#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
#পর্ব_৬৫
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
হাসপাতালের করিডর টা এখনও এক।ভয়াবহ নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। কারো মুখে হাসি নেই। আরিয়ান একই ভাবে ফ্লোরে বসে রইল। নিস্তব্ধত দুটি চোখ ফ্লোরের দিকে নিবদ্ধ।
আহাদ মির্জা আর আদনান এসে তাঁকে জাপ্টে ধরলেন। বললেন,
“শান্ত হ বাবা আরিয়ান, সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ্ ভরসা,” আহাদ মির্জা ছেলেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার কানে তখন কোনো কথা ঢুকছে না। তার মনের ভেতরে এক প্রলয়ংকরী ঢেউ সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে লেবার রুমের দরজাটা একটুখানি খুলে গেল। একজন নার্স ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন, তার কোলে সাদা নরম কাপড়ে মোড়ানো এক ফুটফুটে সদ্যজাত শিশু। আরিয়ান তখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে, সে এখনো তার অনাগত সন্তানের মুখ দেখার শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। নার্স মৃদু হেসে মির্জা পরিবারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“অভিনন্দন! আপনাদের ঘরে এক পরীর মতো কন্যাসন্তান এসেছে।”
সবার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। মায়মুনা বেগম পরম মমতায় তাঁর নাতনীকে কোলে তুলে নিলেন। সদ্যজাত সেই শিশুটি যেন এক মুঠো স্বর্গের আলো নিয়ে এসেছে এই পৃথিবীতে। কিন্তু আরিয়ানের সমস্ত সত্তা তখনো ওই বন্ধ দরজার ওপাশে পড়ে আছে। সে কোনোমতে মেঝ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আমার ওয়াইফ… ও কেমন আছে? ও কি ঠিক আছে?”
নার্স মুহূর্তের জন্য থামলেন, তাঁর হাসিমাখা মুখটা কিছুটা গম্ভীর হয়ে এল। তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
“এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। রক্তক্ষরণ কিছুটা বেশি হয়েছে, ডক্টর ম্যাম ভেতরে চেষ্টা করছেন। দোয়া করুন।”
তার পায়ের তলার মাটি যেন আবার সরে গেল। একদিকে নতুন মেহমান আসার আনন্দ, অন্যদিকে তৃণার জীবনের এই অনিশ্চয়তা মির্জা পরিবারের সবার মনেই এখন এক দোলাচল। মায়মুনা বেগম বাচ্চার কান্না আর আরিয়ানের অস্থিরতা দেখে এগিয়ে এলেন। নাতনীকে আরিয়ানের সামনে ধরে বললেন,
“আরিয়ান, দেখ তোর রাজকন্যা! ঠিক যেন একটা পরী হয়েছে রে!”
আরিয়ান তার সন্তানের দিকে তাকালো। কিন্তু একি! সন্তানের মুখ দেখে পিতার মুখে যে চওড়া হাসি থাকার কথা ছিল, তার বদলে আরিয়ানের বুক চিরে কান্নার লোনা ঢেউ উপচে পড়ল। সে কেবল ফুপিয়ে উঠতে লাগল। মায়মুনা বেগম ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
“কাঁদিস না বাবা, দিনটা খুশির। কোলে নিবি না তোর কলিজার টুকরোকে?”
ঠোঁট ভেঙে আসছিল কান্নায়। সে অত্যন্ত সাবধানে কাঁপা কাঁপা দুটো হাত বাড়িয়ে দিল। মায়মুনা বেগম অতি সতর্কতায় নাতনীকে আরিয়ানের কোলে সঁপে দিলেন। আরিয়ানের জীবনে কোনো শিশুকে কোলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, তাই অত্যন্ত অপরিপক্কভাবে সে শিশুটিকে আঁকড়ে ধরল। মনে হলো যেন আকাশের এক টুকরো চাঁদ তার কোলের ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। সে অপলক দৃষ্টিতে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শিশুটি মিটমিট করে তার ডাগর চোখ দুটো মেলল। তারপর এক অলৌকিক দৃশ্য! হয়তো এই পৃথিবীর আলোয় প্রথমবার তার বাবাকে চিনতে পেরেই ছোট্ট ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে এক চিলতে হাসি দিল সে।
আরিয়ান বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছে, শরীর কাঁপছে। সে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“ও আম্মু! তুমি দেখলে? তুমি দেখলে আমার কলিজা, আমার পৃথিবী হাসছে! ও আমাকে দেখে হাসছে আম্মু!”
আরিয়ানের এই আনন্দের চিৎকার আর চোখের জল দেখে সেখানে উপস্থিত সবার চোখেই পানি চলে এল। মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের সেই করিডোরটা যেন এক বিষণ্ণ শোক থেকে পরম প্রাপ্তির আনন্দে ভরে উঠল। আরিয়ান তার ছোট্ট রাজকন্যাকে নিজের মুখের কাছে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
হাসপাতালের করিডোরে সময় যেন আর কাটতেই চায় না। কোলের ছোট্ট নতুন অতিথির জন্য সবার মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেলেও তৃণার জন্য উৎকণ্ঠা কিছুতেই কমছে না। এক অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে আছে চারপাশ। চেয়ারটায় নিথর হয়ে বসে আছে আরিয়ান। তার দুই পাশে রোহান আর আদনান সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে চুপচাপ বসে। সে কেবল মনে মনে পরম করুণাময়কে ডেকে চলেছে। ওমর হাওলাদারও খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছেন। তিনি দেয়ালে এক হাত রেখে উদাস চোখে ওদিকের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
ঠিক এমন সময় সেই কাঙ্ক্ষিত দরজা খোলার আওয়াজ হলো। আরিয়ান ধড়ফড়িয়ে আসন ছেড়ে সবার আগে ছুটে গেল সামনে। নারী চিকিৎসক মুখ থেকে মাস্কটা সরাতেই সে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ডক্টর, আমার শ্যামলিনী কেমন আছে? ও ভালো আছে তো? প্লিজ বলুন!”
তাকে এভাবে উতলা হতে দেখে চিকিৎসক মুচকি হাসলেন। পরম আশ্বাসের সুরে বললেন,
“অভিনন্দন মিস্টার মির্জা! আপনার স্ত্রী এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত এবং সুস্থ। আপনি চাইলে ভেতরে গিয়ে দেখা করতে পারেন।”
মুহূর্তের মধ্যে করিডোরে উপস্থিত সবার মলিন মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সবাইকে পাশ কাটিয়ে জলদি ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে ধবধবে সাদা বেডে শুয়ে আছে তার শ্যামলিনী। হাতে স্যালাইনের সুঁই ফোটানো, ক্লান্তিতে চোখ দুটো বোজা। তার নিজের চোখ দিয়ে তখনও অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে যখন তৃণার নিস্তেজ হাতটা স্পর্শ করল, তখনই আলতো করে চোখ মেলল তৃণা। তাকে চোখ খুলতে দেখেই সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; আলতো করে গলা জড়িয়ে ধরে এক অবুঝ বালকের মতো ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
তাকে এভাবে কাঁদতে দেখে তৃণা কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে গেল। সে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো একদম ঠিক আছি রাগি সাহেব। তবে কেন এখনও এভাবে কাঁদছেন?”
সে দ্রুত চোখের জল মুছে তৃণার গালে আর কপালে গভীর অনুরাগে চুমু খেল। মুখের ওপর এসে পড়া এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমাদের একটা ফুটফুটে রাজকন্যা হয়েছে শ্যামলিনী।”
কথাটা শুনে তৃণার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে নতুন জাতককে কোলে নিয়ে একজন নার্স কেবিনে প্রবেশ করলেন। আরিয়ান নিজের কন্যাকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে আলতো করে চুমু খেল। তারপর আবার তৃণার শয্যার পাশে ফিরে গিয়ে আলতো করে বাচ্চাটাকে মায়ের বুকের ওপর শুইয়ে দিল।
কলিজার টুকরোকে প্রথমবার নিজের বুকের স্পর্শে পেয়ে তৃণার চোখের কোণ বেয়ে তপ্ত নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণের সহ্য করা পৃথিবীর সমস্ত মরণান্তক কষ্ট যেন এই এক মুহূর্তের ছোঁয়ায় কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল। তৃণা তৃপ্তির পূর্ণ দৃষ্টি দিল বাচ্চার নিষ্পাপ মুখের দিকে। অবিকল তার রাগি সাহেবের মতো গড়ন পেয়েছে মেয়েটা।
তৃণা পরম আবেশে সন্তানকে বুকের সাথে আরও মিশিয়ে ধরে ফিসফিস করে ডাকল,
“আমার রোদসী সোনা…”
সে কিছুটা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“রোদসী নাম রাখলে?”
তৃণা হেসে বলল, “সাইয়্যিদা রোদসী।”
তার মুখেও এবার চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে তৃণার চিবুকটা ছুঁয়ে বলল,
“তাহলে ওর ডাকনাম হবে রোদ্দুর। আমাদের জীবনের ‘রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র’।”
তৃণা আবার স্নিগ্ধ হাসল। বাইরের আকাশে তখন মেঘ কেটে এক চিলতে সোনালী রোদ উঁকি দিচ্ছে, আর কেবিনের ভেতরে সে তৃণার কপালে নিজের মাথা ঠেকিয়ে পরম আবেগে এক নতুন জীবনের মৌন শপথ নিল। এতদিনের সব ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে তাদের ভালোবাসার সংসার আজ এক পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল।
★★★
হাসপাতাল থেকে সেই ছোট্ট রাজকন্যাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর দেখতে দেখতে প্রায় তিনটি মাস কেটে গেছে। এই তিন মাসে মির্জা বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইছে। নতুন অতিথিকে পেয়ে বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন সারাক্ষণ মুখরিত থাকে। ছোট্ট রোদসী অবিকল তার বাবার চেহারা পেয়েছে ফর্সা, নিটোল আর মিষ্টি অবয়ব। মেয়ের জন্মের পর থেকে আরিয়ানের অভ্যাসেও এসেছে বিশাল এক পরিবর্তন। একসময়ের কাজপাগল মানুষটি এখন সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফেরার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। আজ তো রীতিমতো বিকালের মৃদু আলো থাকতেই বাড়ি চলে এসেছে।
কোটটা একহাতে ঝুলিয়ে আরিয়ান যখন শোবার রুমে ঢুকল, তখন ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা। বিছানার একপাশে নরম চাদরের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তিন মাসের রোদসী। ছোট্ট হাত-পাগুলো অনবরত দুলছে। রোদসীকে কখনোই একা ছাড়া হয় না, বাড়ির কেউ না কেউ সারাক্ষণ তার পাহারায় থাকে। আরিয়ান ব্যাগ আর কোটটা একপাশে রেখে দ্রুত বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। পরম মায়ায় ডাকল,
“রোদ্দুর সোনা আমার!”
বাবার সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে যেতেই রোদসী এক ঝটকায় উপুড় থেকে সোজা হওয়ার চেষ্টা করল। আরিয়ানকে সামনে দেখেই ছোট্ট ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে। মুখ দিয়ে ফুটল এক আধো-আধো ‘আও আও’ শব্দ। মেয়ের এই স্বর্গীয় হাসি দেখে আরিয়ানের সারাদিনের সব ক্লান্তি নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে বিছানায় ঝুঁকে পড়ে মেয়ের গালে, কপালে আর নরম থুতনিতে একের পর এক স্নেহভরা চুমু এঁকে দিল।
তারপর রোদসীকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে কৃত্রিম রাগের সুরে বলতে লাগল,
“তোমার আম্মুটা দিন দিন খুব পচা হয়ে যাচ্ছে, দেখেছ রোদ্দুর? আমার কলিজার টুকরোকে এভাবে একা রুমে ফেলে রেখে কোথায় চলে গেছে! আজ আসুক শ্যামলিনী, খুব বকুনি দেব তাকে।” ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ পাওয়া গেল। তার মানে তার তৃণা ভেতরেই আছে।
আরিয়ান রোদসীকে উঁচিয়ে ধরে নানা রকম মজার আওয়াজ করে খেলা করতে লাগল। কিন্তু অতি উৎসাহে সে খেয়ালই করেনি যে মেয়ের পরনে তখন কোনো ডায়াপার ছিল না। হঠাৎ করেই নিজের শার্টের ওপর হালকা গরম কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করল সে। একটু নিচে তাকাতেই আরিয়ানের চক্ষু চড়কগাছ! রোদসী তার সাদা ধবধবে শার্টের ওপর পটি করে দিয়েছে। আরিয়ানের সাদা শার্টে এখন হলদেটে দাগ।
আরিয়ান নাক-মুখ কুঁচকে নিজের শার্টের দিকে তাকালো, আর পরক্ষণেই দেখল রোদসী তার ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক এই সময়েই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে বের হলো তৃণা। আরিয়ান মেয়ের সেই নিষ্পাপ চাউনি দেখে শব্দ করে হাসতে লাগল।
তৃণা তো ঘরজুড়ে আরিয়ানের হাসির শব্দ শুনে অবাক। এগিয়ে আসতেই তার নজর পড়ল আরিয়ানের শার্টের সেই হলদে দাগের দিকে। অথচ এই শৌখিন মানুষটা নিজের পোশাক নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র বিরক্ত বা বিচলিত না, উল্টো মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাসছে। তৃণার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আপনি কখন এলেন? আর দেখলেন আপনার মেয়ের কাণ্ড? এই মাত্র ওকে কত কষ্ট করে ঘুম পাড়িয়ে ওয়াশরুমে গেলাম, আর এর মধ্যেই উঠে এই কীর্তি করে বসে আছে! দিন দিন ভারী বজ্জাত হচ্ছে মেয়েটা।”
আরিয়ান তৎক্ষণাৎ মেয়ের পক্ষ নিয়ে বলল,
“খবরদার! আমার রাজকন্যাকে একদম বজ্জাত বলবে না বলে দিচ্ছি। ও আমার লক্ষ্মী মেয়ে, বাবার শার্টে একটু আদর করে দিয়েছে, তাতেই তোমার হিংসে হচ্ছে?”
তৃণা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হয়েছে, আর ওকালতি করতে হবে না। এবার দিন ওকে আমার কাছে।” তৃণা রোদসীকে কোল থেকে নামিয়ে তাকে পরিষ্কার করার জন্য আবার ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। আরিয়ান নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া শার্টটার দিকে তাকিয়ে আরও একবার মনে মনে হাসল।
★★★
রাত তখন প্রায় আটটা। মেহরাব দেওয়ান সবেমাত্র কলিংবেল চেপে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেছেন। রান্নাঘর থেকে কাজের খালার রান্নার সুগন্ধ আর খুন্তি নাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখতে পেলেন সোফায় এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তূর্ণা। তার সমস্ত মনোযোগ কোলের ওপর রাখা ফোনের স্ক্রিনে। মেহরাবকে আলাদা করে কৌতূহলী হতে হলো না এটা বোঝার জন্য যে তূর্ণা ফোনে কী করছে। গত সাত-আট মাস ধরে এই একটা কাজই নিয়ম করে করে যাচ্ছে।
মেহরাব দেওয়ান কোটটা একহাতে নিয়ে নরম গলায় ডাকলেন,
“মামণি আমার?”
তূর্ণা ফোনের স্ক্রিন থেকে ম্লান চোখে একবার বাবার দিকে তাকালো। দৃষ্টিতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো অভিযোগও নেই। পরক্ষণেই সে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল ফোনের আলোয়। মেহরাব বুকের ভেতর থেকে আসা একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখলেন। অথচ রিনি এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে দিনগুলো কত অন্যরকম ছিল! মেহরাব অফিস থেকে ফিরলেই তূর্ণা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরত, সারাদিনের রাজ্যের গল্প জুড়ত। কিন্তু যেদিন থেকে রিনি তাদের জীবন থেকে, এই দেশ থেকে হারিয়ে গেল, সেদিন থেকেই তূর্ণা কেমন যেন খোলসের মধ্যে ঢুকে গেল। চঞ্চল মেয়েটা রাতারাতি বড্ড চুপচাপ হয়ে গেল।
মেহরাব ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের পাশে সোফায় বসলেন। আড়চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওনার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক যা ভেবেছিলেন, রিনির সেই পুরোনো বাংলাদেশি নাম্বারটায় তূর্ণা পরপর কয়েকবার ডায়াল করেছে। রিনি চলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এমন একটা দিন যায়নি, যেদিন তূর্ণা এই বন্ধ নাম্বারটায় অন্তত একবার হলেও রিং করেনি। প্রতিবারই ওপাশ থেকে সেই চেনা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে “আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে না।”
আর প্রতিবারই তূর্ণার চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
মেহরাব নিজের পকেট থেকে তূর্ণার প্রিয় কয়েকটা চকলেট বের করে মেয়ের সামনে ধরলেন। গলাটা কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললেন,
“এই নাও মামণি, তোমার প্রিয় চকলেট।”
তূর্ণা চোখের জলটা আড়াল করার জন্য চট করে একবার বাবার দিকে তাকালো। তারপর বাধ্য মেয়ের মতো চকলেটগুলো হাত বাড়িয়ে লুফে নিল ঠিকই, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসিটা আর ফুটল না। চকলেটগুলো মুঠোয় নিয়ে সে আবার জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহরাব দেওয়ান মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন, কিন্তু ওনার ভেতরের দীর্ঘশ্বাসের মেঘ কিছুতেই সরল না।
★★★
ফ্রান্সের নিস শহরের এক কোণে, ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির ঠিক পাশেই রিনির এই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। রাত এখন বেশ গভীর। শহরের চিরচেনা ব্যস্ততা থিতিয়ে এসেছে অনেক আগেই, কিন্তু রিনির চোখে আজ ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে তার বেলকনির গ্রিলটা শক্ত করে ধরে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
সামনে অবারিত সমুদ্র। রাতের অন্ধকারে সেই বিশাল জলরাশিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু সমুদ্রের সেই চিরচেনা গর্জন বাতাসের ঝাপটায় স্পষ্ট কানে আসছে। ঢেউগুলো একের পর এক তীরে আছড়ে পড়ছে, যার মধ্যে এক অদ্ভুত ছন্দ আছে। এই শব্দ সাধারণত মানুষের মনকে শান্ত করে, কিন্তু তার কাছে এই ধ্বনি আজ কেবলই এক অন্তহীন হাহাকার।
সে চোখ তুলে আকাশের তারার দিকে তাকালো। তূর্ণা একদিন বায়না ধরে বলেছিল, রাতের আকাশের তারা গুনতে তার নাকি ভীষণ ভালো লাগে। রিনি মনে মনে ভাবল, তূর্ণা কি এখন বাংলাদেশে বসে তারা গুনছে? পরক্ষণেই নিজের ভুল ভাঙল। এখন তো বাংলাদেশি সময়ে রাতের শেষ প্রহর, ভোরের আলো ফোটার উপক্রম। তূর্ণা নিশ্চয়ই এখন ঘুমাচ্ছে। ভেবেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার।
হঠাৎ করেই তার পাশে এসে দাঁড়াল লুসি। জন্মসূত্রে মেয়েটি ফরাসি। গায়ের চামড়া এতটাই ফর্সা যে মনে হয় হাত ছোঁয়ালেই রক্ত ফেটে পড়বে। রিনিকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই হয়তো লুসির ঘুম ভেঙে গেছে। রিনির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সে তেমন কিছুই জানে না, কারণ তাদের পরিচয়ের বয়স মাত্র মাস দুয়েক। রিনির মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে লুসি ফরাসি ভাষায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে রিনি? এই নিশুতি রাতে এভাবে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
“বুকটা বড্ড ভারী হয়ে আছে লুসি। একটা বড় করে দম নিতে পারলে হয়তো কিছুটা শান্তি পেতাম।”
লুসি রিনির কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“তোমার দেশের কথা, তোমার প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ছে, তাই তো?”
রিনির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বন্ধ চোখের পাতায় সবার আগে ভেসে উঠল তূর্ণার সেই নিষ্পাপ চঞ্চল মুখটা। সে লুসির কথার পিঠে মাথা নেড়ে সায় দিল। লুসি কৌতূহলী হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
“কার কথা এত বেশি মনে পড়ছে তোমার?”
“আমার মেয়ের কথা।” রিনির সংক্ষিপ্ত উত্তর।
লুসি ভীষণ অবাক হলো। চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
“তুমি না সিঙ্গেল? আর আমি যতটুকু জানি, বাংলাদেশে তো বৈবাহিক বন্ধন ছাড়া সন্তান হওয়া সম্ভব নয়। তবে?”
রিনি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“পৃথিবীতে এমন অনেক সম্পর্ক রয়েছে লুসি, যা গড়ে তোলার জন্য কোনো রক্তের সম্পর্কের বা সামাজিক পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। মনের টানই সেখানে শেষ কথা।”
লুসি হয়তো রিনির এই গভীর দর্শনের মানে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারল না। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই বলল,
“আচ্ছা, আজ তো তোমার ডক্টরের চেম্বারে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছিলে?”
“হুম, গিয়েছিলাম।”
“কী বললেন ডক্টর?” লুসির গলায় উদ্বেগের সুর।
রিনি আবারও আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ডক্টর বললেন আমি নাকি একদম ঠিক আছি। তেমন বড় কোনো সমস্যা হয়নি।”
লুসি অবাক হলো বলল, “কি বলো! ডক্টর এসব বলেছে! কিন্তু আমার তো মনে হয়…
লুসিকে থামিয়ে দিল। বলল,
“সকালে তোমার অফিস আছে যাও ঘুমাও।”
লুসি নিজের রুমে ফিরে গেল। কিন্তু রিনি একই জায়গায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে তার নিজের হাত দুটো দেখল, যা একসময় তূর্ণাকে আগলে রাখত। সমুদ্রের নোনা বাতাস তার চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রিনি অন্ধকারের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আপনি চাইলেই আমাদেরও একটা পরিপূর্ণ সুন্দর সুখের সংসার হতে পারত। অথচ আজ আমরা কত দূরে!”
বিদেশের এই ঝলমলে শহরে রিনির জীবনটা আজ বড্ড একাকী, ঠিক যেন এক খণ্ড মেঘ, যা আকাশের সীমানা পেরিয়ে এক অজানা দেশে এসে থমকে গেছে।
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫০ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫২ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫