রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৮ (১)
পর্ব_৫৮ (১)
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রিনি টেবিলের এক কোণে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের পরীক্ষার খাতা কাটছিল। খাতার পাতায় লাল কলমের আঁচড় দিতে দিতে সে নিজের অজান্তেই মুচকি হাসছিল। ঠিক তখনই তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে কল এসেছে। রিনি খাতা দেখা থামিয়ে ফোনটা কানে দিয়ে বলল,
“হ্যালো, কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা শোনামাত্রই রিনির পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঘৃণা আর তিক্ততা মোচড় দিয়ে উঠল। রৌশনারা বেগম কল করেছেন। রিনি চোয়াল শক্ত করে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
“আমাকে কেন কল করলে?”
ওপাশ থেকে রৌশনারা বেগম ধরা গলায় করুণ সুরে বললেন,
“এভাবে কথা বলছিস কেন মা? আমি তোর মা হই।”
রিনি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“না, আমার কোনো মা নেই।”
রৌশনারা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁপা গলায় বললেন,
“তুই নাকি তোর বাবার বাড়িতে থাকছিস?”
রিনি বিরক্ত হয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“হ্যাঁ, তাতে তোমার কোনো সমস্যা? আমার বাবার বাড়িতে আমি থাকব না তো কে থাকবে?”
রৌশনারা বেগম এবার তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
“তুই নিশ্চয়ই তোর বাবার থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভালো সাজার অভিনয় করছিস, তাই না? আমি তোকে চিনি রিনি।”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে রিনি স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তীব্র ঘৃণাভরে বলল,
“না, তুমি ভুল। প্রতিশোধ নিতে নয়, বরং আমি জীবনের সঠিক পথটা বুঝতে শিখেছি। তোমার যদি বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকে, তবে দ্বিতীয়বার আমাকে আর কল দিবে না।”
বলেই রিনি রাগে কলটা কেটে দিল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছিল। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতেই দেখল, অন্য একটা নাম্বার থেকে বারবার কল আসছে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাম্বারটা তার খুব পরিচিত মেহরাব দেওয়ান।
গত কয়েক দিনে তূর্ণার মাধ্যমে মেহরাবের সাথে রিনির এক অদ্ভুত অথচ অম্লমধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মেহরাব সাধারণত তূর্ণার বিষয় ছাড়া রিনিকে কল দেয় না। বারবার কল দেখে রিনির মনে কু ডাকল। তূর্ণার কিছু হয়নি তো? রিনি দ্রুত কলটা রিসিভ করল।
রিনি ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে মেহরাবের ভারী এবং ভীষণ উদাস কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেহরাব বলল,
“মিস রিনি, তূর্ণা বিকেল থেকে খুব অসুস্থ। গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে ওর। ওষুধের ঘোরেও শুধু আপনার নাম ধরে ডাকছে। খুব বায়না করছে আপনাকে একবার দেখার জন্য।”
কথাটা শোনামাত্র রিনির বুকটা ধক করে উঠল। কলিজার ভেতর যেন কেউ সূক্ষ্ম সুঁচ ফুটিয়ে দিল। এই অল্প কদিনেই এক অদৃশ্য সুতোয় তূর্ণার সাথে সে বাঁধা পড়ে গেছে। তূর্ণা যেন রিনির নিজের শরীরেরই কোনো এক অংশ। রিনির চোখের সামনে তূর্ণার সেই মায়াবী হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠল, যা এখন জ্বরের ঘোরে বিবর্ণ হয়ে আছে।
রিনি আর একটি মুহূর্তও নষ্ট করল না। শুধু ধরা গলায় বলল, “আমি আসছি।”
বাইরে তখন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমেছে।
★★★
মিতু, নৌশি আর তৃণা তিনজন মিলে বেশ খোশমেজাজে গল্প করছিল। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আদনান। নৌশি মুখ ফুলিয়ে অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসেছে, আদনান কেন সারাক্ষণ তার সাথে খিটখিট করে, কেন কথায় কথায় ঝগড়া বাঁধায়! নৌশির সেই সিরিয়াস অভিযোগ শুনে মিতু আর তৃণা হেসেই কুটিপাটি।
কিন্তু এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেও মিতুর তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না যে, তৃণা আজ একটু বেশিই অন্যমনস্ক। গল্পের খেই হারিয়ে ফেলছে বারবার। গত এক ঘণ্টার মধ্যে সে এই নিয়ে তিনবার ওয়াশরুমে গেল। এবারও যখন তৃণা বলল,
“ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
বলে উঠে গেল। মিতু আর নৌশি একে অপরের দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
মিনিট কয়েক পর তৃণা হাত-মুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে এল। মিতু আর নৌশি লক্ষ্য করল, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তৃণা খুব সতর্ক আর ধীরপায়ে হাঁটছে, যেন পা ফেলতেও তার কষ্ট হচ্ছে। নেমে এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়তেই মিতু কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তৃণা, শরীর কি খারাপ লাগছে? তুমি কি অসুস্থ?”
তৃণা ফ্যাকাসে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল,
“না ভাবি, তেমন কিছু না। আমি ঠিক আছি।”
মিতু এবার একটু কড়া গলায় বলল,
“ঠিক আছো মানে? তাহলে ওভাবে গুটিগুটি পায়ে হাঁটছো কেন? আর বারবারই বা কেন ওয়াশরুমে দৌড়াচ্ছো? সত্যি করে বলো তো কী হয়েছে?”
তৃণা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। ক্লান্ত স্বরে বলল,
“আসলে ভালো লাগছে না ভাবি। কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে।”
তৃণার চেহারায় ফুটে ওঠা অস্বস্তি দেখে মিতু আর দেরি করল না। সে দৃঢ় গলায় বলল,
“অস্থির লাগছে যখন, তখন এখানে বসে থেকো না। যাও, রুমে গিয়ে একটু শুয়ে পড়ো।”
তৃণা আবদারের সুরে বলল,
“থাক না ভাবি, তোমাদের সাথে আরও একটু বসি।”
মিতু এবার বড় বোনের মতো শাসন করে বলল,
“একদম না! আমি বললাম তো রুমে গিয়ে শুয়ে থাকবে। বড় বোনের কথা শুনতে হয়, যাও।”
তৃণা আর দ্বিরুক্তি করল না। মিতু ভাবির এই ভালোবাসামাখা ধমক শুনে তৃণা মুচকি হাসল। নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
নৌশি সোফায় বসে তৃণার ফেলে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল আর ‘রাগী সাহেব’ নামটা। নৌশি মুচকি হেসে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আরিয়ানের উদগ্রীব কণ্ঠ ভেসে এল,
“শ্যামলিনী!”
নৌশি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“দাদাভাই, আমি নৌশি।”
ওপাশে আরিয়ান বলল,
“তুই? তোর বউমনি কোথায়? ফোন ধরছে না কেন?”
“বউমনির শরীরটা মনে হয় ভালো নেই রে দাদাভাই। কেমন জানি অস্থির লাগছিল বলল, তাই রুমে গিয়ে শুয়েছে।”
“কী হয়েছে ওর? হঠাৎ শরীর খারাপ করল কেন?”
আরিয়ানের গলার স্বর এবার বেশ গম্ভীর।
“ঠিক জানি না, শুধু বলল ভালো লাগছে না।”
নৌশির কথা শেষ হওয়ার আগেই আরিয়ান ছোট করে
“আচ্ছা, ঠিক আছে” বলে কলটা কেটে দিল। নৌশি বুঝতে পারল, ওপাশে আরিয়ানের মনে এখন ঝড় বইছে।
প্রায় আধাঘণ্টার মধ্যেই আরিয়ান ঝড়ের বেগে কলিং বেল বাজিয়ে বাসায় ঢুকল। সোফায় বসা নৌশিকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে নৌশি অবাক হয়ে বলল,
“দাদাভাই, এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে?”
আরিয়ান সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েই সংক্ষেপে বলল,
“তোর বউমনি কি রুমে?”
“হ্যাঁ।”
নৌশি সিঁড়ি দিয়ে আরিয়ানের হন্তদন্ত হয়ে ওপরে যাওয়া দেখে মনে মনে হাসল। প্রিয়তমার সামান্য অসুস্থতার খবর শুনে যে মানুষটা পৃথিবীর সব কাজ ফেলে এভাবে ছুটে আসে, ভালোবাসা বোধহয় একেই বলে।
আরিয়ান রুমে ঢুকে দেখল ঘরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। তৃণা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান পা টিপে টিপে গিয়ে পেছন থেকে আলতো করে তৃণাকে জড়িয়ে ধরল। তৃণা চমকে উঠল না, কারণ আরিয়ানের গায়ের সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ আর স্পর্শ তার অস্তিত্বে মিশে আছে। সে নিঃশব্দে মাথাটা এলিয়ে দিল আরিয়ানের চওড়া বুকে।
আরিয়ান তৃণার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে নরম কণ্ঠে শুধাল,
“তুমি নাকি অসুস্থ?”
তৃণা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,
“কে বলল? না তো! আসলে মুডটা একটু খারাপ ছিল, তাই হয়তো ওরা ভেবেছে আমি অসুস্থ।”
আরিয়ান এবার তৃণালে নিজের মুখোমুখি ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। তৃণার ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
“কয়েক দিন ধরেই দেখছি তুমি একই কথা বলছো। শুধু মুড অফ না, আমি খেয়াল করছি তুমি ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছো। শরীর কেমন লাগে? খুব দুর্বল লাগে? মাথা ঘোরে বা অন্য কিছু? চলো, আগামীকালই কোনো ভালো ডক্টরের কাছে যাব।”
তৃণা আরিয়ানের দুশ্চিন্তা দেখে আলতো করে ওর হাতটা ধরল।
“এত অস্থির হচ্ছেন কেন? তেমন তো কিছুই হয়নি। কিন্তু আপনি হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি চলে আসলেন কেন?”
আরিয়ান এক মুহূর্ত তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর টুপ করে ওর গালে একটা গভীর চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমার শ্যামলিনীর মন ভালো নেই, এটা জানার পর আমি কি করে অফিসে মন বসাই, বলো?”
তৃণা আদুরে গলায় বলল,
“যান তো, আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন।”
আরিয়ান আর দেরি করল না। চটজলদি ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। পরনে একটা হালকা নীল রঙের টি-শার্ট। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে খেয়াল করল, তৃণা আগের মতোই জানলার পাশে চুপচাপ বসে আছে। বাইরের আবছা আলোয় ওর মুখটা ভীষণ মলিন আর বিষণ্ণ লাগছে। আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল। সে পা টিপে টিপে গিয়ে তৃণার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসল।
তৃণার ছোট দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম গলায় শুধাল,
“কী করলে আমার শ্যামলিনীর মন ভালো হবে, বলো তো?”
তৃণা উদাসীনভাবে জবাব দিল, “কিছু না।”
মেয়েদের এই এক স্বভাব! মন খারাপ থাকলে যখন বলে ‘কিছু না’, তখন বুঝতে হবে সেই ‘কিছু না’-এর ভেতরেই পৃথিবীর সব না-বলা কথা লুকিয়ে আছে। এই মৌনতার ভাষা পড়া যে কত কঠিন, তা কেবল ভুক্তভোগী স্বামীরাই জানে।
আরিয়ানের মাথায় হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে ঝটপট নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে একটা ধুমধাড়াক্কা হিন্দি গান চালিয়ে দিল। তারপর কোনো ভূমিকা ছাড়াই তৃণার সামনে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল। তৃণা যেন আকাশ থেকে পড়ল! আরিয়ানের মতো একজন গম্ভীর, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ সে কি না এভাবে হাত-পা ছুড়ে নাচছে!
আরিয়ান কোনো প্রফেশনাল ড্যান্সার নয়, বরং তার স্টেপগুলো ছিল বেশ হাস্যকর। হাত-পা ছোড়ার চোটে সে একবার হোঁচট খেতে খেতেও বেঁচে গেল। আরিয়ানের সেই অদ্ভুত কসরত দেখে তৃণা আর গম্ভীর থাকতে পারল না। তার সব অস্থিরতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে খিলখিল করে শব্দ করে হেসে উঠল।
হাসতে হাসতে তৃণার দুচোখে জল চলে এল। আরিয়ান নাচ থামিয়ে হাপাতে হাপাতে তৃণার একদম কাছে এসে বসল। ওর হাসিমাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আরও নাচতে হবে নাকি?”
তৃণা হাসতে হাসতে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উহু, না! আর নাচতে হবে না, তাতেই হবে।”
আরিয়ান তৃণার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে গভীর নজরে তাকিয়ে বলল,
“মন ভালো হয়েছে এবার?”
তৃণা পরম মমতায় আরিয়ানের দাড়িভরা মুখটা দুই হাতের তালুতে আগলে ধরল। তারপর নিজের নাকটা আরিয়ানের নাকের সাথে আলতো করে ঘষে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এমন একজন ‘রাগী সাহেব’ যার জীবনে আছে, তার শ্যামলিনী কি বেশিক্ষণ মন খারাপ করে থাকতে পারে?”
আরিয়ানের চোখেমুখে তখন একরাশ তৃপ্তি। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ঘরের ভেতর এক চিলতে ভালোবাসা।
★★★
রাতের নির্জন রাস্তা চিরে মেহরাব দেওয়ানের গাড়িটা এগিয়ে চলছে। স্টিয়ারিং হুইলে মেহরাবের হাত দুটো স্থির, দৃষ্টি সামনের পিচঢালা পথে। পাশে বসে থাকা রিনি জানালার বাইরের অন্ধকার দেখছে, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে তূর্ণার সেই ছোট্ট বিছানায়।
সন্ধ্যা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত সময়টা যেন চোখের পলকে কেটে গেল। তূর্ণার শরীরের উত্তাপ রিনি নিজের হাতের তালুতে অনুভব করেছে। মেয়েটা জ্বরের ঘোরে বারবার রিনিকে আঁকড়ে ধরছিল, যেন রিনি চলে গেলেই তার সবটুকু নিরাপত্তা হারিয়ে যাবে। আসার সময় তূর্ণার সেই আকুতি “আম্মু তুমি যেও না, তোমাকে ছাড়তে আমার কষ্ট হয়।” তারপর তূর্ণাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে রিনি এসেছে। ঘুম থেকে উঠে নিশ্চয় সে রিনি কে খুজবে। তূর্ণার সেই কথা এখনও রিনির কানে তীরের মতো বিঁধছে।
রিনির নিজেরই অবাক লাগছে। এক সময় যে রিনি শিশুদের চঞ্চলতা সহ্য করতে পারত না, আজ সেই রিনির চোখের কোণ ভিজে উঠছে এক অবুঝ শিশুর মায়ায়। তূর্ণার সাথে তার কোনো রক্তের টান নেই, অথচ নাড়ির স্পন্দন যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। রিনি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল মুছল। তার মনে কেবল একটাই হাহাকার, এই মায়া হয়তো ক্ষণস্থায়ী, সারাজীবন তো তূর্ণার পাশে থাকা হবে না। গাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে মেহরাব হঠাৎ গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বলে উঠল,
“কোনো কারণে কি আপনি আপসেট, মিস রিনি?”
রিনি দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। মেহরাবের দিকে না তাকিয়েই ধরা গলায় বলল,
“না, তেমন কিছু না। তূর্ণার শরীরটা দেখে খারাপ লাগছে, এই যা।”
মেহরাব আর কথা বাড়াল না। রিনি এবার সাহস সঞ্চয় করে প্রথমবারের মতো মেহরাবের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো মেহরাবের তীক্ষ্ণ নাকে আর চিবুকে এসে পড়ছে। লোকটা নিঃসন্দেহে প্রচণ্ড সুদর্শন এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, কিন্তু তার চোখের গভীরে এক অদ্ভুত একাকিত্ব লুকিয়ে আছে। রিনি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না, দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।
গাড়িটা একসময় হাওলাদার বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। এত রাতে রিনি আর মেহরাবকে ভেতরে আসার সৌজন্যতা দেখাল না, কারণ সে জানে বাড়িতে তূর্ণা একা আর অসুস্থ। মেহরাব শুধু একটা ছোট কৃতজ্ঞতাসূচক মাথা নেড়ে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।
রিনি ধীরপায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরে এল। কাপড় বদলে বিছানায় শুতেই হঠাৎ একটা চিন্তা তার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো এল। মেহরাব আর তূর্ণাকে নিয়ে এমন এক ভাবনা যা হয়তো তার জীবনের সব সমীকরণ বদলে দিতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা ঝাকিয়ে সেই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল, “না, এটা ঠিক হবে না। রিনি, তুমি বড্ড বেশি ভেবে ফেলছো।”
চলবে….
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫০(বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৬ (প্রথমাংশ)