জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;২৩
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
রাতের নিস্তব্ধতা চাপিয়ে, অন্ধকারের মাঝে নিশ্চুপ হয়ে ছাদে বসে আছে তরঙ্গ।
ধরনীর সবার চোখে শান্তির নিদ্রা থাকলে ও তরঙ্গের নেই। বিরক্তি আর রাগের তোপে তার কপালের রগ গুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ফর্সা হাতের শিরা – উপশিরা গুলো নীল হয়ে উঠেছে। তার সাথে অন্ধকারে যোগ হয়েছে মশা। মশার উপদ্রবে ছাদে বসাটাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। পেছনের সুপারি বাগান থেকে বিষাক্ত মশা গুলো উড়ে এসে কামড়াচ্ছে তার শরীরে। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো তরঙ্গ।
চাঁদের মতো সুশ্রী বদনে আজ মেঘ জমেছে তার। মনের নীল, নীল বেদনা আর শরীরের অস্থিরতায় ক্ষণে ক্ষণে বিষিয়ে উঠছে তার মন। তরীটা সব সময় তার বেলাতেই রুদ্র রূপ ধারণ করে। কথার আঘাতে জড়জরিত করে তার হৃদয়। আজ তো সুযোগ পেতেই গায়ে হাত তুলে বসলো। অথচ সবার বেলাতে সে টলটলে শান্ত স্রোত বিহীন নদী। যার বুকে শত অত্যাচার চালালে ও সে কেবল নিশ্চুপ বয়ে চলে। চোখে জ্বালা শুরু করলো তরঙ্গের। চাঁদের পান থেকে মুখ ফিরিয়ে দু’হাতের আঁজলায় মুখ চেপে ধরলো সে। তার কান্না পাচ্ছে। খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তরীকে জড়িয়ে।
মেয়েটা তার ভালোবাসা বোঝে না কেন? সে তো সব বোঝে। সবার মন বোঝে। তিন্নির মন খারাপ হলে গাল ভরে চুমু খায়। অথচ তার বেলাতে যতো অত্যাচার, অনিয়ম, অবহেলা। সময় নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, উঠে দাঁড়ালো তরঙ্গ। পেছনে ঘুরতেই দেখলে তরী দাঁড়িয়ে। অবাক হলো তরঙ্গ, কখন এসেছে মেয়েটা? এক ঝলক তার মুখের দিকে তাকালো তরঙ্গ। গোলগাল শ্যামা মুখটা কান্নার ধমকে লাল হয়ে উঠেছে। চোখ জোড়া কি একটু বেশিই ফুলে ফেঁপে উঠেছে? নাকি সে ভুল দেখছে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো তরঙ্গ।
গটগট পায়ে সিঁড়ি ঘরের দিকে চলে যেতে নিতেই; তড়িৎ বেগে ছুটে এলো তরী। অলগোছে নিজের দু’হাতের মাঝে তরঙ্গের ডান হাত চেপে ধরলো সে। তরঙ্গ ডান বসালো হাতে। তরী ছাড়লো না। কাঁপা কাঁপা গলায় সুধালো সে;-
–” আই’ম সরি তরঙ্গ। আমি বুঝতে পারিনি চড়টা এতো জোরে পড়বে।”
–” আর কিছু বলবেন?”
–” রাগ করবেন না প্লিজ। ঘরে চলুন। এখানে মশা কামড়াবে।”
–” আপনি ঘুমান গিয়ে। আমি আর বিরক্ত করবো না আপনাকে।”
চোখে জ্বালা অনুভব করতে লাগলো তরীর। তরঙ্গ তাকে আপনি সম্বোধন করছে। এতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন তার? অথচ এই দূরত্ব, এই সম্মান সেই তো সব সময় চেয়েছে। যাতে তরঙ্গ আর পাঁচটা ছোটো চাচাতো ভাইয়ের মতো আচরণ করুক। তাকে সম্মান দিক। তবে আজ সম্মান গ্রহণ করতে অনীহা হচ্ছে কেন? তরী আমতা আমতা করে উঠলো।
–” আপনি করে ডাকছেন কেন?”
–” সব সময় তো এটাই চেয়েছেন।”
তরঙ্গ আর দাঁড়ালো না। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছাদ থেকে নেমে পড়লো। চোখ ফেটে জলও ধারা বইলো তরীর গালময়। ঝাপসা চোখে তরঙ্গের পিছু পিছু সেও নেমে এলো। ঘরে ফিরে আরেক দফায় চমকালো তরী। তরঙ্গ ব্যাগ গোচ্ছাচ্ছে। আলমারি থেকে শেষ ট্রাউজার টা নিয়ে সজোরে দরজায় ধাক্কা বসালো তরঙ্গ। আলমারির দরজার কপাটের ধাক্কার শব্দে কেঁপে উঠলো তরী। জড়োসড়ো পায়ে এগিয়ে এলো সে। তরঙ্গ তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে ও তরঙ্গের নাগাল পেলো না সে। ততক্ষণে তরঙ্গের গাড়ি ছেড়ে গেছে সরকার বাড়ির সদর গেট।
অক্ষি কটরে জমে থাকা শেষ অশ্রুকণা গাল গড়িয়ে বিসর্জন হতেই, শাড়ির আঁচলে গাল মুছে ঘরে ফিরে এলো তরী। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বিছানার হেড বোর্ডের সাথে পিঠ এলিয়ে দিলো সে।
গম্ভীর মুখে ফোরকান দেওয়ান আর ফারহান দেওয়ান বসে আছেন বুসরার ঘরে। দুই ভাই পাশাপাশি বিছানায় বসেছেন।
বুসরা আর সাহনারা ওনাদের সামনের সোফায় বসা। গলা খেকাড়ি দিয়ে বুসরা বললো।
–” আপনি আর ভাইজান কে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিলো।”
ফারহান দেওয়ান আড়মোড়া ভেঙে চোখ থেকে চশমা খুলে নিলেন। সারাদিনের ক্লান্তি আর জার্নিতে শরীর ব্যথা হয়ে আছে। সকালেই তিনি খুলনা থেকে গাজীপুর ফিরে ছিলেন। তারপর আবার গাজীপুর থেকে ফেনী এসেছেন। এই মূহুর্তে বুসরার কথা গুলো বেশ বিরক্তিকর ঠেকছে ওনার নিকট। তবুও বড় ভাইয়ের বউ হওয়ার দরুন কিছু বলতে ও পারছেন না তিনি।
–” বলুন ভাবি, তবে একটু তাড়াতাড়ি বলার চেষ্টা করবেন।”
বুসরা আর সাহনারা চোখাচোখি করলেন। নিজেদের ইশারায় কথা সেরে ফোরকান দেওয়ানের দিকে তাকালেন তিনি।
–” কিভাবে যে বলবো, ভেবে পাচ্ছি না।”
–” এতো বণিতা করো না তো বুসরা। যা বলার সোজাসুজি বলো।”
–” গতকাল রাতে তরীর বিয়ে হয়ে গেছে।”
বুসরার কথায় চমকে উঠলেন ফোরকান আর ফারহান দেওয়ান। দু’জনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে। মিনিট না ফেরোতেই নিজেকে সামলে নিলেন ফোরকান দেওয়ান। ফারহান এখনো নিজেকে সামলাতে পারেনি। তিনি অবাকের তোপে চুপ হয়ে গেছে। ফোরকান দেওয়ান গমগমে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন;-
–” কার সাথে?”
কষ্টে চোখ ছলছল করে উঠলো সাহনারার। আচঁল দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন তিনি। বুক ভেঙে আসা কান্না আর থামাতে পারলেন না। হু হু করে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলেন।
–” আমার ছেলের কপাল পুড়েছে ভাইজান। ওই মেয়ে আমার ছেলেকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। আমার বাচ্চা ছেলেটা।”
–” মানে?”
–” কাল রাতে রাকিব আর তরীকে কাছারি ঘরে ধরে ছিলো সবাই। আমার ছেলের কোনো দোষ নেই। ওতো ঘরে ছিলো। কিন্তু তরীকে বাঁচাতে নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিয়ে নিয়েছে। পরে বড় ভাইজান ওদের দু’জন কে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।”
সাহনারার বলা কথা গুলো মনোযোগ সহকারে শুনলেন ফোরকান দেওয়ান। পর পর দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন তিনি। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। বড় ভাইকে দাঁড়াতে দেখে ফারহান দেওয়ান ও দাঁড়িয়ে পড়লেন।
–” এখন এসব থাক। পরশু বাড়ি ফিরে বাকি কথা বলা যাবে।”
দুপুরের তেজস্ক্রিয় রশ্মি মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।
বিকেলের কোমল আলোতে হাইওয়ে রোড ধরে চলছে ফোরকান দেওয়ানের গাড়িটা। ড্রাইভারের পাশের সিটে ফোরকান দেওয়ান বসে আছেন। পেছনে তরী, তিন্নি আর বুসরা। ফারহান দেওয়ান আর সাহনারা অন্য গাড়িতে আসছেন। রুমার রিসেপশন শেষ হওয়ার পর গতকাল ই বাড়ি ফিরতে চেয়ে ছিলো তরীরা। কিন্তু আলামিন সরকার দেননি।
জানলার সাথে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তরী। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। সকালে কিঞ্চিত বৃষ্টি হয়ে ছিলো। জুন মাস শেষের পথে। এখন আর কাল বৈশাখী ঝড় হয় না। তবুও হুটহাট আকাশ কাঁপিয়ে বজ্রপাত শুরু হয়ে বৃষ্টি নেমে আসে ধরনীতে। গতকালের রিসিপশনের জামাটা এখনো অব্দি বদলায়নি তরী। কোমর ছড়ানো চুল গুলোতে অগোছালো হাত খোঁপা করা। দু’দিনেই তরীর সৌন্দর্য মলিন হয়েছে। দেওয়ান বাড়ি গেট পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজায় গাড়ি থামতেই জলদি গাড়ি থেকে নেমে পড়লো তরী। সবার আগে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দোতলায় উঠে পড়লো সে। ছুটে তরঙ্গের রুমের সামনে এসে থামলো তরী।
অস্বস্তিতে বুক কাঁপছে। কোমর থেকে পা অব্দি অবশ হয়ে আসছে তার। গলা রোধ হয়ে আসছে কেন তার। বহু কষ্টে পা টেনে মিলিয়ে রাখা দরজা ঠেলে তরঙ্গের রুমে প্রবেশ করলো তরী। কিন্তু ভাগ্যে এইবারে তরীর সহায় হলো না। পুরো রুম ফাঁকা। বিছানা চাদর টান টান করে পাতা। বারান্দার দরজা সহ বড় দক্ষিণের জানলা টাও বন্ধ। জানলার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে গ্লাস খুলে দিলো তরী। হতাশ নেত্রে কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে ফিরে আসতে নিতেই চোখ পড়লো তরঙ্গের স্টাডি টেবিলে।
পেপার ওয়েটের নিচে চাপা দেওয়া একটা সাদা কাগজ। দূর থেকে দেখতে চিঠির মতোই লাগছে। টেবিলের উপর থেকে পেপার ওয়েট সরিয়ে কাগজটা হাতে তুলে নিলো তরী। চেয়ারে বসে কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরলো সে। গোটা গোটা সাজানো বাংলা অক্ষরে লেখাতে পূর্ণ কাগজটা। তরঙ্গের লেখা বেশ সুন্দর। মেধাবী কিনা!
প্রিয় পাষাণ মহিলা,
জানি না আপনি আমার ঘরে আসবেন কি না। আসবেন না এটা সিওর। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেননি। আমি বেসেছি। তাই চিঠিটাও আমিই লিখলাম। আপনাকে গত তিন বছরে বেশ যাতনা দিয়েছি আমি। ভার্সিটি হলে সিট পেয়ে ও আপনার টানে বার বার বাড়ি ফিরে গেছি। সময় – অসময়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে অস্বস্তিতে ফেলেছি। তার জন্য আমি দুঃখিত। তবে এর সাথে এই নিশ্চয়তা ও দিচ্ছি যে,,,,,,
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
আপনারা মন্তব্য করা কমিয়ে দিয়েছেন। যা সত্যিই হতাশা জনক। তরঙ্গের মতো আমি ও লুকিয়ে পড়লে তখন বুঝবেন।😭 অবশ্য আপনারা পাষাণন্ড মহিলা। পুরোই তরীর মতো। আমি হারালেই বা কি! যাইহোক, কেমন হয়েছে জানাবেন! রিচেক দেইনি। ভুল হলে বলবেন প্লিজ।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
She is my Obsession পর্ব ৩২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২০
-
She is my Obsession পর্ব ৩৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৯