Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ১১


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা১১

রাস্তার মোড়ের টং দোকানটায় বেশ কয়েকদিন বাদে বন্ধুদের আড্ডা বসেছে আজ। দোকানি মিরাজ ভালো করেই চেনে এই দলটাকে। যদিও বেশ সামর্থ্যবান পরিবারের ছেলেমেয়ে, তবুও তার দোকানটার প্রতি একটা ভিন্ন মায়া আছে। সেই স্কুলজীবন থেকেই অনুরাগ আর সাইবান নামের ছেলে দুটো তার দোকানে চা সিগারেট খেতে আসতো। আজকাল আরও বেশ কতক সঙ্গী জুটেছে। ভালোই লাগে মিরাজের, তরুণ ছেলেপিলেদের গালগল্প শুনতে। মাঝে মাঝে এমন ভাষায় চলে যায় যে বোঝাই যায়না কি কথা বলছে। জেনারেশন কি আমূল বদলে যাচ্ছে!

অনুরাগরা যখন আসে তখন বুঝি গোটা দোকানটাই তাদের হয়ে যায়। কাঠের বেঞ্চে পা দোলায় বসে বসে। অনুরাগ, নীরব, আফনান ইতোমধ্যে চলে এসেছে। সন্ধ্যা ক্রমশ গাঢ় হয়ে রাতে পরিণত হচ্ছে। নীরব সিগারেট ধরিয়েছে, অপরদিকে আফনান পান চিবুচ্ছে। ওসবের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ নেই অনুরাগের। সে আপাতত এক কাপ রং চায়ের অর্ডার দিয়ে বসেছে।

“মামুর ব্যাটা এখনো এলো না?”

পান চিবুতে চিবুতে জিজ্ঞেস করল আফনান, থু করে পিক ফেলল একপাশে। নীরব সিগারেটে লম্বা একটা টান মেরে বলল,

“এখন ওনার বউয়ের আঁচলের তলায় থাকার সময় বস! বন্ধুদের জন্য টাইম আছে নাকি?”

খিলখিল করে হাসাহাসি শুরু করল উভয়ে। অনুরাগ মাথা নেড়ে জানাল,

“আমাকে আসবে বলেছে। হয়ত কোথাও ফেঁসে গিয়েছে তাই দেরী হচ্ছে।”

“বাচ্চার ডায়পার চেঞ্জ করছে মনে হয়।”

“কার ডায়পার?”

আফনান বলতেই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মেয়েলী কন্ঠস্বর প্রশ্ন করল। প্রত্যেক ছেলেই জমে গেল নিজেদের জায়গায়। এই কণ্ঠের মালকিনকে হাড়ে হাড়ে চেনা আছে তাদের। অবশেষে সামনে এসে দাঁড়াল এক রূপবতী। লাস্যময়ী শরীরে জড়ানো টাইট টপ, ধবধবে সাদা। ইলাস্টিক ফেব্রিক একদম চেপে থাকায় শরীরী অবয়বটা ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে। নিচে একটা ঢোলা ট্রাউজার সেট। চুলগুলো সিল্কি, দৈর্ঘ্যে কাঁধসমান। টানা টানা আইলাইনার দেয়া চোখে চেয়ে আছে যুবতী। এক কাঁধে ঝুলছে একটি জিমব্যাগ, তাতে ঢোকানো গোলাপি রঙের ইয়োগা ম্যাট দেখা যাচ্ছে।

“কি ব্যাপার? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলি কেন সবাই? কিসের ডায়পারের কথা বলছিস?”

মেয়েটি প্রশ্ন করল আবার। আফনান আর নীরব একে অপরের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসল, উভয়ে বিব্রত এবং অপ্রস্তুত। নীরব ইশারায় অনুরাগকে কিছু বলতে বলল। বান্দা সোজা হয়ে বসে শুধাল,

“সিঙ্গাপুর থেকে কবে এলি তিতলি?”

তিতলি নামক যুবতী খানিকক্ষণ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে বন্ধুদের দেখল। তারপর ধপাস করে কোনোপ্রকার দ্বিধা ছাড়াই অনুরাগের পাশে বসে পড়ল।

“এইতো, আজ সকালেই পৌঁছালাম। অনেক ভোরে এসেছি তো, তোদের কল করে জানাইনি আর। বিকালে জিমে গিয়েছি। ভাবলাম, একেবারে এখানে এসে সারপ্রাইজ দিয়ে দিই।”

“তিতলি আপা? আপনার জন্য গ্রিন টি বসাই?”

দোকানি মিরাজ হাসিমুখে বলল। পাল্টা হেসে তিতলি মাথা দোলালো,

“জি অবশ্যই। সঙ্গে ডায়াবেটিস কুকি দেবেন দুটো।”

মিরাজ কাজে লেগে গেল। তিতলি বন্ধুদের দিকে ফিরল। সবাই কেমন অস্বস্তিতে পরে গিয়েছে মনে হচ্ছে। তার দিকে তাকাচ্ছেনা কেউই। অবাক হলো সে।

“ব্যাপার কি দোস্ত? সবগুলোর মুখ এমন বাংলার পাঁচের মতন ঝুলে আছে কেন? আর বায় দ্যা ওয়ে, মিস্টার ডি জে কোথায়? দেখছি না যে? এখনো আসেনি?”

অনুরাগ তিতলির দিকে তাকিয়ে বলতে নিল,

“ইয়ে মানে…তিতলি শোন, আসলে সাইবান…”

“ইয়ো ব্রো’স!”

অদূর থেকেও সাইবানের উৎফুল্ল কণ্ঠের ডাক স্পষ্টত ভেসে এলো। সকলে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল, সড়কের অপর প্রান্তে বেয়ে এগিয়ে আসছে সাইবান। হেঁটে আসছে না, গাড়িতেও আসছেনা। তার পায়ে ডাবল রোলার শু’য। ভারী কেডসের মতন কালো জুতার নিচে দুই জোড়া চাকা লাগানো। পা দুটো রোল করে রাস্তার উপর স্লাইডিং করে এগিয়ে আসছে সাইবান। একেবারে দোকানের সামনে এসে ব্রেক কষে থেমে গেল সে অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে।

“আমাকে ছাড়াই শুরু করে দিয়েছিস বেয়াদবের দল? মিরাজ মামা, এক কাপ ঘন ব্ল্যাক কফি দাও তো, চিনি দুই চামচ। আরে তিতলি!”

ধপাস করে তিতলির পাশে বসে হাত বাড়িয়ে নীরবের হাতের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ছিনিয়ে নিল সে। লাইটারটাও হাতিয়ে ঠোঁটে পুরে ধরাতে ধরাতে সাইবান প্রশ্ন করল,

“সিঙ্গাপুর ভালো লাগেনি? বিনা নোটিশে দেশে ল্যান্ড করলি যে?”

সাইবানকে দেখেই বিরাট হেসে কোনপ্রকার ভণিতা ছাড়াই নিজের দুবাহু জড়িয়ে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলল তিতলি।

“তোদের ছাড়া আমার কবেই বা কি ভালো লেগেছে মেরে জিনি!”

সাইবান হালকা হাসল, এক হাতে সিগারেট ধরে অন্য হাতে তিতলির পিঠ চাপড়ে দিয়ে আলিঙ্গন ভেঙে ফেলল।

“ওহ? সিঙ্গাপুরের ছেলেরা বুঝি এতই দূর্বল?”

“জিনি!”

চটাশ করে সাইবানের বাহুতে ঘুষি বসিয়ে দিলো তিতলি। শব্দ করে হাসতে হাসতে সিগারেটে মনোনিবেশ করল সাইবান। আড়চোখে সামনে তাকাতেই দেখল নীরব আর আফনান মিলে তাকে কি যেন ইশারা করছে। অথচ ইশারার অর্থটা সে হুট করে ধরতে পারলনা। তিতলিও খেয়াল করেছে বিষয়টা।

“কি সমস্যা কেউ একবার বলবি আমাকে? এসে থেকে দেখছি কেমন অদ্ভুত আচরণ করছিস সবাই।”

গলা খাকারি দিলো অনুরাগ,

“অদ্ভুত? আমরা? না তো। তারপর বল তিতলি, সিঙ্গাপুরে কি কি দেখলি?”

কথা ঘুরিয়ে ফেলতে চাইলো সে। ততক্ষণে সবার চা এসে গিয়েছে। নিজের গ্রিন টি এর কাপে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে আরামের নিঃশ্বাস ফেলে তিতলি নিজের সিঙ্গাপুরের ট্যুরের কাহিনী বলা শুরু করল।

তিতলি চৌধুরী, সাইবানদের গ্রুপের পঞ্চম সদস্য। একমাত্র মেয়ে হওয়ায় তার আলাদাই একটা কদর আছে গ্রুপের মাঝে। সঙ্গে চাহিদা এবং সম্মানও। ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে। বর্তমানে একজন বিউটি ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছে। হালকা পাতলা মডেলিংও করে বেড়ায়। সাইবান তিতলির কাহিনী শুনতে শুনতে আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছিল। কাহিনী শেষ করেই তিতলি হাত বাড়িয়ে তার ঠোঁট থেকে আধখাওয়া সিগারেটটা নিয়ে নিজের ঠোঁটে পুরে দিল। বিনা দ্বিধায় দীর্ঘ এক সুখটান দিয়ে বলল,

“অনেক হয়েছে আমার গল্প। এবার তোদের কথা বল। এই এক মাসে কি কি মিস করলাম?”

আফনান, নীরব, অনুরাগ প্রত্যেকে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে শেষমেষ সাইবানের দিকে তাকাল। ছেলেটার অবশ্য হেলদোল নেই। সে পারছেনা শুধু বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়তে। বেঞ্চের সাথেই লাগোয়া একটা জলপাই গাছ থাকায় সুবিধা হয়েছে তার। পায়ের উপর পা তুলে ঝোলাতে ঝোলাতে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। কেউ তেমন কিছু বলছেনা বিধায় তিতলির সন্দেহ হলো। পাশ ফিরে সাইবানের উরুতে হাত রেখে সে বলে উঠল,

“ভালো কথা। তুই আজকে ফ্রি? শো নেই? তাহলে চল আমরা সবাই মিলে একটা স্পিডিং করে আসি? অনেকদিন করিনা। বেশি দূরে না, এই চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবধি যাব।”

সাইবান পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল।

“মাথা খারাপ? বিয়ের প্রথম দিনেই দেরি করে বাসায় গেলে মম আমার পা কুচিকুচি করে চিকেন ফিট স্যুপে ঢেলে দেবে!”

“যাহ, শয়তান! আংকেল থাকতে আন্টি আবার বিয়ে করবে কেন?”

“তুই কি গাছবলদ? আমি আমার কথা বলেছি।”

অট্টহাসি হাসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তিতলি, তবে সাইবানের জবাব তাকে জমিয়ে দিলো। মুখ নামিয়ে হাসিমাখা ঠোঁটেই তাকাল সে, বিশ্বাস করছেনা এখনো।

“জিনি, প্লীজ। মজা করিস না। তোরা সবাই মিলে আমাকে বোকা বানাতে চাইছিস না? প্র্যাংক করছিস। আমি কিন্তু বুঝে ফেলেছি। এবার বলদ হব না, হব না!”

আঙুল নেড়ে নেড়ে বলল তিতলি। তবে বাকি সকলের থমথমে চেহারা দেখে সে মুহূর্তেই আন্দাজ করতে পারল কিছু একটা গড়বড় আছে। সাইবান তার আঙুলটা চেপে ধরে আস্তে করে নামিয়ে দিলো। স্বাভাবিক গলায়ই জানালো,

“তিতলি, আ’ম ম্যারিড।”

স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকল তিতলি, সাইবানের মুখপানে, দীর্ঘক্ষণ। তার জ্বলজ্বলে নয়নজোড়া আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সাইবানকে, যেন বিয়ের কোনো প্রমাণ তার শরীরে লেপ্টে আছে। সাইবান সরে বসে বলল,

“সরি। সবকিছু এতটা তাড়াহুড়োয় হয়েছে যে তোকে জানানো হয়নি। ভেবেছিলাম তুই ফিরে এলে একেবারে বলব।”

তিতলি বাকি বন্ধুদের দিকে তাকাল। অনুরাগ, নীরব, আফনান প্রত্যেকে অপরাধীর ভঙ্গিতে মুখ নামিয়ে নিলো। পরিস্থিতি এতটাই গুরুগম্ভীর হয়ে দাঁড়ালো যে দোকানি মিরাজ অবধি নিজের কাজ বাদ দিয়ে হা করে চেয়ে আছে দৃশ্যপটে। কয়েক মিনিট কাটল পিনপতন নীরবতায়। তারপর তিতলির কাটকাট কন্ঠ ধ্বনিত হলো,

“ওরা ডায়পারের কথা বলছিল। বাচ্চাও ফুটিয়ে ফেলেছিস নাকি?”

সাইবান মেয়েটির কন্ঠস্বর শুনে খানিকটা অবাক হলো।

“না। ব্যাপারটা অমন না। ইটস কমপ্লিকেটেড। আসলে আমার খালাতো…”

“স্টপ ইট জিনি! থাক, আমাকে আর কিছুই বলতে হবেনা তোদের আর কোনোদিন।”

সটান উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল তিতলি। নিজের গ্রিনটির বিল নিজের পকেট থেকে বের করেই মিরাজের হাতে দিয়ে ব্যাগ তুলে হনহন করে হাঁটা দিলো। সাইবান লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো বেঞ্চ থেকে। পিছন থেকে গিয়ে মেয়েটার হাত টেনে ধরল,

“ওয়েট। কি সমস্যা তোর? কি হয়েছে? এইতো বেশ গল্প করছিলাম।”

“আমার কোনো সমস্যা হয়নি। সমস্যা তো সব তোর! ইউ নো হোয়াট জিনি? ফাক অফ!”

এর আগে কোনোদিন এত ঝাঁঝ নিয়ে সাইবানের সঙ্গে কথা বলেনি। নিজের হাতটা সে ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুতগতিতে হেঁটে চলে গেলো। যাওয়ার সময় রাস্তার কোণায় রাখা একটা অসহায় ডাস্টবিনকে বিনা কারণে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেলো। সাইবান আহাম্মকের মতন নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে কাঁধ তুলল।

“যাক বাবা, এর আবার কি হলো? ইয ইট দ্যা মান্থ? মুড সুইং হচ্ছে সেকেন্ডে সেকেন্ডে।”

পিছন থেকে বন্ধুদের হতাশাবোধক শব্দ শুনতে পেলো সাইবান। কৌতূহলী হয়ে সে ঘুরে দাঁড়াতেই অনুরাগ দুহাত ছড়িয়ে বলল,

“ভাই, তুই ছাড়া গোটা দুনিয়া জানে তিতলি তোকে পছন্দ করে।”

“তুইও তো তাল দিয়েছিস মাঝখানে। এখন এত নিষ্পাপ সাজছিস কেন?”

নীরব তাল মিলিয়ে বলল। সাইবান খানিক হেসে হাত তুলে জানালো,

“দ্যাট ওয়ায জাস্ট আ সিচুয়েশনশিপ, নাথিং মোর।”

“আরও কর সিচুয়েশনশিপ। সামলা নিজের লাভ লাইফ আর ম্যারিড লাইফ। তিতলি ক্ষেপেছে।”

আফনান বলতেই হেঁটে এসে পুনরায় বেঞ্চে বসে পড়ল সাইবান।

“অ্যায ইফ আই কেয়ার! আমার পুরো কথা না শুনেই চলে গিয়েছে। আমার কি দোষ?”

ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির মগে চুমুক দিতে দিতে কপালে তীব্র এক ভাঁজ পড়ল তার।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রাত প্রায় ৯ টা বেজে এসেছে।

লিভিং রুমে বসে ল্যাপটপ ঘাঁটাঘাঁটি করছে ইরাম। ইযান মেঝেতে বিছানো ম্যাট্রেসের উপর গড়াগড়ি করে খেলছে। তাকে দেখেশুনে রাখছে সুগন্ধা। এক হাতে বই, অন্য হাতে একটা ঝুনঝুনি বাজাচ্ছে। ইযান মজা পেয়ে সেটা কামড়ে দিতে চাইছে। ইরাম জেনে বেশ অবাক হয়েছিল যে সুগন্ধা পড়াশোনা করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত এখন। সাইবানদের বাড়িতে এসেছে প্রায় পাঁচ ছয় বছর। গ্রামে যে বাড়ি আছে পরিবারের, সেটার কেয়ারটেকার ছিল সুগন্ধার বাবা। মা মরা মেয়ে সে। বাবাও শেষে স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন। একমাত্র মেয়ে সুগন্ধার তখন বেহাল দশা। সামিয়া সেবার তাকে সাথে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। কাজের পাশাপাশি পড়ালেখারও ব্যবস্থা করেন। সুগন্ধা বলেছে, সামিয়ার এক কথা, অনার্স পাশ না করা অবধি পড়ালেখা ছাড়ার কথা চিন্তাও করা যাবেনা। বিষয়টা বেশ ভালো লেগেছে ইরামের। আদতে সুগন্ধা নিজেকে যেমন প্রদর্শন করে অভ্যস্থ, তার চাইতে বহুগুণে স্মার্ট। সেটা এই কয়েকদিনেই বুঝে গিয়েছে সে।

ল্যাপটপটা সামিয়ার। বাড়িতেই থাকে। তিনি খুব একটা ব্যবহার করেন না। ইরাম আজকেই চেয়ে নিয়েছে। এই মুহূর্তে সে বসে বসে নিজের লিংকড ইন প্রোফাইল সাজাচ্ছে। চাকরি এবং ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী একটা স্থান। প্রোফাইলের কাজ শেষ হয়ে গেলে ইরাম ল্যাপটপ বন্ধ করে দিচ্ছিল। তবে হঠাৎ কি যেন একটা মনে পড়ল তার। সুগন্ধার থেকেই জেনেছে, আজকাল খুব ব্যবহার করা হয় কিছু এ আই প্রোগ্রাম। গুগল থেকে তেমনি একটা প্রোগ্রামে ঢুকে সে মনোযোগ দিয়ে টাইপিং করল।

—সিচুয়েশনশিপ কি?

যতক্ষণ প্রোগ্রামটি তথ্য খোঁজার সময় নিচ্ছে, ততক্ষণ ইরাম তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবলো বানানটা ঠিক করে লিখেছে কিনা। সুগন্ধার সাহায্য নেবে? কিন্তু দরকার পড়লনা। প্রোগ্রামটি উত্তর করেছে।

—সিচুয়েশনশিপ (Situationship) হলো এমন এক ধরনের সম্পর্ক যেখানে দুজন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বা আবেগ থাকে, কিন্তু সম্পর্কটা স্পষ্টভাবে “প্রেম” বা “কমিটেড রিলেশনশিপ” হিসেবে নির্ধারিত নয়।

ইরামের মাথা ঘুরতে শুরু করল। কিঃ? এমনও আবার কোনো সম্পর্ক হয়? ঘনিষ্ঠতা থাকলে আবার প্রেম হয়না কীভাবে? প্রেম না হলে ঘনিষ্ঠতা থাকে কীভাবে? তার মাথায় ঢুকলনা। সে আবারও টাইপ করল,

—বেঞ্চিং কি?

—বেঞ্চিং (Benching) হলো ডেটিং/ রিলেশনশিপের একটা টার্ম, যেখানে কেউ তোমাকে পুরোপুরি রিলেশনশিপে রাখে না, আবার পুরোপুরি ছেড়েও দেয় না। মানে “ব্যাকআপ” হিসেবে রেখে দেয়। তুমি যেন রিজার্ভ প্লেয়ার, প্রয়োজন হলে ডাকবে, না হলে সাইডে বসিয়ে রাখবে।

“ইস! ছিঃ!”

না চাইতেও ইরামের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো। সুগন্ধা মাথা তুলে তাকাল।

“কোনো সমস্যা আপা?”

ভড়কে গিয়ে দ্রুত সব কেটে ল্যাপটপটা বন্ধ করে ইরাম সোজা হয়ে বসল। বলল,

“তোমাদের জেনারেশনটারই সমস্যা!”

সুগন্ধা অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। ব্যাপারটা কি হলো? সে বিনা দোষে কথা শুনল কেন? ইরাম অবশ্য ব্যাখ্যা দিলোনা তাকে। এমন সময়েই হুট করে বড় গাড়ির হর্ণের আওয়াজ ভেসে এলো। ইরাম মেঝে থেকে ইযানকে কোলে তুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে দেখল একটা ছোটখাট মালবাহী ভ্যান দাঁড়ানো। ভেতর থেকে ধরাধরি করে আসবাবপত্র নামাচ্ছে কয়েকজন লোক। একটা সোফার মতন দেখতে আসবাব, একটা লম্বাটে ট্রলি, তার মাথায় আবার ছোট ছোট খেলনার মতন কিসব যেন ঝুলছে। কাজের তদারকি করছেন সামিয়া। তিনি দুপুরের পর হাসপাতালে গিয়েছিলেন। একেবারে গাড়ি নিয়েই ফিরেছেন। ইরাম শ্বাশুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।

“এসব কি খালামণি?”

মুচকি হাসলেন সামিয়া।

“প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তোর লাগবে।”

আঙুল তুলে সোফার মতন জিনিসটাকে দেখালেন তিনি।

“ওটা নার্সারি গ্লাইডার, অনেকে ফিডিং চেয়ারও বলে। ব্রেস্টফিড করানোর সময় ওটাতে বসবি। আর এটা টেবিল, এখানে ডায়পার চেঞ্জ করবি।”

ইরাম হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মা হতে এতগুলো জিনিসের প্রয়োজন তার জানা ছিলনা কখনো। তবে এসব ঠিক প্রয়োজন নয়, বরং জার্নিটাকে আরামদায়ক করার প্রচেষ্টামাত্র। সামিয়া একজন ডাক্তার। যদিও শিশু বিশেষজ্ঞ নন। তবে তিনি ভালোমতোই জানেন একজন মা এবং তার সন্তানের কেমন যত্নের প্রয়োজন।

কিছুক্ষণের মাঝেই আধুনিক আসবাবে সাজানো সাইবানের বেডরুমটা পূর্ণ হয়ে উঠল অনাকাঙ্ক্ষিত সব জিনিসপত্রে। বিছানার একপাশে ফিডিং চেয়ারটা রাখা হলো। তার সাথে টেবিলটা। বেশকিছু ড্রয়ার সম্বলিত ওয়্যারড্রব। তাতে বাচ্চাদের ন্যাপকিন, ডায়পার। অনেক ধরনের ফিডার, টেম্পারেচার ফ্লাস্ক, সঙ্গে ব্রেস্টপাম্প। এমন কিছু নেই যা সামিয়া বাদ রেখেছেন। লোকগুলো প্রায় এক ঘণ্টা সময় নিয়ে রুমটা সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়ে গেলো। ইরাম একপাশে ইযানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, কীভাবে সাইবানের রুমের বেপরোয়া ভাবটা এক লহমায় পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। সবকিছু গোছগাছ হয়ে গেলে সামিয়া বললেন,

“আমি আমার ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে রেখেছি। ও একজন খুব ভালো পেডিয়াট্রিশিয়ান। কালকের অ্যাপয়েনমেন্ট বুকড। তুই আর সাইবান ইযানকে নিয়ে যাবি, কেমন?”

তিনি বলা শেষ করতে না করতেই রুমের দরজার কাছে উদয় হলো সাইবান। মাত্রই বাইরে থেকে ফিরেছে। নিজের জ্যাকেট খুলতে খুলতে বলতে গেলো,

“মেয়েদের মন আর সাড়ে পাঁচ প্যাচের জিলাপী একই। কোনো পার্থক্য….আহহহহহহ! আমার রুম!”

সাইবানের চিৎকারে কেঁপে উঠল চারপাশ। ইরাম আগে থেকেই প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করে ছেলের দুই কানে আঙুল দিয়ে রাখল। পা ফেলে থপথপ করে ভেতরে ঢুকল সাইবান। আশেপাশে তাকিয়ে মাথা চেপে ধরল এমনভাবে যেন তার সামনে তার পৃথিবীকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেয়া হয়েছে।

“মাই ফাকিং রুম!”

সামিয়া ভ্রুকুটি করলেন।

“মুখে লাগাম দেয়া শিখ এখন। এক বাচ্চার বাবার মুখে এমন ভাষা মানায় না।”

“ড্যাম ব্রো! ড্যাম ড্যাম ড্যাম! শিট শিট শিট!”

একটি হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন সামিয়া। এই ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাওয়া যায় সামিয়া জানেন না। সাইবান হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ছুটে দেখল সবকিছু। কীভাবে তার গেমিং সেটাপ চেপে দিয়ে সেখানে অন্য আসবাব বসানো হয়েছে, কীভাবে তার সাধের সাউন্ডবক্সগুলো সরিয়ে সেখানে ফিডিং চেয়ার রাখা হয়েছে। সবকিছু। ইরাম অবস্থা দেখে সামিয়ার কাছে ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,

“মনে হয় এমনটা না করলেও হত। বেচারার অনেক সাধের রুম।”

“তুই চুপ থাক তো। বিয়ে হতে না হতেই স্বামীকে দরদ দেখাবি না। শোন, তোর সামনে যে পাগলা বাবার মতন ছোটাছুটি করছে, ওটাকে তোর হাতের পুতুল বানাতে হবে। চাবি দিবি ঘুরবে, চাবি বের করবি থেমে যাবে।”

ইরাম না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেললো। ঠিক এমন সময়েই তার কোলে থাকা ইযান নড়েচড়ে উঠল। আঙ্গুল চুষতে চুষতে গোঙাতে লাগল। ইরামের বুঝতে বাকি রইলনা কি হয়েছে।

“ওহ, আমি ওকে চেঞ্জ করিয়ে নিই।”

বলে সে বাথরুমের দিকে যাচ্ছিল কিন্তু সামিয়া থামিয়ে দিলেন তাকে।

“এই না না, এখানে রাখ, সাইবানকে করতে দে। ওর শেখার দরকার আছে।”

এমনিতেও রুম হারানোর শোকে আধমরা সাইবান। এই কথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল সে। মুখে ভর করল তীব্র আতঙ্ক।

“কি? খবরদার ব্রো! আমি ওসব হাগুমুতু পরিষ্কার করতে পারবনা। একদম না ড্যাম! ওহ ড্যাম ডিয়ার গড অফ হেভেন হেয়ার মাই কল!”

সামিয়া তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর আদেশ করলেন,

“যা ইরাম, ওই টেবিলের উপর রাখ। ডায়পার আছে। শিখিয়ে দে ওকে কীভাবে করিস।”

ইরাম মানতে না চাইলেও সে ভীষণ বিনোদন পাচ্ছে। সাইবানের মুখটা একেবারে দেখার মত হয়েছে। ইযানকে সাবধানে সে টেবিলের শুইয়ে দিলো। অতঃপর আগের কাপড়ের ন্যাপিটা খুলে ফেলল। ছোট ছোট হাত ওয় ছুঁড়ে ড্যাবড্যাব করে সাইবানের দিকে তাকিয়ে ইযান শব্দ করে উঠল,

“ব্যা..!”

“ওয়াক! ওয়াক!”

মুখে হাতচাপা দিলো সাইবান। আশেপাশে কিছু না পেয়ে একটা কাপড়ের ক্লিপ তুলে নিজের নাকে আটকে ফেলল।

“পোটলা খায় দুধ আর হাগে অ্যাটম ব*ম্ব!”

ইরাম আর পারলনা। ওই অবস্থায়ই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসতে শুরু করল সে। সামিয়া অবধি মুখ টিপে হাসছেন দৃশ্য দেখে। হাসতে হাসতে ইরাম হাত বাড়িয়ে বলল,

“একটা ডায়পার দাও।”

সাইবান ডায়পার সেকশন থেকে পরিষ্কার ডায়পারটাও
এক আঙুলে এমনভাবে মুখের সামনে তুলে ধরল যেন পৃথিবীর সবথেকে কদর্য কিছু ধরেছে। ঘৃণায় চোখমুখ বাকিয়ে বমি পাচ্ছে এমন ভঙ্গি করে সে হঠাৎ বলে উঠল,

“হতে চেয়েছিলাম সুগার ড্যাডি, ভাগ্য হাতে ধরিয়ে দিলো বাচ্চার ন্যাপি!”

“আইআ…কিয়া!”

লাফিয়ে উঠল ইযান। ইরাম ওয়েট টিস্যু দিয়ে তার ত্বক মুছে নিচ্ছিল, হাতে নাড়া খেয়ে আধমোছা টিস্যুটা ছুটে গিয়ে পড়ল একেবারে সাইবানের হাতের উপর। দুনিয়া উল্টে গেলো ছেলেটার। হাহাকার করে উঠল,

“ইয়া খোদা! ইটস মি অ্যাগেইন! জবাব চাই আমি, আমার সঙ্গে তোমার কিসের দুশমনিইইইইই?”

                                  —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply