নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৩২ এর শেষাংশ
প্রভার কথাটা শেষ হতেই বাইজিদের চোখের দৃষ্টি যেন এক মুহূর্তে দূরে কোথাও চলে গেল।
সে আর প্রভাকে দেখছে না সে দেখছে অতীত।
একটা রাত যখন পুরো মহল একইভাবে থমকে গিয়েছিল। রত্নপ্রভার সেই ঘটনা।
সেই ভয়াবহ সময়, যেটা আজও এই প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে নীরব হয়ে লেগে আছে।
সেদিনও এমনই একটা ভাঙনের মুহূর্ত ছিল।
ভুল বোঝাবুঝি, চাপা অভিযোগ, আর অসহ্য মানসিক চাপ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, রত্নপ্রভা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। পরবর্তীতে তাকে যখন পাওয়া যায়, তখন পরিস্থিতি খুবই গুরুতর ছিল।
মহল জুড়ে হাহাকার পড়ে যায়। চিকিৎসকরা দৌড়ে আসে, স্থানীয়রা নয় বরং দূর দেশ থেকে আনা হয় অভিজ্ঞ চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত।
তারা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অবস্থা এতটাই জটিল ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়নি সেই অবস্থায়, যেভাবে সবাই চেয়েছিল। এই ঘটনার পর মহলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিচার তখন থেমে থাকা সম্ভব ছিল না, কারণ অনেক কিছুই তখন সাক্ষ্য-প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, আর রত্নপ্রভার অবস্থাও এমন ছিল যে তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না।
পরে চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘ চিকিৎসা ও জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার চেহারায় পরিবর্তন আনা সম্ভব যাতে তার পরিচয় ও নিরাপত্তা দুটোই রক্ষা পায়। সবকিছুর শেষে রত্নপ্রভার দাফন সম্পন্ন হয়, আর সেই শূন্যতা ঢাকতে এক নতুন পরিচয়ের জন্ম দেওয়া হয় আরেক রত্নপ্রভা।
যে আসলে সেই চন্দ্রপ্রভা ছিল, কিন্তু এক অন্য নাম, এক অন্য পরিচয়ে এই মহলে বেঁচে থাকে চুপচাপ, আড়ালে, এক অদৃশ্য ইতিহাস হয়ে। সবাই জানে বিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে চেহারা বদলে ফেলা হয়েছে রত্নার। অথচ রত্নার জায়গা হয় জমিদার দের পুরনো কবরস্থানের এক কোণে। মাইমুনা শেখ এর কবরের পাশে। আর রত্না সেজে মহলে রয়ে যায় চন্দ্রপ্রভা। যা কেবল বাইজিদ জানে আর জানে মিরান। নিঃসন্দেহে এই মহলের প্রতিটা খারাপ সময়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে মিরান। নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়েছে তাদের উপকারে।
এই স্মৃতি থেকে বের হয়ে আসে বাইজিদ। সে ধীরে ধীরে প্রভার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়।
তার কণ্ঠ আগের চেয়ে নিচু, কিন্তু দৃঢ়। এক মুহূর্ত থেমে সে আবার সামনে তাকায়।
“এবার আমাকে নিজের চোখে দেখা সত্যটাই দেখতে হবে সকলের সামনে। বাস্তবনা রাখতে হবে আড়ালে।”
আড়ালের সেই নির্জন জায়গায় প্রভার কণ্ঠ দ্রুত হয়ে উঠেছিল।
প্রভা একটু এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল
“এই ফাঁদটা আবারও সাজানো হতে পারে। এবার দয়া করে এতে পা দিও না।”
তার চোখে ছিল তাড়াহুড়ো, ভয় আর পুরোনো অভিজ্ঞতার ভার।
“মেহেরুন্নেসার বিরুদ্ধে যা দেখানো হচ্ছে। সবটাই পরিকল্পিত। সেই তরল দিয়ে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে, এটা অসম্ভব না।”
সে শ্বাস নিয়ে আবার বলল
“কেউ চাইছে তোমাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে।”
কিন্তু বাইজিদ নড়ল না।
তার মুখে সেই আগের কঠোরতা, তবে এবার তার ভেতরে এক ধরনের ক্লান্ত স্থিরতা আছে। সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে প্রভার দিকে তাকাল।
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়
“প্রভা… আমি আর অনুমানের উপর সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।”
সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“সবকিছু সবার সামনে এসেছে। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, নিজের হাতে যা স্পর্শ করেছি তার ভিত্তিতেই আমি বিচার করেছি।”
এক মুহূর্ত থেমে সে যোগ করল
“এখন আর কোনো ফিসফাস, কোনো সন্দেহ আমাকে নড়াতে পারবে না।”
তার চোখে এবার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত।
“যদি সত্য লুকানো থাকে, সেটাও সামনে আসবে। কিন্তু আমি আর অন্ধভাবে কিছু বিশ্বাস করব না।”
বাইজিদ একবার প্রভার দিকে তাকিয়ে সেখান
থেকে সরে যেতে শুরু করল।
তার পা ধীর, কিন্তু নিশ্চিত। আর প্রভা দাঁড়িয়ে রইল, বুঝে গেল এই মুহূর্তে তাকে থামানো আর শুধু কথা দিয়ে সম্ভব না।
মেহেরুন্নেসা কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সবকিছু তার চারপাশে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
এই কক্ষটা সাধারণ কোনো ঘর না। এটা মেহেরুন্নেসার জান্নাত। এটা রাজকীয় কক্ষ উঁচু ছাদের বিশাল ঘর, যেখানে দেয়ালজুড়ে সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা। সোনালি রঙের কারুকাজ আলো পড়লে হালকা ঝলমল করে ওঠে। জানালার ভারী পর্দাগুলো নড়ছে খুব ধীরে, যেন বাতাসও এখানে ঢুকতে ভয় পায়।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা অনুভব হয়, সেটা হলো গন্ধ। একটা গভীর, ভারী আতরের ঘ্রাণ পুরো কক্ষটাকে ঘিরে রেখেছে।
এটা সাধারণ কোনো সুগন্ধি না এটা বাইজিদের উপস্থিতির ঘ্রাণ। মিশ্র এক আতর, যার মধ্যে আছে কাঠের উষ্ণতা, কিছুটা কস্তুরির তীক্ষ্ণতা আর এমন এক পুরুষালি গাম্ভীর্য, যা বাতাসে মিশে থাকলেও যেন চোখ বন্ধ করলেই তাকে অনুভব করা যায়।
এই ঘ্রাণই মেহেরুন্নেসার বুকটা আরও বেশি চেপে ধরছে। সে ধীরে ধীরে কাপড়গুলো গুছাতে থাকে, কিন্তু প্রতিটা কাপড় ধরতেই হাত কেঁপে ওঠে।
যেন এগুলো শুধু কাপড় না এগুলো স্মৃতি।
হঠাৎই তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
সে বসে পড়ে। তার কণ্ঠ ভাঙা, অসহায়।
“একটা সামান্য ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি?”
সে মাথা নিচু করে ফেলে।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মুহূর্তগুলো
এই ঘরেই সে কখনো ভয় পেয়েছে, কখনো শান্তি পেয়েছে, আবার কখনো বাইজিদের নীরব দৃষ্টিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।
একটা সময় এটা ছিল তার নিরাপদ জায়গা।
তার অপেক্ষার জায়গা। তার ভালোবাসার অস্তিত্বের প্রমাণ। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দেয় দেয়ালের দিকে।
আঙুল ছুঁয়ে দেয় ঠান্ডা পাথরের গায়ে।
“এগুলো সব… এখন আমার না…”
কণ্ঠটা প্রায় শোনা যায় না। তার গলার ভেতর কান্না জমে আছে, কিন্তু বের হতে পারছে না ঠিকভাবে। সে আবার তাকায় বিছানার দিকে।
সেই বিছানা, যেখানে কত রাত নীরবে কেটেছে
কখনো কথা, কখনো নীরবতা, কখনো অদ্ভুত এক দূরত্ব।
বাতাসে এখনও সেই আতরের ঘ্রাণ।
মনে হয়, বাইজিদ এখনো এখানেই আছে কোথাও দাঁড়িয়ে, নীরবে তাকিয়ে। মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ করে নেয়।
“আমি কি সত্যিই তাকে ছাড়া থাকতে পারব?”
প্রশ্নটা সে নিজেকেই করে, কিন্তু উত্তর আসে না।
শুধু ঘরের নীরবতা আর সেই ভারী আতরের ঘ্রাণ তাকে আরও বেশি ভেঙে দিতে থাকে ধীরে, নির্মমভাবে, যেন এই ঘরটাই তাকে শেষবারের মতো ভালোবাসার স্মৃতি থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। কক্ষের ভারী নীরবতা ভেঙে হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। বাইজিদ ভেতরে প্রবেশ করল। তার পায়ের শব্দও যেন এই রাজকীয় কক্ষের পাথরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে।
মেহেরুন্নেসা মাথা তুলে তাকাল। দুইজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইজিদ চোখ সরিয়ে নিল।
একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল সে, যেন নিজের ভেতরের কোনো ঝড়কে জোর করে থামাচ্ছে। তার চোখ যদি আরেক সেকেন্ডও ওই দৃষ্টির সামনে থাকত, তাহলে হয়তো সিদ্ধান্তটা বদলে যেত পারে এই ভয়টা সে নিজেই বুঝতে পারছে।
সে ধীরে ধীরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল
“হয়ে গেছে… গোছগাছ শেষ করো।”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভাঙা।
“ভোরের আলো ফুটতে চলেছে। বেরিয়ে পড়ো।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল বাইজিদের দিকে যেন শেষবারের মতো পুরো মানুষটাকে চোখে ভরে নিতে চাইছে।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সে কাঁদছে না পুরোপুরি ভেঙে।
কণ্ঠটা কাঁপছে, তবুও সে বলল
“আপনি কি… আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন, শাহজাদা?”
একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল
“আপনার… একটুও কষ্ট হবে না?”
এই প্রশ্নটা যেন ঘরের বাতাসকেও ভারী করে দিল।
বাইজিদ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল, চোয়াল টানটান।
সে তাকাল না মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসা অবিলম্বে ছুটে এসে আছড়ে পড়লো বাইজিদ এর বুকে। কেদে উঠলো নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে। যতটুকু কান্না ভিতরে জমে ছিলো সব উগরে দিতে চাইলো। বাইজিদ এখনো পাথরের মত সটান।
শুধু নিচু গলায়, প্রায় নিজের সাথে যুদ্ধ করে বলল
“যাও।”
শব্দ টুকুর ভেতরে লুকানো ছিল হাজারটা না বলা কথা, ভাঙা সিদ্ধান্ত আর আটকে রাখা অনুভূতি।
মেহেরুন্নেসা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। আর সেই রাজকীয় কক্ষ, যেখানে একসময় ভালোবাসা আর নীরবতা পাশাপাশি ছিল। আজ সেখানে শুধু থেকে গেল আতরের ঘ্রাণ, ভাঙা নীরবতা আর বিদায়ের ভারী প্রতিধ্বনি। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। প্রতিটা ধাপ যেন তার বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো বসে যাচ্ছিল। চোখ ভেজা, কিন্তু কান্না সে আটকানোর চেষ্টা করছে কারণ এই মুহূর্তে ভেঙে পড়াও তার জন্য নিষেধ হয়ে গেছে।
কক্ষ থেকে বের হওয়ার পরও সেই আতরের ঘ্রাণ যেন তার গায়ে লেগে আছে। মনে হচ্ছে, বাইজিদের উপস্থিতি তাকে ছাড়ছে না। শুধু তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল সিমরান।
তার চোখে এক ধরনের ঠান্ডা সন্তুষ্টি। সে মেহেরুন্নেসাকে দেখে একটু এগিয়ে এল, কণ্ঠে ইচ্ছাকৃত তীক্ষ্ণতা মিশিয়ে বলল
“শেষ পর্যন্ত তো বেরোতেই হল, তাই না?”
মেহেরুন্নেসা থেমে গেল, কিন্তু তাকাল না। সিমরান একটু হাসল, তারপর ধীরে ধীরে বলল
“তুমি যাওয়ার পর পরই শাহজাদার সাথে নিকাহ সেরে নেব।”
এই কথাটা যেন বাতাস থামিয়ে দিল। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর এক মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে গেল। হাতের আঙুল শক্ত হয়ে এলো, ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু সিমরানের দিকে একবার তাকাল। তারপর চোখ সরিয়ে নিল, যেন এই কথাটার উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
সে আবার সিঁড়ি নামতে শুরু করল।
তবে প্রতিটা ধাপ আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার ভেতরে একটা আশা জেগে উঠল ছোট, ভাঙা, কিন্তু এখনো বেঁচে থাকা। সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল। তার চোখ খুঁজে নিল বাইজিদকে। মনে হলো, যদি সে একবার তাকায় যদি শুধু একবার ডাকে তাহলে হয়তো সবকিছু বদলে যাবে।
কিন্তু বাইজিদ দাঁড়িয়ে ছিল স্থির। তার দৃষ্টি অন্যদিকে, মুখ শক্ত। মেহেরুন্নেসার চোখের দিকে তাকাল না সে। তার কণ্ঠ ভারী, ঠান্ডা
“কোনো ছলনাময়ীকে আমি ভালোবাসি না।”
এই কথাটা যেন সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে ধাক্কা দিতে লাগল। মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। আর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে তার মনে একটাই অনুভূতি রয়ে গেল। ভালোবাসা শেষ হয়নি… শুধু তাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। মেহেরুন্নেসাকে ধীরে ধীরে ঘোড়ার গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। মহলের উঠোনে তখন ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
গাড়ির সামনে এসে রক্ষীরা থেমে গেল।
বাইজিদ সিঁড়ির উপরের ধাপে দাঁড়িয়ে ছিল। দুই হাত পেছনে গুঁজে রাখা, দৃষ্টি সামনে কিন্তু কোথাও স্থির নয়। মুখ শক্ত, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
সে শান্ত গলায় নির্দেশ দিল
“তাকে নিরাপদে পিতাগৃহে পৌঁছে দাও।”
কণ্ঠে আদেশ ছিল, কিন্তু তাতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। শুধু দায়িত্বের কঠোরতা।
রক্ষীরা মাথা নুইয়ে মেহেরুন্নেসাকে ঘোড়ার গাড়িতে উঠতে সাহায্য করল।
সে উঠতে গিয়ে এক মুহূর্ত থেমে গেল।
পেছনে তাকাল। পুরো মহলের দিকে, সেই সিঁড়ির দিকে, আর সবচেয়ে বেশি বাইজিদের দিকে।
তার চোখ খুঁজছিল কিছু একটা একটা ইশারা, একটা ডাক, একটা “থামো”।
কিন্তু কোনো শব্দ এলো না।
বাইজিদ তখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে। পেছনে হাত, সোজা দৃষ্টি, মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।
মেহেরুন্নেসা আর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলে উঠলো
“এই মহল আমায় আবারও ডাকবে। আমি আবারও ফিরবো। মহলে থাকা প্রত্যেকটা কলুষিত চেহারায় আগুন জ্বালাতে আমায় ফিরতেই হবে”
তারপর ধীরে ধীরে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসল।
পর্দাটা নামতে শুরু করল। ঠিক তখনই, সিঁড়ির উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদের দিকে একবার শেষবারের মতো তার চোখ গেল।
পরদার ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা যায় সে শুধু তাকিয়ে আছে। তারপর পর্দা পুরোপুরি নেমে গেল। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
আর সেই মুহূর্তে, সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদ আর নড়ল না। কিছুক্ষণ সে একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো স্থির।
গাড়িটা যত দূরে যেতে লাগল, ততই তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত যখন মেহেরুন্নেসার গাড়ি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল।
বাইজিদের ভেতরের বাঁধটা ভেঙে গেল। সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। আর পর্দার আড়ালে, নিঃশব্দ সেই গাড়ির ভিতর বসে থাকা একজন মানুষ ফেটে পড়ল বাধনহারা কান্নায়। মেহেরুন্নেসাকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িটি ধীরে ধীরে পথ চলতে শুরু করল। রাজপ্রাসাদের সীমানা পেরিয়ে বাইরের গ্রামীণ পথ, ধুলোভরা রাস্তা আর দূরের সবুজ মাঠ সবকিছু যেন তার ভেতরের ভারী নীরবতার সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
পথটা সহজ ছিল না। সময় গড়িয়ে যেতে যেতে সকাল পেরিয়ে দুপুর নেমে এলো। সূর্যের আলো তীব্র হয়ে উঠলেও মেহেরুন্নেসার চোখে তা কোনো উষ্ণতা আনতে পারছিল না।
গাড়ি থামল শেষ পর্যন্ত হাওলাদার বাড়ির সামনে। সাহাবাদের শেষ প্রান্তে, তার বাবার বাড়ি।
রক্ষীরা নেমে প্রথমে চারপাশ দেখে নিল। তারপর তারা মেহেরুন্নেসাকে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, সে একজন সম্মানিত অতিথি হিসেবে ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবটা ছিল ভিন্ন।
বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই দরজার ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
প্রথমে বেরিয়ে এল তার ফুপু, খুব মল্লিকা। তার চোখে আনন্দ আর কৌতূহলের ঝিলিক। তার পেছনে মা রমলা বেগম।
মল্লিকা প্রায় দৌড়ে এসে বলল
“মা রে! তুই আসছিস!”
রমলা বেগমও এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন মাঝপথে।
কারণ মেহেরুন্নেসার মুখটা দেখে তিনি চমকে গেলেন।
না কোনো হাসি, না কোনো স্বস্তি শুধু এক ধরনের থমথমে, ভারী শূন্যতা। মল্লিকার মুখের হাসিটাও ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল।
“কি হয়েছে?”
সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল। রমলা বেগম আরও কাছ থেকে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। চোখে সামান্য লালচে ভাব, চেহারায় ক্লান্তি, আর সবচেয়ে বেশি একটা ভাঙা নীরবতা।
তিনি ধীরে বললেন
“মা… কিছু একটা হয়েছে, তাই না?”
মেহেরুন্নেসা কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার সেই নীরবতা ঘরের ভেতর হঠাৎ করেই একটা ভারী চাপ তৈরি করে দিল।
মল্লিকা আর রমলা বেগম একে অপরের দিকে তাকালেন। তারা বুঝতে পারছিলপন না কি হয়েছে। তবুও মল্লিকা বলল
“আগে ভিতরে চল পরিস্কার হয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিবি। একটু বিশ্রাম নিবি তারপর সব শুনবো”
সাহাবাদ প্রাসাদের বৈঠকটা সেদিন সকাল থেকেই টানটান ছিল। জমিদারদের প্রতিনিধি, বাণিজ্যিক দিককার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সব মিলিয়ে বাইজিদের পুরো মনোযোগ সেখানেই আটকে ছিল। দিনটা কেটে গেল হিসাব, সিদ্ধান্ত আর নানা প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে। কোথাও এক মুহূর্তের জন্যও থামার সুযোগ ছিল না। মেহেরুন্নেসার নামটা তার মনে খুব একটা আসেনি তা না, বলা ভালো, সে নিজেই ইচ্ছা করে সেটা দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
সন্ধ্যার আগেই বৈঠক শেষ হলো।
অতিথিদের যথাযথ সম্মান ও আপ্যায়নের পর ধীরে ধীরে বিদায় জানানো হলো। পুরো প্রাসাদ তখন আবার শান্ত হয়ে এলো, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর ছিল দিনের ক্লান্তি। বাইজিদ ধীরে ধীরে নিজের কক্ষে ফিরল। শরীরটা ভারী লাগছিল, মাথাটাও একটু ঝিমঝিম করছিল। দরজায় ঢুকেই অভ্যাসের মতো তার কণ্ঠ বেরিয়ে এল
“মেহের…”
সে একটু থামল, আবার ডাকল
“মেহের!”
তার গলায় সামান্য বিরক্তি ছিল। এত দেরি কেন আসছে সে? কিন্তু দ্বিতীয়বার ডাকতে গিয়েই হঠাৎ তার হাত থেমে গেল। শব্দটা গলায় আটকে গেল।
তার মনে ধীরে ধীরে একটা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল।
মেহের আর নেই। এই কক্ষটা এখন আর আগের মতো না। বাতাসে কোনো পরিচিত উপস্থিতি নেই, দরজার পাশে কোনো নড়াচড়া নেই, সেই হালকা পদশব্দ নেই, যা শুনে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।
বাইজিদ ধীরে ধীরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য কোনো কঠোরতা রইল না।
শুধু একটা নীরব উপলব্ধি। সে ডাকছে… কিন্তু যে মানুষটার নাম ডাকছে, সে আর এই প্রাসাদে নেই। বাইজিদের বুকটা হঠাৎই ভারী হয়ে এলো।
একটা অদ্ভুত চাপ যেন ভেতর থেকে তাকে চেপে ধরল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দম যেন ঠিকমতো ভেতরে ঢুকছে না। সে এক পা পিছিয়ে দেয়, তারপর থেমে যায়।
নিজের কক্ষটা আজ অচেনা লাগছে। যে ঘর একসময় মেহেরুন্নেসার উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত ছিল, সেই ঘর এখন যেন শূন্যতার ভারে নুয়ে পড়েছে। বাতাসেও কোনো উষ্ণতা নেই, দেয়ালেও কোনো সাড়া নেই। বাইজিদ হাত দিয়ে বুক চেপে ধরল। তার ভেতরে ছটফটানি শুরু হলো। মনে হচ্ছে কিছু একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে কিন্তু সে কিছুই ধরতে পারছে না।
“মেহের…”
শব্দটা আবারও বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু গলায় আটকে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অসহায়তা ভেসে উঠল।
এই প্রথম সে বুঝল শাসকের ক্ষমতা এখানে কোনো কাজে আসে না। সে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে গিয়ে বিছানার কিনারে বসে পড়ল।
শরীর ভারী, মাথা ঝিমঝিম করছে।
মনে পড়ছে এই ঘরে কত সুখ ছিল, কত সহজভাবে সবকিছু চলছিল। হঠাৎ তার চোখ বিছানার ওপর পড়ে থাকা মেহেরুন্নেসার একটা ওড়নার দিকে। ভাজ করা আকাশি রঙের পাতলা ওড়না। বোধহয় থলে তে সব ভরার সময় এটার কথা ভুলে গেছে। দ্রুত গিয়ে ছিনিয়ে নিলো ওড়না টা। দুহাতে করে এনে মুখ গুঁজল তাতে। এটাতে এখনো মেহেরুন্নেসার গায়ের গন্ধ লেগে আছে। বাইজিদ মন ভরে শুঁকে নিলো।
বুকের যন্ত্রণা টা ক্রমশ বাড়ছে। সে যতক্ষন কক্ষে থাকতো মেহেরকে হেঁশেলে পর্যন্ত যেতে দিত না। অন্দরে থাকলে বার বার দাসী দের দিয়ে খবর পাঠাতো। সেই মেহেরুন্নেসা মহল ছেড়ে চলে গেছে। আর সে নিজে বের করে দিয়েছে। ওড়বা টা বুকের সাথে চেপে ধরে শুয়ে পড়লো পালঙ্কে। কোনো কিছুতেই তার হৃদয় শীতল হচ্ছে না। আগুণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এমন সময় ঘরে আসলো সিমরান। কোনো প্রকার অনুমতি না নিয়েই বড় বড় পা ফেলে ঢুকলো বাইজিদের কক্ষে। বাইজিদ তখনো উপুড় হয়ে শুয়ে। সিমরান পিঠে হাত রাখতেই বাইজিদ চমকে উঠলো। ক্রোধ নিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সিমরান বলল
“চাচাজান আপনাকে ডাকছেন। দ্রুত গোসল সেরে নিচে যেতে বলেছেন”
বাইজিদ এক ঝটকায় সরিয়ে দিল সিমরানের হাত। চলে গেলো গোসল করতে। অনেকটা সময় নিয়ে গোসল করার পরও বেড়িয়ে এসে দেখে সিমরান পালঙ্কে বসে আছে। বাইজিদ গুরুত্ব না দিয়ে আয়নার সামনের কারুকাজ করা চেয়ার টায় বসলো। মাথা ঝুকিয়ে সে চিন্তায় মগ্ন। এক বেলা কাটছে না, বাকি দিন গুলো কি করে কাটাবে মেহের কে ছাড়া? এবার সে নিজেই ছেড়ে দেবে নিজের আসন। চলে যাবে মেহেরুন্নেসার কাছে। যেই মহলে তার স্ত্রী নেই, সেই জমিদারি লাগবে না তার। মেহেরুন্নেসার ভাবনায় যখন সে পুরোপুরি ডুবে, সেই সময় মাথায় তোয়ালের স্পর্শ পেয়ে হচকচিয়ে উঠলো বাইজিদ। মেহের বলে হাতটা খপ করে ধরে পিছনে ঘুরতেই দেখলো সিমরান।
এতক্ষণ মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভুলেই গেছিলো সে তো প্রাসাদেই নেই। মেজাজ চড়ে গেলো বাইজিদের। উঠে দাড়িয়ে সিমরান কে দরাজ কন্ঠে দিল এক ধমক।
“বেয়াদব। আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে স্পর্শ করার”
সিমরান চমকে উঠলেও, টলল না। বরং খানিকটা এগিয়ে এসে বলল
“এখন তো মেহেরুন্নেসা নেই। আবারও আমাকেই আপনার সুবিধা অসুবিধা গুলো দেখতে হবে। আগের বিষয় টা ভিন্ন, তবে স্ত্রীর থেকে যেই সুবিধা টা পেয়েছেন সেটার খেয়ালও তো আমায় রাখতে হবে”
সেই সময় দরজার সামনে থেকে বাজখাঁই কন্ঠে সুনেহেরা বলল
“যার ঘর, যার অধিকার তাকে তাড়িয়ে দিয়ে, এক আশ্রিতার থেকে সুবিধা গ্রহণ করছেন ভাইজান? আপনাকে সাধুবাদ”
কেমন হয়েছে বলিও পাখিরা। তোমাদের অনেক অনেক ভালোবাসা রইল। 🫶😽
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭