Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৬

প্রাসাদের উঠোনে তখন ঝলমলে আলো নেমে এসেছে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন বাইজিদ শাহ্। বৈঠক না সেরেই ফিরেছেন তিনি। দরজার প্রহরীরা মাথা নত করে সরে দাঁড়াল।
বাইজিদ ধীরে ধীরে মহলের ভেতর প্রবেশ করলেন। মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে সেই স্বাভাবিক সংযম।

ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল সিমরান।
মাথায় ওড়না টানা, মুখে স্বাভাবিক হাসি আনার চেষ্টা করছে।
“আপনি চলে এসেছেন? আমি ভাবছিলাম আজ একটু দেরি হবে।”

বাইজিদ একবার তাকাল তার দিকে। কোনো জবাব দিলো না। দিনকে দিন এই মেয়েটার গা ঘেষা স্বভাবটা যেন বাড়ছে। সিমরান উত্তর না পেয়ে ফের বলল
“আপনার তো সন্ধ্যায় ফেরার কথা ছিলো জমিদার সাহেব”

বাইজিদ বিরক্ত হয় সিমরান এর মুখে এসব আদূরে আলাপ শুনে। যেন ঘরের গিন্নি, এমন ভাবে জমিদার সাহেব ডাকছে
“কাজ শেষ হয়ে গেল, তাই ফিরে এলাম।”

সিমরান বাইজিদ এর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল
“আপনি আগে বিশ্রাম নিন। আমি এখনই আপনার জন্য শরবত পাঠাচ্ছি।”

বাইজিদ মাথা নেড়ে এগোতে যাচ্ছিলেন।
হঠা দূরের কোনো প্রান্ত থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল। যেন একটা চাপা চিৎকার।
এতটাই ক্ষীণ যে কেউ খেয়াল নাও করতে পারে। কিন্তু বাইজিদের পদক্ষেপ থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে তিনি কান পেতে রইলেন। সিমরানের বুক ধক করে উঠল। দ্রুত বলল
“কিছু না। হেঁশেলে কাজকর্ম চলতেছে তো, দাসীরা হয়তো হাঁড়ি-পাতিল ফেলে দিয়েছে।”

বাইজিদ আরেকটু সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন
“হেঁশেল থেকে মানুষের চিৎকার আসে নাকি? আজকাল কি জমিদার হেঁশেলে মানুষ রান্না শুরু করেছেন? দেখতে হচ্ছে ”
সিমরানের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে বলল
“আপনি ভুল শুনেছেন। আপনি বরং ঘরে যান, আমি….”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার সেই শব্দ।
এইবার আরও স্পষ্ট। কারও ব্যথা চাপা দিয়ে রাখা কণ্ঠ। বাইজিদের চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল। তিনি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। লম্বা পা ফেলে সোজা এগিয়ে গেলেন হেঁশেলের দিকেই। সিমরান পিছন থেকে ডাকল
“শুনুন!”
কিন্তু বাইজিদ থামলো না। করিডোর পেরিয়ে হেঁশেলের দরজার কাছে আসতেই ভেতরের দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল।
পাথরের মেঝের মাঝখানে ফেলে রাখা হয়েছে একজন মানুষকে। কালো বোরখায় ঢাকা শরীর।
মারজান বেগম দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। হাতে মোটা চামড়ার চাবুক।
ঠিক সেই মুহূর্তেই চাবুকটা শূন্যে উঠল।
ছ্যাঁক করে আঘাতটা পড়ল বোরখা ঢাকা পিঠে।
মেয়েটার শরীর কেঁপে উঠল। মেঝেতে পড়ে থাকা হাত দুটো শক্ত হয়ে উঠল।
নিকাবের আড়াল থেকেও বোঝা যাচ্ছে, সে ব্যথা চেপে রাখতে চেষ্টা করছে। বোরখার কাপড় কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে।
দাসীরা চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ে থম মেরে।
ঠিক তখনই
দরজার সামনে এসে থেমে গেল বাইজিদ।
এক মুহূর্তের জন্য তিনি যেন স্থির হয়ে গেলেন।
চোখের সামনে দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
পাথরের মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটাকে চিনতে অসুবিধা হলো না। হাত দুটো মেঝের যে জায়গায় স্পর্শ করছে সেখানেই লাল হয়ে উঠছে। হাত দুটো ঝলসে গেছে যেন
বাইজিদের চোখ হঠাৎ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
গভীর, গর্জে ওঠা কণ্ঠে বলল
“থামুন!”

শব্দটা এমনভাবে হেঁশেলের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল যে সবাই কেঁপে উঠল। মারজানের হাত মাঝ আকাশেই থেমে গেল। ধীরে ধীরে সবাই ঘুরে তাকাল দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ শাহ্। তার চোখ তখন সরাসরি গিয়ে থামল মেঝেতে পড়ে থাকা মেহেরুন্নেসার ওপর।

গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে মেয়েটা।
এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর কিছু যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
গভীর, ঠান্ডা কণ্ঠে তিনি বললেন
“এখানে কি হচ্ছে? এটা কি হচ্ছে এখানে?”

হেঁশেলের সব দাসী থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ শ্বাস নেওয়ার সাহসও পাচ্ছে না।
মারজান বেগম প্রথমে একটু থমকালেন, তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন
“তু….তুমি এসে গেছো? ভালোই হলো। এই মেয়েটাকে শাস্তি দিচ্ছি।”
বাইজিদের চোখ সরু হয়ে গেল।
“শাস্তি?”

মারজান চাবুকটা একটু দুলিয়ে বললেন
“হ্যাঁ। শত্রুর মেয়ে। তবু প্রাসাদে এত আরামে আছে। আমি দেখলাম, আচরণে খুব বিনয় নেই। তাই একটু শিক্ষা দিচ্ছি।”

বাইজিদ এর চোয়াল এখনো শক্ত। সবুজাভ চোখের দৃষ্টি স্থির মারজান এর দিকে। মারজান এর হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ছে বাইজিদ এর চাহনি তে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে।

মেঝেতে পড়ে থাকা মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। নিকাবের আড়ালে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। বাইজিদ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন। তার পায়ের শব্দ পাথরের মেঝেতে ঠকঠক করে উঠছে।
তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন মারজানের সামনে। গোটা হেঁশেল জুড়ে পিনপতন নিরবতা। সিমরান ভয়ে সিটিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।

বাইজিদ ধীরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল
“আমি কি আপনাকে অনুমতি দিয়েছিলাম?”

মারজান একটু থমকালেন।
“কিসের অনুমতি?”
বাইজিদের চোখ তখন জ্বলছে।
“ওনাকে চাবুক মারার অনুমতি। বলুন দিয়েছিলাম?”

শব্দগুলো এত ঠান্ডা যে হেঁশেলের বাতাস যেন জমে গেল।
মারজান ভ্রু কুঁচকে বললেন
“অ…..অনুমতির ক…কি আছে? সে তো শত্রু পরিবারের মেয়ে। তাকে শাস্তি দেওয়াটা….”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইজিদ হুংকার দিলো
“চুপ।”
এই এক শব্দে হেঁশেলের সবাই কেঁপে উঠল। বাইজিদের দৃষ্টি তখন পাথরের মতো কঠিন।

“এই প্রাসাদে কে শাস্তি পাবে আর কে পাবে না, সেটা আমি ঠিক করি। আপনি না। সেই অধিকার কেবল জমিদার দের আছে”

মারজানের মুখের রং বদলে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিমরান নিঃশব্দে সব দেখছে। তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। মারজান ঠান্ডা গলায় বললেন
“তো তুমি কি বলতে চাইছো? আমি ভুল করেছি? ওরা আমার মেয়েটাকে এত অত্যাচার করেছে….”

বাইজিদ এক পা এগিয়ে এলেন। মারজান চুপ হয়ে গেলো ভয়ে।
“আমি যা বলছি তা খুব স্পষ্ট। আমার অনুমতি ছাড়া এই মেয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস কি করে পেলেন?”

বাইজিদ কণ্ঠ এত দৃঢ় যে সেখানে কোনো দ্বিধা নেই। মারজান এবার সত্যিই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন।
“তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আমি এই মহলের বড় বেগম”

বাইজিদের চোখ এক মুহূর্তের জন্যও নরম হলো না। সোজা তাকিয়ে বলল
“বেগম শব্দ টা আপনার চরিত্রের সাথে মানায় না বুঝলেন। আর একটা কথা ভালো করে শুনে রাখুন…..

হেঁশেলের ভেতর সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে।
বাইজিদ ধীরে ধীরে বলল
“এই মেয়ের কি বিচার হবে, কবে বিচার হবে, আর কি শাস্তি পাবে, সব হবে আমার আদেশে।”

অনেকক্ষণ যাবৎ বাইজিদ এর চিৎকার শুনে আর ঘরে থাকতে পারলো না প্রভা। এখন সে মোটামুটি সুস্থ। নিজ কক্ষ থেকে বের হয়ে চলে গেলো হেঁশেল এর দিকে চিৎকার এর উৎস খুজতে। হেঁশেলে ঢুকতেই সবাই প্রভার দিকে তাকালো। মারজান একটু সাহস পেলো, প্রভা হয়তো মেয়েটাকে ঘৃণা করবে। ওর স্বামীর বোন বলে কথা। প্রভা কৌতূহলি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
“কি হয়েছে সবাই হেঁশেলে……

কথার মধ্যেই চোখ পড়লো মেঝেতে পরে থাকা মেহের এর দিকে। সর্বাঙ্গ কালো বোরখায় আবৃত। শুধু হাতের কব্জি টুকু উন্মুক্ত। প্রভার কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
“এটা কে ভাইজান?আর এভাবে মারা হচ্ছে কেনো? তাও আবার হেঁশেলে”

বাইজিদ এর আগে মারজান উত্তর দিলো
“দেখো না রত্না। ওরা তোমাকে কত্ত অত্যাচার করেছে। তাই তো আমি ওকে শাস্তি দিচ্ছিলাম। কিন্তু তোমার ভাই আমাকে কথা শোনাচ্ছে”

বলতে বলতে মিছেমিছি চোখ মুছলো মারজান। প্রভা কপাল কুচকে বলল
“মানে?”

মেহের মৃদু কন্ঠে আওড়ালো
“ভা…ভাবি”

মেহের এর কন্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই যেন প্রভার পিলে চমকে উঠলো। পরিচিত কন্ঠে ভাবি ডাক শুনে আর চিনতে বাকি রইলো না এটা তার একমাত্র ননদ। তড়িৎ বেগে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো বুকের মধ্যে
“মেহের? মেহের, কী অবস্থা হয়েছে তোমার। এই মেহের”

প্রভার গলা ধরে আসছে। যেন কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে মেহেরুন্নেসার যন্ত্রণা দেখে। জাপটে ধরে বুকের মধ্যে আগলে নিলো মেহেরকে। মূহুর্তেই মুখভঙ্গি রং বদলালো রত্নপ্রভার। সকলের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে কান্না মিশ্রিত তেজী গলায় বলল
“এ কি করেছো তোমরা? ওকে কেনো নিয়ে এসেছো? আর কি অবস্থা করেছো ওর”

প্রভা মেহের এর শরীরে হাত বুলায়। নিস্তেজ হয়ে পড়েছে ওর শরীর। দুই দিন ধরে না খাওয়া। শুধু পানি খেয়ে বেঁচে আছে। কেউ খাবার টুকু পর্যন্ত দেয়নি তাকে। প্রভা কান্না করতে থাকে মেহেরকে বুকে জড়িয়ে। নিকাবে ঢাকা মুখটা টা আগলে নিয়ে বলে
“খুব কষ্ট হচ্ছে বোন? ও মেহের? তাকাও না লক্ষিটি।”

প্রভা আহাজারি করে কাঁদতে কাঁদতে বাইজিদ এর দিকে তাকিয়ে বলল
“এ তুমি কি করেছো ভাইজান? আমার….আমার মেহেরুন্নেসা কে কেনো এত অত্যাচার করেছো? ও নির্দোষ। ও আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। আর তোমরা ওকে……এই মেহের, তাকাও না। বোন আমার। একটি বার চোখ খোলো। ইয়া আল্লাহ, এ কি হলো”

মেহেরুন্নেসা নামটা কানে যেতেই যেন বাইজিদ এর শরীরে যেনো তড়িৎ বয়ে গেলো। এই নামটা সে চিঠির খামের ওপর পড়েছিলো। তারমানে এই সেই মেহেরুন্নেসা?

সেদিন মেহের বুদ্ধি করে নিজের নামটা খামে লিখে দিয়েছিলো এই জন্যে, যে বাইজিদ প্রভার লেখা অবশ্যই চিনবে। এটা প্রভা লেখেনি এটা ভেবে যদি প্রত্যাখান করে। যদি ভাবে ভূয়া চিঠি দিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই খামের ওপর নিজের নামটা লিখেছিলো।

সেই রাতে খামের ওপর ছোট করে লেখা সেই নামটার প্রেমে পড়েছিলো সাহাবাদ এর জমিদার পুত্র। যার হৃদয়ে কোনো নারীর রুপ কখনো প্রেম ছুতে পারেনি, সেখানে শুধু একটা নাম তার আত্মায় অনুরনন তুলেছিলো। পরবর্তী তে বোনকে আনতে গিয়ে এই নারীর চোখ জোড়া তার গতিপথ পাল্টেছিলো, এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো সে।
বাইজিদ এর হাত পা অবশ হয়ে আসতে শুরু করে। চারিদিক তার কাছে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনো শব্দ তার কর্ণে পৌছায় না।

মারজান চাবুক ফেলে দিয়ে কান্নার অভিনয় করতে করতে বলল
“কি আর বলবো? রত্নার অবস্থা দেখে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কি হাল করেছে ওরা আমার বড় মেয়েটার….

প্রভা হুংকার দিয়ে উঠলল
“আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী তোমার মেয়ে। মেহের না।”

মেহেরুন্নেসা কে আরো নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল
“এই মেয়েটা পরিবার এর সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে বাঁচিয়েছে আমায়। যেই মেহেরুন্নেসা কখনো বাড়ির চৌকাঠ পেরোয় নি, পরপুরুষ এর সামনে যায়নি। সেই মেহের আমাকে বাচানোর জন্য ভাইজান কে লেখা চিঠি পাশের বাড়ির প্রহরি ওবদি পৌঁছে দিয়েছে। তাও আবার সকলের অগোচরে। বাড়ির লোকের মার খেয়েছে আমার হয়ে কথা বলার জন্য। তার সাথে এই অন্যায় খোদা ও সহ্য করবে না”

সুনেহেরা দরজা হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে আপেল খাচ্ছে। আপেল চিবুতে চিবুতে বলল
“এসব কথা পরে বলো আপা। বৈদ্য এসেছে, মেয়েটাকে জলদি নিয়ে এসো। পোষাক ও পাল্টানো প্রয়োজন। ঘরে নিয়ে চলো।”

দাসিরা সাহায্য করলো মেহের কে ঘরে নিয়ে যেতে। বাইজিদ ও পিছু পিছু গেলো। কিন্তু সে কক্ষের দরজা পর্যন্তই যেতে পারলো শুধু। সুনেহেরা হেঁশেল থেকে বেরোতে গিয়ে আবার ফিরে আসলো কয়েক পা। সিমরান এর দিকে শকুন চোখে তাকালো। সিমরান একটু ভড়কে গেলো সুনেহেরার চাহনি তে। আতঙ্ক এড়াতে, এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকালো হেঁশেলের কোণায় কোণায়।

সুনেহেরা আপাদমস্তক পরখ করে বলল
“মেয়েটার ব্যাপারে মায়ের কানে বিষ তুমিই ঢেলেছো তাই না?”

সিমরান আমতা আমতা করে বলল
“আ…আমি…..”

“এই চুপপপপপপ”

সুনেহেরার কড়া ধমকে কেঁপে উঠলো সিমরান। এই টুকু মেয়ে কি তেজ বাপরে। চোখ বড় বড় করে সিমরান এর দিকে আঙুল তুলে বলল
“চেহারা দেখেই শরীরের শিরা-উপশিরা গুনে দিতে পারি আমি। পরের বার এমন কিছু চোখে পড়লে, চাপটে মুখের মানচিত্র বদলে দিব বলে দিলাম। চুপচাপ মেয়েটার জন্য খাবার নিয়ে ঘরে আসো”

সোনালি চুল গুলো উড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে মেহের কে নিয়ে যাওয়া কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলো সুনেহেরা। সিমরান এবার হাফ ছেড়ে বাচলো, দম বন্ধ করে দিচ্ছিলো মেয়েটা।


প্রাসাদের মাঝখানে বিশাল দরবারখানা (যেখানে জমিদার প্রজাদের বিচার কিংবা রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জ্ঞানী গুণীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন)। উঁচু ছাদের নিচে ভারী কাঠের খোদাই করা স্তম্ভ, দেওয়ালে ঝোলানো পুরনো তরবারি আর বর্শা। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো এসে পাথরের মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলেছে।
দরবারের মাঝখানে উঁচু আসনে বসে আছেন জমিদার বাকের শাহ্। সামনে কয়েকজন মুন্সি আর দেওয়ান দাঁড়িয়ে। রাজ্যের বানিজ্যিক হিসাব, নৌপথে পণ্য পাঠানো, প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে লেনদেন, সবকিছু নিয়ে আলোচনা চলছিল।
কিন্তু আজ বাকের শাহ্‌ এর মন কোথাও স্থির হচ্ছে না।

মুন্সি কিছু একটা বলছিল, তিনি শুনেও যেন শুনলেন না। কপাল কুঁচকে আছে। আঙুলের গাঁটে গাঁটে টেবিল ঠুকছেন ধীরে ধীরে।
হঠাৎ তিনি হাত তুলে বললেন
“থামো তো এবার।”
ঘরের সব কথা মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাকের শাহ্ ধীর, ভারী কণ্ঠে বললেন
“বাইজিদ কোথায়?”
এক দাস এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে বলল
“হুজুর, শাহজাদা প্রাসাদেই আছেন।”
“ডেকে আনো তাকে।”
কণ্ঠে এমন কঠোরতা ছিল যে কেউ আর প্রশ্ন করার সাহস পেল না। কিছুক্ষণ পর দরবারখানার দরজা দিয়ে প্রবেশ করল বাইজিদ শাহ্। সোজা হয়ে হাঁটছে, মুখে স্বাভাবিক স্থিরতা। এসে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নত করল।
“ডেকেছেন?”
বাকের শাহ্ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। কিন্তু দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধানী। হাত ইশারা করতেই সকলে বেড়িয়ে গেলো সেখান থেকে। দরবার ফাঁকা হতেই বাকের শাহ্ কড়া গলায় বললেন
“একটা কথা শুনছি আমি।”

দরবারখানার ভেতর নিস্তব্ধতা। বাইজিদ কৌতূহল নিয়ে তাকালো।
“শুনছি, গতরাতে তুমি নাকি প্রভার শশুর বাড়ী থেকে আনা সেই মেয়েটার সাথে এক কক্ষে রাত কাটিয়েছো?”

কথাটা বলার সময় বাকের শাহ্ এর চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“এটা কি সত্যি?”

বাইজিদ মুহূর্তখানেক স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো ভয় নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধু চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা।
সে ধীরে মাথা তুলল।
“কে বলেছে আপনাকে এই কথা?”
বাকের শাহ্ টেবিলে হাত চাপড়ালেন।
“কে বলেছে সেটা পরে হবে। আগে বলো কথাটা মিথ্যে, না সত্যি?”

দরবারখানার ভারী বাতাস যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। বাইজিদ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
“আমি কেবল ওই মেয়েটিকে সাবধান করতে গিয়েছিলাম যেন কক্ষ থেকে না বের হয়। এটা করাটা কি অন্যায় আব্বা? আমি তার সাথে এক কক্ষে রাত কাটাই নি। কিছু মূহুর্ত কেবল দাড়িয়ে ছিলাম সেখানে। আর তাছাড়া আমার ওপর কি আপনার ভরসা নেই আব্বা?”

বাকের শাহ্ চোখ বন্ধ করে দুদিকে মাথা নাড়ালো।
“ বিষয়টা শুধু ভরসার নয় বাইজিদ। দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী এবং পুরুষ, মোম আর আগুণের মতো। মোম আগুণের কাছে গেলে গলবেই। আমি এক্ষেত্রে ভরসার দোহাই দিতে চাচ্ছি না। সাবধান করতে তুমি একজন দাসি পাঠাতে পারতে, সিমরান ছিলো, সুনেহেরা ছিলো, তোমার আম্মা ছিলো। তুমি কেনো যেতে গেলে, তাও আবার রাতের অন্ধকারে। এমন তো নয় বাইজিদ? তুমি ওই মেয়েটার বন্দিত্ব এবং অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে গেছিলে?”

বাইজিদ চোখ বড় বড় করে তাকায় বাবার দিকে
“নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ। এ আপনি কি বলছেন আব্বা? আপনার আমাকে বিশ্বাস না হলে সেই মেয়েটি কেই জিজ্ঞেস করুন। আমি তার সাথে কোনো অন্যায় করার চেষ্টা করেছি কিনা?”

বাকের শাহ্ চিন্তিত স্বরে বলল
“জিজ্ঞেস তো অবশ্যই করতে হবে। তাও আবার সকলের সামনে। কারণ গোটা প্রাসাদ ছড়িয়ে গেছে, জমিদার পুত্র শাস্তি দিতে আনা নারী আসামীর কক্ষে রাত কাটিয়েছে”


রাত নেমে এসেছে জমিদার প্রাসাদের নির্জন অংশে। জানালার বাইরে হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু ভিতরে যেন অদৃশ্য এক আগুন জ্বলছে। নিজের ঘরে একা দাঁড়িয়ে আছে সিমরান। প্রভার মুখে শোনা নামটা এখনও কানে বাজছে, মেহেরুন্নেসা!
তাহলে এই মেয়েটাই মেহেরুন্নেসা। এই সত্যটা জানার পর থেকেই সিমরানের বুকের ভিতরটা অস্থির হয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে জানালার পর্দাটা শক্ত করে ধরে। আঙুলের ভাঁজে অজান্তেই চাপ বাড়ে। মনে পড়ে যায় চিঠির সেই খামের ওপর লেখা নামটার কথা। সিমরান স্পষ্ট দেখেছিলো মেহেরুন্নেসার নামটা। আর চিঠিতে ছিল বাইজিদ এর ছায়াময় অনুভূতি, তাও চোখ এড়ায়নি সিমরান এর।
“কেন… কেন ওকে এই মহলে আসতে হলো?”

সিমরানের গলায় চাপা কান্না মিশে থাকে।
বিছানার কিনারায় বসে পড়ে। চোখের কোণে জ্বালা করছে, কিন্তু কান্না বের হচ্ছে না। শুধু অভিমান আর হিংসার অদ্ভুত মিশ্রণ বুকের ভেতর মোচড় দিচ্ছে। মনে মনে সে ভাবতে থাকে, বাইজিদের চোখে কি মেহেরুন্নেসার জন্য কোনো নরম অনুভূতি আছে? যদি সত্যি হয়, তবে তার নিজের জন্য কী বাকি থাকবে?
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেছে। সিমরান ধীরে ধীরে ফিসফিস করে
“আমি তাকে চাই… কিন্তু সে কেন অন্য কারো নাম নিয়ে বাঁচে? আমার যত্ন, অনুভূতি, দৃষ্টির মুগ্ধতা কি কখনো তার চোখে পড়েনি?”

সিমরান এর আঙুল কাঁপে। হিংসা তাকে শান্ত হতে দিচ্ছে না। তবু মন বারবার বিদ্রোহ করে। মেহেরুন্নেসা যদি বাইজিদের জীবনে জায়গা পায়, তাহলে তার নিজের স্বপ্নগুলো কোথায় যাবে?
দূরের প্রাসাদের দেয়ালে মশালের আলো কাঁপছে। সিমরানের চোখে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়তে চাইলেও পড়ে না।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমি হারতে আসিনি। আমি হারতে পারি না ওই মেয়েটার কাছে। আমার এক যুগের প্রেম ওই দুইদিন ধরে আসা মেয়েটার কাছে হারতে পারে না”

দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হয়। সিনরান নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল
“এসো”

এজন দাসী ঢুকে বলল
“আপা, জমিদার বাবু সকলকে দরবারে ডেকেছেন”

“সবাইকে বলতে?”

“মহলের সবাই কে। রক্ষি, দাসী, পরিবার এর সদস্য। সকলকে”

সিমরান মাথায় ওড়না টেনে উপস্থিত হলো সেখানে। ইতিমধ্যেই ওখানে উপস্থিত আছে মহলের প্রতিটি সদস্য। মেহেরুন্নেসা কালো বোরখা ছেড়ে পরেছে সাদা শুভ্র বোরখা পরেছে। এতে সৌন্দর্য যেনো দ্বিগুণ বেড়েছে তার। সবাই উপস্থিত থাকলেও সেখানে নেই সুনেহেরা। বাকের শাহ্ খোঁজ নিলো সুনেহেরার। দাসী জানালো দরজা খুলছে না সুনেহেরা। মেয়েটা রাত হলেই আর দরজা খুলে না। দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ভেঙে ফেললেও সারা পাওয়া যায় না তার। বোধহয় উবে যায় ঘর থেকে। বাকের শাহহ বড়ই চিন্তিত মেয়ের এমন ব্যাবহার নিয়ে। আপাতত ওর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দরবার এর দিকে মনোযোগ দিলো।
“মেয়েটার নাম কি?”

প্রভা মেহের কে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। প্রভাই উত্তর দিল।
“মেহেরুন্নেসা”

বাকের শাহ্ ছেলে কে বলল
“বাইজিদ, প্রাসাদের দাসী – রক্ষীরা বলছে তুমি নাকি গতরাতে মেহেরুন্নেসার কক্ষে ছিলে?”

মেহের এর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। যে কখনো পরপুরুষ এর সামনে ওবদি যায় নি, ভাগ্য তাকে আজ কতবড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এনে। এর চেয়ে বদনাম এর আর কীই বা হতে পারে। দরবারের পিনপতন নিরবতা ভেঙে বাইজিদ বলল
“কে দেখেছে? প্রমাণ দিতে বলুন। তাকে আমার সামনে দাড়িয়ে বলতে বলুন”

সবাই এক দাসীর দিকে তাকালো। ধরা পড়ে যাওয়া সেই দাসী মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো।

বাইজিদ বলল
“তুমি দেখে ছিলে আমায় মেহেরুন্নেসার ঘরে রাত কাটাতে?”

দাসী কাপা কাপা গলায় বলল
“না না, আ….আমি তো কেবল সেদিক থেকে আসতে দেখেছি শাহজাদা কে”

বলেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে হাতজোড় করে কাঁদতে লাগল
“আমাকে ক্ষমা করে দিন জমিদার বাবু, আমি নিজে থেকে বলিনি। আমাকে তো উনি……

কোথ থেকে একটা বর্শা উড়ে এসে বিধে গেলো দাসীটির পিঠ বরাবর। এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে বেড়িয়ে গেলো দেহ চিড়ে। সকলেই পিছনে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে

পোস্ট করার সাথে সাথে গল্পটি পেতে, পেইজটা ফলো করে রাখুন। আর গল্প শুধু এই পেইজ থেকেই পড়বেন। কারণ এটা আমার লেখা, আর আমার এই একটাই পেইজ। আজ অনেক ব্যাস্ততায়ও লিখেছি আমি। কেনাকাটার ব্যাস্ততায় সারাদিন ঘুড়েছি মার্কেটে। কেমন হইছে অবশ্যই বলবেন। আর এটাতে কিন্তু ২.৫k রিয়্যাক্ট চাই। কি হবে তো? আমার পাঠক রা চাইলে অবশ্যই হবে 😌

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply