#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
#পর্ব_৬৪
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
বাইরে তখন শ্রাবণের অঝোর ধারা। প্রকৃতিজুড়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নিবিড় হয়ে নেমেছে। বিছানায় শুয়ে থাকা তৃণা হঠাৎ এক দুঃস্বপ্নের ঘোরে ছটফট করে জেগে উঠল। তার বুকের ভেতরটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তবে কি এতক্ষণ যা কিছু দেখল, আরিয়ানের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা, হাসপাতালের করিডোরে তার পাগলের মতো ছোটাছুটি, আরিয়ানের সেই অচেনা নির্লিপ্ত দৃষ্টি সবই কি তবে স্বপ্ন ছিল? শূন্য দৃষ্টিতে সে অন্ধকার ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। সারা শরীর ভয়ে অবশ হয়ে আসছে। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে তার গায়ে লাগছে, কিন্তু উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করার মতো শক্তিও সে পাচ্ছে না। বৃষ্টির এই একটানা শব্দ শুনলেই অবচেতন মনে সেই কৈশোরের বিভীষিকা জেগে ওঠে। ছাদের সেই নির্জন কোণে মামার সেই কুৎসিত লালসা আর নিজের অসহায়ত্বের স্মৃতি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। সে চাদরটা গায়ের ওপর আরও শক্ত করে টেনে নিয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে রইল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার কপাট খোলার শব্দ হলো। সে সিক্ত চোখে সেদিকে তাকালো। দেখল দরজার চৌকাঠে দীর্ঘকায় এক ছায়া, আরিয়ান! আরিয়ান ঘরে ঢুকেই সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আরিয়ানের পুরো শরীর বৃষ্টির জলে সিক্ত, চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হাতের ব্যাগটা মেঝেতে রেখে সে বিছানার দিকে তাকাতেই থমকে গেল। তৃণার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে সে দ্রুতপদে এগিয়ে এল। সে কোনো কথা না বলে পাগলের মতো আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। যেন এই মানুষটাকে একবার ছুঁতে না পারলে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। আরিয়ান কিছুটা বিস্মিত হয়ে মাথায় হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তৃণা? শরীর খারাপ লাগছে? তুমি এমন করছ কেন?”
তৃণা তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ধরা গলায় বলল, “আমার খুব ভয় হচ্ছে… খুব ভয়!”
আরিয়ান তার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে হাসল। পরম মমতায় বলল,
“পাগলী মেয়ে, কিসের এত ভয়? আমি তো আছি।”
তৃণা কান পেতে বৃষ্টির শব্দ শুনল। তারপর ভেজা কণ্ঠে বলল, “এই প্রকৃতি থেকে কি বৃষ্টিকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না? বৃষ্টির শব্দ কানে এলে মনে হয় কেউ যেন তপ্ত সীসা ঢেলে দিচ্ছে।”
আরিয়ান মৃদু হেসে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“বৃষ্টির শব্দ শুনে কেউ বুঝি এমন ভয় পায়?”
তৃণা আরিয়ানের সেই জলসিক্ত, মায়াবী চেহারার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বেয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি বড্ড ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
“কী স্বপ্ন?” আরিয়ান কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।
তৃণা মাথা নেড়ে বলল,
“না, বলব না। মা বলতেন, অশুভ স্বপ্ন বললে নাকি সত্যি হয়ে যায়। আমি চাই না সেই দুঃস্বপ্ন কখনও ছায়া হয়েও আমাদের জীবনে আসুক।”
আরিয়ান তাকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তৃণা আবার প্রশ্ন করল, “আপনাকে হারানোর ভয় আমাকে এত নিঃস্ব করে দেয় কেন? কেন মনে হয় আপনি না থাকলে আমার পৃথিবীটা একদম অন্ধকার হয়ে যাবে?”
আরিয়ান তৃণার দুহাতে নিজের হাত রেখে গভীর অনুরাগে বলল,
“ভালোবাসায় যদি হারানোর ভয় না থাকে, তবে সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। এই ভয়টুকুই তো একে অপরের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল করে তোলে।”
তৃণা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে তার মনের অস্থিরতা কমতে শুরু করল। সে আরিয়ানের ভেজা শার্টের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“যান, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসুন। যে হারে ভিজেছেন, ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”
আরিয়ান তৃণার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। কিছুক্ষণ পর সে ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসতেই তৃণা অনুভব করল না, কোনো হাসপাতাল নেই, কোনো স্মৃতিভ্রম নেই। তার রাগি সাহেব তার পাশেই আছে। বাইরের বৃষ্টির শব্দটা এখন আর সীসার মতো বাজছে না, বরং মনে হচ্ছে তা এক অলিখিত প্রেমের গান গেয়ে যাচ্ছে।
★★★
বৃষ্টিভেজা নির্জন রাজপথ। ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে দু-একটা রিকশা টুংটাং শব্দ তুলে দূর অজানায় মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারের সোডিয়ামের স্নান আলোয় মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই আলো-আঁধারিতে ভিজে একাকার হয়ে হেঁটে চলেছে দুই মানব-মানবী নুসরাত আর নির্জন ইমতিয়াজ।
নুসরাতের পরনের চুড়িদারটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। তার লম্বা ভেজা চুলগুলো মুখের ওপর অবাধ্য হয়ে আছড়ে পড়ছে। সে দুই হাত মেলে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাকে যেন অনুভব করতে চাইছে। এই রাতের বৃষ্টিতে শরীরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা লাগলেও নুসরাতের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তার চোখের কাঁচের চশমাটা বৃষ্টির জলে ঝাপসা হয়ে আছে, কিন্তু খোলার উপায় নেই, চশমা ছাড়া যে নুসরাতের পুরো পৃথিবীটাই ধোঁয়াশা। সোডিয়ামের আলোয় তার গালের সেই পুরনো এসিডদগ্ধ দাগটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না, বরং বৃষ্টির স্নিগ্ধতায় তাকে অপার্থিব সুন্দরী দেখাচ্ছে।
নির্জন পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তার এই চশমাওয়ালি ম্যাডাম-এর দিকে। নুসরাতকে দেখলে তার মনে হয়, পৃথিবীতে মায়া যদি কোনো রূপ নিত, তবে সে হয়তো এই মেয়েটার মতোই হতো। নির্জনের নিজের মাথার চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে, ভেজা সাদা শার্টের নিচে শরীরের গঠন স্পষ্ট। সে এক পা বাড়িয়ে নুসরাতের পথ আগলে দাঁড়াল।
নির্জন মৃদু কণ্ঠে বলল,
“এভাবে ভিজলে তো নির্ঘাত জ্বর বাঁধাবেন ম্যাডাম। এবার একটু থামুন।”
নুসরাত হাসল। এক অদ্ভুত চপলতায় মাথা দুলিয়ে বলল,
“হলে হোক না জ্বর। সেবার করার জন্য তো আমার বাদামওয়ালা আছেই, তাই না?”
নুসরাত আবার হাঁটতে শুরু করল। নির্জন তার পেছন পেছন ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে নুসরাত হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নির্জনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। তার চোখের তারায় অনেকগুলো না বলা কথা ভিড় করছে। নুসরাতের এই গভীর চাহনি দেখে নির্জনও স্থির হয়ে গেল।
নির্জন অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু কি বলবে আমায়?
নুসরাত স্থির দৃষ্টিতে নির্জনের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির ঝাপটা সরাসরি এসে তার মুখে পড়ছে, কিন্তু তার মন যেন কোনো এক গভীরে ডুব দিয়েছে। এক বুক নিঃশ্বাস টেনে সে হঠাৎ বলে উঠল,
“আমি তোমাকে একটা মিথ্যা বলেছিলাম, নির্জন।”
নির্জন খুব একটা অবাক হলো না। বরং পকেট থেকে হাত বের করে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী মিথ্যা?”
নুসরাত কিছুটা অপরাধবোধের সুরে বলল, “তুমি আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলে, তোমার আগে আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম কি না। সেদিন আমি সরাসরি ‘না’ বলেছিলাম। কিন্তু আমার সেই উত্তরটা পুরোপুরি মিথ্যা ছিল। তোমার আগে অন্য একজন আমার জীবনে এসেছিল, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।”
নির্জন এবার মৃদু হাসল। সে হাসিতে নেই কোনো ঈর্ষা, নেই কোনো অভিযোগ। সে নুসরাতের আরও কাছে এসে বলল, “আমি জানি ম্যাডাম। এমনকি তুমি কাকে ভালোবেসেছিলে, সেটাও আমার অজানা নয়।”
নুসরাত বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি জানতে? সব জেনেও তুমি এমন নির্লিপ্ত?”
“হুম জানি।” নির্জনের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
নুসরাতের ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা হাসিটা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। একটা অজানা ভয় আর অস্বস্তি তাকে গ্রাস করতে চাইল। ঠিক তখনই নির্জন শব্দ করে হেসে উঠল। সে নুসরাতের দুই গালে হাত রেখে পরম আদরে তার মুখটা উঁচিয়ে ধরল।
“তাতে কী হয়েছে চশমাওয়ালি ম্যাডাম? মানুষের অতীত থাকতেই পারে। তবে আমি তোমার অতীত নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। আমি শুধু চিনি আমার বর্তমানের এই চশমাওয়ালিকে। ওই পুরোনো ডায়েরির পাতাগুলো আমার কাছে এখন অর্থহীন।”
নুসরাতের চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু অবিরত ঝরতে থাকা বৃষ্টির শীতল জলে সেই চোখের জল কখন যে মিশে একাকার হয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না। হঠাৎ করেই নির্জন তাকে অবাক করে দিয়ে নুসরাতকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিল। নুসরাত অপ্রস্তুত হয়ে নির্জনের ভেজা শার্টটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। নির্জন তাকে নিয়ে বৃষ্টিভেজা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আমি তোমার অতীত নিয়ে ভাবি না, আর চাই না তুমিও সেটা নিয়ে ভাবো। সব ভুলে গিয়ে এখন শুধু আমার দিকে তাকাও।”
নুসরাত স্তব্ধ হয়ে নির্জনের বুকের ওপর মাথা রেখে রইল। তার মনে হতে লাগল, সৃষ্টিকর্তা যা করেন তা মানুষের মঙ্গলের জন্যই করেন। অনেক সময় আমরা এক টুকরো রুপা হারিয়ে কত হাহাকার করি, কত অভিযোগ তুলি বিধাতার কাছে। অথচ আমরা জানি না যে, পরম করুণাময় আমাদের হাত থেকে সামান্য রুপা কেড়ে নেন কেবল তার বিনিময়ে দামী এক টুকরো হীরা উপহার দেবেন বলে।
★★★
দেখতে দেখতে সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে তৃণা এখন তার গর্ভাবস্থার অষ্টম মাসে পা রেখেছে। তার শারীরিক অবয়বে এখন এক পূর্ণতা মাতৃত্বের সেই অমলিন আভা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। দূর থেকে দেখলেও স্পষ্ট বোঝা যায়, তার ভেতরে এক নতুন প্রাণ, এক নতুন অস্তিত্ব ডানা মেলছে।
আজ তৃণার নিয়মিত চেক-আপের দিন। আরিয়ান অতি সাবধানে তৃণার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, যেন কাঁচের কোনো বহুমূল্য সম্পদ আগলে রাখছে সে। ড্রয়িংরুমে মায়মুনা বেগম উদ্বিগ্ন মুখে এগিয়ে এলেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে শাসনের সুরে বললেন,
“শোন বাবা, গাড়ি একদম ধীরে চালাবি। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না, কোনোভাবেই যেন তৃণার কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখিস।”
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল, “তুমি চিন্তা করো না মা, আমি খুব সাবধানেই চালাবো।”
তৃণা কোনোমতে গাড়ির পেছনের সিটে না বসে আরিয়ানের পাশেই সামনের সিটে বসল। আজ সকাল থেকেই তার মনটা কেন জানি একটু ভার হয়ে আছে। আরিয়ান গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে তৃণার মলিন মুখের দিকে একবার তাকালো। তারপর কোমল গলায় জিজ্ঞেস করল, “শরীর ঠিক আছে তো তেনার? মন খারাপ কেন?”
তৃণা ছোট করে উত্তর দিল, “হুম, ঠিক আছে।”
আরিয়ান এবার গাড়ি স্টার্ট দিল। কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করতেই তৃণার চোখের পলক আর পড়ে না! সে অবাক হয়ে একবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, আর একবার স্পিডোমিটারের দিকে। আরিয়ানের গাড়ি এখন যে গতিতে চলছে, তাকে আর যা-ই হোক ড্রাইভিং বলা চলে না। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তৃণা আর সহ্য করতে না পেরে বিস্ময় মাখানো গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি রসিকতা করছেন? এত ধীর গতিতে কেন গাড়ি চালাচ্ছেন? সাইকেলের চেয়েও কম গতিতে চললে তো আমরা পরশুদিন ক্লিনিকে পৌঁছাবো! আরেকটু স্পিড দিন প্লিজ!”
আরিয়ান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে স্টিয়ারিং ধরে রেখে বলল, “নাহ, স্পিড দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। যদি হুট করে ব্রেক কষতে হয়? যদি ঝাকুনি লাগে? কোনো রকম রিস্ক নেওয়া যাবে না।”
তৃণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হা করে তাকিয়ে রইল তার এই অতি-সতর্ক স্বামীর দিকে। রাস্তায় পাশ দিয়ে একটা সাধারণ সাইকেলও সাঁই সাঁই করে তাদের গাড়িকে ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। আরিয়ানের এই অতিরিক্ত সাবধানতা দেখে তৃণা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। তার রাগি সাহেব এখন পাহারাদার, যে তার অনাগত সন্তানের জন্য পৃথিবীকে একদম থামিয়ে দিতেও রাজি!
সেদিন ডাক্তার সব পরীক্ষার পর জানিয়েছিলেন যে গর্ভস্থ সন্তান একদম সুস্থ আছে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন হয়তো অন্যরকম ছিল। রাত তখন বারোটা। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ, আরিয়ান গভীর ঘুমে মগ্ন। ডক্টরের চেম্বার থেকে ফেরার পর থেকেই তৃণার শরীরটা ঠিক সায় দিচ্ছিল না। তলপেটে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে, যা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তৃণা হিসেব মেলাতে পারছে না এখন তো মাত্র সাড়ে আট মাস চলছে, তবে কি এখনই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ? ব্যথার চোটে সে বিছানায় স্থির থাকতে পারল না। ভাবল একটু পায়চারি করলে হয়তো আরাম হবে, কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। প্রতিটা পদক্ষেপে পেটের ভেতর যেন কেউ ধারালো ছুরি চালাচ্ছে। এতক্ষণ দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করার চেষ্টা করলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। তৃণার মুখ দিয়ে অবাধ্য এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল, দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা জল।
তৃণার সেই অস্ফুট ফুপিয়ে কাঁদার শব্দে আরিয়ানের তন্দ্রা ছুটে গেল। সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। বিছানার এক কোণে তৃণাকে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকতে দেখে আরিয়ানের কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তৃণার দুহাত চেপে ধরল। আরিয়ানের কণ্ঠস্বর তখন থরথর করে কাঁপছে, “কী হয়েছে শ্যামলিনী? তুমি ঠিক আছ তো? কথা বলো!”
তৃণা ব্যথার তীব্রতায় নীল হয়ে গিয়ে আরিয়ানের টি-শার্টের কলারটা খামচে ধরল। ভাঙা গলায় বলল, “খুব ব্যথা করছে আরিয়ান… পেটে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না!”
আরিয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। প্রিয়তমা স্ত্রীর এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে তার নিজের চোখেও জল চলে এল। সে তৃণার মাথাটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল, যেন নিজের বুকের উষ্ণতায় তার সমস্ত যন্ত্রণা শুষে নিতে চায়। রুদ্ধস্বরে সে বারবার বলতে লাগল,
“একটু ধৈর্য ধরো শ্যামলিনী, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু হবে না তোমার।”
মুহূর্তেই পুরো মির্জা বাড়িতে সোরগোল পড়ে গেল। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সবাই জাগ্রত। তৃণার প্রসব বেদনা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। যখন পুব আকাশে ভোরের আলোর আভাস ফুটে উঠছে আর মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজানের প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে, তখন আরিয়ান নিজেকে সামলে নিতে একটু আড়ালে গেল। ওজু করে নামাজের কক্ষে দাঁড়িয়ে পরম করুণাময়ের দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল আরিয়ান।
সালাত শেষে দুই হাত তুলে মোনাজাতে সে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“হে মহান রাব্বুল আলামিন! আপনি আমার স্ত্রীর এই অসহ্য যন্ত্রণাটুকু কমিয়ে দিন। সহিহ সালামতে আমাদের সন্তানকে এই পৃথিবীতে আসার তৌফিক দান করুন। আপনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই মাবুদ!”
ততক্ষণে বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। বাড়ির সবাই মিলে দ্রুত তৃণাকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। হাসপাতালের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটার সময় আরিয়ান তৃণার হাতটা শক্ত করে ধরে রইল। তার মনে তখন একদিকে অনাগত সন্তানের আগমনের প্রতীক্ষা, আর অন্যদিকে তার শ্যামলিনীকে হারানোর এক অজানা হাহাকার।
তৃণাকে লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা আশ্বাস দিয়েছেন যে শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নরমাল ডেলিভারি হওয়া সম্ভব। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের অবস্থা তখন শোচনীয়। শক্তসমর্থ এই পুরুষটি আজ এক অবুঝ বালকের মতো ডুকরে কাঁদছে। রুমের ভেতর থেকে আসা তৃণার প্রসব যন্ত্রণার সেই বুকফাটা আর্তচিৎকার আরিয়ানের কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছে।
ডক্টর ম্যাডাম ভেতরে ঢুকতে নিলেই আরিয়ান ছলছল চোখে মিনতি করে বলল,
“ম্যাম, প্লিজ আমাকে ভেতরে যেতে দিন। ও আমাকে ছাড়া খুব ভয় পাচ্ছে।”
ডক্টর আরিয়ানের আকুলতা দেখে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, আমাদের সহযোগিতা করবেন। চলুন।”
ভেতরে ঢুকে আরিয়ান দেখল তৃণা যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বেডের সাদা চাদরটা খামচে ধরেছে। তার পুরো মুখ ঘামে ভিজে একাকার। আরিয়ানের পা যেন এগোতে চাইছিল না, তবুও মনের সমস্ত জোর সঞ্চয় করে সে তৃণার মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ানকে দেখা মাত্রই তৃণা যেন আশ্রয়ের শেষ ভরসাটুকু খুঁজে পেল। সে আরও জোরে কেঁদে উঠে আরিয়ানের হাতটা খামচে ধরল।
তৃণা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়ে গোঙাতে গোঙাতে বলল,
“আমি বোধহয় আর বাঁচব না। আমি মরে যাচ্ছি রাগী সাহেব!”
আরিয়ানের ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে তৃণার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এভাবে বলো না শ্যামলিনী। মৃত্যুর কথা মুখে এনো না। তুমি না থাকলে আমার এই পৃথিবীর কোনো অর্থ নেই।”
ডক্টর পাশ থেকে তাগাদা দিলেন, “তৃণা, সাহস হারাবেন না। আরেকটু জোর দিন!”
তৃণার শরীর তখন একদম ছেড়ে দিয়েছে। সে নিস্তেজ হয়ে আসছিল। আরিয়ান এবার তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গভীর আবেগে বলতে লাগল, “একবার ভাবো তো শ্যামলিনী, আর কয়েক মুহূর্ত পরেই আমাদের সেই স্বপ্নটা আমাদের কোলে আসবে। আমাদের ভালোবাসার এক টুকরো অংশ এই পৃথিবীতে আসবে। তুমি কি চাও না আমাদের একটা সুন্দর পরিপূর্ণ সংসার হোক? আমাদের বাচ্চার জন্য হলেও তোমাকে লড়তে হবে তৃণা।”
আরিয়ানের এই কথাগুলো তৃণার নিভে আসা শরীরে দাবানলের মতো শক্তি জোগাল। সে চোখ দুটো খিঁচিয়ে বন্ধ করে, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে শেষবারের মতো চেষ্টা করল।
ডক্টর উৎসাহ দিয়ে বললেন, “ইয়েস, জাস্ট ফিউ সেকেন্ডস!”
তৃণা তার সর্বশক্তি দিয়ে এক গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। একজন মা-ই কেবল জানে সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে কতটা মৃত্যুসম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। নারীদের এই লড়াই যেন এক পুনর্জন্ম। তৃণার সেই তীব্র চিৎকারের রেশ কাটতে না কাটতেই এক নবজাতকের কান্নার সুরে পুরো রুম মুখরিত হয়ে উঠল।
ডক্টরদের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল। কিন্তু আরিয়ান বিস্ময় আর আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে তৃণার দিকে। তৃণা তখন নিস্পন্দ। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে স্থির হয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে, মুখটা হা হয়ে আছে যেন প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে ফুসফুসে পর্যাপ্ত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।
আরিয়ান উন্মাদের মতো তৃণার গালে আর মুখে হাত বুলিয়ে ডাকতে লাগল, “শ্যামলিনী! এই শ্যামলিনী, কথা বলো! তাকাও আমার দিকে!”
কিন্তু তৃণার কোনো সাড়া নেই। তার স্থির হয়ে যাওয়া চোখের মণি আর আধখোলা মুখটা এক ভয়াবহ স্তব্ধতার জানান দিচ্ছে। আরিয়ান আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করে উঠল, “ডক্টর! প্লিজ দেখুন ওর কী হয়েছে! ও কেন কথা বলছে না?”
প্রধান চিকিৎসক দ্রুত এগিয়ে এসে তৃণার হাতের নাড়ি পরীক্ষা করতে লাগলেন। অন্য একজন নার্স অক্সিজেন মাস্কটা আরও চেপে ধরলেন। ডক্টরের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে নিজের মাথার চুল মুঠো করে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। নার্সরা পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত এগিয়ে এলেন।
“মিস্টার মির্জা, প্লিজ! আপনি এখন বাইরে যান। আমাদের কাজ করতে দিন,” একজন নার্স আরিয়ানকে এক প্রকার ঠেলে বের করে দিতে চাইলেন। আরিয়ান বের হতে চাইছে না, সে তার শ্যামলিনীকে এই অবস্থায় ছেড়ে কোথাও যাবে না। কিন্তু কয়েক জন স্টাফ মিলে তাকে জোর করে লেবার রুমের বাইরে বের করে দিয়ে সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দিল।
বাইরে বেরিয়েই আরিয়ান দরজার ওপর আছড়ে পড়ল। সে পাগলের মতো দরজায় করাঘাত করতে করতে মেঝেতে বসে পড়ল। তার বুক চেরা আর্তনাদে হাসপাতালের করিডোরটা যেন কেঁপে উঠছে। সেখানে উপস্থিত রোগী আর তাদের স্বজনরা অবাক হয়ে এই দৃশ্য দেখছে। পুরুষ মানুষ এভাবে জনসমক্ষে হাউমাউ করে কাঁদলে লোকে ভালো বলে না, কিন্তু আরিয়ানের কাছে তখন পৃথিবীর লোকলজ্জার চেয়ে তার তৃণার প্রাণটা অনেক বেশি দামী।
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৬ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬০(বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬২(প্রথমাংশ)