Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;১০

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

রাত গভীর। চারপাশে নেমে এসেছে নীরব নিস্তব্ধতা।

সেই নীরবতাকে ছাপিয়ে বাগানের দিক থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম ডাক। যেন অন্ধকার রাতের বুক জুড়ে তাদেরই রাজত্ব বসেছে। বাইরে মৃদু ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে। আকাশের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা মেঘের ভার দেখে মনে হচ্ছে শেষ রাতের দিকে হয়তো বৃষ্টি নামবে। উত্তরের জানলাটা আধ খোলা। সেখান দিয়ে বয়ে আসা হিমেল বাতাস এসে আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছে তরী আর তিন্নির শরীর।

তিন্নি ঘুমিয়েছে প্রায় ঘণ্টা খানেক হলো। ঘুমোবার আগে বেশ কিছুক্ষণ মায়ের জন্য কেঁদেছিলো সে। ছোট্ট বুক ভরা সেই কান্না ধীরে ধীরে ক্লান্তিতে মিইয়ে এলে এক সময় অজান্তেই ঘুম এসে আছন্ন করলো তার মস্তিষ্ক।

যখন মিতা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়ে ছিলেন। তখন তিন্নির বয়স ছিলো মাত্র ছয় বছর। এত অল্প বয়সে মাকে হারালে ও, তিন্নির মনে মায়ের কিছু স্মৃতি এখনো আবছা হয়ে ভেসে ওঠে। সেই স্মৃতি গুলো খুব বেশি স্পষ্ট নয়, তবুও সেগুলোয় মিশে আছে মায়ের ভালোবাসার পাশাপাশি কোমল উষ্ণতা। যে উষ্ণতা তার মস্তিষ্ক জুড়ে আজ ও বিদ্যমান।

তখন তাদের বাবা ও দুই মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসতেন। ছোট্ট সেই সংসারটা ছিলো সুখে আর শান্তিতে ভরা। সাধারণ ভালোবাসাময় উষ্ণ পরিবারের মতো। দিন গুলো কেটে যেতো হাসি, গল্প আর ছোট ছোট আনন্দে। সেই দিন গুলোর স্মৃতি এখন আর তিন্নির কাছে স্পষ্ট নয়, তবুও মনের গভীরে কোথাও লুকিয়ে আছে। আর যখনই সেই স্মৃতি গুলো তিন্নির ছোট্ট মস্তিষ্কে নড়ে চড়ে ওঠে, বাচ্চাটা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। হারিয়ে ফেলা দিন গুলো আর মা কে ফিরে পেতে চায় সে।

এতক্ষণ তিন্নির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল তরী। ছোট বোনটার অশান্ত ঘুমটা একটু শান্ত হোক। এই চেষ্টাতেই বসে ছিলো সে। কখন যে নিজের অজান্তেই তার চোখে ঘুম নেমে এসেছে, সে নিজে ও টের পায়নি।

হঠাৎ, কোথাও কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো তরী। ঘুম জড়ানো চোখ মেলে অন্ধকারের ভেতর এদিক ওদিক তাকালো সে। শব্দটা ঠিক কোথা থেকে এলো — তার উৎস খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলো তরী।
চারপাশ নিস্তব্ধ, অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না তার। কিছুক্ষণ এভাবে স্থির হয়ে থেকে, আর কোনো শব্দ না পেয়ে আবার চোখ বুঁজে নিলো তরী।

তরী শুয়ে পড়তেই, নিঃশব্দে বারান্দার স্লাইডিং ডোর টেনে রুমে প্রবেশ করলো তরঙ্গ। বলা বাহুল্য দরজা টা খুলতে গিয়ে কাঁটা জায়গায় বেশ চোট পেয়েছে সে। ব্যথার পরোয়া না করে অন্ধকারের মাঝে মেপে মেপে কদম ফেললো তরঙ্গ। বিছানার পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো সে।

ড্রিম লাইটের ম্লান নীল আভায় রুমটা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেই নীলচে আলোয় তরীর শ্যাম সুন্দর মুখশ্রী ঝলমল করছে। ঘুমের শান্ত প্রশান্তিতে তাকে আরো সিগন্ধ আর নিরীহ লাগছে। ধীরে ধীরে কুঁজো হয়ে এগিয়ে এলো তরঙ্গ। অন্ধকারে তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে বিছানার ওপর পড়লো। তরঙ্গ পুরুষালি এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে সাবধানী স্পশে ছুঁয়ে দিলো তরীর কপাল।

সেই মুহূর্তেই, হঠাৎ গগন বিদারী শব্দে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। অন্ধকার রাত যেন মুহূর্তের জন্য ছিন্ন হয়ে ঝলসে উঠলো সাদা আলোয়। সেই বজ্রের তীব্র শব্দে ঘুমন্ত তিন্নি কেঁপে উঠলো। তরঙ্গ এক মুহূর্ত ও সময় নষ্ট করলো না। দ্রুত হাত বাড়িয়ে তরীর ঘাড়ের নিচ দিয়ে নিজের বাহু গলিয়ে দিলো। অনায়াস ভঙ্গিতে পাঁজা কোলে তুলে নিলো তাকে। যেন এই কাজটায় তার বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না।

দরজার ছিটকিনি খুলে রুম থেকে বেরিয়ে এলো তরঙ্গ। ক্ষীণ কদমে ছাদের সিঁড়ির দিকে গেলো সে। তরীর ঘুম হাল্কা হয়ে এলো ততক্ষণে। তড়িৎ বেগে চোখ খুলতেই তরঙ্গের সাথে চোখাচোখি হলো তার। মূহুর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো তরীর মুখে।

–” কি করছেন তরঙ্গ?”

তরঙ্গ জবাব দিলো না। সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে। ছাদে প্রবেশ করলো সে। তাতে তরীর ছটফটানি বাড়লো।

–” তরঙ্গ! নামান আমাকে। পাগল হয়ে গেছেন নাকি?”

ছাদের কার্নিশের নিকট এসে থামলো তরঙ্গ। একদম কার্নিশ ঘেঁষে তরীকে নিয়ে দাঁড়ালো সে। তা দেখে আঁতকে উঠলো তরী। ভয়ের তোপে দু’হাতে তরঙ্গের কাঁধ আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো সে। মুচকি হাসলো তরঙ্গ। তরীর চোখে চোখ রেখে নিগূঢ় কন্ঠে সুধালো;-

–” জড়িয়ে ধরলি যে। ভালোবাসিস না যাকে। তাকে জড়িয়ে ধরেছিস?”

তরী আবার ও বিস্ময়ে থমকে গেল। হাতের বাঁধনটা ঢিলা করার কথা তার মনে এলো বটে, কিন্তু তরী তা করলো না। তরঙ্গকে ছেড়ে দেওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যুকে ডেকে আনা। এক মুহূর্তের অসাবধানতায় দু’জনেই ছাদ থেকে নিচে গড়িয়ে পড়বে। তিন তলার উচ্চতা পেরিয়ে; নিচে ছড়িয়ে থাকা শুকনো কাঠের স্তূপে আছড়ে পড়লে মৃত্যু না হলে ও মারাত্মক জখম অনিবার্য। তাই শ্বাসরুদ্ধকর আশঙ্কা বুকে নিয়েই তরী শক্ত করে ধরে রইলো তাকে।

–” একদম বাজে কথা বলবেন না তরঙ্গ। এখান থেকে সরুন। নয়তো,,”

–” নয়তো কি?”

–” আমরা ছাদ থেকে পড়ে যাবো।”

–” পড়লে কি হবে?”

তরঙ্গের হেয়ালিপনায় চুপসে গেলো তরী।

–” অদ্ভুত তো?”

তরী কে কোল থেকে কার্নিশে বসিয়ে দিলো তরঙ্গ। ভয়ে অন্তর আত্মা শুকিয়ে ধূ ধূ হয়ে গেলো তরীর। মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো সে।

–” আল্লাহর দোহাই তরঙ্গ। আমাকে নামতে দিন কার্নিশ থেকে। এমন পাগলামো করছেন কেন?”

–” আমরা এখন ট্রুথ ওর ডেয়ার খেলবো!”

ব্যতিব্যস্ত গলায় তরী বললো;-

–” যা ইচ্ছে করুন। আগে আমাকে নামান।”

–” ট্রুথ ওর ডেয়ার না খেললে আমি তোকে চুমু খাবো। বাকি টা তোর ইচ্ছে।”

ফের বিরক্তি নিয়ে তরী সুধালো;-

–” খেলবো, খেলবো।”

–” ট্রুথ ওর ডেয়ার?”

–” ডেয়ার।”

তরীর উত্তরে ফিচেল হাসলো তরঙ্গ।

–” আমাকে ভালোবাসিস বল।”

তরঙ্গের কথায় চোখ ছোটো ছোটো করে নিলো তরী।

–” ট্রুথ,”

–” আমার জন্য তোর মনের ফিলিংস বল!”

–” আল্লাহ্ এসব কি তরঙ্গ?”

তরীর বিরক্ত মুখ ভঙ্গি দেখে তরঙ্গ মৃদ্যু স্বরে শিষ বাজালো। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো তার। অতঃপর, ধীরে ধীরে মুখটা এগিয়ে আনলো তরীর কানের কাছে। এতটাই কাছে, যে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেলো তরীর কানের লতি। সেই হালকা উষ্ণ স্পর্শে তরীর শরীর অনিচ্ছা সত্তে ও কেঁপে উঠলো। তরীর শরীরের সেই কম্পন দেখতেই। তরঙ্গের ফিচেল হাসি গাড়ো হলো।

–” আমার ভালোবাসা ভরা প্রেমময় কথা।”

–” আজে বাজে কথা বলবেন না।”

বিরক্তিতে তরঙ্গের হাতে ধাক্কা দিলো তরী। ধাক্কায় অপ্রস্তুত হয়ে, তরঙ্গের কাঁটা জায়গা ছাদের কার্নিশে ঘষা লাগতেই ব্যথাতুর শব্দ করে উঠলো সে। তরী ভাবলো তরঙ্গ বুঝি এইবারে ও মজা করছে।

–” আমি কিন্তু ওতোটা জোরে ও ধাক্কা দেইনি। নাটক বন্ধ করুন।”

তার ধমকে ও তরঙ্গ কে চোখ বুঁজে থাকতে দেখে; তরঙ্গের ডান হাত টেনে চোখের সামনে ধরলো সে। মূহুর্তে তার মুখশ্রী বদলে গেলো। হিম শীতল কন্ঠে তরী প্রশ্ন করলো।

–” হাতে কি হয়েছে আপনার?”

তরীর কথায় নিজের হাতের দিকে তাকালো তরঙ্গ। পর পর বিরক্তির কন্ঠে সুধালো সে;-

–” বোম পড়েছে।”

–” মানে?”

–” বোম চিনিস না? মুভিতে দেখিস না। গুন্ডারা মারে যে। সেগুলো, আমার হাতে পড়া বোম টা অবশ্য তেমন না। সেটাই দেখতে খুবই কিউট।”

–” পাগল।”

তরঙ্গের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেলো। শক্ত চোয়ালে, নিরট কন্ঠে বলে উঠলো সে;-

–” আমি তোকে মেরে ফেলবো তরী। বিলিভ মি, আই উইল কিল ইউ। সবার অপমান সহ্য করার অপরাধে একদিন তুই আমার হাতে খুন হবি।”

তরীর কপালের সাথে নিজের কপাল চেপে ধরলো তরঙ্গ। রাগের তোপে হাতের বাঁধন শক্ত করলো সে।

–” আমার লাগছে তরঙ্গ। হাত ছাড়ুন।”

–” হ্যাঁ, আমি ছুঁলেই ফস্কা পড়ে তোর শরীরে।”

তরী দাঁত খিঁচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।

–” তোকে আমার মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে তরী জান। তোর এই অবাধ্যতা আমার আর সহ্য হচ্ছে না।”

–” মেরে ফেলুন তরঙ্গ। আপনার দাসত্বে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়।”

তরঙ্গ নির্লিপ্ত চোখে তরীকে দেখলো। তাদের মাঝের নীরবতা ছেদ করে, পুনরায় দূরে কোথাও বাজ পড়লো। তাতে ও তরঙ্গ একটু ও সরলো না।

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর আল্লাহ্ চাইলে কাল/পরশু দিবো নে এক পর্ব।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply