#মেজর_ওয়াসিফ
#লেখনীতে_ঐশী_রহমান
পর্ব (৩৫)
ওয়াসিফ টের পেলো ধারা ঘুমিয়ে গেছে, ভারী শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে ওয়াসিফের বুকে। বইটা বন্ধ করে এক সাইডে রেখে, ধারাকে ঠিকঠাক করে শুইয়ে দেয়। ওয়াসিফ ঝুঁকে থাকে বৌয়ের মুখের দিকে, একটুও সরে না। নিয়মিত ঔষধ আর ঘর ছেড়ে কোথাও বের না হওয়ার ফলস্বরূপ মেয়েটা গায়েগতরে একটু মোটা হয়েছে, মুখটা হয়েছে গোলগাল।
আজ প্রায় বহুদিন পর আবার শাড়ি পরতে দেখলো ধারাকে। ওয়াসিফ সময় নিয়ে খুঁটে খুঁটে দেখতে থাকে বৌ কে। আচমকা ওয়াসিফ পুরুষালী ঠোঁট ছোঁয়ায় কপালে, দীর্ঘ সময় বেশ লম্বা একটা চুমু আঁকে সেখানে। কপালে, মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুলগুলো কে হাতের আঙ্গুলে সরিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে।
‘ আজ তুই একটু স্বাভাবিক থাকলে আমি তোর সঙ্গে নিজের বাবা হওয়ার অনুভূতি ভেঙে চুরে শেয়ার করতাম মুমতাহিনা,বিপরীতে তোর অনুভূতি টুকুও অনুভব করতাম। কিন্তু আফসোস! আমি তা পারছিনা। আমি যে কিভাবে তোকে এই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবো সেই পথই পাচ্ছি না ‘
ধারা একটু নড়েচড়ে ঘুরে শুতেই ওয়াসিফ চুপ হয়ে যায়। ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবে কিছু একটা। হঠাৎ ই ফোনে নোটিফিকেশনের সাউন্ড কানে আসতে ওয়াসিফ ফোন তুলে হাতে নেয়, আধাশোয়া থেকে উঠে বসে মেইল বক্সে ঢুকে চেইক করে।
যেখানে সম্পূর্ণ কথাটি ইংরেজিতে লেখা ছিলো, যার বাংলা অর্থ ( দুঃখিত! মেজর শাহেদ ওয়াসিফ। আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত এই জন্য যে, আপনার কর্ম বিরতি আর বাড়ানো হচ্ছে না, আগামী ৫/০৪/২০১৮ তে আপনার পদে যোগদান করতে হবে। আপনার এই চলতি বছরের সকল ছুটি স্থগিত করা হয়েছে। আগামীকাল যথাযথ সময়ে আপনার ঠিকানায় নোটিশ পৌঁছে যাবে)
মাঝরাতে, এমন সময় ওয়াসিফ মোটেও আশা করেনি এমন একটা ম্যাসেজ পাওয়ার।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরের সেই ভয়াবহ দিগুলোর পর ওয়াসিফ শারীরিক ভাবে আহত এবং ধারার অসুস্থতার কারনে বেশ লম্বা কর্মবিরতি পেয়েছিলো, শরীরের হাড়গোড় তখনও আঁকাবাকা, ক্ষত কাঁচা, তবুও জেদ ধরে ওয়াসিফ হাসপাতালের কেবিন ছেড়ে ছুটে এসেছিলো অসুস্থ বৌয়ের কাছে। সেই দিনগুলোতে ওয়াসিফ ছিলো মানসিক ভাবে হতাশাগ্রস্ত। চোখের সামনে নিজের কর্ম জীবন টেনে বৌয়ের পরিণতি, নিজের জটিলতা সবকিছু ছাপিয়ে ওয়াসিফ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো দেশের জন্য নেওয়া শপথ থেকে বন্দুকের নলের সামনে পাতিয়ে রাখা বুকটা ও তুলে নেবে। ভীষণ শখের চাকরিটা ও ছেড়ে দেবে। মানসিক এবং শারিরীক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ও যেদিন হেড অফিসে নিজের ইউনিফর্ম আর ব্যাচগুলো জমা দিতে গিয়েছিলো, কর্নেল ইমাম শোয়েবের কিছু নীতিকথার সামনে পুরোপুরি দমে গিয়েছিলো ওয়াসিফ। ওয়াসিফের এখনো স্পষ্ট কানে বাজে কর্নেল ইমাম শোয়েবের বলা সেই কথাগুলো।
‘ আমি জানতাম তুমি সুপুরুষ, যে চিতাবাঘের মতো থাবা বসিয়ে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। তবে আমি আজ আমার সামনে বসে থাকা শাহেদ ওয়াসিফ নামক একটা কাপুরষ কে দেখতে পাচ্ছি। এবং তোমাকে কাপুরুষ বলাতে একটুও লজ্জাবোধ করছি না।
ওয়াসিফ তুমি কি ভুলে গেছো বাংলার ইতিহাস? পাইলট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানে জীবনী পড়েছো নিশ্চয়? যিনি দেশের জন্য নিজের জীবন তো উৎসর্গ করেছেই, এবং তার স্ত্রী ও সন্তানেরা পাক-হানাদারের যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো সে কাহিনি নিশ্চয় তোমার অজানা নয়? আচ্ছা ওসব বাদ, ২০০৯ সালে বি ডি আর বিদ্রোহ! মেজর শাকিল আহমেদ সহ তার ওয়াইফ, হেল্পিং হ্যান্ড সহ সপরিবার নিহত হয়েছিলো, কপাল জোরে বেঁচে গিয়েছিলো শুধু তার ছেলে মেয়ে দুটো। এই সবকিছু থেকে তুমি কি শিখলে ওয়াসিফ? তারা তাদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের আদৌও কি কিছু শিখিয়ে যেতে পারলো? ‘
‘ নিজের জীবন, নিজের পিঠ নিয়েই যদি বাঁচতেই চাও তবে এই ইউনিফর্ম গায়ে তুলেছিলে কেনো? কেনো এতো এতো ব্যাচ অর্জন করেছিলে? আজ সবকিছু থেকে পালিয়ে যেতে তোমার বিবেক বাঁধা দিচ্ছে না? তোমার কি মনে হয় ওয়াসিফ? আমার এই প্রফেশনে ট্রাজেডি আসেনি? আমি যখন ২০০৭ এ মিশনে যাই, আমার সকল সহকর্মী ফিরে এলেও আমি ফিরেছি দেড়মাস পর। এই তিনমাসে আমার পরিবার, আমার ওয়াইফ, আমার বাচ্চারা মেনে নিয়েছিলো আমি আর জীবিত নেই। আমার ওয়াইফ তখন তৃতীবারের মতো আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, আমার স্ত্রীর মানসিক চাপ, আর হতাশায় আমাদের বাচ্চাটা আর পৃথিবীর আলো দেখেনি। খারাপ সময় কি আমি পার করিনি ওয়াসিফ? এমন কোনো সেনাবাহিনীর, নৌবাহিনীর কর্ম কর্তারা বলতে পারবেনা তাদের জীবনে জান হাতে বেরিয়ে আসার মতো পরিস্থিতি কখনো আসেনি। সবার জীবনে কিন্তু একবার করে এলেও এসেছে, কারোটা ছোট,কারোটা মাঝারি, আবার কারোটা মহামারি, জীবন ই নিয়ে গেছে তাদের। তাই বলে তারা কিন্তু কখনো জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইনি, তবে তুমি মেজর শাহেদ ওয়াসিফ কেনো পালাতে চাইছো? তোমার জীবনে কি মতিউর রহমানের মতো ভয়াবহতা এসেছে?তোমার স্ত্রী কি পাক-হানাদার বাহিনীর কাছে মাসের পর মাস আটকা ছিলো? তোমার জীবনে কি মেজর শাকিল আহমেদের মতো জীবনের আলো নিভে গেছে? এর কোনোটাই ই তো তোমার হয়নি ওয়াসিফ, ওরা মেয়েলি একটা টিম ছিলো, সেখানে কয়েকটা ছেলে ছিলো, যারা তোমার ওয়াইফ কে তুলে নিয়েছিলো, তাদের উদ্দেশ্য তোমার ওয়াইফ কে পাচার করে দেওয়া ছিলো, তুমি বিচক্ষণতার সঙ্গে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জখম হয়ে উদ্ধার করেছো ওয়াইফ কে। ব্যাস এতটুকু ই। এতটুকুর কাছে তুমি হেরে যাবে? আমার ভাবতেই ভীষণ অবাক লাগছে’
কথাগুলো পুনরায় আরো একচোট মনে করতেই ওয়াসিফের শিরদাঁড়া সোজা হয়। ওয়াসিফ চাকরি ছাড়েনি, তবে পরিবার, পরিজন সবাই জানে ওয়াসিফ আর সেই চাকরিতে নেই। এখানে ও মেজর শাহেদ ওয়াসিফের এক গোপন মিশন আছে। নারী চক্রের সেই ঘাঁটি ভেঙে দিতে পারলেও আসল কালপিট কে ধরা সম্ভব হয়নি, সে যে-ই হোক ভীষণ শুকর। যে পেটের মধ্যে থেকে নারী কেটেছে অথচ তাকে এখনো ধরতে পারেনি ওয়াসিফ।
ওয়াসিফ যে ধারাকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছিলো কারণ ওয়াসিফ বুঝতে পেরেছিলো ওর গোপন মিশনের মেয়াদের সময়কাল উপরমহল আর বাড়িয়ে দেবেনা, ওর যেকোনো সময় ডাক পড়বে। আজ পড়লোও তাই। এই পরিস্থিতি তে ওয়াসিফ ভীষণ চিন্তিত। শুধু শুধু অঘাত সময় নেওয়া হলো অথচ কাল পিট এখনো ধরা পরলো না।
হতাশাকে গিলে ফেলতে দু’হাতের মুঠোয় চুল খামছে ধরে কতক্ষণ বসে রইলো ওভাবে। ভালো লাগছেনা কিছু, মাথা বিগড়ে যাচ্ছে বারবার। কোন সাইড রেখে কোন সাইডে ফোকাস করবে তার কিছু ই আপাতত মাথায় ঢুকছেনা ওর।
ঘরের চারিপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তাকায় বিছানার বাম পাশে, গভীর ঘুমে বুদ হয়ে থাকা রমনীর দিকে। যে রমনীটি পরম নিশ্চিতে ঘুমিয়ে আছে, সেই এক এবং একমাত্র মেজর শাহেদ ওয়াসিফের ব্যক্তিগত নারী। যার ডাগর চোখ জোড়ার দিকে তাকালেই একজনমের হতাশা সহজেই গিলে ফেলা সম্ভব। এবং বিগত দিনগুলোতে ওয়াসিফ ঠিক তাই ই করেছে। যখন ভেতর থেকে বারবার ভেঙে চুরে একাকার হয়েছে ঠিক ততবারই ওয়াসিফ সবটুকু শান্তি খুঁজে পেয়েছে এখানে।
আগেপিছে কিছুই ভাবলোনা, আজ আর ঘুম ভাঙার তোয়াক্কা করলোনা, বরং শক্ত পেটানো শরীরটার পুরোটাই দিয়ে আঁকড়ে ধরলো পিনপিনে নরম শরীরটা। আকস্মিক ওমন কাজে চট করে চোখ মেলে ধারা। মস্তিষ্ক থেকে ঘুমের রেশ কাটাতেই অনুভব করে ওর সবচেয়ে আপনজন মনে হওয়া মানুষটাই ওকে এভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
পুরো ঘর জুড়ে ড্রিম লাইটের আলো, সেই আলোতে ধারা স্পষ্ট দেখে মানুষটার অবয়ব। মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারছেনা, এই মানুষটার ঠিক কি হলো? বিছানার সঙ্গে লেপ্টে রাখা হাতদুটো গুছিয়ে চওড়া পিঠটাতে রাখতেই মাথার পাশ থেকে মুখ তুলে তাকায় ওয়াসিফ, দেখে ধারার ঘুম ভেঙে বিস্ময় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের দৃষ্টি মিললতেই ধারা জিজ্ঞেস করে।
‘ ভয় পেলেন’?
ওয়াসিফ মুখে জবাব দেয় না, নিজের পিঠের উপর রাখা ধারার ডান হাতটা টেনে এনে সেই হাতের পাতায় চুমু খেতে খেতে বলে।
‘ তোর ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ার জন্য দুঃখিত, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, চল আবার ঘুমাবি’
ধারা দু’পাশে ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলে।
‘ এখন আর ঘুম আসবেনা, আপনার কি হয়েছে? আপনি কি কিছু নিয়ে ভয় পেলেন? আমার মতো কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলেন’?
গত দেড়বছরের এমন অনেক রাত, গভীর ঘুম থেকে ধারা ছটফটিয়ে উঠেছে। বারবার ওর ঘুমের মধ্যে কল্পনায় এসেছে ওর সঙ্গে খারাপ কিছু হচ্ছে, কিন্তু ওকে বাচিয়ে নেওয়ার মতো এবার ওয়াসিফ নেই। মানুষটা ওর জীবন থেকে কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। তবে সেই জঘন্য কল্পনা দেখে ছটফটিয়ে উঠে প্রতিবারই পাশে পেয়েছে ওয়াসিফকে। এবং প্রতিবারই চওড়া লোমশ বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ঘুমের ইস্তফা দিয়েছি। ধৈর্য্য আর ভালোবেসে ওয়াসিফ ঠিক ততবারই তার শখের নারীকে আগলেছে, চুমু খেতে খেতে বারবার বলেছে, ‘ আমি আছি মুমতাহিনা, আমি ছিলাম, আমি থাকবো ইনশাআল্লাহ। তোর ভয় নেই ‘
তাই আজ যখন ওয়াসিফ কে এতোটা নিভু নিভু ভাবে দেখে ধারার মনে হয় লোকটা বাজে কিছু স্বপ্নে দেখেছে। ওর মতো করেই ভয় পেয়েছে। ওয়াসিফের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে ধারা দু’হাত ক্লিন সেইভ করা অমসৃণ গালটা আগলে ধরে বলে।
‘ আমাকে বলুন, আপনি ভয় পেয়েছেন? খারাপ কিছু দেখেছেন’
ওয়াসিফ নিজের গাল থেকে ধারা হাতদুটো টেনে নিজের মুঠোয় চেপে আরেক দফায় চুমু খেয়ে বলে।
‘ আমি দেখেছি, মুমতাহিনা ধারা নামক মেয়েটির সঙ্গে আমার খুব চমৎকার একটি সংসার হয়েছে, একে একে পারমিতা গল্পের পারমিতার মতো আমাদের ও একে একে চারটি মেয়ে ও একটি পুত্র হয়েছে। এবং তাদের নিয়ে আমাদের ও ভীষণ চমৎকার একটি সংসার হয়েছে ‘
এটুকু বলে থামে ওয়াসিফ, পুনরায় হাত দুটোতে চুমু খেয়ে বলে।
‘ একেকটি কন্যা সন্তান জন্মাবার সময় পারমিতার স্বামীর মতো মুমতাহিনা ধারা’র স্বামী কখনো ই নারাজ হবেনা। সে খুব খুশি হবে, ভীষণ খুশি হবে আল্লাহ তার ঘরে একের পর এক রহমাত পাঠাচ্ছেন বলে। এবং প্রত্যেকটি কন্যা সন্তানকে মেজর শাহেদ ওয়াসিফ ভীষণ মাথায় তুলে আদর, যত্ন করে বড়ো করবে। এবং মেজর শাহেদ ওয়াসিফের জীবনে তার বৌয়ের জায়গাটা থাকবে সবার উপরে, তারপর একে একে বাচ্চারা’
ওয়াসিফের কথার মধ্যে ই ধুম করে ধারা বলে ওঠে।
‘ আপনি তো এখন মেজর নেই, চাকরি ছেড়েছেন, তাহলে নাম বলার আগে ঐ শব্দটা কেনো বললেন’?
ওয়াসিফ কথা থামিয়ে চুপ হয়ে যায় , ধারার চোখে মুখে জিজ্ঞাসার চাহনি। ওয়াসিফ একটা ঢোক গিলে আস্তে করে বলে।
‘ বহুদিনের পুরাতন অভ্যাস, তাই ভুল করে হয়ে গেছে ‘
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২০
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ২য় অংশ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ১ম অংশ ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১০
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৮