ে মুখে কী ছাইপাশ বলছে এসব! যেই মেয়েটাকে সে সারাজীবনের জন্য নিজের বাচ্চার আম্মু বানাতে চায়, আর সেই মেয়ে কিনা সেধে সেধে তার বাচ্চার ‘ফুপি’ হতে চাইছে?!আকাশের তীব্র ইচ্ছে করছে বৃষ্টিকে টেনে এনে দুটো কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিতে! কিন্তু এখন আর সেই মুড বা সাহস কোনোটাই তার নেই। সে বহু কষ্টে ভেতরের রাগ আর উথালপাথাল কষ্টটা চেপে রেখে মেইন গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—-“আচ্ছা ঠিক আছে, এখন ভেতরে যাও। আর হ্যাঁ, একদম চিন্তা কোরো না তোমাকে ফুপিই বানাব আমি!”
একরাশ তীব্র অভিমানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল বৃষ্টি। লোকটা এত নিষ্ঠুর কেন? একটা মেয়ে চিরদিনের জন্য দূরে চলে যাচ্ছে, অথচ একবারের জন্যও কি মুখ ফুটে বলতে পারল না। বৃষ্টি, যেয়ো না তুমি আমার কাছে থেকে যাও’?

বৃষ্টি মনে মনে শক্ত প্রতিজ্ঞা করে ফেলল এই জীবনে সে আর কখনো এই পাষাণ লোকটার সাথে ভুলেও কথা বলবে না! এই লোকটার সাথে আজ থেকে মহা আড়ি!

অবশেষে পরের দিন সন্ধ্যা ছয়টায় হায়দার শেখ বৃষ্টিকে নিয়ে কানাডার উদ্দেশ্যে উড়াল দিলেন। বৃষ্টি চলে গেল বহু বহুদূরে, কিন্তু যাওয়ার আগে আকাশ নামের রাশভারী পুরুষটিকে একদম উন্মাদ বানিয়ে দিয়ে গেল। নিষ্পাপ মেয়েটা টেরও পেল না, ওই লোকটার খোলসের ভেতরে তার জন্য কতটা উগ্র আর গভীর ভালোবাসা জমাদাতা ছিল। আকাশও তার চোখের ব্যাকুল ভাষা পড়ে বুঝতে পারল না, অথচ তার যে কত ইচ্ছে ছিল হাতটা ধরে বলতে—’থেকে যাও না আমার আকাশে!’
অন্য দিকে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই সীমা চলে গেছে তাদের গ্রামের বাড়িতে। আর এদিকে ইশতিয়াকের জীবনটা নরকতুল্য হয়ে উঠেছে। ঘরে তার মন টেকে না, বাইরে গেলেও বুক ফেটে যায় সবকিছুতেই যেন এক অসহ্য দমবন্ধ করা অনুভূতি। সারাক্ষণ শুধু ইচ্ছে করে ছন্নছড়ার মতো ছুটে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে, সীমাকে টেনে এনে নিজের বুকের শক্ত খাঁচায় জড়িয়ে ধরে বলতে,আমি মুক্তি চাই না।আমি তোমাকে চাই।
তবে সবচেয়ে করুণ দশা এখন বাঁধনের। রূপা নামের মেয়েটাকে হারিয়ে বাঁধন নামের ছেলেটা যেন জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়েছে! তার চেহারার দিকে এখন আর তাকানো যায় না। দুটি চোখ টকটকে জবা ফুলের মতো লাল, বহুদিনের নির্ঘুম ক্লান্তি আর কান্নায় চোখের কোল ফোলা। খাওয়া-দাওয়ার নামগন্ধ নেই, শুকনো মলিন মুখ আর এলেমেলো চুল। অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর, জেইনরা ওকে সারাক্ষণ আগলে রাখছে, শত সান্ত্বনা আর ভরসা দিচ্ছে, কিন্তু বাঁধন যেন ভেতরে ভেতরে তিলে তিলে হেরে যাচ্ছে।
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও দু-দুটো দিন। কিন্তু বাঁধনের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হলো না।আজ দুপুরবেলা বাঁধন তার সিক্রেট কন্ট্রোল রুমেই বসে ছিল। হঠাৎ তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল একটা অপরিচিত বিদেশি নম্বর থেকে কল আসছে! বাঁধন শুকনো চোখে ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল।
—-“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত উত্তেজিত আর হাঁপাতে হাঁপাতে বৃষ্টির কণ্ঠ ভেসে এলো,
—-“ভাইয়া আমি বৃষ্টি বলছি!”
বাঁধন সোজা হয়ে বসে নিচু গলায় বলল,
—-“হ্যাঁ বৃষ্টি, বলো?”
বৃষ্টি ওপাশ থেকে ব্যাকুল হয়ে দ্রুত বলতে লাগল,
—-“স্যার, রূপাকে বাংলাদেশে খুঁজে আর কোনো লাভ নেই! কারণ রূপা এই মুহূর্তে কানাডায় আছে! আমি মাত্রই নিজের চোখে ওকে দেখলাম কালো পোশাক পরা একদল বন্দুকধারী লোক ওকে সাথে করে নিয়ে একটা গাড়িতে তুলল! আমি রূপার কাছে ছুটে গিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার পৌঁছানোর আগেই গাড়িটা স্পিডে চলে গেল স্যার!”
ঝাঁকুনি দিয়ে বাঁধনের পুরো শরীর মুহূর্তের মধ্যে থরথর করে কেঁপে উঠে পাথর হয়ে শক্ত হয়ে গেল! রগগুলো ফুলে উঠল কপালে। তার মানে রূপাকে অনেক আগেই বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে কানাডায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে! আর সেই কারণেই সে টানা এতগুলো দিন ধরে এই দেশের আনাচে-কানাচে উন্মাদের মতো খুঁজেও তার রূপের কোনো হদিস পাচ্ছিল না!বাঁধন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ঝোড়ো হাওয়াকে কোনোমতে একপাশে চেপে নিজেকে শক্ত করল। থমথমে গলায় শুধাল,
—-“বৃষ্টি, আর ইউ শিউর?”
ওপাশ থেকে বৃষ্টি শক্ত কণ্ঠে দ্রুত জবাব দিল,
—-“হ্যাঁ ভাইয়া! আমি একশো পার্সেন্ট শিউর! আমি নিজের চোখে রূপাকে দেখেছি ওটা আমাদের রূপাই ছিল!”
বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—-“ওকে বৃষ্টি, থ্যাংক ইউ সো মাচ!”
কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিল সে।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যান্সি বাঁধনের এমন থমথমে রূঢ় রূপ দেখে আতঙ্কিত হয়ে শুধাল,
—-“কী হয়েছে বাঁধন? সব ঠিক আছে তো? কে ফোন করেছিল?”
বাঁধন ঘরের সবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে হিমশীতল কণ্ঠে বলল,
—-“রূপা কানাডায়।”
কথাটা শোনামাত্রই অ্যান্সির চোখ দুটো যেন ছিটকে বাইরে আসার উপক্রম হলো!
—-“হোয়াট?!”
—-“হ্যাঁ, ওকে কিডন্যাপ করে কানাডায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কানাডায় এইমাত্র বৃষ্টি নিজের চোখে ওকে দেখেছে।”
নিক্সি দ্রুত এগিয়ে এসে চিন্তিত মুখে বলল,
—-“এখন কী করবি তুই?”
বাঁধনের চোখের আগুন যেন এক নিমিষে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। শক্ত চোয়ালে সে বলল,
—-“আমাকে কানাডায় যেতে হবে!”
বলেই সে অখিলের দিকে ঘুরে কঠোর গলায় নির্দেশ দিল,
—-“অখিল, আমার পাসপোর্ট-ভিসার ব্যবস্থা কর! এমার্জেন্সি টিকেটের ব্যবস্থা কর!”
সব শুনে অখিল খানিকটা ইতস্তত করে শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল,
—-“কিন্তু বাঁধন, তুই কি হুট করে কানাডায় গিয়ে কিছু করতে পারবি? এই দেশের আইন আর ওই দেশের আইন কিন্তু এক নয় ভাই! ওখানে গিয়ে তুই চাইলেই হুট করে তোর পাওয়ার বা ক্ষমতা দেখাতে পারবি না। যদি কিছু করতে যাস, তবে কানাডার মাফিয়া আর আইন দুটোই তোকে ঘিরে ফেলবে আরও বড় ডেঞ্জারাস ঝামেলায় পড়ে যাবি তুই!”
অখিলের কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন রক্তচক্ষু নিয়ে দুই হাতে কাঠের টেবিলটা সজোরে খামচে ধরে গর্জে উঠল,
—-“তোকে আমি যা করতে বলেছি, একদম তা-ই কর অখিল! আমার রূপাকে ফিরে পেতে আর বাঁচাতে হলে আমি যেকোনো রুট বা যেকোনো পদ বেছে নিতে রাজি আই ডোন্ট কেয়ার!”
অখিল আর এক মুহূর্তও কথা বাড়াল না, দ্রুত গতিতে সব পাসপোর্ট-ভিসা আর জরুরি এয়ার টিকিটের ব্যবস্থা করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বাঁধন অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইনকে সাথে নিয়ে সোজা ডিআইজি অফিসের দিকে রওনা দিল।ডিআইজি আলতাফ মাহবুবের কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বাঁধন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—-“আসব স্যার?”
ভেতর থেকে আলতাফ মাহবুব কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে তাকালেন। বাঁধনকে দেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,
—-“হ্যাঁ বাঁধন, ভেতরে আসো।”
বাঁধন ধীরপায়ে ঘরে ঢুকে আলতাফ মাহবুবের সামনে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকল। তারপর দুই হাত পেছনে রেখে একদম শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল,
—-“আসসালামু আলাইকুম স্যার। আপনার সাথে জরুরী কিছু কথা ছিল।”
আলতাফ মাহবুব কুশল বিনিময় করে চশমাটা ঠিক করে বললেন,
—-“ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ বলো, কী কথা?”
বাঁধন এক মুহূর্ত নীরব থেকে স্পষ্ট গলায় বলল,
—-“স্যার, আমার স্ত্রী অর্থাৎ রূপার খোঁজ পাওয়া গেছে!”
ডিআইজি আলতাফ মাহবুব আগেই বাঁধন আর রূপার বিয়ের খবর জানতেন, বাঁধন নিজেই তাকে সব বিস্তারিত বলেছিল। এতদিন পর রূপার খোঁজ পাওয়া গেছে শুনে আলতাফ মাহবুব নিমেষেই বসা থেকে সোজা উঠে দাঁড়ালেন! বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললেন,
—-“কোথায় রূপা? এখন বর্তমানে ও কোথায় আছে?”
বাঁধন সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিষাদময় কিন্তু স্থির গলায় জবাব দিল,
—-“স্যার রূপা এখন কানাডায়!”
আলতাফ মাহবুব চমকে উঠে বললেন,
—-” হোয়াট?”
বাঁধন চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিল,
—-” হ্যাঁ স্যার!”
আলতাফ মাহবুব কিছুটা চিন্তিত মুখে বললেন,
—-” বিষয়টা তো খুব জটিল দেখা যাচ্ছে!”
বাঁধন আর কোনো ইতস্তত না করে সরাসরি বলল,
—-” স্যার, আমি কানাডায় যেতে চাই।”
আলতাফ মাহবুব বাধা দেওয়ার সুরে বললেন,
—-” কিন্তু বাঁধন, এই দেশের আইন আর ওই দেশের আইন এক নয়! তুমি চাইলেই সেখানে গিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখাতে পারবে না। তা ছাড়া ওইটা সম্পূর্ণ একটা অপরিচিত দেশ, ওখানে গিয়ে এভাবে লড়াই করা আমাদের পক্ষে মোটেও সহজ হবে না।”
বাঁধনের চোয়াল আরও কঠিন ও শক্ত হয়ে এলো। সে স্থির ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—-” আমি এত কিছু জানি না স্যার! আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য আমি সব কিছুই করতে পারব, প্রয়োজনে পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে পারি!”
আলতাফ মাহবুব গাম্ভীর্য নিয়ে নিজের চেয়ারে বসলেন। চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দুই হাতের আঙুল টেবিলে বুনে আবারও বাঁধনকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,
—-” বাঁধন, তুমি আগে শান্ত হও। এতটা উত্তেজিত হলে কিন্তু কোনো সমাধান বের হবে না। আমরা কোনো অনিয়ন্ত্রিত গ্যাংস্টার নই যে পৃথিবীর কোনো আইনকানুনই মানব না! আমরা দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা, সরকার আমাদের যা নির্দেশ দেবে, আমাদের সেটাই মেনে চলতে হবে।”
বাঁধন তার তীক্ষ্ণ ও রক্তিম দৃষ্টি আলতাফ মাহবুবের দিকে নিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—-” তাহলে আপনি কি বলতে চাইছেন স্যার, আমি কানাডায় যেতে পারব না?”
একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে পেছনে হেলান দিলেন আলতাফ মাহবুব,
—-” দেখো বাঁধন, বাস্তব কথাটা বোঝার চেষ্টা করো। এই দেশের আইন আর ওই দেশের আইন পুরোপুরি আলাদা। তুমি বাংলাদেশ পুলিশের একজন দায়িত্বশীল এসপি! একজন এসপি হয়ে বিদেশে গিয়ে যদি তুমি এমন কোনো কদম নাও যা আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি করে, তাহলে সেটা কিন্তু আর তোমার স্রেফ ব্যক্তিগত বিষয় থাকবে না এটা তখন সরাসরি সরকারি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আর এর পরিণতিতে তোমার এই উজ্জ্বল চাকরিটাও চলে যেতে পারে!”
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চরম আক্রোশে আর রাগে কাঠের টেবিলটা সজোরে খামচে ধরল বাঁধন! রাগে তার কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট টানটান হয়ে উঠল, হাতের রগগুলো ফুলে উঠল। তার বুকের ভেতর নিঃশ্বাস ভারী থেকে আরও ভারী হয়ে আসতে লাগল, আর দুটো লাল চোখ স্থির হয়ে রইল আলতাফ মাহবুবের থমথমে মুখের ওপর!
দাঁতে দাঁত চেপে, চরম হিসহিসে কিন্তু অটল কণ্ঠে সে বলে উঠল,
—-” আমার পুরো পৃথিবী আজ ওই দেশে বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে স্যার! আমার শ্বাস, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ওই দেশে চরম বিপদের মধ্যে আঁটকে আছে। আর আমি কিনা সামান্য এই একটা চাকরির ভয়ে সেখানে যেতে পারব না?”
এক মুহূর্ত থেমে বাঁধন বুক চিরে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। তারপর পুরো ঘর কাঁপিয়ে বজ্রকণ্ঠে চরম ঘোষণাটি দিয়ে দিল,
—-” ওকে ফাইন! করবো না আমি এই চাকরি! আমি জাওয়াদ অধীর বাঁধন সোজা নিজ থেকে এই মুহূর্তেই বাংলাদেশ পুলিশের এসপি পদ থেকে পদত্যাগ করছি!”
চলবে…!
দিয়ে দিলাম সারপ্রাইজ পর্ব এখন তোমাদের কাজ চুরি করে না পড়ে সবাই রিয়েক্ট দিয়ে ৬k রিয়েক্ট বানিয়ে দাও, যদি 6K রিয়েক্ট না উঠে তাহলে সত্যি গল্প কবে আসবে আমি নিজেও জানে না,রিয়েক্ট যতটুক উঠে আমি দেখি পরবর্তী পর্বে যদি রিয়েক্ট না উঠে তাহলে লিখতে ইচ্ছে করে না। See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply