সোফিয়া_সাফা
কয়েকদিন কেটে গেছে!
বিছানায় আধশোয়া হয়ে ড্রিঙ্কস করছে উদ্যান। তার এক হাতে গ্লাস, অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়ার নীলচে কুণ্ডলী সিলিংয়ের দিকে উঠে যাচ্ছে, হঠাৎ এক গভীর নির্লিপ্ততায় তার ঠোঁট নড়তে লাগল।
“ইয়ে দূরিয়া… ইন রাহো কী দূরিয়া
নিগাহো কী দূরিয়া… হাম রাহো কী দূরিয়া
ফানা হো সাভি দূরিয়া।”
শব্দগুলো ঘরের নিস্তব্ধতায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। উদ্যান যেন কোনো এক ঘোরগ্রস্ত ঘোরের ভেতর ডুবে আছে।
“কিউ কোয়ি পাস হ্যায়… দূর হ্যায় কিউ কোয়ি,
জানে না কোয়ি ইহা পে।
আ রাহা পাস ইয়া… দূর মে যা রাহা,
জানু না মে হু কাহা পে।”
নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে উদ্যান নিজেই সন্দিহান। তার এই অন্যমনস্কতার মাঝেই ডোরবেল বেজে উঠল। সে সামান্য মাথা উঁচিয়ে যান্ত্রিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “হু ইজ আউটসাইড?”
অ্যালেক্সের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “লুহান, সোহম অ্যান্ড মেলো।”
উদ্যান কয়েক মুহূর্ত স্থির থেকে বলল, “ওকে লেট দেম ইন।”
দরজা খোলার শব্দ হতেই উদ্যান সোজা হয়ে বসল। স্বাভাবিক আদলে ফেরার চেষ্টায় এলোমেলো চুলগুলো স্লাইড করে গোছাতে লাগল। তারা ভেতরে ঢুকতেই সিগারেটে শেষ টান দিয়ে উদ্যান সেটা অ্যাশট্রেতে পিষে দিল।
লুহান এগিয়ে এসে সুক্ষ্ম চোখে তাকাল তার দিকে।
“তোর ফোনের কী হয়েছে? কতোগুলো কল দিয়েছি খবর আছে?”
উদ্যান অলস ভঙ্গিতে ফোন খুঁজতে লাগল। সোহম এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের সামনে পড়ে আছে। সে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সেটা বন্ধ; অন করার চেষ্টা করেও যখন অন হলোনা তখন বুঝতে পারল চার্জ একদম শেষ হয়ে গেছে।
সোহম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা চার্জে বসিয়ে দিল। উদ্যান নিজের চিরচেনা গাম্ভীর্য ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও মেলো বুঝতে পারল কিছু একটা ঠিক নেই। শুধু সে নয় লুহানও অনুমান করতে পারল। “তুই ঠিক আছিস তেহ?”
উদ্যান সরাসরি চোখের দিকে না তাকিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল। “হুম, আই এম ফাইন।”
মেলো শান্ত গলায় জানাল, “রিদম জানতে চাইছিল নরওয়ে যাওয়ার ডেট পোস্টপয়েন্ট করে দেবে কিনা।”
উদ্যান হাতের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে মাথা নাড়ল।
“নো নিড।”
“তাহলে তো তাড়াতাড়িই ফিরে যেতে হবে।” সোহমের কথার পিঠে উদ্যান কেবল সায় দিল। “হুম, ফিরে যাবো।”
লুহান রয়েসয়ে বলল, “তেহ, ফুলকে একটু বুঝিয়ে বললেই মেয়েটা বুঝতে পারতো।”
উদ্যান নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলল, “বোঝার দরকার নেই।”
মেলো একটু আনকম্ফোর্টেবল ফিল করে উল্টো ঘুরে চলে গেল। লুহান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উদ্যানকে প্রশ্ন করল, “তোর কি ওকে আর ভালো লাগছে না?”
উদ্যান জিজ্ঞেসু দৃষ্টে তাকাতেই লুহান হালকা হেসে বলল, “আগে প্রতিদিন ও আসতো তোর কাছে, কয়েকদিন ধরেই আসেনা। তোর তাতে কিছুই যায় আসেনা?”
উদ্যান অস্বস্তি চেপে রেখে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “অ্যাকচুয়ালি আমিও এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”
লুহান কিছুটা অবাক হয়ে শুধাল, “ক্লান্ত? ঠিক কোন বিষয়ে?”
উদ্যান সোজাসাপটা জবাব দিল, “অনি আর রিদম যেমন একটা সময় পর ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে আমার সাথেও তেমন কিছুই হয়েছে।”
লুহান খুকখুক করে কেঁশে উঠল। “তুই বুঝতে পারছিস তুই কী বলছিস? ওরা ওদের বউকে ভালোবেসে অন্য মেয়েদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। তুই নিজের বউয়ের সঙ্গ ত্যাগ করছিস কাকে ভালোবেসে?”
উদ্যানের স্থির চাউনি লুহানের ওপর নিবদ্ধ হলো। “ওরা ক্লান্ত হয়ে থেমে গিয়েছিল। আমিও সেই জন্যই থামতে চাইছি। উল্টো পালটা লজিক খুঁজিস না।”
সোহম এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সে এবার বিড়বিড় করে বলল, “উল্টো পাল্টা লজিক তুই খুঁজছিস তেহ। সত্যিটা কী, কেন বলছিস না?”
উদ্যান তার আস্তে বলা কথাটাও শুনে ফেলল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “তোরা আমাকে ডিস্টার্ব করছিস।”
লুহান বুঝতে পারল এখন কথা বাড়ানো বৃথা। সে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি আমরা।”
হলরুম দিয়ে যাওয়ার সময় সোহম লুহানকে বলল, “আমাদের উচিত ফ্রাইটফুলকে গিয়ে বুঝিয়ে বলা।”
লুহান দ্বিধায় পড়ে গেল, “তেহ জানতে পারলে রেগে যাবে।”
সোহম হালকা হেসে বলল, “হার্টফুল সত্যিটা জানতে পারলে তেহকে রেগে যেতে দেবেনা।”
লুহান একমত হলো, “ঠিক আছে, চল তবে।”
“উঁহু, আমি যাব না। তুই মেলোকে নিয়ে যা।” সোহম থেমে গেল।
“কেন? তুই যাবি না কেন?”
সোহম মৃদু স্বরে বলল, “সরোফুল আমার কথা বিলিভ করবে না তাই।”
,
,
,
জানালার ফ্রেমে কপাল ঠেকিয়ে একদৃষ্টিতে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল ফুল। তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ল দরজায় লুহান আর মেলোকে দেখে। সে কিছুটা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল। ম্লান হেসে বলল, “আরে আপনারা? ডিনারের তো এখনো ঢের দেরি।”
লুহান বলল, “এমনিতেই এলাম। ভাবলাম কিছুক্ষণ গল্প করা যাক।”
ফুল ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। “হুম বলুন।”
মেলো আলতো করে ফুলের হাত ছুঁয়ে বলল, “চলো, গার্ডেন থেকে ঘুরে আসি।”
গার্ডেনে এসে কাঠের বেঞ্চের ওপর বসল ফুল। তার পাশে বসল মেলো। আর লুহান বসল গাছের বেদির ওপর।
“আমি তোমাকে যেই গিফটটা দিয়েছিলাম, সেটা কি খুলে দেখেছো?” মেলোর প্রশ্নে ফুল মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। সে খুলে দেখেছে মেলো তাকে মোবাইল গিফট করেছে। ফুল অবশ্য সেটা অন করেও দেখেনি। কাকেই বা কল করবে সে; কেউ নেই তো তার। অনিলা আর উর্বীর কাছে তো ফোনই নেই যে তাদের সাথে আলাপচারিতা করবে।
“আমারটা দেখেছো?” লুহান জানতে চাইল।
ফুল মাথা নেড়ে বলল, “আপনি আর সোহম স্যার আমাকে চাবি গিফট করেছেন, আমি জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গিয়েছিলাম সেগুলো কিসের চাবি।”
লুহান হতভম্ব হয়ে গেল, “তুমি বুঝতেই পারোনি?”
ফুল ডানে বায়ে মাথা নাড়ল। লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমাকে আমি কার গিফট করেছি ফুল।”
বিস্ময়ে ফুলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “কীহ? আমি গাড়ি দিয়ে কী করবো লুহান স্যার?”
“গাড়ি দিয়ে কী করে সেটাও তুমি জানো না?”
“জানি, কিন্তু আমি তো এস্টেটেই থাকি, তাই না? গাড়ি আমার কোন কাজে আসবে? আপনাদের তেহ তো আমার ভার্সিটিতে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে।”
“যখন গিফট ডিসাইড করেছিলাম তখন তেহ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাই ভেবেছিলাম তোমার গাড়ি প্রয়োজন হবে। অবশ্য এখনো মনে হচ্ছে কেননা সোলার এস্টেটে আমরা সবাই আর কয়েকদিনের অতিথি মাত্র।”
ফুলের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, “আমাকেও বেরিয়ে যেতে হবে? কিন্তু কোথায় যাবো আমি, আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”
“সোহম তোমাকে ওর শহরের ফ্ল্যাটটা গিফট করেছে। ওর দেওয়া চাবিটা সেই ফ্ল্যাটেরই।”
ফুল যেন কথা বলতেই ভুলে গেল। লুহান ফের ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, “অনি আর রিদমের গিফট দেখে যে রেগে যাওনি তা দেখা অবাক হয়েছি আমরা।”
ফুল ফ্যালফ্যাল চোখে তাকাল, “ওনারা তো কিছুই দেননি। গিফট বক্স ফাঁকা ছিল। হয়তো প্র্যাংক করেছে। এখানে রেগে যাওয়ার কী আছে?”
মেলো পাশ থেকে বলল, “প্র্যাংক করেনি, ফ্ল্যাটের সব ফার্নিচার নতুন করে তোমার টেস্ট অনুযায়ী অ্যারেঞ্জ করে দিয়েছে রিদম। আর অনির দেওয়া গিফট তুমি পরে বুঝতে পারবে।”
ফুল এবার চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেল। “কেন আপনারা আমাকে নিয়ে এতো ভাবছেন? এতো দামি সব গিফট কেউ কাউকে দেয়?”
মেলো বলল, “তুমি আমাদের তেহুর ওয়াইফ ফুল, দামি কাউকে দামি গিফটই দিতে হয়।”
ফুল মাথা নিচু করে নিল। গাল বেয়ে প্রবাহিত হলো অশ্রুধারা। ভাঙা গলায় বলল, “একজন খু’নির বউ কখনো দামি কেউ হতে পারে না।”
লুহান আর মেলো একে অপরের দিকে তাকাল। মেলো শান্ত গলায় বলল, “পৃথিবীর সব মানুষই খু’নি, ফুল।”
ফুল প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল। মেলো বুঝিয়ে বলল, “একটা মশা মা’রাও খু’নের মধ্যেই পড়ে।”
ফুল তাজ্জব বনে গেল। “আপনাদের তেহকে আমি একটা লাশের সামনে দেখেছি মেলো ম্যাম। উনি মানুষ মেরেছেন, শুধু মেরেই ক্ষান্ত থাকেন নি। লাশটার মুখ বিভৎস করে ফেলেছেন। এখনো মনে পড়লে দম আটকে আসে আমার। তার ওপর উনি ফ্লোরা সহ আরও তিনজন লোককে কাঁচের শো-কেসে আটকে রেখেছেন।”
লুহান আর মেলোর চেহারায় কোনো ভীতি বা বিস্ময় না দেখে ফুল থমকে গেল। সে স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা… আপনারা কি আগে থেকেই এসব জানেন?”
লুহান শান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, আমরা জানি। আর আমরা এই ব্যাপারে গর্বিত যে, তেহ একজন রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার।”
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল ফুল। কথাটা বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল, “রোবোটিকস… মানে উনি কি সায়েন্টিস্ট?”
মেলো বলল, “হ্যাঁ সায়েন্টিস্টও বলতে পারো, ও সেদিন হয়তো রিয়েল হিউম্যান টেকচার রিপলিকেট নিয়ে স্টাডি করছিল। জীবিত মানুষের ওপর তো আর রিসার্চ করা যাবে না তাই ও ডেড বডি ইউজ করেছিল।”
ফুল এখনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার শরীরের কাঁপুনি তখনো থামেনি। “তার মানে… তিনি রোবট বানাচ্ছেন?”
লুহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে গভীর স্বরে বলল, “ও ইতোমধ্যেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে ফুল। ওই যে তিনজনকে তুমি দেখেছ; ওরা আসলে মানুষ নয়, রোবট। দেখতে হুবহু মানুষের মতো হলেও ওদের ভেতরে কোনো আবেগ নেই, কথাবার্তাও একদম যান্ত্রিক। হাত দিয়ে স্পর্শ করলে তুমিও বুঝতে পারবে ওরা মানুষ নয়। বাট, বাট, বাট তেহ এমন একটা রোবট বানিয়ে ফেলেছে যে মানুষের মতোই কথা বলতে পারে, ইমোশনও আছে। ওকে টাচ করলেও বুঝতে পারবে না।”
ফুল নিজের অজান্তেই ঠোঁট ভিজিয়ে অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল, “আপনারা কেউ নন তো?”
লুহান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। “নট রিয়েলি, আমি ফ্লোরার কথা বলেছি। এই পর্যন্ত তেহুর বানানো সব রোবটদের মধ্যে ফ্লোরাই হচ্ছে ওর ‘ম্যাগনাম ওপাস’। তেহ নিজে না বললে আমরাও হয়তো কোনোদিন ধরতে পারতাম না।”
ফুলের মনের মধ্যে জমে থাকা সংশয় কাটলো অবশেষে। সেই সাথে উদ্যানকে নিয়ে সেও প্রাউড ফিল করছে।
“তেহুর প্ল্যান ছিল মেল রোবট বানানোর বাট ফ্লোরাকে কেন বানালো সেটাই বুঝতে পারছি না। ওকে দেখতে কিন্তু বেশ অনেকটা তোমার মতোই লাগে।” মেলোর কথার পিঠে লুহান মজা করে বলল, “কী জানি, ও সেদিন ক্লাবে গিয়ে লিটারালি ফুলের বর্ণনা দিয়ে বলেছিল—এমন একটা মেয়েকে খুঁজে এনে দিতে। তারপর আবার ফ্লোরাকে বানালো। ফ্লোরার কথাবার্তার ধরন, এক্সপ্রেশন দেখে আমি জাস্ট স্পিচলেস হয়ে যাই।”
মেলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ও এখনো ফ্লোরাকে আরও ডেভেলপ করার জন্য দিন-রাত রিসার্চ করে যাচ্ছে।”
ফুল অধীর আগ্রহ নিয়ে বলল, “ফ্লোরাকে বিশ্বের সামনে প্রেজেন্ট করলে উনি একেবারে ফেমাস হয়ে যাবেন। সবাই ওনার মেধার কতো কতো প্রশংসা করবে ভাবতেই আমার ভীষণ আনন্দ লাগছে!”
লুহানের ঠোঁটের হাসি রেখে মিলিয়ে গেল। সে বিষণ্ণ গলায় বলল, “ও কাউকেই জানাবে না ফুল। আর নাতো ফ্লোরাকে অন্য কারো সামনে রোবট হিসেবে প্রেজেন্ট করবে।”
ফুল চকিত নয়নে তাকাল, “কিন্তু কেন?”
“ও জাস্ট নিজে স্যাটিসফাই হতে এগুলো করে। শো-অফ করে ফেমাস হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই ওর।”
“এটা কেমন কথা? উনি কি ওনার এতো বড় প্রতিভা সারাজীবন আড়ালেই রাখতে চান?”
মেলো বলল, “হ্যাঁ, তেহ সেটাই চায় ফুল।”
লুহান বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। “তেহুর অনুমতি ছাড়াই আজ তোমাকে অনেক কথা বলে দিলাম। কেন বললাম, তা নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারছ। তুমি বিভিন্ন সময়ে আমাদেরকে অনেক ভাবে হেল্প করেছো। তাই আমাদের মনে হলো তোমাকে সত্যিটা জানানো উচিত। দেখো, এর জন্য তেহ যেন আবার আমাদেরকে পানিশট না করে।”
,
,
,
গার্ডেন থেকে ফিরে ফুল সোজা উদ্যানের রুমের সামনে চলে এল। নক করার পরেও দরজা খুলল না। ফুল অপেক্ষা করতে লাগল। ঘন্টা খানেক অতিবাহিত হওয়ার পরেও যখন দরজা খুলল না তখন ফুল আশাহত হয়ে ডিনার করতে চলে গেল।
উদ্যান গত কয়েকদিন ধরেই নিচে খেতে আসেনা। সে নিজের রুমেই লাঞ্চ এবং ডিনার করে নেয়। ফুল ভাবল আজ সে নিজেই উদ্যানের জন্য ডিনার নিয়ে যাবে কিন্তু তার আগেই উদ্যান কল করে লুহানকে বলে দেয় যে সে ডিনার করবে না আজ। কেউ যেন খাবার নিয়ে না যায়।
এটা শুনে ফুল মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো। লোকটা ইচ্ছে করেই তাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে সেটা সে ভালোই বুঝতে পারছে। ফুল সব কাজ মিটিয়ে আবারও উদ্যানের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে অনবরত নক করতে লাগল। তবুও লাভ হলো না। একটা সময় পর ফুল ক্লান্ত হয়ে দরজার সামনেই বসে পড়ল।
ভাবতে লাগল নানান কথা। ভাবনা চিন্তার একপর্যায়ে তার কিছু একটা মনে পড়ে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল।
রাত আড়াইটা।
হঠাৎ দরজার লক খোলার শব্দে ফুলের তন্দ্রা ছুটে গেল। সে ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। সামনে উদ্যানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ঘুম এক নিমিষেই উবে গেল। আবেগ আপ্লুত হয়ে জাপ্টে ধরল উদ্যানকে। আকুল কণ্ঠে বলল, “কতক্ষণ ধরে আমি অপেক্ষা করছিলাম, আপনি খুলছিলেন না কেন? আমাকে এভাবে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে, তাই না?”
উদ্যান আলগোছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আমি তোর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে চাইছি না। যা এখান থেকে।”
ফুল দুহাতে চোখ মুছে নিল। “আমি কোনো প্রশ্ন করতে আসিনি আপনাকে। আমি জেনে গেছি আপনি একজন সায়েন্টিস্ট। ওই লাশটাকে আপনি মা’রেন নি। শুধুমাত্র রিসার্চের জন্য এনেছিলেন।”
উদ্যান থমকে গেল। তার দৃষ্টি ফুলের ওপর স্থির হলো। “কে বলেছে তোকে এসব?”
ফুল ভেতরে ঢুকে খাটের ওপর বসে পড়ল।
“ওনারা এই ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন, আমি আড়াল থেকে শুনে ফেলেছি। কেউ আমাকে আলাদা করে বলেনি।”
উদ্যান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নিল। “আর কী শুনেছিস?”
“কিছুই না, আরও কিছু শোনার বাকি আছে নাকি?”
“না আর কিছুই নেই। যা এখন।”
ফুল বিমর্ষিত হলো। “আপনি আমাকে বারবার চলে যেতে বলছেন কেন?”
উদ্যান নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “বিকজ আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফা`ক ইউ এনিমোর।”
ফুলের মুখটা হাঁ হয়ে গেল। লোকটা এতো অশালীন আর রূঢ়ভাষী কেন?
“যেতে বলেছি তোকে।”
ফুল মিছেমিছি হাই তুলে ধপাস করে শুয়ে পড়ল, “আমি যাবো না, দরজা লক করে দিয়ে এদিকে আসুন।”
উদ্যান শান্ত চোখে তাকাল তার দিকে। শীতল কণ্ঠে বলল, “ডোন্ট পুশ ইওরসেলফ! জেনেই যখন গেছিস ফ্লোরা মানুষ নয়। তখন নিশ্চয়ই বুঝতেও পারছিস আমি যাবো না ওর কাছে; অন্য কারো কাছেও যাবো না, তুই নিশ্চিন্তে গিয়ে ঘুমাতে পারিস।”
ফুল চকিত নয়নে তাকাল উদ্যানের দিকে। উদ্যান দৃষ্টি সরিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গেই। ফুল ধীরপায়ে উদ্যানের সামনে চলে এল। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, “ক… কী হয়েছে আপনার?”
উদ্যান জবাব দিল না। শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উদ্যানের গালে হাত রাখল ফুল।
“আমার দিকে তাকান।”
উদ্যান তাকাল তার চোখের দিকে। ফুল খুব জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তবে কি আমার প্রতি আর আকর্ষণ কাজ করছে না?”
ফুল নিজের চুলের খোঁপাটা আলগা করে ফেলল। ওড়নাটাও বুক থেকে নামিয়ে ফেলে দিল। উদ্যানের গলা শুকিয়ে এল অজানা কারণে। সে অন্যদিকে মনোযোগ ফেরানোর আগেই ফুল আবারও তার মুখটা নিজের হাতের আঁজলায় নিয়ে নিল। তারপর কান্না গিলে ফিসফিসিয়ে বলল, “কিয়েরো উন বেসো।”
মুহূর্তেই উদ্যানের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঝুঁকে এসে ফুলের ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিল। ফুলের শরীর ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেই উদ্যান তাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। বিছানায় তাকে শুইয়ে দিয়ে সে যেন এক তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো ফুলকে নিংড়ে নিতে লাগল।
দীর্ঘক্ষণ পর উদ্যান যখন উঠে যেতে নিল, ফুল তার শার্টের হাতা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ইশারায় তাকে থামতে নিষেধ করল। তার মনোভাব বুঝতে পেরে উদ্যান নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে শক্ত গলায় আদেশ করল, “অ্যালেক্স ক্লোজ দ্যা ডোর ফার্স্ট, দেন গো টু কমপ্লিটলি শাট ডাউন ফর সিক্স আওয়ার্স।”
সকাল ন’টা।
সকালের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ। শাওয়ার শেষে ফুল খাটের ওপর বসে ভেজা চুল মুছতে ব্যস্ত। উদ্যান ততক্ষণে ড্রেস-আপ শেষ করে খাটের অন্য পাশে বসে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। ঘরজুড়ে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
“তোর পিরিয়ড হয়েছে এই মাসে?” হঠাৎ উদ্যানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে ফুলের হাত থেমে গেল। সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “হ্যাঁ, এই তো তিনদিন দিন আগেই শেষ হলো।”
“ওহ। তাহলে আর পিল খেতে হবে না।”
ফুল বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল। “সত্যি বলছেন?”
উদ্যান টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে প্রাণহীন কণ্ঠে বলল, “হুম। আজই শেষ। আমরা আর কখনো ওসব করব না। তাই পিল খেয়ে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করার দরকার নেই।”
ফুলের মুখটা চুপসে গেল। বিড়বিড় করে বলল, “ওহ আপনার প্রয়োজন ফুরিয়েছে? আর আমি ভাবলাম আপনি হয়তো বাচ্চা-কাচ্চার প্ল্যানিং করছেন…”
উদ্যান বিদ্যুৎবেগে ঘুরে তাকাল। কাঠকাঠ কণ্ঠে বলল, “লিসেন, আমি তোকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভাবছি।”
ফুলের হাতের তোয়ালেটা খসে পড়ল। সে স্তম্ভিত হয়ে বলল, “আপনি মজা করছেন?”
উদ্যান প্রত্যুত্তর করল না। ফুল অস্থির হয়ে পড়ল। সে হাঁটুতে ভর দিয়ে উদ্যানের পাশে এসে বসল। বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, “শুনুন না, আমি ডিভোর্স চাই না। আমাদের ধর্মে তো চারটা বিয়ে করা জায়েজ আছে। আপনি চাইলে আমাকে ডিভোর্স না দিয়েও বিয়ে করতে পারবেন।”
“তুই চাস না বলেই আমি তোকে ডিভোর্স দেব।” উদ্যান এবার ফুলের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে ধীরে বলল, “অন্য কাউকে বিয়ে করার জন্য নয়।”
ফুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার দুচোখ বেয়ে অবিরল অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। উদ্যান নিজেকে নির্লিপ্ত রাখার চেষ্টা করেও পারল না। তার মেজাজ চড়ে গেল। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “তুই নিজের রুমে গিয়ে কাঁদ। আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে।”
“কেন, আপনার তো ভালো লাগা উচিত। আমাকে কাঁদতে দেখতেই তো আপনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তাই না? দেখুন… দেখুন না আমি কতোটা অসহায় আপনার সামনে। আপনি সফলভাবে আমাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন, সম্ভাব্য সকল উপায়ে আঘাত করে ফেলেছেন। আমার হৃৎপিণ্ডটা যদি বের করে আপনার হাতে তুলে দিতে পারতাম তাহলে হয়তো আপনি সবচেয়ে বেশি স্যাটিসফাই হতেন।”
উদ্যান ঘাড় কাত করে ফুলের দিকে তাকাল কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। ফুল তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি খুব করে চাই এমন এক দিন আসুক যেদিন আপনি আমার কান্না সহ্য করতে পারবেন না। আমাকে অসহায় হয়ে পড়তে দেখে আপনি নিজেও অসহায় হয়ে পড়বেন।”
উদ্যান ভ্রু তুলে জানতে চাইল, “আর কী কী চাস তুই?”
“মানুষ তার ভালোবাসার মানুষটার মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনতে চায়, কিন্তু আমি তা চাই না। আপনি যখন বলেন যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন, তখন শব্দগুলো মিথ্যে শোনায়, আমার খুব কষ্ট হয়। তাই আমি চাই, কোনো একদিন আপনি নিজ থেকে স্বীকার করুন যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। একটুও না। আমি চাই, ভুল করে হলেও অন্তত একবার আপনি আমার নাম ধরে ডাকুন এবং নিজে থেকেই বলুন আপনাকে একবার ‘উদ্যান’ নামে ডাকতে। আপনি বলেছিলেন, আমি নাকি আপনাকে হাসতে শিখিয়েছি; তাই আমি আপনাকে কাঁদাতেও চাই। আমি চাই, কোনো একদিন আপনার হৃৎস্পন্দন কোনো শারীরিক স্পর্শ ছাড়াই স্রেফ আমার কথা ভেবে অবাধ্য হয়ে উঠুক।”
উদ্যান হেয়ালি করে বলল, “এমন কিছু কখনোই হবে না। আমি হতেই দেবো না।”
ফুল কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু আড়াল করে হালকা হেসে বলল, “এতক্ষণ যা যা বললাম, সব মজা করে বলেছি। আমি আসলে মন থেকে চাই আপনি সবসময় ভালো থাকুন। কোনো জাগতিক কষ্ট যেন আপনাকে কোনোদিন ছুঁতে না পারে।”
উদ্যান ফুলকে আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে ফুল বলে উঠল, “আজ ২১শে ডিসেম্বর, আপনার বউফুলের জন্মদিন। তাকে উইশ করবেন না?”
উদ্যান থেমে গিয়ে তার দিকে তাকাল। সত্যি বলতে তার শুধু একটা দিনই মনে থাকে সেটা হলো তার নিজের জন্মদিন তাছাড়া আর কোনো দিনের কথাই তার মনে থাকেনা। যদিও মনে রাখার প্রয়োজনও পড়েনা। বাকিরা তো আছেই মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
সে ঘুরে এসে পুনরায় ফুলের সামনে আসন গেঁড়ে বসল। চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত কাঠিন্য ফুটিয়ে বলল, “অশুভ জন্মদিন! তোর আসলে জন্ম নেওয়াই উচিত হয়নি।”
ফুল হালকা হাসল। যেন সেই হাসিতে নিজের প্রতিই বিদ্রূপ ছিল। “হ্যাঁ আমারও তাই মনে হয়। আমি না জন্মালে মামা হয়তো আজ সুস্থ থাকতেন। আমি আসলেই অলক্ষ্মী। সত্যি বলতে আমি নিজেও জন্ম নিয়ে খুশি নই। তবুও… গুগলে সার্চ দিয়ে দেখুন, বউয়ের জন্মদিনে তাকে গিফট দিতে হয়। আপনি নিশ্চয়ই গিফট দেবেন আমাকে?”
উদ্যান কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরলয়ে বলল, “তোর জন্য একটা স্পেশাল গিফট ভেবে রাখা আছে। আজকের দিনটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
ফুল অবাক হয়ে গেল, “কী গিফট দেবেন?”
উদ্যান হালকা গলায় বলল, “আমার সাথে বিকেলে গেলেই দেখতে পারবি।”
ফুল খুব একটা উচ্ছ্বসিত হতে পারল না। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, “আমি আপনাকে এই ব্যাপারে কিছুই বলতাম না। বলেছি কারণ গিফট হিসেবে আমার অন্য কিছু চাওয়ার ছিল।”
“বল, শুনি।”
“আমি ডিভোর্সি হতে চাইনা। আপনি প্লিজ আমাকে ডিভোর্স দেবেন না।”
উদ্যান কোনো জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “অ্যালেক্স ডিউটিতে আছে, বেশি পাকামো করতে যাবি না। আমি বাইরে গেলাম, এসে যেন তোকে এই রুমে না দেখি।”
,
,
,
উদ্যান রুম থেকে বেরিয়ে বাংকারে চলে গেল। তাকে দেখে সায়মন শুকনো মুখে এক চিলতে হাসি টেনে বলল, “কতোদিন পর এলেন মাস্টার! সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?”
উদ্যান একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটের কোণে চেপে ধরল। ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত গলায় শুধাল, “তোকে যদি মুক্ত করে দেওয়া হয়, তুই কতটা খুশি হবি সায়মন?”
মুহূর্তেই সায়মনের ফ্যাকাশে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “আমি সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না মাস্টার!”
“তবে খুশি হয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যা।”
সায়মনের মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। অবিশ্বাসের সুরে বলল, “আপনি সত্যিই আমাকে মুক্ত করে দেবেন মাস্টার?”
“হুম!”
“আপনি কি তবে ফিরে যাচ্ছেন মেক্সিকোতে?”
উদ্যান নিরুত্তর রইল যেন অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছে সে। সায়মন এখনই অতো বেশি এক্সপেকটেশানস রাখল না। কে বলতে পারে উদ্যান না আবার মুক্ত করে দেওয়ার নাম করে তাকে দুনিয়া থেকেই মুক্তি দিয়ে দেয়।
সায়মন কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “মাস্টার, আপনার সাথে কাজ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি চাইলে আমি মেক্সিকো যেতেও রাজি। শুধু… দয়া করে আমাকে মে`রে ফেলবেন না।”
উদ্যান এক মনে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “আমি সত্যিই তোকে সুস্থ শরীরে মুক্ত করে দেবো। তোকে আর কোনো প্রয়োজন নেই আমার।”
উদ্যান ইশারা করতেই সেখানে পাঁচজন লোক প্রবেশ করল। উদ্যান তাদের স্প্যানিশ ভাষায় নির্দেশ দিল, “ওকে শহরের নির্জন কোনো জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আয়।”
একটা লোক এগিয়ে এসে সায়মনের হাত-পা বাঁধতে শুরু করল। সায়মন উল্লাসিত হয়ে বলল, “মাস্টার, ভবিষ্যতে কখনো প্রয়োজন হলে এই অধমকে স্মরণ করবেন। আপনার সাথে কাজ করাটা আমার জন্য বড় অভিজ্ঞতা ছিল।”
উদ্যান যেন তার কথা শুনতেই পেল না। একে একে সায়মনের মুখ আর চোখ দুটোও বেঁধে ফেলা হলো। উদ্যান আর সময় নষ্ট না করে বাংকার থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে ফিরে এল। ফুল ততক্ষণে চলে গেছে। উদ্যান চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল; মেয়েটা যাওয়ার আগে ঘরটা নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রেখে গেছে। অগোছালো ঘরটাতে এখন এক ধরণের স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে।
,
,
,
বিকেলের তপ্ত রোদ ম্লান হয়ে আসতেই উদ্যান ফুলকে নিয়ে কোনো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। ড্রাইভিং সিটে আছে লুহান, যে গভীর মনোযোগে গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে ড্রাইভ করছে। ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা উদ্যানের কানে ব্লুটুথ গোঁজা, চোখ ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ। পেছনের সিটে ফুল তখন গভীর ঘুমে বিভোর। সিটবেল্ট বাঁধা থাকায় সে কোনোমতে স্থির হয়ে আছে, নইলে ঘুমের ভারে হয়তো এতক্ষণে জানালার কাচে তার মাথা আছড়ে পড়ত।
প্রায় ঘন্টাখানেক জার্নি করার পর হঠাৎ ফুলের ঘুম ভেঙে গেল। অকস্মাৎ ঘাম ছুটে গেল তার, অথচ এখন শীতকাল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তীব্র বমিভাব তার কণ্ঠনালি পর্যন্ত উছলে এল। ফুল এক হাতে মুখ চেপে ধরে অন্য হাতে জানালার কাচে অস্থির হয়ে ধাক্কা দিতে লাগল। উদ্যান ঘাড় বাকিয়ে ফুলের এই ছটফটানি দেখে মুহূর্তেই জানালার কাচ নামিয়ে দিল।
পরক্ষণেই ফুল জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে গলগল করে পেটের সমস্ত কিছু উগড়ে দিল। হঠাৎ এমন ঘটনায় লুহান হকচকিয়ে গেল। সে রিয়ার-ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করল, “ফুল, আর ইউ ওকে?”
ফুল উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। সবকিছু উগড়ে দিয়েও বমির রেশ কমছে না তার। উদ্যান ফোনটা পকেটে পুরে গম্ভীর স্বরে বলল, “লুহান, গাড়ি থামা।”
গাড়ি থামতেই উদ্যান দ্রুত নেমে পেছনের সিটে গিয়ে বসল। সে ফুলকে টেনে এনে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “এভাবে জানালার বাইরে মাথা বের করে দিলে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে। মনে রাখিস, রাস্তাটা তোর বাপের নয়।”
গাড়ি আবারও চলতে শুরু করল। কিন্তু ফুলের বমিভাব তখনো কাটার নাম নেই। সে আবারও জানালার দিকে ঝুঁকতে নিলে উদ্যান তাকে আটকে দিল। সিটবেল্ট খুলে তাকে অন্য পাশে বসিয়ে দিয়ে সেই পাশের জানালাটা খুলে দিল সে। তারপর লুহানকে সতর্ক করে বলল, “এইপাশ দিয়ে যেন গাড়ি আসা-যাওয়ার স্পেস না থাকে, খেয়াল রাখিস।”
লুহান একবার আয়নায় তাকিয়ে নিচু স্বরে পরামর্শ দিল, “ওর পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দে তেহ। তাহলে হয়তো একটু রিলিফ ফিল করবে।”
উদ্যান অন্যমনস্ক হয়ে হাত এগিয়ে নিলেও কিছু একটা ভেবে ফিরিয়ে নিল। ফুল বমি করতে করতে একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। সে জানালার ফ্রেমে মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। খুব খারাপ লাগছে তার, মনে হচ্ছে সে আর বাঁচবে না। পুরো দুনিয়াটাই যেন চোখের সামনে গোলগোল ঘুরছে। উদ্যান আঁড়চোখে তাকিয়ে শুষ্ক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আর ইউ ফিলিং বেটার নাউ?”
ফুল উত্তর দিল না, তবে তার কান্নার নিদারুণ শব্দই বুঝিয়ে দিচ্ছে সে বেটার ফিল করছে না। উদ্যান কিছুক্ষণ মূর্তির মতো বসে থেকে অবশেষে ফুলের পিঠে হাত রাখল। খুব আনাড়িভাবে সে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
ফুলের মনে হলো উদ্যান তাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। হায়! লোকটা এটাও জানেনা কীভাবে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে হয়। ফুল ঘাড় বাকিয়ে উদ্যানের দিকে তাকাল। তার অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া নজরে আসতেই উদ্যান অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল।
“টিস্যু আছে?” ফুলের প্রশ্নে উদ্যান একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও পকেট থেকে রুমাল বের করে তার হাতে ধরিয়ে দিল। ফুল সেটা দিয়ে চোখ, নাকমুখ মুছে আচমকাই এগিয়ে এসে উদ্যানের বুকে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরল।
উদ্যান যেন বজ্রাহত হলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে স্থবির হয়ে রইল। ফুল ফিসফিসিয়ে বলল, “এবার হাত বুলিয়ে দিন।”
উদ্যান বিমূঢ় হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল লুহান রেয়ার ভিউ মিররটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ড্রাইভিং-এ মনোযোগী হয়েছে। উদ্যান অস্বস্তি নিয়ে ফুলকে সরিয়ে দিতে দিতে চাপা গলায় বলল, “এখানে অনায়াসে তিনজন বসতে পারে। সোজা হয়ে বোস।”
ফুল অবুঝের মতো কান্না ধরল, “আমার ভালো লাগছে না। এভাবেই থাকতে দিন, নইলে আমি ম’রেই যাবো।”
উদ্যান সপাটে জবাব দিল। “ম’রে গেলে যাবি তাতে আমার কী? এসব কিঞ্জ টাইপের কথাবার্তা তেহজিবকে প্রভাবিত করে না।”
ফুলের ভীষণ খারাপ লাগল কথাটা শুনে। সে কাঁদতে কাঁদতেই সরে যেতে চাইল কিন্তু উদ্যান তার আগেই দুই হাতে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৭০০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন গল্পের লিংক
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮