Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৯


জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৯

পর্ব সংখ্যা;১৯

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ধরনীর বুকে গাড়ো কালো অন্ধকার বিরাজমান।

সন্ধ্যা হতেই গরমের তাপ কমে গেছে। মৃদু বাতাস বইতে শুরু করেছে। সরকার বাড়ি জুড়ে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। দূর দূরান্তের আত্মীয়রা সকালেই এসে উপস্থিত হয়ে ছিলেন। বর্তমানে, বাড়িতে শান্তিতে কোথাও বসে নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মতো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। অনেকদিন পর দেখা হওয়াতে, উপস্থিত মেহমানরা সকলে বসার ঘরে বসে চা – নাশতা খাচ্ছেন আর গল্প করছেন। তরঙ্গের ছোটো মামী সবার হাতে হাতে পিঠের প্লেট তুলে দিচ্ছেন। সোফার একপাশে চায়ের কাপ হাতে তরী বসে। তার পাশে তিন্নি বসা। বাচ্চাটা চায়ের সাথে চানাচুর খাচ্ছে। ছোটো ছোটো হাতে মুঠো ধরে চানাচুর মুখে নিয়ে ফের চা’য়ে চুমুক দিচ্ছে সে। তার অদ্ভুত এই খাওয়ার রুচি দেখে তরী গোল গোল চোখে তার খাওয়া দেখছে। তাদের পাশের সোফায়; রুমার কয়েকজন খালাতো, মামাতো বোন বসে আছে। তারা নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে। তরী না পারতে বলল,-

–” বিস্কুট থাকতে চানাচুর দিয়ে চা খাচ্ছিস কেন? কে শিখিয়েছে এমন খাওয়া?”

প্লেট থেকে বাদাম তুলে মুখে চালান করে চমৎকার হাসলো সে।

–” খেতে খুব মজা লাগছে। তুমি ও খেয়ে দেখো আপু।”

–” দরকার নেই। তুই ই খা।”

–” তরঙ্গ ভাইয়াকে দেখেছো তুমি?”

তিন্নি তরঙ্গের কথা তুলতেই চোখ বড় বড় হয়ে এলো তরীর। বিষম খেলো সে। অস্বস্তি আর লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠলো তরীর। ছেলেটা দিন দিন অসভ্যতামির সীমা অতিক্রম করছে। বেহায়াপনা যেনো তার নিত্যদিনের সঙ্গী। দুপুরে বকতে বকতে তার মাথা শূন্যে করে দিয়েছিলো। তারপর ছোটো মামার ডাকে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। এখন ও পর্যন্ত বাড়ি ফিরেনি। তিন্নিটা ও তার সাথে মিশে মিশে ওমন হচ্ছে। যে কেউ এক দেখায় তিন্নি কে তরীর বোন কম; তরঙ্গের আপন বোন বেশি ভাবতে দ্বিধা করবে না। নিজের বিরক্তি চাপতে পারলো না তরী।

–” সারাদিন তরঙ্গের সাথে তোর কি?”

–” ভাইয়ার সাথেই তো কাজ। তুমি তো বুড়ো হয়ে গেছো। কেমন মা, মা ভাবে শাসন করো। ভাইয়া খুব ভালো।”

তরী ইচ্ছে করলো বলতে, “এতো যে ভাইয়া, ভাইয়া করছিস। তোর দুলাভাই লাগে নাকি?” কথাটা মনে মনে আওড়ালে ও মুখে উচ্চারণ করার সাহস হলো না তার। তিন্নিটা আজ কাল বেশ বদ হয়েছে। এর প্রতি উত্তরে সে আবার না তরঙ্গ কে দুলাভাই ডাকতে শুরু করে। তাতে তরঙ্গ আরো মাথায় চেপে বসবে। যদিও ওদের দুজনের বিয়ের খবরটা তিন্নি জানে না। আলামিন সরকার কাল রাতেই সবাইকে কড়া কন্ঠে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। যাতে এই বিয়ে নিয়ে বাইরের কেউ না জানে। তরী ওনার মেহমান। যদি তরীকে কেউ কিছু বলে। তবে ওনার থেকে খারাপ কেউ হবে না।

–” বেশ মুখে মুখে তর্ক করছিস তো।”

–” ভাইয়া কে তুমি দেখেছো? হ্যাঁ নাকি না?”

–” আমি দেখিনি তোর গুরুকে। জলদি চা শেষ করে উপরে চল। তোকে রেডি করে দিবো।”

–” আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিবে?”

–” হ্যাঁ,”

–” আমাদের ও শাড়ি পরিয়ে দিবে আপু? আমরা কেউই শাড়ি পরতে পারি না।”

ঝুমার কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকালো তরী। পাঁচ, ছয়জন বসে আছে ওরা। প্রত্যেকেই বড়। কলেজে বা স্কুল শেষের দিকে হবে। ঝুমা ছাড়া কারো সাথেই তার আলাপ হয়নি। স্বভাবত মুখে মিষ্টি হাসি টানলো তরী।

–” নাশতা সেরে শাড়ি নিয়ে উপরে চলে এসো।”

–” তুমি কোন ঘরে থাকবে?”

তরী জবাব দেওয়ার আগেই উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ঝুমা সুধালো;-

–” আরে ভাবি তো তরঙ্গ ভাইয়ার বউ। ভাইয়া ঘরেই থাকবে।”

ভাবি শব্দটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই তরীর কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। শরীরজুড়ে অচেনা অনুভূতির কাঁটা বিঁধে গেলো। মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এলো এক শীতল স্রোত। লজ্জা নাকি অস্বস্তি— নিজেই বুঝে উঠতে পারলো না সে। তবুও ঠোঁটে জোর করে টেনে আনলো এক ক্ষীণ হাসি।

–” ওই ঘরেই আছি। এসো তোমরা।”

–” তুমি সাজাতে পারো ভাবি?”

–” তেমন পারি না।”

–” যা পারো তাতেই চলবে। আমি সাজতে পারি না।”

–” আচ্ছা এসো।”

কথা শেষ করে খুশিতে গদগদ হয়ে ওঠলো সবাই। এতক্ষণ বেশ চিন্তায় ছিলো তারা। এতদিন সব কাজিনের বিয়েতে রুমা আর তরঙ্গের ছোটো মামী তাদের শাড়ি পরিয়ে দিতো। কিন্তু এইবারে দু’জনেই ব্যস্ত। তাই শাড়ি পরানো নিয়ে প্যারা খাচ্ছিলো। চায়ের কাপ রেখে তরী উঠতে নিতেই সকালে ভাবিটা এগিয়ে এলো। পুনরায় তরীকে টেনে বসিয়ে দিলেন নিজের পাশে। হাসি হাসি মুখে বললেন তিনি।

–” দুপুর থেকে দেখছি তোমার খবর নেই মেয়ে।”

–” ঘরে ছিলাম ভাবি।”

তরীর কোমল কন্ঠের কথার বিনিময়ে ভাবি হাসলেন। তরীর বেশ ভালো লেগেছে মানুষটাকে। সাধারণের মাঝেই অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের একজন মানুষ। এই প্রথম কোনো মানুষ প্রথম দেখাতেই তার গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলেনি। কিংবা বিয়ে না হওয়াটাকে ও তরীর অপারগতা মনে করেননি। বরং, সান্দদে তাকে কাছে টেনে নিয়েছে।

–” মেহেদী উঠিয়ে ফেলেছো?”

নিজের হাতের দিকে তাকালো তরী। সে জবাব দেওয়ার আগেই ভাবী তরীর হাত জোড়া টেনে নিলেন সামনে।

–” ও মা, মেহেদীর রঙ তো খুব এসেছে। মেয়ে তো স্বামী সোহাগী হবে। আর মেয়ে বলছিলো তার মেহেদীত রঙ আসবে না।”

ভাবির কথায় উপস্থিত রুমার কাজিনরা তরীর হাতের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। মেহেদীর রঙটা বেশ গাড়ো হয়েছে। শ্যামবর্ণের হাতে কি সুন্দর মেরুন রঙটা ঝলঝল করছে। নিজেও তা দেখে অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে গেলো তরী। সবেই বাজার থেকে ফিরেছিলো তরঙ্গ। এই পথে যাওয়ার সময় এমন কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। কৌতূহল না দমিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে তরীর পাশে দাঁড়ালো তরঙ্গ। মাথা নুইয়ে তাকালো তরীর হাতের পানে। আচমকা কোনো পুরুষের অস্তিত্ব টের পেতেই উপরের দিকে তাকালো তরী। তরঙ্গ এখনো তার হাত দেখছে। চোখাচোখি হলো দু’জনের। ঠোঁট টিপে হাসলো তরঙ্গ।

এতে করে আরো এক ধাপ অস্বস্তি বাড়লো তরীর। তরঙ্গ হঠাৎ ঝুঁকে পড়লো সবার সামনেই। সেন্টর টেবিলে রাখা, প্লেট থেকে মিষ্টি নেওয়ার ভান করে তরীর কানের কাছে ফিসফিস করে সুধালো সে।

–” এখন তো সবাই ও বলে দিলো।”

তরঙ্গের কথায় কান ঝা ঝা করে উঠলো তরীর।

–” কি?”

–” তুমি স্বামী সোহাগী হবে। তুমি বাদে সবাই আমার ভালোবাসার কথা বুঝে গেলো তরকারি জান। দেখলে আমার ভালোবাসা কতোটা পাওয়াল ফুল।”

–” সব মিথ্যা কথা।”

–” ঘরে চল, প্র্যাকটিক্যালি সত্যি মিথ্যা প্রমাণ করে দিবো।”

কথা শেষ করে, প্লেট থেকে মিষ্টি নিয়ে মুখে পুরে দিলো তরঙ্গ। তার পর যেভাবে এসেছিলো। সেভাবে চলে গেলো সে।


রাত সাড়ে আটটা পেরিয়েছে।

আকাশের অবস্থা আগের থেকে পরিবর্তন হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়া বাড়ছে। সবাই যার যার ঘরে ব্যস্ত তৈরি হতে। তরী তিন্নিকে রেডি করে দিয়ে বাকিদের শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে দু’জনকে পরিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই সে ঘেমে নেয়ে একাকার। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা এসে গলায় ঠেকছে।

ঝুমা কে শাড়িটা পরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তরী। এখনো সাবিহা, আর তিরি বাকি আছে। চারজন কে শাড়ি পরাতে গিয়েই তার কোমর শেষ। তার মধ্যে দরজায় কড়া নাড়লো কেউ।

–” এই তোদের হয়েছে?”

তরঙ্গের গলার স্বর পেতেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলো ঝুমা। ভেজিয়ে দেওয়া দরজা টা খুলে মাথা বের করলো সে।

–” আরেকটু সময় লাগবে ভাইয়া। ভাবি সবাইকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে।”

–” কোন ভাবী?”

ঠোঁট টিপে হাসলো ঝুমা,

–” তরী ভাবি।”

–” ও তৈরি হয়েছে?”

–” না আপু এখনো তৈরি হয়নি।”

–” আকাশে অবস্থা ভালো না। তোরা জলদি রেডি হ। যেকোনো মূহুর্তে বৃষ্টি আসতে পারে।”

–” আচ্ছা,”

–” হুমম, আর ম্যাডাম কে বলিস। তোদের শাড়ি পরিয়ে তিনি নিজেও যাতে তৈরি হয়ে নেন।”

–” আচ্ছা।”

তরঙ্গ হন্তদন্ত পায়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো। ফের দরজা বন্ধ করে তরীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো ঝুমা। তরীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটে হেসে উঠলো সে। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো তরী।

–” হাসছো কেন? শাড়ি পরানো পছন্দ হয়নি?”

–” হয়েছে।”

–” তবে?”

–” ভাইয়া বলেছে, যাতে ম্যাডাম মানে তুমি ও যাতে শাড়ি পরো। ভাইয়া তোমাকে কতো কেয়ার করে দেখেছো?”

চলবে

( রিচেক দেইনি। প্রাণ হাতে নিয়ে লিখেছি। যেকোনো মূহুর্তে কারেন্ট চলে যেতে পারে। তাই ছোটো পর্ব দিয়েছি। কোথাও ভুল হলে বলবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply