#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের ঠোঁটের কোণের সেই ফোলা অংশটার দিকে তাকিয়ে তার নিজেরই নিজেকে চিমটি কাটতে ইচ্ছে হলো নৈশির। কিন্তু এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। রাজনীতিতে একটা কথা আছে, ‘আক্রমণই হলো আত্মরক্ষার সেরা উপায়।’ আব্রাজের মতো বজ্জাত, ধূর্ত এমপিকে শায়েস্তা করতে হলে চোখের জল ফেলে লাভ নেই, তাকে তার নিজের ভাষায় জবাব দিতে হবে। নৈশি দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল। বেনারসি শাড়িটা বদলে সে একটা সুতির হালকা বেগুনি রঙের শাড়ি পরে নিল। চুলগুলো শক্ত করে একটা খোঁপা বানিয়ে নিল, যাতে ঝগড়া করার সময় কোনো অবাধ্য চুল এসে ডিস্টার্ব না করে। ঠোঁটের ফোলা ভাবটা ঢাকতে একটু গাঢ় রঙের লিপস্টিক লাগাল। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে এক বুক আত্মবিশ্বাস টেনে নিয়ে সে মনে মনে বলল, মীর আবরাজ রোদ, তুমি যদি নিজেকে এই রাজপ্রাসাদের রাজা ভাবো, তবে মনে রেখো
আমিও কিন্তু বিরোধী দলের তুখোড় নেত্রী। আজ ডাইনিং টেবিলে যদি তোমার ওই ৪কে ভিডিওর ভূত আমি না নামিয়েছি, তবে আমার নামও নৈশি নয়!
আব্রাজকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে গত রাতে তার ওপর দিয়ে কোনো কালবৈশাখী ঝড় গেছে! সে ধবধবে সাদা কটন পাঞ্জাবি পরে। মেজো খালা আর বড় খালা তখন টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই ডাইনিং হলে প্রবেশ করল নৈশি। তার চনমনে, দাপুটে উপস্থিতি টেবিলের কয়েকজনের নজর কাড়ল। নৈশি সোজা গিয়ে বসল আব্রাজের ঠিক পাশের চেয়ারটায়। আব্রাজ পত্রিকা থেকে চোখ না সরিয়েই ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, “স্বাগতম নেত্রী। ভাবলাম বিছানায় শুয়ে এখনো ঘাস পাতা চিবোচ্ছেন। তা, সংসদের বিরোধী দলীয় আসনে বসার জন্য এত তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে গেলেন যে?”
নৈশি মিষ্টি একটা ভন্ড হাসি মুখে ঝুলিয়ে আব্রাজের দিকে তাকাল। টেবিলের নিচ দিয়ে সে নিজের হিল জুতোটার সুচালো গোড়ালি দিয়ে আব্রাজের পায়ের পাতায় সজোরে একটা চাপ দিল।
“জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকতে হলে ঘুম ভাঙতেই হয়, মাননীয় এমপি সাহেব। আর ছাগল কারা, তা তো গত রাতে আমার নখের আঁচড় খাওয়া ওই চওড়া পিঠই ভালো জানে!” নৈশি ফিসফিস করে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল। আব্রাজ পায়ের ব্যথায় সামান্য কেঁপে উঠল, সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “পায়ের জোর দেখানোর জায়গা এটা নয় নেত্রী। বড় ভাই সামনে বসে আছেন। এখানে কোনো অনধিকার চর্চা করলে স্পিকার কিন্তু এক সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবে।” ঠিক তখনই মেজো খালা এক বাটি গরুর মাংসের ঝাল ভুনা নৈশির সামনে রেখে বললেন, “নৈশি মা, আব্রাজ কিন্তু বিকালের নাস্তায় একটু বেশি ঝাল পছন্দ করে। ওর প্লেটে একটু মাংস বেড়ে দাও তো দেখি।”
নৈশির চোখ দুটো এক মূহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল। সে ভাবল, “আল্লাহ্ সুযোগ একটা দিয়েছেন!” সে চামচ হাতে নিয়ে বাটি থেকে মাংস তোলার বাহানায় ওপরের পুরো লাল টকটকে মরিচের তেলের আস্তরণ আর সাথে বেছে বেছে চার-পাঁচটা কাঁচা মরিচ আব্রাজের প্লেটে ঢেলে দিল।
“নিন, আপনার পছন্দের ঝাল ভুনা। আপনি দেশের জন্য এত খাটেন, আপনার শরীরে তো একটু বেশিই ঝালের দরকার, তাই না?” নৈশি অত্যন্ত মধুর গলায় বলল। আব্রাজ প্লেটের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘এত ঝাল খেলে তো আমার লিভার পচে যাবে!’ কিন্তু সে-ও মীর বাড়ির ছেলে, সহজে হার মানার পাত্র নয়। সে নৈশির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে শয়তানি হাসি হাসল। তারপর হুট করেই নিজের হাতটা টেবিলের নিচে নিয়ে গিয়ে নৈশির শাড়ির ওপর দিয়ে তার উরুটা শক্ত করে চিমটি কেটে ধরল। নৈশি আকস্মিক এই আক্রমণে প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কোনোমতে নিজের ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলাল। তার চোখ দিয়ে প্রায় জল বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
“কী হলো নেত্রী? দয়া করে খাবারটা মুখে তুলুন। আপনি তো আবার অন্যের মুখে ঝাল দিতে ভালোবাসেন, নিজের প্লেটে একটু পরোটা নিন।” আব্রাজ মুখে অত্যন্ত ভদ্রতা দেখিয়ে টেবিলের নিচে তার হাতের মুঠো আরও শক্ত করল। নৈশি কাঁটাচামচটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে টেবিলের নিচ দিয়েই আব্রাজের হাঁটুতে নিজের হাঁটু দিয়ে এক জোরালো গুঁতো মারল। আব্রাজ এবার সত্যি সত্যি বিষম খেল।
“খোকা! কী হলো তোর? এভাবে কাশছিস কেন?” বড় খালা চিন্তিত হয়ে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলেন। আব্রাজ জল খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে এক পলক তাকাল। আরযান তখনো পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সব লক্ষ্য করছে, কিন্তু তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। আপাতত তার মাথার সব চিন্তা সাঁঝকে নিয়ে। এখন তো রুমে আঁটকে রেখেছে। রাত নামুক। এই বিয়ে শেষ হোক এইবার সাঁঝকে সে সত্যি চরম শিক্ষা দিবে।
আব্রাজ গলা ঝেড়ে বলল, “কিছু না বড় খালা। আসলে বিরোধী দলের ছোঁড়া কিছু ‘তিরিয্যক বাণ’ হঠাৎ গলায় আটকে গিয়েছিল। তবে সমস্যা নেই, এই বিল আমি সংসদে পাস করিয়েই ছাড়ব।” বিকালের নাস্তা খাওয়া শেষ হতেই মেজো খালা আর বড় খালা রান্নাঘরের দিকে গেলেন। টেবিলে এখন শুধু আরযান, আব্রাজ আর নৈশি।
নৈশি এবার তার আসল চাল চালার জন্য প্রস্তুত হলো। সে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বলল, “মাননীয় সংসদ সদস্য, আপনি যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বড় বড় ভাষণ দেন, নিজের ঘরেই যদি কেউ পারমিশন ছাড়া কারও পার্সোনাল ভিডিও রেকর্ড করে, তবে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত?”
আব্রাজ চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থামল। সে বুঝল নৈশি বড় ভাইয়ের সামনে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বলল, “সেটা নির্ভর করে ভিডিওর সাবজেক্টের ওপর। যদি সাবজেক্ট নিজেই একজন মত্তাবস্থায় থাকা হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি হয়, তবে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সেই ফুটেজ ‘সেফগার্ড’ হিসেবে রাখা বৈধ।”
“ওহ তাই? কিন্তু সেই সেফগার্ড যদি কোনো হ্যাকার চুরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়, আর সেখানে যদি দেখা যায় দেশের একজন স্বনামধন্য তরুন এমপি তার নিজের স্ত্রীর কাছে মার খাচ্ছেন, তবে উনার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের কী হবে? ভোটাররা কি উনাকে ভোট দেবে, নাকি মীর বাড়ির এই কাপুরুষটাকে দেখে হাসবে?” নৈশি চোখ টিপে তকমা লাগাল।
আব্রাজ এবার সত্যি সত্যি একটু দমে গেল। নৈশির মাথা যে এত দূর খেলবে, সে ভাবেনি। সে একটু সোজা হয়ে বসে বলল, “নেত্রী, আপনি কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। আমার ফোন বায়োমেট্রিক লকে লক করা, ওটা হ্যাক করা এত সহজ নয়।”
“ফোনের লক খুলতে পাসওয়ার্ড লাগে না আব্রাজ সাহেব। আপনি যখন রাতে হা করে ঘুমাবেন, তখন আপনার ওই ফর্সা বুড়ো আঙুলটা আমার একটা মাত্র ছোঁয়ার দূরত্বে থাকবে। আমি জাস্ট আঙুলটা ছোঁয়াব, ভিডিওটা নিজের ফোনে নেব, আর তারপর… বুম! ‘এমপি সাহেবের রাতের কীর্তি’ শিরোনামে ব্রেকিং নিউজ!” নৈশি বিজয়ী হাসি হাসল
আব্রাজ আর নৈশির এই ফুসুর-ফুসুর আর ইশারা-ইঙ্গিতের ঝগড়া যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাল, তখন টেবিলের ওপার থেকে গম্ভীর কাশির শব্দ শোনা গেল। মীর আরযান শান তার হাতের পত্রিকাটা ভাজ করে টেবিলের ওপর রাখল। তার সেই পাথুরে চাউনি এবার সরাসরি গিয়ে পড়ল আব্রাজ আর নৈশির ওপর। আরযানের এক একটা চাউনি যেন আদালতের জজের রায়।
–
জমিদার বাড়ির ঝাড়বাতির আলো আজ রাতে যেন একটু বেশিই ঝলমল করছে। সানাইয়ের রাগালাপে মুখরিত চারপাশ, আর রাজকীয় প্যান্ডেলের নিচে হাজারো মেহমানের কোলাহল। আজ মেজো খালামণির মেয়ের বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল উৎসবের মাঝেও কিছু মানুষের চোখ যার ওপর গিয়ে থমকে যাচ্ছে, সে হলো মীর আরভিদের অর্ধাঙ্গিনী, আর্যা।
আর্যার পরনে আজ গাঢ় রয়্যাল ব্লু রঙের একটি মসলিন শাড়ি, যাতে রুপোলি সুতোর ভারী কারুকাজ। গলায় হীরের একছড়া নেকলেস, কানে মানানসই দুল আর চুলগুলো আজ খোঁপায় বাঁধা নয়, বরং একপাশে আলগা করে কাঁধের ওপর ফেলে রাখা। তার এই অপার্থিব রূপের সামনে বিয়ে বাড়ির বাকি সব জাঁকজমক যেন এক মূহূর্তে ফিকে হয়ে গেছে।
আর্যা যখন মেজো খালার পাশে দাঁড়িয়ে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সাথে সৌজন্যমূলক কথা বলছিল, তখন সেই পরিবারের একমাত্র ছেলেটা তার দিক থেকে চোখ সরাতেই পারছে না। ছেলেটা বারবার আর্যার খুব কাছে আসার চেষ্টা করছে এবং অবান্তর সব প্রশ্ন করে আর্যার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আর্যা মনে মনে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করলেও বড়দের সামনে কিছু বলতে পারছে না। প্যান্ডেলের ঠিক অন্য প্রান্তে, মেহমানদের শুভেচ্ছা বিনিমর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরভিদ তেজ। সবার সাথে কথা বললেও আরভিদের তীক্ষ্ণ চিল-দৃষ্টি কিন্তু আটকে আছে আর্যার ওপর। যখন সে দেখল ওই ছেলেটি আর্যার শাড়ির আঁচলের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসছে এবং আর্যার আরো এক কদম এগিয়ে গেল, ঠিক তখনই আরভিদের হাতের কাঁচের গ্লাসটা উনার হাতের চাপে প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আরভিদ হাতের কাঁচের গ্লাসটা পাশের একটি কাঠের টেবিলের ওপর সজোরে রাখল। বরফ কুচি আর কোল্ড ড্রিংকসের গ্লাসটা টেবিলের বুকে কেমন তীক্ষ্ণ শব্দ করে উঠল। আরভিদ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। মাপা কদমে ভিড় ঠেলে সে এগিয়ে গেল আর্যার দিকে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই ছেলেটি আর আর্যার মাঝখানে। তার চওড়া পিঠ দিয়ে আর্যাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেলল সে। আরভিদ তার পকেট থেকে চাবির রিংটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। সে চাউনি এতই বরফশীতল ছিল যে ছেলেটি এক পা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো। আরভিদ অত্যন্ত নিচু গলায় বলল,
“মীর বাড়ির মেহমান হয়ে এসেছ, মেহমানের মতোই থাকো। চোখ দুটো যদি শরীরের সঠিক জায়গায় রাখতে না পারো, তবে গ্রাম থেকে ফেরার রাস্তাটা তোমার জন্য বড্ড অন্ধকার হয়ে যাবে। গেট আউট!”
ছেলেটি ভয়ে এক সেকেন্ডে ফ্যাকাশে হয়ে ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। আর্যা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যাবে, ঠিক তখনই আরভিদ পেছন ফিরে তার ডান হাতটা কবজি বরাবর শক্ত করে চেপে ধরল। তার আঙুলের তপ্ত চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে আর্যা হালকা শিউরে উঠল। সে আর্যাকে প্রায় টেনেই প্যান্ডেল থেকে বের করে নিয়ে এল জমিদার বাড়ির ভেতের প্রবেশ করল। করিডোরের একটা বিশাল শ্বেতপাথরের পিলারের সাথে আর্যাকে এক ঝটকায় চেপে ধরল আরভিদ। আর্যার দুপাশে নিজের দুটো হাত রেখে সে আর্যাকে সম্পূর্ণ খাঁচাবন্দি করে ফেলল। আরভিদের ঘন নিশ্বাস আর শরীরের তপ্ত উত্তাপ আর্যার মুখে এসে আছড়ে পড়ছিল।
“আরভিদ! কী করছ কী? হাত ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে!” আর্যা কাঁপতে কাঁপতে বলল।
আরভিদ কোনো কথা বলল না। সে তার হাত দিয়ে আর্যার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল,
“দেখুক। দেখার মতোই কাজ করব আজ।” আরভিদের গলার স্বর সকালের চেয়েও ভারী আর বুক কাঁপানো শোনাল। “খুব ভালো লাগছিল ওই চুনোপুঁটির চাটুকারিতা? হুম? এত সুন্দর করে সেজেছ কার জন্য আর্যা? অন্য পুরুষেরা যখন তোমার এই রূপের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, তখন আমার কেমন লাগে তুমি জানো?”
আর্যার চোখ দুটো তখন জলে ছলছল করে উঠল, লজ্জায় আর তীব্র অনুরাগে উনার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। সে আরভিদের জামার কলারটা মুঠো করে ধরে বলল,
“কী যা তা বলছ আরভিদ! আমি তো নিজেই অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছিলাম। তুমি কেন এত দেরিতে এলে? আমি তো মনে মনে শুধু তোমাকেই খুঁজছিলাম যে কখন তুমি এসে আমাকে এই ভিড় থেকে উদ্ধার করবে।”
আর্যার মুখে এই স্বীকারোক্তি শুনে আরভিদের চোখের সেই হিংস্র রাগটা এক নিমেষে তীব্র আকুলতায় রূপ নিল। তার হাতটা চিবুক থেকে নেমে এসে আর্যার নরম গালে লেপ্টে গেল। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে আর্যার ঠোঁটের কোণটা আলতো করে ছুঁয়ে সে ফিসফিস করে বলল,
“দেরি? এক সেকেন্ড দেরি হলে আজ এই বিয়ে বাড়িতে একটা রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেত আর্যা। তুমি জানো না মীর আরভিদ তেজ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে যখন কেউ তার বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করে।”
আর্যা নিজের কাঁপতে থাকা শরীরটাকে আরভিদের চওড়া বুকের সাথে আরও একটু মিশিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি জানি… তোমার চোখ দেখেই তো আমি ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন তো আমি তোমার কাছে, একদম তোমার খাঁচায় বন্দি। এখন তো রাগটা কমাবে? নাকি নিজের বউকে এভাবেই ভয় দেখাবে সারারাত?” আরভিদ আর্যার কোমরের মসলিন শাড়ির ভাঁজে নিজের হাতটা শক্ত করে বসিয়ে দিল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় আর্যা চোখ দুটো বুজে ফেলল। আরভিদ তার ঠোঁট দুটো আর্যার কানের লতির খুব কাছে নিয়ে এল, তার তপ্ত নিশ্বাস আর্যার পুরো শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে।
“ভয় দেখাব না তো কী করব? এই রয়্যাল ব্লু শাড়ির প্রতিটা সুতো, তোমার এই উন্মুক্ত ঘাড়, এই বেলী ফুলের সুবাস সবকিছুর ওপর শুধু মীর আরভিদের সিলমোহর মারা আছে। যখন কেউ সেটা ভুলে যায়, আমার মাথা ঠিক থাকে না আর্যা।”
আর্যা তার বুকে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে এক বুক নিশ্বাস নিয়ে বলল, “কেউ ভোলেনি আরভিদ, আর কেউ ভুলবেও না। এই আর্যা নামের মেয়েটার প্রতিটা নিশ্বাস, প্রতিটা ধড়কন শুধু তোমার নাম জপ করে। ওই লোকের দিকে তো আমি তাকাইওনি। আমার চোখ তো শুধু প্যান্ডেলের ওই প্রান্তে থাকা আমার অবাধ্য স্বামীটাকেই দেখছিল।”
আরভিদ আর্যার চুলে মুখ ডুবিয়ে এক গভীর টান দিল। সেই সুবাস উনাকে পাগল করে দিচ্ছে। সে আর্যাকে দেয়ালের সাথে আরও একটু চেপে ধরে বলল, “আজকের এই রাতটা বড্ড বড় আর্যা। নিচে ওই বিয়ের আদিখ্যেতার মাঝে আমি আমার এই রূপসী বউকে এক সেকেন্ডের জন্যও আর হাতছাড়া করছি না। এখনই যদি তোমাকে নিয়ে আমি আমার ঘরে চলে যাই, কেউ আটকানোর সাহস পাবে?”
আর্যা আলতো করে হেসে আরভিদের চোখের দিকে তাকাল। আর্যা তার ঠোঁটে নিজের আঙুল রেখে আদুরে গলায় বলল, “পাগলামি করো না তো! মা-খালারা কী ভাববেন? আজ বড় অনুষ্ঠান, কত কাজ বাকি! আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা আরভিদ… তারপর তো পুরো রাতটাই তোমার। তখন তো আর এই আর্যা তোমার কোল থেকে কোথাও পালিয়ে যেতে পারবে না।”
“কয়েক ঘণ্টা? মীর আরভিদের ডিকশনারিতে এক মিনিট মানে এক যুগ আর্যা।” আরভিদ আর্যার ঠোঁটের দূরত্বটুকু এক মূহূর্তে মুছে দিল। “আজ এই করিডোর, এই ঝাড়বাতির আবছা আলো আর এই রয়্যাল ব্লু মসলিন সব আমাদের এই চুরির সাক্ষী হয়ে থাকবে।”
আরভিদ আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে আর্যার সেই কাঁপতে থাকা, রেশমি ঠোঁটদুটোকে নিজের গভীর চুম্বনে টেনে নিল। আর্যার হাত দুটো আরভিদের গলার চারপাশে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
বাইরে তখন সানাইয়ের সুর আরও উগ্র হচ্ছে, মেহমানদের কোলাহল চলছে, কিন্তু এই অন্ধকার করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আর্যা তখন মীর আরভিদের সেই তীব্র, দমবন্ধ করা ভালোবাসার ঝড়ে নিজেকে সম্পূর্ণ উজার করে দিয়েছে। মীর বাড়ির ছেলেদের অধিকারবোধ যে কতটা ভয়ঙ্কর আর সুন্দর, আর্যা আজ রাতে তা নিজের প্রতিটি কোষে কোষে টের পাচ্ছে। করিডোরের বাতাসে তখন কেবলই দুটি তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের ফিসফিসানি আর সমর্পণের উৎসব।
–
মীর বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে এখন উৎসবের আলোর রোশনাই। উঠোনের বিশাল প্যান্ডেলে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে শত শত মেহমান। অবনীকে আজ দেখতে এতটাই মায়াবী লাগছিল যে প্যান্ডেলের আলোটাও যেন তার সামনে ফিকে। কপালে ছোট একটা কালো টিপ, কানে ঝুমকো আর হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি। অবনী আজ প্রায় তিন ঘণ্টা সময় নিয়ে সেজেছে শুধু একজন মানুষের জন্য। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে রাজ তাকে এক প্রকার পাত্তাই দেয়নি। মেজো দাদুর সেই ‘পেত্নী আতঙ্ক’ সামলাতে তাকে দীর্ঘ সময় দিতে হয়েছে, তারপর মীর আরযানের নির্দেশে ঢাকার এলিট গেস্টদের দেখভাল করতে হয়েছে। এই পুরো সময়ে সে অবনীর দিকে ভালো করে তাকানোরও সুযোগ পায়নি। আর এটাই অবনীর মনে এক মস্ত বড় অভিমানের পাহাড় তৈরি করেছে। অবনী এখন প্যান্ডেলের এক কোণে দাঁড়িয়ে মেজো খালার বান্ধবীদের মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে। মুখে তার জোরপূর্বক আনা হাসি। কিন্তু রাজ দূর থেকে লক্ষ্য করল, অবনী যখনই তার দিকে তাকাচ্ছে, তার চোখের মণি দুটো রাগে আর অভিমানে ছোট হয়ে আসছে। সে রাজকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে অন্য সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। রাজের ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ফুটে উঠল। সে চশমাটা নাক বরাবর একটু সোজা করে মনে মনে বলল, “আমার সামনে সাইকোলজিক্যাল গেম? ডক্টর রাজের অবহেলা সহ্য করা এত সহজ নয়, অবনী । এবার তোমাকে থেরাপি দেওয়ার সময় এসেছে।”
রাজ ধীরপায়ে মেজো খালার দিকে এগিয়ে গেল। অত্যন্ত ভদ্র এবং মার্জিত গলায় বলল, “মেজো খালামণি, মেজো দাদুর ঘরের আলমারিতে একটা জরুরি প্রেসক্রিপশন আর ওষুধের ফাইল রয়ে গেছে। আমার এই মুহূর্তে ওটা দরকার, কিন্তু আমি তো গেস্টদের ছেড়ে যেতে পারছি না। অবনীকে একটু বলবে ওটা এনে দিতে?”
মেজো খালা ব্যস্ততার মাঝে রাজের পাতা ফাঁদটা বুঝতেই পারলেন না। তিনি সাথে সাথে অবনীকে ডেকে বললেন, “বউ শুনছো? মেজো দাদুর ঘরের আলমারি থেকে রাজের ওষুধের ফাইলটা একটু এনে দেও তো মা। ওদিকে দাদু আবার কখন অস্থির হয়ে পড়ে ঠিক নেই।”
অবনী রাজের দিকে এক ঝলক তাকাল। রাজের চোখে তখন রহস্যময় চাউনি। অবনী মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। সে খুব ভালো করেই জানে রাজ নিজেই গিয়ে ওটা আনতে পারত। কিন্তু খালার সামনে তো আর না বলা যায় না। সে মিষ্টির ট্রে-টা টেবিলে রেখে গটগট করে পা ফেলে জমিদার বাড়ির ভেতরের অন্দরমহলের দিকে রওনা দিল। তার শাড়ির কুঁচির খশখশ শব্দ আর পায়ের নূপুরের আওয়াজ বলছিল, সে কতটা রেগে আছে। রাজ একটু সময় নিল। মেজো খালার সাথে আরও দুটো সৌজন্যমূলক কথা বলে, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেও ধীরপায়ে অবনীর পিছু পিছু অন্দরমহলের দিকে পা বাড়াল।
জমিদার বাড়ির পেছনের অংশের এই ঘরটা বড্ড পুরনো আর নির্জন। মেজো দাদু ঘুমানোর পর এইদিকের করিডোরে মেহমানদের যাতায়াত একদমই নেই। ঘরটার ভেতরে একটা আবছা অন্ধকার ছায়া জমে আছে। কেবল জানালার ফাঁক গলে বাইরের সোডিয়াম লাইটের কিছুটা আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। অবনী আলমারির পাল্লাটা খুলে খটখট শব্দে ফাইল খুঁজছিল। তার ফর্সা কপালে রাগ আর গরমে হালকা ঘামের বিন্দু জমে উঠেছে। সে বিড়বিড় করে বলছিল, “অভদ্র, কাঠখোট্টা একটা ডাক্তার! সারাদিন শুধু দুনিয়ার পাগলদের পেছনে সময় আছে, আর আমার দিকে তাকানোর এক সেকেন্ড সময় নেই। এখন আবার হুকুম করা হচ্ছে! আমি কেন এলাম? আমি তো বলতেই পারতাম আমার পা ব্যাথা করছে!” ঠিক তখনই পেছনের ভারী কাঠের দরজাটা বন্ধ হওয়ার একটা মৃদু শব্দ হলো।
দরজার লক হওয়ার সুক্ষ্ম শব্দটা অবনীর কানের পর্দায় এসে ধাক্কা মারল। তার পুরো শরীর এক মূহূর্তে জমে পাথর হয়ে গেল। আলমারির হাতলটা শক্ত করে ধরে সে পেছনে তাকানোর সাহস পাচ্ছিল না। ঘরের ভেতরের বাতাসটা যেন হঠাৎ করেই বড্ড ভারী আর তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাতাসে এখন মেজো দাদুর ওষুধের গন্ধ নেই, বরং রাজের ব্যবহার করা দামী মেল-পারফিউমের সেই চেনা, মাদকতা ভরা সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে।
অবনী ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়াল। অন্ধকারে সে দেখল, রাজ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দুহাতে বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের চশমাটা এখন আর চোখে নেই, সেটা সে শেরওয়ানির পকেটে গুঁজে রেখেছে। চশমা ছাড়া রাজের চোখ দুটোকে বড্ড বেশি ধারালো, গভীর আর নেশাতুর দেখায়। যেন সে এক নজরেই অবনীর মনের সবটুকু পোশাক খুলে তার ভেতরের নগ্ন অভিমানটাকে দেখে ফেলছে।
“দরজা লক করলে কেন? মা-খালারা দেখলে কী ভাববেন? হাত সরাও, আমি নিচে যাব।” অবনী নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব কঠিন করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার ভেতরের কাঁপুনিটা লুকানো গেল না।
রাজ কোনো কথা বলল না। সে তার দাপুটে, মাপা কদমে অবনীর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। কাঠের মেঝেতে তার বুটের প্রতিটা শব্দ অবনীর হৃদস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিল। অবনী পিছু হটতে চাইল, কিন্তু পেছনেই আলমারির শক্ত কাঠ। তার পালানোর আর কোনো রাস্তা নেই। রাজ এসে অবনীর একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্বটা এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। রাজের শরীরের তপ্ত ওম অবনীর সুতি শাড়ির দেয়াল ভেদ করে তার চামড়ায় গিয়ে বিঁধছিল। রাজ তার একটা হাত বাড়িয়ে অবনীর মাথার ঠিক পাশে আলমারির গায়ে রাখল। এতে অবনী এক প্রকার রাজের চওড়া বুকের খাঁচায় বন্দি হয়ে গেল। সে চোখ তুলে রাজের দিকে তাকাতে পারছিল না। তার লম্বা চোখের পাপড়িগুলো কাঁপছিল।
“কী হলো অবনী? সারাদিন তো খুব চঞ্চল হরিণীর মতো সবার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে। এখন আমার সামনে আসতেই এতটা কুঁকড়ে যাচ্ছ কেন?” রাজের গলার স্বর বড্ড নিচু।
অবনী মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “আমি কুঁকড়ে যাচ্ছি না। আমার নিচে অনেক কাজ আছে। ফাইলটা নাও আর আমাকে যেতে দাও।”
রাজ অন্য হাত দিয়ে অবনীর চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে তার দিকে ফেরাল। উগ্র চাউনিতে অবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “কাজ? নাকি পলায়ন? ডক্টর রাজের চোখ ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয় অবনী। সারাদিন ধরে যে অবহেলার নাটকটা তুমি করলে, তার একটা প্রেসক্রিপশন তো আজ রাতেই দরকার, তাই না?”
অবনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের এতক্ষণের জমে থাকা অভিমান বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো বেরিয়ে এল। সে রাজের হাতটা চিবুক থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল, “নাটক আমি করছি, নাকি তুমি করছ? হ্যাঁ? সারাদিন ধরে তুমি আমাকে একবারও ডেকেছ? এই যে আমি তিন ঘণ্টা ধরে পার্পল কালারের শাড়িটা পরেছি, চুলে বেলী ফুল জড়িয়েছি কাকে দেখানোর জন্য? তুমি তো মেজো দাদুর ভূত তাড়াতে আর ওই ঢাকার গেস্টদের তেল দিতেই ব্যস্ত ছিলে! আমার দিকে তো একটা বারও চোখ তুলে তাকাওনি! এখন এসেছ বড় ডাক্তার দেখাতে? হাত সরাও বলছি!”
অবনী রাজের বুকে দুহাত দিয়ে ধাক্কা মারার চেষ্টা করল, কিন্তু রাজ যেন এক অটল পাহাড়। সে একটুও নড়ল না, বরং অবনীর দুটো ছটফট করতে থাকা হাত এক ঝটকায় ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। অবনীর কাঁচের চুড়িগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে টুংটাং শব্দে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। রাজ অবনীর আরও কাছে চলে এল। তাদের নাক প্রায় ছুঁইছুঁই। রাজের ঘন নিশ্বাস অবনীর ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ছিল। “তাকাইনি?” রাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। “তুমি ভাবছ রাজ তোমাকে দেখেনি? যখন তুমি বিকেল চারটায় ওই প্যান্ডেলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলে, তোমার শাড়ির আঁচলটা বাতাসের টানে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল, আমি দূর থেকে দেখেছি। যখন তুমি মেজো খালার পাশে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেতে গিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণায় হালকা ক্রিম লাগিয়ে ফেললে, আমি সেটাও দেখেছি অবনী।” অবনীর রাগি চোখ দুটো এক মূহূর্তে বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রাজ তাকে কোনো সুযোগ দিল না। সে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “যখন মেজো খালার দূর সম্পর্কের ওই কাজিনটা তোমার দিকে একটু বেশি সময় ধরে তাকিয়ে ছিল, আমার হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। আমি যদি তখন সাইকিয়াট্রিষ্টের বর্মটা পরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করতাম অবনী, তবে আজ বিকেলে ওই প্যান্ডেলের নিচে একটা বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত। তুমি ভাবছ আমি তোমাকে অবহেলা করেছি? সারাদিন ধরে দুনিয়ার পাগলদের থেরাপি দিতে দিতে এই ডাক্তার নিজেই যে আজ একটা মরণ রোগে আক্রান্ত, সেটা বুঝি এই অভিমানী মেয়েটা দেখবে না?”
রাজ অবনীর হাত দুটো ছেড়ে দিল, কিন্তু তার দূরত্ব কমাল না। তার হাতটা এবার নেমে এল অবনীর কোমরের শাড়ির ভাঁজে। অবনী এক তীব্র শিহরণে চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার হাত দুটো অবলীলায় রাজের শেরওয়ানির কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। “তাহলে… তাহলে তখন এসে একটু বলতে পারলে না যে আমাকে সুন্দর লাগছে?” অবনীর কণ্ঠস্বর এখন পুরোপুরি বুজে এসেছে।
“বললে কি আর এই নির্জন ঘরে তোমাকে এভাবে একান্তে পেতাম?” রাজ অবনীর কানের লতির খুব কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল। তার উষ্ণ নিশ্বাস অবনীর পুরো শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল। “সবার সামনে রাজ বড্ড গম্ভীর, বড্ড ভদ্র। কিন্তু তার ভেতরের সবটুকু অবাধ্যতা, সবটুকু তীব্রতা শুধু তার এই বেগুনি শাড়ি পরা মেয়েটার জন্য তোলা থাকে। রাগটা এবার কমাও অবনী, নতুবা এই ডাক্তার আজ রাতে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই তোমাকে সারারাত এই ঘরে বন্দি করে রাখার থেরাপি দেবে।”
অবনী আলতো করে হেসে রাজের বুকের মাঝে নিজের মুখটা লুকাল। তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর তীব্র ভালোবাসায় তখন লাল জবা ফুলের মতো দেখাচ্ছিল। সে রাজের বুকে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল,
“তুমি একটা আস্ত পাগল, রাজ। দুনিয়ার মানুষকে সুস্থ করো, আর নিজে দিন দিন একটা বদ্ধ পাগল হয়ে যাচ্ছ।”
“এই পাগলামির ওষুধ তো শুধু তোমার কাছেই আছে, অবনী।” রাজ অবনীর চিবুকটা আবার উঁচিয়ে ধরল।
রাজ আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। জানালার ফাঁক গলে আসা আবছা আলোর মাঝে সে অবনীর সেই কাঁপতে থাকা ঠোঁটদুটোকে নিজের গভীর চুম্বনে টেনে নিল। অবনীর হাত দুটো রাজের পিঠের ওপর আরও শক্ত বাঁধনে জড়িয়ে ধরল। আসলে মীর বাড়ির ছেলেদের অবহেলা যেমন তীব্র, তাদের ভালোবাসার দহন তার চেয়েও শতগুণ বেশি ভয়ঙ্কর আর সুন্দর।
–
তাজ শ্বেতপাথরের প্রাচীন পিলারটায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার অফ-হোয়াইট কুর্তার হাতা সামান্য গোটানো ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা টিকটিক করে ঘুরছে। বিমানের ককপিটের ডিজিটাল ক্লকের সাথে এই মন্থর গতির সময়ের কোনো মিল নেই। ককপিটে সময় কাটে নিয়মের কড়া শৃঙ্খলে, আর এখানে সময় যেন আলসে বিড়ালের মতো হাই তুলছে। বড় ভাই মীর আরযান কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাজ টের পায়নি।
“কী রে তাজ? একা একা পিলার পাহারা দিচ্ছিস? তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুই কোনো প্যাসেঞ্জার প্লেন ক্র্যাশ করার আশঙ্কায় আছিস। একটু রিল্যাক্স কর।”
তাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “না ভাইয়া, এমনি। পরিবেশটা দেখছিলাম।”
আরযান একটু হাসল। “পরিবেশ দেখছিস, নাকি পরিবেশের আড়ালে অন্য কিছু খুঁজছিস? ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন বড় খালার খালাতো ভাই, মোবারক হোসেন। মোবারক সাহেব লোকটা অদ্ভুত। তিনি সারাজীবন এলআইসি-র দালালি করেছেন। দুনিয়ার যেকোনো আনন্দঘন কথাকে তিনি ঘুরেফিরে মানুষের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে ওস্তাদ।
মোবারক সাহেব তাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে তাজ বাবাজি যে! পাইলট মানুষ। আকাশে ওড়ো। ভয়ডর করে না?”
তাজ বিনীতভাবে বলল, “না মামা। ওটা আমার প্রফেশন।”
মোবারক সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হুম। প্রফেশন তো বটেই। তবে আকাশে থাকা মানেই তো মৃত্যুর এক হাত কাছাকাছি থাকা। যেকোনো সময় ইঞ্জিন বিকল, পাখি ঢুকে যাওয়া, ব্যস! মানুষ মরে গেলে তার পলিসির টাকাটা কে পাবে, সেটা ঠিক করে রেখেছ তো? একটা বিয়ে-শাদি করে ফেলো। অন্তত বউ টাকাটা পাবে। একা মানুষ মরে গেলে সরকারের খাতায় টাকা চলে যায়, বড় ঝামেলা।”
আরযান সাহেব হেসে ফেললেন, “মোবারক মামা, গায়ে-হলুদের আসরে এসব মৃত্যুর বীমা বাদ দিন। তাজের লাইফ ইন্সুরেন্স অনেক বড় অঙ্কের, চিন্তা করবেন না।”
মোবারক সাহেব মাথা নাড়তে নাড়তে জর্দা মুখে দিয়ে চলে গেলেন, “তবুও, সাবধানের মার নেই। মরণ তো আর বলে-কয়ে আসে না।” মোবারক মামা যেতেই তাজের পকেট আবার কেঁপে উঠল। আরযান আড়চোখে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিলেন। তাজ একটু সরে এসে ফোনটা বের করল। সিয়ার মেসেজ। এবার কোনো টেক্সট নয়, একটা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে সে। তাজ চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরল।
ক্যাপ্টেন তাজ স্যার! ঢাকার আকাশ এখন পুরোপুরি কালো। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছি আর ভাবছি গ্রামের বিয়ে বাড়িতে কি এখন ইলিশ-খিচুড়ি রান্না হচ্ছে? নাকি আপনার ওই গম্ভীর বাউন্সার চেহারার ভয়ে বাবুর্চি মশলা দিতেই ভুলে গেছে? স্যার, একটা সত্যি কথা বলবেন? আপনি কি ছোটবেলায় হাসতে গিয়ে গাল মচকে ফেলেছিলেন? তাই এখন আর হাসেন না? আই অ্যাম জাস্ট কিউরিয়াস, স্যার!”
তাজ নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটাকে কী বলা যায়? সে দ্রুত আঙুল চালিয়ে টাইপ করল:
“সিয়া, তুমি কি অফিস টাইমে শুধু আমার হাসির হিসেব রাখার জন্য বেতন পাও? ঢাকায় বৃষ্টি হচ্ছে, ভালো কথা। গিয়ে রিপোর্টে মন দাও। আর আমার গাল ছোটবেলায় মচকায়নি, তবে তোমার এই অবান্তর কথাবার্তা শুনতে থাকলে সোমবার অফিসে তোমার মগজ মচকে দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করব।”
সিয়ার উত্তর এল মাত্র তিন সেকেন্ডে। এবার টেক্সট:
“মগজ মচকালে তো খুব ভালো হবে স্যার! তখন আপনি আর সোজা হয়ে পাইলটের মতো ডিসিপ্লিন্ড হাঁটতে পারবেন না। সাধারণ মানুষের মতো একটু হেলেদুলে লুপ খেয়ে হাঁটবেন। আচ্ছা স্যার, একটা খেলা খেলি? আপনি এখন বিয়ে বাড়ির যে কোনো একটা বাচ্চার সাথে গিয়ে কথা বলুন। বাচ্চার নামটা আমাকে জানান। যদি বাচ্চাটা আপনার কথা শুনে না কাঁদে, তবে বুঝব আপনার ভেতর এখনো একটু হলেও ‘মানুষ’ অবশিষ্ট আছে। আর যদি কেঁদে দেয়, তবে সোমবার অফিসে এসে আমি আপনার জন্য এক কাপ স্পেশাল তিতো কফি বানাব। ডিল?”
তাজ ফোনটা পকেটে রেখে চারপাশ তাকাল। খেলাটা সে খেলবে না, প্রথমটায় ভেবেছিল। কিন্তু কেমন যেন একটা জেদ চেপে গেল। সে তাজের মতো একজন দক্ষ পাইলট, যে কি না শত শত যাত্রী নিয়ে ঝড়-তুফান সামলায়, সে একটা গ্রামের বাচ্চাকে হাসাতে পারবে না? এটা তো তার ইগোতে লাগছে।
প্যান্ডেলের এক কোণে একটা ছোট, চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটার পরনে লাল রঙের শেরওয়ানি, মাথায় একটা ঢিলেঢালা পাগড়ি। ইশ বর সেজেছে। সে একহাতে একটা প্লাস্টিকের গাড়ি নিয়ে একা একা আপনমনে খেলছিল। তাজ গুটি গুটি পায়ে বাচ্চাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নিজের স্বাভাবিক গম্ভীর গলায় বলল, “এই যে, শুনছ?”
বাচ্চাটা চমকে উঠে তাজের দিকে তাকাল। তাজের বিশাল চওড়া শরীর, লম্বা গড়ন আর পাথরের মতো গম্ভীর মুখ দেখে বাচ্চাটার হাতের প্লাস্টিকের গাড়িটা ঠাস করে নিচে পড়ে গেল। তার পুচকে ঠোঁট দুটো কাঁপতে শুরু করল। তাজ বিপদ টের পেয়ে নিজের মুখটা একটু নরম করার চেষ্টা করল। সে নিচে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “তোমার নাম কী? গাড়িটা সুন্দর তো!”
তাজের এই জোর করে আনা ভালোমানুষি দেখে বাচ্চাটার ভয় আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে এক সেকেন্ড তাজের দিকে তাকাল, তারপর ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে চিৎকার দিল।
“আম্মুউ!!!!’ বলেই সে শেরওয়ানি গুটিয়ে উল্টো দিকে দৌড়ে পালালো।
তাজের কপাল আর কান দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে সিয়াকে লিখল, “বাচ্চাটার নাম জানি না। তবে সে কেঁদে দিয়েছে। সোমবার কফিটা যেন খুব বেশি তিতো না হয়। দ্যাটস অল।”
সিয়ার রিপ্লাই যেন তৈরিই ছিল, “হা হা হা! আই নিউ ইট, স্যার! আপনার ওই আইসবার্গের মতো লুক দেখে মাঝ আকাশে মেঘেরা পথ ছেড়ে দেয়, আর সে তো একটা পুচকে বাচ্চা! তবে ডোন্ট ওয়ারি স্যার, কফিটা তিতো হলেও তাতে আমি এক ফোঁটা মায়ায় ভরা চিনি মিশিয়ে দেবো। যাতে বাউন্সার স্যারের মনটা একটু গলে। আচ্ছা স্যার, একটা শেষ কথা… গ্রামের আকাশে কি এখন চাঁদ উঠেছে? ঢাকার মেঘে তো চাঁদটা পুরো ঢাকা পড়েছে। দেখতে পাচ্ছি না।”
তাজ ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে প্যান্ডেলের বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকাল। বিকেল গড়িয়ে কখন যেন সন্ধ্যা নেমেছে। গ্রামের পরিষ্কার, দূষণহীন আকাশে একটা রুপোলি কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। সেই চাঁদের মায়াবী আলো পিলুগ্রামের বাঁশঝাড়, সুপুরি গাছ আর পুকুরের স্থির পানিতে এক অপার্থিব রূপ তৈরি করেছে। চারপাশের শ্যাওলা আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এক অদ্ভুত একাকীত্বের সুর তুলছে। তাজ মনে মনে ভাবল, ঢাকার মেঘে হয়তো চাঁদ ঢাকা পড়েছে, কিন্তু সিয়া নামের এই দূরন্ত, অবাধ্য মেঘটা তার নিজের মনের সব শৃঙ্খল, গাম্ভীর্য আর ডিসিপ্লিনকে কেমন যেন এক অদ্ভুত মায়ায় ঢেকে ফেলছে। সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনে টাইপ করল,
“হ্যাঁ, চাঁদ উঠেছে। অনেক আলো। তোমার রিপোর্টের শেষ পাতাটা টেবিলের ওপর রেখে দিও, সোমবার আমি নিজেই ওটা সাইন করব। আর… ঢাকায় বৃষ্টি হলে সাবধানে বাড়ি ফিরো। মরে টরে গেলে আমি আবার এমন অপদার্থ কর্মী পাবো কোথা থেকে?”
সিয়ার রিপ্লাই আসার আগেই তাজ নেট বন্ধ করে দিলো। এই মেয়ের পাখা যদি সে না কেটেছে। একবার ঢাকায় ফিরুক।
–
সাঁঝ বিছানায় হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে বসে অন্ধকারের মাঝেই দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। তালা খোলার শব্দ হতেই ঘরের ভেতর করিডোরের সোনালী আলো এসে আছড়ে পড়ল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মীর আরযান শান। তার জামার গলার কাছের বোতামগুলো সামান্য আলগা। তার ডানহাতে একটা বিশাল রুপোলি ট্রে, যেখান থেকে ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি বিরিয়ানির সুবাস পুরো অন্ধকার ঘরটাকে এক মূহূর্তে মাতিয়ে তুলল। আরযান ঘরে ঢুকে পা দিয়ে ধাক্কা মেরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। টেবিলের ওপর ট্রে-টা রেখে দেয়ালের সুইচে চাপ দিতেই ঝাড়বাতির আবছা হলুদ আলোটা জ্বলে উঠল। সাঁঝ ঝটকা দিয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সে এমন একটা ভাব করল যেন আরযান নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই। আরযান টেবিল থেকে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানির প্লেটটা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এল। সে সাঁঝের ঠিক মুখোমুখি একটা বেতের চেয়ার টেনে বসল। তার মুখাবয়ব বরাবরের মতোই শান্ত আর গম্ভীর।
“মুখটা ওদিকে ঘুরিয়ে রাখলে পেটের খিদে কমবে না, সাঁঝ। সোজা হয়ে বোস।”
সাঁঝ দেয়াল পানে তাকিয়েই নাক ফুলিয়ে বলল, “আপনার সাথে আমি কোনো কথা বলব না। আপনি একটা আস্ত জল্লাদ, আরযান ভাইয়া! বিয়ে বাড়িতে সবাই এনজয় করছে, আর আপনি নিজের বোনকে এভাবে চোরের মতো ঘরে আটকে রেখেছেন? আপনার একটুও গায়ে বাধল না? ছোটবেলায় তো আপনার হাফপ্যান্ট টেনে পুকুরে ফেলে দিইনি তবুও শোধ নিচ্ছেন। “
আরযান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে প্লেট থেকে এক টুকরো খাসির মাংস আঙুল দিয়ে আলতো করে ভাঙতে ভাঙতে বলল, “ ফেলবি কেমনে? হাফপ্যান্ট টেনে পুকুরে ফেলার বয়সে আমি ফুলপ্যান্ট পড়তাম। আর তোকে মাথায় তুলে রেখেছি বলেই তুই আজ এত বড় বড় ক্রাইম করতে পারলি। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে তাকে দুনিয়ার বাইরে পাঠিয়ে দিতাম।”
সাঁঝ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝটকা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে আরযানের চোখের দিকে তাকাল। “কীসের ক্রাইম? হ্যাঁ? আপনি তো শুধু আমার দোষটাই দেখেন!”
“দোষ দেখব না?” আরযান সাঁঝের খুব কাছে ঝুঁকে এল। “আজ দুপুর আড়াইটায় মেজো খালার আস্ত একটা দেশি মোরগ চুরি করে, পেছনের বাগানে নিয়ে ২০০০ টাকায় বিক্রি করেছিস তুই। সেই টাকা দিয়ে পাড়ার ছোকরা গ্যাং নিয়ে পিকনিক করাটা কোন আইনের ভেতর পড়ে?”
সাঁঝ একটু আমতা আমতা করে বলল, “ওটা চুরি ছিল না! ওটা ছিল বদলা। মেজো খালা কাল রাতে আমার আইসক্রিম লুকিয়ে রেখেছিল, আমি জাস্ট তার বিচার করেছি।”
আরযান একটা মৃদু, কুটিল হাসল। সে মাথা নেড়ে বলল, “আইসক্রিমের বদলে তিন কেজি ওজনের জ্যান্ত দেশি মোরগ? তোর ইকোনমিক্স তো বেশ খতরনাক, সাঁঝ! তোর হাত তখন এত জোরে ধরেছিলাম লেগেছিল তাই না?”
সাঁঝ চট করে তার ডান হাতটা ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। আরযান প্লেটটা বিছানায় রেখে এক চুলও সময় নষ্ট না করে সাঁঝের লুকিয়ে রাখা হাতটা এক ঝটকায় টেনে বের করল। সাঁঝের ফর্সা কবজিটা সত্যি কিছুটা ফুলে লাল হয়ে আছে। কাদার ভেতর ডাইভ দিতে গিয়ে সে যে ব্যথা পেয়েছে, সেটা এতক্ষণ রাগের মাথায় বুঝতে পারেনি। আরযান তার চোখের গাম্ভীর্য আরও বাড়িয়ে বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম সাঁঝ, আজ যদি আর একটাও পাগলামি করিস, তবে তোর শরীরে আমি এমন দাগ করে দেব যা সহজে মুছবে না। মীর আরযানের কথার খেলাপ হয় না। এবার তোকে আমার স্পেশাল থেরাপি দিতে হবে।”
সাঁঝ ভয় আর বিস্ময় মেশানো চোখে তাকিয়ে বলল, “কীসের থেরাপি? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন আরযান ভাইয়া? ছাড়ুন আমার হাত! আপনি একটা আস্ত শয়তান…!”
আরযান কোনো উত্তর দিল না। সে তার পকেট থেকে একটা ছোট কাঁচের শিশি বের করল। ওটা তীব্র ঝাঁঝালো আয়ুর্বেদিক লিনিমেন্টের একটা মিশ্রণ। যা আরযান নিজে তৈরি করেছে হাড়ের মচকানির জন্য। ওষুধটার গন্ধ এতই কড়া যে ঘরের বিরিয়ানির সুবাসকে এক মূহূর্তে ছাপিয়ে গেল। আরযান সাঁঝের খাটের ওপর চেপে বসে তার ফুলে থাকা কবজিটা নিজের বাম হাতের শক্ত মুঠোয় বন্দি করল। সাঁঝের নড়ার কোনো ক্ষমতা রইল না। আরযান ডানহাতে সেই তীব্র ঝাঁঝালো মলমটা সাঁঝের কবজিতে ঢেলে দিল।
“আরযান ভাইয়া! উফফ, পুড়ছে! ছাড়ো, প্লিজ ছাড়ো!” সাঁঝ ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। মলমটার ছোঁয়া লাগতেই চামড়ায় যেন আগুন ধরে গেল।
“চুপচাপ বসে থাক,” আরযান অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল। সে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সাঁঝের মচকানো রগের ওপর প্রচণ্ড চাপ দিয়ে ম্যাসাজ করতে লাগল। আরযানের আঙুলের তীব্র ঘষায় আর মলমের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাঁঝের ফর্সা চামড়াটা মুহূর্তের মধ্যে জবা ফুলের মতো টকটকে লাল হয়ে এক গভীর, স্পষ্ট দাগে রূপ নিল।
“আহহ্! মরে গেলাম! তুই একটা জল্লাদ আরযান ভাইয়া! আমি বড় আব্বুকে বলে দেব আপনি আমাকে টর্চার করছেন!” সাঁঝের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল, তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে।
আরযান হাতটা ছেড়ে দিয়ে শান্ত মুখে শিশিটা পকেটে রাখল। সাঁঝের কবজির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর বড় আব্বু নিজেই তোকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছেন এই বাঁদরামো থামানোর জন্য। দেখ, কবজির এই লাল দাগটা কাল সকাল পর্যন্ত থাকবে। যতবার তুই হাতটা দেখবি, ততবার মনে পড়বে তুই কার খাঁচায় আছিস। এটা মীর আরযানের থেরাপি। অবাধ্য রোগীদের নার্ভ সোজা করার দাওয়াই।”
সাঁঝ নিজের লাল হয়ে যাওয়া হাতটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দেয়ালের দিকে মুখ ফেরাল। “আমি আপনার মুখও দেখতে চাই না। আপনি বড্ড নিষ্ঠুর। দুপুর থেকে পেটে একটা দানাপানি পড়েনি, তুমি এসে আমাকে আরও কষ্ট দিলে।”
আরযান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখের সেই কঠিন পাথুরে ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল এক গভীর, আকুল উদ্বেগ। সে আবার বিরিয়ানির প্লেটটা হাতে তুলে নিল। নিজের আঙুল দিয়ে বিরিয়ানির চাল, নরম আলু আর খাসির মাংসের তুলতুলে অংশটা একসাথে মেখে একটা বড় লোকমা তৈরি করল। সে সাঁঝের কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘোরাল। সাঁঝের ভেজা চোখ আর লাল হয়ে যাওয়া নাকটা দেখে আরযানের বুকের ভেতর কোথাও একটা সূক্ষ্ম মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু সে তা প্রকাশ করল না।
“এবার কান্না থামা। হা কর,” আরযান লোকমাটা সাঁঝের মুখের সামনে ধরে ধমকের সুরে বলল।
“আমি খাব না বললাম না! আপনার ওই বিষাক্ত ভাত আপনি খান!” সাঁঝ মুখটা শক্ত করে বন্ধ করে রাখল।
হা কর বলছি সাঁঝ! নইলে এবার কিন্তু দাগটা কবজি ছেড়ে তোর ওই ফর্সা গালে পড়বে,”*আরযান তার গলার স্বর এক পর্দা চড়ালো। “দুপুর থেকে পেটে কিছু পড়েনি, অথচ জেদ দেখানোর সময় কম পড়ে না! মীর বাড়ির মেয়ল উপোস করে ঘরে কাঁদবে আর বাইরে আমি মেহমানদের সাথে হাসিমুখে কাচ্চি চিবোব এত বড় কুলাঙ্গার আমি নই। হা কর!”
এই লোকটা তাকে যেমন খাঁচায় বন্দি করতে পারে, ঠিক তেমনি নিজের বুকের সবটুকু ওম দিয়ে আগলে রাখতেও জানে। সে আর না পেরে লক্ষ্মী মেয়ের মতো চোখ বন্ধ করে মুখটা খুলল। আরযান প্রথম লোকমাটা তার মুখে পুরে দিল।
“চিবিয়ে খা। গিলবি না একদম। ছোট বাচ্চাদের মতো গিলে ফেলার বদভ্যাস তোর এখনো গেল না,” আরযান শাসাতে শাসাতে বলল, আবার পরক্ষণেই অত্যন্ত আলতো করে নিজের সুতি রুমালটা দিয়ে সাঁঝের গাল বেয়ে পড়া চোখের জল আর ঠোঁটের কোণের মশলা মুছে দিল।
সাঁঝ মুখে খাবার নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “ধীরে দেন… গলায় আটকে যাচ্ছে তো…”
“আটকালে পানি আছে,” আরযান দ্বিতীয় লোকমাটা রেডি করতে করতে বলল। “সারাদিন তো টো টো করে পাড়া মাথায় করিস, তখন তো গলা আটকায় না? মেজো খালার মোরগটা যখন বিক্রি করছিলি, তখন বুঝি খুব খিদে পেয়েছিল?”
“আমি ওটা গরিব বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য করেছি। সাঁঝ চিবোতে চিবোতে চোর চোর গলায় বলল।
“তোর ওই গরিব বাচ্চাদের লিডারগিরি আমি সোমবার ঢাকা গিয়ে ছুটিয়ে দেব। এখন চুপচাপ পুরো প্লেটটা শেষ কর।” আরযান একের পর এক লোকমা সাঁঝের মুখে তুলে দিতে লাগল।
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৮
-
প্রেম আসবে এভাবে গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৭+৩৮
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
প্রেমতৃষা ৪২ ( শেষ অর্ধেক)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৫
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৬
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩০