.বজ্রমেঘ পর্ব ৩৩
ফাবিয়াহ্_মমো .
ছটফট করে কাটানো রাত, চোখজুড়ে নির্ঘুম চিহ্ন, ফোনের প্রতি উদ্বেলিত দৃষ্টি সবকিছু যেন নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছিল। বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওর হৃদয়কোণে জায়গা করে নিয়েছে সেই নিভৃত দস্যু। যার প্রভাব ও কীর্তিকলাপ আজও ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। একটু আগেই শাওলিন খবর পেয়েছে আজ ঘরভর্তি মেহমান আসবে। সকলেই মুখে মুখে শোনা মির্জা বাড়ির সদস্য। কাউকে সেভাবে চেনে না ও, কখনো আগ বাড়িয়ে জানার চেষ্টাও করেনি। ফাতিমা নাজ ভীষণ খুশি মুখে সংবাদটা দিলেন খাবার টেবিলে। তখন গরম পরোটার পাশে পাঁচমিশেলি সবজি বেড়ে দিচ্ছে রোকেয়া। খবরটা শুনেই মুখে অমাবস্যার রঙ ধারণ করল। তাহিয়া সহ অধরা যখন বেজায় খুশিতে উৎফুল্ল, তখন একদিকে শোয়েবের শূন্য চেয়ারে বসা শাওলিন পরোটা ছিঁড়ছিল। ফাতিমা নাজ ওর প্লেটে আরেকটি ফুলকো পরোটা তুলে দিয়ে বললেন,
- শাওলিন, রাতের দিকে একটু ভালোভাবে প্রস্তুত হয়ো। যারা বাড়িতে আসছে তারা তোমাকে দিয়ে তোমার স্বামীর পছন্দকে চিন্তা করবে। আমি কথাগুলো ছোটো করতে বলছি না। কিন্তু কিছু কারণবশত ব্যাপারে এটাও চাচ্ছি না ফারশাদের কিছু নিয়ে খুঁত, প্রশ্ন, কথা ওঠানো থাকুক।
বাড়তি পরোটা দেখে আঁতকে উঠতে যাচ্ছিল শাওলিন। সঙ্গে সঙ্গে হাতের পরোটাটা রেখে চাপা নাকোচের সুরে বলে উঠল,
- আমি দরকার পড়লে তুলে নেব দাদী। আপনি এতোগুলো পরোটা দিবেন না। খাবারটা নষ্ট হবে।
চোখে চাপা আকুতি নিয়ে তাহিয়ার দিকে একবার পরক্ষণে ফাতিমার দিকে একবার তাকায় শাওলিন। ওর চোখদুটোতেই যেন সবটুকু দ্বিমত বুঝিয়ে পরোটাটা তুলে দিল। ব্যাপারটা দেখে হালকা মশকারা করে বসলো অধরা। ভ্রুঁ দুটো কপালে নাচাতে নাচাতে বলল,
- স্বামীর অন্নধ্বংস করতে চাও না বিবি শাওলিন? তোমার দেখছি না খাওয়ার স্বভাব! খাবার নিয়ে কেউ গড়িমসি করে?
শাওলিন ব্যাপারটাতে প্রচণ্ড বিরক্ত অনুভব করলেও মুখে কিছু বলল না। চুপচাপ পানির গ্লাসটা টেনে এক ঢোক খেয়ে শান্ত গলায় বলল,
- বিষয়টা সেরকম কিছু নয়। আমি সবসময় যেভাবে খেয়ে এসেছি, এখানেও তাই করা। দরকার হলে নিব, কিন্তু নিয়ে রেখে পরে না খেতে পারলে এটা নষ্ট হবে। তার চেয়ে ভালো তোলা থাকুক।
অধরার কথাকে খণ্ড খণ্ড করতে রণে যুক্ত হয় তাহিয়া। সদ্য বিয়ে করা মেয়েটাকে সে চেনে ভালোভাবেই। মুখে ও মনে এক বাক্য। তাহিয়া অধরাকে কটাক্ষ চাহনি হেনে বলল,
- তুমি বিয়ের সময় কী ছিলে শুনি? পুরোই একটা শুটকি ছিলে। ফুঁ দিয়ে বাতাসের মতো উড়ে যেতে। এখন এসেছ ভ্রুঁ নাচিয়ে অন্যকে বুঝজ্ঞান দিতে।
অধরা কথাটাকে হাসতে হাসতে অন্যদিকে নিল। সামনে যে দাদী বসা, একজন প্রবীণ বৃদ্ধা, সেদিকে একচুল ভ্রুঁক্ষেপ না করে পৈশাচিক হাসিতে ডান চোখ টিপ মেরে বলল,
- চুয়াল্লিশ কেজিকে কীভাবে চুয়ান্ন করা লাগে এই হিসাব দেবর সাহেব ঠিকই জানে। খালি . . হি হি . .
অধরার কথায় মুখ লাল হয়ে যায় শাওলিনের। পলকে নিজের গলায় আঁটকে পড়ে খাবার। চিবানো পরোটা যেন কাশি তুলে দিচ্ছে। দ্রুত পানির গ্লাসটা খপ করে নিলে তাহিয়া লবণের বাটির ঢাকনা তুলে এক ঢিল মারল। ভেটকি মাছের মতো হাসতে থাকা অধরা তখন দুহাতে পরোটা ছিঁড়ছে, খেয়াল করেনি ওর দিকে উড়ন্ত ঢাকনা ছুটে আসছিল। সেকেণ্ডের দেরি! অমনেই মাথার চাঁদিতে ঠকাস করে আঘাত হানলো ঢাকনাটা। ‘উ মা গো, ইশ!’ বলে আর্তস্বরে ককিয়ে উঠে অধরা, ঝটিতে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দাদীর দিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকায়। দাদী পুরো নীরব দর্শকের মতো সবটা দেখলে অধরাকেই চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠেন,
- খাবারের সময় মুখটা না চালালে হয় না নাতবউ? তোমার শ্বাশুড়ি কিন্তু এসব কারণেই কথা শোনাতে ছাড় দেয় না। আজকে এলে কী অবস্থা করে দেখে নিয়ো। চুপচাপ খাও! আর একটা কথা বলবে না!
বিমর্ষ মুখে খাবারের গ্রাস মুখে তুলল অধরা। কিন্তু ঠিক তখনি লক্ষ করল, শাওলিনের মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেছে। সবজির ভেতর বিরাট একটা কাঁচা মরিচ। ওটা না সরিয়েই পরোটার টুকরোটা ওর ওপর বসিয়ে দিয়েছে। কী ব্যাপার? কী নিয়ে অতো অন্যমনষ্ক? পরোটার ভেতর মরিচ পুড়ে ফেলল কিন্তু চোখেই দেখল না? অধরা তাড়াতাড়ি ওকে থামাতে হুমড়ি খেয়ে উঠল,
- অ্যাই শাওলিন! কী করছ তুমি? ওভাবে আস্তো মরিচ খাচ্ছ কেন? প্রচণ্ড ঝাল ওগুলো, প্লিজ ফেলে দাও!
চকিতে ভ্রম ভাঙার মতো চমকে ওঠে সামনে তাকায় শাওলিন। মুখোমুখি চেয়ার থেকে অধরার বলা শুনে ত্রস্তহাতে গ্রাসটা প্লেটে ফেলে। অল্প ভাজির সঙ্গে পুরোটাই মরিচ ছিল বলে চোখে-মুখে অপ্রতিভ অবস্থা রেখে বলে,
- আমি খেয়াল করিনি।
বলেই মরিচটা সরিয়ে গ্রাসটা মুখে পুড়ে কিছু অপ্রস্তুত হয় ও। মুখে না বললেও দাদী বুঝতে পারেন মেয়েটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি চোখের ইশারায় সেজো নাতবউকে বিহিত করতে বললে তাহিয়া খাবার চিবোতে চিবোতে মাথা ‘হ্যাঁ’ বোধক করল। নাশতা শেষে সদ্য সেই ঘরটায় ফিরেছিল শাওলিন, এমন সময় খেয়াল করল ওর ফোনটা বাজছে। বিছানা সংলগ্ন টেবিলের ওপর ভাইব্রেট হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রটা। শাওলিন দৌড়ে ফোনটা নিয়ে কলার নামটা দেখে ঠোঁট কুঁকড়াল, পরক্ষণে দ্বিধা-সংকোচ ঝেড়ে কানে এঁটে বলল,
- হ্যালো।
- কী করছ?
চড়া গলায় প্রশ্নটা করল রেবেকা। শাওলিন শান্তভাবে প্রত্যুত্তর জানাল,
- নাশতা করা হলো। আপনি?
- শ্বশুরবাড়িতে কী দিয়ে নাশতা করালো? দ্বিতীয় সকাল তো চলে।
প্রশ্নটা কেমন কটাক্ষপূর্ণ। যেন তাচ্ছিল্য করতেই জোট বেঁধে প্রস্তুত হয়েছে। শাওলিন তখনো নিজেকে ধরে রেখে শান্ত উত্তর দিল,
- পরোটা, পাঁচমিশালি সবজি ভাজি।
- আমি ভাবলাম বড়োলোক বাড়ির নাশতায় আমেরিকান ব্রেকফাস্ট থাকবে। বয়েলড এগ, স্টিমড ভেজিটেবল, বাটার টোস্ট খাবে।
ভ্রুঁ দুটো কুঁচকে এল শাওলিনের। কণ্ঠে তীক্ষ্মভাবে সমালোচনা ফুটিয়ে প্রশ্নটা করল,
- খাবারের সঙ্গে এগুলো কেমন তুলনা?
মুহুর্তের মধ্যে ভোল পালটে স্বাভাবিক হলো রেবেকা। ননদের মতি কোনদিকে এটা বুঝেই যেন কথার আবহাওয়া ঝটিতি বদলে দিল। চতুর ভাবে দুঃখ মেশানো কণ্ঠে বলল,
- যে মেয়েটাকে বুকের মধ্যে রেখে এতোদিন স্নেহ করেছি, সে আমাকে ভুলে গেলেও আমি তো আর তাকে ভুলে যেতে পারি না। ভাগ্যই এরকম, যাকে বেশি কদর করি সে-ই কদরের কদর্য বোঝায়।
ভ্রুঁ দুটো তখনো কুঁকড়ানোই রইল ওর। ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ব্যাপারটুকু। একবার মন বলছে গতকালকের আচরণ নিয়ে উনি অনুতপ্ত, হয়ত কাল শাওলিনের কল না পেয়ে সত্যিই একটু রেগে গেছিলেন, মেজাজ খুঁইয়ে তাই ওভাবে কড়া কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু এখন দোনোমনায় ভুগছে শাওলিন। হয়ত ওর ব্যাপারটা দূর থেকে আঁচ করে রেবেকাও চাতুর্য ফলিয়ে বলল,
- শাওলিন,
বলেই ভারি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন বুকে চাপা কতদিনের রুদ্ধ শ্বাস ত্যাগ করল। অথচ বিয়েটা হয়েছে একদিন পেরোল। রেবেকা আবেগ মেশানো কণ্ঠে পুরোপুরি মন বশ করতে বলল,
- দেখো, আমার জীবনে তুমি ছাড়া কেউ নেই। কেউ ছিলও না। তোমার দাদা যাওয়ার পরে কখনো অন্যকিছুকে প্রাধাণ্য দিইনি। তোমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের আপন মানুষ ভেবেছি। সেই মানুষ এভাবে অভিযোগ করল, আমি নাকি তার দুঃসময়ে কিছু করলাম না। জেঠি যখন তেড়ে ওঠেছিল, আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলাম। এতো বড়ো অপবাদ কীভাবে মেনে নিই বলো? কী এমন করলে তুমি বিশ্বাস করবে আমি সেদিন যা যা করেছি, সবই তোমার মঙ্গলের জন্য। নিজের আত্মসম্মানের দিকে না তাকিয়ে সেই ছেলের সাথেই সবটা বুঝিয়ে দিলাম যে আমাকে দুচোখে সহ্য করে না। আমি সবই বুঝি। কিন্তু মুখে প্রকাশ করি না।
চুপ করে বিপরীত দিকের কথা শুনছিল শাওলিন। কোঁচকানো ভ্রুঁ আরেকটু কোঁচকাতে গিয়ে হঠাৎ সমান করে দিল। যেন ওর মস্তিষ্কে রেবেকার প্রচণ্ড দুঃখ জড়ানো আর্তরব ইনজেক্ট হয়ে গেল। একটু থেমে পরিস্থিতিটা আবারও বুঝে কণ্ঠ ম্লান করে রেবেকা। শ্বাস ছাড়ার শব্দ বুঝিয়ে ফের বলতে শুরু করে করুণভাবে,
- তোমার মনে হতেই পারে আমি কিছু করিনি সেদিন। কিন্তু আমার হাতে করার মতো কতটুকুই বা ছিল। পড়াশোনা করছ, শিক্ষিত হচ্ছ, বাবা-মায়ের আর্দশ নিয়ে বড়ো হচ্ছ, এরপরও আর কী চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে? হ্যাঁ, আমি মানি তাহমিদ কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা করেছিল। কিন্তু ওগুলো তো তুমি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মিটিয়ে ফেলতে পারতে। তুমি বুদ্ধিমান বলেই না জেঠা তোমাকে পুত্রবধূ করার জন্য বারবার তাগাদা দিয়েছে। কাল জেঠা মশাইয়ের ওপরও ধকল কম যায়নি। উনি খুব ভেঙে পরেছেন জানো? একমাত্র ছেলে বাড়ির কাছ থেকে বেমালুম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এই দুঃখ কোন বাবা-মা সহ্য করতে পারে বলো? বাড়িতে কান্নাকাটি, ভয়-দুশ্চিন্তা … পরিবেশ খুব খারাপ।
শেষ পেরেকটা গেঁথে দিয়ে চুপ হয়ে যায় রেবেকা। কখনো বুঝতে দেয় না সে যা চায়, মানুষকে দিয়ে অজান্তে তা-ই করায়। তার কথার মোহ, বাক্যের চাল, আবেগের উঠা-নামা এতোটাই পরিমিত পরিমাণে হয়, যেখানে অপর ব্যক্তি নিজেও জানে না সে যে বোকা বনে গেল। যা শুনল তা খাঁটি মিথ্যা মেশানো। সত্য একফোঁটা থাকলে মিথ্যা পুরোটাই। শাওলিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভেতরের আগল ভেঙে দিল। কণ্ঠে যেটুকু উত্তাপ ছিল তা সাইবেরিয়ার বরফে গলে শান্তভাবে বলল,
- কাল আপনি কেন ওভাবে বললেন তা কিন্তু বলেননি। যাকে নিয়ে —
মাঝপথে থামিয়ে দিল রেবেকা। কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আবারও নিজের যুক্তি প্রস্তুত করে বলল,
- এখানে কী হচ্ছে তা তো জানো না তুমি। তোমাকে বিদায় দেবার পর পুলিশ, ডিজিএফআই বাড়ি ভর্তি করে এল। একটার পর একটা জেরা চলছে, অন্যদিকে তাহমিদের অফিস-কলিগরা ওর ব্যাপারে কিছু তথ্য দিচ্ছে। তাহমিদ নাকি ভয়ংকর একটা কেস হাতে নিয়ে গুম হয়েছে। গুমটা কেন করা হলো এখনো কেউ জানাতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে কী কোন্দল পাকিয়েছে, এটা একমাত্র অপহরণকারীরা বলতে পারবে।
কীভাবে সুক্ষ্ম কৌশলে কথার গতি বদলে দিল এটা হয়ত কেউ মনোযোগ না দিলে ধরতেও পারবে না। এতোটা সুক্ষ্ম চাল ধুরন্ধর মস্তিষ্ক ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়। রেবেকার কথার বেড়াজালে একটু একটু করে ফেঁসে যাওয়া শাওলিন তখন বশীভুত। রেবেকা চাইলে প্রশ্ন করবে, না চাইলে সেটাও করবে না এটা এমন এক ডার্ক সাইকোলজি। রেবেকা একটু থেমে বাক্য সাজিয়ে পুনরায় কথা তুলল। এবার ভারী সাবধানে কাজটা করে,
- সবকিছু মিলিয়ে আমার মাথা গরম হয়ে থাকে। এটা তোমারও জানার কথা। এতোকিছু সামলে নিজেকে ঠিক ধরে রাখা যায় না। শোয়েব মানুষ হিসেবে খুব ভালো। ভদ্র, আদব জানে, দায়িত্বের প্রতি খুব নীতিনিষ্ঠ। কাল আসলে আমারই মাথা খারাপ হয়ে গেছিল, তাই কী কী সব বলেছি আজ আর খেয়ালে নেই। তুমি তো জানো বয়স হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সে এসে অনেক কিছুই মাথায় থাকে না।
শাওলিন দ্বিধার শেষ স্তরে থাকলে সেটাও দূর করে দিল রেবেকা। প্রত্যুত্তর চোখ বুজে জোরে শ্বাস ছাড়ে শাওলিন। স্মিত গলায় নির্ভার হয়ে বলে,
- আপনি জানেন না কাল আপনার অমন আচরণে কতটা অবাক হয়েছি। ভাবতেই পারছিলাম না আপনি কিনা কারোর সম্বন্ধে এমন কথা বললেন।
- থাক, যা হয়েছে তা হয়েছে। এসব বিষয় ক্ষান্ত দাও। শোয়েব কোথায়? আছে পাশে?
এই প্রশ্নটা করার সময় রেবেকা সতর্ক ছিল। যে নাম মুখে নিচ্ছে, সেই ব্যক্তি যেন নামেই অভিশপ্ত। বুনো জানোয়ারের মতো কখন কীসে ওঁত পেতে থাকে বলা যায় না। কাল নিশ্চয়ই শাওলিন ওসব কথা শোয়েবকে বলেনি। এই মেয়ের স্বভাব আবার কথা লাগানোর মধ্যে নেই। স্বস্তির দম ফেলতে নিবে ঠিক তখুনি রেবেকা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। সমস্ত শরীরে বৈদ্যুতিক শক লাগার মতো শুনল, ওপাশ থেকে হিম জাগানো অমানুষিক গলাটা ওকেই উদ্দেশ্য করে বলছে,
- কেমন আছ রেবা? সব ভালো?
ঝটিতি নিজের মুখ ফিরিয়ে পিছু তাকায় রেবেকা। চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় তখন। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল সে, কিন্তু পেছন থেকে জোহরা খালেক উনার ফোনটা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কল লাউড স্পিকারে না থাকলেও কণ্ঠের ভারত্ব এতোটাই উচুঁ, রেবেকা পর্যন্ত চমকে ওঠে ভিড়মি খায়। রেবেকা তখন কান থেকে ফোনটা কিঞ্চিত সরিয়ে ঢোক গিলতে গিলতে হাত বাড়াল। জোহরা ওর হাতে ফোন তুলে দিয়ে মৃদুভাবে বলল,
- শোয়েব! কথা বলো! জানি না কীভাবে কলটা করল, ধরো। রেবেকা ধরো!
জোহরার চোখমুখ সংশয়ে আচ্ছন্ন। সে অবস্থা দেখে রেবেকা একহাতে শাওলিনের কল, অন্যহাতে শোয়েবের অদ্ভুত কল ধরে দ্বিধায় পড়ল। শাওলিন তখন ওপাশ থেকে খটকা লাগা গলায় বলছে,
- আপনার কল এসেছে মণি? এই কলটা কাটব?
রেবেকা দ্রুত ওর কলটা হোল্ডে ফেলে জোহরার ফোনটা কানে ধরল। আকস্মিক এই আক্রমণে দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
- হ্যাঁ, হ্যালো। আরে, কী খবর শোয়েব? ভেবেছিলাম সময় বুঝে একবার কল করব। কিন্তু তুমি ব্যস্ত মানুষ তাই কল করা হয়নি। কেমন আছ?
- তুমি সময় বোঝো না, তাই আমাকে কল করতে পারো না। কিন্তু আমার বউকে কল করে ঠিকই কথা লাগাতে জানো।
- কথা লাগাচ্ছি? কী কথা এগুলো? তোমার মুখ থেকে এসব কথা মানায়?
- যেটা মানায়, সেটা শুনে দুকানে আঙুল দিয়ে কল কেটো না।
- মুখের লাগাম টানো। ভদ্রভাবে কথা বলছি বলে ভেবো না লাগাম ছিঁড়তে জানি না।
- মুখে লাগাম টানা বলেই ভদ্র আচরণ করছি। কাল একবার কল দিয়েছ, কিচ্ছু বলিনি। এখন আবার কল দিয়ে ঢঙ দেখাচ্ছ, আমার মিটিং ডিলে করে তোমার মতো নর্দমাকে সহ্য করছি। তুমি কী ছিঁড়তে জানো ওটা জায়গামতো ছেঁড়ো। সিলেটের কোন জেলায় চাকরি করো খবর অবশ্যই আমার কাছে পৌঁছায়।
বলেই শেষ কথাগুলো থেমে থেমে উচ্চারণ করল শোয়েব। প্রত্যেকটা শব্দে আলাদা জোর দিয়ে বলল,
- কল দিবে না ওই নাম্বারে। ভুল করেও না। তোমার অবস্থা শোচনীয় করে ফেলব রেবা, কাল যা করেছ এরপর তোমাকে ভদ্র হাতে ছাড় দেব না।
হুমকি মেশানো গলায় কল কেটে দেয় শোয়েব। গলায় কালো টাইটা শেষবারের মতো ঠিক করে ফরেস্ট বাংলো থেকে দৃঢ় পায়ে বেরিয়ে পড়ে। অন্যদিকে মুখে অপমানের রঙ ছাপিয়ে থমথম করছে পরিবেশটা। এতোটা তাচ্ছিল্য, এতোটা রূঢ় কথা, এতোটা অপমান রেবেকা আজ পর্যন্ত পায়নি! আজ পর্যন্ত কক্ষণো না! হোল্ডে ফেলা কল কানে চেপে থমথমে রুক্ষ গলায় বলল,
- তোমাকে কল করব। ভালো থেকো। কোনো দরকারে কল দিতে দ্বিধা করো না। বায়।
কল কাটতেই ভ্রুঁ দুটো কুঁচকে যায় শাওলিনের। দুই মিনিট তিন সেকেণ্ডের হোল্ডে কী হলো তা বুঝতে পারল না ও। ওদিকে রেবেকার চরম কালো মুখে রাগে ভঙ্গিমা ভয়ংকর ভাবে ফুটছিল। দৃশ্যটা দেখে মুহুর্তেই জোহরা হাত টেনে ডাইনিং রুমে এনে বসায়। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ক্ষীণসুরে শুধায়,
- কী বলল? ও কী করে জানলো তুমি শাওলিনকে কল দিয়েছ? আমি হঠাৎ শোয়েবের কল দেখে আশ্চর্য! কল ধরতে না ধরতেই ঠাস করে বলল তোমাকে কলটা দিতে। কী হয়েছে রেবেকা বলো দেখি।
রেবেকা পানির গ্লাস নিয়ে ঠোঁট পানিতে ভেজালো। ছোট্ট চুমুকে গিলতে লাগল সে। চোখস্থির হয়ে আছে, ডানহাতের মুঠোটা বজ্রমুষ্টিতে পাকানো, নাকের অবস্থা ফুলে ফুলে উঠছে। পানিটা সম্পূর্ণ শেষ করে ধীর গলায় বলল,
- শূ… বাচ্চাটা আমাকে শাষাচ্ছে। যেন ওর কচি বউকে ওর ব্যাপারে কিছু না বলি। এটা ভালো করেই বুঝেছে ওই মেয়ে ওসব কথা শুনলে ওকে দুচক্ষে দেখতে পারবে না। বনবিভাগে চাকরি জুটিয়ে নিজের অতীত তো ঢাকা দিতে পারে না। ওগুলো একদিন না একদিন বের হয়ই।
জোহরা প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে কথাটা বলল,
- শোয়েব তোমাকে গা… লি দিয়ে এভাবে বলল?
রেবেকা তাচ্ছিল্যের হাসিতে ডান হাতটা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে নাড়িয়ে বলল,
- ওর মুরোদ আছে নাকি গালি দেয়ার! ওই মুখ নিজে রেখেছে নাকি!
রেবেকাকে অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে দেখে ভ্রুঁ কোঁচকান জোহরা। ক্ষণিকের জন্য ভাবনায় পড়েন এতোটা মুখ খারাপ কী করে রেবেকা করছে? যতটা মার্জিত রূপ বাইরে দেখায়, রেবেকার অন্তস্থ রূপ ততটাই বিকৃত। যদি শাওলিন এই রূপটা দেখে তাহলে কী হবে তখন? ও কী রেবেকাকে হজম করতে পারবে? সহ্য করবে? মনে তো হয় না। কী যে হবে তা জোহরাও জানেন না। মনে মনে তিনি বলতে থাকেন, ‘ মেয়েটার সামনে দুই ঘটনা। যাকে এতো আপন করে মানলো, সে ওর কতটা ভালো চায়, সেটাই এখন প্রশ্ন। যাকে বিয়েটা করল, সেই ব্যক্তির অতীত দিয়ে ঘাঁটালে ভালো কিছু তো বের হবে না। কিন্তু দুর্গন্ধ… দুর্গন্ধটা ছড়িয়ে যাবে। ‘
.
পরিবেশ উত্তপ্ত। উনুনের মতো গরম হয়ে আছে সমস্ত নিচতলা। পাহাড়ে গরম পড়লে ভয়ানক তেজ ফোটে। কিন্তু রাতের আঁধারে নেমে আসে শীতের মতো ঠাণ্ডা। ফাতিমা নাজ সেজো ও ছোটো নাতবউকে দিয়ে রান্না সহ বাকি তদারকি দেখছিলেন। কিন্তু আট সদস্যের জন্য প্রস্তুত করা ঘরকে ধোয়া-মোছা পরিষ্কার করণ সবকিছুই বাকি। বাংলোটা জমিদার সুলভ বলেই ঘরগুলো বিরাট। ছাদ উঁচু। পরিষ্কারে সময় লাগে। সবাই যখন বিভিন্ন দিকে ব্যস্ত, তখন ফাতিমা বন্ধ ঘরগুলোকে কীভাবে ঠিকঠাক করাবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ঘটনায় তখন পদার্পণ করল শাওলিন। সমস্ত কিছুই নিরীক্ষণ দৃষ্টিতে দেখার পর নিজেই আগ বাড়িয়ে দাদীর কাছে জানাল সে সাহায্য করতে আগ্রহী। ফাতিমা গম্ভীর মুখে প্রথমে না জানান, কিন্তু আধঘণ্টা পরও যখন রোকেয়া, রাবেয়া, মতিন, মোখলেসকে ফাঁকা পেলেন না, তখন রাজি হলেন ওর অনুরোধে।
শাওলিন পর্যাপ্ত বিশ্রামে সুস্থ। সঠিকভাবে ঔষুধ পথ্য দেখভালের পর নিজেকে অনেকটাই ঝরঝরে অনুভব করছে। দোতলায় ঘর বেশি, কিন্তু মহারাজের ইচ্ছে হয়নি কাউকে নিচতলা থেকে ওপরতলায় থাকতে দেয়ার। কোমরে আঁচল গুঁজে, চুলে খোঁপা পাকিয়ে, হাতে ঝাড়ু ও বালতি নিয়ে প্রতিটি ঘর পরিষ্কারে ব্যস্ত হয় ও। ধূলো ঝেড়ে, ময়লা ফেলে, বিছানায় নতুন তকতকে চাদর বিছিয়ে কপালে পরিশ্রমের ঘামটুকু হাতের উলটো পিঠে মুছে।
পুরো নীচতলা যখন পরিপাটি, তখন সূর্য প্রায় ঢলে পড়ছে। এমন সময় দিনের শেষ আলোতে কারো আগমনের শোর হল। বজ্রমেঘ খ্যাত বাংলোর লৌহদ্বার দুটো বিকট গর্জনে খুলে যাচ্ছে। চারধার কাঁপিয়ে ভীতিস্বর ফুটিয়ে দুটো গাড়ি ঢোকার গুম গুম আওয়াজ ভেসে এল। শব্দটা শুনল সবাই। ঝটিতি নিজেদের কালিঝুলি মাখা অবস্থা বদলাতে গোসলে ছুটল ঝটপট। দেরি করলে মসিবত! যে দুজন ভদ্রমহিলা আসছেন, তারা যদি দেখেন যে উনার পুত্রবধূরা কাজের মহিলাদের মতো সেজে আছে, তখন শাণ দেয়া ছুরির মতো কথা ছুঁড়বেন। তাহিয়া হন্তদন্তে নীচতলায় ছুটলে শাওলিনকে একবার চাপা স্বরে বলে গেল,
- শাওলিন, তাড়াতাড়ি করো। যতটুকু করেছ, হয়েছে, বাকিটা রাখো! তুমি আমাদের চাইতেও বেহাল দশাতে আছ। এক্ষুণি গোসলে ছোটো!
শাওলিন কোমরের বাঁপাশ থেকে আঁচল খুলছিল।ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আশ্চর্য গলায় বলল,
- আমার তো শেষ। আপনি এরকম অস্থির হয়ে কোথায় ছুটছেন?
- তুমি শব্দ পাওনি? উনারা চলে এসেছেন তো! দাদী গিয়েছেন উনাদের ভেতরে আনতে। এই ফাঁকে তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরো।
- উনার চাচা-চাচীরা চলে এসেছেন? কই? আমি তো কোনো শব্দ পেলাম না!
তাহিয়া দ্রুত সদর দরজার দিকে চোখ বুলিয়ে পরক্ষণে শাওলিনের দিকে তাকায়। কণ্ঠে যথাসম্ভব তাগাদা ঠেলে দিয়ে বোঝায়,
- আরে তুমি ভেতরের ঘরে আছ, শব্দ পাবে কীভাবে? এক্ষুণি গোসলখানায় যাও। শোয়েবও আসার পথে। রাফান কল করেছিল একটু আগে। ওরা আসছে! চুলায় তরকারি দিয়ে তোমাকে খবর দিতে পাইনি।
এবার চোখে চমক ফুটল ওর। একটু আগের অসচেতন ভঙ্গি চাপা উত্তেজনায় নিংড়ে এল। শাওলিন দ্রুত খালি বালতিটা নিয়ে বেরোতে থাকলে হঠাৎ তাহিয়ার গলা শুনল। উপরে যাবার সিঁড়িতে পা রেখেছে ঠিক তখুনি শুনল,
- সর্বনাশ! বলতে বলতে এসেই গেছে! কী মস্ত বড়ো দেরিটা হয়ে গেল!
কথা কয়টা শুনতে দেরি, শাওলিনের বুঝতে দেরি হলো না। কানে ভেসে আসছে চেনা বাহনের আওয়াজ। ধাপ করে দরজা খোলার পরিচিত শব্দ। বজ্রভারি গলাটা বেজে উঠল পরিমিত ভঙ্গিমায়। শাওলিনের তখন কী হলো নিজেও জানলো না, সিঁড়িতে ধপ ধপ পা ফেলে অস্থির গতিতে ছুট দিল দোতলাতে। পেছন থেকে নিকটে আসছে সেই স্বর, সেই পদশব্দ, সমবেত মানুষের হই হই হাসি রব।
শাওলিন যখন অস্থির ভাবে ছুটে চলে যাচ্ছে, তখন সদর দরজা দিয়ে ঢুকছে শোয়েব। বাঁহাতের বাহু থেকে স্যূট ঝুলছে, সাদা শার্ট টাই দ্বারা বাঁধা, রিমলেস চশমার এপাশ থেকে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ স্থির হলো। সরাসরি বিদ্ধ হলো ছুটে যাওয়া মানবীটার দিকে। একঝলক দু জোড়া দৃষ্টি একত্র হলো, কিন্তু সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে আড়াল হয়ে গেল ও। তুষার শুভ্র শাড়ি, গাঢ় নীল ব্লাউজ, এলোমেলো খোঁপা থেকে খুলে আসা চুল – শোয়েব মন্থর হয়ে গেল। হঠাৎ ডানপাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল,
- বউ নাকি?
সমুখ থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকায় শোয়েব। বড়ো চাচা তৌকির মির্জার দিকে চেয়ে মাথা নাড়ায়। মুখে শব্দ উচ্চারণ না করলেও ভাতিজার এই ভঙ্গিটা বোঝেন ভদ্রলোক। তিনিও কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করে বলেন,
- নতুন বিয়ে করলে ঘরে সময় দিতে হয় বাবা। এমন দায়িত্ব ফেলে বাইরের দিকে ঝুঁকো না।
কথাটা পরামর্শ হিসেবে দিলেও তিনি চাচ্ছিলেন শোয়েব মর্মটা বুঝুক। ওর বাবা যে কাজগুলো করতেন সেই ব্যাপারগুলো না ঘটুক। বাইরের দুনিয়ার প্রতি ফারদিন মির্জা একনিষ্ঠ ছিলেন। স্ত্রী, সন্তান, পরিবারের প্রতি ভীষণ যত্নবান হলেও কোথাও যেন ‘আরো চাই’ ব্যাপারটা বুকে পিপাসা তুলতো। বড়ো ভাইকে তিনি যে কতটা ভালোবাসতেন, এ কথাটা তো তাদের জানা। তৌকির সাহেব এগোতে এগোতে বললেন,
- খবরটা পেয়ে হতভম্ব ছিলাম। কিন্তু এটাও ভেবেছিলাম তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না। অন্তত এই দিকটাতে। যেহেতু তাহমিনার বিষয়টা কানে এসেছে, এরপর আর কোনো কথা থাকে না।
শোয়েব তবু চুপ। পেছন থেকে দুই চাচী, দাদী ও মতিন লালের কণ্ঠ ভেসে আসছে। রাফান গাড়ি ঘুরিয়ে কোয়ার্টার মুখো। পার্থ রাতের তদারকিতে কিছু জোনে ব্যস্ত। তৌকির আশপাশে পরখ দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে হলঘরের সোফায় বসে বললেন,
- এই বাড়িটাই তোমার নানা কিনতে চেয়েছিল?
শোয়েব চাচার দিকে চোখ রেখে হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। পরক্ষণে কী ভেবে উত্তরটা দিল,
- জ্বি। বায়নার চেয়ে শর্ত বেশি ছিল। নানা সেসব শর্তে এগোতে পারেননি। আমি অবশ্য নিঃশর্তেই কিনেছি। জমিদার এই এলাকা ছাড়তে চাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তৌকির সাহেব বললেন,
- তুমি কী ইচ্ছে করেই এই অঞ্চল বেছে নিয়েছ? যেখানে এসব সমস্যা বেশি, সেখানেই তোমার মনোযোগ?
পেছন থেকে সদর দরজা দিয়ে বাকিরা ঢুকছে। শোয়েব ব্যাপারটা বুঝে আর কথা বাড়ায়নি। মাথা পিছু করে দুই চাচীর একজনকে দেখে চোখ কঠোর হতে গিয়ে শান্ত বানাল। চাচাকে বসতে বলে গোসলের কথা জানিয়ে উপরে উঠল সে। কানে ততক্ষণে গলা ফাটানো কণ্ঠের কথা ভেসে আসছে। নিজ ঘরে ঢুকতেই স্যূটটাকে ডিভানের ওপর রাখল শোয়েব। ঘর খালি। গেল কোথায়? নাকি ঘরেই ঢোকেনি? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ দুয়ার খোলার শব্দ পেল শোয়েব, মাথা পিছু ঘুরাতেই দেখল দুহাতে ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে ভেতরে ঢুকছে শাওলিন। কিন্তু ঘরের ভেতর তাকে দেখে শিউরে উঠল ও। অবাক চোখে ভ্রুঁ কোঁচকাতে গিয়েও কপাল সমান করল। শোয়েব ওর মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নজর বুলিয়ে দেখছে। হঠাৎ দু পা এগোতেই শাওলিন সংকুচিত হয়ে গেল। দুহাত মুঠো করে শাড়ি খামচে ধরল। শোয়েব ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
- গোসল করোনি?
শাওলিন চট করে নিজের অবস্থা দেখে মাথা উঁচু করে জানাল,
- না। ব্যস্ত ছিলাম।
শোয়েব আবার ওর দিকে একপ্রস্থ চোখ ঘুরাল। ওই চাহনির কাছে কুঁকড়ানোর পালকের মতো জড়সড় হচ্ছিল শাওলিন। ওই নীল চোখ যেন লেজার সম্পন্ন চাহনি। যাতে এফোঁড়-ওফোঁড় করে সবকিছু দেখে ফেলা সম্ভব। শোয়েব ডান হাত বাড়ালে শাওলিন ওই পুরুষ্টু হাতকে দেখে দমবন্ধ করে ফেলে। নিঃশ্বাস আঁটকে দাঁতে দাঁত খিঁচায়। থাবার মতো ওই হাতটা ওর মাথার ওপর আসলো, এরপর দু আঙুলে কিছু একটা তুলে ওর দিকে সেটা সমুখে ধরে বলল,
- কী কাজ করেছ যে এতো ব্যস্ত? গোসলের সময় দুপুর টাইম। আর এখন পৌণে ছয়টা বাজে।
ঠোঁট গোল করে ফুঁ দিয়ে মাকড়সার ঝুলটা হটালো শোয়েব। হাতটা ঝেড়ে নিজের টাই আলগা করতে করতে ওর মুখে তীর-চাহনি বিঁধাল। শাওলিন অবরুদ্ধ শ্বাসটা প্রচণ্ড হিমশিম খেয়ে ছাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতর অশান্ত ঝড়কে স্থির করতেই বলল,
- নীচতলার ঘরগুলো অপরিষ্কার ছিল। এতোক্ষণ সেদিকেই ব্যস্ত ছিলাম। কাজ শেষ না করা পর্যন্ত গোসলে যেতে পারিনি। তাই আজ একটু দেরি।
- আচ্ছা।
ভদ্র মানুষের মতো সায় জানালো শোয়েব। যেন বিষয়টা কত নিত্যনৈমিত্তিক। তার বিয়ে করা বউ এভাবেই ঘরদোর গুছিয়ে রাখে, নিজ হাতে পরিচ্ছন্ন করে, সবকিছু সামলাতে গিয়ে বারোটা থেকে ছয়টা বাজায়! কী সুন্দর অভিব্যক্তি! শাওলিন গভীর শ্বাস ছেড়ে আলমারি থেকে টাওয়েল বের করতে লাগল। শোয়েব ততক্ষণে টাই, ঘড়ি, ওয়ালেট, গাড়ির চাবি সমস্ত কিছু ড্রেসিং টেবিলে রাখছিল। ঠিক তখনি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে শোয়েব বলল,
- এর আগে কখনো বাথরুম শেয়ার করেছ?
শাওলিন প্রশ্নটা শুনে নিজের পোশাক বের করতেই বলল,
- না। কিন্তু কেন?
শোয়েব দুহাতে কোমরের বেল্ট খুলতে খুলতে বলল,
- কিছু না। আমার পোশাক বের করে দাও।
শাওলিন কথামতো টিশার্ট, ট্রাউজার, টাওয়েল সমস্ত বের করে দিল। বিছানায় রেখে নিজের পোশাকগুলো যখন বাথরুমের ক্লথ হ্যাঙারে রাখছিল, ঠিক তখনি কানে অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। মনে হলো যেন দরজার ছিটকিনি লাগাচ্ছে। শাওলিন তৎক্ষণাৎ পিছু ঘুরতেই ওর সমস্ত শরীর যেন কাঁটা দিয়ে উঠল। হাত থেকে দ্বিতীয় টাওয়েলটা ঝপ করে খসে পড়ল। বাথরুমের দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। দুহাতে সাদা শার্টের বাটন খুলতে খুলতে বলল,
- এখন থেকে বাথ, ব্রিথ, বেড আমার সঙ্গে শেয়ার করবে।
কথাটা শেষ করতেই কাঁধের ওপর থেকে নিজের পোশাকগুলো ওর দিকে ছুঁড়ে দিল শোয়েব। ক্লথ হ্যাঙারে ওর শাড়ির পাশে রাখার ইঙ্গিত করল। শাওলিন এতোটাই স্তব্ধ, দুহাতে শোয়েবের পোশাক ধরে মূঢ় ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিল। একবার হাতে থাকা পোশাকের দিকে তাকাল, আরেকবার তাকাল শোয়েবের দিকে। বহুকষ্টে ঢোক গিলে বিপণ্ণ গলায় বলল,
- আপনি এখানে গোসল করবেন!
খুব ধীরে সুস্থে গা থেকে শার্ট খুলছিল শোয়েব। ডান হাতে পুরোনো ব্যাণ্ডেজ। জায়গাটা এখনো ব্যথা, চামড়ায় লালচে বর্ণ। তবু সাবলীল ভঙ্গিতে শার্টটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
- আমি তোমার সঙ্গে গোসল করব। আমাকে গোসলের জন্য সাহায্য করো শাওলিন। বডিওয়াশ নিয়ে এসো।
হুকুম ছেড়ে বাথটাবের একদিকে বসে পড়ল শোয়েব। জায়গাটা বসার জন্য প্রশস্ত। শাওলিন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
- আপনি গোসল করুন। আমি এভাবে . . সম্ভব না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। শেষ করুন।
শার্টটা নীল ঝুড়িতে রেখে ত্রস্ত পায়ে যাচ্ছিল শাওলিন, তার আগেই বন্য মেজাজে স্বর ফুটল কারোর,
- বাইরে এক পা দিলে নীচ পর্যন্ত ঝামেলা হবে। আমি চাই না সেরকম কিছু হোক। তোমার কাছে খারাপ কিছু দাবি করিনি। শুধু আজ আমাকে সাহায্য করো।
এবারের কথা ওর গতি আঁটকে দিল। শাওলিন ভ্রুঁক্ষেপ করবে না ভেবেও তার দিকে তাকাল। ক্লান্তিতে ন্যুব্জ মুখ, চোখদুটোয় রাতজাগা পরিশ্রম, হাতের তালু দুটোয় ধুলোর চিহ্ন। চোখটা যখন তার পুরুষ্টু বাহুর কাছে, পেশল মাংসে ব্যাণ্ডেজ মোড়ানো দেখল তখন ঠিক জেদ করল না। সংকোচ যেটুকু ছিল, সেটুকুও তার ওই অবস্থা দেখে চাপা পড়তে লাগল। শাওলিন পায়ে পায়ে এগিয়ে তার সমুখে দাঁড়িয়ে বলল,
- আমি আপনাকে সাহায্য করব। কিন্তু, এরপর আমাকে একা ছেড়ে দিবেন। রাজি?
শোয়েব মাথা তুলে উর্ধ্বমুখে তাকায়। শাওলিনের চোখে নিজের ব্যাকুল চোখদুটো রেখে বলতে চাচ্ছিল, ‘ দুদিন ছেড়ে দিলাম। আরো সময় চাই?’ কিন্তু মুখে উত্তর দিল,
- রাজি।
শাওলিন লম্বা আঁচলটা কোমরের কাছে গুঁজে সম্মতি বোঝায়। দেয়ালে থাকা কেবিনেট খুলে চিকিৎসা বাক্স নিয়ে আসে। শোয়েব চুপ করে বসে ওর টুক টুক করে করা কাজগুলো দেখছে। চোখে আনন্দ, পুলক, আবেগের স্তুতি। শাওলিন যদি একবার তার দিকে তাকাতো, তবে বুঝতে পারত ওর দিকে কতটা ব্যাকুল-বিভোর নয়নে তাকিয়ে আছে শোয়েব। যেন চোখ দিয়েই মিটাচ্ছে হৃদয়ের পিপাসা।
শাওলিন ডানদিকে বাথটাবের চওড়া ধারের ওপর বসলো। পুরুষোচিত বাহুটা এই প্রথম নরম আঙুলে ধরে, আধ ময়লা ব্যাণ্ডেজটা খুলে দিতে। কিন্তু হাতের পেশি কী ভয়ানক কঠোর, যেন মোটা কোনো পিণ্ড, যাতে আঙুল ডাবে না, ফাঁপা মাংস অনুভূত হয় না। বরং কী মজবুত দৃঢ় পেশি! এই চওড়া বাহুতে কাউকে বেঁধে ফেললে সে কী নিঃশ্বাস নিতে পারবে? দম আঁটকে মৃত্যু হবে না? শাওলিন অজান্তে ঢোক গিলল। ব্যাণ্ডেজটা খুলে ক্ষত জায়গাটা ছোটো ছোটো চোখে দেখল। যেন হাত তার, কিন্তু ব্যথার ঘা হচ্ছে ওর। নিচের নরম ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে, জায়গাটা স্যাভলন জড়ানো তুলো দিয়ে মুছল। মৃদু গলায় নরমস্বরে বলল,
- আপনি সেই দুইদিন কোথায় ছিলেন? আপনার সহকর্মী রাফান একা ফিরেছিল। কেউ বলতে পারছিল না আপনি কোথায়। সঙ্গে ফোনও বন্ধ।
কথা শুনে খানিক মুচকি হাসলো শোয়েব। ওর দিকে দুটি চোখ ছুঁয়ে রেখে বলল,
- তুমি কী আমার খোঁজ রেখেছিলে? কেউ তো বলল না তুমি কিছু জানতে চেয়েছ?
তুলো ধরা হাত কিঞ্চিত থামিয়ে মুখ তোলে শাওলিন। দুটো কৃষ্ণকালো চোখ তার মুখে স্থির করে বলল,
- আপনি জানেন, ও সময় কিছু বাউণ্ডারি ক্রস করা আমার পক্ষে ছিল না। মর্তুজা বাড়িতে মির্জা বাড়ির কাউকে নিয়ে ভাবব, সেটা নিশ্চয়ই নানা কথা ছড়াতো।
- তুমি কী জানো আমি তোমাকে কীভাবে চিনি? কেন হাতের কাছে নিজের ফুপাতো ভাইকে পেয়েও কিছু করিনি? কিছুই বলিনি?
শাওলিন মন থেকে সত্যিটাই বলল। ওর মুখজুড়ে থাকা এলো চুলের গুচ্ছগুলো ওকে নিষ্পাপ করে তুলছে। শোয়েব সেদিকে তাকালে শাওলিন নির্ভার সুরে বলল,
- আমি জানি না, আপনি কেন ঢাকায় এসেছিলেন। কেন ফার্মগেট, প্রান্তিক গেট, শেষে মর্তুজা বাড়িতে এলেন। সত্যি বলতে, আমি আপনার সম্বন্ধে কিছুই জানি না।
ডাগর দুটি আঁখি একরাশ হতাশা ফুটিয়ে নত হলো। পুনরায় ব্যস্ত হলো তুলো ধরা হাতে ক্ষত পরিচ্ছন্ন কাজে। শোয়েব বাঁহাত বাড়িয়ে ওর ঝুঁকানো মাথায় রেখে দিল। পলকে একটু চমকে ওঠে শাওলিন, কিন্তু স্থির হয় ও। মাথা না তুলে সেভাবে হাত চালিয়ে কাজে প্রবৃত্ত থাকল। শোয়েব সেই প্রশস্ত থাবাটা ওর মাথায় রেখে আঙুল ডোবাল ওর রেশম চুলে। শাওলিন সেই স্পর্শে চোখ বুজে ফেলেছে। অনুভব করছে সাড়াশির মতো আঙুলগুলো চুলের গহিন ছুঁয়ে যাচ্ছে। গোঁড়ায় গোঁড়ায় মখমলি পরশ ছুঁইয়ে দিতেই শোয়েব আবেগপূর্ণ স্বরে বলল,
- আমার ব্যাপারে কী জানতে চাও? তুমি তো কখনো বলোনি, কী জানার ইচ্ছে তোমার। তুমি সবার কাছে মিশুক, কিন্তু আমার কাছে কেন ওভাবে থাকো?
ওই পৌরুষ স্বরে কিছু একটা মিশে আছে। কী মিশে আছে তা শাওলিন জানে না। শুধু চুপ করে তার কথাগুলো শুনে যাচ্ছে ও। চোখ বুজে, চুলের গহনে, আঙুলের উষ্ণে অনুভব করে যাচ্ছে তার স্পর্শটুকু। শোয়েব এবার ইঞ্চিখানেক ওর কাছে এগিয়ে বলল,
- তুমি বাউণ্ডারি ক্রস করো শাওলিন। কারণ আমি ওটাই চাই। আমি বাঁধা দেব না, তোমাকে জোর করব না। তুমি আমার কাছে নিরাপদ, এটুকু বিশ্বাস করো তো?
শোয়েব হাতের অতলে থাকা মাথাটা বার দুয়েক নড়তে টের পায়। সামান্য নাড়িয়ে হ্যাঁ জানাল শাওলিন। নত রাখা মাথা অবশেষে উপরে তুলে সরাসরি তাকাল শোয়েবের পানে। হাতের তুলো ক্ষতস্থানে চেপে ধরেছে এটা ও খেয়াল করেনি। শোয়েবও বুঝতে দেয়নি ব্যথা পাচ্ছে। ওর মাথায় রাখা হাত ধীরে ধীরে ওর গালে নামিয়ে হঠাৎ চিবুকটা তুলে ধরল। কম্পনরত গোলাপি উষ্ণ ঠোঁটদুটো তার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই অমোঘ গহন থেকে চোখ সরিয়ে ওর চোখে চেয়ে বলল,
- ব্রিথ শেয়ার কবে করছ জানি না। কিন্তু বেশিদিন অপেক্ষায় রেখো না।
কথাটা ইঙ্গিতে ছুঁড়তেই ওর কেঁপে ওঠা ওষ্ঠাধর ফের দৃষ্টিবন্দি করল শোয়েব। নিজের পিপাসু অধর ওই গহনে ডুবিয়ে দিতে চাচ্ছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেকে রুখে নিচ্ছিল। তবু চাওয়ার কাছে মন যখন তীব্র প্রবল, তখন ওই পুরুষালী ঠোঁটদুটো ওর থুতনিতে ছুঁয়ে দিল। প্রবলভাবে চেপে রাখল স্পর্শটুকু। অনুভব করছিল তার ডান বাহু থেকে হাত সরে গেছে শাওলিনের। তীব্রভাবে অবিন্যস্ত হচ্ছে ও। ভারসাম্য রক্ষার্থে শাওলিন বসা থেকে দাঁড়িয়ে যেতে চাচ্ছিল, কিন্তু সেটিও রুখে দিল শোয়েবের দামাল প্রতিরোধ। ডান হাতের অসুরিক ভরে ওকে কোলের ওপর বসিয়ে নেয় সে। টেনে নেয় বুকের খাঁজে খাঁজে। আচম্বিতে শিউরে ওঠারও সুযোগ দেয় না ওকে, তার আগেই যে হাতে তীব্র ব্যথা, সেই হাতেই ওর কোমর আগলে ভরটুকু নিজের মাঝে করল। শাওলিন একটু আগের কল্পনায় যে ভয়ংকর ব্যাপারটা ভেবেছিল, সেটাই যেন এই মুহুর্তে ঘটে যাচ্ছে। বাহুর বেড়িতে আঁটকা পড়ে দমবন্ধ পরিস্থিতি হয়েছে। হাঁশফাঁশ করতে থাকলেও এতটুকু ছাড়া পেল না। যেন খাঁচা বন্দি পাখিটা বাহুবন্দি দূর্গে ফেঁসে গেল। শোয়েব ওই মুহুর্তে একদিকে ফাইরুজের মৃত্যু, অন্যদিকে ক্যামেরার সত্য, এদিকে দায়িত্ব ও দূরত্বে সরিয়ে রাখা অনুভব নিয়ে এলোমেলো ছিল। যেন এই শোয়েব সেই শোয়েব নয়, যে নিজেকে কারো কাছেই ধরা দেয়নি। কাউকে একতিল পরিমাণ বুঝতেও দেয়নি। সে নিজেকে ধরা দিয়ে নিজের বেপরোয়া দিকটাকে সামনে আনতে চায়নি। কিন্তু এখন ছাড়া পাওয়া বুনো দিকটা ধরা পড়ে যাচ্ছে। শোয়েব চোখ বন্ধ রেখে ওর কানের কাছে ঠোঁট রাখে। দু বাহুর ডোর আরো ভয়ানক করতেই প্রতিটি শব্দ ওর কান ছুঁয়ে বলে,
- হাতের ক্ষত যেভাবে সারিয়ে দিচ্ছ, সেভাবে আমাকেও সারিয়ে দাও। যেখানে তুমি আছ এখন, সেখানে শান্তি ছড়িয়ে দাও।
FABIYAH_MOMO .
নোটবার্তা — অপেক্ষা করা মুশকিল, তাই না? আজকের পর্বটা কেমন লেগেছে, ছোট্ট করে সবাই একটু একটু জানাবেন। শোনার, জানার, মন্তব্য পড়ার অধীর অপেক্ষা করব। ওহ হ্যাঁ . . পর্ব এটা ৪৪২০+ শব্দসংখ্যার। বিরাটট করে দিলাম। ❤
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৩
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৭