Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ অন্তিম পর্ব


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ার করবেন)

[ অন্তিম পূর্ব ]
শক্তপোক্ত কাঁচের দরজাটা মায়া টেনে ধরতেই সুখ রিদের অফিস কক্ষে ‘আব্বু! আব্বু! মৃদু স্বরে ডেকে ভিতরে ঢুকতেই খানিকটা চমকে উঠে সেদিকে তাকাল রিদ। দুপুর তখন একটার ঘরে! হাতে কাজ গুলোই শেষ করছিল মনোযোগ সহকারে। ঠিক তখনই মেয়ের আদুরীপনায় ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে তার। টকটকে লাল জামা পরিহিত সুখের মাথায় তাল গাছ বেঁধে দু’হাতে ভাঁজে বেশ বড়সড় একটা আম চেপে ধরে দৌড়ে আসছে রিদের দিকে খুশিতে আটখানা হয়ে, যার জন্য ফর্সা হাতে টকটকে লাল কাচের চুড়ি গুলোও ঝনঝন শব্দ করছে ক্ষণে ক্ষণে। মেয়েকে দৌড়াতে দেখে রিদ তৎক্ষনাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দৌড়ে এগিয়ে গেল মেয়ের দিকে। হাঁটু মুড়ে মেয়ের সামনে বসতেই সুখ দৌড়ে এসে বাবাকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরতেই মেয়ের পিছন পিছন মায়াও কেবিনের ভিতর প্রবেশ করলো। রিদ মেয়ের মাথায় আদুরে চুমু খেয়ে সুখকে নিয়ে সোফার উপর বসতে বসতে মায়ার দিকে তাকাল এক পলক। লাল বোখরা পরে আছে মায়া। হয়তো মা-মেয়ে যুক্তি করে একিই রঙ্গা পরেছে। আজকাল মা-মেয়েকে রিদ বেশি ভাগ সময়ই একি রঙ্গা ড্রেস পরে ঘুরাফেরা করতে দেখে বাড়িতে। এতে খারাপ কিছু না! রিদের অবশ্য ভালোই লাগে। তার চোখ জুড়িয়ে যায় ভালোবাসার কলিজার টুকরা দুটোকে একিই রকম ড্রেসে নিজের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলে। রিদ মেয়েকে উরুর মাঝের বসিয়ে ফের চুমু খেল সুখের ঘামন্ত ভেজা কপালে। সোফার টেবিলে উপর থেকে একটা টিস্যু নিয়ে সযত্নে মেয়ের কপালের বেবি হেয়ার গুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানটায় ঘাম মুছে দিতে দিতে রিদ মেয়েকে উদ্দেশ্য করে আদুরী গলায় বলল…

—” আমার আম্মুটা এতো ঘেমে গেছে কিভাবে শুনি??

বাবার আদুরী কথায় দারুণ হেঁসে উঠে সুখ। বাবাকে নিজের আশেপাশে পেলে যেন এক কেজি রক্ত বাড়ে ওর। সারাক্ষণ আব্বু” আব্বু’ বলে মুখে লফজোটা থেকেই থাকে। বাবা পাগল মেয়ে যার জন্য, রিদ সকালে অফিস যেতে চাইলে কতক্ষণ কান্নাকাটি করবে বায়না ধরে বাবার সাথে অফিসে যেতে চেয়ে। এজন্য মায়া প্রায় রিদের অফিস টাইমে মেয়েকে লুকিয়ে অন্যর্থে পাঠিয়ে দেয় মালাকে দিয়ে। নয়তো দেখা যায়, রিদ মেয়ের কান্না সহ্য করতে না পারলে সুখকেসহ মায়াকেও রিদের অফিসে আসতে হয় বাধ্য হয়ে। এতে অবশ্য সুখের খেলাধুলা নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়না। রিদের অসিফের তিন তলা ফ্লোরে দুই ভাগ করে একভাগ রিদ খালি রেখেছে নিজের পরিবারের সাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্য। বিশেষ করে মেয়ের জম্মের পর এটা করেছে সে। মারিদ, সুখকে নিয়ে প্রায় মায়া, হেনা খান চলে আসে তার অফিসে এর কারণ হলো সুখ বাবার কাছে যাবে বলে বেশি কান্নাকাটি করলে তখন এমনই করে চলে আসে হঠাৎ হঠাৎ রিদের অফিসে। আজও তাই হয়েছে। সুখের অতিরিক্ত কান্নাকাটির ফলে মায়া একপ্রকার বাধ্য হয়ে এসেছে রিদের অফিসে মেয়েকে নিয়ে। রিদের প্রশ্নের উত্তরে মায়া মাথার হিজাব খুলতে খুলতে তৎক্ষনাৎ বলল…

—” ঘামবে না? আপনার মেয়ে কি মাটিতে পা ফেলে হাঁটে? সারাক্ষণ দৌড়াদৌড়ির উপর থাকে! গাড়ির থেকে নেমে যে দৌড় শুরু হয়েছে আব্বু যাবে’ আব্বু যাবে’ বলে সেই দৌড় শেষ হয়েছে আপনার কাছে এসে। এর মধ্যে দুবার পরে ব্যথাও পেয়েছে। দেখুন পা চেক করে এখনো লাল হয়ে আছে। আমাকে ধরতে পযন্ত দিচ্ছে না। তারপর এই যে, ওর হাতের আমটা পযন্ত আমার কাছে দিচ্ছে না। বলে আমি নাকি খেয়ে ফেলব। আচ্ছা! আমার কি আর কোনো কাম নাই? আমি কি ওর আম খাওয়ার জন্য বসে থাকি বলুন?

মায়ার অভিযোগ রিদ শুনেও না শুনার মতোন রইল। এটা রোজকার কাহিনি! যেমন মা, তেমন মেয়ে। তাই রিদ মেয়ের পক্ষ ধরে আদুরে হাতে মেয়ের পা চেক করে ব্যথা লাল হয়ে যাওয়া হাঁটু দুটো দেখে নিল এক পলক। পর মূহুর্তে মেয়ের কপালের ঘাম পরিষ্কার করে টিস্যুটি টেবিলে উপর রাখতে রাখতে বলল…

—” তুমি হয়তো খেয়েছ মেয়ের আম, সেই জন্য সত্যিটায় বলছে।

রিদের খুঁচা মারা কথায় মায়া জ্বলে উঠে বলে…

—” আমি আপনার মেয়ের আম খেতে যাব কেন? আমি কি চোর? আমার আম খাওয়ার হলে আমি গাছ পেরে খাব নয়তো ফ্রিজ থেকে নিয়ে খাব। শুধু শুধু আমার নামে মিথ্যা কাহিনি রটাচ্ছেন দুজন। আপনার মেয়ে সারাক্ষণ একটা না একটা আম হাতে নিয়ে রাখবেই। কালকেও একটা আম হাতে নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পরেছিল। আমি ওটা সরাতে গিয়ে দেখি আমটা নষ্ট করে ফেলেছে বারবার হাত থেকে ফেলার কারণে, ভিতর থেকে অতিরিক্ত নরম ও তেতে গেছে সেই জন্য আমি আমটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর আমি ওকে ভালো একটা আম দেয় আগের আমটা চাওয়াতে। কিন্তু আপনার শিয়ানা মেয়ে আমটা নিল না। বলে কিনা ওকে আগের আমটা দিতে, এটা নাকি ওর আম না। আমি যখন বারবার করে বুঝাচ্ছিলাম ভালো আমটা নিতে তখন বলে, আমি নাকি ওর আম খেয়ে ফেলেছি এজন্য ওর আমটা নাই। এই করে করে, আমাকে সকালে দুই ঘন্টা জ্বালিয়েছে কেঁদেকুটে। তারপর দাদী নিজে গিয়ে গাছ থেকে ওর পছন্দ মতো আম পেরে দিয়েছে তারপর শান্তি হয়েছে। এখন সারাদিন ধরে এই আম নিয়েই ঘুরছে। আমাকে ধরতে পযন্ত দিচ্ছে না বলে, আমি নাকি আবার খেয়ে ফেলবো! বদের হাড্ডি একটা মেয়ে!

মায়ার মুখ বাঁকানো কথায় ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল মায়ের দিকে সুখ। মা যে ওকে উদ্দেশ্য করে বাবার কাছে নালিশ করছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারল। মায়ের সবগুলো কথা ঠিকঠাক বুঝতে না পারলেও নালিশ করা বিষয়টি ঠিকই বুঝতে পারলো। যার জন্য অনেকটা অপমান বোধ করল বাবার সামনে। বিশেষ করে মায়ার মুখ বাকানো কথা ‘ বদের হাড্ডি মেয়ে’ গালি দেওয়াতে একটু বেশি অপমানিত হলো। যার রেশ টেনে তৎক্ষনাৎ ঠোঁট উল্টিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে বাবার তাকাল চোখ ভরতি পানি নিয়ে। মেয়ের আদুরী কান্নায় রিদ চোখ পাকিয়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে সুখের ভেজা গাল আঁজলে একহাতে মুছে দিতে দিতে বলল…

—” অ আমার আম্মু কাঁদে না। এইতো আব্বু তোমার কাছে। কি হয়েছে আমার আম্মুটার?

বাবার আদুরে কথায় ভিষণ আদুরী হলো মেয়ে। ঠোঁট ভেঙ্গে ছোট ছোট হাতে এক আঙ্গুল তুলে মায়ের দিকে ইশারা করে কাঁদতে কাঁদতে বলে…

—” আম্মু বতে(বকে)।

রিদ ফের মেয়ের ফুলা দুগালের পানি মুছে দিতে দিতে বলে…

—” আম্মু পঁচা! সুখ ভালো! আম্মু সাথে সুখের কথা নেই কেমন!

ডাগর ডাগর ভেজা চোখ তুলে মায়ার কপাল কুঁচকে আসা চেহারার দিকে তাকাল সুখ। মাকে তার ভিষণ পছন্দ। বাবা না থাকলে তো মার পিছন পিছন ঘুরঘুর করার তার স্বভাব। তারপরও বাবার পাশে থাকলে দুনিয়া ভুলে যায়, সাহসও বেড়ে যায় বাবার সানিধ্যে। তাই রিদের কথা মাথা নাড়িয়ে সাহসী সুখ সম্মতি দিয়ে বলে..

—” আম্মু পঁতা(পঁচা)! চুখ ভালোঅঅ!

রিদ হাসল। বাবার হাসি দেখে মেয়েও খিলখিল করে হাসল আদুরে সহিত। মায়া কপাল কুঁচকে তাকাতেই রিদ হাতের ইশারায় মায়াকে ডাকল নিজের অপর পাশে খালি জায়গায়। মায়া গাল ফুলিয়ে সেখানটায় বসতেই দ্বিতীয় বারের মতোন টিস্যু নিয়ে মায়ার ঘামন্ত ভেজা মুখটা যত্ন করে মুছে দিতে দিতে মিহির স্বরে প্রশ্ন করে বলল…

—” তোমার কি একা এসেছ দাদী সাথে আসেনি? মারিদ কই? স্কুল থেকে ফিরেনি এখনো?

রিদের পরপর প্রশ্নে মায়া উত্তরে বলল..

—” আমরা বডিগার্ডদের সাথে এসেছি একা। দাদী মারিদের স্কুলে! রাদিল আর মারিদকে নিয়ে সোজা এখানে চলে আসবে আমাকে বলেছে। হয়তো চলে আসছে রাস্তায় হবে। দুপুর লাঞ্চ আমরা সবাই এখানে করবো এজন্য দাদী রান্না করে পাঠিয়ে দিয়েছেন আগেই।

মায়ার কথা গুলো বলতে বলতেই মারিদ বাবার কেবিনে ঢুকল স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে। পিছন পিছন রাদিল, হেনা খান,আরাফ খান ও ঢুকল। হেনা খানের হাতে রাদিলের স্কুল ব্যাগ। আর মারিদের ব্যাগ নিজের কাঁধেই ঝুলানো। সে নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করে বিদায় কারও কাছে থেকে সাহায্য নিতে ইচ্ছু নয়। রুমে ঢুকেই মারিদ সোজা গিয়ে বসল বাবার অপর পাশে খালি জায়গায় চুপ করে। মায়া রিদের পাশ থেকে উঠে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যেতেই রিদ সুখকে মায়ার জায়গায় বসিয়ে ছেলের কাঁধ থেকে স্কুল ব্যাগটি ছাড়িয়ে নিয়ে সোফার টেবিলে উপর রাখল। তৃতীয় বারের মতোন টিস্যু নিয়ে যত্ন সহকারে ছেলের লাল হয়ে উঠা ঘামন্ত ভেজা চোখ মুখ মুছে দিতেই মায়া ফ্রিজের ঠান্ডা পানি গ্লাসে করে নিয়ে সবার হাতে হাতে দিল। বিশেষ করে রাদিল, মারিদ, আর হেনা খানের হাতে। মায়া রাদিলকে পানি গ্লাস দিয়ে বাক্স থেকে টিস্যু নিয়ে যত্ন সহকারে রাদিলের ও ভেজা চোখ মুখ মুছে দিয়ে মারিদের পাশে বসাল তাকে। দুজন একিই স্কুলে, একিই ক্লাসে পরে চতুর্থ শ্রেণিতে। এইতো আর হাতে গুনা কিছু পরই ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দুজনের তারপরও পঞ্চম শ্রেণিতে উঠবে দুজন। দেখতেও দুজনকে চোখে লাগার মতোন বড়সড়ো, লম্বা আর স্বাস্থ্যবান। বয়স এবার নয় পার হয়ে দশের কোঠায় পা রাখবে মারিদ৷ রাদিল আরও কয়েক মাস পর দশ বছরে পা রাখবে। এর মধ্যে দুজনের ভিসা প্রসেসিং হয়ে গেছে দুজন দুই দেশে যাবে বাকি পড়াশোনার জন্য। মারিদ যাবে সুইজারল্যান্ডের রিদের চির বাসস্থানে। রাদিল যাবে তার বাবার শহরে লন্ডনে পড়াশোনা করতে তবে রাদিলের সাথে ফিহার বড় ছেলে ইফরাদও যাবে সেখানে পড়াশোনা করতে। মারিদ সুইজারল্যান্ড একা থাকবে এমনটা নয়। মায়া, রিদ, হেনা খান,আরাফ খান, সবসময় যাওয়া আসা থাকবে মারিদের কাছে। রাদিল মারিদের পাশে বসে গ্লাসের পানিতে চুমুক দিতে দিতে এক পলক সুখের দিকে তাকাল স্বাভাবিক দৃষ্টিতে। যেমনটা সে আসতে যেতে সবাইকে দেখে ঠিক তেমনটাই দেখল সল্প সময়ে জন্য। সুখের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে গিয়ে চোখে পরল সুখের ছোট ছোট দু’হাতে ভাঁজে ভিতর চেপে ধরে রাখা মাঝারি সাইজের বড় আমটার দিকে। হাতের চেয়ে দ্বিগুণ বড় আম হওয়ার ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে যার জন্য অলরেডি দুইবার পরে গেছে হাত ফসকে, রিদ বারবার তুলেও দিচ্ছে বিরতিহীন ভাবে। তারপরও সুখ আমটা ছাড়ছে না। দু’হাতে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে হলেও আপ্রান চেষ্টা চালাচ্ছে আমটা নিজের কাছে রাখার। যার জন্য হাতের কাঁচের চুড়ি গুলো অনবরত ঝনঝন শব্দ করছে সেই তালে। রাদিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষ পানিটুকু পান করে গ্লাসটা টেবিলে উপর রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যর্থে রাখল। খানিকটা বাদেই খাবারের ডাক পড়তেই রিদ মেয়েকে কোলে নিয়ে গিয়ে বসল ফ্লোরে উপর বিছানা করা আসনে। মারিদ অলরেডি হেনা খানের পাশে বসে ছিল। রাদিল বসল হেনা খান ও আরাফ খানের মধ্যে। রিদ সুখকে কোলে নিয়ে মারিদ ও মায়ার মধ্যস্হে বসল ফ্লোরের বিছানায়। সামনে কাঁচের ডাইনিং টেবিল যেটা ফ্লোরে বসা অবস্থায় সবার বুক বরাবর হয়। রিদ তাতে মেয়েকে নিজের সামনে বসিয়ে প্লেটে খাবার তুলতেই সুখ আদৌ আদৌ ভাষায় সেদিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে আওড়াল’

—” আব্বু মাংচ! (মাংস)! আব্বু মাংচ!

রিদ তাই করল। মেয়ের পছন্দ অনুযায়ী প্লেটে মুরগীর মাংস তুলতেই মারিদ নিজের প্লেট ছেড়ে নিরবে এসে বসল বাবার পাশে যার অর্থ সেও রিদের হাতেই খাবে। রিদ ছেলের গম্ভীর প্রকাশটা বুঝে প্লেটের অপর পাশে মারিদের পছন্দ অনুযায়ী খাবার তুলতেই মায়াও চেপে চেপে রিদের অপর পাশে বসল জায়গায় ছেড়ে। যার অর্থ সেও খাবে। ছেলে-মেয়ের খাবারের পাশাপাশি মায়ার জন্যও প্লেটের অপর পাশে চিংড়ি মাছ নিল। কারণ মায়া সর্বত্রে মাছটাই পছন্দ করে। বড় প্লেটে গোল করে খাবার নিয়ে রিদ ভাতের সাথে এক-টুকরো মাংস মেয়ের মুখে আগের দিতেই সুখ খা করে সেটা মুখে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে চিবুতে চিবুতে মারিদকে দেখাতে দেখাতে বলে..

—” আমি আদে! তুমি পলে(পরে)। আমি আদে(আগে) তুমি পলে!

মারিদ হাসে কম। গম্ভীরতাটায় তার স্বভাব। তাই স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই সুখের খুশি দেখে টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে বোনের ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা অল্প এঁটো মুছে দিল। রিদ দ্বিতীয় বারের মতোন মারিদের মুখে সবজি ভাত তুলে দিল। নিজেও তাই খেল। তবে তার আগে মায়ার মুখে মাছ ভাত দিল। রিদ ছেলে-মেয়ে বউকে নিজের পাশে গোল করে বসিয়ে সুন্দর একে একে সবাইকে ভালোবাসার সহিত ধীরে ধীরে খাইয়ে দিচ্ছে আবার নিজেও খাচ্ছে। রিদের যত্ন সহকারে ভালোবাসাটা সবার চোখে পড়ার মতোন। তবে এখন আর কেউ চমকায় না। কারণ রিদ রোজকার এমন করে বউ বাচ্চাদের খাওয়াতে দেখে সবাই। এতে করে হেনা খান আরাফ খান অন্তত সন্তুষ্ট রিদের উপর। যাক অবশেষে তারা পেরেছেন রিদকে সংসারী করতে এতেই অনেক। তবে তারা আরও আশায় আছেন রিদ একদিন না একদিন নিজের গ্যাংস্টার উগ্র জীবন ছেড়ে ভালো পথে ফিরে আসবে। এতো পরিবর্তন যখন হতে পেরেছে বাকিটাও হবে ইনশাআল্লাহ। আশা ছাড়লো না আল্লাহ উপর থেকে। সবাই খাওয়া-দাওয়াতে মনোযোগী তবে রাদিলে চোখে সবচেয়ে বেশি সুখের চঞ্চলতায় চোখে পড়ল। প্রচুর চঞ্চল মেয়েটা। তাই রাদিল খেতেও খেতেও বেশ কয়েক বার সুখকে বিরক্তির চোখ আওড়িয়ে দেখল। তার বিরক্ত হওয়ার কারণও আছে, এই যেমন মাংস খেতে চাচ্ছে আবার সেই মাংস দাঁতে লাগলে তৎক্ষনাৎ কেঁদে উঠছে ভয়ে, মুখে খাপ্পা(সাপ) লেগেছে বলে বলে! এতে করে মায়া বারবার দাঁত পরিষ্কার করে দিচ্ছে, আর বারবার রিদের হাত থেকে মাংস খাচ্ছে। প্রতিবার একিই ঘটনা নিয়ে খানিকটা বিরক্ত হচ্ছে রাদিল। হেনা খান ও আরাফ খানের মধ্যস্হে বসে খাওয়া পরও বেশ কয়েকবার চোখ ঘুরিয়ে ফেলেছে সুখকে। আজকাল রিদের নিজের পরিবারের প্রতি এতো ভালোবাসাটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই নেয় হেনা খান ও আরাফ খান। রিদ নিজের ছেলে-মেয়ে ও বউকে কতটা ভালোবাসে সেটা তারা গত দশ বছরের দেখে ফেলেছেন। বিশেষ করে মেয়ের জম্মের পর রিদের মমতার প্রকাশ একটু বেশিই পাঁচ্ছে। এমন না মারিদ আদুর যত্ন সে কম করেছে। ঠিকই আদুর যত্ন করেছে। তবে মারিদ স্বভাবে গম্ভীর আর শান্ত হওয়ায় রিদ ছেলের জন্য কিছু করলেও সেটা প্রকাশ কম পেত কারণ দুজন গম্ভীর স্বভাবের তাই। কিন্তু সুখের বেলা হয় উল্টো। কাঁদবে, চিল্লাচিল্লি করবে, আবার সবচেয়ে বেশি রিদকেই জ্বালাবে তারপরও বাবাকে চাই। চাই মানে চাই। মোট কথা সুখের সবকিছুতে বাবাকেই লাগবে নয়তো এই নিয়েও সারাদিন কাঁদবে আর জ্বালাবে।
~~
তপ্ত দুপুরে ভ্যাপসা গরমের হাঁপিয়ে উঠে ধপ করে সোফার উপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ল রাদিল। দিনটা শুক্রবার হওয়ায় সারাদিনই বেট বল হাতে ছিল তার। এজন্য অবশ্য ছুটিয়ে ক্রিকেটও খেলেছে বেশ। সে একা খেলেনি সাথে ফুপাতো ভাই ইফরাদসহ সাঙ্গোপাঙ্গু হিসাবে খান বাড়ির কয়েকজন সার্ভেন্ড নিয়ে এতোটা সময় খেলায় খেলায় পার করল। মূলত আজকে সবাই খান বাড়িতেই আছে তার কারণ হলো ফিহা বাবার বাড়িতে এসেছে বিড়াতে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। এজন্য মেহেরবান সবাইকে নিয়ে খান বাড়িতে চলে এসেছে ঘুরতে। জুই বাবার বাড়িতে যাওয়া আসা করতে পারলেও মায়া যেতে পারে না কোথাও রিদের জন্য। একটা দিনের জন্যও মায়াকে কাছ ছাড়া করে না রিদ। মায়া ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে গেলেও সেটা হবে কয়েক ঘন্টার সফর। রিদ আসিফের যাওয়ার পর যেতে পারবে, আবার রিদের সন্ধ্যায় বাসা ফিরার আগে তাদের উপস্থিত থাকতে হবে। এই অল্প সময়ের জন্যও মায়া মাঝেমধ্যে বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসে সবাইকে দেখবে বলে। তাছাড়া আর কি করবে যার এমন একটা ঘাড়ত্যাড়া স্বামী থাকে তারাই বুঝে তাদের কতোটা মানিয়ে নিতে হয়। তাছাড়া খান বাড়িতে সকলের রোজকার আসা যাওয়া লেগে থাকে কারণে অকারণে। হেনা খানও মায়াদের নিয়ে আয়নের বাসায় ঘুরেফিরে আসে একদিন পরপর। দুই বাড়ির দূরত্বটাও বেশ না। পনেরো মিনিটের দূরত্ব। তাই সবার মতো যাতায়াত লেগেই থাকে রোজ। আজকেও তাই হচ্ছে! বাড়ির বড়রা সবাই বাগানে আসড় জমাতেই ছোট সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। রাদিল গরমে অতিষ্ঠ হয়ে শার্টে বুক পাশের তিনটা বোতাম খুলে দিল কাঁধে ছড়িয়ে শার্টটা। সোফায় চিৎ হয়ে শুইয়ে নিউজপেপার নিয়ে হাতে সাহায্য বাতাস করতেই সুখ কোথায় থেকে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে তার কাছে এসে দাঁড়াল। একহাতে আম জড়িয়ে অপর হাতটা দিয়ে রাদিলের কাঁধে ছড়িয়ে দেওয়া শার্টের অংশটা টেনে টেনে বলল…

—” লাদু ভাআইয়া ওঠো! লাদু ভা-আইয়া ওঠো!

সুখের অনবরত টানায় রাদিলের হাত থেমে যায় বাতাস করা থেকে। কপাল কুঁচকে সুখের ঘামন্ত লাল মুখটার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ ঘুরালো সুখের চেপে ধরে রাখা তার কাঁধে শার্টের অংশটার দিকে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসতে চাইলেই সুখ হাত ছেড়ে দেয় শার্টের সেই অংশটাকে। রাদিল সোজা হয়ে বসে আশেপাশে তাকাল কেউ আছে কিনা সেটা দেখতে। এই মেয়েকে একা পাওয়া আর দিনের বেলায় আকাশে চাঁদের খোঁজা সমান কথা। সারাক্ষণ কারও না কারও সাথে তো থাকবেই। যদি বাপ ভাই বাসায় থাকে তাহলে তো কথায় নেই! বাতি মেরেও এই মেয়েকে একা খোঁজে পাওয়া যাবে না, দেখা যাবে বাপ-ভাইয়ের নয়তো মার সাথেই আছে। আজকে তার কাছে আসা মানে নিশ্চিত কোনো কারণ তো অবশ্যই আছে। তাছাড়া বাকি সবার মতোন করে রাদিল চাইলেও সুখের সাথে আগ বাড়িয়ে বোনের সখ্যতা নিয়ে কথা বকতে পারে না। এমন কি স্বাভাবিক আচার-আচরণ করতেও জড়তা কাজ করে। কাজ করাটায় স্বাভাবিক অস্বাভাবিক কিছু না। আর তার কারণটা হলো তার পিতা মহোদয় মানে আয়ন চৌধুরী। রাদিলের জম্মের পর থেকে একটু একটু করে বড় হওয়া পযন্ত সর্বদা সে শুনে এসেছে রাদিলকে দিয়ে রিদের মেয়েকে বিয়ে করে আনবে এটা তার বাবার স্বপ্ন। রাদিলকে রোজ কয়েক বার করে শুনতে হয় নিজের বাবার সেই স্বপ্নের কথা। এতে করে রাদিলের মনে হয় তার বাবা নিজের স্বপ্নের কথা তাকে শুনাচ্ছে এমনটা নয় বরং রাদিলকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় তার জন্য মেয়ে তার বাবা ঠিক করে রেখেছে। এজন্য মূলত রাদিল চাইলেও সুখের সাথে সহজ আচারণ করতে পারে না কেমন একটা লজ্জা আর সংকোচ লাগে নিজের মাঝে। ছোট থাকতে এক ছিল। এখন সে বড় হচ্ছে ধীরে। তাই তার মাঝে সবকিছুর বুঝ একটু একটু ঢুকছে। বিয়ে মানে জ্ঞানও তার আছে। হবেই না কেন নয় বছর তো আর ছোট হয়না। অনেক কিছুই বুঝে। আর এই বুঝা থেকেই যত দ্বিধা তার। সরাসরি সুখের দিকে তাকালেও মনে হয় সবাই হয়তো তাকে অন্য চোখে দেখছে! সুখের সাথে তার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে হয়তো সবাই মিটমিট করে হাসবে, মজা করবে। এজন্য সে বরাবরই সুখকে একটু এরিয়ে চলে লজ্জা লাগে বলে। তবে লুকোচুরি ভাবে সে সুখকে কাঁদাতে পিছু পা হয়না। এই যেমন এখন করছে। অনেকটা দৌড়াদৌড়ি করে খেলার কারণে সুখ গরমের শরীর চুলকাচ্ছে বলে রাদিলের কাছে এসেছিল নিজের শরীরের জামাটা খুলে দিতে।

—” লাদু ভাআইয়া! এতা খলে দাও! আমাদ তরম(গরম) লাদে!

রাদিল কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল আসলে সুখ তাকে কি বলছে এমন ভাঙ্গাচুরা কথায়। খানিকটা সময়ে বুঝে ফেলল সুখের গরম লাগছে বলে তাকে জামা খুলে দিতে বলছে। কিন্তু বিষয়টি বুঝেও যেন অবুঝ সাজল। অন্য কেউ হলে সে এতক্ষণ কাজটি করে ফেলতো নির্দ্বিধায় বাচ্চা মনে করে। কিন্তু সুখ বলে সেটা করল না বরং আগের নেয় গা এলিয়ে ঠাস করে শুয়ে পড়ল জায়গায়। অবুঝ সুখ রাদিলের ভাবমূর্তি বুঝতে না পেরে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আবারও রাদিলের একটা হাতে টেনে ধরল নিজের জামাটা খুলে দেওয়ার জন্য। রাদিল বিরক্তি চোখ মুখ কুঁচকে তাকাল সেদিকে। তার শ্যামবর্ণ হাতে যেন সুখের আদুরী ফর্সা হাতটা একটু বেশিই ঝলঝল করছে। এতো বেশি ফর্সা মানুষ তার পছন্দ না। সে শ্যামবর্ণের মানুষ। ফর্সা বউ তার সাথে যায় না। বাবা কি দেখে এমন সাদা বিলাই তার জন্য পছন্দ করেছে কে জানে। সে কালো মানুষ তার কালো বউই পছন্দ হবে। এমন সুন্দরী বউ তার লাগবে না। যেখানে কালারের মিল নাই সেখানে আবার কিসের কি? রাদিল নিজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে চেতে উঠে অল্প ধাক্কা দিয়ে তৎক্ষনাৎ সুখের হাতটা নিজের হাতের উপর থেকে সরিয়ে ফেলতে ফেলতে বলল…

—” যাহ সর ধরবি না আমাকে বদজাত মেয়ে! তোকে বলছি আমি এতো সুন্দর হইতে? আমার এতো সুন্দরী বউ লাগবে না জানিস না। দেখ! তোর সাথে আমার গায়ে রঙটা পযন্ত মিল নেই কতো অমিল! বিয়ে ক্যান্সেল! যাহ ভাগ!

রাদিলের কথার যথার্থ অর্থ মর্ম ছোট সুখ না বুঝলেও রাদিলের মুখ বাঁকানো ধমকটা ঠিকই বুঝতে পারে যে ওকে ধমক দিচ্ছে রাদিল তাই অপমানের ঘোরে ঠোঁট ভেঙ্গে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে তৎক্ষনাৎ। রাদিল সুখের কথায় কথায় কান্নাটা আরও বাড়িয়ে দিয়ে সুখের হাতে থেকে আমটা ছিনিয়ে নিয়ে তাতে কামড় বসাতেই সুখ অপমানে কষ্টে ছোট দু’হাতে চোখ ঢেকে আরও জোরে জোরে কেঁদে উঠে দুঃখে। বাড়ির বড়রা বাগানে থাকাই আপাতত কেউ শুনল না সুখের সেই কান্না তবে ফিহা মেয়ে পরি, সুখের সাথেই দৌড়েদৌড়ি খেলছিল এতক্ষণ সেও ঘেমে-নেয়ে একাকার। সুখের কান্নায় দৌড়ে এসে পাশে দাঁড়িয়ে অবুঝ দৃষ্টিতে রাদিলকে এক পলক দেখে অপরাধী মুখ করে সুখের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এখানে বয়সে সে সবার ছোট, এমনকি সুখেরও। ভালমতো ঠিকঠাক কথা বলতেও আটকে যায় মুখে। তবে সবার আদুরের। রাদিল ভাইয়া তাকে একটু বেশিই আদুর করে বোন হিসাবে। এখান রাদিল যদি পরির বান্ধবীকে কাঁদায় তাহলে সে কি করবে? রাদিল আমে কামড় বসাতে বসাতে দেখল পরিও সুখের মতো করে ঘেমে শরীর চুলকাচ্ছে বারবার। রাদিল নিজের আম খাওয়ার রেখে আদুরে হাতে পরিকে নিজের কাছে টেনে যত্ন করে ফ্লকটা খুলে দিতে চাইলে সেখানে উপস্থিত হয় মারিদ বোনের কান্নার শব্দ শুনে। রাদিলকে এক পলক দেখে সুখের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বোনকে কোলে নিয়ে ফের রাদিলের পাশে সোফায় বসতে বসতে গম্ভীর মুখে বলল…

—” কি করেছিস ওকে? কাঁদছে কেন?

রাদিলের তৎক্ষনাৎ উত্তর…

—” আমি কেন কিছু করতে যাব? তোর বোন এমনই কাঁদতে পারে! কাঁদার মাস্টার! এই পরি ভাইয়া কিছু করেছি তোমার বান্ধবীকে?

পরি অবুঝ মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায় যার অর্থ রাদিল কিছু করেনি। সত্যি রাদিলকে কিছু করতে দেখেনি সুখের সাথে পরি। মারতেও দেখেনি। বকাও দেয়নি! এমনই কাঁদছে সুখ এমনটায় লাগল পরির। মারিদ পরির অবুঝ চোখে মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে বোনকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে সুখের গায়ের ঘামে ভেজা উপরের ফ্লকটা খুলে দিতে দিতে বুঝল সুখের কাঁদার কারণটা হলো তার আম রাদিলের মুখে। মারিদ চোখ পাকিয়ে রাদিলের দিকে তাকাতেই রাদিল দারুণ হাসল। তার এই হাসিটাই যেন মানুষের মন বুলাতে সক্ষম। মারিদও কিছু না বলে সুখকে কোলে নিয়ে গেল কিচেন। ফ্রিজ থেকে নতুন একটা আম নিয়ে সুখের হাতে দিতেই দেখল পরিও দাঁড়িয়ে আছে সুখের সাথে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে। দুজনের গায়েই সাদা সেন্টু গেঞ্জি পড়া। মারিদ পরির হাতে একটা আম তুলে দিতেই দুই বোন ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে চলে যায় বাড়ির বাহির বড়দের কাছে।
~~
মারিদের বর্তমান রুমটা হলো মায়ার আগের রুমটা। রুমের নতুন করে ডেকোরেশন করা হয়েছে মারিদের পছন্দে। মারিদ মা-বাবা ছাড়া রাতে একা ঘুমাই আজ বিগত পাঁচ বছর হলো। পাঁচ বছর বয়সে মারিদের সাথে রাতে সঙ্গ দিয়ে ঘুমাতো হেনা খান ও আরাফ খান। তবে মারিদের একটু বড় হওয়ার পর থেকেই সে একা ঘুমাইতে চায়। এখনো একাই ঘুমায়। তাকে কেউ ডিস্টার্ব করে না। এইতো কাল বাদে পরশু তার নবমতম জন্য দিন। দেখতে দেখতে নয় বছরে পা রেখে ফেলেছে সে। সেই সাথে গম্ভীরতাটাও যেন একটি বেশিই প্রকাশ পাচ্ছে তার আচরণে। এতে করে অবশ্য মায়া বেশ চিন্তিত। ছেলের এমন আচরণে রিদের স্বভাবই প্রকাশ পায় বলে মায়া ভয়ে থাকে বাবা মতোন না ছেলেও উগ্রবাদী জীবনে চলে যায়। মায়ার শত চিন্তাটাও রিদ কানে তুলে না। আবার ছেলেকেও কিছু বলে না। কি বলবে? ছেলের অপরাধ খুঁজে পেলেতো কিছু বলবে? গম্ভীর শান্ত থাকা কোনো অপরাধ নয়। এখন অপরাধ না থাকলে শুধু শুধু ছেলেকে কি শাসন করবে সে। রিদের এক কথা ছেলে যদি কাউকে পছন্দ হয় তো কথা বলবে, আর না হলে কথা বলবে না ব্যস শেষ। এখানে জোরাজোরি বা চাপ প্রয়োগ করে কেন অন্যের সাথে মিশতে ছেলেকে বাধ্য করবে? রিদের স্বভাবও তো এমন না। রিদ নিজেই তো এমনটা করে। সে এখনো দাদা-দাদি বউ, ছেলে-মেয়ে ছাড়া অন্য কাউকে আপন মনে করতে পারে না। করেও না। তাদের স্বভাবই এমন। এখন সেইম স্বভাবের জন্য ছেলেকে কি দোষ দিবে সে? তারা নিজেরা বুঝে কতটা সুখী তারা নিজেদের সাথে। বাকিদের সমস্যা হলেও তাদের নিজেদের নিয়ে নিজের কোনো সমস্যা হয়না। বাকি রইল ভালোবাসা আর বিয়ে তো রিদের একটায় কথা, ছেলের জীবনে চলার পথে যদি কাউকে ভালো লাগে তো লাগল নয়তো সে কিছু বলবে না এই বিষয় নিয়ে৷ কারণ সে নিজে বুঝে তার স্বভাবে মানুষদের বলে কিছু কোনো কালেই করানো সম্ভব নয়। তাদের মনের টান অনুভব করলেই করবে নয়তো দুনিয়া উল্টে গেলেও কিছু করা সম্ভব না। এজন্য মূলত রিদ মায়ার কোনো কথায় কানে তুলে না। আসলে সে ছেলের উপর চাপ প্রয়োগ করতে চায় না অবুঝের মতোন। স্বভাবে তার ছেলে যেমনই হোক না কেন? অন্তত এতটা শিওর তার ছেলে মেয়ে জাতিকে কখনো অসম্মান করবে না। মারিদ যেমন নিজের মাকে সম্মান করে বাকিদের করবে। কিন্তু অধৈর্য্যে মায়া রিদের কথা গুলো বুঝতে চায় না। ছেলেকে প্রাণবন্ত জীবনে রাখতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেই থাকে। মেয়েকে নিয়েও মায়ার এতোটা টেনশন নেই যতোটা টেনশন সে ছেলের জন্য করে।

রাত আটটা! মারিদ নিজের রুমে পড়ার টেবিলে বসে মনোযোগ সহকারে স্কুলের হোম ওয়াক শেষ করে উঠে দাঁড়াল। শরীর ম্যাচম্যাচ করছে তার। বিকাল থেকে টানা পাঁচ ঘন্টা পড়া টেবিলে বসা সে। এর মধ্যে মায়া, হেনা খান বেশ কয়েকবার তাকে শুকনো খাবার দিয়ে গেছে। কিছু খেয়েছে আর কিছু আবার এমনই পড়ে আছে টেবিলে। মারিদ সেই গুলো রেখে উঠে দাঁড়াল। আপাতত বাহির থেকে একটু ঘুরে আসবে তারপর আবার পড়তে বসবে এমনটা ভেবেচিন্তে গায়ে কুচকে থাকা সবুজ টি-শার্টটা টেনে বের হলো রুম থেকে। পড়নে তার বাদামী রঙ্গা থ্রি কোয়াটার প্যান্টের সাথে সবুজ রঙ্গা টি-শার্ট। দেখতেও বেশ মানিয়েছে হলুদ বর্ণের ফর্সা শরীরে। লম্বা চওড়া যেন তরতর করে বাড়ছে দিন বা দিন চোখে লাগার মতোন। মারিদ রুম থেকে বের হয়ে সামনের করিডোর ধরে এগোতেই দেখতে পেল পরি উপরে সিঁড়ি গোড়ায় দাড়িয়ে আছে নিচের দিকে ভয়ার্ত মুখে তাকিয়ে থেকে। মারিদ সেদিকে এগোতেই পরি মারিদের উপস্থিতে বুঝে ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে এসে মারিদের হাতের আঙ্গুল চেপে ধরে আদো আদো ভাষায় আওড়ায়…

—” আম্মু যাব মাদু ভাআইয়া।

মারিদ কপাল কুঁচকে তাকায় উরু সমান পরির দিকে। তার সুন্দর নামটা ভেঙ্গে বলাতে পছন্দ হয়নি তাই পরিকে শুধরিয়ে বিরক্ত গলায় ঝেড়ে বলল…

—” ইট’স নট এ মাদু! ইটস মারিদ।

মারিদের শক্ত গলার ইংরেজিটা বুঝতে না পেরে ঘাড় উঁচিয়ে ড্যাবড্যাব করে মারিদের দিকে তাকিয়ে থাকল পরি। মারিদকে তার ভিষণ পছন্দ। বিশেষ করে সবসময় মারিদ তাকে পছন্দ খাবার দেয় বলে এজন্য। বাচ্চাদের স্বভাবই তাদেরকে যারা আদুর করে পছন্দের খাবার দিবে, বাচ্চারা তাদের সাথেই মিশতে চায়। মারিদের ক্ষেত্রেই ও তাই। মারিদ পরিকে খাবার দেয় এজন্য পরির অনেক পছন্দ তার মাদু ভাইয়াকে। কিন্তু মারিদ ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। সে ইচ্ছা করে বা নিজ থেকে পছন্দ করে পরিকে কখনো কোনো খাবার দেয়নি বরং মারিদ বোনকে কোনো কিছু দেওয়ার সময় সুখের পাশে পরি থাকতো বলে সেই ক্ষেত্রে পরিকেও দেওয়া হতো তার ব্যস এতটুকুই। কিন্তু পরি বাচ্চা মন মারিদের সানিধ্য পছন্দ করে প্রায় ঘুরেফিরে মারিদের কাছে চলে আসে খেলতে। মারিদ তখনো কিছু বলে না পরিকে বাচ্চা বলে। তবে সে নিজের কাছেও রাখে না পরিকে। কাউকে না কাউকে ডেকে পরিকে তাদের কাছে ধরিয়ে দেয় কাছে রাখতে চায় না। এখনো তাই। পরি মারিদ বিরক্তি ফেসটা বুঝতে না পেরে ঘাড় উঁচিয়ে মারিদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল…

—” আম্মু যাব! তলো না মাদু ভাআইয়া।

পরির মুখে বারবার নিজের নামটা ভেঙ্গে বলতে দেখে বিরক্তি খানিকটা চেতে উঠে মারিদ তৎক্ষনাৎ মৃদু স্বরে ধমক লাগায় পরিকে। এতে করে বাচ্চা পরি ভয়ে চমকে উঠে মারিদের হাত ছেড়ে মূহুর্তেই কেঁদে উঠে গগন কাঁপিয়ে। মারিদকে সচারাচর আজ পযন্ত কেউ রাগতে দেখেনি। তাই তার রাগটা কতটুকু কারও জানাও নেই। বড়জোর মারিদ নাখুশ হয়ে বিরক্ত হয়। তারপর কাউকে তেমন একটা কিছু বলে না। তবে এখন পরিকে যে বেশ জোরে ধমক দিয়েছে তেমনটা নয়। ধমকটা আস্তেই দিয়েছিল কিন্তু পরির বাচ্চা মানুষ সেটা নিতে না পেরে কেঁদে উঠে জোড়েসড়ে। পরির কান্নায় মায়া নিজের রুম থেকে ধড়ফড়িয়ে দৌড়ে বের হয়। মায়ার পিছন পিছন জুই, হেনা খান, মেহেরবানও বের হয় একত্রে। তারা মূলত সবাই একত্রিত ছিল। মায়া পরিকে কাঁদতে দেখে দৌড়ে এসে ওকে কোলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে মারিদের কাছে জানতে চাইল পরি কাদছে কেন? মারিদ সত্যিটাই বলল নিজের মাকে। মায়া মারিদের সামান্য বিষয়ে পরিকে ধমক লাগানোটা পছন্দ হয়নি বলে সেও ছেলেকে কর্ড়া গলায় শাসন করতে চাইলে মারিদ স্পষ্টভাষায় জানায়…

— আই ডোন্ট লাইক হার আম্মু। ওহ সঙ্গ আমার পছন্দ না। ওকে বলো আমার কাছে আর না আসতে তাহলে আমিও ওকে আর ধমক দিব না।

ছেলের কথায় মায়া শাসন করবে কি? দুঃখ কষ্ট জর্জরিত হয়ে আরও চিন্তায় পরে গেল। এতটুকু ছেলে বলে মেয়ে সঙ্গ পছন্দ না৷ এই ছেলে যে বড় হয়ে বিয়ে করতে চাইবে না সেটা এখনই বুঝতে পারছে মায়া। সামান্য বাচ্চা মেয়ে পরির সঙ্গটাই নিতে পারল না? সেদিন রাতে দেখা গেল এই বিষয় নিয়ে মায়া রিদের সাথে সারারাত কান্নাকাটি করেছে। ছেলে ওর বিগড়ে যাচ্ছে বড় হতে হতে। ছেলে যদি রিদের মতো নারীবিদ্বেষী হয় বড় হয়ে তাহলে তো মায়া শেষ। ত্যাড়া স্বামীকে যেমন তেমন সংসারী করে নিল মায়া। কিন্তু ছেলেকে সে কি করবে? কোথায় পাবে তার মতোন ছেলের বউ যে শত কিছুর পরও মারিদকে ছেড়ে যাবে না। মায়া চিন্তায় চিন্তায় সেদিন রাতটা পার করলেও পরদিন দুপুর বেলায় যেন মায়ার চিন্তাটা আরও শতাংশ ভাগ বাড়িয়ে দেয় মারিদ। যখন মারিদ স্কুল থেকে মারামারি করে বাসায় ফিরে গাড়ি ছাড়া একা একা তখনই যেন মায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পরে গুছানো ছেলের এলোমেলো অবস্থা দেখে। মায়া যে ছেলেকে আজ পযন্ত রাগ করতে দেখেনি। সেই শান্ত ছেলের ভয়ানক রাগ দেখে দিশেহারা মায়ার অবস্থা নাজেহাল। হেনা খান মারিদকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে উদ্বিগ্ন সহিত দেখতে লাগল মারিদের শরীর কোথায় কোথায় ব্যথা পেয়েছে চেক করতে। তিনি দেখলেন মারিদের হাতে, কপালের জায়গায় জায়গায় কাটাছেঁড়ার রক্তের দাগ! উদ্বিগ্নতায় হেনা খানও মারিদ থেকে জানতে চাইল এমন মারামারি করার কারণটা কি? তখনো মারিদ স্পষ্টভাষী হয়ে রাগে চোখ মুখ শক্ত করে জানায়.. ” রিদকে তার স্কুলে একটা ছেলে গুন্ডা বলেছে বলেই সে মারামারি করেছে। বাবা তার ভালোবাসার মানুষ। বাবাকে নিয়ে কথা বললে সে চুপ থাকবে না।
মারিদের এতটুকু কথায় মায়াও নিজের রাগ সংযম করতে পারল না। অনেকটা রেগে ছেলেকে শাসন করে বলল…
” তোর বাবা গুন্ডামী করতে পারবে আর কেউ বলতে পারবে না সেটা? বললেই তোরা তাদের মারতে যাবি? দেশটা কি তোদের নামে লেখা? নাকি বাকি সবাই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা থাকে কোনটা?
মারিদ বরাবরই মায়ের কথায় চুপ থাকল। সে মার সাথে বেয়াদবি করে না। তবে মার কথাটাও পছন্দ হয়নি। বাবা-মাকে নিয়ে কেউ কথা বললে কাউকেই ছাড়বে না সে। এবার যা হওয়ার হোক। এমন মারামারি দরকার পরলে শতবার করবে। মারিদ মার কথায় প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে নিজের রুমে চলে যায়। সারাটা দিন রুমের দরজা আটকিয়ে বসে রইল। কারও হাতে ড্রেসিং পযন্ত করলো না। এমনই রইল। মায়া মারিদের মারামারি ঘটনাটি কেঁদেকুটে রিদকে জানাল তৎক্ষনাৎ। রিদ সবটা শুনেও মায়াকে কিছু বল না বলে এতেও মায়া কেঁদেকুটে রুমের দরজা আটকিয়ে বসে রইল খাবে না বলে। রিদের উপর মায়ার বেশ রাগ। কেমন বাবা? ছেলে বিগড়ে যাচ্ছে বাবা হয়ে রিদ কিছু বলছে না। ছেলেকে শাসন না করে চুপ বসে থাকলে হবে? মায়ার ছেলেটা আরও বিগড়ে যাবে না। এই বয়সেই মারামারি করে বাসায় ফিরল তারমানে মায়ার ভয়টায় ঠিক হতে যাচ্ছে। এই ছেলে বড় হয়ে বাবার মতোন উগ্রবাদীর জীবন বেচে নিবে এতে কোনো সন্দেহ নাই। তাছাড়া হেনা খানও তো মায়াকে বলে, রিদ নাকি ছোট বেলায় এমনই ছিল, বাবা-মা বলতে পাগল ছিল। সবমসময় তাদের কথায় শুনতো। এতো শুনার পরও তো রিদ এমন উগ্র জীবন লিড করছে। মায়ার ছেলেও তো বাবা-মা বলতে পাগল। তারমানে মায়ার ছেলেও বড় হয়ে এমন হবে? মায়া ফের কাঁদে কষ্ট। ছেলেকে যেকোনো মূল্যেই হোক কারও সাথে বাধ্যতে হবে। এতো সহজে যে হার মানবে না। স্বামী বেলায় যখন হার মানেনি সেখানে ছেলের বেলায় তো হার মানার প্রশ্নই উঠে না। রিদের সাথে যেমন করে মায়ার বিয়ে দিয়েছিল ছোট বেলায়। ঠিক তেমন করে মায়াও মারিদের সাথে কারও বিয়ে দিয়ে দিবে। ভালোবাসা জোর করে হয়না। তবে সম্পর্কে আটকা পরলে ভালোবাসা এমনই হয়ে যাবে। তাছাড়া বিয়ে এখন হয়ে থাকলে সংসারটা তো হবে ছেলের বড় হওয়ার পরই। অন্তত মায়ার পছন্দ কথা ভেবে হলেও মারিদ নিজের বউকে নিয়ে ভাববে একটু করে হলেও। মায়ার এতেই চলবে। রিদ বাড়িতে আসল মায়ার ফোন পাওয়ার একটু পর পরই। সংসারী জীবনে টেনশনটা এবার সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। রিদ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আশেপাশে তাকাল শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে। পাশাপাশি রুম দুটোর বন্ধ দরজা দেখে বুঝতে পারল মা-ছেলে মান অভিমানের বিষয়টি। রিদ নিজের রুমের বন্ধ দরজার দিকে এক পলক তাকিয়ে গেল ছেলের দরজা সামনে। মারিদের নাম ধরে দরজায় একটা টুকা দিতেই বাধ্য ছেলের মতোন মারিদ দরজা খুলে দেয়। রিদ ভিতরে প্রবেশ করে। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ছেলের হাতে কপালে শুকনো কাটা জায়গায় গুলো দেখে ড্রয়ার থেকে ফাস্টেড বক্স নিয়ে যত্ন সহকারে মারিদের কাটা জায়গায় গুলো ড্রেসিং করে দেয়। তারপর ছেলের সাথে রিদ রয়েসয়ে অনেক কথায় বলল, ছেলেকে স্বাভাবিক করে তারপর নিয়ে গেল মায়ার কাছে। মা-ছেলের অভিমানও ভেঙ্গে গেল অল্প সময়ের মধ্যে। কিন্তু তার মধ্যে মায়া জোরে দিল নতুন আবদার। মারিদকে বিয়ে দিবে সে। মায়ার প্রথম কথাতে রিদ অবুঝের মতো রিয়েক্ট করেনি ছেলের সামনে। বরং চুপ থেকে ছেলেকে রুমে পাঠিয়ে রিয়েক্ট করলো। মারিদ ছোট! এই বয়সে সে বিয়ে দিবে না। কিন্তু অধৈর্যের মায়া নিজের পক্ষের যুক্তি দেখাল রিদকে একের পর এক। রিদের স্বভাব পেয়েছে মারিদ। তাই এই বয়সে মারিদ যতোটা কথা তাদের শুনবে বড় হয়ে হয়তো ততটা কথা নাও শুনতে পারে। তখন যদি মায়ার ছেলে নারীবিদ্বেষী হয় তাহলে বিয়ে করানো মুশকিল হয়ে যাবে। আর এখন যদি মায়া মারিদের বিয়ে দিয়ে রাখে তাহলে হয়তো নারীবিদ্বেষী ভাবটায় তেমন জম্ম নিবে ছেলের মনে। তাছাড়া রিদকে তো ছোট বেলায় বিয়ে দিয়েছিল মায়ার সাথে। তাহলে মায়া মারিদের সাথে অন্যায় করছে কোথায়? রিদ মায়ার সবকিছুই বুঝল তারপর মায়ার সাথে সহমত পোষণ করল না। বিয়েটা ব্যক্তিগত ইস্যু। অকারণে ছেলের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়াটাও ঠিক না। এজন্য রিদ মায়ার আবদার প্রথম মানতে পারল না। এতে করে মায়া সারারাত না ঘুমিয়ে কেঁদেকুটে রিদকে জ্বালিয়ে রাজি করায় মারিদের বিয়ে জন্য। রিদ অনেক ভেবে চিন্তে রাজি হয়। কিন্তু এখন ছেলের জন্য মেয়ে কোথায় পাবে মায়া? এই নিয়ে আরেক টেনশন! অনেক খুঁজে খুঁজে মায়া চোখে পরিকে পরল। মায়ার ধারণা তাদের বংশের মেয়েরা স্বামী সোহাগী হয়। আর যায় হোক অন্তত স্বামী পিছন ছাড়ে না তারা। খুশিতে আটখানা মায়া সবাইকে সেকথা জানাতে তেমন কেউ অমত পোষণ করল না মায়ার প্রস্তাবে। মারিদকে ছেলে হিসাবে সবারই পছন্দ। বিশেষ করে ফিহার একটু বেশিই পছন্দ এমন বুঝদার ছেলেকে কে না চায় মেয়ের জামাই হিসাবে। কিন্তু এতো ছোট বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতে মন নারাজ ছিল প্রথমে, তাই মায়া হেনা খানকে দিয়ে অনেক করে বুঝাল ওদের বড় হওয়ার পর পুনরায় বিয়ে দেওয়া হবে পারিবারিক ভাবে। এখন শুধু ইসলামিক নিয়মে বিয়েটায় হয়ে থাকবে। মায়ার কথায় সবাই রাজি হলো, সবকিছু ঠিকঠাক করা হলো। ঘরোয়ালো ভাবে বিয়ে আয়োজন করল মারিদের জন্মদিনের এক সাপ্তাহ পরে। মায়া এক সাপ্তাহ লেগেছে মারিদকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভাগে আনতে বিয়ের জন্য। সবটা পারিবারিক ভাবেই বিয়ের আয়োজন করা হলো খান বাড়িতে। সেখানে উপস্থিত হলো হেনা খানের দুই কন্যার পরিবার থেকে শুরু করে মায়ার পরিবারসহ। ছোট পরি লাল টকটকে ফ্লক পরে দু’হাত ভরতি চকলেট নিয়ে বাবা কোলে বসা। রিদ ছেলের বিয়ের জন্য আজ অফিসে যায়নি। বাসায় ছিল। অর্ধেক রেডি হয়ে বসে আছে মায়ার জন্য। তাড়াহুড়োয় মায়া রিদের পায়ে মোজা বের করে দিয়ে যায়নি। সে থেকে রিদ বসে আছে মায়ার অপেক্ষায়। বাবা পাশে সুখও নীল ফ্লকে, নীল জুতা, মাথায় নীল ব্যান পড়ে বসে আছে হাতে আম নিয়ে। একবার বাবাকে দেখছে তো অন্যবার বাবার মতোন করে দরজার দিকে তাকাচ্ছে কপাল কুঁচকে। রিদ অনেক বিরক্তর সহিত চেচিয়ে মায়াকে ডাকল’ রিত! রিত! করে। বাবার দেখাদেখি সুখও তেমন করেই ডাকল ‘ লিত! লিত! বাবা-মেয়ের ডাকাডাকিতে মায়া তাড়াহুোড় রুমে আসল। গায়ে ওর নীল রঙ্গের জামদানী শাড়ি রিদের শার্টের সাথে মিল রেখে। মূলত মায়া এতক্ষণ মারিদকে রেডি করছিল অনুষ্ঠানের জন্য তাই দেরি হচ্ছিল। মায়া ঠোঁট ভরতি হাসি নিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই দেখল রিদ তখনো পুরোপুরি রেডি হয়নি মায়ার জন্য বসে আছে সে। মায়া দ্রুততা সঙ্গে হাত চালিয়ে মোজা জোড়া এনে রিদের পায়ে কাছে বসতেই, সুখও বিছানার উপর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে মায়ের মতোন করে রিদের খালি পা-টার সামনে বসে অপর মোজা নিয়ে বাবাকে পড়ানোর চেষ্টা করলো মায়ার দেখাদেখি লক্ষ করে। রিদ হাসে মেয়ের কান্ডে! রোজই এমন করে মার দেখাদেখি বাবার কাজ গুলো করতে চায় সুখ। অন্যদিন মায়া বাঁধা দেয় না মেয়েকে। কিন্তু আজ মায়ার দেরি হচ্ছে বলে তাড়াহুড়োয় মেয়ের হাত থেকে মোজাটা টেনে নিতে চাইলে কেঁদে উঠে সুখ বাঁধা দিয়ে বলে!
–” আম্মু আমি! আমি! আমি দাও!

মায়া দিতে না চাইলে রিদ বাঁধা দেয়। মেয়ের হাতে অপর মোজাটা তুলে দেয় পড়ানোর জন্য। রিদ ধৈর্য নিয়ে বসে রইল মেয়ের জন্য। সুখ এলোমেলো ভাবে অনেক বার চেষ্টা করলো বাবাকে মোজাটা পড়াতে কিন্তু ছোট মানুষ হওয়ায় তা করতে সফল হলো না। অবশেষে রিদ মেয়ের হাত ধরে নিজে নিজেই মোজা পায়ে পরে নিয়ে সুজ পড়ে সুখকে কোলে নিয়ে বসে মায়ার দিকে তাকাল। মায়া তাড়াহুড়ো করে চুল ঠিক করছে। বাড়িতে মেহমান চলে এসেছে সে কোনো রকম শুধু শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে ছিল তখন চুল ঠিক করার সময় পযন্ত পায়নি। সুখ মার বিশাল বড় চুলের দিকে তাকিয়ে থাকল বেশ সময় নিয়ে। মায়ার চুল আগে থেকে আরও বড় হয়েছে বিগত বছরে। এবার তো হাটু ছেড়ে ফ্লোরের গড়িয়ে পরে মায়ার চুল। সুখ বাবার কোলে বসে মায়ার বিশাল বড় চুল দেখে হঠাৎ ঘাড় উঁচিয়ে রিদের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ার দিকে ছোট আঙ্গুল তাক করে বলে…

—” আম্মুর ততবলো(কতবড়ো) তুল(চুল)!

রিদ হাসে মেয়ের নাক টিপে বলে…

—” আমার সুখের চুলও অনেক বড়।

বাবার কথায় খুশি হয়ে গেল সুখ। নিজের কাঁধ সমান সিল্কি চুল গুলো আদো আদো হাতে নাড়িয়ে হেসে কুটি কুটি হয়ে রিদকে দেখাতে দেখাতে বলে…

—” আমাল তুল ততবলোঅঅ! (আমার চুল কত্তবড়)
~~
যথাযত আয়োজনের সঙ্গে বিয়ে পড়ানো হলো মারিদের সাথে পরির। মারিদ সুন্দর ভাবেই কবুল বলেছে স্বভাবগত গম্ভীর মুখে। কিন্তু বিপত্তি বাজল পরির বেলায়। সে কবুলের জায়গায় বারবার তবুল বলছে। প্রথমবার মায়া এই বিষয়টি ঠিক করে দিয়েছিল। কিন্তু পরের বার আর ঠিক করে দেয়নি। বাচ্চা মানুষ কবুলের জায়গায় তবুল বলবে এটাই স্বাভাবিক। বড়দের সম্মতিতে সুন্দর ভাবেই বিয়েটা শেষ হলেও মারিদ কপাল কুঁচকে অনেকেটা সময় আদলে পরির মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার অবশ্য দুটো কারণ আছে। প্রথমটা হলো পরির কবুলের জায়গায় তবুল বলাটা পছন্দ হয়নি। দ্বিতীয়টা হলো পরি দেখতে অনেকটায় তার মার মতোন। একিই বংশ আর রক্ত বলে হয়তো একে অপরের চেহারাটা টানে। মারিদ আগে লক্ষ করলেও এতোটা মনোযোগ দেয়নি এই বিষয়ে কিন্তু আজ যেন বিষয়টি একটু বেশিই চোখে পড়ল তার। কিন্তু সেটাও দীর্ঘ স্হানীয় করতে পারল না লজ্জায় আর জড়তার জন্য, স্বভাবিক নেয় দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিল তখনই। মারিদের বিয়ের শেষ হতে হতে বেঁকে বসল আয়ন তার ছেলেকেও আজকে বিয়ে দিবে বলে। এতক্ষণ যাবত সে মারিদের বিয়ে শেষ হবার অপেক্ষায় ছিল। বিয়ের কাজ শেষ হতেই এবার সেও জোড় তালে লাফিয়ে উঠে সুখের সাথে তার ছেলের বিয়ে নিয়ে। এতে সবাই আপত্তি জানাতে চাইলে সে জানায় সুখের সাথে যেহেতু রাদিলে জম্মের আগে থেকেই বিয়ে ঠিক করা তাহলে এখন বিয়ে দিতে সমস্যা কোথায়? তাছাড়া রিদ যে ত্যাড়া মানুষ মারিদ বিয়ে নিয়ে ঝামেলা না করলেও মেয়ের বিয়ে নিয়ে ঝামেলা করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? তার ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে না বলে যদি পরে বেঁকে বসে তো? আয়নের কথা সত্যি প্রমাণ করে রিদ সত্যি সত্যি বেঁকে বসল মেয়ে বিয়ে দিবে না বলে। এমন ভাবে বেঁকে বসল যে, সে কারও মুখেই মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথা শুনতেও ইচ্ছুক নয়। মারিদকে নিয়ে মায়ার টেনশনে বিষয়টি নাহয় রিদ বুঝল। কিন্তু তার মেয়ে? রিদের মেয়ে তো একদম বাবার মন মতোন হয়েছে। তাকে নিয়ে রিদের কোনো টেনশন নেই। বরং রিদের মেয়ে যদি চায় সারাজীবন বিয়ে না বসতে বাবার কাছে থাকবে বলে, তাতেও রিদের আপত্তি নেই। তারপরও রিদ এখন মেয়ের বিয়ে দিবে না। রিদ রেগে মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠে যেতে চাইলে বাঁধা দেয় আয়ন। সেও হার মানার পাত্র নয়। ছেলের বউ বলে কথা। এমনই তো ছাড়া যাবে না। রিদের সাথে ছেলের বউ নিয়ে যুদ্ধ হবে এমনটা সে পূর্ব থেকেই ধারণা করে রেখেছিল। এখন তো তাই হচ্ছে। তাহলে ভয় কিসের? আয়ন জোর খাঁটিয়ে রিদের কাঁধ চেপে সোফার সাথে ঠেসে ধরে বাঁধা দিতেই সুখ বাবার কোলে থেকে ভয়ে কেঁদে উঠে এই বুঝি আয়ন সুখের বাবাকে মারতে চাচ্ছে এই ভেবে, ভয়ে সুখ দু’হাতে রিদের গলা জড়িয়ে মুখে গুজে চিৎকার করে কেঁদে উঠে। মেয়ের কান্নায় রিদ সুখের পিঠে হাত বুলিয়ে আদুর করে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আয়নকে চোখ রাঙ্গিয়ে শক্ত গলায় বলল…

—” আয়ন ছাড়! ওহ ভয় পাচ্ছে!

—” ছেড়ে দিব! আগে মেয়ের বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাহ।

—” দেখ আয়ন! আমি অমত করছি না। তবে আমার মেয়ে বড় হোক তারপর ওর সম্মতি নিয়ে বিয়ে দেব। এখন ছাড়।

রিদের কথা আবারও অসম্মতি প্রকাশ করল আয়ন। অধৈর্যর গলায় শুধিয়ে বলল…

—” একদম না! তোর ভোটকা মারা কথার চল-চাতুরী আমি বুঝি না বুঝি? আমাকে বোকা বানানো সম্ভব নয় আপাতত। ছেলের বউ আজকে আমি কমফার্ম করেই যাব। দেখ! তোর কাছে এমনই আমি অনেক ঋণ পায়। মনে নেই, তোর বাসর ঘরে আমি কতো উপকার করছিলাম হ্যাঁ? এখন তার সুদ আসলে ফিরত দেয় নিজের মেয়েকে আমার ছেলের কাছে বিয়ে দিয়ে। নয়তো ছাড়াছাড়ি নাই। তুইও এখানে আমিও এখানে। সারাদিন ধরে রাখব যতক্ষণ না পযন্ত মেয়ে বিয়ে দিবি ততক্ষণ।

আয়নের কথায় রিদ রাগে কটমট করে মায়ার দিকে তাকাল। সবকিছু মূলই তার বউ। না নাটক করে ছেলের বিয়ে ঠিক করতো আর না এতো সবকিছু হতো। রিদেরই ভুল। ছেলের জন্যও বিয়ের সম্মতি দেওয়া ঠিক হয়নি। এখন ছেলের জন্য সম্মতি দিতে গিয়ে মেয়েকে ফাঁসিয়ে দিল। তার ছেলে মেয়েকে কি বুঝা হয়ে গেছে নাকি? বড় হলে কি তাদের বিয়ে দেওয়া যেত না। এমন ছোট বয়সে কেন সে নিজের কলিজা টুকরো ছেলে মেয়েদেরকে অন্যের নামে দলিল করে দিবে? শত ছেলে মেয়ে নিজের কাছে থাকলেও অন্যের নামে দলিল করাটা তার কষ্ট লাগছে না বুঝি? বিশেষ করে মেয়ের বিয়েটা তার একটু বেশিই কষ্ট লাগছে। রিদের রাগান্বিত মুখটা দেখে আস্তে করে রিদের পাশ থেকে উঠে মায়া শফিকুল ইসলামের পাশে গিয়ে বসে পরল ভয়ে। মায়া নিজেও জানতো না এমন কিছু হবে। সেতো ছেলের ভালো করতে চেয়েছিল শুধু। এখন আয়ন যে এইভাবে বেঁকে বসলে সেটা কি মায়া জানতো? রিদ মায়ার পাশে বসা শফিকুল ইসলামের দিকেও তাকাল৷ আজ যেন রিদ গম্ভীর মুখ বসা শফিকুল ইসলামের কষ্টটা বুঝতে পারছে। সেদিন ঠিক এমন করেই তো মায়াকে রিদের সাথে বিয়ে দিয়েছিল তিনি বাঁধ্য হয়ে। তাহলে সেদিন তার কষ্টটাও ঠিক রিদের মতোই হয়েছিল। এজন্যই কি শফিকুল ইসলাম রিদকে তার সন্তান হওয়ার দোয়াটুকু করেছিল? তার কষ্টটা উপলব্ধি করার জন্য? রাদিল বাবার পীড়াপীড়িতে ভিষণ বিরক্ত। না চাইতেও সে বিয়েটা করে নিল। কিন্তু সুখের কবুলের জায়গায় বারবার ‘তবুল’ বলাতেও অনেক বিরক্ত বোধ করেছে। কিন্তু সবশেষে যেটা সুন্দর হয়েছে সেটা হলো একবার ফের তারা নতুন আত্মীয় হলো ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে। রাতে বেলায় রিদ সকলের ঝামেলা মিটিয়ে রুমে গিয়ে দেখল সুখ তখন অলরেডি বড় দোলনায় ঘুমিয়ে আছে। রিদ মায়াকে রুমে কোথাও খুঁজে না পেয়ে বুঝতে পারলো মারিদের রুমে আছে। রিদ ফ্রেশ হলো। কফি মেশিন থেকে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আজ জীবনটা অনেক সুন্দর মনে হয় তার কাছে। পাওয়া থেকে কিছু হারানোর ভয় হয় ভিষণ। বউটা তার জীবন রঙিন করে দিয়েছে প্রতিনিয়ত। সুখে সুখে ভরিয়ে তুলেছে সবকিছু। এতো ভালোবাসা পেয়ে সে দিন বা দিন আরও দূর্বল হয়ে পরছে। রিদ কফিতে চুমুক দিতে দিতে আরও কিছুক্ষণ মায়ার জন্য অপেক্ষা করেও যখন দেখল মায়া আসছে না তখন বিরক্তি নিয়ে সেও গেল মায়ার খোঁজে। প্রথমে গেল ছেলের রুমে গিয়ে দেখল মারিদ ঘুমিয়ে পড়েছে আর মায়াও রুমের কোথাও নেই। মায়াকে ছেলের রুমে না পেয়ে রিদ ফের গেল কিচেনে দিকে, সেখানে গিয়ে মায়াকে ঠিকই পেল। হাতে কাজটা সাড়ছে সে। রিদকে অপেক্ষা করিয়ে মায়ার মেহমানদারিটা রিদের পছন্দ হয়নি। তাই অনেকটা রেগেই এগিয়ে গিয়ে আচানক মায়ার হাত টেনে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে…

—” তোমাকে একদিন বলেছি না? আমি বাসায় থাকলে তোমার কাজ করা নিষেধ! আমার কথা কানে যায় না? আমাকে অপেক্ষা করিয়ে কিসের কাজ তোমার? সার্ভেন্ডরা কোথায়?

রিদের কথায় মায়া বলে…

—” আসলে বাসায় সবার জন্য একটু নাস্তা বানাচ্ছিলাম। আপনি রুমে যান। আমি আসছি পাঁচ মিনিট লাগবে আর! প্লিজ রাগ করবে না। এখনই চলে আসবো প্লিজ!

রিদ রাগ চেপে চলে গেল সেখান থেকে। বেয়াদব বউটারে এতো বছরেও একিই জিনিস বলেও ঠিক করতে পারেনি। আর ঠিক হবে কিনা কে জানে?

মায়া মারিদকে এক পলক দেখে নিয়ে রুমে এসে খালি বিছানাটা দেখে বুঝতে পারল রিদ বারান্দায় আছে। তাই আস্তে করে রুমের দরজাটা লক বারান্দায় যেতেই রিদ মায়ার উপস্থিত বুঝে পিছন থেকে মায়ার হাত টেনে সামনে এনে মায়ার কমড় জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুঁতি ঠেকিয়ে ঝুকে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলে…
—” আজও আমার উপরে তোমার কাজটায় থাকল। তোমার কাছে আমার গুরুত্বটা সবসময় পরে থাকে কেন রিত?

রিদের চাপা অভিযোগের কারণটা মায়া বুঝতে পেরে সামনে দিকে ঘুরে রিদের পেট জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখতে রাখতে মায়া বলে…

—” আপনার থেকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণ আমার জীবন কখনোই কিছুই ছিল না মিস্টার ভিলেন। সর্বদা আমার আপনি ছিল প্রথম প্রায়োরিটি। আমার এতো যুদ্ধ, এতো কিছু শুধু আপনার জন্য। আপনাকে নিজের কাছে বাঁধতে চায় বলে আমার এতো যুদ্ধ করে সন্তানদের জম্ম দেওয়া। আপনি আমাকে সবসময় বলতে না যে, আপনাকে দিয়ে আমার কেন হয়না? কেন আমার সন্তানদের লাগবে? আসলে আমার আপনাকে দিয়ে হয় কিন্তু আপনি আমার হয়ে থাকতে চান না বলেই আমার সন্তানদের জম্ম দেওয়া। আপনি আমাকে বিয়ে করেও উগ্রবাদী জীবন ছাড়েননি। নিজের জীবনের মায়া না করে ঝুকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পরতেন অনাহেষে। দিনের পর দিন আমাকে ছাড়াও একা থাকতে পারতেন দেশের বাহিরে। এজন্যও মূলত আমি বারবার সন্তান নেওয়া চেষ্টা করেছি। সফল হয়েছি আজ। কারণ আজ আপনি আমাদের ছেড়ে একরাতের জন্যও কোথাও যেতে চান না। আপনার দিনটা শত ব্যস্ততায় কাটলেও আমাদের জন্য সময় বের করেন আপনি। কারণ আপনার ভালো লাগে না নিজের ছেলে-মেয়েকে ছাড়া। আর এটাই আমার সব থেকে বড় পাওয়া। আগে আপনার কথা ছিল ‘ জীবনের চলা পথে সংঘর্ষে মৃত্যু আসতেই পারে সেটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু এখন আপনি সকল সংঘর্ষ পেরিয়ে নিজেকে সেইফ রাখতে চান আমাদের জন্য। কারণ এখন আপনার দূর্বলতা বেশি তাই দায়িত্বটাও বেশি। আপনি জীবনের মায়ার পরে গেছেন সন্তানদের সানিধ্য পেয়ে। এজন্য আপনি সন্তানদের জন্য হলেও নিজের উপর আসা সকল বিপদে কাটাতে চান। আর এখানেই আমি জিতে গেছি মিস্টার ভিলেন। কারণ আমি পেরেছি আপনাকে সংসার জীবনে বাঁধতে। আমার তো শুরু থেকে আপনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে ছাড়া আমি জীবন দ্বিতীয় কিছু দেখিনি। সবর্দা আপনিই আমার প্রিয় মিস্টার ভিলেন ছিলেন। খুব ভালোবাসি আপনায়। এত্তো গুলা ভালোবাসা মিস্টার ভিলেন।

মায়ার অনূভুতির অন্তরালে রিদ ঠাস করে মায়াকে কোলে তুলে নিতেই মায়া চমকে উঠে রিদের গলা জড়িয়ে ধরে খানিকটা উত্তেজিত গলায় বলে…

—” কি হয়েছে? এইভাবে কোলে নিলেন কেন? নামান!

—” আমার বউ আদুর পেয়েছে বড্ড! এই মূহুর্তে বউকে আদুর না করলেই নয় বুঝলে।

—” এই একদম না। আমি এখনো অসুস্থ। ছাড়ুন আমায়।

মায়া কথায় রিদ সন্দেহ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলে..

—” দশদিন পযন্ত কিসের অসুস্থতা তোমার শুনি?
—” আপনি আমার অসুস্থতার হিসাবও রেখেছিলে?
—” তো রাখবো না? বউ আমার! হিসাবটা তো আমারই রাখতে হবে তাই না?

রিদের কথায় মায়া মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিয়ে লজ্জায় বলে…
—” জানি না! কিন্তু আমার দশদিন পযন্তই অসুস্থতার দিন চলে। ছাড়ুন এবার! আমি সুস্থ হয়নি।

রিদ শুনলো না মায়ার কথা। বরং মায়াকে নিয়ে রুমে যেতে যেতে বলল…

—” দরকার নেই সুস্থ হওয়ার। আমার জিনিস আমি নিজেই চেক করে নিব! কতোটা সুস্থ আর কতোটা অসুস্থ আছেন আপনি।
~~
সকলেই খান বাড়িতে উপস্থিত। আজ মারিদ, রাদিল ও ইফরাদ চলে যাবে দেশের বাহিরে। মারিদের সুইজারল্যান্ডের ফ্লাইট রাত দুটোই। রাদিলের ও ইফরাদের এগারোটায়। এখন রাত আটটা। রিদ মারিদকে নিয়ে যাবে। আর আয়ন ইফরাদ ও রাদিলকে নিয়ে যাবে। সবার থেকে বিদায় নেওয়া শেষ তিন ছেলের। একটু পরই বের হয়ে যাবে। রিদ এতো সকাল সকাল বের হতো না তবে ছেলের মাইন্ড ফ্রেশ করার জন্য নিজের সাথে কিছুক্ষণ রাখতে চায় একান্ত ভাবে সেজন্য সকাল সকাল বের হওয়া। নয়তো তার পাগল বউ আরও কেঁদেকুটে ছেলের মাথার খাবে। আসিফ পরপর তিনটা গাড়ি বের করলো। একটা আয়নদের জন্য অন্যটা রিদের জন্য। তৃতীয়টা বডিগার্ডদের জন্য। খান বাড়িতে উপস্থিত বড়রা সবাই ছেলের জন্য কষ্টের চাপ চোখের মুখে দেখা গেল শুধু সুখ আর পরি বাদে। তারা মূলত বুঝতেই পারছে না এখানে কিছু হচ্ছে তাই নিজের মতো করে দৌড়েদৌড়ি খেলেই যাচ্ছে একে অপরের সাথে। রাদিল তখন সোফায় বসে ছিল রেডি হয়ে। একটু পরই বের হয়ে যাবে এই বলে। মনোযোগ সব হাতের ছোট ব্যাগটাতে ছিল। আর কি কি নিবে সেটাই চিন্তিত কপাল কুঁচকে ভাবছিল দেখতে দেখতে, ঠিক তখনই কোথা থেকে সুখ দৌড়ে এসে তার পাশে দাঁড়াতেই রাদিল বিরক্তি চোখ তুলে আশেপাশে তাকাল। এই মেয়েটা যখন তখন তার আশেপাশে এসে দাঁড়ালে তার বড্ড লজ্জা লাগে। এখন তো সবাই সরাসরি সুখকে রাদিলের বউ বলেই ডাকে। এতে রাদিলে ভিষণ লজ্জা লাগে। এখন যদি বড়রা কেউ তাদের দুজনকে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহলে নিশ্চিত ভাববে রাদিল যাওয়া আগে আলাদা ভাবে বউকে দেখে যাচ্ছে। সত্যি কি তাই? মোটেও না! রাদিল একদমই আলাদা ফালাদা সময়-টময় চায় না এমন বজ্জাত মেয়ের সাথে। তার বাবাকে এমন বোলাভালা চেহারা দেখিয়ে রাদিলকে বিয়ে করে নিয়েছে সেটা রাদিল সারাজীবন ভুলবে না। এখন নিশ্চয়ই নতুন কোনো ফন্দি আঁটকে এসেছে তার কাছে। রাদিল বিরক্তি নিয়ে সুখকে বলে…

—” কি চায়? এখানে কেন এসেছিস?

সুখ রাদিলের হাতে চেপে ধরে রাখা সুখের ম্যাজিক বলটার দিকে তাকাল। এটা সুখের বল! সে রাদিল থেকে নিতে চায় বলেই এখানে এসেছে মূলত।

—” আমাল বল দাও!

রাদিল নিজের হাতে চেপে ধরে রাখা সুখের ম্যাজিক বলটার দিকে তাকাল। এটা সে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের ব্যাগে ঢুকিয়েছে নিজের সাথে নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু এই বজ্জাত মেয়ের চোখ ঠিকই পরে গেছে বলের উপর। এখন রাদিল বলটা দিতে না চাইলে নিশ্চিত কেঁদেকুটে সবাইকে বলে দিবে বলটার কথা এতেও তার লজ্জা। রাদিল বলটার তার ব্যাগে ঠাস করে ঢুকিয়ে ফেলে বলে…

—” এটা তোর না আমার বল। যাহ এখান থেকে! একটা জলজন্তু মানুষ চোখে পরে না আসছে বল নিতে। আমার বাবাকে পটিয়ে যে আমাকে বিয়ে করলি আমি তখন কিছু বলেছি? এখন আমি তোর একটা বল নিলে সমস্যা কোথায়? নাকি আমার শশুরের মেয়ের কোনো কিছু আমি ধরতে পারবো না, কিন্তু তুই ঠিকই আমার বাবার ছেলেকে তোর নিজস্ব সম্পদ মনে করে চলবি কোনটা?

সুখ রাদিলের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে ড্যাবড্যাব করে রাদিলের হাতের দিকে তাকাল। মূলত সুখের প্রথম থেকে দৃষ্টি ছিল রাদিলের ব্যাগের ভিতরে থাকা তার জিনিসপত্র দিকে। এইতো দেখা যাচ্ছে রাদিলের ব্যাগ ভরতি সুখের খেলাধোলা নয়তো কসমেটিকসের জিনিসপত্র। এইগুলো সব সুখের। সুখ খুব ভালো করে চিনে নিজের জিনিসপত্র গুলো। রাদিল সুখের দৃষ্টি বুঝে নিজের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ ব্যাগের ছিনটা লাগিয়ে নিতেই এবার সুখ রাদিলের মুখের দিকে তাকাল ডাগর ডাগর চোখ তুলে। দুজনের চোখ মিলতেই সুখ নিজের জিনিস চেয়ে রাদিলকে বলল…

—” আমাল দিনিত(জিনিস) দাও! দিনিত দাও!

রাদিল দিল না। বরং সর্তক চোখে আশেপাশে তাকিয়ে ব্যাগটা নিজের পিছনে লুকিয়ে ফেলে সুখকে বলল…

—” চুপ! তোর কিছুই নেয়নি আমি বেয়াদব মেয়ে। এই জিনিসপত্র গুলো আমার ছোট বউয়ের। খরদার নজর দিবি না। যাহ এখান থেকে।

রাদিলে ধমক খেয়ে সুখ সেখান থেকে চলে যেতে নিলে রাদিল ফের সুখকে ডেকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে বলল..

—“দেখ! ভোলা বালা চেহারা দেখিয়ে আমার বাবাকে পটিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিস সেটা নাহয় মেনে নিলাম। কিন্তু আমার সুন্দরী বউ চায় না। তারপরও তুই সুন্দরী হলি! তাই আমার শর্ত একটায়। আমি দেশে ফিরতে ফিরতে তুই সুন্দর থেকে একদম কালো হয়ে যাবি কেমন। দিনে দুইবার নিয়ম করে রোদে দাঁড়িয়ে থাকবি কালো হওয়ার জন্য। কিন্তু খররদার! বড় হয়ে যদি আমি দেশে ফিরে দেখেছি তুই সুন্দরী হয়ে আমার টেনশন বাড়িয়েছিস, তাহলে তোর হিটলার বাপ-ভাইকে মানবো না। থাপ্পড়িয়ে গাল ফাটিয়ে দিব মনে রাখিস। যাহ এবার।

সুখের চলে যাওয়া অপেক্ষা না করে সে নিজেই উঠে গেল। যেতে যেতেও সুখের হাতের আম ছিনিয়ে নিয়ে গেল সুখকে কাঁদিয়ে দিয়ে। অবুঝ সুখ রাদিলের আম ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়াতে কেঁদেকুটে বুক ভাসাল। সেই কান্না শান্ত হলো বাবার কোলে গিয়ে।
~~
মারিদ নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখল পরি সিঁড়ি গোড়ায় পুতুল হাতে বসে খেলছে একা একা। মনোযোগ সব তার পুতুলকে নিয়েই। পুতুলের গায়ের জামাটাও পরির জামার সাথে মিল রেখে পড়া। মারিদ পরিকে এক পলক দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়েও কি মনে করে ঘুরে তাকাল পরির সুন্দর মুখটার দিকে। এইতো ছোট পরি হাসছে পুরো তার মার মতোন করে। মারিদ কি মনে করে হাতের ব্যাগটা ফ্লোরে রেখে পরির নাম ধরে ডাকল নিজের কাছে। পরি প্রথমে মারিদের ভয়ে আসতে না চাইলেও পরে ঠিকই আসল যখন মারিদ ব্যাগ থেকে পরি জন্য চকলেট বের করে দিল। পরি মারিদের দিকে তাকাতে তাকাতে চকলেট গুলো হাতে নিল ভয়ে ভয়ে। মারিদকে নিয়ে তার ছোট মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে মারিদের সেদিনকার ধমকের পর থেকে। সহজে মারিদের সামনে আসতে চায় না পরি। মারিদ সেটা বুঝেও না বুঝার মতো করেই থাকে। কিন্তু আজ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে হয়তো একটু ভালো ব্যবহার করছে পরির সাথে। মারিদ পরির হাতে চকলেট গুলো দিয়ে পুনরায় ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে পরিকে উদ্দেশ্য করে বলে…

—” পড়াশোনা করতে যাচ্ছি আমি। আমাকে ঠিকঠাক পড়াশোনা করতে দিবি। তুই এখন ছোট তাই কিছু বলার নেই। কিন্তু বড় হয়ে আমাকে ভারতি টেনশন দিবি না একদম। কারণ আমার টেনশন নিতে পছন্দ না। আমার আম্মু মনে করে আমি গুড বয়। কিন্তু আমি হলাম বাবার ছেলে। বাবার রক্ত আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কতোটুকু ভালো মানুষ সেটা আপাতত বলতে পারছি না। তবে কতটুকু খারাপ আমি, সেটা তুই নিশ্চিত বুঝবি আশা করছি। আরেকটা কথা! তোর ভালো থাকার দোয়াটা আপাতত করে যাচ্ছি। তবে তোর বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার ভালো থাকাটা তোর জন্য জরুরি। কারণ আমি ভালো থাকলে তোরও সবকিছু ভালো হবে। এখন আসছি ভালো থাকিস। বাই!

মারিদ চলে গেল। পরি সেদিকে কিছু সময় তাকিয়ে ফের নিজের খেলায় মন দিল। ঘন্টা খানিকের ভিতর রিদ মারিদকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড আর আয়ন রাদিল ও ইফরাদকে নিয়ে লন্ডন চলে গেল। কয়েক দিনের ব্যবধানে আয়ন ও রিদ দুজনই দেশে ফিরে আসল ছেলেদের রেখে। তারপর? তারপর দিন গুলো চাওয়া পাওয়া আর অপেক্ষা মধ্যে গেল একে অপরের জন্যের…

[ সমাপ্ত ]

(অনেক বড় একটা গল্প শেষ করলাম আজকে। পাঠক মহলের কথা চিন্তা করেই সাধারণ মিল দিয়ে দিলাম সবার মাঝে। আশা করছি এবার কেউ হতাশ না আমার উপর। আর অবশ্যই গল্প নিয়ে আলোচনা সমালোচনার রিভিউ চায়। ধন্যবাদ সবাইকে!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply