Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২


জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা২

“পরপুরুষ তো? বেশ! আমিও দেখি, কীভাবে তুই একটা বাচ্চা বুকে ঘুরে বেড়াস। তোর জন্য আমার দরজা আজীবনের জন্য বন্ধ। দূর হতে পারিস আমার চোখের সামনে থেকে, নিজের পেটের বেয়াদব ফসল সমেত। সি ইফ আই কেয়ার!”

অরণ্য নিজের কথা রেখেছে। সত্যিই সে কোনো কেয়ার করেনি। ডিভোর্স পেপারে সাইন হয়েছে। অথচ ইযানকে নিয়ে কাস্টাডির প্রশ্ন ওঠেনি। একদম অঘোষিতভাবেই সমস্ত দায়িত্ব বর্তেছে ইরামের উপর। সে অবশ্য এমনটাই চেয়ে এসেছিল। তবে বাস্তবতা আমাদের ভাবনার চাইতে বহু কঠিন। এখানে যা চাওয়া হয় তার উল্টোটাই বরং পাওয়া হয়।

ইযানকে নিয়ে প্রথম মাসটা ইরাম কাটিয়েছে দূর্বিষহভাবে। না, নিজের বাপের বাড়িতে যায়নি সে। ওই বাড়িটা এখন আর বাপের বাড়ি নেই বরং ভাইয়ের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। সেখানে অন্যদের উপর বোঝা হয়ে গেলে ঠিক তাকে অসম্মান করা হবে। তাছাড়া তার ভাই এই ডিভোর্সের ঘোর বিরোধী ছিল। সাহায্য কামনার প্রশ্নই আসেনা। নিজের হাতে থাকা যৎসামান্য কিছু টাকা সম্বল করেই সে ওঠে একটি মেস বাসায়। আমাদের সমাজটাও ভীষণই অদ্ভুত। সিঙ্গেল মাদার হওয়াতে তাচ্ছিল্য কম সহ্য করতে হয়নি ইরামকে। তবুও তার সবকিছু সয়ে যাওয়ার একটামাত্র শক্তি ইযান। নবজাতক নিজের জননীকে সামান্য চাহুনিতেই ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। তেমন সে পারে তাকে পুনরুজ্জীবিত করতেও।

ইরাম একটা কাজের সন্ধান শুরু করে। মাস্টার্স কমপ্লিট করা হয়েছে তার। অথচ দেশের কর্মসংস্থানের অভাব সে টের পেতে শুরু করে হাড়ে হাড়ে। একটা এক মাসের বাচ্চাকে বুকে চেপে এই অফিসারের কেবিন থেকে সেই অফিসারের কেবিন, পিয়নের পিছু পিছু, দালালের পিছু পিছু ছুটে শুধু পায়ের স্যান্ডেলের তলাই ক্ষয় হয়েছে। লাভের লাভটা কিছুই হয়নি। কেউ ইরামের উপর দয়া করেনি, না তার দুধের শিশুটার উপর। একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা অবশ্য দয়া করেছিল। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কনফার্ম। তার বিনিময়ে কোনো ইন্টারভিউ অবধি দিতে হবেনা, শুধু ইরামকে সপ্তাহে এক রাত করে তার সঙ্গে হোটেলে যেতে হবে, সঙ্গ দিতে। সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ইরাম কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ছুঁড়ে মেরে এসেছে লোকটার মুখের উপর।

তৃতীয় মাস গড়াতে গড়াতে অবস্থা গুরুতর হতে শুরু করে। অরণ্য হয়ত ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিল। ইরামের সংগ্রাম, একলা চলতে চাওয়ার ভয়াল লড়াই অরণ্যর পক্ষ থেকে তার জন্য শাস্তিস্বরূপ ছিল। যেন অরণ্য ওত পেতে অপেক্ষায় আছে, কখন ইরাম সম্পূর্ণভাবে ভাঙবে আর তার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াবে। অদম্য ইরাম যায়নি। নিজে না খেয়ে হলেও ইযানের জরুরী জিনিসপত্র কেনার জন্য টাকা রেখে দিয়েছিল। এদিকে দিনদিন ছোটাছুটি এবং অভাবের কারণে শারীরিক দূর্বলতা দেখা দেয় তার। ব্রেস্টফিডিং করায় সে, ইযানের উপর না চাইতেও জননীর ধকলের প্রভাব পড়তে শুরু করে। নিজ অবধি ইরাম ঠিক ছিল, কিন্তু ইযানের উপর একটা আঁচ আসা মাত্র তার সমস্ত ধৈর্য্য, ইচ্ছা, লড়াইয়ের বাসনা গুঁড়িয়ে যায়। ইরাম প্রথমবারের মতন নিজের লড়াইয়ে হেরে যায় একদিন।

ফার্মেসীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কোলে কাঁথার ভেতর ছটফট করে কাদঁছিল ইযান। সামনে রাখা ওষুধের দাম ছিল ১০০ টাকা। অথচ ইরামের হাতের মুঠোয় ছিল শুধুমাত্র পুরাতন দুটো বিশ টাকার নোট। সেদিনের মতন অসহায়, ব্যর্থ ইরামের নিজেকে আর কক্ষনো মনে হয়নি। যে মায়ের নিজের সন্তানের মুখে এক ফোঁটা ওষুধ অবধি তুলে দেয়ার ক্ষমতা নেই, সে আবার কেমন মা?

◉◉◉◉

বাড়িটা আলিশান নয়। মোটামুটি সামর্থ্যবান এক গৃহস্থালী পরিবেশ। সামনে লোহার গেট। ভেতরে ছোট উঠানের মতন জায়গা। সেখানে বিশাল একটি আমগাছ, সিমেন্টের বেড়া দিয়ে বাঁধাই করা। দুই তলা বাড়ির ছাদটায় সারি বেঁধে বসে আছে একদল কবুতর। তাদের ডাকে মুখরিত স্নিগ্ধ সকাল। গেটের পাশে হালকা রং উঠে যাওয়া দেয়ালের বোর্ডে লিখা—

“মুন্সীবাড়ি”।

ইরাম যখন ধীরপায়ে বাড়িটার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল তখন সূর্য মাথার উপর খাঁড়া কিরণ দিচ্ছে। এক হাতে ধরা লাগেজটা ছেড়ে দিয়ে ইরাম অন্য হাতে নিজের বুকে আগলে রাখা যক্ষের ধনকে সযত্নে কাঁথা দিয়ে ঢেকে সূর্যের আড়াল করে নিল। মুখের উপর দুহাত মুঠি পাকিয়ে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে ইযান। সারারাত থেকে থেকে ছটফট করেছিল। ইরাম একনজর আশেপাশে তাকাল। বহুদিন বাদে সে এই তল্লাটে এসেছে। অতি চেনা জায়গাটাও কেমন অপরিচিত লাগছে। বিয়ের পর একবারের জন্যও আর নিজের বাড়িতে ফেরেনি সে। আমগাছে অনেকগুলো মুকুল ধরে আছে। শীঘ্রই আম ধরবে স্পষ্ট। চোখ ঘুরিয়ে একবার পিছনের দিকেও তাকাল ইরাম। দুটো গাড়ি যাওয়ার মতন প্রশস্ত রাস্তার ওপাশে আরও একটি দুইতলা বাড়ি। ঠিক মুন্সীবাড়ির বিপরীতে। উভয়ের মাঝে অবস্থানের ভেদ স্পষ্ট।

রাস্তার ওপাশের বাড়িটা বেশ পরিপাটি, আলিশান। অফিসারদের বাংলোবাড়ির মতন দেখতে। ধবধবে সাদা দেয়াল, উঠানে কৃত্রিম ঝর্ণা এবং একপাশে ফুলের বাগান। ছোট একটা গ্যারাজে একটি গাড়ি রাখা। মূল ফটকটাও সোনালী রঙের ধাতুতে গড়া, সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। মার্বেল পাথরের দেয়ালে খচিত গোটা গোটা অক্ষর,

“ডাঃ সামিয়া মুন্সী
এ কে এম আহমদ উদ্দিন।”

মুন্সীবাড়ি এবং ওই বাড়িটার মাঝে আভিজাত্যের বিভেদ পরিষ্কার। ওটা ইরামের খালার বাড়ি। যে বাড়িতে বহু বছর যাবৎ তার পা রাখা হয়নি।

মাথা ঘুরিয়ে নিজেকে শক্ত করে ইরাম একহাতে লাগেজ টেনে মুন্সীবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাড়ির দরজাটা চাপিয়ে রাখা। আশেপাশে কাউকে দেখাও যাচ্ছেনা। তাই ইরাম নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ভেতরে ঢুকল। বসার ঘরটা আগের মতোই আছে, বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। তবে ফার্নিচার এবং শো পিসে বেশ নতুনত্ব এসেছে। ইরাম থাকতে ব্যবহার করা পুরাতন সামগ্রী সরিয়ে ফেলা হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। নতুন চিকচিক কাপড়ে মোড়া সোফার গদিতে বসে আছে একটা বছর চারেকের বাচ্চা ছেলে। তার যমজ ভাই খালি গায়ে শুধু হাফপ্যান্ট পরে বাড়িময় দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে। পিছু পিছু যাচ্ছে ঢোলা টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে এক রমণী। হাতে ভাতের থালা, ছেলেদের খাওয়াতে ছোটখাট একটা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে সে। ইরাম একটি প্রশ্বাস টানল। তারপর নরম গলায় বলে উঠল,

“আসসালামু আলাইকুম, মিথিলা। কেমন আছো?”

তার কন্ঠ শুনতেই মিথিলা নামক রমণী থমকে গেল। বিস্ময় নিয়ে তাকাল। ক্ষণিকের জন্য ইরাম ওই চোখজোড়ায় ভীষণ অসন্তোষ দেখল। যা পরমুহূর্তেই উবে গেল শীতল অভিব্যক্তিতে।

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম আপু। হোয়াট আ সারপ্রাইজ! আসুন, বসুন। রোহান, সরো, তোমার ফুফিকে বসতে দাও।”

সোফায় থাকা ছোট ছেলেটা তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে নেমে পড়ল। ইরাম মুচকি হেসে রোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সোফায় বসল। লাগেজটা একপাশে রাখল। সরাসরি না তাকিয়েও খেয়াল করল মিথিলা বাঁকা দৃষ্টিতে লাগেজটাকে দেখছে।

ছেলেদের খাওয়ানোয় আপাতত বিরতি দিয়ে মিথিলা রান্নাঘরের ভেতর চলে গেল। দুই মিনিটের মাথায়ই ফিরে এলো এক গ্লাস শরবত এবং বিস্কুটের পিরিচ নিয়ে। ইরাম তখন ইযানকে সাবধানে সোফার একপাশে শুইয়ে টিস্যু দিয়ে নিজের মুখ মুছে নিচ্ছিল। সুতির শাড়ি পড়লেও গরমে খানিকটা ঘেমে গিয়েছে।

“থ্যাংক্স, মিথিলা।”

বলে সে শরবতটা তুলে নিলো। মিথিলা অন্যপাশের সোফায় বসে নিজের দামী স্যামসাং ব্র্যান্ডের ফোন তুলে কিছু করতে করতে জানাল,

“রাহাত তো অফিসে। আর ইহান কলেজে। ক্লাস টেস্ট আছে বলল।”

“আচ্ছা সমস্যা নেই। আসুক ওরা ওদের সময়মত।”

“ওহ। আপনার তাহলে তাড়া নেই? ভালোই হলো তবে।”

মুখে বললেও মিথিলার চেহারার বিতৃষ্ণাটুকু ইরামের নজর এড়ালনা একটুও। ঠিক এই শঙ্কাটাই করছিল সে। নিজেকে কেমন ছোট মনে হচ্ছে। অথচ আপাতত এছাড়া তার কাছে দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই।

সকালের কাহিনী গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। মিথিলা রান্নাঘরেই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। মুরগি এবং ইলিশ মাছ ভেজেছে। সঙ্গে পোলাও। ইরাম তাকে সাহায্যের আবেদন জানালেও সে নাকচ করে দিয়েছে। মেহমানদের দিয়ে নাকি কাজ করাতে হয়না। অনায়াসে বাড়ির সদস্যকে মেহমান হিসাবে সম্বোধন করার বিষয়টা ইরামের আত্মসম্মানে ঘা দিলেও প্রতিবাদ করলনা সে। বরং, মিথিলার যমজ দুই ছেলেকে সুন্দরমত খাইয়ে দিলো। যারা মায়ের কাছে খেতে একদমই চায়না, তারা ঠিকই ফুফুর কোলে বসে অত্যন্ত আদরে গদগদ হয়ে খাবার খেয়ে নিলো। মিথিলা আড়চোখে দেখলেও কোনো মন্তব্য করলোনা।
রান্নাবান্না শেষ হয়ে গেলে গোসল সেরে সালোয়ার কামিজ পরে নিচে এলো মিথিলা। ছেলেদের ভরা পেটে ঘুম পাড়িয়েও রেখে এসেছে। অথচ ইরাম তখনো বসার ঘরের সোফায় বসে আছে। তাকে ভেতরের রুমে গিয়ে কাপড় বদলানোর, কিংবা বিশ্রামের কোনো আহ্বান মিথিলা জানায়নি। জানাবেও না। তার স্বামী রাহাতকে এসে আগে বিষয়টা মিটমাট করতে হবে। কেন এসেছে এই ডিভোর্সী মেয়েটা? মিথিলা কি বোঝেনা নাকি? স্বামীর ভাত কপাল থেকে উঠে গিয়েছে, এখন ভাইয়ের অন্ন ধ্বংস করার ধান্দা। উপরন্তু একটা বাচ্চা ফ্রি!

এতকিছু ভাবনা চিন্তা মিথিলার মাঝে চললেও সে ভদ্র গলায় ডাকল,

“আপু? কতক্ষণ ধরে বসে আছেন। আসুন টেবিলে, আমি খাবার দিচ্ছি।”

“হ্যাঁ। ক্ষুধা তো একটু লেগেছেই।”

ইযান এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। তাই বেশি দেরি করলনা ইরাম। ছেলে ঘুমে থাকতেই কাজ সেরে ফেলতে হবে তার। টেবিলে গিয়ে বসল সে। মিথিলা বেশ ভালোভাবেই তার খাবার বেড়ে দিলো প্লেটে। ইরাম হাত ধুয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল,

“বাবুরা ঘুমিয়েছে?”

“হ্যাঁ। আপনি খান। আরেকটু ঝোল দিই আপনাকে?”

“আরে না না, যথেষ্ট। তুমি দারুণ রান্না করো মিথিলা।”

“আপু! দ্যা হেল ইউ আর ডুয়িং ইন মাই হাউস?”

ইরাম সবেমাত্র ভাতের প্রথম লোকমাটা মুখে দিতে যাচ্ছিল, তখনি পুরুষালী তেজী কণ্ঠটি ভেসে এলো। পিছনে ফিরে তাকাল সে। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে গাট্টাগোট্টা এক পুরুষ। এখনো যুবক শ্রেণীর মাঝে পরে বয়স এবং চেহারা। ইরামের মতই নাকটা খাড়া, চিবুকের নিচে ছোট্ট একটা আঁচিল। নেভী ব্লু স্যুট পরনে, হাতে ব্রিফকেস। ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ইরাম ভাত রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল,

“রাহাত, ভাই…”

“প্লীজ আমাকে ভাই বলে ডাকবেনা আপু।”

ইরাম জমে গেল নিজের জায়গায়। প্রসারিত নয়নে তাকিয়ে রইল নিজের ভাইয়ের দিকে। রাহাত এগিয়ে এসে ঠাস করে ব্রিফকেসটা ফ্লোরের উপরেই রেখে দিল। অতঃপর নিজের গলায় বাঁধা টাই ঢিলে করতে করতে অসন্তুষ্ট চোখে সোফায় ঘুমিয়ে থাকা ইযানকে দেখল। বলল,

“সাবধান করেছিলাম আমি তোমাকে। একটুখানি মানিয়ে নিয়ে চলো। তুমি আমার কথা শোনোনি আপু। তুমি চলেছ তোমার মর্জিমত। বারবার বলেছি আমি, একলা একটা মেয়েমানুষ সমাজে চলতে পারেনা। মহিলা মাত্রই পুরুষ দরকার। কিন্তু তুমি মহীয়সী নারী কিনা! এখন কেন এসেছ আমার কাছে? কি চাই তোমার আমার বাড়িতে?”

“তোর বাড়ি? ভাই, এটা কি আমার বাড়ি নয়? আমার মায়ের বাড়িতে আমি আসতে পারিনা?”

রাহাতের ভ্রুজোড়ার কুঞ্চন বাড়ল। কোমরে দুহাত রেখে সে দাঁড়াল শক্ত ভঙ্গিতে।

“আপু। আমার ওসব আবেগ চর্চার সময় নেই। তুমি সেই সকালে এসেছ। লাগেজ দেখতে পাচ্ছি, এর অর্থ তোমার যাওয়ার কোনো প্ল্যান নেই। সোজাসাপ্টা আমাকে বলে দাও, কি চাও তুমি?”

ইরাম একটি শক্ত ঢোক গিললো। আজও তার মনে পড়ে, সামনে দাঁড়ানো এই পুরুষটার চুল আঁচড়ে দিত সে মায়ের মতন, মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিত কলেজে পাঠানোর আগে। আজ সেই ছেলেটা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের দারোগার মত, যেন ইরাম অপরাধী। মাথা ঝাঁকাল সে। জগতে আপন বলে কিছু হয়না সেটা তার চাইতে ভালো কেই বা বোঝে? চোখে পানি আসতে চাইলেও তা রুখে খানিকটা হিমশীতল দৃষ্টিতে সামনে তাকাল ইরাম। দৃঢ় গলায় বলল,

“আমি এখানে থাকতে এসেছি। বেশ কিছুদিন থাকব ইযানকে নিয়ে, কতদিন বলতে পারছিনা। যতদিন না একটা কাজ পাই আর ভালোভাবে কোথাও সেটেল হতে পারি ততদিন। আর ইযানকে একটু ডাক্তার দেখাতে হবে, বেশকিছু টাকা দরকার আমার। তুই আমাকে ধার দে, আমি ধীরে ধীরে শোধ করে দেব।”

“এক্সকিউজ মি! সরি আপু, বাট আপনার কি মনে হয় টাকা গাছে ধরে?”

এতক্ষণ ধরে নীরব থাকা মিথিলা অবশেষে নিজের আসল রূপ নিয়ে সামনে আসলো। ঠিক নিজের স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ইরামের মুখোমুখি হলো।

“আপু, আপনাকে এখনো আপু ডেকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি আমি। কিন্তু আপনার মনে হয়না আপনি আমাদের দেয়া এই সম্মানটা টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ধরে ফেলেছেন? আমার আর রাহাতের পক্ষ থেকে আপনাকে বারবার বলা হয়েছে, অনুরোধ করা হয়েছে নিজের বৈবাহিক সম্পর্কটা না ভাঙতে। আপনার একটা ছোট্ট দুধের শিশু আছে সেই চিন্তাটাও আপনি করলেন না। নিজের ইচ্ছামত যা নয় তাই করেছেন। এখন যখন ঠেকায় পড়েছেন, তখনি এখানে এসে হাজির?”

ইরামের দিকে এক পা এগোলো মিথিলা। বলতে লাগল,

“আমার কথা শুনতে হয়ত আপনার খারাপ লাগছে কিন্তু কিছু করার নেই, এটাই সত্য। আপনার বোঝা উচিত ছিল, একজন ডিভোর্সী হওয়ার মানে কি। আপনি বাচ্চা না, ভালোই বোঝেন। এখন এই বাড়িতে আস্তানা গাড়তে চাইছেন? বুঝিনা মনে হয় আমরা? আজ বলেছেন কিছুদিন, আগামীকাল বলবেন আরও কিছুদিন। এরপর সেই কিছুদিন আর কোনোদিন শেষ হবেনা। আপনার জন্য এই পরিবারের বদনাম হবে। আমার নিজের ছোট ছোট দুটো বাচ্চা আছে। ওদের উপর আমি আপনার জন্য কোনো আঁচ আসতে দিতে পারিনা, তাইনা? সমাজে আমাদের একটা নাম আছে, ইজ্জত আছে। সেটা আপনার জন্য ধুলিস্যাৎ হতে পারেনা।”

নিজের স্ত্রীর কথায় সায় জানাল রাহাত।

“মিথিলা ঠিক বলছে। আপু, তোমার আমার দিকটাও ভাবা উচিত। এত বড় সংসারটা এখন আমি একাই চালাচ্ছি। নিজের ছোট দুটো ছেলে, ইহানের পড়াশোনা, সাংসারিক খরচ তোমার থেকে ভালো কেউ বোঝে না। আমার সত্তর হাজার বেতনের চাকরিতেও হিমশিম খেতে হয়। তখন মিথিলা হেল্প করে। আমি চাইনা আমার স্ত্রীকে আমার জন্য কোনো কষ্ট সহ্য করতে হোক। তোমার বুঝতে হবে, আমার জীবনটাও সহজ না। তুমি একা হলে তাও একটা কথা ছিল, আমি দরকার হয় অন্য জায়গায় তোমার জন্য একটা রুম নিয়ে দিতাম, কিন্তু তোমার বাচ্চাকে টানার ক্ষমতাটা আমার নেই।”

স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল ইরাম। মুখের কথা তার মুখেই রয়ে গেলো। হাতে ঝোল শুকিয়ে গিয়েছে, অথচ ভাতটুকু আর মুখে তোলা হলোনা তার। খানিকটা উত্তেজনার শব্দে এর মধ্যেই ইযান নড়েচড়ে উঠেছে। উল্টো ঘুরে তাই তাড়াতাড়ি করে বাটিতে হাত ধুয়ে নিলো ইরাম। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সোফা থেকে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। তার বুকে মুখ গুঁজে কুইকুই শব্দ করতে থাকলো ইযান। ছোট্ট অংশকে দোলাতে দোলাতে ইরাম বলল,

“তুই ঠিক বলেছিস, ভাই। দামী ব্র্যান্ডেড ফোন আর ব্র্যান্ডেড ফার্নিচার কেনার পর আসলেই বোনকে দেয়ার মত টাকা বাঁচে না।”

হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেলো রাহাতের। প্রথমবারের মতন তার শক্ত চেহারায় বিষাদের ছায়া পড়ল। ছেলেকে নাড়াতে নাড়াতে ইরাম সূক্ষ্ম হেসে জানালো,

“ভেবেছিলাম, আজকের রাতটা অন্তত নিজের মায়ের বাড়িতে জায়গা হবে। জন্ম থেকে এখানেই বড় হয়েছি কিনা! একটু অধিকার তো আছে বল? কিন্তু যেখানে আমার হাতের ভাত হাতেই শুকিয়ে যায় সেখানে অধিকারের বায়না বিলাসিতা।”

“আপু…”

রাহাত এগিয়ে আসতে চাইলো এক পা, অথচ পাশ থেকে মিথিলা তার বাহু চেপে ধরল। ওখানেই জমে গেলো সে। শুধু তাকিয়ে রইল নিষ্পলক। দৃশ্যটা পরিহাসের হাসিতে ছেয়ে ফেলল ইরামের ঠোঁট। আর দাঁড়ালনা সে। এই বাড়ির বাতাসে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক হাতে ইযানকে বুকে চেপে অন্য হাতে লাগেজ টেনে দরজার দিকে এগোল ইরাম। মাঝপথে থামল। ঘুরে একবার পিছনে তাকাল নিজের ভাইয়ের দিকে।

“মহান আল্লাহ্ যদি তোকে কোনোদিন মেয়ে সন্তান দেয়, তবে জেনে রাখিস ভাই আমার…”

একটু থেমে সে যুক্ত করল,

“মেয়েদের একটাই ঘর। কবর।”

◉◉◉◉

রাত প্রায় দুইটা বেজে এসেছে। অথচ এই স্থানের উত্তেজনায় বোঝা দুষ্কর। তীব্র মিউজিক এবং বিটের তালে তালে দুলছে যেন গোটা পৃথিবী। তরুণ তরুণীদের উন্মত্ত হুংকার, বাঁধনহারা নাচ এবং দক্ষভাবে বিট নিয়ন্ত্রণ করে বাজানো মিউজিকে কেঁপে কেঁপে উঠছে চারপাশ। লাল নীল বাতির ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অ্যালকোহলের কড়া ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। অনেকের হাতে মোবাইল ফোন, পার্টির দৃশ্য ধারণ করে চলেছে। সকলের মনোযোগ আবদ্ধ সামনের ডায়াসের উপর কন্ট্রোল প্যানেলের পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার দিকে।

পরনে একটা পোলো টি শার্ট এবং ব্যাগী জিন্স। লেদার জ্যাকেটটা খুলে ফেলে রেখেছে পানির বোতলের সঙ্গে। সাদা আলোর ফোয়ারা ছুটছে তার মাথার উপর থেকে। তাতে তার গলা এবং উজ্জ্বল চেহারায় জমা ঘামের ফোঁটা চিকচিক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। দ্বিগুণ আকর্ষণীয় লাগছে তাতে তাকে দেখতে। হাফ হাতা পোলো শার্টের কারণে যখনি কন্ট্রোল প্যানেলের বাটনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে, ইকুইলাইজার কমাচ্ছে বাড়াচ্ছে, তখনি তার শক্তিশালী বাইসেপ্স চোখে পড়ছে। অন্য হাতে কানে ধরে রেখেছে হেডফোন, মিউজিকের তালে তালে শরীর দুলছে তার। তরুণীদের ভিড় ঠিক ডায়াসের আশেপাশেই। সকলে ব্যাস্ত মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে।

বোতাম নামিয়ে হঠাৎ করেই মাঝপথে মিউজিকের গতি কমিয়ে দিল সে। নীরব উত্তেজনা ভর করল গোটা জায়গায়। প্রত্যেকটি চোখ আবদ্ধ তার পানে। ছেলেটি একটি হাত তুলে নেড়ে মাউথপিস অন করে চিৎকার করে বলল,

“কাম অন এভরিবাডি, লেটস্ ডান্স দি নাইট অফ, উইথ ডি জে…”

“আলাদিন!”

সমস্বরে গর্জে উঠল জনসমুদ্র। বিরাট হাসলো সে। তাতে মাড়ির দুইপাশে থাকা দুটো চোঁছালো দাঁত নজরে পড়ল, তীক্ষ্ণ সুচারু। অন্যরকম একটা আবহের প্রকাশ ঘটায় তা। আরেক দফায় চেঁচিয়ে উঠল সে,

“ইয়েস! ডি জে?”

“আলাদিন!”

“ডি জে?”

“আলাদিন!”

“কাম অন, ইয়াহু!”

এবার বিটটা ড্রপ করল সে। বিকট জোরালো আওয়াজে বুক কেঁপে উঠল, সঙ্গে সহস্র মানুষ লাফিয়ে উঠল উন্মত্ত উত্তেজনায়। এতকিছুর মাঝেও নিজের পকেটে ভাইব্রেট হতে থাকা ফোনটার অস্তিত্ব ঠিকই টের পেলো সে। বোর্ডে মিউজিক কন্টিনিউ রেখে হেডফোন নামিয়ে অপর হাতে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল সে,

“হ্যাঁ, মম?”

“এখনো শো শেষ হয়নি? বাড়িতে আয়। তোর সাথে জরুরী আলাপ আছে।”

“তুমি কি বলছ আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছিনা। ওকে নাউ, গুড নাইট মোস্ট গর্জিয়াস মম অন প্ল্যানেট আর্থ। স্লিপ টাইট অ্যান্ড নেভার কল মি ব্যাক! উম্মাহ, লাভ ইউ।”

ফোনটা কেটে দিলো সে। একপাশে ছুঁড়ে ফেলে নব উদ্যমে কাজে মনোযোগ দিলো। যত বিট বাড়াল, ততই বাঁধনহারা হয়ে নেচে উঠল গোটা জগৎ।

✿—চলবে—✿

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply