Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর প্রথমাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৩৯ এর প্রথমাংশ

সময় প্রবহমান। কেটে গেছে আরো ৭ দিন। পিচাশ গুলো হঠাৎ হঠাৎ রাত বিরেতে আক্রমণ চালায় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়। ক্ষতি করে মানুষের জানমাল।

দুর্গের কক্ষে একা বসে আছে মেহেরুন্নেসা। বাইরে হালকা বাতাস বইছে, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পর্দা দুলে উঠছে আস্তে আস্তে। চারপাশে নিস্তব্ধতা কিন্তু তার ভেতরে যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়লো তার পুটলিটার কথা। কোণের দিকে রাখা সেই পুরনো কাপড়ের পুটলিটা। অনেকদিন খোলা হয়নি। সে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পুটলিটা টেনে নিল নিজের কাছে। আঙুলে ধুলো লেগে গেল বোঝাই যায়, কতদিন স্পর্শ করা হয়নি। গিঁট খুলতেই একে একে বেরিয়ে এলো কিছু পুরনো জিনিস কাপড়, ছোটখাটো স্মৃতি আর তারপর একটা মোটা বই।
উত্তরের প্রাসাদ থেকে আনা। মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত থমকে গেল।
“এটা তো…”
ফিসফিস করে উঠলো। সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল এই বইটার কথা। ধীরে বইটা তুলে নিল হাতে। মলাটটা পুরনো, কিন্তু এখনো মজবুত। পাতাগুলো খানিক হলদে হয়ে গেছে সময়ের ছোঁয়ায়।
সে ধীরে খুললো।
ভেতরে একটা ডায়েরির মতো সাজানো লেখা।
তার চোখ ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলো।
আর তারপরই তার ভ্রু কুঁচকে গেল বিস্ময়ে।
এক পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা নাম। একটা… দুটো… তিনটে…

ক্রমশ বাড়তে থাকা তালিকা। মোট পঞ্চাশজন।
প্রত্যেকের নামের পাশে ছোট করে লেখা তাদের দেশ। কোথাও “মিশর”… কোথাও “শাম”… কোথাও “পারস্য”… কোথাও আবার আরও অচেনা অঞ্চল।আর তার পাশেই বয়স।
সংখ্যাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে কেউ তরুণ, কেউ প্রবীণ।
সবাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানুষ। মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস ধীরে ভারী হয়ে এলো। সে আবার শুরু থেকে পড়লো। একজন… দুইজন… তিনজন…
কোনো ভুল নেই। একেবারে হিসেব করে লেখা তালিকা। তার মাথায় প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো এই তালিকা কেন? এরা কারা? একসাথে এতজন চিকিৎসক… কেন? সে পাতাটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে রইলো। আর এদের তালিকা ওই মহলে কি করে এলো? আর অতবড় মহল টা অকারণে পরিত্যক্ত তো হতেই পারে না।
এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো রহস্য।
আর সেই রহস্য হয়তো বর্তমান ঘটনার সাথেও জড়িয়ে আছে।

মেহেরুন্নেসা বইটা বন্ধ করলো না। বরং আরও মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলো যেন উত্তরটা এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে। পরের পাতাটা উল্টালো। আর চোখের সামনে যা ভেসে উঠলো,
সে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এটা আর আগের পাতার মতো সাজানো তালিকা না।
এখানে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব লেখা অচেনা অক্ষর, বাঁকা বাঁকা চিহ্ন, তার পাশে অদ্ভুত কিছু সংখ্যা। কোথাও কয়েকটা শব্দের পর সংখ্যা, কোথাও আবার একেবারে হিসেবের মতো কিছু লিখা কিন্তু কোনো পরিচিত ভাষা না।
সে চোখ কুঁচকে পড়ার চেষ্টা করলো।

কিছুই বুঝলো না।
“এগুলো আবার কি…”
নিজের মনেই বললো সে। পাতার উপর আঙুল বুলিয়ে দেখতে লাগলো যেন স্পর্শ করলে কিছু বোঝা যাবে। কিন্তু না। এটা একেবারেই তার অজানা। কিছুক্ষণ ভেবে সে উঠে দাঁড়ালো।
কক্ষের বাইরে গিয়ে একজন মিশরীয় নারী যোদ্ধাকে ডেকে আনলো যারা এখানে অস্ত্রচর্চা করে। নারীটি ভেতরে এসে সম্মান জানিয়ে দাঁড়ালো।
“এটা দেখো তো”
মেহেরুন্নেসা বইটা এগিয়ে দিল। নারীটি কাছে এসে পাতার দিকে ঝুঁকে পড়লো। প্রথমে তার চোখে স্বাভাবিক ভাব ছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার দৃষ্টি বদলে গেল।
সে আরও কাছে ঝুঁকল, অক্ষরগুলো ভালো করে দেখলো। সে ধীরে বললো
“এটা রোমান ভাষা।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“রোমান?”
নারীটি মাথা নাড়লো।
“হ্যাঁ। আমরা যুদ্ধে বা ভ্রমণে মাঝে মাঝে এমন লেখা দেখেছি। এটা তাদের লিপি।”

সে আবার পাতার দিকে তাকালো।
“কিন্তু”
তার কপাল কুঁচকে গেল,
“এগুলো সাধারণ বাক্য না।”
সে আঙুল দিয়ে কয়েকটা শব্দ দেখালো
“এই নামগুলো… এগুলো কোনো রাসায়নিক তরলের নাম মনে হচ্ছে।”
মেহেরুন্নেসা একটু এগিয়ে এলো।
“রাসায়নিক…?”
নারীটি ধীরে মাথা নেড়ে বললো
“হ্যাঁ… বিভিন্ন ধরনের তরল পদার্থ… সম্ভবত চিকিৎসা বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হয়।”

সে আবার পড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে বললো
“ঠিক কি কাজে লাগে… সেটা আমি বুঝতে পারছি না।”

তার কণ্ঠে হালকা হতাশা।
“শুধু নাম আর পরিমাণের মতো কিছু লেখা আছে… কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থটা বোঝা কঠিন।”

মেহেরুন্নেসা চুপ করে গেল।
তার দৃষ্টি আবার সেই পাতার উপর স্থির হলো।
অচেনা ভাষা অজানা রাসায়নিক তরল আর তার আগে থাকা পঞ্চাশজন চিকিৎসকের তালিকা।
সবকিছু মিলিয়ে যেন একটা জটিল ধাঁধা। এই বইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কোনো বড় রহস্য।
আর সেটা হয়তো খুব ভয়ংকরও হতে পারে।

মিশরীয় নারীটি চলে যেতেই কক্ষটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ স্থির বসে রইলো। তার সামনে খোলা বই পাতায় অচেনা ভাষা, অদ্ভুত রাসায়নিক নাম, আর তার আগে সেই পঞ্চাশজন চিকিৎসকের তালিকা।
সবকিছু মিলিয়ে তার কপাল ধীরে ধীরে কুঁচকে এলো। তার মনে একটাই কথা বারবার ঘুরতে লাগলো। এটা কাউকে দেখাতে হবে।
আর সেই কেউ শুধু একজনই হতে পারে। বাইজিদ।

বাইজিদ গত সাত দিনে একবারও আসেনি সে এখানে। আগে যেভাবে নিয়মিত আসতো, এখন আর আসে না। এই ভাবনাটা হালকা অভিমান এনে দিলো মনে, কিন্তু তার থেকেও বড় হয়ে উঠলো উদ্বেগ। এটা তাকে জানানো দরকার… এখনই। মেহেরুন্নেসা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো।
দ্রুত টেবিলের কাছে গিয়ে কাগজ আর কলম তুলে নিলো। সময় নষ্ট না করে লিখতে শুরু করলো সংক্ষিপ্ত, কিন্তু জরুরি ভাষায়।

শেষে লিখলো
“অবিলম্বে আসা প্রয়োজন।”
লেখা শেষ করে চিঠিটা ভাঁজ করলো। তারপর দরজা খুলে বাইরে দাঁড়ানো এক বিশ্বস্ত রক্ষীকে ডাকলো।
“এটা মহলে পৌঁছে দাও। শাহজাদার হাতে অবিলম্বে।”
রক্ষী মাথা নত করলো।
“জি, বেগম।”

চিঠিটা নিয়ে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
মেহেরুন্নেসা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দূরে তাকিয়ে। তার বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি কাজ করছে।
মনে হচ্ছে সময় খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর সে যেন দাঁড়িয়ে আছে কোনো বড় ঘটনার ঠিক আগমুহূর্তে।

মহলের ভেতরে তখন গম্ভীর এক পরিবেশ।
বড় দরবার কক্ষে বসে আছেন জমিদার বাকের শাহ্। সামনে দাঁড়িয়ে বাইজিদ। পাশে কিছুটা দূরে নীরবে উপস্থিত নেওয়াজে আবিদ।
আলোচনার বিষয়বসিমরান আর নেওয়াজের বিয়ে। বাকের শাহ্ গম্ভীর গলায় বললেন,
“এই পরিস্থিতিতে বিয়েটা আদৌ উচিত কি না… সেটাই ভাবছি।”
বাইজিদ চুপচাপ শুনছিল। তারপর ধীরে বললো
“রাজ্যের অবস্থা স্থির না, আব্বা। বাইরে আক্রমণ, ভেতরে অস্থিরতা, এই সময় এমন আয়োজন..”
সে থামলো।
“ঠিক কতটা সম্ভব হবে… সেটা অনিশ্চিত।”

নেওয়াজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু তার অবস্থানও সহজ নয় সবকিছুর মাঝে তাকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
বাকের শাহ্ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
“শান্তির সময় বিয়ে আনন্দ আনে, কিন্তু অশান্তির সময়… কখনো কখনো সেটা নতুন সমস্যাও তৈরি করে।”

কক্ষের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
ঠিক তখনই দরজার পাশে নীরবে এসে দাঁড়ালো মাহাদি। সে কোনো শব্দ করলো না।
শুধু চোখের ইশারায় বাইজিদকে ডাকলো। বাইজিদের দৃষ্টি সেদিকে গেল। মাহাদির সেই চেনা স্থিরতা কিন্তু আজ তার চোখে হালকা তাড়াহুড়োর ছাপ।
বাইজিদ বুঝে গেল গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
সে বাকের শাহ্-এর দিকে তাকিয়ে বললো
“একটু আসছি।”
অনুমতি নিয়েই সে দরবার থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এসে মাহাদির সামনে দাঁড়াতেই মাহাদি কোনো কথা না বলে তার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো। মোড়া কাগজ।

বাইজিদের চোখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠলো।
সে দ্রুত চিঠিটা খুললো। চোখ বুলাতেই তার দৃষ্টি বদলে গেল।
ভ্রু কুঁচকে এলো। এত গুরুত্বপূর্ণ দরকার? মাহাদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাইজিদ চিঠিটা ভাঁজ করলো ধীরে। তার চোখে তখন চিন্তা, আর সঙ্গে একটা সিদ্ধান্তের ছাপ। সে আর দেরি করবে না এটা পরিষ্কার। বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে। দুর্গের পথে ধুলো উড়িয়ে দ্রুত ছুটে এলো বাইজিদ। চিঠিটা পড়ার পর আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি সে। দুর্গে পৌঁছে সোজা সেই কক্ষের দিকে গেল। দরজার সামনে এসে থেমে গেল এক মুহূর্ত।
ভেতরে মেহেরুন্নেসা সোনালি রঙের পোশাকে, পালঙ্কের উপর হাঁটু ভাজ করে বসে আছে। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া আলোয় তার চারপাশ যেন কোমল আভায় ভরে উঠেছে। চুলগুলো আলগোছে ঝরে পড়েছে, মুখে অদ্ভুত এক শান্ত ভাব কিন্তু চোখে যেন অপেক্ষার ছাপ।
বাইজিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো।
নিঃশব্দে। শুধু তাকিয়ে রইলো তার প্রিয়তমার দিকে। সাত দিন… পুরো সাত দিন পর দেখছে তাকে। এই সময়টা যেন হঠাৎ করে দীর্ঘ হয়ে উঠলো।
ঠিক তখনই মেহেরুন্নেসা যেন কিছু অনুভব করলো। ধীরে মুখ তুলে তাকালো দরজার দিকে।
আর তাকাতেই চোখ থেমে গেল।
বাইজিদ। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে রইলো।
তারপর বাইজিদ ভেতরে ঢুকতে পা বাড়াতেই মেহেরুন্নেসা আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না।

এক ছুটে দৌড়ে এলো। সোজা গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। এত জোরে যেন এই সাত দিনের সব অভিমান, অপেক্ষা, ভয় সব একসাথে ভেঙে বেরিয়ে এলো। সে আছড়ে পড়লো বাইজিদের চওড়া বুকে। বাইজিদও থামলো না। দু’হাতে শক্ত করে আগলে নিল তাকে। তার বুকের ভেতর যেন জমে থাকা সবকিছু এক মুহূর্তে নরম হয়ে গেল।
কিন্তু আজ মেহেরুন্নেসাই যেন বেশি উতলা। সে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। মুখ লুকিয়ে ফেলেছে তার বুকে।
“এতদিন…!”
তার কণ্ঠ ভেঙে এলো
“একবারও আসেননি…”
তার কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। অভিমান, স্বস্তি, ভালোবাসা সব মিশে গেছে। বাইজিদ ধীরে তার মাথায় হাত রাখলো। কিছু বললো না।
শুধু একটু কাছে টেনে নিল আরও। এই মুহূর্তে—

এই দূরত্ব তাদের কতটা নাড়িয়ে দিয়েছে। বাইজিদের বুকে মুখ গুঁজে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো মেহেরুন্নেসা। তার শ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু হাতের বাঁধন এখনো ঢিলা হয়নি। বাইজিদ আলতো করে তার মুখটা তুললো।
“আমাকে ডেকেছিলে কেন?”
নরম কিন্তু কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো সে।
মেহেরুন্নেসা একবার তাকালো তার চোখের দিকে। তারপর হালকা করে মাথা নাড়লো।
“এখন না আগে… হাত-মুখ ধুয়ে আসুন।”

বাইজিদ ভ্রু তুললো সামান্য।
“মেহের”
“না”
সে এবার একটু জোর দিয়েই বললো,
“আগে ধুয়ে আসুন। তারপর বসে কথা বলবো।”

তার কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত স্থিরতা যা বাইজিদকে আর প্রশ্ন করতে দিল না। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলো।
“ঠিক আছে।”

স্নানাগারের দিকে চলে গেল সে।
মেহেরুন্নেসা তখন দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিল।
টেবিলে নাশতার ব্যবস্থা করে রাখা ছিল সে সব ঠিকঠাক করে সাজালো। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইজিদ ফিরে এলো। চুলে হালকা পানি, মুখে ক্লান্তির ছাপ কমে এসেছে।
“এবার বলো?”
বসতে বসতেই বললো সে। মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়লো।
“আগে খেয়ে নিন।”
সে নিজেই সামনে বসে তাকে নাশতা এগিয়ে দিল। বাইজিদ এবার আর তর্ক করলো না।
দু’এক লোকমা খেতে খেতে তার চোখ কিন্তু বারবার মেহেরুন্নেসার দিকে যাচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে আজকের এই ডাকার পেছনে কিছু একটা আছে। নাশতা শেষ হতেই মেহেরুন্নেসা আর দেরি করলো না। ধীরে তার সামনে এসে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর খুব স্পষ্ট গলায় বললো
“আমি এই রাজ্যের আগা-গোড়া সব জানতে চাই।”
বাইজিদ থেমে গেল। তার চোখে হালকা বিস্ময়।
“কি সেটা ?”
মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়লো।
“ উত্তরের প্রাসাদ, তা পরিত্যক্ত কেন, নাসিরাবাদ… সাহাবাদ… পুরনো যুদ্ধ… সবকিছু।”

তার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।
“একটা কিছু লুকানো আছে, আমি সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার সবটা জানা দরকার শাহজাদা।”

বাইজিদ গভীর দৃষ্টিতে তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে। আসলেও এবার তার জানা উচিৎ


“উহুম উহুম”

মাহাদি মৃদু গলা খাঁকারি দিতেই চমকে উঠলো সুনেহেরা। ধরা পড়া চোরের মত এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। সৈন্য মহলের প্রথম ঘরটাই সেনাপ্রধান মাহাদি ইকরাম এর। চারিদিকে মাহাদি কে কোথাও না দেখে তারই ঘরের সামনে উঁকি দিচ্ছিলো সুনেহেরা। কিন্তু কক্ষ ফাঁকা, দরজাও ছিলো খোলা। দরজা থেকে উঁকি মেরে ভিতরে দেখতে গেলেই পিছন থেকে মাহাদির উপস্থিতি টের পায় সুনেহেরা।
“কোনো প্রয়োজন শাহজাদি?”

সুনেহেরা আমতা আমতা করে বলল
“ন…না। না। কি প্রয়োজন থাকবে? আমি তো… এই যে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সৈন্যরা কেমন আছে। কেমন থাকছে এই”

মাহাদি কেমন সরু চোখে তাকিয়ে আছে। বোধহয় বিশ্বাস করলো না কথা গুলো। সুনেহেরার অস্বস্তি আরো বাড়লো। মাহাদি বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল
“আপনার কন্ঠে তেজী উচিত জবাব গুলোই মানায় শাহজাদী। যে কোনো পরিস্থিতি তে সত্য কথা বজ্র কন্ঠে বললেই সেটা ভালো শোনায়। মিথ্যে বলাটা আপনার আসে না, বলতে পারেন যে মিথ্যা আপনি বলতে পারেন না”

সুনেহেরা এখানে থেকে আর বেইজ্জতি হতে চাইলো না। সিল্কের ঘাগড়া টা দুহাতে ধরে পাশ কাটিয়ে বেড়িয়ে যেতে নিলেই মাহাদির কথায় তার পা থেমে গেলো
“বলে দিন না শাহজাদি, ভালোবাসেন”

সুনেহেরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন বরফের মতো জমে গেছে সে। এই পাথর মানব টা মন পড়া শিখে গেলো কবে? ভালোবাসার মত কোমল জিনিস এই পাথরটার চোখে কি করে পড়লো? সুনেহেরা শুকনো ঢোক গিলল। পিছনে ফিরার সাহস হচ্ছে না। মাহাদি নিজেই এসে দাঁড়ালো সুনেহেরার সামনে। সুনেহেরার দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলতে লাগলো
“কি নিখুঁত অভিনেত্রী আপনি শাহজাদি। আমি আপনার পিছু নিলে তেজ দেখান, বুকে তলোয়ার ঠেকান। অথচ আপনার গোপন অভিযান থেকে ফেরার সময় সেনা মহলের বড় ঘরটায় নিয়ম করে উঁকি দিতে ভুলেন না”

সুনেহেরার চোখ যেন কোটর চিরে বের হওয়ার উপক্রম। এই লোকটা সব জানতো। মাহাদির চোখ দুটো কুচকে আসা দেখে বুঝলো, বর্মের আড়াল থেকে সে হাসছে।
“আপনার কখনো মনে হয়নি শাহজাদি? রোজ আমার কক্ষের বিছানার পাশের জানালা টা কেন খোলা থাকে? সব গুলো তো বন্ধই থাকে। তাহলে এটা কেন রোজ উন্মুক্ত? কারণ আমি নিজেই রাখতাম।”

সুনেহেরা তোতলাতে তোতলাতে বলল
“তো…তো কি হয়েছে? আমি দেখতে আসতাম এই জন্য যে আপনি কক্ষে আছেন না আবার আমার পিছু নিতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন”

মাহাদি নাটকীয় ভঙ্গিতে সুনেহেরার চারপাশে এক চক্কর ঘুরলো।
“তাহলে…… যে রাতে আমি সারারাত দরবার মহলে ছিলাম, কে যেন আমার কোণে আঙুলে তার কোণে আঙুল ঠেকিয়ে ছিলো”

সুনোহেরা ধরা পড়ে গেছে। আর কিচ্ছু বলে লাভ হবে না। মাহাদি বলল
“কেন সবটা লুকাচ্ছেন শাহজাদি?”

“আমিও আপনার মত পাথর মানবী হতে চাচ্ছি। ভালোবাসা প্রকাশ করলে তা সৌন্দর্য হারায়। কিছু ভালোবাসা অপ্রকাশিতই শ্রেয়। আপনি কেবল আপনার দ্বায়িত্ব বোঝেন। এই নারীর মন বোঝা আপনার আয়ত্তের বাইরে। আপনি ভালো তলোয়ার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন জনাব, কোনো নারীর আবেগ নিয়ন্ত্রণ এর সুকৌশল আপনার অজানা।”

“আপনি শাহজাদি, আমি সামান্য কর্মচারী। আমি তো আপনাদের হুকুমের গোলাম। এক বার আদেশ দিয়েই দেখতেন আপনাকে ভালোবাসার। আমি তার ব্যাতিক্রম করতাম কিনা।”

সুনেহেরার চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠে। আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে ছুটে গেলো মহলের দিকে। আর এ মুখো হবে না সে। গোপন জিনিসটা যখন প্রকাশ্যে আসলো, আগের মত আর লুকোচুরি সে করতে পারবে না। মাহাদি তাকিয়ে রইলো সুনেহেরার যাওয়ার পানে। আনমনেই বলল
“এই কঠিন, শক্ত বর্মের খোলসের ভিতর যেমন রক্ত মাংসে গড়া একটা নরম দেহ আছে। তার ভেতরে সুপ্ত আছে একটা হৃদয় ও। যা অপর হৃদয়টার স্পন্দন টের পায়”

কেমন হয়েছে বলিও। তোমাদের তো আবার কমেন্ট করতে কষ্ট হয় 🫠 রিয়্যাক্ট দিও মনে করে। লেখা ছিলো তাই গল্প গ্যাপ দিই নি। কেমন হয়েছে বলিও।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply