Golpo romantic golpo কিস অফ বিট্রেয়াল

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৩


#কিস_অফ_বিট্রেয়াল

#পর্ব_৩৩

#লামিয়া_রহমান_মেঘলা

[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]

চট্টগ্রামের ঢালু পথটা রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে এগিয়ে চলেছে কায়ানের গাড়ি। শহরের আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে কাঁচের জানালায় ভেসে উঠছে অস্পষ্ট ছায়া, আর ভেতরে সময় যেন থমকে আছে এক অসহায় মুহূর্তে।

সেরিনের মুখশ্রী ততক্ষণে নীলচে ক্লান্তির আভায় ঢেকে গেছে। শরীরের যন্ত্রণা তাকে আর সোজা হয়ে বসে থাকতে দিচ্ছে না। কাঁপা কাঁপা হাতে সে বানু মির্জার শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে ফেলে, যেন সেটাই তার একমাত্র আশ্রয়।

বানু মির্জা নিচের দিকে তাকাতেই মেয়েটির ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। মাতৃত্বের গভীর টান, দায়বদ্ধতার ভার সব মিলিয়ে তার চোখের কোণ ভিজে আসে।

কই তারও একটা মেয়ে আছে। আহির সাথে তিনি এমনটা চাইলেও করতে পারতেন না। তিনি পরিস্থিতি আলতো ভাবে সামলাতে চেষ্টা করতেন। আর মেয়েটাকে এভাবে মেরে সারাটা দিন ফেলে রাখা এটাকি কোন ভাবে উচিত হয়েছে।

সেরিন ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে বানু মির্জার কোলে। ক্লান্ত গলায় কষ্ট মেশানো স্বরে বলে ওঠে,

“আ আন্টি, প পারছি না বসে থাকতে।”

এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি সেরিনকে নিজের কোলে টেনে নেন, যত্নে মাথাটা স্থির করে রাখেন।

গাড়ির পেছনের সিটে বানু মির্জার কোলে শুয়ে পড়ে সেরিন। মাথাটা আলতোভাবে তাঁর কোলেই হেলে পড়ে আছে। বানু মির্জা ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলেন,

“শান্ত হ মা, আর কিছুটা পথ, আমরা চলে এসেছি।”

সামনের আসনে বসে কায়ান লুকিং গ্লাসে একবার তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে যায়। সেরিনের ভাঙা অবয়ব, অসহায় মুখ, সবকিছু তার বুকের ভেতর তীব্র অস্থিরতা জাগিয়ে তোলে। হাতটা স্টিয়ারিংয়ে আরও শক্ত হয়ে যায়, আর গাড়ির গতি অচেতনেই বেড়ে যায়।

তার বুকের ভেতর জমে থাকা ব্যথা যেন আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাইরে সে নীরব, শুধু চোখে জমে থাকা অস্থিরতা আর অপরাধবোধই কথা বলে যায়।

অর্ধেক পথও পেরোতে না পেরোতেই সেরিনের শরীর আরও নিস্তেজ হয়ে আসে। যন্ত্রণাটা অসহনীয় হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাসও যেন ভারী লাগে।

বানু মির্জা আরও জোরে তাকে আগলে ধরে, কণ্ঠে তাড়নার ছাপ ফুটে ওঠে,

“বাবা, একটু দ্রুত চালাও, মেয়েটা আর পারছে না”

———–

কায়ান, সেরিনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে সেরিনদের বাড়িতে নেমে আসে নিস্তব্ধতা।

শিমুল বসে আছে বাবা মায়ের সামনে।

আবু সুফিয়ান এবং নূরবানু সিকদার চুপচাপ বসে আছেন। তাদের মাথা নিচু।

দুজনেই লজ্জায় আছেন নিজেদের কান্ডে৷

“আম্মা একটা ফোনত করতে পারতেন আমাকে?

নাকি বিয়ে দিয়ে এমন পর করেছেন যে আমার আর জেবরানের কথা ভুলেই গেছিলেন৷’

” শিমুল, কায়ান তোর ভাসুর। আমি চাইনি….”

“চাননি বলে এরকম একটা ছেলের সঙ্গে সেরিনের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? কাকলি কাকির থেকে আমি সব শুনেছি। আপনি কিভাবে সেরিনকে মেরেছেন। সেরিন কি আদও আপনার পেটের সন্তান আম্মা?”

নূরবানু সিকদার একটু চিৎকার করে উঠলেন,

“শিমুল৷”

“চিৎকার করিয়েন না আম্মা, আপনি জানেন হিমেল ভাই না থাকলে কালকের ভেতরে সেরিনকে পাচার করে দিত ওরা। খুঁজেও পেতেন না।

হিমেল ভাই বিকালে বাড়িতে এসে সব খুলে বলে সবাইকে। গ্রামের মাতব্বর যাকে বলেন আপনারা তিনিই সেরিনের এসব কাজে মেহেরীণের ভাইকে সাহায্য করেছে।

মেহেরীণের ভাই এবং বাপ মিলে, শাহারিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে এসব প্লান করেছে।

শাহারিয়ার সেরিনকে রেপ করার হুমকি দিয়েছে জানেন? সেরিন যদি না করত বিয়েতে৷ তবে সেরিনকে সবাই মিলে গ্যাং রেপ করবে আর আপনাদের মেরে ফেলবে এই হুমকি দিয়েছিলো শাহারিয়ার৷”

কথা গুলো শুনে নূরবানু সিকদার কান্নায় ভেঙে পড়লেন,

“যাকে অমানুষের মত পিটিয়ে এমন অবস্থা করেছেন সেই মেয়েটাই আপনাদের কথা ভেবে এই নরকে ঝাপ দিতে চেয়েছিলো।”

আবু সুফিয়ান চুপচাপ চোখের পানি ফেলছেন। আসলেই মেয়েটার সাথে অজান্তেই কত অন্যায় করে ফেলেছেন।

“সেরিনের জায়গায় আমি হলে পারতে মা এভাবে টর্চার করতে?”

শিমুলের প্রশ্ন শুনে নূরবানু সিকদার মাথা তুলে তাকায়।

“এ এ কেমন প্রশ্ন শিমুল।”

“আমি সব জানি মা। সেরিন আমার আসল বোন নয়। সেরিনের মা আমাদের খালা নীলিমা খাতুন। যে কিনা একটা ক্যান্সারে মারা যায়। আর তার বাবা বিয়ে করে। সেরিনের কেউ ছিলোনা তখন। ৬ মাসের সেরিনকে আপনি নিয়ে এসেছেন এ বাড়িতে৷”

নূরবানু সিকদার চিৎকার করে ওঠেন শিমুলের উপর,

“চুপ করো শিমুল। সেরিনকে আমর কখনো সেই অভাব বুঝতে দেয়নি। তাকে সর্বোচ্চ পড়ালেখা, সর্বোচ্চ ভালো জীবন দেওয়ার চেষ্টা করেছি৷”

উপস্থিত সবাই চুপ হয়ে রইলো। আহি, জেবরান এই সংবাদ শুনে খুব অবাক হলেও ওই সময়ে কিছুই বললোনা। কারণ পরিস্থিতি এখন প্রশ্নের জন্য উপযুক্ত নয়৷

———

হসপিটালে পৌঁছে কেটেছে প্রায় ২ ঘন্টা।

কায়ান এবং বানু মির্জা উভয় অপারেশন সেন্টারের বাহিরে বসে। হসপিটালে আসতে আসতে সেরিন নিজের জ্ঞান হারায়৷

ডক্টর সেরিনের অবস্থা দেখে দ্রুতই সার্জারী করার জন্য নিয়ে যায়৷

কায়ান যেন নিস্তব্ধ এক কাঠের পুতুল বনে গিয়েছে। কি হচ্ছে, কি হবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।

সেরিনের জন্য ডক্টর দের চোখে মুখে যে ভয় কায়ান দেখেছে সে ভয় তাকেও ভেতর থেকে ভেঙে চুড়ে গুটিয়ে দিচ্ছল।

এই মুহুর্তে অপেক্ষা ছাড়া কিছুই নেই তার হাতে।

কিছুক্ষণ পর ডক্টর বেরিয়ে আসে। বানু মির্জা এবং কায়ান উভয় বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ডক্টরের চোখে মুখে চিন্তা স্পষ্ট।

ডক্টর এগিয়ে গিয়ে বলেন,

“পেসেন্টের হাসবেন্ড আপনি?”

“জি৷”

“আমার সঙ্গে একটু আসুন।”

কথাটা বলে ডক্টর তার কেবিনের দিকে চলে যায়। কায়ানও পিছু পিছু ডক্টরের কেবিনে চলে যায়।

ডাক্তারের চেম্বারের ভেতরটা নিস্তব্ধ। শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন সময়কে আরও ভারী করে তুলছে। জানালার বাইরে শহরের আলো-আঁধারি ভেসে আসছে, কিন্তু ভেতরের বাতাসটা যেন জমে গেছে এক অদৃশ্য আশঙ্কায়।

ডাক্তার কাগজপত্র গুছিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধীর, সংযত কণ্ঠে বললেন,

“মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত হয়েছে। যে অবস্থায় হাড়টা ভেঙেছে তাতে করে আমাদের সার্জারী করাটাও বেশ ক্রিটিকাল ছিলো। সব থেকে বড় কথা, অনেক দেরি হয়ে গেছে চিকিৎসা শুরু করতে। অপারেশন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”

তিনি একটু থামলেন। শব্দগুলো যেন আরও ভারী হয়ে নামল,

“মিস্টার সিকদার দেখুন আমার কথা গুলো আপনার কষ্ট লাগতে পারে কিন্তু, আপনার স্ত্রী এর এই মুহুর্তে আপনাকে প্রয়োজন। প্লিজ আপনি প্যানিক করবেন না।

পেসেন্ট সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে, এমন সম্ভাবনাও আছ, আবার এটাও হতে পারে যে, সে সারাজীবনের জন্য শয্যাশায়ী হয়ে যাবে। কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব না।”

কথাগুলো শেষ হতেই কায়ানের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ থমকে গেল। ডাক্তার তাকিয়ে আছেন তার দিকে, কিন্তু সেই দৃষ্টি সান্ত্বনার নয়, একটি কঠিন বাস্তবতার নিরব সাক্ষী।

বাইরে হাসপাতালের করিডরে ভেসে আসছে যন্ত্রের শব্দ, নার্সদের দ্রুত পায়ের আওয়াজ। আর ভেতরে, কায়ানের সামনে শুধু একটা প্রশ্ন দাঁড়িয়ে রইল, অতীত কি সত্যিই ফিরিয়ে আনা যাবে, নাকি এই নীরবতা শুধু অপেক্ষার নাম?

কায়ানকে এমন চুপ হয়ে থাকতে দেখে ডক্টর উঠে দাঁড়ায়। কায়ানের ঘাড়ে হাত রাখে।

“দেখুন মিস্টার সিকদার, এই মুহুর্তে আপনাকে স্ট্রং হতে হবে। হয়ত আপনারা কেউ অনুভবও করেন নি ওনার অবস্থা এতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। এটা আমি বুঝতে পারছি কিন্তু এই মুহুর্তে তার টেক কেয়ারের প্রয়োজন। সৃষ্টিকর্তাকে স্বরণ করুন।

যদি সব ঠিক থাকে তবে পেসেন্টকে রেস্ট করিয়ে আমরা ফিজিওথেরাপি শুরু করব৷

২-৩ মাসের ভেতর রেসপন্স পেতে পারি আমরা। তবে আমি বার বার বলছি আপনার ধৈর্য আর ভালোবাসা সব থেকে বেশি প্রয়োজন।”

——–

সম্পূর্ণ ঘটনাটা কায়ানকে ভেতর থেকে এমনভাবে চূর্ণ করে দিয়েছিল যে ছেলেটা এখন প্রতিটি ঘটনার দায় নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। মনে হচ্ছে, এই সর্বনাশের নেপথ্যে যদি কেউ থাকে, সে একমাত্র সে নিজেই।

সেরিনের সামনে যাওয়ার সাহসটুকুও আর তার অবশিষ্ট নেই। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে বানু মির্জার কোলে মাথা গুঁজে শিশুর মতো কেঁদেছে। বুক ভাঙা সেই কান্নায় জমে ছিল অপরাধবোধ, আতঙ্ক আর অসহায়তা।

ছেলের বত্রিশ বছরের জীবনে এমন ভাঙাচোরা রূপ কখনো দেখেননি বানু মির্জা। যে ছেলে সবসময় ঝড়ের মাঝেও পাথরের মতো অটল থেকেছে, আজ সে নিজেই ভেঙে ধুলো হয়ে গেছে।

সেরিনের অবস্থার কথা শুনে তিনিও গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। যদি মেয়েটা আর কোনোদিন বিছানা ছেড়ে উঠতেই না পারে? যদি এই তরতাজা জীবনটা চার দেয়ালের মাঝে থমকে যায়?

তবু মায়ের হৃদয় ভেঙে পড়ার সময় পায় না। তিনি কায়ানের মাথায় হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললেন,

“শান্ত হ বাবা, তুই যদি ওর কাছেই না যাস, তবে ওর পাশে দাঁড়াবে কে?”

মায়ের কণ্ঠে স্নেহের সঙ্গে কঠিন সত্য মিশে ছিল। সেই কথাতেই যেন কায়ান নিজেকে সামলে নিল। বানু মির্জা তাকে সেরিনের কেবিনে পাঠিয়ে দিলেন।

ততক্ষণে সেরিনকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কায়ান ধীর হাতে দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।

চারপাশে নিস্তব্ধতা। সাদা দেয়াল, যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ, ঔষধের গন্ধে ভারী হয়ে থাকা বাতাস। সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে বড়ো একটি বেড, আর তার উপর নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে সেরিন।

পরনে বেবি ব্লু রঙের হাসপাতালের গাউন। মুখটা ফ্যাকাশে, নিস্তেজ। ডাক্তার তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন, তাই গভীর অচেতনায় ডুবে আছে সে।

কায়ানের চোখ দু’টো কান্নায় ফুলে উঠেছে। লালচে দৃষ্টিতে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সেরিনের শয্যার পাশে বসে পড়ল।

কাঁপা হাতে সেরিনের দু’হাত নিজের মুঠোয় নিতেই বুকের ভেতর জমে থাকা সব বাঁধ ভেঙে গেল।

সে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল।

কি থেকে কি হয়ে গেল,

যে জীবনটা হাসিতে ভরা ছিল, তা এক নিমিষে এসে দাঁড়াল হাসপাতালের এই নীরব শয্যার পাশে।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply