Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭২


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা) সিজন-২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৭২
পুরাতন গোডাউন! ঢাকা থেকে বাহিরে। জনমানবহীন পুরিতিক্ত পুরাতন বিল্ডিং। তীব্র গোঙ্গানির চিৎকারের শব্দ দেয়াল দেয়াল ভারি লেগে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে পুনরায়। দয়া মায়াহীন বেদুম পেটানো হচ্ছে অর্ধবয়স্ক পাঁচ পন্ডিত সদস্যকে। প্রত্যেকের গুটি হাত পা জোড়া বাঁধা চেয়ারে সঙ্গে মুখে ট্যাপ লাগিয়ে। প্রত্যেকের শরীর জুড়ে লাল রক্তের ছুপছুপ দাগ। তাদের পাশেই চুলায় আগুন দিয়ে বিশাল বড় বড় কর্ড়ায় মধ্যে ফুটন্ত তেল জাল দিচ্ছে বুরবুর করে। মূলত তেল জ্বাল দেওয়ায় হচ্ছে বডিগার্ডদের দিয়ে। মেহু গায়ে তখনো কেউ হাত লাগায়নি। সে সুস্হ সবল চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। তবে ঘামন্ত মুখশ্রীতে ভয়ের তীব্র আতনার্দ। মেহু বারবার শুকনো ঢুক গিলে ভয়ার্ত দৃষ্টি বিলিয়ে চারপাশে মানুষজনকে দেখছে আষ্টশ হয়ে। কতটা নির্দয় আচরণ সবার। মেহুর সর্বাঙ্গে কাঁপছে অনবরত। তাদের রাত বারোটার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় বাসার থেকে তুলে এনেছে গন্ডা-পান্ডা লোক দিয়ে আসিফ। আর সেই থেকেই সবার উপর নির্মম অত্যাচার করা হচ্ছে মেহুকে বাদে বিগত দুই ঘন্টা ধরে। বর্তমান রাত দুটোর ঊর্ধ্বে আছে। রিদ মাত্র কিছুক্ষণ আগেই এলো এখানে। এসেই চেয়ারে না বসে তাদের সামনে টেবিলের উপর লাফিয়ে বসলো। রিদের গায়ে সম্পূর্ণ কালো অফিসিয়াল পোশাক জড়ানো। শার্ট প্যান্ট ইন করে পড়া। গলায় টাই নেই। বরং শার্টের হাতা দুটো কুইন অবধি টেনে তুলে বুক বরাবর দুটো বোতাম খোলা। রিদের কালো আর সাদা রঙটা বরাবরই খুব পছন্দ। তাই বেশি ভাগ সময়ই রিদ কালো বা সাদা পোশাক পরেই থাকে। আজও তাই। তবে এই মূহুর্তে রিদের ব্যবহার অতি মাত্রাতিক শান্ত ও স্বাভাবিক। রিদকে দেখে মনে হচ্ছে এখানে কি হচ্ছে আসলে সে কিছুই জানে না। মূলত সে বাজা মাছটা উল্টে খেতেও পারে না। এতোটা ইনোসেন্ট আর ভালো মানুষ রিদ খান। গুটি মিনিট দশেক সময় পার হওয়ার পর রিদ হাতের ইশারায় সবাইকে থামতে বসে। ক্লান্তিতে সবাই থেমে যায়। রিদ একটা ভ্রুর উচু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আধমরা ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে বডিগার্ডদের বলল মুখে বাঁধন খুলে দিতে। রিদের আদেশ অনুযায়ী তাই করলো। একে একে সবার মুখের ট্যাপ খুলে দিতেই প্রত্যেকে তীব্র আহাজারি করে রিদের কাছে ক্ষমা ও প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগল। রিদের কি নির্বাক শান্ত সেই ভঙ্গিতে। প্রত্যেকের আহাজারি শুনে যেন শুনছে না সে। বরং একটা ভ্রুর কুঁচকে হেলিয়ে বলল…

—” কি আশ্চর্য? আমার কাছে কান্নাকাটি করছিস কেন? আমি কি মারছি তোদের। আমি চুপচাপ বসে আছি না। আমি কিছু করছি নাকি আজব।

রিদের হেয়ালি কথায় ভয়ার্ত মুখে আরও সিঁটিয়ে গেল সবাই। অন্তত বুঝতে পারলো রিদের পাষান্ড হৃদয় আর গলবার নয়। প্রত্যেকটা ভয়ার্ত মুখ একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাওয়াচাওয়ি করলো। তাদের মধ্যে থেকে ভুড়িওয়ালা কালো মোটা করে নেতা ফারুক সাহেব বলল…

—” মিস্টার খান আমাদের ক্ষমা করুন প্লিজ। সবকিছু পিছনে আমাদের দোষ নেই। আমরা শুধু সহমত পোষণ করে ছিলাম। সবকিছু পিছনে অন্য কারও হাত আছে। আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না তেমন। বিশ্বাস করুন আমাদের।

ফারুক আহমেদ কথায় হৈ হৈ করে জোড় তালে সকলে সম্মতি জানালো। আহাজারি করে বলতে লাগল তাদের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি। রিদ যেন শুনেও শুনলো না। মাথা বাঁকিয়ে পাশ থেকে মাঝাটি সাইজের ছোট মার্বেল বলটা হাতে নিল। সেটাকে অন্তত মনোযোগ সহকারে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল…

—” কাল দুনিয়ায় বাদশাহ হিসাবে নির্বাচিত আমি। বুঝতেই পারছিস ঘাস ছড়িয়ে এতো দূর আসি নাই। যায় হোক মেইন পয়েন্ট আসি। দেখ! আমি খারাপ হয়ে অন্যকে খারাপ কাজের জন্য কখনোই বাধা দেয় না। আমার গল্পের ভিলেন আমি। তবে আমারও একটা ধর্ম আছে। ক্ষমতা জিনিসটা আমার ছোট থেকে প্রিয়। ছোট থেকে ক্ষমতা পাওয়ার নিয়ে খেলতে পছন্দ করতাম। আমার মা বিষয়টি বুঝতে পারত সবসময়। আমি যখন বড় হতাম আমার রাগ, আমার বিচক্ষণতা, আমার কাজ কর্ম অন্য মানুষদের থেকে আলাদা প্রকাশ করতো বলে, আমার মা আমাকে একটা বিষয়ে খুব করে শিক্ষা দিত। বলত যে, জীবনে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে নারী জাতিকে অসম্মান করা যাবে। আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসতাম। তাই আজ পযন্ত তার কোনো কথায় আমি অমান্য করেনি। কখনো করবো না। আমাদের মতো গ্যাংস্টাদের চরিত্র খারাপ থাকবে। তাঁরা রোজ রাতে নৃত্য নতুন মেয়ে ভোগ করবে। একটা মেয়ের মধ্যে থেকে সারাজীবনে তাঁকে নিয়ে সংসার করবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টি অস্বাভাবিক হয়ে যায় যখন গ্যাংস্টার মাফিয়া হয়েও চরিত্রটা ফুলের মতো পবিত্র হয়ে যায় তখন। আসলে আমি আমার গ্যাংস্টার পদবিটা ঠিক রাখতে গিয়ে বহুবার চেষ্টা করছি পরনারীর সঙ্গ নিতে। হোটেল রুমে মেয়ে এনেও তাড়িয়ে দিয়েছি। সামান্য আঙ্গুল পযন্ত স্পর্শ করতে পারিনি ভিতরকার অপরাধ বোধের জন্য। মার বলার কথা গুলোর জন্য জীবন কখনো মেয়েদের অসম্মান করে ছুঁয়ে দেখা হয়নি আমার। কালো দুনিয়ায় সকল পাপের সাথে জড়িত আমি, শুধু নারী পাচারের ব্যবসাটা ছাড়া। নারীদের যেহেতু সম্মান করি তাই তোদের নারীর পাচারের ব্যবসাটা বন্ধ করে দেয়। এবং তোদের সর্তক করি আমার অবাধ্য না হতে। কিন্তু তোরা ভালো হলি না। আমার সাথে টক্কর নিলি। আমার দূর্বলতা খোঁজে সেখানে আঘাত করলি। এতে আমি ভিষণ আপসেট হলাম তোদের উপর। আমার একটা মাত্র নিষ্পাপ অবুঝ বউ। তোরা তাকেও ছাড়লি না। জানে মারতে চাইলি। আজ সে মরতে মরতে বাঁচল। আমি চেয়েছিলাম তোদের আমার বিয়েটা খাইয়ে দাইয়ে মারতে। কিন্তু তোদের মরার তাড়াহুড়ো বেশি। তাই তোদের ইচ্ছা মতোই কাজ করলাম। ধরে নিয়ে আসলাম বাড়ি থেকে। এবার তোরা কেন আমার কাছে কান্নাকাটি করছিস সেটা বল?

রিদের কথায় ভয়ার্ত মুখে তীব্র ছটফট করলো সবাই বাঁচার জন্য। পাশ থেকে রফিক আজম অস্থির ভঙ্গিতে বলল…

—” মিস্টার খান আমার ক্ষমা দেন প্লিজ। আপনি আমাদের নারী শিশু পাচারের ব্যবসাটা বন্ধ করে দেওয়াতে আমরা আর্থিক ভাবে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। তাছাড়া আমরা আপনার নামের ক্ষমতাটাও ব্যবহার করতে পারছিলাম না কোথাও আপনার নিষেধ করাতে। মূলত এজন্যই রাগে বশে আমরা আপনার বিরুদ্ধিতা করে ফেলি। প্লিজ মিস্টার খান আমাদের জানে মারবেন না। ক্ষমা করে দিন। আমরা আপনার বউকে মারার প্ল্যানিংয়ে সামিল ছিলাম ঠিকই কিন্তু আমরা আপনার বউকে মারতে লোক পাঠায় নি বিশ্বাস করুন। আমাদের উপরেরও একজন লোক আছে। আর সেটা তার কাজ। আমরা কেউ তাকে দেখিনি শুধু ফোনে কথা বলা ছাড়া। আমরা কেউ তেমন কিছু জানি না সত্যি। প্লিজ আমাদের মাফ করুন মিস্টার খান।

রিদ হালকা হাসলো। হাতের মার্বেলটা টেবিলে উপর রেখে ঘুরিয়ে লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল…

—” তোদের বসকে আমি পরে দেখে নিব। তার ব্যবস্হা করা আছে আমার কাছে। তবে তোরা কতটা নিষ্পাপ তাও আমার জানা আছে। আচ্ছা তোদের সবার না একটা করে বউ আর যুবতি মেয়ে আছে ঘরে। ধর এবার যদি আমি তাদের দেহ ব্যবসায় পাঠায় তাহলে কেমন হবে বলতো?

রিদের কথায় গা শিউরে উঠল সবার। নিজেদের পরিবারে দিকে রিদ আঙ্গুল তুলতেই একেক জন অস্থিরতায় উত্তেজনায় ফেটে পড়ল তৎক্ষনাৎ। চিৎকার করে রিদকে সবাই একটা কথায় বলতে লাগল’ তাদের বউ মেয়েদের কিছু না করতে। তারা নিষ্পাপ। তাদের দেহ ব্যবসায় না পাঠাতে। রিদ পুনরায় হাসল তাদের বাচনভঙ্গি দেখে। অন্তত মজার কন্ঠে বলল…

—” তোদের পরিবার! পরিবার। আর অন্যের পরিবার কিছু না? অন্য বউ, বাচ্চা, মেয়ে দিয়ে যখন দেহ ব্যবসার করতি তখন নিজের পরিবারে দিকে কেন তাকালি না। পরিবার তো একটা তোদেরও ছিল। বউ, বাচ্চা, যুবতি মেয়ে তোদের আছে। তাদের সাথে কেউ এমন করলে তোদের কেমন লাগতো। আমি জানি কালো দুনিয়ায় মায়া ভালোবাসা থাকতে নেই। তোরা তোদের জায়গায় ঠিক আছিস। দয়া মায়াহীন কাজ করেছিস বেশ ভালো কথা। কিন্তু নিজেদের পরিবারকে কেন রেহাই দিলি। তাদের নিয়েও ব্যবসাটা করতি। বড় কলিজার পরিচয় দিতে। কিন্তু না ছোট কলিজা নিয়ে এতো বড় কাজে নামলি। আমার নিষেধ করার পরও আমার বিরুদ্ধিতা করে, আমারাই বউকে আঘাত করলি শেষ পযন্ত। আচ্ছা তোদের সাথে তো আমার প্রফেশনাল শত্রুতা ছিল তাহলে তোরা আমার পার্সোনাল ব্যাপারে কেন গেলি। মেহুর বিষয়টা না-হয় বুঝলাম। বেচারি মাত্রাতিক ভালোবাসে আমাকে। কিন্তু তোদের কি সমস্যা? তোরাও কি আমাকে ভালোবাসিস। সংসার করবি আমার সাথে আমার বউকে মেরে হুম?

রিদের কথায় ভয়ার্ত মুখে চুপসে যায় সবাই। একে একে সবাই শুকনো ঢুক গিলল রিদের ভয়ে আষ্টশ হয়ে।প্রত্যেক ভয়ে সর্বাঙ্গ নাড়িয়ে তরতর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার। সকলে বুঝতে পারছে রিদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব। হয়তো রিদ খান মাত্রাতিক রাগ থেকে এমন শান্ত আচরণ করছে সবার সঙ্গে। ঘুর্ণিঝড়ের তান্ডব হওয়ার পূবে যেমন পরিস্থিতি শীতল থাকে! ঠিক তেমনই রিদ খানের হিংস্রতা প্রকাশ পাওয়ার আগে শান্ত আচরণ করছে তাদের সাথে। মেহু এতক্ষণ যাবত ভয়ে চুপচাপ বসে থাকলেও রিদের মুখে নিজের নাম শুনে এবার সেও মুখ খুলল। শুকনো ঢুক গিলে রিদের উদ্দেশ্য বলল মেহু…

—” রিদ আমি মায়ার উপর অ্যাটাক হওয়ার বিষয়ে কিছু জানি না সত্যি বলছি। তাছাড়া এদেরকেও আমি চিনি না। আমাকে কেন তুমি ধরে নিয়ে এসেছো? আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি ভালো করেই জানো, আমি এমন কিছু করবো না মায়ার সাথে।

—” আমি জানি বলেই তো তোকে এখানে ধরে নিয়ে আসলাম। আসলে আমার বড়ই প্রেম প্রেম পাচ্ছে তোর উপর। ভাবলাম এদের মারতে মারতে তোর সঙ্গে জমিয়ে একটু প্রেমটা করে নিব। এজন্য তোর গায়ে কাউকে হাত দিতে দেয়নি। আমার ভালোবাসার মানুষের গায়ে কেন অন্য কেউ হাত দিবে বল? তুই তো আমাকে ভালোবাসিস তাই না?

রিদের কথায় তুমুল গতিতে নিজের মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো মেহু…

—” হ্যাঁ! হ্যাঁ! রিদ আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। বিশ্বাস করো আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তুমি মিশে আছো। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আই লাভ ইউ।

মেহুর কথায় যেন রিদ বেশ মজা পেল। পুরো দমে রিদ নিজের ব্যক্তিত্বে ফিরত এসে বলল…

—” বেশ ভালো কথা! আমাদের প্রেমটা মাখো মাখোঁ হওয়ার আগে বল, তুই আমাকে কি দিবি তোকে ভালোবাসলে?

—” মানে?

—” মানে সিম্পল! আমার বউ পবিত্র! আর আমি অপবিত্র। তাই তাঁকে আমার দরকার। এখন তুই বল বউকে রেখে তোকে কেন ভালোবাসব? আর তোকে বিয়ে করলে তুই আমাকে কি দিবি সেটা বল।

রিদের কথায় অন্তত খুশি হলো মেহু। আসন্ন মনে বলল…

—” তোমার যাহ চাই তাই দিব রিদ। ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখব তোমাকে। আমাদের দুজনের স্ট্যাটাস মিলে। আমি মায়া থেকে যোগ্যতা সম্পন্ন দক্ষ নারী। আমি তোমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারবো সমাজে। যেটা মায়া পারবে না।

রিদ খানিকটা ভ্রুর কুঁচকে বলে…

—” তোকে কে বলেছে আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বউ নিয়ে সমাজে চলতে চাই। আমি তো বুকে বুক মিলিয়ে বউকে নিয়ে সংসার করতে চাই। বউ বুকের রাখার জিনিস। তাকে বুকে রাখব। তাকে কেন সমাজের সামনে প্রদর্শন করে বেড়াব আমি? তাছাড়া তুই আমাকে বিয়ে করে কি দিবি সেটা বল? তোর কাছে কি আছে? কি দিবি? আজ পযন্ত কয়টা ছেলের সাথে বিছানায় গিয়েছিস হিসাব আছে? একবার হাতে গুনে বলতে পারবি মোট কতটা ছেলের সাথে বিছানায় ছিলি। যদি বলতে পারিস তাহলে তোকে আমি ছেড়ে দিব যাহ। প্রমিস।

রিদের কথায় সর্বাঙ্গ নাড়িয়ে তরতর করে কেঁপে উঠে মেহুর। ভয়ের ছুটে কপালের ঘাম গলা বেয়ে নিচে নামল। রিদ মেহুর ভয়ার্ত মুখ দেখে বেশ মজা পেল। টেবিল থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে চেয়ারটা টেনে বসল সবার সামনে। মেহুর ভয়ার্ত মুখশ্রী দিকে তাকিয়ে দায়সারা ভাবে বলল…

—” দেখ! আমার জীবনে প্রথম নারী আমার বউ। যাকে আমি ছুঁয়েছি, আদুর করেছি, আবার আঘাতও দিয়েছি। ভবিষ্যতে আরও করবো যদি সে আমার কথা না শুনে। কিন্তু তার বাহিরে কখনো কোনো মেয়ের দিকে অন্য দৃষ্টিতে দুই সেকেন্ড তাকায়নি অবধি আমি। বউটাও তাই। আমি ছাড়া কিছুই বুঝে না। তোর ভালোবাসা কি তার সঠিক অর্থই জানা নেই। তুই আমাকে হাজার বার আহত অবস্থায় দেখেছিস। কাটা ছেঁড়া এমনকি গুলি খেতেও দেখেছিস। কিন্তু কখনো আগ বাড়িয়ে আমার আঘাতে মলম লাগাতে আসিস নি আমার ভয়ে। আমি তোকে ধমক দিব বা আঘাত করবো সেই ভয়ে দূরে দূরে থাকতি। কিন্তু আমার বউটা তোর মতোন না। ইনফ্যাক্ট সে কারও মতোই না। আমি সামন্য আঘাত পেলে জান যেন বউয়ের যায়। কাদেকুটে বুক ভাসায়। আমার শত ধমক, শত আঘাত পরও, আমার জন্য অস্থির হয়ে থাকে কখন মলম লাগাবে বলে। রাতের আধারে আমার রুমে চুরে করে আসে আমারই যত্ন নিতে। আমি আঘাত করলে কারও কাছে আমার নামে নালিশ করে না। অভিযোগ তুলে না। আর না আমার থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করে। বরং আমার শত আঘাতের পরও উল্টো আমার পিছন পিছন ঘুরঘুর করে কাঁদতে কাঁদতে। আমাকেই জ্বালায়। আবার আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমার বাহিরে কারও কাছে যায় না। আমার বিনোদনহীন জীবনটাকে রোজ রোজ রঙ্গিন করে তুলে তার পাগলামিতে। আমার কোনো কথার অবাধ হতে চাই না। বাধ্য মেয়ের মতোন সব কথায় শুনে। এই যে তোর পাল্লায় পরে বিয়ে করবে, বিয়ে করবে, বলে এতো পাগলামি করছে তার পিছনের কারণটাও আমার জানা। তার ভালোবাসাময় স্মৃতি লাগবে বুড়ো বয়সে। তাই এলবাম ভরে ছবি রাখার জন্য আমাকে দিয়ে তিন তিনবার বিয়ের পিরিতে বসাচ্ছে সে। আমার বউটা ততটায় পবিত্র যতটা পবিত্র একটা শিশু হয়। তার গায়ে পর পুরুষে ছুঁয়া নেই তোর মতো করে। তার গায়ে শুধুই আমার ছুয়া বিচরণ। এখন তুই বল আমার এতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বউটাকে রেখে তোর মতোন অপবিত্র লোভী নারীর কাছে কেন যাব আমি? তোর আমাকে নয় তোর আমার ক্ষমতা চাই। আর তার দাপটে তুই এতো দূর অবধি গেলি আমার বউকে মারার জন্য। এখন একটা অপশন আমি তোকে দিচ্ছি। তোকে আমি জানে মারবো না। প্রাণে বাচিয়ে রাখব। ঐ যে বললাম! আমি নারী জাতিকে সম্মান করি আমি। সেই জন্য তোর গায়েও কেউ হাত দিবে না। তবে তোকে সহজেই ছেড়ে দিব তাও কিন্তু না।

রিদ কথা গুলো বলতে বলতে থামে। মেহু আংকিত মুখে রিদকে কিছু বলবে তখনই পিছন থেকে কেউ একজন মেহুর মস্তিষ্কের উপর ইনজেকশন পুষ করল। মাথার চিনচিন ব্যাথায় মেহু কুঁকড়ে উঠে ‘আহ’ বলে মৃদু চিৎকার করল। লোকটির দ্রুত কাজ শেষ হতেই সরে দাঁড়ালো। মেহুর তৎক্ষনাৎ পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো সাদা ইউনিফর্ম পরা ডক্টরকে খালি ইনজেকশন শিরিশ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহু আতকে উঠল। মাথার ভিতরে কেমন চিনচিন ব্যথা অনুভব করলো। মেহু প্রাণপূণ ছটফট করতে করতে চিৎকার করে বলল…

—” এই আমাকে কি দিয়েছিস তোরা? রিদ! এই রিদ এই ডক্টর আমার ব্রেইন কি পুষ করেছে। আমার মস্তিষ্ক ব্যথা করছে কেন?

মেহুর কথায় রিদ আড়মোড়া ভেঙে চেয়ার আরাম করে বসতে বসতে বলল…

—” তেমন কিছু না। সারাজীবন যেন পাগল বেশে থাকতে পারিস সেই ব্যস্হায় করলাম। বাকি তোর ভাগ্যের উপর। কপাল ভালো থাকলে জীবনে কখনো তুই ভালো হতেও পারিস। তবে না হওয়ার চান্স নব্বই%। তোর এই ভরা সৌন্দর্যের অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে পাগল বেশে। তুই কয়েক সেকেন্ড মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বি। যখন ঘুম থেকে উঠবি তখন তোর দিন দুনিয়ায় খবর থাকবে না। তুই সম্পূর্ণ পাগল হয়ে রুম বন্দী থাকবি সারাটা জীবন। অল দা বেস্ট ইউর ক্রেজিনেস লাইফ বেবি।

রিদের কথা আত্মা কাপিয়ে চিৎকার করে উঠে মেহু। সেই কি চিৎকার তার। মেহুর প্রতিটা চিৎকারের ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে দেয়ালে দেয়ালে ভারি খাচ্ছে বারবার। মেহু দেখতে দেখতে ডলে পড়লো ঘুমের তীব্রতায়। মৃদু স্বরে চিৎকার করতে করতে ঘাড় ফেলে ঘুমিয়ে পরল। মেহুর অবস্থা দেখে আরাও ভয়ার্ত হলো পাঁচজন নেতা সদস্যরা। রিদের আপন জন হয়েও যদি মেহু এতো নির্মম পরিণতি হয় তাহলে তাদের কি হবে? রিদের ভয়ে সবাই আহাজারি করে চিৎকার করে বলল…

—” রিদ খান আমাদের মারবেন না প্লিজ। আমাদের পরিবারের বউ বাচ্চা আছে ছোট ছোট। প্লিজ দোহায় লাগে প্রাণে ছেড়ে দিন আমাদের। আমরা তো আপনার পক্ষের লোক। প্লিজ মিস্টার খান দয়া করুন।

উপস্থিত সবার চিৎকার বিরক্ত বোধ করলো রিদ। গা ঝেড়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল…

–” ছেহ! জানিস না গ্যাংস্টার মানুষদের দয়া মায়া থাকে না। তারপরও কেন কানের কাছে বারবার ঘ্যান ঘ্যান করছি হ্যাঁ? তোরাও দেখি আমার মনের মতোই অবাধ্য। ছেহ! সব অবাধ্যের দল আমার কপালেই জুটে। জানিস? আমার মনকে বলি তুই গ্যাংস্টার মানুষ। তুই মানুষ মারবি, কাটাকাটি করবি, হুমকি দিবি। প্রয়োজনে কথা শুনলে মানুষ মারবি। তুই কেন প্রেমে পড়বি? তোর কি ভালোবাসা মানায়? তুই আমাকে কলঙ্ক করছিস মন। তুই মারামারি কাটাকাটা বাঁধ দিয়ে। ভালোবাসা বাসি শুরু করেছিস। তুই আমার অপমান করছিস মন। আমার ফকফকা ঝকঝকা সাদাসিধা গ্যাংস্টার জীবনে প্রেম নামক বড় বড় কালো দাগ কাটছিস প্রতিনিয়ত। কিন্তু অবাধ মনটা আমায় বুঝে না। আমার অবাধ্য বউটার মতোন করে। উফ আমার যে কত কষ্ট কাকে যে বুঝায় তোরায় বল।

কথা গুলো বলতে বলতে রিদ গা এলিয়ে চেয়ারে বসে। ছাঁদে দিকে তাকিয়ে মাথার পিছনে দু’হাতে রেখে ভাবুক কন্ঠে বলল…

—” জানিস একটা বউ আমারও আছে তোদের মতো করে। কিন্তু বউটা আমাকে বুঝতে চাই না। কথা শুনে না। বলছি বিয়েটা করার দরকার নাই চলে আসো আমার সাথে। না সে আসলো না। আমার উপরে বিয়েটা রাখল। তোরাই বল! এমন বউয়ের কি দরকার আমার। আমার থেকে কি বিয়েটা বড় হলো তার কাছে। আমি যে এতে কষ্ট পাচ্ছি তার কোনো খবর নেই তার। সে দিব্যি বিয়ে করতে ব্যস্ত।

রিদের কথা শেষ হতে হতে শুনা গেল একেক জনের গলা ফাটা তীব্র চিৎকারের আতনার্দ। জীবন্ত তাদের সবাইকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করছে বডিগার্ডরা একে একে।
~~
বিয়ের আমেজ পড়েছে চারপাশে। বাচ্চা-কাচ্চার হৈ হুল্লোড় উল্লাসে গমগম পরিবেশ। দুই বাড়িতে ব্যস্ততার আমেজ মেহমানদারি করার জন্য। মায়া সারাদিন ধরে রুমে বসা। বিয়ের কনে বলে রুম থেকে বেশ একটা বের হয়নি প্রয়োজন ছাড়া। মায়ার নিরাপত্তার বিষয়টি এবার জোরতালে দেখছে সবাই। মায়ার খাবারও রেহেনা বেগম নিজ হাতে রান্না করে মায়াকে খাওয়াচ্ছে কারও উপর না ছেড়ে। মায়ার পাশে সবমসময় জুই নয়তো ফিহা থাকছে পাহারা দেওয়ার জন্য। তাছাড়া সারাদিন ভর মায়ার রুমে পাড়া-প্রতিবেশী এবং মেহমানদের আনা গুনা ছিল বউ দেখার জন্য। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ মায়া একটু বেশিই চুপচাপ ছিল। তার কারণ দুটো। প্রথমত্ব রিদ সাথে মায়ার সম্পর্ক নষ্টের ভয়ে। দ্বিতীয়ত্ব বিয়ের কনে বলে মায়া চক্ষু লজ্জায় আষ্টশ হয়ে আছে। এইতো বিকাল দিকে মায়া নানি ফাতেমা খাতুন হাতে করে একটা আঙরা বাণিয়ে নিয়ে আসে মায়ার জন্য। মোটা করে লাল সুতা পাকিয়ে তাতে কাঁচা হলুদ গোল গোল করে কেটে গেতেছে দুটো সুতার মধ্যে। লাল সরিষাদানার পুঁটলি বানিয়ে সেই সুতায় বাঁধল। নিয়ম অনুযায়ী অল্প সোনা-রুপাও তাতে বেঁধে মায়ার বাম হাতের কব্জায় পড়িয়ে দিল বেঁধে। সেইম একটা আঙরা রিদের জন্যও তৈরি করে পাঠানো হলো মানুষ দিয়ে খান বাড়িতে। ফাতেমা খাতুন মায়াকে আপাতত একটা লাল তাতের শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে গেল। কারণ মায়ার হলুদের গোসলের পর খান বাড়ির থেকে আসা কাপড় গুলোই পড়ানো হবে তাই। মায়া ফিহা লাল তাতের শাড়ি পরে জড়সড় হয়ে বসে আছে মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে বউদের মতো করে। মায়ার চারপাশে ঘিরে বসে আছে তার কাজিন মহলের বাচ্চা-কাচ্চারা। মায়াদের বাসা থেকে হলুদের পাটি দিয়ে মানুষজন পাঠানো হয়েছে খান বাড়িতে বিকাল করেই। যেহেতু শীতের সময় তাই মায়ার গোসল সন্ধ্যা দিকে করানোটা বেস্ট হবে বলে এমনটা চিন্তা সবার।

হেনা খান নিজের মেয়েদের নিজের ব্যস্ততায় বিয়ে বাড়ির সবকিছু সামাল দিচ্ছে। সাধারণ নর্মাল বিয়ে নয়। রিদ খানের বিয়ে বলে কথা, মানুষজনের দাওয়াতও পড়েছে বেশি। এক্সট্রা থেকে এক্সট্রা সাভেন্ড রাখা হয়েছে সবকিছুতে। বাড়ির সব ছেলেরাই আজ খান বাড়িতে উপস্থিত আছে। কেউ বাদ পরেনি শুধু রিদ ছাড়া। যার বিয়ে তার খবর নেই। এইদিকে বিকাল গরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে রিদের কোনো খবর নেই। আরাফ খান, আয়ন, হেনা খান বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল রিদকে। সে বলেছে সে কাজে আছে ব্যস্ত। এই মূহুর্তে আসতে পারবে না। বিয়ের অনুষ্ঠানেও সে জয়েন হতে পারবে না ব্যস্ততায়।
বিয়ে বাড়িতে এতো সমাহার আয়োজন চলছে রিদকে ঘিরে। অথচ বিয়ের বরের কোনো হদিস নেই। হেনা খান রিদের টেনশনে টেনশনে পাগলপারা। এই ছেলে সবসময় উনাকে টেনশনে রাখে ত্যাড়ামি করে করে। বিয়ে করবে না, করবে না, বলে বলে সারাবছর উনাকে জ্বালানি মারলো। তারপর হঠাৎ একদিন এসে মায়াকে বিয়ের করবে বলে, কতটা দৌড় করালো তাদের আশুগঞ্জ থেকে ঢাকা পযন্ত। শেষমেশ বিয়েটা ঠিক হলো। এখন আবার দ্যাড়ামি করতে করতে বলছে, বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারবে না। কিন্তু বিয়ের সময় গিয়ে ঠিকই কবুল বলে আসবে! আচ্ছা এটা কোনো কথা? এতো ত্যাড়া মানুষ হয়? হেনা খান মাথায় হাত দিতে রুমে বসে রইলো। বাড়িতে মেহমানে গিজগিজ করছে। সবাই বর কই! বর কই করছে! হেনা খান সবাইকে বলেছে, রিদ কিছুক্ষণের মধ্যে আসবে। আদৌ আসবে কিনা সন্দেহ। হেনা খান ফের ফোন লাগায় রিদকে। প্রথমবার ফোন রিসিভ না করলেও দ্বিতীয়বার ঠিকই করলো। রিদ ফোন রিসিভ করে কানে তুলতেই হেনা খান হাউমাউ করে কেঁদেকুটে রিদকে বলছে বাড়িতে ফিরে আসতে। নয়তো তিনি ঘুমের ঔষধ বেশি করে খেয়ে মরে যাবে। এতো জ্বালা উনার আর সহ্য হচ্ছে না। দাদীর কান্দনে রিদের শক্ত মন নরম হলো। ‘আসছি’ বলে ফোন রেখে দিল। হেনা খান খুশিতে আটখানা হয়ে চোখ মুছল। তিনি জানেন রিদ এবার চলে আসবে। রিদ যাদের ভালোবাসে সে ঠিক তাদের কথা শুনে। তাছাড়া হেনা খান এই ও জানে রিদ মায়ার সাথে রাগ করে বিয়ের কোনো ফাংশনে এটেন্ড করতে চাইছে না। কিন্তু বিয়েটা তো বারবার আসবে না। তাই বিয়ের নিয়ম কানুন গুলো অন্তত পালন করুক। বাকিটা নাহয় তারাই বুঝে নিবেন নিজেদের মধ্যকার ঝামেলাটা। হেনা খান আশুগঞ্জ থেকে আসা মেহমানদের আপ্যায়ন করলো। রিদ আসল আরও আধা ঘন্টা পর। এসেই সোজা নিজের রুমে গেল। অফিসিয়াল ড্রেসআপ ছেড়ে সাদা টি-শার্ট পড়লো টাউজারের সঙ্গে। রুম থেকে বের না হয়ে পুনরায় ল্যাপটপ নিয়ে বসল সোফায়। ইমেল চেক করছে। মূলত তার অফিসিয়াল কাজ শেষ হয়নি। তাছাড়া সে এমন বেয়াদব বউয়ের জন্য কোনো রকম ফাংশনে এটেন্ড করবে না। রিদে মূল্য যদি না থাকে তাহলে সেও মূল্য দিবে না। সে থাকুক বিয়েটা নিয়ে। রিদ তিরতির মেজাজ কফি মেশিনে নিজের জন্য ব্ল্যাক কফি বানাল। মন মেজাজ দুটোই বিগড়ে আছে। যদি বিয়েটা না হতো তাহলে সে কবেই দেশ ছেড়ে চলে যেত। এসব ফালতু ঝামেলা আর ভালো লাগছে না। সবকিছুর উপর বিরক্তি বা রাগ লাগছে তার। শুধু একটা বার বিয়েটা শেষ হোক রিদ আর ভুলেও থাকবে না বাংলাদেশের। সে চুলে যাবে সুইজারল্যান্ড। বিয়ে করছে ব্যাস এতোটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকবে। ভুলেও সংসার শুরু করবে না। তার সংসারই চাই না। যেদিন তার বউ, তার গুরুত্ব বুঝবে সেদিনই রিদ ফিরে আসবে এই দেশে নয়তো না। রিদ চাপা রাগে কটমট করে ল্যাপটপ খুলে বসল। বেশ কিছুক্ষণ কাজ করার পর আসল হেনা খান ডালা হাতে সাজিয়ে। তাতে মায়ার দুটো নর্মাল, একটা ভারি শাড়ি, তিনটা ব্লাউজ, তিনটা পেটিকোট, নতুন কামছা, সাদা টাওয়াল, কসমেটিকস ইত্যাদি রাখা। অন্যটাতে কাঁচা হলুদ হাতে বেঁটে পেস্ট করে বাটিতে রাখা। সাথে বেশকিছু টিউব মেহেদী চারপাশে সাজিয়ে রেখে। হেনা খানের সাথে মালা ও আয়ন প্রবেশ করলো রিদের রুমে। আয়ন জানে রিদ এখন ত্যাড়ামি করবে। এজন্য সেও আসল। রিদের সম্মোহে ল্যাপটপের সাথে লাগিয়ে ডালা দুটো রাখল হেনা খান ও মালা। রিদ বিরক্তিতে চোখ তুলে তাকাতেই। হেনা খান রিদের ডান হাতটা টেনে মায়ার কাপড় গুলোর মধ্যে রেখে সবকিছুতে রিদের স্পর্শ দিতে দিতে বলল…

—” দে এই গুলো ছুঁইয়ে দে। তোর বউয়ের জন্য গায়ের হলুদের তথ্য যাচ্ছে। তুই ছুঁইয়ে না দিলে হবে না।

রিদ বিরক্তি চোখে তাকায়। সে এসব নিয়ম কানুন মানে না। রিদ হাত সরিয়ে নিতে চাইলে হেনা খান জোর করে হলুদ আর মেহেদী বাটি দুটোতে ও রিদের হাত ছুয়া নিল। রিদ রাগে বোম্ব মেরে বসে রইল। রিদের বিরক্তির ফেসটা দেখে আয়ন ঠোঁট প্রসারিত করে দুষ্টু হাসে। হেনা খান মায়ার বাড়ি থেকে আসা লাল সুতায় বাঁধা আঙরাটা রিদের বামহাতে বাঁধতে চাইল। রিদ সেটা পড়তে নিষেধ করলো হাবিজাবি জিনিস দেখে। নাক ছিটকে হাত দূরে সরিয়ে নিল বাধবে বলে। আয়ন রিদের অপর পাশে বসে বাম হাতটা জোর পূর্বক হেনা খানের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে…

—” রিদ এটা যদি তুই না বাঁধিস তাহলে মায়ার হায়াত কাটা যাবে। দেখা যাবে তোর জন্য অল্প বয়সে তোর বউ মারা গেল ত…

রিদের রাগী কটমট দৃষ্টিতে আয়ন থেমে যায়। আয়ন রিদকে আর রাগালো না। বরং ইনোসেন্ট ফেস করে বলল…

—” আরে ভাই তুই আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছিস কেন? আমি কি এসব নিয়ম জানি নাকি। আসার সময় মুরব্বিরা বলছিল সেটা শুনেই তো তোকে আমি বললাম। যাতে তুই সর্তক হতে পারিস। বিশ্বাস না হলে নানুমাকে জিগ্যেসা কর। নানু মা আমি ঠিক বলছি না?

রিদ হেনা খানের দিকে কপাল কুঁচকে তাকায়। মূলত তারও জানতে ইচ্ছা করছে এসব ফালতু নিয়ম গুলো আসলেই সত্যি কিনা। হেনা খান আয়নের মিথ্যা কথাটা ধরতে পারল। এছাড়া রিদকে বিয়ের আঙরাটা পড়ানো যাবে না বলে তিনিও মিথ্যার আচরয় নিল। আয়নের কথা সম্মতি জানিয়ে বলল…

—” হ্যাঁ আয়ন তো ঠিকই বলল। তুই সুতার বাঁধা বিয়ের আঙরাটা না পড়লে এমনটা তো হবেই। যেটা নিয়ম সেটা তো পালন করতে হবে তাই না।

রিদ রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে…
—” ফালতু কথা এসব আমি বিশ্বাস করি না। খোল এসব।

রিদের কথায় আয়ন খোঁচা মেরে বলল…

—” তুই মায়ার জন্য একটা আঙরায় পড়তে চাচ্ছি না রিদ। এই তোর বউয়ের জন্য দরদ? আমি হলে একটা কেন জুইয়ের জন্য দুহাত ভরতি শুধু বিয়ের আঙরায় পরে থাকতাম। বউয়ের লম্বা হায়াত বলে কথা ভাই। রিস্ক কি নিতাম নাকি।

রিদ নিভে গেল। হাতটা আর সরালো না। রাগ নিয়েই বিয়ের আঙরাটা পড়লো। একমাত্র বউ তার। যদি সত্যি সত্যি বউয়ের হায়াত কমে যায়।। তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। না তার বউয়ের হায়াত কমানো যাবে না। এমনিতেই বউটার উপর দিয়ে কত বিপদ যাচ্ছে। থাক! রিদ রাগ হলে হইছে। তারপরও বউয়ের কিছু না হোক। বউটা লম্বা হায়াত বাড়ুক। রিদকে সুতাটা বেঁধে চলে গেল সবাই। মায়া জন্য তথ্য গুলো পাঠানো হলো আশুগঞ্জ। রিদ কাজ করতে করতে বার কয়েক হাতে লাল সুতোর আঙরাটা দিকে তাকাল। কালো লোমশ ফর্সা হাতে লাল সুতাটার বাঁধনটা যেন ঝলমল করছে। রিদ পুনরায় সুতার দিকে তাকাল হাত বাড়িয়ে আলতো ছুয়ে দিল। মনে অদ্ভুত ফিল হচ্ছে তার। বিয়ের অনূভুতি জাগ্রত হচ্ছে। শরীর শিরশির করছে তীব্র ফিলিংসে। সে বিয়ে করছে সেটা যেন মনে গভীর ভাবে কড়া নাড়ছে। উফ! এইভাবে বসে আর কিছুক্ষণ ভাবলে রিদ সত্যি পাগল হয়ে যাবে তীব্র অনূভুতিতে। রিদ চাপা রাগে মন ঘুরিয়ে কাজে মনোযোগ হলো। আপাতত সে এসব ফালতু বিষয় নিয়ে ফিল করতে চাই না মোটেও। রিদ এই বিয়েটা মানে না। আর না মানে তার বেয়াদব বউকে। স্বামী দাম দিতে জানে না যে বউ, তার সাথে আবার কিসের ভাব বিনিময় করবে রিদ? কোনো দরকার আছে কি সংসার করার। কোনো দরকার নেই। থাকুক সে তার মতোন। রিদ কাল বিয়েটা শেষ করেই চলে যাবে আর থাকবে না এদেশে। বাংলাদেশের হাওয়াটা তার অসহ্য লাগছে। রিদ চাপা রাগে পাশ থেকে ফোন উঠিয়ে আসিফকে কল লাগাল। প্রথম বার রিং হতেই আসিফ দ্রুত করল রিসিভ করে হ্যালো বলতেই রিদ কোনো প্রকার ভনিতা না করে গম্ভীর কণ্ঠে আসিফকে সোজাসাপ্টা বলে উঠল…

—” আসিফ সুইজারল্যান্ডের ফ্লাইট ঠিক কর আমার কাল রাতের জন্য। আমরা কাল রাতেই ব্যাক করবো মনে রাখিস।

রিদের কথায় চমকে উঠে আসিফ। আমতা আমতা করে বলে..
—” ভাই কাল তো আপনার বিয়ে। ভাবিকে রেখে…

আসিফকে থামিয়ে দিয়ে ধমক স্বরে রিদ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল…

—” তোকে বলছি জ্ঞান দিতে? যার বলছি তাই কর।

ফোনের অপর পাশ থেকে আসিফ দমে গিয়ে জড়তার কন্ঠে উত্তরে বলল…

—” জ্বিই ভাই।
~~

রাত প্রায় আটটার দিকে। খান বাড়ি থেকে তথ্য আসতে দেরি করায় মায়ার গোসলটাও দেরি হলো। মায়া সকল কাজিন ভাবিরা মিলেমিশে মায়াকে নিয়ে গেল উঠানের দিকে। গোসল করাবে বলে। তার আগে নিয়ম অনুযায়ী মায়া সকলের পা ছুঁইয়ে সালাম করালো মা-বাবাসহ বাড়ির সকল গুরুজনদের দোয়া নিতে। মায়া একে একে সকলকে সালাম করলো। মায়ার ভিতরকার গুমরে কষ্টে ডুকরে কেঁদে উঠল। বাড়ির সবার চোখেই জল। রেহেনা বেগম মুখে আঁচল গুঁজে ফুপিয়ে উঠল কান্নায়। মেয়েকে তিনি অনেক আগেই বিদায় করেছিল খান বাড়ির উদ্দেশ্য! কিন্তু তখন মনে আশা ছিল মেয়েকে তিনি পুনরায় ফিরে পাবেন নিজের বুকে। কিন্তু আজ যেন সেই আশায় মিথ্যা হয়ে গেল। মেয়েটাকে চিরতরে ঐ বাড়িতে আবারও পাঠাতে হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দিকে। আল্লাহ উনার মেয়ের সহায় হোক। নিজের নাড় ছেঁড়া ধনকে চিরতরে পর করতে হবে সেটা ভেবে তিনি আরও ডুকরে কেঁদে উঠল। ফিহাসহ মায়ার সকল ভাবিরা মায়াকে নিয়ে বাহিরে প্যানেলের দিকে গেল। যেখানে মায়াকে গোসল করানোর জন্য আলাদা ভাবে ফুল দিয়ে ছোট ঘর হিসাবে সাজানো হয়েছে। কান্দনরত মায়াকে ফিহা প্যানেলের ভিতর ছোট কাঠের মোড়ায় বসাল। মায়া জড়সড় হয়ে বসল কাঁদতে কাঁদতে। মায়ার চারপাশে থেকে ছোট বড় মেয়ে মানুষের ভিড় জমানো কনের গোসল করা দেখবে বলে। মায়ার একপাশে বেশ কিছু মাটির কলসি করে পানি তুলে রাখা হয়েছে মায়াকে গোসল করানোর জন্য। জুঁই ও ফিহা খান বাড়ির থেকে আসা ডালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফিহা হাত বাড়িয়ে রিদের ছুঁয়ে দেওয়া কাঁচা হলুদের বাটির এগিয়ে দিল একজন ভাবির কাছে। তিনি সহ আরও কয়েক জন ভাবি মিলে মায়ার হাতে, পায়ে,গলায়, পিঠে, মুখে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছে নিয়ম অনুযায়ী। মহিলারা সবাই মায়াকে সম্পূর্ণ হলুদ মাখানোর পরপরই কলস ভরতি পানি মগে ঢেলে মায়ার মাথায় ডালা হলো গোসল করানের জন্য। ঠান্ডা কনকন শীতের মধ্যে মায়া তিরতির করে কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার। তারপরও দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপতে কাঁপতে ঠায় জায়গায় বসে রইলো। একের পর এক পানি ভরতি কলস শেষ করলো মায়া শরীর ঢেলে গোসল করানোর জন্য। মায়াকে তরতর করে কাঁপতে দেখে ফিহা দ্রুত সাদা টাওয়াল দিয়ে মায়া শরীর ঢেকে দিল। মায়ার কাজিন ভাবিরা মিলে সেখানেই মায়ার শাড়ি চেঞ্জ করতে চাইলে বাঁধা দেয় মায়া। মায়া বলে, সে এখানে কাপড় চেঞ্জ করবে না, এতো গুলো মহিলাদের সামনে। মায়া লজ্জা বুঝে সকল ভাবিরা গণহারে মায়াকে লজ্জা দিতে লাগল এটাসেটা বলে বলে। তবে মায়া ঠায় নত মস্তিষ্কের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো গায়ে টাওয়াল জড়িয়ে। মায়া অবস্থা বুঝতে পেয়ে, মায়ার বোন মুক্তা এগিয়ে এসে ফিহা আর জুঁইকে বলল ‘ মায়াকে বাহিরের কল পাড়ের ওয়াশরুমে নিয়ে যেতে শাড়ি চেঞ্জ করানোর জন্য। মুক্তার কথা অনুযায়ী ফিহা মায়াকে নিয়ে কল পাড়ের দিকে গেল। জুই মায়ার কাপড়ের ঢালা হাতে তাদের পিছন পিছন ঢুকল ওয়াশরুমের ভিতর। লাল পাড়ের হলুদ শাড়িটি মায়াকে পড়ালো ফিহা। জুঁই মায়ার মাথায় গামছা বেঁধে দিল। কারণ ভেজা চুলের কারণের মায়ার লাল ব্রাউজের পিঠটা সহ ভিজে গেছে সম্পূর্ণ। তথ্যের সাথে আসার নতুন জুতা জোড়া মায়াকে পড়িয়ে বের করা হলো ওয়াশরুমের দরজা খুলে। সাদা ভেজা টাওয়ালটা জুই হাতে নিল। ফিহা মায়ার মাথায় বেশ লম্বা ঘোমটা টেনে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। মায়াকে হলুদের স্টেজে রাত বারোটা দিকে উঠানো হবে। মেয়েরা সবাই দৌড়াদৌড়ি করে পার্লারে যাচ্ছে সাজতে। হলুদের স্টেজ ছাঁদে করা হয়েছে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান ম্যারেজ হলে করা হবে বলে ঠিক করা হয়েছে।

মায়াকে ফিহা খাটের কোণায় বসালো। মায়া শীতে জড়সড় হয়ে বসলো এক কোণে। আপাতত এই রুমে সবার আসা নিষেধ। কারণ কিছুক্ষণ পর পার্লার থেকে মেয়েরা আসবে মায়াক সাজাতে। তাই ফিহা মায়াকে কিছু খাওয়ানোর জন্য নিচে গেল। জুই গেল হাতে ভেজা টাওয়ালটা বারান্দায় মেলে দিতে। মায়া শীতের কারণে পা গুটিয়ে বসে মাথার ঘোমটা আরও টানলো সামনের দিকে। জুই টাওয়াল বারান্দায় মেলে রুমে আসতেই তাকাল মায়ার দিকে। মায়ার শরীরে হলুদের ছুঁয়া পরায় এক অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মায়াকে দেখতে। যেন পুরো শরীর স্বর্ণের মতো ঝলঝল করে উঠছে। মায়া এমনিতেই হলুদ ফর্সা, তার উপর কাচা হলুদের ছুঁয়া পড়াতে যেন সবমিলিয়ে অদ্ভুত অসাধারণ সুন্দর লাগল মায়াকে জুইয়ে চোখে। জুইয়ের চোখই যেন ফিরানো দায় হলো। আর এই অপরুপ সৌন্দর্যটা যদি তার আসল হোকদারে কাছে না পৌছায় তাহলে বৃথা হয়ে যাবে না সবকিছু। জুই ফিহা ফোন নিয়ে মায়ার গুটিয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকা অবস্থায় বেশ কিছু ছবি তুলল। হোয়াটসঅ্যাপে ফিহা সেজে জুই আয়নকে মেসেজ করে রিদের ই-মেইল অ্যাড্রেস নিয়ে পরপর সব গুলো পিক রিদের ইমেইল সেন্ড করে। দুষ্ট হেসে মায়ার পাশে বসে বলল…

—” তোর ছবি গুলো কাকে পাঠিয়েছি জানিস?

মায়া কপাল কুঁচকে কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে জুইয়ের দিকে তাকাতেই জুই ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলে…

—” জিজুকে পাঠিয়েছি। আমি শত% শিওর আজকে ভাইয়া ঘুম আসবে না। কালকে রাতে কথা চিন্তা করে করে ছবি গুলো দেখে রাত কাটাবে। আচ্ছা কাল এই টাইমে তো তুই ভাইয়ে রুমে থাকবি তাই না? কি অনূভুতি তোর? ফিলিংস সামথিং সামথিং হ্যা?

মায়া কপাট রাগে কটমট করে বলে…
—” তোর মতো অসভ্য না সবাই যে এসব ফালতু চিন্তা করবে বসে বসে।

মায়া কথায় নাক ছিটকালো জুই। চোখ মুখ খিচে বলল..

—” আসছে আমার সাধু মহিলা। কাল রাতে তোর জামাইর হুশ থাকবে না তোকে কাছে পেলে দেখিস। এতো কাহিনি করে বিয়েটা হচ্ছে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে তোকে ভেবেছিস। আমার কি মনে হয় জানিস কাল তোর উপর দিয়ে হেভি চাপ যাবে। আচ্ছা রিতু তুই রেডি তো? না মানে পাক সাফ হ….

মায়া রাগের বশে ঠাস করে বালিশ নিয়ে ঘুরিয়ে ভারি মারল জুইয়ের মুখে। মায়া তেতে উঠে বলে…

—” অসভ্য মাইয়া। দিন দিন চরম লেবেল অসভ্য হচ্ছিস তুই। মুখে কোনো কিছু আটকায় না। তোরে আমি বলছি ভবিষ্যতের গণনা করতি হ্যা?

জুই বালিশের ভারি খেয়ে মুখ ঢলতে ঢলতে বলে…
—” হহ! আমি সত্যিটা বললেই অসভ্য হয়ে যায় আর তোমরা কিছু করলেও অসভ্য হবা না। আসলেই দুনিয়াটা উল্টো ঘুরে। সত্যবাদীদের কোনো দাম নাই।

মায়া জুইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠে ধুপ করে বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে উঠে। মায়ার মাথার ঘোমটা পরে গিয়ে ভিজা ব্লাউজের পিঠ উম্মুক্ত হল জুইয়ের সামনে। এবং মায়ার মাথায় বাঁধা গামছার খোপাটা খসে একপাশে পড়ল। জুই চমকে উঠে মায়া হঠাৎ কান্নায়। সেতো মজা করছি মায়ার মন ভালো করার জন্য। তাহলে মায়া কান্না করছে কেন? জুই দ্রুত এগিয়ে এসে মায়া পিছনে বসে ব্যস্ত গলায় বলল…

—” কি হয়েছে রিতু কাঁদছিস কেন? আমার কথায় কি কষ্ট পেয়েছিস? বল আমাকে।

মায়া বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে উঠা কান্নায় শরীরও মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে। জুই উত্তেজিত ভঙ্গিতে মায়া পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেই মায়া কেঁদে উঠে বলে…

—” উনি(রিদ) আমার কাছে আসবে না জুই। আমাকে ভুলেও ছুঁয়ে দেখবে না। আমি উনাকে চিনে। আমাকে উনি উনার রুমে অবধি জায়গায় দিবে না। আমার দ্বারা উনি কষ্ট পেয়েছেন। আমাকে নিজের কাছেও ভিড়তে দিবে না। আমি কি করবে জুই। আমার কাছে সত্যিই কোনো রাস্তা খোলা নেই।

মায়ার কান্না চোখ ভরে আসে জুইয়ের। কাল রাতের বাসায় এতো তান্ডবের পর সবার মনই আতংকে আছে রিদকে নিয়ে। মায়া রিদের সাথে স্বাভাবিক সংসার করতে পারবে কিনা সেই ভয়েই আছে। তারপরও লোক লজ্জার ভয়ে আর মায়ার সম্মতিতে বিয়ে সম্পূর্ণ করছে সবাই। কিন্তু মায়াকে নিয়ে জুইয়ের পরিবার সবাই বেশ চিন্তিত। জুই মায়াকে সান্ত্বনা দেওয়া ভাষা খুঁজে পেল না। ফিহা খাবার হাতে দরজার সামনে থেকে সবটাই শুনলো। পানির গ্লাসটা টেবিলে উপর রেখে বামহাতে দরজা বন্ধ করে ফিহা এগিয়ে আসল মায়া দিকে।

—” এতো চিন্তা থাকলে তুই কেন কাল ভাইয়ের সাথে চলে গেলি না। তাহলে তো সব ঠিক থাকতো তোদের মধ্যে তাই না।

মায়া মাথা উঠিয়ে ফিহার দিকে তাকিয়ে থেকে কান্না ভেজা কন্ঠে বললো…

—” কিভাবে যাব ভাবি তুমিই বলো। বাবা, আরিফ ভাইয়ের সম্মান কি থাকতো সমাজে আমি এই ভাবে চলে গেলে হুমম? সবাই কতো খারাপ নিন্দা করতো তারা বাসা থেকে বের হলে। সবাই সত্যিটা দেখে যাচাই করতো না। বরং বলতো আমাকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন উনি। তাছাড়া বিয়ের জন্য এতো মানুষের দাওয়াত পড়েছে। আরিফ ভাইয়া এতো টাকা খরচ করলো। তাদের ছোট করে কিভাবে স্বামী হাত ধরে চলে যেতাম সামান্য ভয়ে জন্য। বিয়ে কি বারবার হয়? আমি এই নিয়ে তিন বার একিই স্বামীকে বিয়ে করেও একটা ছবি নেই আমার কাছে। তাছাড়া বুড়ো বয়সে আমার নাতি-নাতনিদের একটা কাহিনি বা একটা ছবিও দেখাতে পারতাম না। কাল চলে গেলে। তারপর তোমার ভাইকে নিয়ে কি আমার জীবন কোনো স্মৃতি আছে। নেই তো। তাহলে আমি কেন বিয়েটা করবো না তুমি বলো?

মায়া কথায় ফিহা হাসল। সুন্দর মুহূর্তে স্মৃতি দাঁড় করার জন্য বিয়েটা করাটা খারাপ না। ভালোবাসা মানুষের সাথে অবশ্য সুন্দর মূহুর্তে গুলো এলবামে বন্দী করে রাখা দরকার। বেশ না হলেও অল্প তো করা দরকারই। ফিহা খাবার প্লেট হাতে মায়ার সামনে বসল। ভাতের লোকমা মাখাতে মাখাতে বলল…

—” তোর কথা সবিই ঠিক আছে কিন্তু ভাইয়ের দিকটাও দেখ। ভাই তোর বিপদের কথা শুনে পাগল হয়ে ঢাকা থেকে তোর কাছে ছুটে আসল। তোর মধ্যে ভাইয়ের জান বাঁচে সেটা আমরা সবাই দেখেছি। এখন সে তোর সেইফটি কথা চিন্তা করেই নিজের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তাহলে এখানে ভাইয়ে দোষ কোথায়? তুই বল?

কথা গুলো বলতে বলতে ফিহা নিজের বামহাতে মায়াকে টেনে মুখোমুখি বসিয়ে খাবার তুলে দিল। মায়া মুখের ভাত চিবাতে চিবাতে বলল…

—” আমি তো এমনই তোমার ভাইয়ের সাথে যেতে ভাবি। একটা দিনের ব্যাপার ছিল মাত্র। এখন যদি আমি সবকিছু এলোমেলো রেখে উনার সাথে চলে যেতাম তাহলে সেটা ভালো দেখাতো বলো? সবাই কষ্ট পেত না?

মায়ার কথায় দমে যায় ফিহা। আসলে ওর কাছে সঠিক কোনো যুক্তি নেই। দু’জনই দুই দিক থেকে সঠিক। কারও দোষ নেই কোনো কিছুতে। তাহলে ফিহা কাকে দোষ দেখিয়ে কাকে সঠিক বলে প্রমাণ করবে। দুজনের জায়গায় থেকে তো দুজনই সঠিক। ফিহা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে পুনরায় মায়ার মুখে খাবার তুলে দেয়। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল…

—” বাদ দে এসব। সময়ে উপর সবকিছু ছেড়ে দে। ইনশাআল্লাহ দ্রুত সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। নে তাড়াতাড়ি খাবারটা শেষ কর। তোর গায়ের হলুদের এক্সট্রা শাড়ি পাঠিয়েছে নানুমা। সেটা পড়তে হবে। পার্লারের মেয়েরা চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে।
.
( কাল ছোট করে হলেও একটা পার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। মায়ার বিয়েটা গ্রাম্য সংস্কৃতিতে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। অনেকের খারাপ লাগতে পারে গ্রাম্য বিয়ে বলে। তবে সকলে দাওয়াত রইলো রিদ মায়া বিয়েতে। ধন্যবাদ সবাইকে)

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply