আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা১৮
রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আছে সুগন্ধা। পিছনের সিটে ইরাম। তার কোলে ইযান, চুপটি করে বসে নিজের হাতে ধরা একটা ছোট খেলনা দিয়ে খেলছে। প্রায় অনেকটা পথই গাড়ি চলল নিঃশব্দে। তারপর হঠাৎ মুখ খুলল সুগন্ধা,
“আপনি কিছু মনে কইরেন না আপা। আসলে, বড় সাহেব লোকটা একটু অমনি।”
ইরাম ছেলের উপর থেকে চোখ সরিয়ে সুগন্ধাকে দেখল। ঠোঁটে অতি মৃদু হাসি মেখে বলল,
“মনে না করার মতন কাজ তো খালু করেননি। তবে আমি ফাঁকা বুলিতে বিশ্বাসী নই। প্রতিবাদ হওয়া উচিত কাজের মাধ্যমে।”
পরক্ষণেই কথা ঘুরিয়ে ফেলল সে। শুধাল,
“কিছু মনে করো না, সুগন্ধা। খালামণিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে অস্বস্তি হচ্ছিল বলে তোমায় করছি। বায় এনি চান্স, খালুর সঙ্গে কি খালামণির কোনো ঝামেলা হয়েছে?”
সুগন্ধা প্রশ্ন শুনে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ইরামের সঙ্গে দৃষ্টি মিলিয়ে জানাল,
“আপনি বাড়ির মানুষ। আজকে নইলে কালকে এমনেই জানবেন। সত্যিটা হইল গিয়া…আম্মাজান আর বড় সাহেবের সম্পর্কটা গত দুই বছর ধইরা ঢিলা দিয়া চলতেসে। আমি অত বেশি কিছু জানিনা, কখনো আগ বাড়ায় জিজ্ঞেস করতে চাইনাই। কিন্তু এক বছর হইল বড় সাহেব বাড়িতে থাকেন না। আলাদা থাকেন। ব্যবসার কাজে এদিক সেদিক। সেপারেশন টাইপ। কেন, কি এত কিছু ঘাঁটিনাই। ভাইজান, সারিকা আপাও কখনো এই বিষয় নিয়া কথা বলতে ইচ্ছুক হয়নাই। ব্যাপারটা ধোঁয়াশা।”
ইরাম সব শুনে মাথা দোলালো। পাল্টা প্রশ্ন করলনা। এখন অনেক কিছুই ধরতে পারছে সে। সাইবানের বিয়েতে আহমদের অনুপস্থিতির কারণ, হঠাৎ তার বাড়িতে ফেরা আর ফিরেই শত্রুমনোভাবাপন্ন আচরণ করা। আহমদ উদ্দিন আর সামিয়া মুন্সীর সম্পর্কটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে। ভেতরে অনেক অজানা কাহিনী এবং কিন্তু থেকে গিয়েছে। দুজনের মাঝে মায়া ভালোবাসা নেই বললেই চলে। আচরণে তেমনটাই প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র নামে এখনো স্বামী স্ত্রী তারা।
সুগন্ধাকে তার কলেজের সামনে নামিয়ে দিয়ে ইরাম গেল ঠিক পাশের রাস্তায়। গাড়ি থেকে নেমে ছেলেকে সাবধানে কোলে নিয়ে সে আশেপাশে তাকাল। তিনতলা একটা বিল্ডিং। নিচতলা সম্পূর্ণটা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ইযান মায়ের বুকে চুপটি করে শুয়ে আছে। ছেলের মাথায় ছোট্ট একটা চুমু এঁকে পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকল ইরাম। ঢুকতেই রিসিপশনের মত একটা জায়গা। একজন হিজাব পরিহিত মেয়ে বসে আছে কম্পিউটারের পিছনে।
“কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি, ম্যাম?”
ইরাম এগিয়ে গেল।
“আমি ইরাম কিবরিয়া। আজ সকালেই ফোন করেছিলাম। আপনাদের ফ্রিল্যান্সিং বেসিক কোর্সটা করতে চাচ্ছিলাম।”
“ওহ, হ্যাঁ। আমার মনে আছে। আমি ফর্ম রেডি করেই রেখেছি। ম্যাম, আপনি ফিল আপ করে দিন।”
মেয়েটা ফর্ম দিল। ইরামকে একপাশে থাকায় সোফায় বসতে ইশারা করল। রমণী সেখানে বসে ধীরে ধীরে ফর্ম পূরণ করতে লাগল। পরিবেশটা পছন্দ হয়েছে ইরামের। বেসরকারি হওয়ায় একদম শান্ত, পরিপাটি স্থান। ভিড়ভাট্টার বালাই নেই। ছোটখাট একটা স্কুল টাইপের জায়গা। ইরাম যখন ফর্ম পূরণ করছে, তখন আশপাশ দিয়ে যাতায়াত করা গুটিকতক ছেলেমেয়ে ফিরে ফিরে তার কোলে বসা ইযানকে দেখছে। এক বান্ধবীর দল তো উত্তেজনা সামলাতে না পেরে কাছেই চলে এলো, ইযানকে আদর করে গেল। হাতে চকলেটও ধরিয়ে দিল, যেটা অবশ্যই ইযান খেতে না পারলেও প্যাকেট জিভে গুঁজে চুষতে লাগল। ছেলের কান্ড দেখে মুচকি হাসল ইরাম।
টাকা জমা দিয়ে কোর্সে ভর্তি হওয়া হয়ে গেলে মেয়েটি বলল,
“ম্যাম, আসুন। আমি আপনাকে আমাদের ক্লাসগুলোর একটা কুইক টুর দিয়ে দিই। তাহলে পরেরদিন আপনাকে কিছু খুঁজে পেতে কষ্ট করতে হবেনা।”
ইরাম খুশিই হলো। রিসিপশনে অন্য একজনকে রেখে মেয়েটি ইরামকে করিডোর ধরে ভেতরে নিয়ে গেল। আশেপাশে স্কুলের মত কয়েকটি ক্লাস। প্রত্যেকটি কম্পিউটার এবং টেবিল দিয়ে পরিপূর্ণ। একটা ছোট লাইব্রেরীও আছে। তার সঙ্গে লাগোয়া একটা বিশেষ রুম।
“এখানে মিটিং, ভাইবা, পরীক্ষা ইত্যাদির কাজ করা হয়।”
মেয়েটি বাৎলে দিল। মোটামুটি চারপাশ ঘুরে দেখানোর পর তারা যখন ফিরে আসছে তখন ইরাম জিজ্ঞেস করল,
“আর, আপু। আমি যে রিকুয়েস্ট করেছিলাম, সেটা?”
“জি, বাচ্চাকে সাথে রাখার ব্যাপারটা। এই ডিমান্ড আমাদের কাছে আগেও এসেছে, এবং আমি দুঃখিত এই বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করাটা কষ্টকর। আপনার সঙ্গে আরও অনেকে কোর্সটা করবে। যদি তাদের সমস্যা হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ হিসাবে আমাদের দায়িত্ব সকলের সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করা।”
ইরামের চেহারা ঝুলে পড়ল।
“ওহ, আচ্ছা।”
মেয়েটি থেমে জানাল,
“তবে মানবিক দায়িত্বকোন থেকে বিষয়টা বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ আপনার মত আরও অনেকেই আছে কিংবা ভবিষ্যতেও আসতে পারে। আপনার বাচ্চা যদি অন্য কারো সমস্যার কোনো কারণ না হয়, তবে সেক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে উপস্থিতি রাখা যাবে। বাকিটা কর্তৃপক্ষের ফাইনাল সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। সরি, আমি এর বেশি আর কোনো সাহায্য আপনাকে করতে পারছিনা, ম্যাম।”
এবার সামান্য হাসল ইরাম।
“না না, যথেষ্ট করেছেন। থ্যাংকস।”
তারা ফিরে এলো। করিডোর বেয়ে রিসিপশনের দিকে যাওয়ার সময় একদম শেষ ক্লাসটার দিকে অজান্তেই নজরপাত হলো ইরামের। বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। আর একদম সামনে ডায়াসের উপর দাঁড়িয়ে ডিজিটাল বোর্ডে কিছু একটা বুঝিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষক। লম্বা চওড়া এক পুরুষ, মেদহীন শরীরে জড়ানো কালো শার্ট এবং ফরমাল। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা। শ্যামলা মুখে একটা মায়াবী ভাব, আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপন। হাত নেড়ে সে বুঝিয়ে যাচ্ছে,
“জেন্টলম্যান অ্যান্ড লেডিস, আপনাদের আর্টিকেল ফিনিশ করার আর ঠিক দুই মিনিট বাকি আছে। আমি উপদেশ দেব আপনারা পয়েন্টগুলোর উপর ফোকাস করুন। সুন্দর লিখা এ আইও লিখতে পারে। আপনাদের মনে রাখতে হবে, অনন্য হতে হবে নিজের স্বকীয়তায়। ওকে?”
ইরাম থেমে দাঁড়িয়ে খানিকটা সময় নিয়ে দেখল। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, এই লোকটাকে সে আগেও কোথাও দেখেছে। কিন্তু কোথায়, ঠিক মনে করতে পারলনা। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি পাশ থেকে ঝুঁকে জানাল,
“উনি আমাদের সবথেকে জনপ্রিয় এবং গুণী ট্রেনার। কায়সান রুশদী। ওনার ইউটিউব চ্যানেলে ওয়ান মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার, সেখানেও উনি প্রোগ্রামিং, কম্পিউটার সম্পর্কিত টিউটোরিয়াল ভিডিও দেন।”
রুশদী? হ্যাঁ, এবার নিশ্চিত সে শোনা শোনা লাগছে। তবে হুট করে কিছুতেই মনে পড়লনা ইরামের সত্যিকার স্মৃতিটুকু। সময় লাগবে। সে যখন দাঁড়িয়ে আছে, তখন হঠাৎ করেই ক্লাসের ভেতরে থাকা কায়সান মাথা কাত করে তাকাল। ইরামের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল তার। বিব্রত হয়ে পড়ল ইরাম, আর দাঁড়ালনা। দ্রুত উল্টো ঘুরে ছেলেকে নিয়ে হেঁটে চলে গেল। সে খেয়ালই করলনা কায়সানের দৃষ্টি সে আড়াল হওয়া পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করে গেল।
ভর্তির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ইরাম বাইরে চলে এলো। সুগন্ধার পরীক্ষা চল্লিশ মিনিটের ছিল। এতক্ষণে হয়ে যাওয়ার কথা। গাড়ি নিয়ে সে যখন সুগন্ধার কলেজ গেটের সামনে অপেক্ষা করছে, তখন অদূরে একটা বাইকের উপস্থিতি লক্ষ্য করল। তেমন চোখে পড়ার মত কিছু নয়। ক্লাসিক লাল কালো হোন্ডা, সেখানে বসে আয়েশ করে বাদাম চিবুচ্ছে একটা ছেলে, আরেকটা ছেলে ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। ছেলে দুটোকে কিছুক্ষণ আগে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল ইরাম। শর্ট টাইম মেমোরি ভীষণ ভালো তার। লং টাইমে ভুলে গেলেও কাছাকাছি সময়ে ঘটা ঘটনা ভালোই মনে থাকে। বাইক চোখে লাগার মত কিছু না, আশেপাশে কালো সবুজ আরও কিছু বাইক আছে। তবে ইরামের কেন যেন মনে হচ্ছে সে যেখানে যেখানে যাচ্ছে, এই বাইকটাও ঠিক সেখানেই যাচ্ছে। নাকি মনের ভুল? দুটো জায়গায় কাকতালীয়ভাবে হয়ত চলে গিয়েছে তারা দুজনেই, তাতেই কি সন্দেহজনক হয়ে গেল? সুগন্ধা চলে আসায় বিষয়টা নিয়ে আর ভাবার সুযোগ হলোনা তার। বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় বাইকটা ওখানেই থেকে গেল, অনুসরণ করলনা বিধায় ইরাম নিশ্চিত হলো, সেই বেশি সন্দেহ করছিল।
─────────────────────────────
রাত প্রায় দুইটা।
সাইবানের শো এখন তুঙ্গে। সময় যত বাড়ে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাঁধনহারা হয় মানুষের আত্মা। লাল নীল বাতির ঝলমলে আলোর নিচে কন্ট্রোল প্যানেলে ঝুঁকে বিট ঠিক করছে সাইবান। এক হাতে হেডফোন ধরা কানের কাছে, শরীর দুলে যাচ্ছে তার মিউজিকের সাথে সাথে। ডান্সফ্লোরে তরুণ তরুণী উচ্ছ্বাসে মত্ত। এদের দেখলে মনে হয়না জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা আছে কারো। বেশ কতক রমণী তো নাচতে নাচতে একেবারে সাইবানের কাছে ঘেঁষে এলো।
“হেই মিস্টার ডি জে! ভেরি হ্যান্ডসাম।”
“থ্যাংকস।”
পাল্টা হেসে উত্তর করল সাইবান। আরেকজন তো একেবারে গা ঘেঁষে এসে সেলফি তুলে নিয়ে আবেশিত গলায় শুধাল,
“আজকের শো এর পর ফ্রি আছেন? ওয়ানা হ্যাভ আ লিটল ড্রিংক উইদ মি লেটার?”
সাইবান নিজের বাম হাতটা তুলল। তার অনামিকায় একটি সিলভার আংটি জ্বলজ্বল করে উঠল। যদিও আংটিটা কোনো কারণ ছাড়াই আজ পড়া হয়েছিল, সে আঙুল দিয়ে সেদিকে নির্দেশ করে বলল,
“সরি মাই লেডি, আই হ্যাভ মাই ওন লেডি টু ড্রিংক উইদ।”
“হাউ কিউট!”
আশেপাশের কিছু মেয়ে উৎসাহ দিয়ে চিৎকার করে উঠল, আবার অনেকে মুখ ফুলিয়েও ফেলল। সাইবান অবশ্য কারো দিকেই মনোযোগ দিলনা। সে মাইক্রোফোনে চেঁচিয়ে উঠল,
“লেটস গো!”
তীব্র বিটে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল চারপাশ। সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল। মিষ্টি একটা ঘ্রাণে ছেয়ে রইল পরিবেশ। প্রায় ঘেমে গিয়েছে সাইবান। তাই উপর থেকে ব্লেজার খুলে শুধু জ্যাকেট পরে কাজে মনোযোগ দিল। কপালে চুলের গোছা লেপ্টে আছে তার, চিকচিক করছে আইব্রো পিয়ার্সিং। সকলে যখন মিউজিকের সঙ্গে প্রায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, তখনি একেবারে হঠাৎ করে গুঞ্জনের শব্দ ছেয়ে গেল চারপাশে। প্রথমটায় কেউই বুঝতে পারলনা কি হয়েছে। ডান্সফ্লোরের মাঝখান বরাবর একটি ছেলে আরেকটি ছেলের উপর চড়াও হয়েছে, নিচে ফেলে ঘুষি মারছে। আঁধারি খেলায় বিষয়টা স্পষ্ট নয়। সাইবান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, মিউজিকের ভলিউম কমিয়ে এনে হাত তুলে টিমকে ইশারা করল। লাল নীল ডিস্কোলাইট নিভিয়ে উজ্জ্বল বাতি জ্বলে উঠল মুহূর্তেই। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। মারামারি হচ্ছে দুজন ছেলের মাঝে। সাইবান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নতুন কিছু নয়। অ্যালকোহলের প্রভাবে হরহামেশাই শো এর মাঝে এমন উদ্ভট কান্ডের মোকাবেলা তাকে করতে হয়।
“তুই আমার ওয়ালেট নিয়েছিস!”
“আরে! আমার বাপকে চিনিস তুই? তোর মত চোদ্দটা পিসকে কিনে ফেলতে পারব অনায়াসে! আর আমি কিনা তোর ওয়ালেট নেব? ক্রেজি!”
“তাহলে আমার ওয়ালেট কোথায়? চোর কোথাকার!”
সিকিউরিটি ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে সাইবান এগিয়ে গেল। একটা মেয়ের গায়ে মোক্ষম ধাক্কা লেগেছে দুজনের মারামারির কারণে। মেয়েটাকে ধরে সে আস্তে করে পিছিয়ে নিরাপদ দূরত্বে রেখে দুটো ছেলের মাঝখান বরাবর দাঁড়াল।
“ওকে নাউ, বয়েজ, স্টপ ইট। দুজনের বাপেরই অনেক টাকা, নাহলে এখানে স্ফূর্তি করতে আসতে না। সো চিল।”
ছেলে দুটো থতমত খেয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর সাইবানকে দেখল।
“আপনি মাঝখানে বাঁধ সাধছেন কেন? বিষয় টাকার না। বিষয় হলো, বেয়াদবির! ওই শালা তুই আমার ওয়ালেট নিলি কোন সাহসে?”
“কতবার বলেছি নেইনি? আর শালা বলিস কাকে, মাদারচো! যাহহ, এবার আমিই নিয়েছি তোর ওয়ালেট! কার কি বা ছিঁড়বি ছিঁড়ে দেখা দেখি?”
দুজন দুজনের দিকে আবারও তেড়ে গেল। মাঝখানে সাইবান স্যান্ডউইচ হয়ে গেল। একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। সিকিউরিটি এসে ঘিরে ফেলল। দুজনকে একে অপরের কাছ থেকে ছাড়াতে চেষ্টা করল। অন্যরা চেঁচিয়ে বলছে,
“বাইরে! বাইরে ফালান দুটোকে! বদমাইশ!”
“ইয়েস, জাস্ট থ্রো দ্যাম আউট প্লীজ। পুরো মজাটাই মাটি করে দিচ্ছে।”
এই চরম বিশৃঙ্খলতার মাঝেই সাইবানের পকেটে থাকা ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। জীবনেও এই ফোন সে রিসিভ করবেনা। ফোন পুরোপুরি সুইচড অফ করতে ভুলে গিয়েছে তাই ফোন কেটে বন্ধ করার জন্য হাতে তুলতেই সে থমকে গেল। সিকিউরিটি চেঁচিয়ে তাকে কিছু বলছিল তবে সে হাত তুলে বলে উঠল,
“হুশ!”
তারপরই সকলের উদ্দেশ্যে রীতিমত গলা ফাটিয়ে হুংকার দিল,
“এভ্রিয়ান শাট দ্যা ফাক আপ রাইট নাউ! কেউ যদি আগামী দুই মিনিটের মধ্যে একটা টু শব্দ করেছে তো পার্সোনালি তার ভোকাল কর্ডের ক্ষমতা দেখে নেব আমি!”
তার কন্ঠস্বরে অদ্ভুতুড়ে একটা জাদুকরী ক্ষমতা ছিল বোধ হয়। সিকিউরিটি, চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকা মানুষ এমনকি ঝগড়ার কারণ ছেলে দুটো অবধি জমে গেল। সাইবান সকলের মাঝখানে দাঁড়িয়েই ফোন রিসিভ করল,
“ইয়েস, মাই প্রেশিয়াস?”
তার কন্ঠস্বর এতটা নরম হয়ে উঠল যে আশেপাশের কেউ কোনো তালমিল না পেয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল শুধু। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো ইরামের কন্ঠস্বর,
“শো শেষ হয়নি?”
“উম্, এইতো শেষের পথে। আপনি ঘুমাননি এখনো? খুব বেশি মিস করছেন হাসবেন্ডকে?”
হাসবেন্ড—শব্দটাতে একটা আলাদাই জোর দিল সাইবান। তীর্যক হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। ইরাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“তুমি অনেক টায়ার্ড বোঝা যাচ্ছে, কথাবার্তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।”
“আপনি এসে ঠিক করে দিতে পারেন, মাইন্ড করবনা।”
“নিয়ে তো যাওনি। জিজ্ঞেস করে দেখেছ যেতে চাই কিনা?”
“ওহ! হাউ ক্রুয়েল অব মি! আপনি হানিমুনে আসতে চান সেটা আমাকে আগে বলবেন না?”
“আলাদিন!”
চেহারা দেখা না গেলেও সাইবান নিশ্চিত এখন ফোনের ওপাশে থাকা ইরামের গাল দুটো লালচে হয়ে উঠছে। উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকে লালচে ভাবটা দেখলেই তার কেমন পাগল পাগল লাগে। ভাগ্যিস ইরাম কাছে নেই! তার কথাবার্তার ধাঁচ লক্ষ্য করে ইরাম বিষয় পাল্টে ফেলল,
“যাক গে। শো এর মাঝখানে ফোন রিসিভ করলে কীভাবে?”
“আপনার জন্য শুধু আমার শো কেন, দুনিয়াটাও বিরতিতে পাঠাতে রাজী আছি।”
“বুঝেছি। সিলেটে গিয়ে তোমার মাথাটা আসলেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বেশি বেশি চা খাওয়ার চেষ্টা করো চায়ের দেশে বসে, তাতে যদি মস্তিষ্কের জটটা একটু খোলে।”
খিলখিল করে হাসল সাইবান।
“মস্তিষ্কের জটে জটে আপনি পাঁকিয়ে গেছেন, এত সহজে খুলবে কি?”
ইরামের দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো।
“আশেপাশে কোনো শক্ত জিনিস থাকলে মাথাটা বাড়ি মেরে ঠিক করো। আর হ্যাঁ, শো শেষ হওয়ার সাথে সাথে সোজা হোটেলে গিয়ে রেস্ট নেবে, খাবে তারপরই ঘুমাবে। আমি কালকে আর ফোন দেব না, দিলেই উল্টাপাল্টা কথাবার্তা শুরু করবে। রাখছি।”
“যথা আজ্ঞা পার্ট টাইম আম্মু ফুল টাইম ওয়াইফি।”
“গুড নাইট।”
“ব্যাড নাইট। আপনাকে ছাড়া আমার নাইট কখনো গুড হবেনা।”
ফোনটা এবার সরাসরি কেটেই দিল ইরাম। সাইবান ঠোঁটে হাসি মেখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল। একেবারে জ্বালিয়ে ফেলেছে কয়েক মিনিটেই। ফোন পুনরায় পকেটে ভরে মুখ তুলতেই সে ভড়কে গেল। সকলে তখনো একদম চুপ করে বাধ্য শিশুর মত দাঁড়িয়ে তাকে দেখে যাচ্ছে। সাইবান বাঁকা হাসল,
“হেহ! ওয়াইফি কামস ফার্স্ট। নাউ, কোথায় যেন ছিলাম আমরা? ওহ হ্যাঁ, ঝগড়া, প্লীজ কন্টিনিউ। সিকিউরিটি!”
─────────────────────────────
সাইবানের সঙ্গে ফোনকলটা অভাবনীয় ছিল। এখনো বুকের ভেতর ধুকপুক করছে ইরামের। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে সামনে তাকাতেই সে অবাক হয়ে গেল। বিপরীত দিকের সোফায় বসে থাকা সামিয়া এবং সারিকা দুজনেই তার দিকে রীতিমত হা করে তাকিয়ে আছে। আজ এমনিতেই অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছে। সামিয়া ফিরেছেন কিছুক্ষণ আগেই, সারিকা নিজের কিছু ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিল। আর ইরাম রাতে তৃতীয়বারের মত উঠে যাওয়া ইযানকে পুনরায় ঘুম পাড়িয়ে নিচে নেমেছিল। তিনজন রমণীই অপরিকল্পিত এক চায়ের আসরে বসে গিয়েছে অতঃপর।
সামিয়ার চোয়াল ফাঁক হয়ে গিয়েছে, অপরদিকে সারিকার চোখ দুটো রসগোল্লার মত বড় বড় হয়ে আছে। ইরাম একটা ঢোক গিলল,
“কি ব্যাপার? তোমরা এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
সারিকা ইরামের হাতের ফোনের দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠল,
“ওয়েট! সাই শো এর মাঝখানে ফোন অন রেখেছে?”
“ও তোমার কল রিসিভ করেছে?”
দ্বিতীয় অবিশ্বাস্য বাক্যটি ছুটে আসলো সামিয়ার তরফ থেকে। যারপরনাই হতবাক তারা। তবে ইরাম এর কারণ উদঘাটন করতে পারলনা। ফ্যালফ্যাল করে শ্বাশুড়ি আর ননদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা এত অবাক কেন হচ্ছে? যেন সাইবান জীবনেও তাদের ফোনকল রিসিভ করেনি!
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ৯