Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ এর এর খণ্ডাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৩৪ এর খণ্ডাংশ

বাবার বাড়ির সেই পুরনো ঘরটা আজ কেমন অচেনা লাগছে মেহেরুন্নেসার কাছে। দেয়ালের রঙ, মেঝের নকশা সবকিছুই যেন আগের মতোই আছে, অথচ বাড়ির মানুষ গুলোর আচরণ বদলে গেছে।
জানালাটা খোলা। রাতের হালকা বাতাস ঢুকে পর্দাটাকে আস্তে আস্তে দোলাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা জানালার ধারে বসে আছে, এক হাত জানালার খিলে রাখা। চোখ দুটো দূরে কোথাও স্থির কিন্তু সে কিছুই দেখছে না।
তার ভেতরে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে,
বাইজিদ কি আদৌ চিঠিখানা পাঠিয়েছিল? নাকি কোনো ষড়যন্ত্র?
মনে মনে বলল
“আপনি কি একটুও ভাবলেন না আমার কথা…?
এভাবে দূরে সরিয়ে দিতে পারলেন?”

তার বুকটা হু হু করে উঠলো। চোখ ভিজে এলো, কিন্তু সে কান্নাটা আটকে রাখার চেষ্টা করলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে ফিসফিস করে বললো
“আমি কি এতটাই অচেনা হয়ে গেলাম আপনার কাছে…?”
ঠিক তখনই হঠাৎ করে তার হাতে একটা ঠান্ডা স্পর্শ। বরফের মতো ঠান্ডা। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। পুরো শরীরটা যেন কেঁপে উঠলো সেই স্পর্শে। দ্রুত করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে ঘুরে তাকালো সামনে। আর তাকাতেই তার নিঃশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো।

জানালার ঠিক বাইরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো মুখটা। মিরান। তার চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা, ঠোঁটে হালকা একটা রহস্যময় হাসি। যেন কোনো উদ্দেশ্য আছে। মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে যাচ্ছিল
“তুমি…..!”
কিন্তু সে কথাটা শেষ করতে পারলো না।
মিরান ঠান্ডা, শান্ত কণ্ঠে তাকে থামিয়ে দিলো।
“দরজা খুলে দাও।”

এক সেকেন্ড থেমে, চোখ সরাসরি মেহেরুন্নেসার চোখে রেখে বললো
“আমি ভিতরে আসবো, কথা আছে।”
তার কণ্ঠে কোনো তাড়া নেই, কিন্তু এমন এক চাপা দৃঢ়তা আছে, যেটা অস্বীকার করা যায় না।
মেহেরুন্নেসার বুক ধুকপুক করতে লাগলো। মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে সে এখানে কেন? এই সময়? আর… কী কথা?
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মিরানকে দেখে হঠাৎ করেই চারপাশটা যেন আরও অন্ধকার, আরও ভারী হয়ে উঠলো।
মেহেরুন্নেসার চোখ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। ভয়, কষ্ট, অপমান সবকিছু একসাথে জমে বিস্ফোরণ ঘটালো তার ভেতরে। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো, কাঁপতে থাকা আঙুল তুলে মিরানের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো
“তোমার জন্য আমার এতবড় ক্ষতি হয়েছে!”
তার গলা কেঁপে উঠছে, কিন্তু কথাগুলো থামছে না
“তুমি যদি আমায় সেই ঘরটাতে নিয়ে না যেতে, আজ আমি আমার স্বামীর কাছে থাকতাম! মহল থেকে আমাকে বের করে দিতো না!”
এক পা এগিয়ে এলো সে, চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে
“ওই ঘরে যে রাসায়নিক তরল আছে, আমি কি জানতাম? তুমি জেনে শুনে আমায় ওই ঘরে নিয়ে গেছিলে!”
তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত
“চলে যাও তুমি! কেন এসেছো এখানে? আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েও শান্তি হয়নি তোমার?”
কথাগুলো যেন ছুরির মতো এসে লাগলো বাতাসে। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। মিরান কিন্তু একটুও বিচলিত হলো না। তার মুখে সেই একই স্থিরতা। শুধু চোখদুটো একটু গাঢ় হয়ে উঠলো, যেন ভেতরে অন্য কোনো চিন্তা কাজ করছে।
সে ধীরে ধীরে বললো
“আমি যদি সত্যিই তোমার ক্ষতি করতে চাইতাম… আজ তুমি বেঁচে থাকতে না, বেগম ।”
মেহেরুন্নেসা থমকে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু রাগ এখনো কমেনি।
“নাটক করো না!”
দাঁতে দাঁত চেপে বললো সে। মিরান আর সময় নষ্ট করলো না। জানালার অন্ধকার থেকে একটু সামনে এগিয়ে এসে নিচু, তাড়াহুড়ো করা কণ্ঠে বললো
“শাহজাদা বাইজিদ আসছে।”
এই একটা বাক্য যেন বজ্রপাতের মতো পড়লো।
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ থেমে গিয়ে আবার জোরে ধুকপুক করতে শুরু করলো।
“কি…?”
মিরান দ্রুত বললো
“তোমাকে সরতে হবে। এখনই। আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।”
কিন্তু মেহেরুন্নেসার মুখের অভিব্যক্তি হঠাৎ বদলে গেলো। ভয় নেই। দ্বিধা নেই। বরং এক অদ্ভুত জেদ জমে উঠলো তার চোখে। সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
“না।”
মিরান অবাক হয়ে তাকালো।
মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ এবার ঠান্ডা, কিন্তু ভীষণ দৃঢ়
“আমি সরবো না।”
এক পা এগিয়ে জানালার দিকে তাকালো সে, যেন বাইরের অন্ধকার ভেদ করে কাউকে দেখতে চাইছে।
“আসুক সে।”
তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো, কিন্তু চোখে আগুন
“আমারও কথা আছে তার সাথে।”
মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
একদিকে ভুল বোঝাবুঝি, অন্যদিকে জমে থাকা ভালোবাসা আর আঘাত দুজন মানুষ মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
আর সেই মুখোমুখি হওয়াটা ভীষণ দরকার। মিরান এক মুহূর্তে বুঝে গেল মেহেরুন্নেসাকে মিথ্যা বলে সরানো যাবে না। তার চোখের সেই জেদসেটা ভাঙার মতো নয়। সময় নেই।
হঠাৎ করেই সে জানালার শিকের ফাঁক গলিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। খপ করে ধরে ফেললো মেহেরুন্নেসার কব্জি।
স্পর্শটা শক্ত, তাড়াহুড়ো করা কিন্তু ভেতরে ভয় লুকানো।
“আজ তোমাকে অপহরণ করতে আসবে, মেহেরুন্নেসা… পালাও! এখনই পালাও এখান থেকে!”

তার কণ্ঠে এবার আর কোনো রহস্য নেই সরাসরি আতঙ্ক। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেলো।
ভ্রু কুঁচকে গেলো, চোখে ফুটে উঠলো সন্দেহ।
সে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো মিরানের হাত থেকে।
“তুমি কি ভাবছো আমি কিছুই বুঝি না?”
ঠান্ডা কণ্ঠে বললো সে।নমিরান থমকে গেলো।
মেহেরুন্নেসা এক পা পিছিয়ে এলো, চোখ সরু করে তাকালো তার দিকে
“তুমি চাও না আমি শাহজাদার সাথে দেখা করি… তাই না?”
কথাগুলো ধীরে ধীরে, স্পষ্ট করে বললো সে।
“এই জন্যই এসব গল্প বানাচ্ছো? অপহরণ… পালাও… এসব বলে আমাকে ভয় দেখাতে চাইছো?”
তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হালকা হাসি ফুটে উঠলো, কিন্তু চোখে জমে থাকা কষ্টটা লুকানো গেলো না।
“আগেও তো তুমি আমাকে ভুল পথে নিয়ে গেছো… এবারও তাই?”
মিরানের মুখের রঙ বদলে গেলো।
“না, আমি”
“থামো!”
মেহেরুন্নেসা এবার কড়া গলায় থামিয়ে দিলো।
তার বুক উঠানামা করছে, চোখে পানি চিকচিক করছে
“তুমি আমার জীবনটা একবার নষ্ট করেছো এবার আর না।”
এক সেকেন্ড থেমে, খুব নিচু কিন্তু কাঁপা কণ্ঠে বললো
“আমি তার সাথে দেখা করবো আজই। সে আসুক।”
তার চোখে এবার অদ্ভুত এক দৃঢ়তা
“সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক। আমি নিজের মুখে শুনতে চাই।”
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মিরান নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সময় ফুরিয়ে আসছে…বকিন্তু মেহেরুন্নেসা এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। তার জেদই তাকে চালাচ্ছে।
আর এই জেদ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা এখনো কেউ জানে না।

উপায় না পেয়ে মিরান শেষবারের মতো মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক চাপা আতঙ্ক। কিন্তু কিছু বললো না আর। নিঃশব্দে সরে গেল অন্ধকারের ভেতর। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার ছায়াটাও মিলিয়ে গেল, যেন সে কখনো এসেই ছিল না। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ।
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি খচখচ করছে কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করলো।
না এসব ফাঁকি। আমাকে সরানোর চেষ্টা।
ঠিক তখনই দরজায় হালকা শব্দ।
“মেহের আপা…?”
ছোটভাবি শিমুর কন্ঠ পেলো।
মেহেরুন্নেসা মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। শিমু ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে তার কাছে এগিয়ে এলো।
“আপা, তুমি এখানে একা বসে আছো কেন?”
মেহেরুন্নেসার ঠোঁটে হালকা একটা ক্লান্ত হাসি ফুটলো।
“শাহজাদা আসছে।”
একটা বাক্য শুনেই শিমুর চোখ চকচক করে উঠলো।
“সত্যি?!”
উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করে ফেললো সে। তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করলো
“কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে?”
মেহেরুন্নেসা এক সেকেন্ড থামলো। মিরানের কথা মনে পড়লো কিন্তু সে মাথা নাড়িয়ে সেটা ঝেড়ে ফেললো।
“একজন রক্ষী এসে জানিয়ে গেলো”
শান্তভাবে বললো সে। শিমু আর কিছু ভাবলো না। আনন্দে ভরে গেল তার মুখ। দ্রুত এসে মেহেরুন্নেসার পাশে বসে পড়লো, হাতটা ধরে হালকা ঝাঁকিয়ে বললো
“এই তো ভালো খবর! দেখো, একটু সুন্দর করে সেজেগুজে থাকো মেহের।”
তার কণ্ঠে ছিল মিষ্টি উৎসাহ
“শাহজাদা যেন চোখ ফেরাতে না পারে তোমার দিক থেকে। তোমাকে যেন আবার মহলে নিয়ে যায়।”
একটু থেমে, মায়া ভরা চোখে তাকালো
“তাকে ছাড়া কী হাল হয়েছে তোমার… আমি তো দেখতেই পারছি।”
মেহেরুন্নেসা কিছু বললো না। শুধু চোখ নামিয়ে রাখলো। শিমু উঠে দাঁড়ালো তাড়াহুড়ো করে।
“আমি যাই”
“কোথায় যাচ্ছো?”
মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করলো। শিমু হেসে বললো
“নাশতার আয়োজন করতে! সে শাহজাদা হলেও তো এই বাড়ির জামাই।”
তার চোখে দুষ্টুমি মেশানো উজ্জ্বলতা
“জামাই এলে খালি মুখে বসিয়ে রাখা যায় নাকি?”
বলেই সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। ঘরটা আবার শান্ত হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসার মুখে অল্প হাসি কিন্তু চোখের পানি বাঁধ মানছে না। এই চোখের পানি কষ্টের না, অতি আনন্দের। আজ তিনটা দিন হয় স্বামীকে দেখে না। তিনটা দিন যেন তিনটে যুগেট ন্যায় দীর্ঘ লাগছে। উঠে চোখের পানি মুছে মহল থেকে আনা পুটলা টা হাতড়ে একটা লাল ঘাগড়া বের করলো। পোষাক টা তার খুব পছন্দের ছিলো। ভেবেছিলো একদিন পরবে। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। আজ সেই ঘাগড়া টা পরলো। সাথে জুরির কাজ করা ওড়না। আয়নায় দেখলো নিজেকে। লম্বা কেশ-রাশিতে চিরুনি চালিয়ে আচড়ে নিলো। তার কাছে কোনো প্রসাধনী নেই। কেবল এই পোষাক টাই যেন তার সৌন্দর্য কে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মেহেরুন্নেসা সেজে-গুজে, নিঃশব্দে বসে আছে ঘরের মাঝখানে। হৃদপিণ্ডটা অকারণেই দ্রুত ধুকপুক করছে।
ধাম!
হঠাৎ করে দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়লো কেউ। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠে দাঁড়ালো। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখে ঝলসে উঠলো একরাশ আশার আলো।
“আপনি…?”
সে তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে গেলো।
কিন্তু দুই পা এগোতেই থেমে গেলো। ঘরের ভেতর কেউ নেই। দরজার খিলটা টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে মেঝেতে, কিন্তু কোনো মানুষ নেই।
তার নিঃশ্বাস আটকে গেলো।
“কে…?”
খুব আস্তে করে ডাকলো সে। কোনো সাড়া নেই।
একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো তার শরীর বেয়ে।
সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পা দুটো কাঁপছে হালকা, তবুও নিজেকে সামলে উঠোনে এসে চারপাশে তাকাতে লাগলো।
“কে আছে এখানে…?”
জোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে পুরো উঠোন। সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তবুও যেন কোথাও কেউ লুকিয়ে আছে। সে একবার ডানে তাকায় তারপর বামে খালি। কোথাও কেউ নেই।

খড়ের স্তূপের আড়ালে, অন্ধকারের ভেতর
একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ স্থির হয়ে আছে তার উপর। শকুনের মতো।
লোভী, হিসেবি,শিকার দেখার মতো দৃষ্টি।
জোৎস্নার ক্ষীণ আলোয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো সেই ছায়ামূর্তি। বলিষ্ঠ দেহ, পুরো শরীর আবৃত।
সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ঠান্ডা হাসি। নাসিরাবাদের বড় জমিদারের ছেলে। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই। আজ সে শিকার নিতে এসেছে।
লোকটা ধীরে ধীরে শ্বাস নিলো। তার চোখে হতাশার ঝিলিক, আজকের মূল শিকার তো অন্য কেউ ছিল।
সে এসেছিল বাইজিদকে শেষ করে দিতে।
খবর পেয়েছিল আজ রাতেই বাইজিদ এই বাড়িতে আসবে। সব হিসেব কষেই এসেছে সে। অন্ধকার, নির্জনতা, অপ্রস্তুত মুহূর্ত সব তার পক্ষে।
কিন্তু বাইজিদ এল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। কেন এল না? খবর কি ভুল ছিল? নাকি কেউ আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছে?
ভাবনার ভেতরেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আবার গিয়ে থামলো উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন্নেসার উপর। জোৎস্নার আলোয় মেয়েটা যেন অন্য এক জগতের। নরম আলো গায়ে পড়ে তাকে আরও স্বচ্ছ, আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অজান্তেই লোকটার চোখে বদলে গেলো সেই শিকারের হিসেব।

এইবার তার চোখে অন্যরকম আগ্রহ। ধীরে ধীরে ঠোঁট বাঁকালো সে। এমন রূপ জীবনে দুটো দেখিনি। তার দৃষ্টি আরও গভীর হলো, যেন চোখ দিয়েই ছুঁয়ে ফেলতে চাইছে।
“একে আমার চাই, যেভাবেই হোক।”

একটু থামলো সে, নিজের ভেতরের লোভটাকে গুছিয়ে নিয়ে মনে মনে হিসেব কষলো। আগে সহজ পথে চেষ্টা করবো সম্মান দিয়ে। যদি নিজে থেকে রাজি হয়, তার চোখে তখন ঠান্ডা, অন্ধকার এক ছায়া নেমে এলো।
আর যদি না হয়? ভাবনাটা শেষ করলো না, কিন্তু তার চোখই বলে দিলো বাকিটা।
ওদিকে মেহেরুন্নেসা অনেকক্ষণ চারপাশে খুঁজেও কাউকে পেলো না। তার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেলো, কিন্তু নিজের মনকে বোঝালো
হয়তো ভুল দেখেছি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে এলো সে। ভাঙা দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেললো। খিলটা প্রায় ভেঙেই গেছে।
“কালই ঠিক করাতে হবে…”
নিজের মনেই বললো সে। তারপর সাবধানে দরজাটা যতটা সম্ভব ঠেকিয়ে রেখে আবার নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। ঘরের ভেতরে ঢুকে আবার খিল তুলে দিলো যদিও জানে, এই খিল এখন আর তেমন ভরসার না।
তবুও একটু নিরাপত্তার ভান। বিছানার ধারে এসে বসলো সে। অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।
কিন্তু সে জানে না এই বাড়ির আঙিনায়, অন্ধকারের ভেতরে, এখনও কেউ রয়েছে।
যে শুধু দেখছে না সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

খড়ের স্তূপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কিছুক্ষণ আগেও হিসেব কষছিল কোথায় আঘাত করবে, কীভাবে বাইজিদকে শেষ করবে।
কিন্তু এখন সব হিসেব এলোমেলো। তার দৃষ্টি যেন আটকে গেছে এক জায়গায়, মেহেরুন্নেসার উপর।
জোৎস্নার আলোয় মেয়েটার অবয়ব বারবার তার চোখে ভেসে উঠছে। সে আর উঠোনে নেই, ঘরে ঢুকে গেছে তবুও তার মনে হচ্ছে, এখনো যেন ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে একরকম তাচ্ছিল্য নিয়ে ফিসফিস করে উঠলো
“বাইজিদ এত সুন্দরী বউ রেখে দূরে থাকে কী
করে?”

তার ঠোঁটে কটু হাসি ফুটে উঠলো।
“আমার যদি এমন রূপসী স্ত্রী থাকতো… তার এক কথায় গোটা রাজ্য এনে পায়ের কাছে রাখতাম।”
চোখে তখন লোভের ঝিলিক।
“আর ওই বোকা তাকে মহল থেকে বের করে দিয়েছে!”
সে একবার হালকা হেসে উঠলো, শব্দটা নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ
“কানায় কখনো দানা চিনে না…”
তার বুকের ভেতর যে আগুনটা কিছুক্ষণ আগে প্রতিশোধের ছিল, সেটা এখন অন্য কিছুর রূপ নিয়েছে।
বাইজিদকে হত্যার পরিকল্পনা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো তার মাথা থেকে। তার জায়গা দখল করলো একটাই চিন্তা, মেহেরুন্নেসা কে কি করে কাছে পাবে।
তার চোখে এখন অদ্ভুত এক নেশা। যেন কোনো শিকারির চোখে হঠাৎ করে অন্যরকম লোভ জন্ম নিয়েছে। সে চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্ত।
মনে ভেসে উঠলো সেই মুখ সেই চোখ সেই জোৎস্নায় ভেজা রূপ।

একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলো সে।
“এমন রূপ…”
ধীরে ধীরে চোখ খুললো।
তার দৃষ্টিতে এখন আর দ্বিধা নেই শুধু একরাশ আকাঙ্ক্ষা।
“এটা হাতছাড়া করা যাবে না…”
অন্ধকারের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা বুঝতেই পারলো না কখন তার প্রতিশোধের আগুন নিভে গিয়ে অন্য এক আগুন জ্বলে উঠেছে।


মহলের ভেতর তখন গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু দূরে কোথাও প্রহরীর হাঁটার ক্ষীণ শব্দ আর মাঝে মাঝে বাতাসে দুলে ওঠা মশালের আগুন।
নিজের কক্ষের দরজা ভেতর থেকে আস্তে করে বন্ধ করেই দেয় সুনেহেরা। চারপাশে একবার তাকায় কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে সে দেয়ালের এক কোণের দিকে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে চাপ দেয় লুকানো পাথরের উপর।
মৃদু ঘর্ষণের শব্দ। দেয়ালের এক অংশ সরে গিয়ে খুলে গেল গোপন পথ।

একটুও দেরি করলো না সে। দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়লো। অন্ধকার সরু পথটা পেরিয়ে সে পৌঁছালো মহলের পেছনের দিকটায় আস্তাবলের কাছাকাছি। রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগলো তার মুখে।
আস্তাবলে ঢুকতেই ঘোড়াগুলোর হালকা নড়াচড়া, শ্বাসের শব্দ।
সুনেহেরা সোজা এগিয়ে গেল নিজের ঘোড়ার কাছে। সোনালী রঙের, বলিষ্ঠ সেই ঘোড়াটা তাকে দেখেই হালকা হ্রেষাধ্বনি করলো। যেন চিনে ফেলেছে।
সে মৃদু হাসলো, হাত বুলিয়ে দিলো তার গলায়।
“চুপ… আজ আমাদের দূরে যেতে হবে।”

বাঁধন খুলতে খুলতেই হঠাৎ মাটিতে লম্বা একটা ছায়া পড়লো তার সামনে। অস্বাভাবিক বড়… আর নড়ছে। সুনেহেরার হাত থেমে গেলো। ধীরে ধীরে সে ঘুরে দাঁড়ালো। আর ঘুরতেই— তার চোখ স্থির হয়ে গেলো। মাহাদি।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে, তবুও তার অবয়ব স্পষ্ট। চোখ দুটো সোজা তাকিয়ে আছে সুনেহেরার দিকে।

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বললো না।বনীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো। তারপর সুনেহেরা ঠোঁট শক্ত করে বললো
“আপনি এখানে কী করছেন?”
কণ্ঠে বিরক্তি, তিরস্কার।
“আমার পেছনে পেছনে আসার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেন না , তাই না?”
মাহাদি কোনো উত্তর দিলো না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।বএই নীরবতাই যেন আরও রাগ বাড়িয়ে দিলো সুনেহেরার।
“সব জায়গায় নজরদারি করাই আপনার কাজ? নাকি, আমাকে আটকাতে এসেছেন?”

তার কণ্ঠে তাচ্ছিল্য মেশানো তীক্ষ্ণতা।
“পথ ছাড়ুন, মাহাদি। আমার সময় নেই।”

মাহাদি তখনও নিশ্চুপ। সুনেহেরা বিরক্ত হয়ে আর কিছু বললো না। দ্রুত ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলো। তার সোনালি চুলগুলো বাতাসে উড়ে উঠলো, মশালের আলোয় ঝলসে উঠলো যেন সোনার মতো। এক ঝটকায় লাগাম টানলো সে।

ঘোড়াটা ছুটে বেরিয়ে গেলো আস্তাবল থেকে।
মহলের পেছনের ফটক পেরিয়ে সে সোজা উত্তরের দিকে ছুটতে লাগলো। রাতের বাতাস তার মুখে আছড়ে পড়ছে, চুলগুলো উড়ছে পেছনে।
কিছুটা দূর যাওয়ার পর হঠাৎ সে পিছনে তাকালো। আর তাকাতেই চোখে পড়লো আরেকটা ঘোড়া। আর তার উপর মাহাদি।
নিঃশব্দে, ঠিক তার পেছনেই ছুটে আসছে।
সুনেহেরার চোখে রাগ জ্বলে উঠলো।
সে ঘোড়ার গতি একটু কমিয়ে পিছনে চিৎকার করে উঠলো
“জানের মায়া নেই নাকি আপনার? এত নিষেধ করি তবুও আমার পিছনে কেন পড়েন?”

বেশি বেশি রিয়্যাক্ট দিও বুলবুলি রা। অনেক কষ্ট করে এতগুলো শব্দ লিখি রোজ। কেমন হয়েছে জানিও।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply