সুতোয় বাঁধা জীবন
পর্বঃ০২
কলমেসোনালিকাআইজা
অশান্ত ভঙ্গিতে ছেলের ঘরের দড়জার সামনে পায়চারি করছেন সালেহা বেগম। বার কয়েক দড়জা ধাক্কানোর উদ্দেশ্যে হাত তুলেও, আবার সেই হাত খানা গুটিয়ে নিলেন। গতকাল গা পোড়ানো জ্বর নিয়ে ঘরে ঢুকেছে ছেলেটা। এখন কি অবস্থা কে জানে? রাতে জ্বর বেড়েছিল নাকি কমেছিল? ছেলে তার সুস্থ আছে তো? একমাত্র সন্তানের অসুস্থতা বার বার কাঁপিয়ে তুলছে মায়ের বুক। তবে মুখ ফুটে ছেলেকে ডাকার সাহস আর পাচ্ছেন না তিনি। বিয়ের পর এই প্রথম দুজন এক ঘরে রাত কাটিয়েছে। বউ সমেত ছেলে ঘরে থাকলে তাকে কি এভাবে সাত সকালে ডাকা যায়? তাই মনের ছটফটানি নিয়ে দড়জার সামনেই পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন।
ঠিক এমন সময় চঞ্চল পায়ে রুবাইতাকে আসতে দেখা গেলো। কাঁধের দুপাশে বেনি ঝুলিয়ে চঞ্চল পায়ে হেঁটে আসছে এদিকে। বারান্দার শেষ প্রান্তে সালেহা বেগমকে দেখে দূর থেকেই হাঁক ছাড়লো রুবাইতা,
—“এখানে কি করো বড়মা?”
আচমকা ডাকে খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন তিনি। পরপরই রুবাইতাকে আসতে দেখে খানিকটা খুশিও হলেন। মনের অস্বস্তি খানিকটা কমলো যেনো। হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন রুবাইতার কাছে। মেয়েটার একটা হাত টেনে ধরে বললেন,
—“তোর ভাইয়ের ঘুম ভাঙলো কি না দেখ তো। দড়জার বাইরে থেকে একটা ডাক দিয়ে চলে আয়।”
—“সে, তো তুমিও ডাকতে পারো।”
রুবাইতার অবুঝ জবাবে বেশ নাখোশ হলেন সালেহা বেগম। চোখ রাঙিয়ে বললেন,
—“এই সকাল সকাল আমার ডাকা সাজে নাকি? আমি মুরব্বি মানুষ না? তুই গিয়ে ডাক।”
—“তোমার ডাকা আর আমার ডাকার মধ্যে পার্থক্য কি হলো বড়মা?”
—“তুই বুঝবি না। যা বলছি তাই কর। গিয়ে ছোট্ট করে একটা ডাক দিয়ে চলে আয়। খবরদার, একবারের বেশি ডাকবি না।”
রুবাইতা আর তর্কে জড়ালো না। বড়মায়ের আদেশ মোতাবেক দড়জার সামনে গিয়ে “তাসরিফ ভাই” বলে জোরেশোরে ডেকে উঠলো। তবে ভেতর থেকে তাসরিফের কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। আর না জবাব এলো মায়ার। ছেলেটা বোধহয়, জ্বরের ঘোরে এখনও ঘুমাচ্ছে। আর মায়া? সেও বোধহয় সারা রাত স্বামীর সেবা যত্ন করে শেষ সময়ে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে? আপন মনকে বুঝ দিয়ে রুবাইতাকে নিয়ে নিচে চলে গেলেন তিনি। আর একটু সময় ঘুমাক। তাতে আহামরি ক্ষতি তো আর হচ্ছে না।
–
সালেহা বেগম নিচে নেমে আসার মিনিট পাঁচেকের মাথায় তাসরিফকে নিচে নামতে দেখা গেলো। আধভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে সিঁড়ি মাড়িয়ে নিচে নামছে সে। সুঠাম দেহে জড়িয়েছে বাইরে যাওয়ার ফর্মাল ড্রেস। এই সাত সকালে ছেলেকে বেরোনোর প্রস্তুতি সমেত নামতে দেখে খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলেন সালেহা বেগম। তবে কি ছেলেটা আজকেই ফিরে যাবে? মায়ার সাথে তবে কি বনিবনা হলো না?
এরই মধ্যে তাসরিফ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। নিজ উদ্যোগে প্লেটে খাবার তুলে নিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তার মুখের ভাবভঙ্গি বেজায় শান্ত। ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে দোতলায় একবার নজর বুলালেন সালেহা বেগম। এরপর এগিয়ে এসে ছেলের কপালে হাত রেখে প্রশ্ন করলেন,
—“জ্বর কমেছে আব্বা?”
—“হুম।”
খেতে খেতেই ছোট্ট করে জবাব দিলো তাসরিফ। সালেহা বেগম আরও একবার দোতলায় চাইলেন। দৃষ্টি সেদিকে রেখেই সুধালেন,
—“মায়া আসছে না কেনো? ওর কি এখনও ঘুম ভাঙেনি?”
মায়ার নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই অল্প সময়ের জন্য থেমে গেলো তাসরিফের হাত। সেকেন্ড কয়েক স্থির হয়ে থেকে আবারও খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। ছেলের তরফ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন সালেহা বেগম। রুবাইতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—“তোর ভাবিকে ডেকে নিয়ে আয় তো রুবা। এতো বেলা পর্যন্ত কিসের ঘুম?”
রুবাইতা যেই না উঠতে যাবে, তৎক্ষনাৎ জবাব এলো তাসরিফের তরফ থেকে,
—“মায়া বাড়িতে নেই। চলে গেছে।”
এই ছোট্ট বাক্যটা মুহুর্তেই বজ্রপাত ঘটালো পুরো বাড়ি জুড়ে। উপস্থিত সকলে চমকে তাকালো তাসরিফের দিকে, যে এই মুহুর্তে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেয়ে যাচ্ছে। তামিম আহমেদ মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন,
—“চলে গেছে মানে? কোথায় গেছে?”
—“আমাকে বলে তো আর যায়নি। যাওয়ার আগে একটা চিরকুট ছেড়ে গেছিলো। সেটা দেখে জানতে পারলাম বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।”
একদম সাবলীল ভাষায় ঝড়ঝড়ে কন্ঠে আওড়ে গেলো বাক্যগুলো। যেনো মায়ার হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় ওর কোনো মাথাব্যথা নেই। কথা শেষ হতেই আচমকা সশব্দে চপেটাঘাত পড়লো তাসরিফের বাম গালে। আচমকা থাপ্পড়ে মুখটা ডান পাশে ঘুরে গেলো তাসরিফের। শোনা গেলো সালেহা বেগমের হুঙ্কার,
—“কি করেছিস মেয়েটার সাথে? এমন কি বলেছিস যে মেয়েটা রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো?”
—“কিছুই বলিনি মা।”
—“কিছু না বললে হুট করে কেনো চলে যাবে? তাও কাউকে কিছু না বলে। এমনি এমনি তো আর বাড়ি ছাড়বে না।”
—“আশ্চর্য! তোমরা তো এমন বিহেব করছো যেনো আমি ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। আমি তো সারা রাত নিজের জ্ঞানেই ছিলাম না। আমার অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে রাতের আঁধারে একটা চিরকুট ফেলে রেখে চলে গেছে। ভালোই হয়েছে। এই জোরপূর্বক সম্পর্কের বোঝা বয়ে বেড়ানোর চেয়ে নিজের আজাদীকে বেছে নিয়েছে মেয়েটা। বুদ্ধিমতির পরিচয় দিয়েছে।”
ছেলের কথা শেষ হতেই ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন সালেহা বেগম। দুচোখ বেয়ে গলগলিয়ে ঝড়তে শুরু করলো ব্যর্থতার অশ্রু। অপরাধ বোধে মুচড়ে উঠলো বুকের ভেতর। নিজেদের স্বার্থে মেয়েটাকে ব্যবহার করেছেন তারা। এক অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে মেয়েটার কাঁধে। যেখানে শুরু থেকেই মেয়েটা স্বামীর অবহেলা, তিরস্কার আর অস্বীকৃতি নিয়ে বেঁচে ছিলো। তবুও মুখ ফুটে কখনো অভিযোগ করেনি। আঙ্গুল তুলে কখনো বলেনি, “আমার জীবন নষ্ট করলেন কেনো?” আকাশ সমান ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করে গেছে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হওয়ার। সেই ধৈর্য্যবান মেয়েটার হুট করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় নয়। কতই না কষ্ট বুকে চেপে ছেড়েছে বাড়ি। চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে সালেহা বেগম বললেন,
—“কোথায় চলে গেলো মেয়েটা? এই অচেনা শহরে ওর তো আপন বলতে কেউ নেই।”
—“নিজের বাড়ি ফিরে গেছে হয়তো। এমন সিচুয়েশনে মেয়েরা সাধারণত নিজের বাপের বাড়ি চলে যায়। সহজ একটা বিষয়।”
ছেলের অর্থহীন জবাব শুনে রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে গেলো তামিম আহমেদের। রাগের বহিঃপ্রকাশ স্বরুপ খাবার টেবিলে থাবা মেরে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,
—“কথাটা বুঝে বলছো তো তাসরিফ? মেয়েটা অনাথ। এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে মেয়েটার এক আমরা ছাড়া আপন বলতে আর কেউ নেই। নিজের শেষ ঠাঁই বলতে একটা বাবার বাড়ি ছিলো, সেটাও ওর চাচারা বেইমানি করে আত্মসাৎ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে যাবে কোথায় ও?”
এই পর্যায়ে বেশ জোরেশোরে একটা ধাক্কা খেলো তাসরিফ। জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ায় মায়ার প্রতি বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়েছে সে। যার দরুন, একবারও মেয়েটার পরিবার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেনি। বিয়ের আগে কেবল এতটুকু জেনেছিল, যার সাথে ওর বিয়ে হচ্ছে সে গ্রামের একটা সাধারণ ঘরের মেয়ে। ব্যাস, অপছন্দের জন্য এতটুকু কারণই যথেষ্ট ছিলো তাসরিফের জন্য। তবে মেয়েটা যে অনাথ সেই কথা তাসরিফ জানতো না। আজ বিয়ের ছয় মাস পর এসে মায়ার জন্য করুণা হচ্ছে তার। সেই সঙ্গে চিন্তাও হচ্ছে কিছুটা।
এরই মাঝে তামিম আহমেদ পাঞ্জাবির পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে একটা নাম্বারে ডায়াল করলেন। ফোনটা রিসিভ হতেই চিন্তিত কন্ঠে সুধালেন,
—“মায়া কি গ্রামে গেছে ইকবাল ভাই?”
—“একটু আগেই তো ওর চাচার বাড়িতে বাজার দিয়ে আসলাম। কই? মায়াকে তো দেখলাম না।”
চিন্তার পারদ এবার হুড়হুড় করে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করে ফেললো যেনো। এতিম মেয়েটা চারিদিক থেকে ঠকতে ঠকতে শেষ পর্যায়ে এই বাড়িতে ঠাঁই পেয়েছিল। এই দুনিয়াতে ওর আপন বলতে কেউ নেই। তাহলে হুট করে কোথায় চলে গেলো মেয়েটা? কার কাছে গেলো? শহরের রাস্তা ঘাটে চলতে গিয়ে যদি কোনো বিপদে পড়ে? অত্যাধিক চিন্তায় আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারলেন না তামিম আহমেদ। মনের সন্তুষ্টির জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন আশেপাশের জায়গা গুলোতে খুঁজে দেখবেন। না পেলে সোজা থানায় চলে যাবেন। বাপ মা মরা মেয়েটা তামিম আহমেদের দায়িত্ব। ওকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারেন না তিনি। অন্তত নিজের ছেলের কারণে তো কখনোই নয়। ভাবনা মোতাবেক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দ্রুততম কদম বাড়ালেন বাড়ির সদর দড়জার দিকে। যেতে যেতে নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—“খুঁজতে যাচ্ছি মায়াকে। যেভাবেই হোক ওকে নিয়েই বাড়ি ফিরবো। খোদার কাছে সাহায্য চাও সালেহা। এর মাঝে মেয়েটার কোনো ক্ষতি যেনো না হয়।”
তামিম আহমেদের পেছন পেছন তার ছোটো ভাই রামিম আহমেদও ছুটলেন মায়ার খোঁজে। এতোক্ষণ ধরে নির্বিকার ভাবে বসে থাকলেও, এই পর্যায়ে কপালে কয়েকটা চিন্তার ভাজ পড়লো তাসরিফের। মনের কোণে কোথাও না কোথাও সামান্যতম অপরাধ বোধ সৃষ্টি হলো। এতোদিন ধরে মন প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে আসা মেয়েটাকে হঠাৎ করেই ফিরে পেতে মন চাইলো। আসলে দুরত্ব না বাড়লে মানুষ সম্পর্কের কদর করতে শেখে না। তাসরিফের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটেছে। এতোদিন হাতের নাগালে থাকায় মূল্যায়ন করেনি মেয়েটাকে। অথচ আজ হারিয়ে যাওয়াতে অদৃশ্য এক টান অনুভব করছে মায়ার প্রতি। ঘৃণা করা মেয়েটাকেও ফিরে পেতে মন চাইছে। নিজের করা সকল ভুল গুলোর সংশোধন করার ইচ্ছে জাগছে। মাথা নিচু করে খানিকক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবলো তাসরিফ। এর পরপরই হুট করেই উঠে দাঁড়ালো। আগে পিছে না তাকিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
–
সকালের খাবার খেয়ে মাত্রই নিজেদের বইপত্র গোছাতে শুরু করেছিলো নিকিতা আর রুমি। ঠিক সেই মুহুর্তে গার্লস হোস্টেলের আয়া এসে জানালো, ওদের দুজনের খোঁজে কেউ একজন এসেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির দর্শনে হাতের কাজ ফেলে রেখে ছুটলো দুই বান্ধবী। গেট পেরিয়ে বাইরে আসতেই বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো দুজনার মুখ। গেটের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত রমনীকে দেখে কথা হারিয়ে ফেলেলো দুজন। কন্ঠ হতে ঠেলে ঠুলে বেরিয়ে এলো অবাক করা বাক্য,
—“মায়া, তুই? তোর এই অবস্থা কেনো?
চলবে?
(পড়া শেষে সবাই লাইক কমেন্ট করবেন। আপনারা পড়েই চুপচাপ চলে যান। একটা লাইকও যদি না দেন তাহলে সেটা কিন্তু লেখকের ব্যর্থতা। সেই সাথে পরের পর্ব দ্রুত পেতে পেইজটি ফলো দিয়ে রাখুন।)
Share On:
TAGS: সুতোয় বাঁধা জীবন, সোনালিকা আইজা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৪
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৩
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৫
-
এক টুকরো মেঘ গল্পের লিংক
-
সুতোয় বাঁধা জীবন গল্পের লিংক
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ২
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ১
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ১