আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা১৬
দুই তলা বাড়িরটার সামনে বেশ কতক মানুষের ভীড়। শেষরাত হওয়া সত্ত্বেও আগ্রহী লোকের কমতি নেই। নিচতলার জানালা দিয়ে বাইরের কর্মকান্ড ভয়ার্ত চোখে দেখে যাচ্ছে তিতলি। তার বাবা মিস্টার চৌধুরী তরুণ ছেলেপিলেগুলোর সাথে ঝামেলায় জড়িয়েছেন। লিডার গোছের ছেলেটার নাম বখতিয়ার। ঘাড়ের কাছে ট্যাটু, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখেও কেমন যেন নেশালো ভাব। মিস্টার চৌধুরীর কলার চেপে ধরে হুমকি দিচ্ছে রীতিমত।
“আপনার মেয়েকে শুধু আমি বিয়ে করব, বুঝছেন চৌধুরী সাহেব? দুইটা বছর প্রেম করার সময় ওর মনে ছিলনা মান সম্মানের কথা? আমার পার্টি কিন্তু ক্ষমতায় আছে। বুঝে নিয়েন। তেড়িবেড়ি করলে একেবারে গায়েব কইরা ফালামু।”
তিতলির বুক কাঁপছে। স্কুল লাইফের সাধাসিদা ভদ্র ছেলেটা এমন জঘন্য একটা মানুষে পরিণত হবে সে কল্পনাও করেনি। প্রেম বলে যেটা চালিয়ে দিচ্ছে, সেটা ঠিক প্রেমও ছিলনা। তিতলি একটুখানি পাত্তা দিত এই যা। সাইবান আসার পর থেকে তার জীবনটাই বদলে গিয়েছে। অন্য কারো সঙ্গে প্রেম করার প্রশ্নই আসেনা। তিতলির মা মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া দরুদ পড়তে শুরু করে দিয়েছেন।
এমন সময়েই দুটো বাইক এসে থামল তিতলিদের বাড়ির সামনে। লাফিয়ে নামল আফনান, নীরব আর অনুরাগ। দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই প্রত্যেকে ছুটে এসে ভিড়ের মাঝে ঢুকে পড়ল। ছেলেদের মধ্যে হট্টগোল বেঁধে গেল। অনুরাগ মাঝখানে দাঁড়িয়ে মিস্টার চৌধুরীকে আড়াল করে বলল,
“এক্সকিউজ মি! এটা কোন ধরণের অসভ্যতা? রাত বিরাতে একটা ভদ্র বাড়িতে এসে ভদ্রলোকদের বিরক্ত করছেন কেন? পুলিশকে জানাতে বাধ্য হব কিন্তু!”
অনুরাগের কথায় বখতিয়ার ভীষণ চটে গেল। প্রতিদ্বন্দ্বীতা আশা করেনি সে। নিজের একটা হাত তুলে দ্বিধা ছাড়াই সটান অনুরাগকে থাপ্পড় দিয়ে বসল সে। আঁতকে উঠল সবাই।
“ইউ স্কাউন্ড্রেল!”
নীরব খেঁকিয়ে উঠে বখতিয়ারকে পিছন থেকে ঘুষি দিতে যাচ্ছিল, তবে দলের অন্য দুটো ছেলে নীরবকে জাপটে ধরে ফেলল। অনুরাগ ভালোই ব্যথা পেয়েছে, মুখের ভেতর রক্তের নোনতা স্বাদ টের পাচ্ছে এখন। মিস্টার চৌধুরী অনুরাগকে ধরে ফেললেন, আর্তনাদ করে বললেন,
“তোমাদের সমস্যাটা কি? সাধারণ মানুষকেই পাও শুধু জ্বালাতন করতে?”
“সাধারণ? আপনার কাছে যে টাকার বস্তা আছে বাইর করেন। এত টাকা পোকায় খেয়ে শেষ করতে পারবেনা। এলাকার উন্নতির জন্য লাখ পাঁচেক দিতে সমস্যা কি? টাকা দিবেন নাকি মেয়ে দিবেন আপনার ব্যাপার!”
কুটিল হাসি মেখে বলল বখতিয়ার। পরক্ষণেই চোখ ঘুরিয়ে তাকাল বাড়ির ভেতরে দাঁড়ানো তিতলির দিকে। কেঁপে উঠল মেয়েটা। বাঁকা হাসল বখতিয়ার। অশ্লীলভাবে ঠোঁট চাটলো সে। তবে তার সুখ দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হলোনা। হঠাৎ করেই পিছন থেকে একটা গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো,
“থোবরা বরাবর বাংলাদেশের মানচিত্র বসিয়ে দিতে চাই, নিবি?”
বখতিয়ার ভীষণ অবাক হয়ে ঘুরে তাকিয়েছে কি তাকায়নি তার চোয়াল বরাবর প্রচন্ড শক্তিতে একটা ঘুষি আছড়ে পড়ল। এতটাই জোর যে বখতিয়ারের শরীরটা ছিটকে পড়ল মাটিতে, মনে হলো চোয়ালের হাড় বুঝি নড়ে গিয়েছে। তার দলের ছেলেরা আঁতকে উঠে ঝট করে সামনে তাকাল। আবছায়া লাইটের আলোর প্রতিফলনে ভেসে উঠল ছায়ামূর্তিটি। সুঠাম শরীরের অধিকারী। জ্যাকেট পরে থাকলেও শক্তিশালী বাহু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সুদর্শন তীক্ষ্ণ চেহারায় জান্তব হিংস্রতা। ভ্রু পিয়ার্সিং চিকচিক করছে অশনি সংকেতের মতন।
দন্ডায়মান সাইবান আলাদিন।
“কোন শালা তুই?”
বখতিয়ার ব্যথায় ককিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“কল মি ড্যাডি!”
তীর্যক হেসে ঝাঁঝাল কন্ঠে জবাব দিল সাইবান। তার নয়নজোড়া ক্ষিপ্তভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। অনুরাগের ফুলে উঠতে থাকা গাল, আতঙ্কিত মিস্টার চৌধুরী আর সবশেষে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকা তিতলি। সাইবানের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেয়েটা দৌঁড়ে বাড়ির বাইরে চলে এলো। সাইবান অবশ্য নাটক দেখতে দাঁড়িয়ে থাকল না। তিতলিদের বাড়ির পাশেই নতুন কিছু জিনিস তৈরির কাজ চলছিল। হনহন করে এগিয়ে গিয়ে সেখানে পরে থাকা একটা চ্যালাকাঠ হাতে তুলে নিল সাইবান। মিস্টার চৌধুরী ভড়কে গেলেন এই ছেলের এমন রুদ্ররূপ দেখে।
“বাবা আস্তে আস্তে, মারামারির কি দরকার?”
“চান্দাবাজ আর ইভটিজারের জন্য মাইরের উপর কোনো কথা নেই, আপনি সরুন আংকেল।”
বখতিয়ার কোনমতে উঠে দাঁড়িয়েছে কি দাঁড়ায়নি সাইবান সটান কাঠটা দিয়ে জোরালো আঘাত হেনে বসল ছেলেটার পাঁজর বরাবর। মুহূর্তেই গণ্ডগোল বেঁধে গেল। আফনান, নীরব, অনুরাগ এরাও আর বসে রইলনা। আশেপাশে যে যা হাতে পেয়েছে, সেটা নিয়েই চড়াও হলো। ধস্তাধস্তির মাঝে বখতিয়ারের কলার ধরে টানতে টানতে বাড়ির সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেল সাইবান। ঠিক তিতলির পায়ের সামনে বান্দাকে উপুড় করে ফেলে পিঠের উপর পা দিয়ে চেপে ধরল। একহাতে চ্যালাকাঠ ধরে রেখে শাসাল,
“আমি যা যা বলব, বাঁচতে চাইলে তাই তাই রিপিট করবি! বল, আম্মাজান আমাকে মাফ করে দেন, আমি আর জীবনেও আপনার দিকে কুনজরে তাকাবনা। যদি তাকাই, তাহলে আমি কুত্তার পা চাটি! বল!”
বখতিয়ার জোর করে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে, অপমানে টকটকে হয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণ। সাইবান আরও জোরে চেপে ধরল তাকে,
“বলবি নাকি উদোম ক্যালানি খাবি? ডিম থেরাপি শুধু তোর পার্টির বস্তিগুলো না, আমিও দিতে জানি!”
“আ…আম্মাজান!”
বলতে বাধ্য হলো বখতিয়ার। বাঁকা হাসি ফুটল সাইবানের ঠোঁটে। সে শিখিয়ে দিল,
“আম্মাজান আমাকে মাফ করে দিন।”
“আম্মাজান… আ…মাকে মাফ করে দিন।”
“আমি দুধ খাওয়া বাচ্চাটি হয়ে যাব, মেয়ে দেখলে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে উল্টো দিকে দৌঁড় দেব।”
“আমি…দুধ…খাওয়া…”
শুনতে শুনতে বুকে দুবাহু বেঁধে বেশ উপভোগ করে গেল তিতলি। বখতিয়ার ছাড়া পেল টানা সাতটা মর্মান্তিক বাক্য উচ্চারণ করার পরেই। আশেপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিল, অনেকেই আবার ভিডিও করেও রাখল। সবশেষে উঠে পড়ে টলতে টলতে যখন সে নিজের দলের ছেলেদের কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ির বাইরের দিকে এগোল, তখন পিছনে তাকিয়ে সাইবানের সঙ্গে দৃষ্টি মেলালো। চ্যালাকাঠটা কাঁধে ঠেকিয়ে বান্দা এক হাতে সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটে পুরে রেখেছে। ভ্রু কুঁচকে তীব্র অসহনীয় এক দৃষ্টিতে বখতিয়ারের দিকে তাকাল সে।
“তোকে আমি দেখে নেব!”
দাঁত কিড়মিড় করে উচ্চারণ করল বখতিয়ার। সাইবান খিলখিল করে হেসে উঠে ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে বলে উঠল,
“তুই কি রাতকানা? এখন দেখতে পাচ্ছিস না?”
আফনান, নীরব একযোগে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। অনুরাগ অবধি হাসতে গিয়ে নিজের ব্যথা পাওয়া গালটা চেপে ধরল। অপমানের চূড়ান্ত পর্যায় পেরিয়ে যাওয়ায় বখতিয়ার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল গেটের বাইরে, অনুসরণে তার সাঙ্গপাঙ্গ।
চারপাশ সুনসান হয়ে পড়তেই তিতলি ছুটে এসে সাইবানকে জাপটে ধরল।
“থ্যাংক্স দোস্ত! কি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি, আব্বুকে যাচ্ছেতাইভাবে হুমকি দিচ্ছিল।”
সাইবান খানিকটা বিব্রত হলেও তিতলির মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করে সরিয়ে দিলনা। শুধু একটি হাত মেয়েটার মাথায় রাখল,
“ইটস ওকে নাউ।”
“তোমাদের সবাইকে যে আমি কি বলে ধন্যবাদ দেব!”
বলতে বলতে মিস্টার চৌধুরী সিঁড়ির উপরেই বসে পড়লেন। অনুরাগ তাকে ধরল। মিসেস চৌধুরীও ছুটে এলেন।
“এদের জ্বালায় বাঁচিনা আর। থানায় জিডিও করে রেখেছি। যদি পুলিশ একটু গুরুত্ব দিত! টাকা ঢেলেও লাভ হচ্ছেনা।”
“পার্টি ক্ষমতায় আছে তো, পলিটিক্সের পাওয়ারে উড়ছে বেশি। এদের সাথে বেশি ঝামেলায় না জড়ানোই ভালো।”
প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলল। তবে সাইবান পাত্তা দিলনা। নিজের কাছ থেকে সাবধানে তিতলিকে দূরে সরিয়ে দাঁড়িয়ে চ্যালাকাঠ ফেলে দুহাত উপরে তুলে খানিক আরমোড়া ভাঙল বুঝি। তারপর অবিচলিত কন্ঠে বলে উঠল,
“আন্টি এক মগ কফি হবে? শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে।”
মিসেস চৌধুরী এত চিন্তার মাঝেও না পারতে হেসে ফেললেন। দ্রুত বাড়ির ভেতর যেতে যেতে বললেন,
“অবশ্যই। তোমরা সবাই ভেতরে আসো। একেবারে সকালের নাস্তা না খাইয়ে কিন্তু ছাড়ছিনা।”
─────────────────────────────
আজকের সকালের নাস্তার টেবিলজুড়ে গুরুগম্ভীর পরিবেশ বিদ্যমান। শুধু প্লেট চামচের টুংটাং শব্দ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রা নেই কারো মুখে। নীরব, অস্থির, রীতিমত দমবন্ধকর একটা অবস্থা। সবাইকে নাস্তা বেড়ে দেয়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আড়চোখে মানুষটাকে দেখে যাচ্ছে ইরাম।
এ কে এম আহমদ উদ্দিন। সাইবান – সারিকার বাবা, সামিয়ার স্বামী এবং ইরামের খালু। পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ঠিক কিসের ব্যবসা সেটা ইরামের বিস্তারিত জানা নেই। এই মানুষটার সম্পর্কে জ্ঞান তার ভীষণই কম। শূন্য বললেও ভুল হবেনা। কারো সাথেই মিশুক নন। ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়েও এই লোকটার বিশেষ উপস্থিতি ইরাম মনে করতে পারছেনা।
পাশাপাশি বসার বদলে সামিয়া এবং আহমদ বসেছেন একে অপরের মুখোমুখি। টেবিলের দুপাশে দুজন। যেন মাঝখানে কেউ দেয়াল তুলে দিয়েছে। বাবার পাশে বসা সারিকা বিশেষ অস্বস্তিতে আছে তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কেমন যেন হাসফাঁস করছে। ইরাম টেবিল ঘুরে নীরবে আহমদের প্লেটে আলুভাজি বেড়ে দিতেই তিনি প্লেট দূরে ঠেলে বলে উঠলেন,
“আমি আলুভাজি খাইনা।”
ইরাম ভড়কে গেল। সামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
“কবে থেকে? আলুভাজি তোমার পছন্দের নাস্তা।”
“আজকে থেকে আর পছন্দের নেই।”
গলা খাঁকারি দিয়ে ইরাম বলল,
“আপনাকে তাহলে ডিম পোচ করে দিই খালু, দুই মিনিট একটু বসুন।”
হাত তুলে ইরামকে থামিয়ে দিলেন আহমদ।
“চা পরোটায় আমার হয়ে যাবে, থ্যাংক্স।”
ডিমের খোসার উপর হাঁটা বোধ হয় একেই বলে। শুধু ইরামই নয়, বরং বাড়ির প্রত্যেক সদস্যই ভীষণ সচেতন হয়ে উঠেছে। ইরাম বেশি তর্ক না করে চেয়ার টেনে বসল। কোনমতে আধখানা রুটি সে শেষ করেছে সেই সময়েই সামিয়া কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন,
“না জানিয়ে মালেশিয়া থেকে হুট করে চলে এলে যে?”
“কেন? ঢাক ঢোল পিটিয়ে, সানাই বাজিয়ে আসা উচিত ছিল বুঝি?”
ভ্রু কুঁচকে ফেললেন সামিয়া।
“সেটা বলিনি।”
“না না, বলে ফেলো। তুমি যা বলো, তাই তো হয়। তোমার উপর কথা বলার কোনো অধিকার অন্য মানুষের আছে? শখ – স্বপ্ন – ইচ্ছা সব তোমারই পূরণ হতে হবে। বাকিদের দিক ভাবার প্রয়োজন নেই।”
“আহমদ!”
টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন সামিয়া। তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন স্বামীর দিকে।
“তুমি অভদ্র আচরণ করছ বলে মনে হচ্ছেনা?”
“নিজের মর্জিমত যাকে তাকে বাড়ির বউ বানানোর সময় তোমার মনে হয়নি তুমি লিমিট ক্রস করছ?”
আহমদের কন্ঠ শান্ত। অথচ তার কথার মাঝে অদ্ভুত একটা তেজ আছে। উপেক্ষা করা অসম্ভব। সারিকা নিজের বাবা মায়ের উত্তপ্ত ক্রোধের মাঝে একটুখানি শীতল হাওয়া হতে চাইলো।
“মম, ড্যাড। প্লীজ। তোমরা বাচ্চা না। এটা নাস্তার টেবিল। অন্য বাড়ির মানুষের সামনে এসব কি ধরণের উদ্ভট আচরণ?”
অন্য বাড়ির মানুষ যে ইরাম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মেয়েটা এমন সময়েও ঠিকই একটা ঠেস দিয়ে দিল। ইরাম একটি নিঃশ্বাস ফেলে ভদ্র অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
“খালু, খালামণি। আপনারা প্লীজ, আমাকে নিয়ে ঝগড়া করবেন না। যদি আমার জন্য এই দ্বৈরথ সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছাড়া আমার আপাতত আর কিছু করার নেই। প্লীজ আপনারা শান্ত হন, আমরা নাস্তা করি। আলাপ আলোচনা সব নাহয় খালু আপনি বিশ্রাম নেয়ার পর করা যাবে?”
আহমদ বাঁকা দৃষ্টিতে ইরামকে দেখলেন। তারপর এক চুমুকে গরম চায়ের কাপ শেষ করে ঠাস করে চেয়ার ঠেলে টেবিল থেকে উঠে গেলেন।
“আমার হয়ে গেছে।”
এটুকুই। তিনি আর বসলেন না। লম্বা পা ফেলে বাড়ির অন্দরমহলে আড়াল হয়ে গেলেন। আহমদ চলে যেতেই সামিয়া নিজের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে ফেললেন। সারিকা এগিয়ে নিজের মায়ের কাঁধে হাত রাখল।
“মম, ইটস ওকে। তুমি জানতে এমনটা হওয়ারই ছিল।”
ইরামেরও ইচ্ছা হলো নিজের খালামণিকে একটু শান্তনা দেয়। তবে সেই সুযোগ হলোনা। পদশব্দ ভেসে এলো। ঝট করে ফিরে তাকাতেই সে দেখল ভেতরে ঢুকেছে সাইবান। কারো দিকেই তাকায়নি সে। সামিয়া আর সারিকা দুজন দুজনের গোপন কথোপকথনে ব্যাস্ত থাকায় বিশেষ নজরপাত করেনি। তবে সাইবানের হাঁটুর দিকে জিন্সের ছিঁড়া অংশ এবং ঘাড়ের দিকে লালচে দাগ ইরামের দৃষ্টি এড়ালনা। সাইবান উপরে উঠে যেতেই সেও টেবিল থেকে উঠে ছুটে চলে গেল বেডরুমের দিকে।
─────────────────────────────
বেডরুমের ভেতর ঢুকেই যথারীতি ইযানকে ক্রিবে নিদ্রাচ্ছন্ন দেখতে পেল সাইবান। ছোট্ট শিশুটি দুই হাত মুঠ করে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পাতলা ঠোঁটজোড়া হালকা ফাঁক করা, সেখান থেকে লালারস গড়িয়ে বালিশে পড়ছে। বাঁকা হাসল সাইবান,
“লাইফ তো তোরই পোটলা। খাওয়া, কাঁদা, হাগুমুতু, ঘুম। সার্কেল অনগোয়িং।”
মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের জ্যাকেটটা খুলে নিল সে। ভেতরের ট্যাংক টপ বেরিয়ে আসতেই ত্বকের উপর লালচে, নীলাভ দাগ পরিষ্কার হলো। মারামারির সময় সেও কম কিছু হজম করেনি, তবে অতি উত্তেজনায় আদ্রেলানিলের ক্ষরণে তখন ওসব গায়ে লাগেনি। এখন লাগছে। গরম পানির ভেতর বসে থাকতে হবে ঘণ্টাখানেক। জাকুযির কথা মনে পড়ল, কিন্তু হাতে অত সময় নেই। দুপুরের আগেই আবার সিলেটের জন্য বেরিয়ে যেতে হবে। সে যখন ঘাড়ে একটা তোয়ালে ঝুলিয়ে বাথরুমে কুইক শাওয়ার নিতে যাবে, তখনি বেডরুমে ঢুকলো ইরাম। খানিকটা হাঁপাচ্ছে, ছুটে এসেছে বোঝা যাচ্ছে। সাইবান এমন মুহূর্তেও মজা নিতে ছাড়লনা। মাথা কাত করে স্ত্রীকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আর তর সইছেনা যে ছুটতে ছুটতে এসেছেন?”
বলে শাহরুখ খান স্টাইলে বুক চেতিয়ে দুবাহু মেলে ধরল সাইবান। ইরাম বিরক্তিবোধক শব্দ করে এগিয়ে এসে চাপড় দিল তার মেলে ধরা হাতে।
“মজা বন্ধ করো। সারা রাত কোথায় ছিলে? আর এসব কিসের দাগ? ব্যথা পেয়েছ কীভাবে? মুখ থুবড়ে ম্যানহোলে পড়েছ এমন গালগল্প আমায় বিশ্বাস করতে বলবেনা।”
“বেশি কিছু না। এই একটু শক্তি প্রদর্শন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এলাম আরকি। রাত না হলে আবার খেলা জমে না।”
সাইবানকে ঠেলে জোরপূর্বক বিছানায় বসিয়ে দিল ইরাম। অতঃপর দ্রুত হাতে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এসে বসল। সাইবান ভ্রু তুলে বিস্ময় নিয়ে রমণীর কর্মকান্ড দেখে গেল। ইরাম অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে তুলো ভিজিয়ে সাইবানের কাছে সরে এলো। নরম আঙুলে তার মাথাটা সামান্য কাত করে ঘাড়ের দিকের দাগটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল।
“কেউ ঘুষি মেরেছে এখানে।”
এতটা কাছ থেকে ইরামের উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল সাইবানের ঘাড়। শিউরে উঠল সে না চাইতেও। চোখজোড়া অজান্তেই বন্ধ হয়ে এলো। ইরাম থেমে নেই, তুলোটা লালচে হয়ে ওঠা ত্বকে বসিয়ে আলতোভাবে মুছে নিতে নিতে সে ফিসফিস করল,
“মারামারি করেছ তুমি।”
জ্বালা হলো, দাঁতে ঠোঁট কামড়ে হিঁসিয়ে উঠল সাইবান,
“আপনার মাথার পিছনে তৃতীয় চক্ষু আছে মনে হচ্ছে।”
“জ্বলছে?”
“না। সুখ লাগছে। চাপ দিন, আরও জোরে কচলে ভর্তা বানিয়ে ফেলুন!”
রাগে গজগজ করে উঠল সাইবান। ইরামের ঠোঁটে মৃদু হাসি ছুঁয়ে গেল। এবার আরও খানিকটা কাছে ঝুঁকে এলো সে। সাইবানের ঘাড়ে তুলো দিয়ে মুছতে মুছতে আলতোভাবে ফু দিলো জ্বালা কমানোর উদ্দেশ্যে। সাইবানের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল তরঙ্গ খেলে গেল। মনে হলো ব্রেইনের ভেতর নিউরনে নিউরনে শর্ট সার্কিট হয়ে গিয়েছে। শরীরের সর্বশক্তিতে সে নিজেকে নিবারণ করল ইরামকে ছোঁয়া থেকে, দুহাত টেনে ধরল বিছানার চাঁদর, ভীষণ নিয়ন্ত্রণে। ইরামের অবশ্য এত কিছু খেয়াল নেই। সে একমনে নিজের কাজ করছে। ঘাড় থেকে সাইবানের বুকের দিকটায় নেমে এলো সে। ট্যাংক টপের চিকন স্ট্র্যাপটা শক্তিশালী কাঁধের উপর থেকে সামান্য নামিয়ে উন্মুক্ত করল ত্বক। হার্টের উপরের দিকটায় নীলাভ একটা ছাপ। এবার সত্যিই রাগ হলো ইরামের। দ্বিতীয়বার তুলা ভেজাতে ভেজাতে সে বলল,
“এসব আমার একদম পছন্দ না, আলাদিন। ভদ্র ঘরের ভদ্র ছেলেরা এমন করেনা। সারারাত বাইরে কাটানোর বিষয়টা নাহয় আমি বাদ দিলাম, তবে নিজের এই অবস্থা করার মানে কি?”
অদ্ভুতুড়ে হাসল সাইবান,
“কেন? আমার জন্য আপনার কষ্ট হচ্ছে বুঝি?”
ইরাম ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল। তেমন কোনো চিন্তা না করেই অজান্তে তুলা খানিকটা জোরে চেপে ফু দিয়ে বলে উঠল,
“হাসবেন্ডের জন্য চিন্তা করা বারণ বুঝি?”
“মাদারফা…!”
অস্ফুট একটা অশ্রাব্য শব্দ বেরিয়ে এলো সাইবানের ঠোঁট গলে। ইরাম বুঝতেও পারলনা কি ঘটছে। নিজের কোমরে একটা হ্যাঁচকা টান খেল। তার শরীরটা আছড়ে পড়ল বিছানার উপর। গায়ের ওড়নাটা একপাশে ছড়িয়ে পড়ল। খোঁপা খুলে চুলগুলো নদীর স্রোতের ন্যায় মেলে গেল চারিপাশে। সাইবানের ভারী ও শক্তিশালী পুরুষালী শরীরটা তার উপর উঠে এলো। ডান হাতের লম্বাটে আঙুলগুলো জড়িয়ে গেল ইরামের গ্রীবাদেশজুড়ে। শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠল ইরাম। পা দুটো ছটফট করে উঠতেই সাইবানের হাঁটু চাপ দিয়ে আটকে ফেলল তাকে। অবাক নয়নে চেয়ে রইল ইরাম নিজের উপর ঝুঁকে থাকা মুখটার দিকে। হলদেটে ত্বক কেমন রক্তাভ হয়ে উঠেছে, কালো চোখ দুটোয় ঝিলিক খেলে যাচ্ছে। ঠোঁটজোড়া হালকা ফাঁক হয়ে আছে, ভারী শ্বাস ফেলছে। চুলগুলো কপালে ছড়িয়ে পড়েছে। সাইবান আরও কাছে ঝুঁকে আসতেই ইরামের কপাল ছুঁয়ে গেল চুলের গোছা। শক্তভাবে চোখ বুঁজে ফেলল রমণী, কেন তা নিজেও বলতে পারবেনা। সাইবান অত্যন্ত মোহ নিয়ে তার মুখটা দেখল। ইরামের নাকে ছোট্ট একটা নোসপিন জ্বলজ্বল করছে। বস্তুটা এত কেন টানছে বোঝার আগেই সাইবান ঝুঁকে সেই নোসপিনের উপর নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। ইরাম হালকা ঝটকা দিয়ে উঠল, অথচ নড়তে পারলনা। তার গলায় সাইবানের হাত আরেকটু শক্ত হয়ে চেপে বসল। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে ইরাম জ্বলজ্বলে চোখ মেলে তাকাতেই সাইবানের দৃষ্টি মোকাবেলা করতে হলো তাকে। তার গলার চাপটা বাড়িয়ে মুখটা একটুখানি উপরে তুলে নাকে নাক ছুঁয়ে দিয়ে সাইবান ফিসফিস করল,
“কল মি হাসবেন্ড অ্যাগেইন, আর আমি আপনাকে পৃথিবীতে বসিয়ে চাঁদ তারা ঘুরিয়ে আনব। এমন পিশাচকে জাগাবেন না যাকে সইতে পারবেন না, মাই প্রেশিয়াস।”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ১