প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||২২||
ফারজানারহমানসেতু
রোজা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।পায়ের দিকে তাকালে রুপার পায়েলটা ঝিকমিক করছে। চারপাশের আলোতে সেটা আরও উজ্জ্বল লাগছে। কিন্তু তার মাথার ভেতরে যেন একসাথে হাজারটা ভাবনা ঘুরছে।বিরবির করল,“হিটলার!”
তারপর দ্রুত পা চালিয়ে সবার দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে মলের ভেতরে নেওয়াজ পরিবারের শপিং জমে উঠেছে। রাফিয়া ইতোমধ্যে তিনটা ড্রেস ট্রাই করে ফেলেছে। আরাজ একটা দোকান থেকে আরেকটা দোকানে দৌড়াচ্ছে। মিরান মাঝে মাঝে সবাইকে বিরক্ত করছে।
তানিয়া নেওয়াজ বললেন,“আরাজ, এত দৌড়াদৌড়ি করিস না। পড়ে যাবি।”
আরাজ গম্ভীর মুখ করে বলল, “আমি দৌড়াচ্ছি না দাদুভাই , আমি এক্সপ্লোর করছি।”
মিরান সঙ্গে সঙ্গে বলল,“দেখেছো বড় আম্মু ? আমাদের আরাজ ছোটবেলাতেই ইংরেজি শুরু করে দিয়েছে।”
সবাই একসাথে হেসে উঠল। রোজা এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মিরান তার দিকে তাকিয়ে বলল,“কি রে বনু? তু্ই কিছু কিনলি?”
রোজা ছোট করে বলল,“না।”
“কেন?”
“পছন্দ হয়নি।”
মিরান হেসে বলল,“আমি তো আগেই বলেছিলাম তোর শপিং কালকে হবে!”
তূর্জান একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে কথাগুলো শুনলেও কিছু বলল না। শুধু মাঝে মাঝে চোখদুটো রোজার দিকে চলে যাচ্ছে। রাফিয়া ট্রায়াল রুম থেকে বের হয়ে বলল,“এই ড্রেসটা কেমন?”
রোজা একটু তাকিয়ে বলল,“খুব সুন্দর ভাবি।”
রাফিয়া হেসে বলল,“তুই না থাকলে আমার শপিংই জমে না।”
রোজা হালকা হেসে এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল। সবার শপিং শেষের দিকে হলেও মজার ব্যাপার হলো রোজা এখনো নিজের জন্য কিছুই নেয়নি।
একটা দোকানে ঢুকতেই মিরান বলল, “এইটা শেষ দোকান। এর পরে কিন্তু আর না। তোমরা মেয়ে মানুষ এমন কেন? দশটা দেখে একটা নেও। যেইটা দেখবা ওইটাই নিবা! তাহলেই তো এতো দোকানে ঘোরা লাগে না।”
তানিয়া নেওয়াজ বলল, “ হুমম কদিন পর থেকে দেখবো, মিরান শপিং এ এসে কয়টা দেখে আর কয়টা কেনে? “
মিরান বলল, “ বড় আম্মু আমাকে ইনডাইরেক্টলি খোচা দিলে? “
“ যেটা সত্যি সেটা বললাম। “
“ আমি জীবনে আর শপিংমলে এলে তো। তোমাদের পিছনে ঘুরতে ঘুরতে জীবন তানাবানা হয়ে গেল। “
তখনি এক দোকানদার বলল, “ ম্যাম আমাদের কাছে তানাবানা শাড়ি আছে, দেখতে পারেন। “
মিরান জোরে হেসে বলল, “ হ্যাঁ ভাই, তানাবানা শাড়ি তো থাকবেই। মেয়েরা ছেলেদের জীবন তানাবানা করে, আর তানাবানা শাড়ি না পড়লে হয়। “
রেহেনা নেওয়াজ চোখ রাঙালেন। এত বড় ছেলে শপিং করতে এসে বাচ্চাদের মতো করছে। এই দোকানে যাবে না। ওই দোকানে যাবে না। এত দোকান ঘোরা লাগবে কেন? তখন আবার পাশ থেকে রোজা বলল,“ ভাইয়া,আমি কিছু কিনিনি এখনো।”
মিরান মাথা চুলকাল। রোজাকে বলল,“এইটাই তো সমস্যা!”
রোজা একটা ড্রেস হাতে নিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর আবার রেখে দিল।রাফিয়া রোজাকে বলল,“এইটা তো সুন্দর।”
“না।”
“কেন?”
“রঙটা ভালো লাগছে না।”
আরেকটা দেখিয়ে বলল,“এইটা?”
“না।”
মিরান নাটকীয়ভাবে মাথায় হাত দিয়ে বলল,“আল্লাহ! আবার শুরু!করেছে এরা। এই বনু যা খুশি নিয়ে নে, টাকা তোর বাপ দেবে। ভালো না লাগলেও নিয়ে নে। শুধু নিয়ে নে।পরে ফেলে দিস তাও ভালো।“
তূর্জান দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।তার ঠোঁটের কোণে অল্প একটা হাসি ফুটল। তাকেই কিছু একটা করতে হবে। নইলে রোজার শপিং আজ আর শেষ হবে না।
আরাজ তখন একটা টুপি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, “আমাকে কেমন লাগছে ছোট কাকু?”
মিরান বলল,“তুই দেখতে একদম ডন।”
আরাজ গর্ব করে বলল,“আমি তো ডনই, এখানে এসো দেখ তোমার মাথা ফাটিয়ে দেব।”
ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাচ্ছে। তাও মহিলাদের শপিং শেষ হচ্ছে না। সবাই প্রায় ক্লান্ত।
তানিয়া নেওয়াজ বললেন,“রোজা, কিছু পছন্দ হলো?”
রোজা মাথা নেড়ে বলল,“না।”
মিরান চিৎকার করে বলল,“আমি বলেছিলাম! এই মেয়ের শপিং আজ শেষ হবে না।”
রাহেলা নেওয়াজ চুপচাপ সব দেখছিলেন।
তিনি হেসে বললেন,“এই মেয়েটা ঠিক ছোটবেলা থেকেই এমন।নিজের জিনিস কিনতে গেলে পৃথিবীর সব দোকান ঘুরবে। তাও কিছু পছন্দ হবে না।”
সবাই হেসে উঠল। রোজা বলল,” আমি কি করবো? তোমরা সবাই তো ভালো গুলো নিয়ে নিয়েছো। “
সবাই আহম্বক বনে গেল। এই মেয়ে বলে কি? রেহেনা নেওয়াজ বলল, “ তোর মনে হলো, আমরা সব সুন্দর ড্রেস নিয়ে নিয়েছি। আর এতবড়ো শপিংমলে আর একটাও তোর ড্রেস নেই। আল্লাহ আমার দুইটা ছেলে মেয়েই এমন কেন?“
মিরান বলল, “ আচ্ছা বাদ দাও! আমি বনুকে নিয়ে বিশমিনিটে শপিং শেষ করে আসছি। “
সবাই অবাক হয়ে বলল, “ যেই মেয়ে তিনঘন্টায় একটা ড্রেস পছন্দ করেনি, সে বিশমিনিটে সব কেনাকাটা শেষ করবে! “
মিরান বলল, “ তোমরা গাড়িতে গিয়ে বসো। আসছি আমরা, ইচ্ছে হলে চলেও যেতে পারো। আব্বু তোমাদের গাড়ি ড্রাইভ করবে। বড় আব্বু অন্যটা নিয়ে চলে যাবে।তুবা অসুস্থ ওকে নিয়ে যাও। আমি ভাইয়া আর বনু একটু পরে আসছি। “
বলেই রোজাকে নিয়ে মিরান চলে গেলো। হলোও তাই সবাই বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলো। তূর্জান যেহেতু আছে তাহলে আর সমস্যা নেই। মিরান এগিয়ে আসতেই তূর্জান ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এল। সে একটা ড্রেস তুলে রোজার সামনে ধরে বলল,“এইটা নে।”
রোজা তাকিয়ে বলল,“না।”
“কেন?”
“ভালো লাগছে না।”
“দেখেই না বলছিস।”
“দেখেছি।”
তূর্জান একটু চুপ করে রইল। তারপর শান্তভাবে বলল,“ঠিক আছে। চল বাড়ি যাই?”
রোজা বলল,“ আশ্চর্য,আমি শপিং করবো না? ”
“ তোর তো কিছুই চয়েস হচ্ছে না। তার থেকে বাড়ি চল!”
মিরান পাশ থেকে বলল,“ ভাইয়া, তুমি হার মানো। বনুর সাথে শপিং যুদ্ধ জেতা যায় না।”
কিছুক্ষণ পরে তূর্জান একটা মেরুন রঙা ড্রেস বের করল।“এইটা একবার ট্রাই করে দেখ।”
মিরানও বলল,“হ্যাঁ,বনু এইটা ট্রাই কর।”
রোজা বাধ্য হয়ে ট্রায়াল রুমে গেল।কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলল।রোজা বের হয়ে এল। ড্রেসটা রোজাকে অসাধারণ মানিয়েছে।
মিরান বলল,
“ওয়াও! বনু তোকে খুব সুন্দর লাগছে। এইটাই নে।”
রোজা আয়নায় তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,“হুম… খারাপ না।”
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।রোজা বলল,“আরেকটা দেখি।”
মিরান মাথা ঠুকল দেওয়ালে বলল,“আমি শেষ!ভাইয়া আরেকটা ড্রেস পছন্দ কর তাড়াতাড়ি!”
তারপর ছোটদের মতো বলল, “ ভাইয়া আমি ছোট হলে ভালো হতো, এখন বলতে পারতাম আমি বাড়ি যাবো।”
এদিকে রাত হয়ে আসছে।ওদিকে রোজা আরেকটা ড্রেস দেখছে।তূর্জান একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে।তার চোখে অদ্ভুত একটা কোমলতা। মিরান সেটা দেখে বলল,“ভাইয়া।”
“হুম?”
“তুমি তো একদম সিনেমার হিরোর মতো তাকিয়ে আছো।”
তূর্জান ঠান্ডা গলায় বলল,“চুপ কর। তোর বোনের শপিং শেষ না হলেও আমি শেষ। “
মিরান হাসল। কিছুক্ষণ পরে রোজার শপিং শেষ হলো। ব্যাগে অনেক জিনিস। রোজার আজকের শপিং এ যা কেনা হয়েছে সবই প্রায় তূর্জানের পছন্দে কেনা।রোজাও কেনার সময় না বলেনি। তূর্জান যা দিয়েছে ওইটাই নিয়েছে। তূর্জান তো ভেবেও ফেলেছে তার বউ অতি ভালো হয়ে গেছে।
তিনজনই ক্লান্ত।মলের বাইরে বের হতেই ঠান্ডা বাতাস লাগল। রোজা হালকা নিঃশ্বাস ফেলল।
মিরান বলল,“আজকের দিনটা ইতিহাসে লেখা থাকবে।”
রোজা বলল,“কেন ভাইয়া ?”
“কারণ আজ আমার বনুর শপিং শেষ হয়েছে।”
রিক্সা নেওয়া হলো। দুইটা গাড়িই যেহেতু নিয়ে গেছে, সেহেতু রিক্সাই নেওয়া হলো।তবে একটাতে যাওয়া সম্ভব না। তাই দুইটা নেওয়া হলো একটাতে মিরান সব ব্যাগসহ নিয়ে যাবে। আরেকটাতে রোজা আর তূর্জান যাবে। আর বাড়ির গাড়ি পাঠানোর বুদ্ধিদাতা স্বয়ং তূর্জান নেওয়াজ।রিক্সায় ওঠার সময় তূর্জান হঠাৎ বলল,“রোজা।”
রোজা থেমে গেল।রোজা কি সত্যিই বাজিতে হেরে যাবে। তূর্জান কথা বলছে। কথা না বললেই তো রোজা চুপ করে থাকে। মনে মনে বলল,
“আগে কথা বলেছে মানে আমার বাজির ধাপ শুরু, আমি এর সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলবো কেমনে? এরে দেখলেই তো আমার জ্বালাতে ইচ্ছে করে।”
রোজার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
তারপর ঘুরে বলল,“কি?”
তূর্জান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তারপর বলল,“ক্লান্ত?”
রোজা একটু ভেবে বলল,“ কই না তো।”
তূর্জান বলল,“ মিথ্যে বলিস না।”
রোজা ভ্রু কুঁচকে বলল,“আপনার কি?”
তূর্জান ঠান্ডা গলায় বলল,“কিছু না। ওঠ।”
রোজা এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।তারপর চুপচাপ রিক্সায় উঠে বসল।রিক্সা ধীরে ধীরে মল থেকে বের হয়ে গেল।রাতের শহরের আলো রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে আছে। রোজা অন্ধকারে দূরের শহরে তাকিয়ে আছে।কিন্তু তার মাথার ভেতরে বারবার একটা কথাই ঘুরছে, “ এই একমাস প্রফেসর তূর্জান নেওয়াজকে না জ্বালিয়ে মিষ্টি করে কথা বলবে কেমনে? তবে যাই হোক একে আমি আমার কথায় উঠাবো আর বসাবো। এই কারণে হলেও চ্যালেঞ্জ পূরণ করবো। হুহ!“
ইনশাআল্লাহ চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২১