নবরূপা
পর্ব_২২
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
সকাল তখন পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশ ধূসর। ফজরের পরের সেই নিস্তব্ধ সময়—যখন শহরটা আধা ঘুমে ডুবে থাকে। রাস্তার দু’পাশে কুয়াশা ঝুলে আছে। গাড়ির হেডলাইট সেই কুয়াশা কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে ইরফান। তার চোখ লাল, সারা রাতের জেগে থাকা আর আতঙ্কে মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে আছে নীহারিকা। তার কোলে ঘুমিয়ে আছে ইনায়া।
বাচ্চাটা গভীর ঘুমে। ছোট্ট বুকটা আস্তে আস্তে উঠানামা করছে। নীহারিকা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তার নিজের হাতটাই কেমন ঠান্ডা। হঠাৎ সে টের পেল, তার আঙুলগুলো অদ্ভুতভাবে অবশ হয়ে যাচ্ছে।
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে হাতটা একটু নড়াল। তারপর চমকে উঠল। তার নখগুলো কেমন যেন কালচে হয়ে উঠছে। হাতের শিরা গুলো বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট হয়ে। রক্তাক্ত লাগছে নিজের চামড়া। ঠিক যেন ধোঁয়ায় পোড়া ছাইয়ের মত রং। সে দ্রুত হাতটা আঁচলের ভেতরে লুকিয়ে ফেলল।
ইরফান তখনও সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। গলায় চাপা ক্লান্তি নিয়ে বলল সে,
—” আর একটু পথ! ওই সামনে মাদরাসাটা।”
নীহারিকা কিছু বলল না। ইরফান আবারো তাকালো নীহারিকার দিকে,
—” নীহা?”
—” বলুন।”
—” আ’ম সরি।”
ইরফানের ভাঙা স্বর শুনে অস্থির নীহারিকা এক মুহুর্তের জন্য স্থির দৃষ্টিতে তাকালো ইরফানের চোখের দিকে। লোকটার চোখে হতাশা ও অপরাধবোধ স্পষ্ট। নীহারিকা জানে কেনো তার স্বামী তার কাছে ক্ষমা চাইলো, তাই অকারনে আর জিজ্ঞেস করলো না কিছু। নীরবে তাকিয়েই রইলো। ইরফান নিজে থেকেই শুকনো ঢোক গিলে আবারো ধীর কন্ঠে বলল,
—” তুমি বিশ্বাস করো নীহারিকা, আমি তোমায় ব্যবহার করিনি। আমি তোমায় এই জঘন্য দুনিয়ায় জড়াতে চাইনি। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যদি জানতাম তুমিও এসবে জড়িয়ে যাবে, তোমারও ক্ষতি হবে, তাহলে তোমাকে আমি বিয়েই করতাম না। আমি বিয়ে করেছিলাম নিজের মানসিক শান্তির জন্য, ইনায়ার জন্য আর পরিবারের জন্য। তোমায় ব্যবহার করতে চাইনি আমি।”
নীহারিকা মলিন হাসলো। জানালার বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাচ্ছিল্যের সহিত হাসলো। চোখের কোণে সদ্য আসা পানিটুকু মুছে নিয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে চোখে পানি নিয়েই হেসে বলল,
—” মনে আছে সেই রাতে আপনি আমাকে বলেছিলেন, ভালোবাসা এত দ্রুত হয়না। সময় লাগে। আপনিও আমায় এই কারনে ভালোবাসতে পারেন নি, এমন কিছুই তো বলেছিলেন। খু্ব একটা মনে রাখিনি আমি।”
একটু থামলো নীহারিকা। এবারে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—” অথচ আমি আপনাকে বিয়ের প্রথম রাত থেকেই ভালোবেসে ফেললাম। দিনে দিনে মাত্রাও বাড়লো। আজকের এই দিনে এসে সেই ভালোবাসার মাত্রা কতখানি বেড়েছে তা নিশ্চয়ই বোঝাতে হবেনা।”
ইরফান স্থবির হয়ে তাকালো নীহারিকার দিকে। তার হাতের স্টিয়ারিং টা আলগা হয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল সে। গাড়ির কাঁচের বাইরে কুয়াশা ভেজা রাস্তা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। সে ধীরে বলল,
—” মানুষ কখন কাকে ভালোবেসে ফেলে, সেটা কেউ আগে থেকে হিসাব করে বুঝে উঠতে পারে না। ভালোবাসা তো আসলে কোনো চুক্তি না যে সময় ধরে, নিয়ম মেনে আসবে।”
সে মৃদু হাসল। চোখে এখনও জল চিকচিক করছে।
—” আপনি সেদিন বলেছিলেন, ভালোবাসতে সময় লাগে। খুব দ্রুত হয় না। তখন আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারিনি কেন আপনার কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ব্যথা করছিল।”
গাড়ির ভেতরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। ইরফানের বুকের ভেতর যেন কেউ ভারি কিছু রেখে দিল। নীহারিকা জানালার বাইরে তাকিয়েই কথা বলে চলল,
—”প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ভুল। হয়তো এটা নতুন জীবনের উত্তেজনা। কিন্তু দিন যত গেছে, তত বুঝেছি এটা ভুল না। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে এই অনুভূতিটা বড় হয়েছে।”
সে ধীরে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কোমল কন্ঠে বলল,
—” আর ইনায়া, ও তো আমার সন্তান না। আমার শরীরের অংশও না। কিন্তু তবুও জানেন, ওকে কোলে নিলেই মনে হয় এই ছোট্ট মানুষটার সাথে আমার কোনো অদৃশ্য বন্ধন আছে।”
নীহারিকার চোখে আবার পানি ভরে উঠল।
—” কারণ ও আপনার অংশ। আমরা যাকে ভালোবাসি, তার সবকিছুকেই ভালোবেসে ফেলাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না।”
ইরফানের হাত স্টিয়ারিংয়ে কাঁপল। তার গলা শুকিয়ে গেল। সে নিজের প্রতি কোনো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে সে নীহারিকা কে অজান্তে কষ্ট দিয়েছে। নীহারিকা আবার বলল,
—” তাই আমি কখনো ভাবিনি ইনায়া আমার না। বরং অনেক সময় মনে হয়েছে, আল্লাহ যদি কখনো আমাকে মা হওয়ার সুযোগ না-ও দেন, তবু এই মেয়েটার হাত ধরে জীবনটা পার করে দিতে পারব।”
তার ঠোঁটে একটা কষ্টমাখা হাসি ফুটল। ফিক করে হেসে সে চোখের পানি মুছে আগ্রহ নিয়ে বলল,
—” জানেন, একদিন রাতে আমি ভেবেছিলাম, আপনার কাছে কখনো সন্তানের আবদার করব না। বলা তো যায়না, যদি কখনও ইনায়ার হক নষ্ট করে দিই। যদি ভুলেও ইনায়াকে পর ভাবি? ও যদি বুঝে যায় আমি ওর আসল মা না? তখন? খুব বাজে ভাবে কষ্ট পাবে মেয়েটা। আমিও অজান্তে ভুল করতেই পারি। তাই ভেবেছিলাম কখনো আর সন্তানই নেব না। ইনায়া হয়তো আমার নিজের রক্ত না, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর যে জায়গাটা সন্তানের জন্য থাকে, সেখানে তো ও অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছে।”
গাড়ির ভেতর ভারী নীরবতা। ইরফানের বুকের ভেতর অপরাধবোধ ছুরির মত বিঁধছে। নীহারিকা এবার খুব শান্ত স্বরে বলল,
—” তাই যদি এই লড়াইয়ের শেষে আমি বেঁচে না-ও থাকি, তবুও আমার কোনো আফসোস থাকবে না।”
ইরফান স্তব্ধ হয়ে তাকাল তার দিকে। নীহারিকা হাসল।
—” কারণ আমি জানব, আমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে আর তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য শুধু একটু চেষ্টা করেছি।”
তার চোখের পানি এবার গড়িয়ে পড়ল।
—” একজন স্ত্রী হিসেবে এর চেয়ে বড় দায়িত্ব আর কী হতে পারে বলুন?”
ইরফানের বুকটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল। সে মনে মনে সেই রাতটার কথা ভাবল, যেদিন ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ভালোবাসা এত দ্রুত হয় না। আজ মনে হচ্ছে সেই কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে ফিরে এসে নিজের বুকেই আঘাত করছে। সে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। মনে মনে একটা কথাই ঘুরছে— সে ভুল করেছিল। ভয়ংকর ভুল। কারণ এই মেয়েটা শুধু তার স্ত্রী না, এই মেয়েটা এমনভাবে তাকে ভালোবেসেছে, যেভাবে হয়তো সে নিজেও কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারেনি। তার বুকের ভেতর তীব্র অনুতাপ দাউদাউ করে উঠল। সে একবার নীহারিকার দিকে তাকাল। নীহারিকা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে যে ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের শান্তি, সেটা ইরফানের বুককে আরও ভারী করে দিল।
ইরফান যখন অন্য এক জগতে বিচরণ করছিল, ঠিক তখনই সে গাড়ির সামনে রাস্তায় হুট করে কিছু একটা দেখতে পেলো। সে দেখলো একটা তাল গাছের সমান লম্বা মানুষাকৃতির কিছু একটা সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক রাস্তার মাঝখানে। দেখে মনে হচ্ছে, কোনো র”ক্তমাখা লা”শ কাফনের কাপড় পড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে জীবন্ত প্রাণীর মত। সাথে সাথে ইরফানের আত্মা শুকিয়ে গেলো। সে চমকে থমকে গাড়ি থামিয়ে দিল তৎক্ষনাৎ আর চেঁচিয়ে উঠলো। নীহারিকা সাথে সাথে সতর্ক হয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” ইরফান, কী হয়েছে? ইরফান? আর ইউ ওকে?”
ইরফানের চোখ সেই বস্তু থেকে সরছে না। সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে কাঁপা আঙুল দিয়ে সামনে দেখিয়ে বলল,
—” নীহারিকা, সামনে…একটা লা”শ দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখো…
নীহারিকা দেখলো। সামনে কেও নেই৷ কিচ্ছু নেই। সাথে সাথে ইরফানের বাহু শক্ত করে ধরে বলল,
—” ইরফান, আমার দিকে তাকান। চোখ সরান। কিচ্ছু নেই। সবই ভ্রম। আপনি ফুল স্পিডে গাড়ি চালান। থামবেন না প্লিজ!”
ইরফান তবুও আতঙ্কিত ও কাঁপা কন্ঠে বলল,
—” নীহারিকা ওটা…ওটা সামনে এগোচ্ছে…
নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলল। সে ইরফানের মনের অবস্থা বুঝতে পারছে। একটা ইয়া বড় আকারের মৃত লা”শকে কাফনের কাপড় পড়ে হাঁটতে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখাটা মোটেই কোনো দুঃসাহসিক কাজ নয়। সে তাই জোরপূর্বক ইরফানের মাথা নিজের দিকে ঘোরালো
—” আমার দিকে তাকান। কিচ্ছু নেই। এসবে মন দেবেন না। ওরা আমাদের থামানোর চেষ্টা করছে। দ্রুত চলুন।প্লিজ…ইনায়ার দিকে তাকিয়ে সাহস করে গাড়িটা স্টার্ট করুন প্লিজ!”
ইরফান শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়লো। নীহারিকার কথামত তা-ই করলো। ফুল স্পিডে গাড়ি চালানো শুরু করলো। চোখ বুঁজে গাড়ি সামনে টানলো ইরফান। কিন্তু ঠিক তখনই নীহারিকার নাকে আবার সেই ভয়ানক গন্ধটা এল। পচা মাংসের গন্ধ। মৃত লা”শের গন্ধ! ঠিক যেন বহুদিনের মরা কোনো প্রাণীর গন্ধ। তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে গাড়ির জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার পাশে একটা গরু দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নীহারিকার চোখ বড় হয়ে গেল। গরুটা না। ওটা যেন পচে যাওয়া একটা মৃতদেহ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ইরফান যা দেখেছে তাই দেখলো নীহারিকা। আরো বেশি কিছু দেখলো। লা”শটির মুখ নেই। চোখের জায়গায় কালো গর্ত। র”ক্তা”ক্ত বিশ্রী চেহারা। নীহারিকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। সে দ্রুত চোখ বন্ধ করল। নিজেকে মনে মনে বলল—ভ্রম… সব ভ্রম… ওদের বান। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও শান্তি পেল না। কারণ এবার সে ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পেল। একটা না, অনেকগুলো। কানের খুব কাছে। মনে হলো কেও কুরআনের ভুল আয়াত পড়ছে। নীহারিকার বুক কেঁপে উঠল। সে চোখ খুলে ফেলল হঠাৎ।
ইরফান এবারে স্বাভাবিক হয়েছে। গাড়ির ভেতর সব স্বাভাবিক। ইনায়া তার কোলে শান্ত ঘুমে। ইরফান গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। নীহারিকা ঠোঁট কামড়ে নিজেকে শক্ত করল। তার মনে পড়ল হুজুরের কথা—সময় কম। গাড়ি তখন একটা ছোট গেটের সামনে এসে থামল। পুরোনো একটা মাদরাসা। ভেতরে ছোট্ট উঠান। দুই পাশে টিনের ঘর। ফজরের পড়া শেষ করে কয়েকটা বাচ্চা কোরআন পড়ছে ভেতরে। গাড়ি থামতেই ইরফানের হাত কেঁপে উঠল স্টিয়ারিংয়ে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর খুব ধীরে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে কাতর স্বরে বলল,
—” সত্যিই…রেখে যাব?”
নীহারিকা ইনায়ার দিকে তাকাল। বাচ্চাটা ঘুমে মৃদু হাসছে। তার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার মাথার ভেতর যেন কেউ ফিসফিস করে হাসল। একটা ভয়ানক কর্কশ হাসি। নীহারিকার চোখ মুহূর্তেই রক্তলাল হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, অনন্যার বান দ্রুত কাজ করছে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। ইরফানের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল সে,
—” দেরি করবেন না। ওকে দিয়ে আসুন। মজিদ হুজুরের নাম বলে ওদের কাছে দিন। বাকিটা ওরা বুঝবে।”
তার গলা কেমন বদলে গেছে।
—” আমার সময় শেষ হওয়ার আগেই, ইনায়াকে বাঁচান।”
ইরফান চমকালো,
—” কী হয়েছে তোমার?”
নীহারিকা ধীরে বলল,
—” আমি টের পাচ্ছি..!”
তার আঙুলগুলো আবার কেঁপে উঠল।
—” ওরা আমার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।”
গাড়ির ভেতর হঠাৎ যেন বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল। নীহারিকা শক্ত করে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর ধীরে বলল,
—” যদি দেরি করেন। তাহলে হয়তো আমিই, ইনায়ার জন্য বিপদ হয়ে যাব।”
ইরফান আতঙ্কে তাকাল। দ্রুত ইনায়াকে কোলে নিয়ে চুমু খেলো কপালে৷ ফিসফিস করে বলল,—” মা আমার। কিচ্ছু হবেনা তোর। আমরা এসে নিয়ে যাব তোকে খুব তাড়াতাড়ি। ” দ্রুত ইনায়াকে নিয়ে নেমে পড়লো ইরফান। চলে যেতে চাইলে হুট করে জানালা দিয়ে মাথা বের করে ইরফানকে ডাকলো নীহারিকা।
—” শুনুন৷ একটু আসুন।”
ইরফান আবারো ফিরে আসলে নীহারিকা খুব আদুরে ভঙ্গিতে জানালার বাইরে হাত বের করে ইনায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। কপালে চুমু খেয়ে আদর করল। ইরফান মুগ্ধ হয়ে দেখলো তা। এরপর নীহারিকা ইশারা করলো যেন দিয়ে আসে ইনায়াকে।
মাদরাসার ভেতরে ঢুকে পড়তেই ইরফানের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই চারপাশে আবার সেই অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। নীহারিকা একা বসে রইল গাড়ির ভেতর। তার কোলে আর ইনায়া নেই। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল। কিছুক্ষণ আগেও যে ছোট্ট উষ্ণ শরীরটা তার বুকের সাথে লেপ্টে ছিল, এখন সেই জায়গাটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ধীরে মাথা সিটে ঠেকাল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। সময় কম। এই কথাটাই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে তার মনে। সে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে হিসাব করতে লাগল। অনন্যা… তার কালোজাদু…জ্বিনদের সাথে চুক্তি… যদি সত্যিই চুক্তি করে থাকে, তাহলে কোথাও না কোথাও সেই চুক্তির মাধ্যম আছে। কোনো বস্তু… কোনো জায়গা… কোনো কবর… অথবা কোনো তাবিজ। কালোজাদুর নিয়ম সে খুব ভালো করেই জানে— কোনো শক্তিই বিনা মাধ্যম ছাড়া কাজ করে না।
নীহারিকা ধীরে ধীরে ভাবতে লাগল, অনন্যা এত বছর ধরে এ বাড়িতে আছে। তাহলে নিশ্চয়ই কোনো গোপন জায়গা আছে বাড়ির ভেতরেই। হয়তো কোনো লুকানো ঘর… কোনো তাবিজ পোঁতা জায়গা… অথবা এমন কিছু যা দিয়ে সে জ্বিনদের সাথে যোগাযোগ রাখে। ঠিক তখনই, তার মাথার ভেতর আবার সেই ফিসফিস আওয়াজ শোনা গেল। নীহারিকার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে চোখ খুলে ফেলল হঠাৎ। তার দৃষ্টি কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। হাতের আঙুলগুলো অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে— সময় সত্যিই শেষ হয়ে আসছে। যদি দ্রুত কিছু না করে তাহলে হয়তো সে নিজেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। নিজেকে মনে মনে বলল—না, এখন ভাঙলে চলবে না। ইরফান আর ইনায়াকে বাঁচাতেই হবে।” ঠিক তখনই— মাদরাসার ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ ভেসে এল। কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজা খুলে গাড়ির দিকে হাঁটতে দেখা গেল ইরফানকে। তার মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কিছু ছিঁড়ে রেখে এসেছে সে।
গাড়ির দরজা খুলে ধীরে বসে পড়ল ড্রাইভিং সিটে।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু স্টিয়ারিং ধরে বসে রইল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। গলায় ভারী কষ্ট জমে আছে।
ধীরে বলল,
—” রেখে এলাম…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
—” ঘুমাচ্ছিল এখনও… কিছুই বুঝতে পারল না।”
নীহারিকা চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে বলল,
—” ভালো করেছেন। কিছু বললো ওরা?”
ইরফান হাতের মুঠোয় থাকা একটা তাবিজ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—” মজিদ হুজুরের নাম শুনে একজন এটা দিল।”
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আধো স্বরে বলল,
—” একটাই?”
ইরফান মাথা নেড়ে বলল,—” হ্যাঁ!”
নীহারিকা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তাবিজটার দিকে। ভাবলো কিছু একটা। এরপর ইরফানের কাতর মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল
—” আপনার জন্যই চেয়েছিলাম। হাতে বাঁধুন।”
ইরফান চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—” এটা দিয়ে কী হবে?”
নীহারিকা বিরক্তি নিয়ে বলল
—” বেশি কথা না বলে বাঁধুন। দিন, আমিই বেঁধে দিই।”
বলেই নীহারিকা ইরফানের ডান হাতে তাবিজটা বেঁধে দিলো। ইরফান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে স্টিয়ারিং ধরল।
—” এবার?”
নীহারিকা জানালার বাইরে তাকাল। সকালের আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। ধীরে বলল,
—” আমি একটা জিনিস ভেবে দেখলাম ইরফান।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো,
—” কী?”
নীহারিকা ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবুক ভঙ্গিতে বলল
—” যা-ই হয়ে যাক না কেনো, অনন্যা আপনার ক্ষতি করবে না। আপনাকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেবে না ও। আসল টার্গেট আমি আর ইনায়া। হতে পারে, আপনার পরিবারের বাকি সদস্যেরাও।”
ইরফান সতর্ক হলো,
—” কিন্তু ও তো আমায়ও বান মেরেছে।”
নীহারিকা মাথা নাড়লো,
—” উহু। ও আপনার জন্য করা চুক্তিগুলো পূরণ করেছে। জ্বিনদের চাহিদা মিটিয়েছে সে। আপনাকে বান মেরেছিল তাহিয়াকে শেষ করার জন্য। আর এখন আপনাকে বান মেরেছে আমায় সরানোর জন্য। আমি মরে গেলে আপনিও ঠিক হয়ে যাবেন। কিন্তু ইনায়াকে টার্গেট করবে কিনা তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছিনা!”
ইরফান চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো,
—” আমি কি তবে তোমার জন্য বিপদ?”
নীহারিকা ফিক করে হাসলো
—” নাহ। তবে…আমি আপনার জন্য বিপদ।”
—” মানে?”
—”পরে বুঝবেন। এবার, আমরা সরাসরি অনন্যার কাছে যাব।”
ইরফান চমকে তাকালো।
—” মানে? ও কোথায় তুমি জানো?”
নীহারিকা হেসে বলল,
—” হয়তো।’
ঠিক তখনই গাড়ির কাঁচের বাইরে মাদরাসার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কালো ছায়ামূর্তি হঠাৎ নড়ল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউই সেটা খেয়াল করল না। ছায়াটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর তার ফাটা ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটা রক্তাক্ত, ভয়ানক, বিকৃত হাসি।
চলবে….
✨ কমেন্টে অনেকে বলেছিলেন লেখিকা নিজেই ভয় পাচ্ছে লিখতে। আপনারা ধারনাও করতে পারবেন না, আমার চিন্তাধারা ও এই জাদুর বিষয়ে ধারনা কতটা গভীর। অনেক কিছু ইমাজিনেশন করতে পারি আমি। ভয় তো একটু পাবোই। 🤧
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ১৬ ( রহস্যে পদার্পণ 🔥)
-
নবরূপা পর্ব ১৭
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ১৯
-
নবরূপা পর্ব ১০
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ১৫
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা পর্ব ২০