Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ শেষাংশ


লেখিকা:_রিক্তা ইসলাম মায়া

২৮ – শেষাংশ
‘ কারও যদি ক্ষমতা থাকে তাহলে আমাকে ঠেঙিয়ে মেয়েটিকে ছুঁয়ে দেখা। খোদা কসম আজ এখানে লাশের বন্যা বয়ে যাবে। একজনও জান নিয়ে ফেরত যাবে না। আয়! সাহস থাকলে ছুঁয়ে দেখা।

মারিদের হুমকার, গ্রামবাসীর কলহের গমগম শব্দের মাঝে আকাশের ঘন বর্ষণে ঝুম বৃষ্টি নামলো। আকাশ ফেটে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে—যেন আকাশ চিৎকার করে ধরণীর বুকে চোখের জল ফেলছে। ঘন অন্ধকারে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে একেক জনের মুখশ্রী কী ভয়ানক দেখাচ্ছে! মোল্লা সওদাগরের দুজন লোক নূরজাহানের দিকে তেড়ে গেল। তাদের কেউ মারিদকে গুরুত্ব দিল না। কাদাপানিতে পড়ে থাকা নূরজাহানকে ছুঁতে চাইলে ক্ষীণ সময় পরেই দুজন লোক চিৎকার করে ছিটকে পরে দূরে। একজনের বাহু, অপরজনের পিঠ কেটেছে মারিদের হাতের রামদায়ের কোপে। মারিদের চোখ-মুখে হিংস্রতা বাড়ল। নূরজাহানকে ছুঁতে আসা সকল হাত এক কোপে কেটে ফেলার মতো হিংস্র শিকারি হয়ে উঠল সে। রামদায়ে লেগে থাকা রক্তটুকু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে।

গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হলো মারিদের উপর। থানচিতে মারিদের হাসপাতাল বানানোর কৃতজ্ঞতা সবারই আছে, কিন্তু তাই বলে মারিদ তাদের গ্রামবাসীদের আঘাত করবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। তাছাড়া গ্রামবাসীর কেউ মারিদকে আঘাত করছে না, তারা শুধু নূরজাহানের জন্য এসেছে। এখানে নূরজাহানের সঙ্গে মারিদকে অনৈতিক কাজে ধরেছে তারপরও গ্রামবাসীর কেউ মারিদের ক্ষতি করছে না; তাই মারিদের গ্রামবাসীর উপর হামলা করা ঠিক হয়নি। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা গ্রামবাসীরা মারিদের কাণ্ডে হঠাৎ হৈ হৈ করে ওঠে ক্ষিপ্ত সুরে। যে যেটা পারছে হাতে লাঠিসোঁটা দা নিয়ে একত্রে ২০-২৫ জনের বেশি মানুষ মারিদের উপর হামলে পড়ে। মারিদ হাতের রামদা উঁচিয়ে এলোমেলো ভাবে বেশ কয়েকটা প্রহার গ্রামবাসীর উপর করলেও এতগুলো গ্রামবাসীর সাথে সে পেরে ওঠেনি। চৌদ্দ পনেরোজন মানুষ মিলে একটা দল মারিদকে মাটির কাঁদা পানিতে চেপে ধরে।

মারিদ চিৎকার করে নূরজাহানকে লোকগুলো যেন না ছোঁয়। নূরজাহানের হোঁশ সবে ফিরছিল বৃষ্টির পানিতে। কানে মারিদের চিৎকার আর মানুষের হৈচৈ শব্দ আসছে। নূরজাহানের জখম শরীরে চোখের পলক ঝাপটায় বৃষ্টির পানির কারণে তাকাতে পারছে না। আকাশ কাঁদছে, অথচ নূরজাহানের তৃষ্ণা মেটাতে পারছে শুদ্ধতার বৃষ্টির পানি। নূরজাহান মৃদুস্বরে পানি চাইল…

“মানিক ভাই পানি খাব। আমাকে পানি দিন।

“তোরে বিষ দিমু নষ্টা ছেড়ি। ওয়াক থু!

একদলা থুতু নূরজাহানের মুখে পড়ে। নূরজাহান মুখ কুঁচকায়। চোখ তখনো মেলে তাকাতে পারেনি। নূরজাহানের মুখে পড়া থুতু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। নূরজাহানকে থুতু ফেলেছে ইকবাল।
ইকবাল গ্রামের ভালো পরিবার থেকেই আসে। হাসানের পাশাপাশি সেও থানচি গ্রামের পাঁচ নং ওয়ার্ড থেকে মেম্বার পদপ্রার্থীতে দাঁড়ায় কিন্তু প্রতি বছরই হাসানের কাছে বিপুল ভোটের কাছে তাকে হারতে হয়। ইকবালের বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। হাসানের সঙ্গে রেষারেষি থেকেই আজ মোল্লা সওদাগরের পক্ষে এসেছে নূরজাহানের সঙ্গে মানিকের বিয়ে দিতে। কিন্তু মানিকের জায়গায় মারিদকে দেখে একটু অবাক হয়েছিল; তবুও হাসানকে গ্রামবাসীর সামনে অপদস্ত করার সুযোগ বুঝে সে নূরজাহানের বিচার করতে চায়। হাসানের মেয়ে নূরজাহানের রূপের বহু গুণ সে শুনেছে। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় হাসানের সাথে চাঁদের মতো সুন্দর নূরজাহানকে দেখত; লোভ জাগত হাসানের মেয়েকে ছোঁয়ার। কিন্তু হাসানের কড়া পাহারার জন্য কখনো এই নূরজাহান অবধি পৌঁছাতে পারেনি কেউ। এরপরেও হাসান নিজের পরীর মতো সুন্দর মেয়ের হেফাজত করতে পারত না, গ্রামবাসীর কেউ না কেউ এতদিন হাসানকে মেরে হলেও নূরজাহানকে নিয়ে যেত কিংবা ভোগ করত যদি না মাঝে মানিক সওদাগর আসত। মানিক সওদাগর হাসানের মেয়ে নূরজাহানের জন্য একদিক থেকে যেমন অভিশাপ অপর দিক থেকে হচ্ছে দোয়ার ফল। মানে হেফাজতকারী। মানিক সওদাগর নূরজাহানের জীবনে আছে বলেই নূরজাহানের নিঃশ্বাস আজও চলছে। কিন্তু এখানে হাসান নেই, মানিকও নেই। আজ হাসানের ফুলের মতো মেয়ে অসংখ্য ভ্রমরের ছোঁয়ায় কলুষিত হবে।
সবার আগে নূরজাহানকে ইকবাল ছুঁল। নূরজাহানের পেটের বাম পাশে শক্ত থাবার মতো মাংস পিষল। আহত স্থানে ব্যথায় নূরজাহান চিৎকার করল। হোঁশ ফিরে বসতে চাইলে দুজন মহিলা এগিয়ে এসে নূরজাহানের দু-হাত টেনে মাটিতে আটকে ধরে গালিগালাজ করে…

‘ বেশ্যা মাগি ছেড়িরে গ্রামে জায়গা দেওন যাইব না মাতব্বর। গেরামে আমাগো মাইয়া-ছেড়ি আছে। এই নষ্টা মাইয়ার লাইগা আমাগো মাইয়া-ছেড়ি নষ্ট হইব।

ইকবালের বোন হাসিনা। বাপের বাড়ি, স্বামীর বাড়ি একই গ্রামে পাশাপাশি হওয়ায় সে থানচি গ্রামের মেয়ে এবং বউ দুটোই। সওদাগর পরিবারের সঙ্গে হাসিনার বেশ ভাব। মোল্লা সওদাগরের কথা মতোই আজ এখানে মানিকের সঙ্গে নূরজাহানের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এখন আবার মোল্লা সওদাগরের কথা মতোই নূরজাহানের বিচার হবে আজ, তাও মানিকের অনুপস্থিতিতে। নূরজাহানের চিৎকারে মারিদও চিৎকার করে নিজেকে ছাড়াতে চায়, কিন্তু একত্রে এতগুলো গ্রামবাসীর চেপে ধরায় সে পারছে না।

সবুজ গেঁয়ো ছেলে, বয়স পঁয়ত্রিশ। কালো খাটো দেখতে সবুজ। ইকবালকে নূরজাহানের শরীরে হাত দিতে দেখে সেও ভিড়ের মাঝে প্রথমে নূরজাহানের গায়ে থাকা মানিকের রক্তাক্ত সাদা শার্ট টেনে ফেলল। আহত নূরজাহানের গায়ের জামার ভিতর হাত দিয়ে নূরজাহানের মসৃণ পেট খাবলে ধরলে নূরজাহান সবুজকে জোরে লাথি মারতে চাইল কিন্তু ইকবাল দু-হাতে নূরজাহানের পা চেপে ধরে নেয় মাটির সঙ্গে। হাত পা আটকে থাকায় নূরজাহান চিৎকার করে নিজেকে ছাড়াতে চায় কিন্তু আহত শরীরে বারবার আঘাত পাওয়ায় নূরজাহানের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। সবুজ সুযোগ বুঝে নূরজাহানের পেট ছেড়ে পায়জামার ভিতর হাত দিতে সেলোয়ারের ফিতা ধরতে আশনূর সবুজের মাথা বরাবর লাথি মেরে দূরে ছিটকে ফেলে। ইকবাল হুংকার দিয়ে ওঠার আগে দ্বিতীয় লাথিটা ইকবালের মুখে পড়ে। চারপাশে হৈচৈ আরও বাড়ল, আশনূর উপস্থিত। গ্রামবাসী হৈচৈ করতে থাকলে আশনূর মহিলাদের ধাক্কা মেরে নূরজাহানকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে বলল…

“জানোয়ারের দল! এতগুলা অমানুষ মিলে একটা মেয়ের উপর নির্যাতন করা কোন ধরনের সমাজিক নীতি তোদের? তোরা কি মানুষ নাকি কুত্তার জাত?

“বুবু আমারে বাঁচা। বুবু!

নূরজাহান হু হু করে কেঁদে উঠল আশনূরকে জাপটে জড়িয়ে। আশনূরের ধাক্কায় হাসিনা দূরে ছিটকে গিয়েও ফিরে এসে আশনূরের চুলের মুঠি ধরে কাদামাটিতে টেনে নূরজাহান থেকে আলাদা করতে চেয়ে গালিগালাজ করে…

‘ নষ্ট নটির জাত তোরা। রাত-বিরাতে বেডা লাগাইতে আইবি তোরা, আর আমরা হাতেনাতে ধরলেই দোষ? তোর বইন যহন ডাক্তারের লগে ফষ্টিনষ্টি কইরা ধরা খাই তহন এডি দেখিস না?

আশনূর শক্ত হাতে নূরজাহানকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। মহিলাদের টানাটানিতেও আশনূরের থেকে নূরজাহানকে আলাদা করা যায় না। নূরজাহান দু-হাতে আশনূরকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে। আশনূর হাসিনার কথার উত্তরে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে…

“খবরদার! কেউ আমার নূরজাহানের গায়ে কলঙ্কের দাগ ছিটাইলে আল্লাহ সইবে না। নূরজাহান এখানে ইচ্ছা করে আসে নাই। ওরে ডাকাত দল ধরে নিয়ে এসেছিল এখানে। আল্লাহর রহমতে আমার নূরজাহানের কিছু হওয়ার আগেই মানিক ভাই নূরজাহানরে বাঁচায় ডাকাত দলের হাত থেকে। এজন্য মানিক ভাই ও তার লোকজন ঘায়েল হয়, ওদের ডাক্তার সাহেবের গাড়ি করে হাসপাতালে পাঠায়। আজ ডাক্তার সাহেব ঢাকা ফিরে যাচ্ছিলেন; আমি ফোন করায় নূরজাহানের কথা শুনে উনারা এখানে আসেন আমাদের সাহায্যের জন্য। এই অন্ধকার রাতে রাদিল সাহেব রাস্তা খুঁজতে গিয়ে পড়ে যান পাহাড় থেকে, আমি উনাকে সাহায্য করতে গিয়ে মারিদ সাহেবকে নূরজাহানের পাশে রেখে যাই যদি আবার কেউ নূরজাহানের উপর হামলা করে তাহলে মারিদ সাহেব যেন নূরজাহানকে বাঁচাতে পারেন। আর এরমধ্যে আপনারা এসে কোনো কিছু না জেনেই মিথ্যা অপবাদ-লাঞ্ছনা লাগিয়ে আমার বোনকে আবারও আঘাত করছেন। এখন বলেন আপনারা কি মানুষের কাতারে পরেন নাকি জানোয়ারের দলে পরেন।

মেয়ে সুন্দর-অসুন্দর, কালো-বেঁটে, বড়-ছোট দেখার প্রয়োজন হয় না একদল চরিত্রহীন পুরুষের জন্য; তাদের মেয়ে মানুষ হলেই হয়—সুযোগে অসৎ ব্যবহার করবেই তাঁরা। ইকবালের হাসানের প্রতি রেষারেষি আর নূরজাহানের সৌন্দর্য লালসায় নূরজাহানকে ছুঁতে চাচ্ছে; আর সবুজ, কাশেম এমনই মানুষের ভিড়ে নারীর শরীর ছুঁতে চাওয়ার লালসায় নূরজাহানকে ছুঁতে চাচ্ছিল। মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় আশনূর। মারিদ তখনো ধস্তাধস্তি করছে সকলের হাত থেকে ছাড়া পেতে।

“তগো উপর জুলুম কেউ করে না। তোরা হইলি জাত মাগি দল। আমাগো গেরামের কলঙ্ক। তগো মারলেও আল্লাহ খুশি হইব। আর এহন নূরজাহান পাপ ঢাকার লাইগা চেয়ারম্যান পোলা মানিকের নাম ভাঙতাছস। ভাবছত মানিক তো নূরজাহানের লাইগা পাগল হের নাম নিলে তোগোর বিচার কেউ করব না। তয় তোরা তো আর জানি না মানিক সওদাগর তো আইজ গেরামেই নাই। হেয় গেরামে থাকলে এহন আমাগো লগেই থাকত। শোন আশনূর, শাকপাতা দিয়া মাছ ঢাহন যায় না। তেমনই নূরজাহান ব্যভিচারের সাক্ষী আমরা হুগল গেরামবাসী। আমরা হুগলে এহানে আইসা ডাক্তার সাহেবের(মারিদ) লগে নূরজাহানরে ধরছি হাতেনাতে। এহন তুই মনগড়া কাহিনি বানাইয়া মিছা কথা কইলেও এহানে কেউ তোগোর এডি বিশ্বাস করব না।

রাশেদ সওদাগর আর মোল্লা সওদাগরের সঙ্গে প্রায় দেড়শ গ্রামবাসী এসেছে মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে। এখানে গ্রামের মাথাওয়ালা বেশ কিছু মানুষ সওদাগর পরিবারের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের চক্রে মিলিত থাকলেও বাকি গ্রামবাসী অজ্ঞাত। রাশেদ সওদাগর জেলা মন্ত্রী হওয়ায় তাকে গ্রামবাসী বেশ মান্য করে চলে। আশনূরের কথায় মারিদ, রাদিল দুজনই চিৎকার করে সহমত দিয়ে একই কথা বলছে। এতে কিছু গ্রামবাসী নূরজাহানের বাবা হাসানকে সংবাদ দেওয়ার কথা বলছে। বাকিরা অমত করছে। তারা হাসানের অনুপস্থিতে নূরজাহানের বিচারের রায় দিয়ে রাখতে চাই যাতে পরবর্তী সময়ে হাসান চাইলেও বিচারের রায় হতে নিজের মেয়েকে বাচাতে না পারে। কিন্তু এই মূহুর্তে হাসান এখানে এলে নিজের কলিজার টুকরো মেয়েদের দুর্দশা দেখলে পরিস্থিতি বিগড়ে যাবে। যা করার হাসানের অনুপস্থিতিতেই হাসানের মেয়েদের বিচার করতে হবে। সকাল হলে আবার মানিক বাগড়া দেবে সবকিছুতে। রাশেদ সওদাগরের ডান হাত-বাম হাত দুটোই মানিক। সেই মানিক নূরজাহানের জন্য পাগল হয়ে রাশেদের সঙ্গেও বেয়াদবি করে। সেজন্য মানিকের জীবন থেকে নূরজাহানকে দূরে সরাতে পারলে তখন আর কোনো বাধা থাকবে না রাশেদ সওদাগরের জন্য। মানিক নূরজাহানের জন্য কিছুদিন কষ্ট পেলেও তারপর ঘরে ছেলে ঘরেই ফিরে আসবে উনার কাছে।

গম্ভীর রাশেদ সওদাগরের মাথায় ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে একজন কাজের লোক। তিনি গম্ভীর গলায় সকলের উদ্দেশ্যে বললেন…

“আমরা হাসানের ছোট মেয়েকে ডাক্তারের সঙ্গে এই কালিঘাটিতে পেয়েছি, তাও বিধস্ত অবস্থায়—এটা তো এখানের কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না?

“হুঁ হুঁ ঠিক ঠিক!

গ্রামবাসী সকলে একত্রে হৈ হৈ করে সম্মতি দিল। রাশেদ সওদাগর ফের গম্ভীর গলায় বললেন…

“তাইলে আগে হাসানের মাইয়াডারে গাছের সঙ্গে বাঁধো। ব্যভিচারের বিচার হবে, কঠিন বিচার। এরপর যেন গেরামে কোনো যুবতী মেয়ের সাহস না হয় ব্যভিচারে লিপ্ত হতে। ইকবাল, কাশেম, সবুজ—মেয়েডারে গাছের সঙ্গে বাঁধ। তারপর গ্রামের সবাই মিলে আলোচনা করে কিছু একটা করা যাবে।

নূরজাহান আঁতকে উঠে আশনূরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল…

“বুবু ওদের হাত ভালো না, নোংরা হাত। বুবু আমারে বাঁচা। বুবু তুই আমারে ছাইড়া যাস না। বুবু! বুবু।

আশনূরের থেকে নূরজাহানকে কোনো মতে ছাড়াতে না পেরে হাসিনার সঙ্গে আরও দুজন মহিলা এগিয়ে আসল। তিনজন পুরুষ আর তিনজন মহিলা ধস্তাধস্তি করল আশনূরের থেকে নূরজাহানকে ছাড়াতে। ধস্তাধস্তির মাঝে তিনজন পুরুষই দুই বোনের গায়ে হাত দিয়েছে। সবুজ সুযোগ বুঝে আশনূরের বাম স্তন খাবলে ধরেছে। ইকবাল আশনূরের পিছন থাবা মারার মতো মাংস খাবলে মুঠোয় চেপেছে। কাশেম নূরজাহানের সালোয়ার টানছে। নূরজাহানের কোমরে সালোয়ারের ফিতা আটকে থাকায় কাশেম সফল হয়নি নিচে নামাতে; কিন্তু সেও থেমে নেই, রাতের অন্ধকারে নূরজাহানের শরীরে হাত দিচ্ছে।

নোংরা স্পর্শে হঠাৎ সাহসী কাজ করে বসল দুই বোন। ভরা মজলিসে আশনূর-নূরজাহান দু-বোনই গর্জে উঠে মহিলাদের সঙ্গে বাধা থাকা অবস্থায় পা তুলে লাথি বসাল কাশেম, ইকবাল ও সবুজের উপর। আশনূর ও নূরজাহান দুজনের লাথি খেল ইকবাল। সবুজ আর কাশেম একটা করে খেয়েছে। আশনূর চিৎকার করে বলল…

” কুত্তা বাচ্চারা, পশুর দল! ভরা মজলিসে একটা অসহায় মেয়ের বিচারের নাম করে তাদের গায়ে হাত দেওয়া এটা কেমন ন্যায়, জানোয়ারের দল?

রাদিল আশনূরের পিছন পিছন দৌড়ে এসেছিল নূরজাহানকে বাঁচাতে, কিন্তু রাদিলকেও মারিদের মতো করে একদল গ্রামবাসী ধস্তাধস্তি করে চেপে ধরে রেখেছে মাটির সঙ্গে। দুটো ছেলে দেড়শ গ্রামবাসীর সঙ্গে শক্তিতে পেরে উঠবে না সেটাই স্বাভাবিক। মারিদ পারছে না মাটি খুঁড়ে উঠে আসতে নূরজাহানকে বাঁচাতে। মারিদ শেষে পরিস্থিতি ফ্যাসাদে পরে অসহায় গলায় রাশেদকে অনুরোধ করে বলল…

“আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা মেয়ে দুটোর কাছে পুরুষদের ভিড়তে দেবেন না। এখানে গেরামের মহিলারা আছেন, মহিলাদের বলুন মেয়েদের কাছে থাকতে, পুরুষ পাঠাবেন না দয়া করে রাশেদ সওদাগর।

এতদিন মারিদ ‘রাশেদ সাহেব’ ‘রাশেদ সাহেব’ বলে ডাকত, আজ সরাসরি মারিদ ‘রাশেদ সওদাগর’ নামে ডাকছে। রাশেদ বুঝেছে এখানে মারিদকে অপমানিত করায় সে উনার উপর রেগে আছে। তাই রাশেদ যতটা পারবে চেষ্টা করবে মারিদকে নূরজাহানের বিচার হতে দূরে রাখতে। এই মজলিসের বিচার শুধু নূরজাহানের জন্যই হবে। মারিদ ক্ষমতাধর মানুষ, মারিদের বিরুদ্ধে গিয়ে উনার বিশেষ কোনো লাভ হবে না। সেজন্য মারিদের কথা মতো ইকবাল, সবুজ ও কাশেমকে দূরে সরিয়ে হাসিনাকে বলল নূরজাহানকে গাছের সঙ্গে বাঁধতে। কয়েকজন মহিলা মিলে জোর করে নূরজাহানকে গাছের সঙ্গে বাঁধল। আশনূর বন্দি হাসিনাদের হাতে।

বৃষ্টির বেগ কমেছে। প্রত্যেকের মাথায় ছাতা, হাতে টর্চ লাইট। একই ছাতার নিচে দুই-তিনজন করেও ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে। আশনূর, মারিদ, রাদিল সকলেই গ্রামবাসীর হাতে বন্দি। রাত প্রায় বারোটার ঊর্ধ্বে। আকাশে গর্জন কমেছে। মুষলধারে বৃষ্টি থেমে প্রকৃতি শান্ত; যেন ঝড়ের তাণ্ডব শেষে নিস্তব্ধ নীরবতা বিস্তৃত পরিবেশ। সেই সাথে পরিবেশে শীতল হাওয়া বইছে। বৃষ্টিতে ভিজে শরীরে কাঁপুনি দিচ্ছে শীতল হাওয়ায়, তারপরও গ্রামবাসীর কেউ নড়চড় হচ্ছে না জায়গা ছেড়ে। হাসানের মেয়ে নূরজাহানের বিচার দেখবে তারা। কিন্তু সাধারণ গ্রামবাসী নিরপেক্ষ হয়ে বিচার দেখছে, আর কিছু মানুষ মোল্লা সওদাগর ও রাশেদ সওদাগরের ভাড়া করে আনা কালসাপ হয়ে ফুস ফুস করছে—যেন ফণা তুলেই বিষাক্ত ছোবল মারবে।

বৃষ্টি শেষে পাহাড়ের উপরে থাকা চৌকিতে বসেছেন গ্রামের মাথাওয়ালা বয়স্ক মুরুব্বিরা। ভরা মজলিসে নূরজাহান তার জখম শরীর নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। এতক্ষণ চিৎকার করছিল আশনূরের কাছে ওকে বাঁচাতে, কিন্তু এখন নিরব। মাথা তুলে কারও দিকে তাকাচ্ছেও না; যেন বিচারের শেষ কী হবে নূরজাহানের জানা। নূরজাহানের শরীর কাদামাটিতে ল্যাপ্টে। গায়ে ওড়না নেই। চরিত্রহীন পুরুষরা সুযোগে নূরজাহানের শরীরে চোখ বুঝাচ্ছে যেন এই জন্মের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে নূরজাহানকে দেখে। দৃশ্য মান গলায় কিছু চাবুকের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। গ্রামবাসীর সকলের হাতের টর্চ লাইটের আলোয় আলোকিত চারপাশ। ইসলামিক মোতাবেক ব্যভিচারের সর্বোচ্চ শাস্তি কী হতে পারে সেই আলোচনাই হচ্ছিল সবার মাঝে। এর মাঝে একজনের নাম জাফর, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তিনি একজন পরহেজগার মানুষ। খোলামেলা মজলিসে গাছের সঙ্গে বেঁধে নূরজাহানের বিচার করাটা উনার ঈমানে সইছে না। তাই তিনি আমতা আমতা করে বললেন…

“হাসানের মাইয়ার বিচার করনের আগে কেউ হাসানরে খবর দেও। বাপ ছাড়া মাইয়াডার বিচার করন ঠিক হইব না।

জাফরের কথা কাটালেন হামিদ। হামিদ হাসানের বয়সী মানুষ, মোল্লা সওদাগরের লোক। সে কথা কেটে জবাব দিল…

“হাসান আইলে কি আরেকটা হইব চাচা? আমরা গেরামবাসী হগলে দেখছি হাসানের ছোট মাইয়া নূরজাহানরে ডাক্তার সাহেবের লগে ফষ্টিনষ্টি করতে, চক্ষে দেখন জিনিসটা কেমনে মিছা হইব কন?

“আল্লাহর গজব পড়বে আপনাদের ওপর যদি আমার নিষ্পাপ পবিত্র বোনটাকে বিনাদোষে মিথ্যা অপবাদ দেন! আল্লাহ সইবে না এতো জুলুম আশনূর চেঁচিয়ে ওঠে।

“হ, সব কয়টা আল্লাহর ফেরেশতা শুধু হাসানের ঘরেই জন্ম লইছে, আর আমরা তো হইলাম শয়তান—তাই না?

হামিদ হৈ হৈ করে আশনূরের কথার প্রতিবাদ জানাল। রাদিলও একই কথা বলছে তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করে। কিন্তু গ্রামবাসী কেউ বিশ্বাস করছে না। আবার যারা নিরপেক্ষ গ্রামবাসী, তারা নূরজাহানের সত্যটা বিশ্বাস করতে গিয়েও দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে মোল্লা সওদাগরের লোকজনের কথায়। পরিস্থিতি খুব বিগড়ে আছে। ব্যভিচারের আলোচনার মাঝে ইকবাল ক্ষিপ্ত হয়ে বলল…

“এই ভরা মজলিসে বিচার হওনের আগে আমার একখান আবদার আছে। যারা ব্যভিচার করে তারা হইল আমাগো গেরামের কলঙ্ক। এই মাইয়া আমাগো গেরামের বাকি মাইয়া-পোলাগোরে নষ্ট করব। এর লাইগা এই মাইয়ার বিচার হওনের আগে, মাথার চুল সব কাইটা নেড়া কইরা বিচার করলে আগামীতে কেউ আর সাহস করব না আমাগো গেরামে ব্যভিচার করার।

দীর্ঘক্ষণ ধরে চুপ থাকা মোল্লা চেয়ারম্যান ক্রিমিনাল হাসি হেসে মুখের কাঁচা-পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন…

“তোমাগো যা মনে লয় তাই কর। আমাগোর এইখানে কিছু করার নাই।

মারিদ হুংকার দিয়ে ওঠে। ১০-১২ জন লোককে একত্রে নিয়ে সে গর্জে ওঠে দাঁড়াতে চাই। সকলেই হিমশিম খাচ্ছে মারিদকে আটকাতে। মারিদ মোল্লা চেয়ারম্যানের দিকে তেড়েফুঁড়ে যেতে বাধা পেয়ে বলল…

“এক রাতে দিন যায় না চেয়ারম্যান। রাতটা তোর সকালটা কিন্তু আমার হবে। আর খুব ভয়ংকরভাবে হবে। যে তামাশায় তুই নূরজাহানকে আঘাত করছিস, তার ভোগান্তি তোর চৌদ্দ গুষ্টি গুনবে—মনে রাখিস চেয়ারম্যান!

[ গল্পটার ভালো মন্দ রিভিউ দিবেন অবশ্যই ]
(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply