#নতুন_প্রেমের_গান
#পর্ব_৩১
সিয়াদাতের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে পুরো ড্রয়িংরুমে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ঘরের ভেতরের তপ্ত বাতাস নিমিষেই জমে বরফ হয়ে গেল।মোহনা শেখের মুখের উদ্যত অহংকারে ভাটা পড়লো। সারা চোখ বড় বড় করে তার ভাইয়ার দিকে তাকাল।আর সুপ্রভা? সে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। অশ্রুভেজা চোখে সে সিয়াদাতের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মোহনা শেখ কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তার মুখের কথা মুখের ভেতরই আটকে গেল। তিনি স্তম্ভিত চোখে দরজার দিকে তাকালেন।সিয়াদাত ধীর পায়ে সুপ্রভার পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো দ্বিধা নেই,নেই কোনো অহংকার।কেবলই নিজের স্ত্রীকে এক অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে রাখার তীব্র জেদ ছাড়া।
মোহনা শেখ তেড়ে আসলেন সিয়াদাতের দিকে।রুষ্ট কণ্ঠে বললেন, “ কী বললে তুমি? আবার বল?”
সিয়াদাত অস্পষ্ট হাসলো। দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ বিয়ের পর একটা মেয়ের আসল ঘর হচ্ছে তার স্বামীর ঘর। কিন্তু তুমি বলছো সেই স্বামীর ঘরে সুপ্রভার ঠাঁই হবে না।তুমি খুব সহজেই কথাটা বলে দিতে পেরেছো মম। কিন্তু আমি পারছি না, ইন ফিউচারেও পারব না।সুপ্রভাকে আমি শুধু তিন কবুল বলেই বিয়ে করিনি।বিয়ের সাথে সাথে সুপ্রভার সুখ ,দুঃখ ,কষ্ট ,সবকিছুর ভার নিয়েছি।ও যেহেতু আমার স্ত্রী, সেহেতু ওর ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব টাও আমারই।সো আমার স্ত্রী যেখানে থাকতে পারবে না, সেখানে আমার থাকাটাও বেমানান নয় কি মম?”
মোহনা শেখ আগুনলাগা মরিচবাতির মতো জ্বলে উঠলেন। ক্রুদ্ধ গলায় বললেন,
“ সিয়াদাত! তুমি নিজের মমের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সামান্য মেয়ের জন্য এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলছ? তুমি ভুলে যাচ্ছো তুমি কে? তুমি এই শেখ সাম্রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী , SSS গ্ৰুপ অফ কোম্পানির চেয়ারম্যান।মিডিয়ার লোকজন একবার জানতে পারলে তোমার ক্যারিয়ার, তোমার রেপুটেশন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? একজন বিধবাকে তুমি…!
বিধবা শব্দটা উপ্তত্ত সিসা ঢাললো সিয়াদাতের কানে। ঠোঁট বেঁকে গেল অসন্তোষে।সে রুক্ষ গলায় বলল,
“সুপ্রভার অতীত কী ছিল, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার, সমাজের নয়। আর আমার ক্যারিয়ার? সিয়াদাত শাহরিয়ার নিজের যোগ্যতায় এই জায়গায় এসেছে, কারও দয়ায় নয়।তুমি বোধহয় ভুলে গেছ, এই সিয়াদাত শাহারিয়ার কাউকে ভয় পেয়ে বা লুকিয়ে কোনো কাজ করে না। সুপ্রভাকে আমি ভালোবেসে, সজ্ঞানে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেছি। সমাজ তাকে কী তকমা দিল, তাতে সিয়াদাতের কিচ্ছু এসে যায় না। আমার কাছে ও শুধু আমার স্ত্রী।ওকে অসম্মান করা মানে আমাকে অসম্মান করা। আজ যদি ও এই বাড়ির চৌকাঠ না পেরিয়ে ফিরে যায়, তবে মনে রেখো তোমার ছেলেও এই বাড়ির চৌকাঠ চিরতরে পেরিয়ে যাবে।”
সুপ্রভা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চোখের জল বাঁধ মানছিল না। সিয়াদাতের প্রতিটি কথা তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে মলমের মতো কাজ করছিল। যে সমাজ তাকে প্রতিনিয়ত বিধবা বলে দূরে ঠেলে দিয়েছে, সেই সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে একটা মানুষ তাকে এভাবে নিজের বুক দিয়ে আগলে রাখছে।এই সত্যটা সুপ্রভার ভেতরের সব অভিমান আর ভয়কে এক নিমেষে গলিয়ে দিতে লাগল।
সারা মায়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
“ ভাইয়া কোনো অন্যায় করেনি মম। তুমি শুধু শুধু এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে দোষ দিচ্ছ।”
মোহনা শেখ এবার আরও রেগে গেলেন। তিনি সুপ্রভাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “পাপ পুণ্যের তুই কী বুঝিস সারা? এই মেয়েটার প্রথম স্বামী বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় মা’রা গেছে। ও একটা অলক্ষ্মী! ও এই বাড়িতে পা রাখলে আমার ছেলের ক্ষতি হবে, আমাদের বংশের ক্ষতি হবে।আমি কোনোভাবেই একে এই বাড়ির বউ বলে মেনে নিতে পারব না।”
মোহনা শেখের কথার পিঠে সিয়াদাত কিছু বলল না।সে সুপ্রভার বরফশীতল হয়ে যাওয়া হাতটা নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় শক্ত করে টেনে নিল। সুপ্রভা চমকে সিয়াদাতের দিকে তাকাল। কিন্তু সিয়াদাতের দৃষ্টি তখনও মোহনা শেখের দিকে স্থির। সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শোনানোর মতো করে বলল, “আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে এই মুহূর্তে শেখ মঞ্জিল ছেড়ে চলে যাচ্ছি। যেখানে সুপ্রভার সম্মান নেই, সেখানে সিয়াদাতের উপস্থিতিও অপ্রয়োজনীয়।”
কথাটা বলেই সিয়াদাত সুপ্রভাকে নিয়ে উল্টো ঘুরে সদর দরজার দিকে পা বাড়াল। সুপ্রভা সিয়াদাতের হাতের শক্ত বাঁধন আর তার এই অনমনীয় রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটা সত্যিই তার জন্য নিজের পরিবার, নিজের এত বড় রাজপ্রাসাদ এক পলকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে?সে সিয়াদাতকে আটকাতে চাইলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পুরুষালি ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ দাঁড়াও।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চকিতে পেছন ফিরে তাকালো সিয়াদাত।দরজার স্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা সাদমান শেখ।তিনি ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের কেন্দ্রবিন্দুতে এগিয়ে এলেন। মোহনা শেখ স্বামীকে দেখেই যেন নতুন করে শক্তি পেলেন। তিনি দ্রুত পায়ে তাঁর কাছে গিয়ে নালিশের সুরে বললেন, “শুনেছ তোমার ছেলে কী বলছে? একটা সামান্য মেয়ের জন্য ও নিজের মাকে অপমান করে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে! তুমি কিছু বলছ না কেন?”
সাদমান শেখ তার স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। সেই চাউনিতে এমন কিছু ছিল যে মোহনা শেখের মুখের বাকি কথাগুলো মাঝপথেই থমকে গেল। এরপর তিনি সোজা তাকালেন সিয়াদাত আর সুপ্রভার দিকে। আদেশের সুরে বললেন–
“তোমরা কোথাও যাবে না।”
সিয়াদাত জেদ নিয়ে বলল,“যেখানে আমার স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত তার অতীতের জন্য খোঁটা শুনতে হবে। অলক্ষ্মী অপয়া অপবাদ সইতে হবে, সেখানে আমি ওকে এক মুহূর্তের জন্যও রাখব না।”
সাদমান শেখ সিয়াদাতের কাঁধে হাত রাখলেন। ধীর গলায় বললেন,
“আমি জানি আমার ছেলে কাপুরুষ নয়। কিন্তু কাপুরুষের মতো মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়াও শেখ পরিবারের র’ক্তে নেই। এই বাড়িটা শুধু মোহনা শেখের একার নয়, সিয়াদাত। এটা তোমার বাড়ি সুপ্রভারও বাড়ি।তোমরা কেন নিজেদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে?”
সুপ্রভা তখন ভয়ে আর সংকোচে কাঁপছিল। সাদমান শেখ স্নেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সুপ্রভার দিকে।সুপ্রভার শুকনো ঢোক গিলে মাথাটা নিচু করে ফেলল। সাদমান শেখ কয়েক কদম এগিয়ে এসে সুপ্রভার ঠিক সামনে দাঁড়ালেন। পরম স্নেহে সুপ্রভার মাথায় হাত রেখে বললেন, “মাথা উঁচু করো সুপ্রভা।”
সুপ্রভা চমকে অশ্রুভেজা চোখ তুলে তাকাল। একজন শ্বশুরের চোখে সে কোনো ঘৃণা বা অবহেলা দেখল না।দেখল কেবলই এক বাবার আশ্রয়।
সাদমান শেখ স্মিত হাসলেন। দরদমাখা গলায় বললেন, “ তুমি এ বাড়ির বউ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো তুমিও মাথা উঁচু করে এ বাড়িতে থাকবে।কখনো যেন মাথা নিচু না হয়।”
সুপ্রভা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। সাদমান শেখ সারার দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বললেন– “ সারা তোমার ভাবীকে উপরে নিয়ে যাও।”
সারা কালক্ষেপণ না করে সুপ্রভাকে সিয়াদাতের কক্ষে নিয়ে এলো। মিষ্টি গলায় বলল, “ তুমি একটু বসো।আমি তোমার লাগেজ নিয়ে আসছি।”
সারা যাওয়ার মিনিট দুয়েক পরেই সিয়াদাতের দেখা মিলল।তাকে দেখা মাত্রই সুপ্রভা তেড়ে এলো। ভাঙ্গা গলায় বলল,
“ আপনি কেন নিজের মায়ের সাথে এভাবে ঝগড়া করলেন? আমার জন্য আপনার পরিবারে অশান্তি হোক, মা ছেলের সম্পর্ক খারাপ হোক, এটা আমি চাইনি। আমি চলে গেলেই বোধহয় ভালো হতো।”
সিয়াদাত ত্বরিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াল। দুকদম এগিয়ে সুপ্রভার খুব কাছে এসে থামল। সুপ্রভার দু কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
“ আর কখনো চলে যাওয়ার কথা মুখে আনবে না সুপ্রভা। গাড়িতে যে অপমান আমাকে করেছ, সেটার হিসাব আমি পরে নেব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্য কেউ এসে তোমাকে অপমান করবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব। মনে রেখ, তুমি শুধু আমার। আর আমার জিনিসে আঘাত করার অধিকার আমি আমার জন্মদাত্রী মাকেও দিই না।”
চলবে???
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৭
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২২
-
নতুন প্রেমের গান বাসর পর্ব
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৯
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৯
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১০
-
সুপ্রভা পর্ব ৩