Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৫


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৭৫]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

(দ্বিতীয় খন্ড)

প্রকৃতি আজ বড্ড বিচলিত, অস্থির, সেই অস্থিরতা গ্রাস করেছে রাইসার সমস্ত সত্তাকে। চোখের কার্নিশ বেয়ে বারিধারা নেমে গেল। ঠোঁটের একপাশে আনমনা হলেই নিম্নাষ্ট দ্বারা চেপে আছে। আজ রাইসা ক্লান্ত, বাস্তবতার জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া এক মামুলি সত্তা মাত্র। মাথার উপর হিমশীতল হিমালয়ের ন্যায় নিটল লোকটার হাতের স্পর্শ অনুভব হতেই ডুকড়ে কেঁদে ওঠে রমণী। কান্নার হিড়িকে কেঁপে কেঁপে উঠলো শীর্ণ বদন।

“আমি এটা আশা করিনি ভাই! আপনি আমাকে সেইভ করতে গিয়ে ইস্ক্রিয়াসকে…

কন্ঠস্বর রোধ হয় রমনীর, অথচ নিশ্চল সেই নীলাক্ষী জোড়ার মালিক , স্বীয় জায়গায় নিটল শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি ছোট্ট দীর্ঘ শ্বাস নির্গত হলো আফরিদের বক্ষ হতে। মাথা কাত করে ডান দিকে এক পলক চেয়ে বলল আফরিদ,

“রাইসা, তুমি কি চাও?”

“আমার কিছু চাওয়ার নেই, শুধু একটা মাত্র আবদার তাকে ছেড়ে দেওয়া হোক।”

বিন্দুমাত্র ভনিতা ছাড়াই বলল রাইসা, বিস্তৃত হাসিতে উদ্ভাসিত আফরিদের ওষ্ঠো জোড়া। আফরিদ হাত সরিয়ে এনে থাইগ্লাসের দিকে দু কদম এগিয়ে গেল ,পিছনে দাঁড়ানো রাইসা উদগ্রীব হয়ে আছে আফরিদের প্রত্যুত্তর জানতে চেয়ে।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করে মিনিট দুয়েক সময় পেরিয়ে গেল তবে বিন্দুমাত্র হেলদোল দেখা গেল না আফরিদের অভিব্যক্তি জুড়ে। আরো কিছুক্ষণ পেরুতেই কিছু গার্ড প্রবেশ করলো। তাদের মধ্যে একজন কাছাকাছি এগিয়ে এলো আফরিদের। ফোন বের করে এগিয়ে দিতেই আফরিদ কারো সাথে ফোনালাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রায় পনেরো মিনিটের মতো আলাপ সেরে ফোনটা ফের এগিয়ে দিলো গার্ডের দিকে।

ঘাড় কাত করে রাইসার দিকে তাকিয়ে আদেশ স্বরুপ বললো।

“মঞ্জিলে ফাংশন আছে,রেডি হও।”

রাইসা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো , ক্ষুরধার ওই চাহনিতে ঠের বুঝতে পারছে কিছু হতে চলেছে। ভয়ংকর কিছু।

____________________

সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসেছে ইদ্রান। চুল চুঁইয়ে চুঁইয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে পানির কণা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে , কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হয়। সেই হাতের মালকিনকে আলতো করে টেনে নিজের সামনে নিয়ে এলো ইদ্রান। বসিয়ে দিলো ড্রেসিং টেবিলের উপর। স্মাইলি হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দৃষ্টি নিজের স্থান বদলে স্থির হয় ঘাড়ের ট্যাটুর দিকে। ঈগলের সুঁচালো ওই ট্যাটু! আলতো করে সেথায় আঙ্গুল ছুঁয়ে দিলো স্মাইলি।

“চার্ম,এটা কেমন ট্যাটু?”

ইদ্রান আবারো স্মাইলির হাত টেনে ঠোঁটের কাছে এনে শীতল এক চুম্বন এঁকে দিলো। মৃদু হেসে বলল,

“এটা আফরিদ এহসানের ফেবারিট ট্যাটু।”

স্মাইলি প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালো তার দিকে। প্রত্যুত্তরে লুসিফার এলেন ইদ্রান হাসলো।

“আপনি কি জানেন প্রিন্স চার্ম, আফরিদ আপনার থেকেও বেশি সুন্দর?”

এক মূহুর্তের জন্য থমকালো ইদ্রান , পরক্ষণেই হেসে উড়িয়ে দিলো স্মাইলির কথাটা। স্মাইলি তবুও থেমে নেই ,উঠে দাঁড়ালো।গলা জড়িয়ে ধরে ইদ্রানের।

“সত্যি বলছি আমি, আফরিদ এহসান মারাত্মক সুদর্শন সুপুরুষ।যে কেউ তার ওই ধারালো দৃষ্টিতে বশীভূত হবে,তার উপর ওই নীলাক্ষী জোড়া তো আরো ভয়ংকর।”ইদ্রান হোহো করে হেসে উঠলো।

“তুমিও কি বশীভূত হয়েছো প্রিন্সেস?”

স্মাইলি হাস্যোজ্জ্বল স্বরে বলল।

“যদি বলি হ্যাঁ তাহলে?”

ততক্ষণ ইদ্রানের বলিষ্ঠ হাত গ্রীবা চেপে ধরে স্মাইলির।

“তাহলে এভাবে মে’রে দেব। আই উইল কিল ইউ।”

স্মাইলি ফিচলে হেসে জানালো।

“বুঝলাম আপনি জেলাস।”

ইদ্রান পাল্টা জবাবে বলল,

“ইয়েস আই অ্যাম।”

স্মাইলি তাকে ছেড়ে দূরে সরে এলো ,বাইরে যেতে যেতে বলল।

“আচ্ছা ঠিক আছে আপনি তাহলে তৈরি হয়ে নিচে আসুন আমি যাচ্ছি।”

“ওকে।”

স্মাইলি নিচে চলে যেতেই আগমন ঘটে ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনার। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকে দেখে চোখ দুটো ছোট হয়ে এলো লুসিফার এলেন ইদ্রানের।

“ইলহাম?”

“হ্যাঁ আমি। আপনার সকল কিছু কথা ছিলো মিস্টার ইদ্রান ভাইয়া।”

ইলহামের টোন শুনে কিছুটা চিন্তিত দেখালো ইদ্রানকে। সে সোজাসাপ্টা বলে।

“কি চাই তোমার?”

“উত্তর।”

পাল্টা প্রশ্নের তোপে অন্ধকারে রাজত্ব করা লুসিফার এলেন ইদ্রান কিছুটা ভড়কে যায়। আমতা আমতা করে বলল।

“কিসের উত্তর?”

ন্যান্সি তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল।

“আপনি কার হয়ে কাজ করেন সেটার উত্তর! নীলাদ্রি ভাইয়ার হাতে যে ঈগলের আংটি ছিলো সেই ট্যাটু আপনার ঘাড়ে কি করছে সেটার উত্তর! অনেক গুলো বছর আগে স্পেনের মিস্টার আলবার্ট নামে একজন ছিলেন সায়েন্টিস্ট তিনি হুট করেই উধাও হয়ে যান সেটার কারণ কি? আলো না একজন ছিলেন যাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে উনি কে? সবচেয়ে বড় কথা যে মিস্টার আলবার্ট কে উধাও করেছিল সিসি টিভি ফুটেজে তাদের একজন লোক ছিলো যার ঘাড়ে ঠিক এই ট্যাটু ছিলো। ঈগল পাখি। সবকিছুর জবাব চাই!”

ইদ্রান নির্বাক, শক্ত তার চাহনি।‌ চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। রাগান্বিত স্বরে বলল।

“তুমি আমাকে এসব কেন জিজ্ঞেস করছো ইলহাম? এই ট্যাটুর জন্য? সিরিয়াসলি? সামান্য ট্যাটু রয়েছে বলে তোমার ভাবনার সাথে আমাকে জুড়ে দেবে?”

“সামান্য নয়, মোটেও সামান্য নয়।”

এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠলো ন্যান্সি।

“আমি জানতে চাই কে ছিলেন মিস্টার আলবার্ট? আর আপনি কেন নীলাদ্রি ভাইয়ার মতো ট্যাটু করিয়েছেন? আপনি উনার হয়ে কাজ করেন তাইনা?”

ইদ্রান তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে তড়িঘড়ি করে স্যুটটা জড়িয়ে বেরুতে বেরুতে বলল।

“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে যা ইচ্ছে তাই বলছো।”

ন্যান্সি ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় ক্ষেপে গেল।

“আপনি আফরিদ এহসানকে ঠকাতে পারেননা ইদ্রান ভাইয়া।”

ঠকানোর কথা শুনে পা জোড়া থামলো ইদ্রানের। বেয়াদব মাফিয়া কিং তাকে দিয়ে এত কিছু করাচ্ছে এদিকে তারই বউ ডিটেকটিভের মতো পিছনে পড়ে আছে। জামাই বউ দুটোই তার ছেঁড়া।

ইদ্রান পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল, ন্যান্সি হাপুসহুপুস করছে সত্যিটা জানার জন্য। সে এই রহস্য আর নিতে পারছেনা। তাকে জানতে হবে সবটা! যদি সত্যি ইদ্রান আফরিদ কে ঠকিয়ে থাকে,তার বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে থাকে তাহলে ন্যান্সি তাকেও ছাড়বে না। প্রয়োজন হলে আরো একটা খু’ন করবে সে।

_______________

সর্বাঙ্গে জড়ানো কালো রঙের পোশাক। মুখে মাস্ক,চোখ দুটো শুধু উন্মুক্ত।চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায় সে একজন নারী। গভীর, অদ্ভুত শান্ত চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্ধকার। নিজেকে আড়াল করতেই কালো পোশাকে সম্পূর্ণ আবৃত সে, যেন রাতেরই এক টুকরো নিশাচর। হাতে ধরা ধারালো অ’স্ত্রের ফলার কোণ বেয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে র’ক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে গন্ধে। গভীর এই জঙ্গলের পথ ধরে বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। এইটা সেই জঙ্গলের পথ যেখান থেকে ধরে আফরিদ এহসানের রিসার্চ সেন্টারের দিকে চলে গেছে।

ঘন পাতার ফাঁক গলে সে এগিয়ে আসে। কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে তার পছন্দের গাড়িটি লালচে রঙের Chevrolet Camaro। আ”গুনের মতো লাল রঙ, ঠিক তার স্বভাবের মতোই তীব্র। লাল তাকে টানে, র’ক্তের রঙের সঙ্গে যার অদ্ভুত এক সখ্য। র’ক্তের সাথে খেলতে তার যে ভীষণ ভালো লাগে তা তার নির্লিপ্ত হাঁটাতেই স্পষ্ট।

র’ক্তাক্ত অ’স্ত্রটি সে নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ির ডিকির ভেতর ছুঁড়ে ফেলে। কোনো দ্বিধা নেই, নেই অনুশোচনা। পরম নিশ্চয়তায় উঠে বসে ড্রাইভিং সিটে। নিজের হাতেই স্টিয়ারিং ঘোরায় দৃঢ়, নিয়ন্ত্রিত। ইঞ্জিনের গর্জনে জঙ্গল কেঁপে ওঠে, অথচ তার মুখে এক ফোঁটা ভাবান্তরও নেই।

তার উদ্দেশ্য কী কেউ জানে না। কে এই রমণী সেটাও অজানা। চারদিকে শুধু ধোঁয়াশা, প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কিছুটা এগোতেই লাল গাড়িটি রাতের কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে যায়, রেখে যায় শুধু টায়ারের দাগ আর ভাসতে থাকা এক অদৃশ্য আতঙ্ক।

_________________

অফিসের দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা শেষে মাত্রই এহসান মঞ্জিলে ফিরেছে আফরিদ। গত কয়েকটি দিন যেন তাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার অবকাশ পর্যন্ত দেয়নি। একদিকে ঈশান ও তিতলির আসন্ন বিয়ের আয়োজন, অন্যদিকে ব্যবসায়িক ডেলিভারি, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এবং অন্তহীন দায়িত্ব সব মিলিয়ে শরীর ও মন দুটোই প্রায় অবসন্ন।

ক্লান্ত পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করতেই সে থমকে দাঁড়াল।

তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে ন্যান্সি।

মেয়েটির মুখাবয়বে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। বোঝাই যাচ্ছে, অনেকক্ষণ ধরেই সে অপেক্ষা করছে। রুমের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অগণিতবার পায়চারি করেছে কেবল এই মুহূর্তটির জন্য। ন্যান্সি আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করল না। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

“আমার আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে, আফরিদ।”

আফরিদ ক্ষীণভাবে ভ্রু তুলল।

“হুঁ, বল, শুনছি।”

কথাটি বলেই সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কব্জি থেকে ঘড়িটি খুলে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিছানার উপর ছুড়ে দিল।

ন্যান্সির উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল।

“আফরিদ, এদিকে তাকান। আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।”

সে সত্যিই ভীষণ ক্লান্ত। চোখেমুখে অবসাদের ছাপ স্পষ্ট। তবু ন্যান্সির গলায় উদ্বেগের সুর শুনে সমস্ত ক্লান্তিকে তুচ্ছ করে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করল তার দিকে। সে শার্টের বোতাম খোলা রেখে এগিয়ে গেল ন্যান্সির সন্নিকটে। মুঠোয় বন্দি করে ওই করতল!

অতঃপর শান্ত গলায় বলল,

“এবার বল।”

ন্যান্সি গভীর শ্বাস নিল। তারপর দ্রুত বলে উঠল,

“আপনি জানেন, ইদ্রান ভাইয়া আপনাকে ঠকাচ্ছে।”

আফরিদের কপাল সামান্য কুঁচকে উঠল।

“ঠকাচ্ছে মানে?”

ন্যান্সি আরও কাছে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে ভয়, সংশয় আর আবিষ্কৃত কোনো গোপন সত্যের আতঙ্ক।

“আপনি জানেন না, নীলাদ্রি ভাইয়ের হাতে যে ঈগল চিহ্নের আংটিটা ছিল, ঠিক সেই একই ট্যাটু আমি ইদ্রান ভাইয়ার ঘাড়ে দেখেছি। আমি নিশ্চিত, উনিও নীলাদ্রি ভাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আগেও আপনাকে ঠকিয়েছেন, এখনও ঠকাচ্ছেন।”

কথাগুলো শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল আফরিদ। ট্যাটুর বিষয়টি সে যেন সত্যিই ভুলে গিয়েছিল।

কিন্তু সেই ঈগল চিহ্নের প্রকৃত অর্থ সে ছাড়া আর কে-ই বা জানে? স্পেনে ছড়িয়ে থাকা তার রক্তপিপাসু বিশেষ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের ঘাড়েই এই চিহ্ন খোদাই করা। সেই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ইদ্রান। আর ঈগল খচিত আংটিটি তা বহন করে একমাত্র তার ক্ষমতার প্রতীক। কারণ সে আফরিদ এহসান।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের অদৃশ্য সম্রাট। মাফিয়া কিং। অসংখ্য অন্ধকার সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি।

ন্যান্সি তার নীরবতা দেখে আরও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল।

“আমি নিশ্চিত, আফরিদ ইদ্রান ভাইয়া আপনার অগোচরে নীলাদ্রি ভাইয়ের সঙ্গে ছিল। আপনি ওনাকে বিশ্বাস করছেন, অথচ উনি,,

সে বাক্য শেষ করতে পারল না। আফরিদ ধীরে ধীরে আরো কাছে এল তার দিকে। তারপর অত্যন্ত কোমল ভঙ্গিতে ন্যান্সির থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে মুখটা উঁচু করল।

গভীর নীলাভ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,

“তুই আমাকে বিশ্বাস করিস তো?”

ন্যান্সি এক মুহূর্তও দেরি করল না।ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

আফরিদের কঠিন মুখশ্রীতে ক্ষীণ এক প্রশান্তির রেখা ফুটে উঠল।

সে ঝুঁকে এসে ন্যান্সির ললাটে নিজের উষ্ণ অধর ছুঁইয়ে দিল। তারপর স্নিগ্ধ, আশ্বাসমাখা কণ্ঠে বলল,

“সব আমি সামলে নেব, পরাণ। তুই এসব নিয়ে একটুও ভাবিস না।”

ন্যান্সি তবু থামল না।

“কিন্তু আফর,,

“হিস,,,

আফরিদ আলতো করে তার ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরল। তার কণ্ঠ নেমে এল আরও নিচু, আরও মোলায়েম স্বরে।

“বললাম তো, সব আমি সামলে নেব। তুই শুধু আমাকে বিশ্বাস করে থাক। বাকি সবকিছুর দায়িত্ব আমার।”

কথাগুলো শুনে ন্যান্সি চুপ করে গেল।কিন্তু তার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটুকু কোথাও গিয়ে থামল না।

আর আফরিদ?সে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের গভীরে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধতে লাগল অদৃশ্য এক ঝড়। কারণ ন্যান্সি যেটাকে সন্দেহ বলে ভাবছে, তার পেছনের সত্যটা আরও অনেক বেশি ভয়ংকর।

দমবন্ধ করা নীরবতার মধ্যে ন্যান্সি ধীরে ধীরে আফরিদের করতলটি নিজের দু’হাতে আবদ্ধ করল। আঙুলগুলো কাঁপছে, চোখের তারায় ভাসছে অনুনয়।

কম্পমান কণ্ঠে সে বলল,

“আফরিদ, আপনি এসব অন্ধকার কাজ ছেড়ে দিন না, প্লিজ।”

আফরিদ এক মুহূর্ত স্থির রইল। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের হাত সরিয়ে নিল। পিঠ ফিরিয়ে ব্লেজারটি খুলে সোফার উপর রাখল। অতঃপর শার্টের বোতামগুলো একে একে আলগা করতে লাগল।

ন্যান্সি বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল।

“কি হলো? কিছু বলছেন না কেন?”

কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতার পর গভীর, ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল সে,

“সম্ভব নয়।”

ন্যান্সি তৎক্ষণাৎ তার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। কপালে উদ্বেগের ভাঁজ, নয়নে অবিশ্বাস।

“কেন সম্ভব নয়? আপনার কিসের অভাব আছে? অর্থ আছে, প্রতিষ্ঠা আছে, বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা সবই তো আছে। তারপরও কেন এই অন্ধকারের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে রেখেছেন?”

আফরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর, প্রস্তরকঠিন কণ্ঠে বলল,

“তুই আর তোর চৌদ্দ গুষ্টির জন্য।”

ন্যান্সি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

“একদম ফাজলামি করবেন না, আফরিদ। আমি আপনাকে সিরিয়াস কথা বলছি।”

আফরিদ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিতে তাকালো ন্যান্সির দিকে, ম্রিয়মাণ স্বরে বলল,

“তুই যেটা চাইছিস, সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

ন্যান্সির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।

“কেন সম্ভব নয়? সেটাই তো জানতে চাইছি!”

আফরিদ আর উত্তর দিল না। ধীর পদক্ষেপে টাওয়েল নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু ন্যান্সি আবারও তার পথরোধ করে দাঁড়াল। আফরিদ পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে একহাত বাড়িয়ে কলারের একাংশ আঁকড়ে ধরে। অগত্যা থামতে হলো তাকে।

এবার কন্যার দৃষ্টি কঠিন, আহত এবং অভিমানে পূর্ণ।

“তার মানে আপনি ছাড়বেন না? তাই তো?”

এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে আফরিদ উত্তর দিল,

“না।”

একটি মাত্র শব্দ।কিন্তু সেই শব্দটুকুই যেন ন্যান্সির অন্তর বিদীর্ণ করে দিল।তার চোখদুটি অশ্রুতে টলমল করে উঠল। বুকের ভেতরে জমে থাকা শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতিকে কোনোভাবে আটকে রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“তাহলে শুনুন, হয় আপনি এই জীবন ছাড়বেন, নয়তো আমাকে। এখন আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন, কোনটাকে বেছে নেবেন।”

কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধাম! প্রচণ্ড শক্তিতে দেয়ালে মুষ্টিঘাত করল আফরিদ। আঘাতের তীব্রতায় তার হাতের চামড়া ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে এলো।

শিউরে উঠল ন্যান্সি। সে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল, যেন সমগ্র পৃথিবী হঠাৎ থমকে গেছে। আফরিদ ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল। চোখ দুটো অস্বাভাবিক র’,ক্তিম, দৃষ্টিতে দহন।

গভীর, ভারী কণ্ঠে বলল,

“আর একবার,যদি এমন কথা মুখ দিয়ে বের হয়, তাহলে কিন্তু,,,,

বাকিটুকু আর উচ্চারণ করল না।হয়তো পারেনি।

হয়তো তার নিজেরই সাহস হয়নি সেই কথাটা বলার।

কারণ পৃথিবীর সমস্ত কিছু হারানোর ক্ষমতা তার আছে, কিন্তু ন্যান্সিকে হারানোর চিন্তাটুকুও তার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব।

পরমুহূর্তেই সে পাশ কাটিয়ে বাথরোবটি তুলে নিল এবং দ্রুত পদক্ষেপে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল।

দরজাটি বন্ধ হওয়ার শব্দে কেঁপে উঠল ন্যান্সি।সে নির্বাক।হতবিহ্বল।কিছুই বুঝতে পারছে নাআফরিদ কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখাল? কেন তার কণ্ঠে এমন কঠিন ছিল?

কেন মনে হলো, দেয়ালে নয় মুষ্টিঘাতটি যেন তার হৃদয়েই এসে আছড়ে পড়েছে? চোখের কোণ বেয়ে নীরবে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। ন্যান্সির বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল।

সে এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছে, যার অতীত র’ক্তে রঞ্জিত, যার বর্তমান অন্ধকারে নিমজ্জিত।

একজন অপরাধী। অথচ সেই মানুষটাই তার কাছে ভবিষ্যৎ চায়, সংসার চায়, সন্তান চায়।হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর হাহাকার জেগে উঠল। যদি কোনোদিন সত্যিই তাদের সন্তান হয় তবে সে তাকে কী পরিচয় দেবে?

কি বলবে?তার পিতা কে?একজন সফল ব্যবসায়ী?

নাকি অন্ধকার সাম্রাজ্যের নির্মম, র’ক্তমাখা সম্রাট?

ন্যান্সির এ বেলায় কান্না পেলো।সে শান্তির সংসার করতে চায়। যেখানে শুধু শান্তি আর শান্তি থাকবে।

_________________

আজ এহসান মঞ্জিলে হলুদিয়া অনুষ্ঠানের রঙিন আয়োজন। বিকেল গড়াতেই একে একে অতিথিদের আগমন ঘটেছে। পুরো বাড়িজুড়ে উৎসবের আমেজ, হাসি-আড্ডা আর কোলাহলের মধুর সুর।

অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত বাড়ির সকলে। মাইমুনা এহসানও নিজ হাতে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। কখনো উষ্ণ আলিঙ্গন, কখনো স্নিগ্ধ হাসিতে পুরোনো পরিচিতদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন তিনি।এদিকে স্মাইলি যেন খাঁচাছাড়া পাখি।

কখনো ড্রয়িংরুম, কখনো বারান্দা, কখনো আবার উঠোন অবিরাম ছুটে বেড়াচ্ছে। বাঙালি বিয়ে সে কখনো দেখেনি; তার কাছে সবকিছুই নতুন, বিস্ময়কর, অপার আনন্দে ভরা।

আজ তার পরণে টকটকে লাল রঙের অপূর্ব এক লেহেঙ্গা। ন্যান্সি নিজেই ড্রেসটি তাকে উপহার দিয়েছে। পার্লারের মেয়েরা পরম যত্নে তাকে সাজিয়ে দিয়েছে। মাথার খোঁপায় ছোট ছোট ফুল, হাতে রঙিন চুড়ি ছোট্ট রাজকন্যার মতো লাগছে তাকে।

হঠাৎই পাখির মতো উড়ে গিয়ে দাঁড়াল তিতলির সামনে।

নববধূ বেশে তিতলিকে আজ অদ্ভুত মায়াবী লাগছে।

হলুদের আভা মেখে থাকা মুখখানি, অলঙ্কারে সজ্জিত কপাল, লাজুক হাসিতে আলোকিত অধর মেয়েটিকে যেন আজ সত্যিই নববধূ বলে মনে হচ্ছে।

আর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

অন্যদিকে নিজের কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে ন্যান্সি।পরণে তুষারের মতো শুভ্র একটি লেহেঙ্গা। সাজসজ্জা বলতে তেমন কিছুই করেনি সে। হালকা কাজল আর মৃদু লিপস্টিক ছাড়া মুখে নেই কোনো বাড়তি আয়োজন।

আজ নিজেকে সাজাতে গিয়েও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক বিষণ্নতা কাজ করেছে। বারবার কানে ভেসে উঠছে আফরিদের বলা সেই কথাগুলো।

সে চেষ্টা করছে নিজেকে সামলে নিতে, সবকিছু ভুলে থাকতে কিন্তু হৃদয় কি এত সহজে মানে?

ক্লান্ত, অবসন্ন পদক্ষেপে ধীরে ধীরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো ন্যান্সি।

বাড়িজুড়ে মানুষ আর মানুষ। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির ওপর।

কালো রঙের নিখুঁত স্যুটে নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে আফরিদ এহসান।

এক হাতে ফোন, অন্য হাত পকেটে। গম্ভীর মুখে কারও সঙ্গে কথা বলছে সে।

ন্যান্সি ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আফরিদের দৃষ্টি গিয়ে থামল তার উপর। পরমুহূর্তে তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন ছন্দ ভুলে বসল। নয়নযুগল স্থির হয়ে রইল।

অধরযুগল অজান্তেই সামান্য ফাঁক হয়ে এলো।

দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। কন্যা কি তার উপর অভিমান করে কৃষ্ণবর্ণের আচ্ছাদন ছেড়ে শুভ্রতায় নিজেকে মুড়িয়েছে?

শুভ্র লেহেঙ্গায় নেমে আসা ন্যান্সিকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তুষারাবৃত কোনো পরী ভুল করে মানুষের ভিড়ে নেমে এসেছে। অস্ফুট স্বরে, প্রায় নিজের অজান্তেই বলে উঠল সে,

“স্নো হোয়াইট!”

ন্যান্সি একবার মাত্র তাকাল তার দিকে।

শুধু একবার। তারপরই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মুখশ্রী মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল সে।

যে মানুষটি তাকে কথার আঘাতে ভেঙে দিয়েছে, যার কঠোর বাক্য এখনও তার বুকের ভেতর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে তার দিকে আর ফিরেও তাকাতে চায় না ন্যান্সি।

তাই মাথা নিচু করে সে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।

আর আফরিদ? সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ফোনের ওপাশে কে কথা বলছে, কী বলছে তার আর কিছুই কানে পৌঁছাল কিন্তু মস্তিষ্ক তা ধরল না।

তার সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত অনুভূতি আটকে রইল এক শুভ্রবসনা রমণীর ওপর যে আজ তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেল। যুবক ঠোঁটে ঠোঁট পিষল।

“রেগে আছিস মানলাম।তাই বলে এভাবে কষ্ট দিবি?”

চলবে………..।🌿

(📌গানটি ডেডিকেট করলাম আগুন্তক নারীকে 🫣সবাই রেসপন্স করবেন।)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply