#ডাকপ্রিয়র_চিঠি
#লেখিকাঃ_রিক্তা_ইসলাম মায়া
৩৩
সৈয়দ বাড়িতে আবারও হৈচৈয়ের কান্নাকাটি হচ্ছে। তবে এবার রিফাতের মা শান্তা কাঁদছে না। সালমা সৈয়দ কাঁদছে মারিদের বিয়ের খবর শুনে। মধ্যরাতে শান্তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল সবাই রিফাতের বিয়ের জন্য, আর এখন সেই সান্ত্বনা ঘুরে সালমা সৈয়দকে দিচ্ছে সবাই। সৈয়দ শাহ বোবার ন্যায় বসে। কাকে কী বলা উচিত তিনি এই মুহূর্তে বুঝতে পারছেন না। একরাতে কী এমন হলো, উনার দুই নাতির বিয়ের খবর এলো বাড়িতে! রিফাত বিয়ে করে গায়েব আর মারিদ বিয়ে করে বাপ-চাচাকে ডেকেছে কিসের সমাধানে? রাতভর শান্তা কেঁদেছে আর সকাল হতে হতে সালমা কাঁদছে। মারিদের বিয়ের খবরটা সকালে থানচিতে পৌঁছে মকবুল দিয়েছে বাড়িতে। বলেছে, মারিদরা বউ নিয়ে ফিরবে ওরা কাল। সৈয়দ বাড়ির বড় ছেলে মারিদ। মারিদের হঠাৎ বিয়ে সবার কাছেই শক খাওয়ার মতো। কোথায় কীভাবে বিয়ে হয়েছে এখনো ব্যাপারটা খোলাসা করে কেউ বলেনি ওনাদের। থানচি থেকে মারিদরা ফিরলে হয়তো জানা যাবে। সকাল আটটার নাগাদ সুখ ঘুম থেকে উঠে বসার ঘরে এসে রিফাত আর মারিদ দুজনের বিয়ের খবরটা শুনে। বাড়ির সবার ছোট হওয়ায় আগ বাড়িয়ে কথা না বলে সকলের মনোভাব শুধু বোবার ন্যায় দেখে গেছে। আজ সুখের এসএসসি পরীক্ষা না থাকায় ভেবেছিল কয়েক ঘণ্টা ঘুমাবে বেশি। ঘুম তো হলো, কিন্তু সুখের ঘুমের সুযোগ নিয়ে বাড়ির সবাই বিয়ে করে নিল। ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে সুখের সাথে। মা কাঁদছে বলে সুখ মুখ ফুটে কিছু বলা সাহস পেল না। সুখ নাস্তা করতে এসেও না খেয়ে চলে যাচ্ছে। ঘরে সবার কান্নাকাটি আর মন খারাপ দেখে সুখ নিজের ঘরের দিকে যেতে চাইলে সোফায় বসা সালমা সৈয়দ হেক করে উঠে সুখের উপর—
‘ এই অসভ্য মেয়ে কই যাচ্ছিস না খেয়ে? কতগুলো পাপ জন্ম দিসি আমি। এই পাপ আমারে জ্বালাইয়া মারতাছে। এই রেণু, তোর সুখ আপারে খাবার দে।
একজনের রাগ অন্য জনের উপর দিয়ে গড়ায়। মারিদের প্রতি রাগ সুখের উপর গড়াচ্ছে সালমা। সুখ ভেবেছিল কাউকে ডিস্টার্ব করবে না, অথচ সালমা সৈয়দ বাড়ির সবার রাগ সুখের উপর গড়াচ্ছে।
বিকেল করে সুখ নিজের ঘরে পড়ছিল। কাল সুখের গ্রুপের পরীক্ষা আছে। বাসায় ছেলেরা কেউ নেই। সুখকে পরীক্ষার জন্য এতদিন বাপ-চাচা নয়তো রিফাত নিয়ে যেত। কিন্তু কাল কেউ নিয়ে যাবে না। বাড়িতে কেউ নেই। রিফাতও কোথায় আছে বাড়ির কেউ জানে না। হঠাৎ মেসেজের নোটিফিকেশন আসতে সুখ পড়া থামিয়ে ফোন হাতে নিতে দেখল রাদিলের নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে। সুখ হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে বাপ-চাচা মারিদের সাঁতার প্রতিযোগিতার ভিডিও দেখল। ভিডিওটা দেখে সুখ আনন্দ পেল। পরিস্থিতি যতটা খারাপ ভেবেছিল তেমন কিছুই না। সবাই আনন্দে হাসিখুশি আছে, তার মানে মারিদের বিয়েটা মেনে নিয়েছে ওদের বাপ-চাচারা। মাও দু’দিন গেলে মেনে নিবে এত চাপ নেই। সুখ রাদিলকে কল করতে গিয়েও করল না। ছোট করে মেসেজ লিখে পাঠাল রাদিলকে—
“ভাবীর একটা ছবি দিয়েন রাদিল ভাই।
সুখের মেসেজটা ডেলিভার হয়েছে কিন্তু সিন হয়নি। সুখ হাতের ফোনটা টেবিলের উপর রেখে পড়ায় মনোযোগী হবে তক্ষুনি একটা আননোন নাম্বার থেকে সুখের নাম্বারে কল আসে। সুখ চেনা-অজানা সকল নাম্বার থেকে আসা কল রিসিভ করে কথা বলে। এটা সুখের বাজে অভ্যাস। দেখা যাবে রং নাম্বারে কথা বলতে বলতে ঝগড়া লেগে যায় পযন্ত। একজোট ঝগড়া করে তারপর ব্লক করবে মানুষকে। স্বভাববশত সুখ কল রিসিভ করে সালাম দিবে, তার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে রিফাত কর্কশ গলায় বলে—
‘ শালীর ঘরের শালী, এতক্ষণ লাগে ফোন রিসিভ করতে তোর?
‘ দুলাভাইয়ের ঘরে দুলাভাই, বিয়ে করে আমাকে এখন শালী ডেকে লাভ নেই। আমি তোমাকে দুলাভাই ডাকব না।
রিফাত রেগেমেগে চারশোবিশ। সুখকে শাসিয়ে বলল—
‘ তোর দুলাভাইয়ের মাদারবোর্ড। এখন ক, তোর ভাই কই?
‘ তুমি যেখানে আছো, আমার ভাইও সেখানেই আছে।
‘ মানে কই আছে?
‘ শ্বশুরবাড়িতে।
সবসময় সব পরিস্থিতিতে মজা করা মানায় না। রিফাত রেগেমেগে সুখকে ধমকে উঠে বলে…
‘ অসভ্য ছেরি, তোরে কে বলেছে আমি শ্বশুরবাড়িতে আছি?
“কেউ বলা লাগবে কেন? আমি বুঝি না? রাতে বিয়ে করে, সকালে শ্বশুরবাড়িতে থাকবে না তো কি আমাদের বাড়িতে থাকবে?
‘ যদি পারতাম তাহলে তোদের বাড়িতে না, তোর ঘরেই থাকতাম। সব দোষ তোর ভাইয়ের। তোর ভাইয়ের জন্য আমার সব শেষ।
রিফাত রাগে ফুসফুস করছে। সুখ হাইহুতাশা করে বলল—
‘ ভাইয়ের দোষ দাও আর যাই বলো রিফাত ভাই। তোমরা কিন্তু আমার সাথে অন্যায় করেছো। আমি কি একটু ঘুমালাম, আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে তোমরা দুজনই বিয়ে করে নিতে পারলে রিফাত ভাই? আমার চিন্তা মাথায় আসলো না?
সুখের কথায় মনে হচ্ছে রিফাত আয়োজন করে বিয়ে করতে গিয়েছিল সুখকে ঘুমে রেখে। রিফাত হেক করে উঠে বলল…
‘ বা’ল মাথা এমনই গরম সুখ। তোর ভাইরে পাইলে কি করমু আল্লাহ জানে। তোর ভাইয়ের জন্য আমার সাজানো স্বপ্ন ভাঙছে। আমি তোর ভাইরে ছাড়মু না। এখন ক, তোর কাল পরীক্ষা আছে না?
“হ আছে।
‘ আচ্ছা ঠিক আছে, আমি কাল তোর পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ায় থাকব। তোর সাথে কথা আছে। আর খবরদার, তোর সাথে যে আমার যোগাযোগ আছে এটা কিন্তু ঘরে কাউরে বলবি না। সবার চিল্লাইয়া মইরা গেলেও বলবি না, বুঝেছিস?
“আচ্ছা।
রিফাত কল কেটে দিল। রিফাতের সঙ্গে কথা বলার সময়ে রাদিল দুবার কল দিয়েছে। দুবার বিজি পেয়েছে সুখের নাম্বার। তৃতীয়বার কলটা সুখ রিসিভ করে সালাম দিতে রাদিল বলল—
“কার সাথে এতক্ষণ কথা বলছিলি তুই?
রিফাতের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারটা লুকিয়ে সুখ মিথ্যা বলে…
‘ আমাদের স্কুলের হ্যান্ডসাম গণিত স্যারের সঙ্গে।
‘ তোর গণিত পরীক্ষা শেষ না?
‘ হ্যাঁ।
‘তাহলে এখন স্যারের সাথে কি কথা বলিস?
‘ পার্সোনাল কথা।
‘ স্যারের সাথে একজন ছাত্রীর কিসের পার্সোনাল কথা থাকতে পারে?
‘ তুমি ঐসব বুঝবে না রাদিল ভাই। কেন ফোন দিয়েছ সেটা বল।
সুখের কথায় রাদিল হঠাৎ রেগে গেল। এতদিন রাদিল সুখের মুখে শুধু শুনে এসেছে সুখের স্কুলে কোনো একটা গণিত টিচার আছে, যিনি অনেক সুন্দর আর হ্যান্ডসাম। যদিও রাদিল কখনো স্বচক্ষে দেখেনি, তবে শুনেছে সুখের মুখে। রাদিল এই বিষয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি, মনে করেছিল সুখ ফাজলামো করছে। কিন্তু দিন দিন বিষয়টা সুখ সিরিয়াসলি নিচ্ছে। রাদিল বলল—
“তোর মতোন স্টুডেন্ট আমরা ছিলাম না? আমরা কি শুধু ম্যাডামের সাথেই কথা বলে বেড়াতাম? তোর রুচি এত খারাপ কেন? আমি কিন্তু মামার কাছে তোর নামে বিচার দিব সুখ।
“বিচার দিলে দাও। আমার জন্য সুবিধাই হয়। আমাকে কষ্ট করে কাউকে আর বলতে হবে না কিছু। সবাই তোমার মাধ্যমে আমার পছন্দের ব্যাপারটা জেনে গেল। এমনিতে ভাইও বিয়ে করে নিয়েছে। আমার পথ ক্লিয়ার…
সুখের কথার মাঝে রাদিল কল কেটে দিয়েছে। সুখ ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখে টেবিলে রেখে পড়ায় মনোযোগী হলো। যেন এই মুহূর্তে কিছুই হয়নি। অথচ রাদিল এবারও জানতে পারল না সুখের গণিত টিচার স্যার নয়, একজন ম্যাডাম ছিল।
~~
সিকদার বাড়ির পাশে লাগা জমির গর্তে মরা বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে। গ্রামবাসী সেখানে ভিড় জমিয়ে দেখছে। বাচ্চার লাশটার বয়স সাত বছর। ছেলে বাচ্চা। ইকবালের বোন হাসিনার ছোট ছেলের লাশ নূরজাহানদের বাড়ির পাশে গর্তে পাওয়া গেছে। খুব বীভৎস ছেলেটার লাশটি। চেনার উপায় নেই। সারা গায়ে এসিড দিয়ে জ্বালানো হয়েছে। ছোট বাচ্চাটার দুটো চোখ নেই। গাল দুটো ছেঁড়া। পেট ছিঁড়ে পাকস্থলীতে এসিড দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। খুবই ভয়াবহভাবে ছোট বাচ্চা ছেলেটিকে মারা হয়েছে। যেন কেউ প্রতিশোধ নিয়েছে ছোট এই ছেলেটিকে বীভৎস মৃত্যু দিয়ে। উপস্থিত গ্রামবাসীর মাঝে গুঞ্জন হচ্ছে সিকদার বাড়ির কেউ হাসিনার ছেলেকে মেরেছে। এই কথাটা হাসিনাও মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে চিৎকার করে বলছে। হাসিনার ছেলে নিখোঁজ কাল রাত থেকে। হাসিনা এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে ছেলের খোঁজ গ্রামে করেছে। গ্রামের প্রচলিত বিশ্বাসে একজন গণকের কাছেও গিয়েছে, গণক বলেছে হাসিনার ছেলেকে জিনে নিয়ে গেছে; যদি জিনের মর্জি হয় তাহলে হাসিনার ছেলেকে ফেরত দিবে, আর নয়তো মেরে ফেলবে। জিনকে খুশি করতে আধমন মিষ্টিও চেয়েছে জিন কবিরাজ। হাসিনা আধমন মিষ্টি নিয়ে কবিরাজের কাছে ছিল সারাদিন। কবিরাজ বলেছিল সন্ধ্যায় আবার হাজিরা বসাবে জিনের হাসিনার ছেলের খোঁজে। এর মাঝে হাসিনার কাছে গ্রামের একজন লোক দৌড়ে এসে খবর দেয় হাসিনার ছেলের লাশ পাওয়া গেছে হাসান মেম্বারের বাড়ির পাশে।
গ্রামবাসীর সকলে ধরে নিয়েছে সিকদার বাড়ির কেউ না কেউ হাসিনার ছেলেকে মেরে এসিড দিয়ে পুড়িয়ে গর্তে ফেলেছে যাতে প্রমাণ না থাকে। হাসান, মাজিদ নিজেও উপস্থিত সকলের সঙ্গে। তবে তাঁরা নির্বাক। কারও সাথে বাকতর্কে কিংবা কারও কথার উত্তর করছে না। হাসিনা চিল্লাচিল্লি করছে। পুলিশ উপস্থিত, লাশের তদন্ত করছে। হাসিনার ছেলের লাশটা প্রথমে দেখেছে এই গ্রামের মফিজ। সে তার গরু দুটো সকালে ক্ষেতে ছেড়ে গেছিল, সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় এসেছিল গরুগুলো নিয়ে যেতে। কিন্তু গরুগুলো ঘাস খেতে খেতে সিকদার বাড়ির আঙিনায় চলে আসে। মফিজ গরু নিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে গর্তের পানিতে ভেসে থাকা হাসিনার ছেলের লাশটা। লাশ দেখে প্রথমে চিল্লাচিল্লি করে গ্রামের মানুষদের জড়ো করে। তারপর পুলিশকে খবর দেয়। কার বাচ্চা? কার বাচ্চা? করতে করতে ভিড়ের মাঝে একজন বলে, হাসিনার ছেলে কাল রাত থেকে নিখোঁজ। গ্রামবাসী হাসিনাকে সংবাদ পাঠালে হাসিনা এসে বাচ্চাটির পোড়া শরীরে পরিচিত প্যান্ট দেখে হাউমাউ চিৎকার করে বলে, “আমার ছেলে গো, আমার বাপধন ওহ, আমার বাপধনরে ওরা মাইরা লাইছে গো, মাইরা লাইছে।
পরশু দুপুরে চেয়ারম্যান গ্রেফতার হয়েছে। সিকদার বাড়ির লোকদের হেফাজতের দায়িত্ব জেলা মন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার নিয়েছে; এই মুহূর্তে গ্রামবাসী কেউ যদি সিকদার বাড়ির কারও দিকে আঙুলও তোলে তাহলে জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সবাই হাসিনার ছেলের লাশ নিয়ে কানাঘুষা করলেও প্রকাশ্যে কেউ হাসান মাজিদকে কিছু বলছে না। পুলিশ কনস্টেবল গ্রামের সবার থেকে জেরা করে লাশটা অ্যাম্বুলেন্সে উঠাল। হাসিনা রাস্তায় পড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছেলের জন্য চিৎকার করছে। পুলিশ কনস্টেবল হাসান মাজিদকেও সাইডে ডেকে নিয়ে কিছু একটা বলতে দেখা গেল, কিন্তু কী বলেছে কেউ জানে না। পুলিশের গাড়ি চলে যেতে হাসান মাজিদও বাড়ির ভিতরে চলে আসতে চাইলে হাসিনা হাউমাউ চিৎকারে হাসানকে অভিশাপ দিয়ে বলল—
“ও হাসান! ও জানোয়াররে, তুই মারছত আমার পোলারে। আমি জানি তুই আমার বাপধনে মারছত। তুই আমার বুকডা খালি করছত, তোর বুকডা আল্লাহই খালি করবরে। তোর বংশ নিবংশ হইব রে হাসান্না, তোর বংশ শেষ হইয়া যাইব। কেউ বাঁচব না, তোর ঘরে বাত্তি দেওনের মতো কেউ থাকব না। আল্লাহ তোর ঘরে ঠাডা ফেলাইব জানোয়াররে, ঠাডা ফেলাইব। আল্লাহ গো। ওহ আল্লাহ তুমি কই। আমার বাপধন কই রে। আমার বাপধন কই। তোমরা আমার বাপধনরে আইনা দেও।
হাসান মাজিদ, হাসিনার কথা উপেক্ষা করে বাড়িতে ঢুকে গেল। কাল সকালেই মারিদরা ঢাকা চলে গেছে। যাওয়ার পূর্বে মারিদ হাসানকে বলে গেছে গ্রামবাসী যে যা-ই বলুক কারও প্রতিবাদ না করতে, শুধু বিষয়টা মারিদকে ফোন করে জানিয়ে রাখতে। মাথা গরম করে কিছু করলে উনাদের বিপদ হবে। ঠান্ডা মাথায় মারিদকে জানিয়ে রাখলে মারিদ বাকিটা সামলে নিবে। সেজন্য মূলত হাসান গ্রামবাসীর কারও কথার উত্তর দেয়নি। হাসান ঘরে ঢুকতে চাইলে বারান্দায় বসা পেল তারানূরকে। তিনি পান চিবুচ্ছেন। হাসিনার চিল্লাচিল্লি রাস্তা থেকে বাড়ির ভিতরে শোনা যাচ্ছে। তারানূর হাসানকে বলল—
‘হাসিনার পোলাডা মরলো কেমনে বাপ?
হাসান তারানূরের কথার উত্তর দেয়নি। পাশ কাটিয়ে ঘরে চলে গেল। হাসানের পিছন পিছন মাজিদ এসে তারানূরের পাশে বসে চিন্তিত মুখে বলল—
“হাসিনার পোলা এমনে মরে নাই দাদী। পোলাডারে মারা হইছে। যেই বা যারা হাসিনার পোলাডারে মারছে, খুব জেদ আর ক্ষোভ লইয়া মারছে। ছোডো পোলাডারে প্রথমে কুপাইছে, হেরপর এসিড দিয়া শরীর পুড়াইয়া দিছে যাতে প্রমাণ না থাকে।
“এতো পাষাণ কামডা কেডায় করলো মাজিদ?
“কেমনে কমু দাদী কেডায় করছে। চেয়ারম্যানের পোলা গুলারেও সন্দেহ করবার পারতাছি না। মানিক হসপিটালে, আজ তিনদিন ধইরা হের জ্ঞান ফিরে নাই। মোল্লা চেয়ারম্যান জেলে। মানিকের দুই ভাই হুনছি ঢাকায় আছে, গেরামে নাই। হেগো ছাড়া গেরামে আর কাউরে তো দেহি না সন্দেহ করণের মতো।
তারানূর, মাজিদ চিন্তায় ডুবে গেল। হাসান নূরজাহানের ঘরের দরজায় টোকা দিতে নূরজাহান ভাসা-ভাসা বড় বড় চোখে হাসানের দিকে তাকাল। হাসান মেয়ের ভাসা দুচোখের দৃষ্টি দেখে ঘরে ঢোকে। নূরজাহানের ঘরের পূর্ব দিকে খোলা জানালাটা বন্ধ করতে করতে নমনীয় গলায় বলে—
“আপনের দৃষ্টি আমারে ব্যথা দেয় আম্মা।
নূরজাহান কাতর গলায় হাসানকে বলল—
“হাসিনা ফুফুর ছেলেরে কেডা মারছে আব্বা?
নূরজাহান সরাসরি প্রশ্নটা করল। চেয়ারম্যান পরিবারের কেউ এমন পরিস্থিতিতে নেই যে খুনখারাবি করবে। মারিদ হাসিনার ছেলের নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঢাকা চলে গেছে। বাকি রইল হাসান। হাসিনা নূরজাহানের সম্মান নিয়ে খেলেছে বলে হাসান হাসিনার ছেলেকে ক্ষোভ থেকে হত্যা করতে পারে—এমনটা সকলের ধারণা। নূরজাহান বাবাকে নিয়ে কী ধারণা করছে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নূরজাহানের সন্দেহী দৃষ্টি হাসানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। হাসানের হাত থেমে যায়। নূরজাহানকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে—
“আপনে কি আমারে সন্দেহ করতাছেন আম্মা?
‘ আপনি কাল সারারাত কই ছিলেন আব্বা?
হাসানের প্রশ্নে আবারও একটা পাল্টা প্রশ্ন করে নূরজাহান। হাসান শক্ত গলায় জবাব দিয়ে বলে—
‘ আমি ঘরেই আছিলাম।
‘ মিথ্যা কথা, আপনি ঘরে ছিলেন না আব্বা। কাল সারারাত আপনি বাহিরে ছিলেন। কোথায় ছিলেন আমি জানি না, তবে আপনি ভোরে বাড়িতে ফিরেছেন। আপনি সারারাত কোথায় ছিলেন আব্বা? হাসিনার ফুফুর ছেলেটা ছোট ছিল। ওর তো কোনো দোষ ছিল না। বাবা-মায়ের শাস্তি সন্তান কেন পাবে আব্বা?
হাসান হঠাৎ রাগে হেঁকে উঠে শক্ত গলায় নূরজাহানকে বলে—
‘ বাপ-মায়ের কর্মফল সন্তানেরাও ভোগ করে। পাপ বাপরেও ছাড়ে না। হাসিনার কর্মফলে হের পোলার জান গেছে। এইহানে অন্য কেউ দোষী না। অন্যের সন্তানরে লইয়া তামাশা করলে হের বিচার এমনে করে আল্লাহ।
হাসান রাগে-জিদে নূরজাহানের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হাসিনার ছেলেকে হাসান খুন করেছে কিনা জানে না, তবে হঠাৎই নূরজাহানের বুক ফেটে কান্না আসলো। তারানূর-মাজিদের কথা নূরজাহান ঘরে বসে শুনেছে। নূরজাহান জানে হাসান কাউকে খুন করার মতো পাপ করবে না। কিন্তু তারপরও আজ নূরজাহানের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেছে বাবার প্রতি। হাসান কাল সারারাত বাসায় ছিল না, হাসিনার ছেলেও কাল রাত থেকে গায়েব। হাসান আশনূরকে বলেছিল, যাঁরা উনার মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে তাদের হাসান জানে মেরে ফেলবে। সেই ক্ষোভে হয়তো হাসান হাসিনার ছোট ছেলেকে মেরেছে? আর যদি হাসান না মারে, তাহলে কে মেরেছে হাসিনার ছেলেকে? আর কারা হতে পারে এই গ্রামে এত ভয়ানক নৃশংসকারী?
~~
হাসান সিঁড়ি ঘাটে একা বসে। আকাশে চাঁদ নেই, চারপাশে অন্ধকার। চারপাশে ঝিরিঝিরি পোকার ডাক, সেই সাথে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। হারিকেন হাতে নূরজাহান পুকুর ঘাটে হাজির হলো, গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে। শাহানার আঘাত দেওয়া পাটা শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই আঘাত আবার তাজা হয়েছে সেদিনকার ঘটনায়। নূরজাহানের সুস্থ হতে সপ্তাহ দশদিন লাগবে। গায়ের জ্বর আছে। নূরজাহান আঘাত পাওয়া পাটা টেনে হাতে হারিকেন নিয়ে হাসানের পাশাপাশি বসল। হাসান চুপচাপ বসে। নূরজাহান হাতের হারিকেনটা ফ্লোরে রেখে পা ঝুলিয়ে বসল হাসানের সঙ্গে। পাশাপাশি হাসানের কাঁধে মাথা রেখে বলল—
‘ আম্মার চাঁদ খুব পছন্দ ছিল তাই না আব্বা?
‘ না আপনের আম্মা চাঁদ পছন্দ করতো না। হের সূর্য পছন্দ আছিল।
নূরজাহান হাসলো। হাসানের মন খারাপ হলে সে পুকুর ঘাটে এসে একা বসে থাকে, কেমন একটা বাচ্চামো স্বভাব। এই স্বভাবের জন্য আয়েশার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষ হাসানকে ভালোবেসেছিল এক সময়। হাসানকে উপর থেকে দেখতে যতটা কঠিন মনে হয়, তার ভিতরটা ততটাই নরম আবরণের। হাসান শত্রুদের জন্য কঠিন যমরাজ কিন্তু ভালোবাসার মানুষদের জন্য খুবই নমনীয়।
‘ আম্মার তো আপনিও পছন্দ ছিলেন আব্বা তাই না?
হাসান এবার বেশ খুশি মনে জবাব দিয়ে বলে…
“আপনের আম্মা যে কঠিন মানুষ আছিল, হের চোখের দিকে চাইতে আমার ডর করতো। আপনের আম্মার চোখ যেন কথা কইতে পারতো। কোনো দিন মুখ ফুইটা আমারে কই নাই হেই আমারে পছন্দ করে। আমিই হের চোখের ভাষা বুঝবার পারতাম। আপনের আম্মা কথা কম কওয়া মানুষ আছিল। হে মুখে কিচ্ছু কইত না কিন্তু কাজে বুঝবার পারতাম হেই আসলে আমারে পছন্দ করে। এক বাড়িতে থাইকা আপনের আম্মা আমারে চিঠি লেখতো। প্রথম যেদিন আপনের আম্মার চিঠি পাই, হেইদিন খুশিতে আমি সারাদিন কিচ্ছু খাইবার পারি নাই। হেরপর আমি চাতক পাখির লান আপনের আম্মার চিঠির আশায় বইসা থাকতাম। আপনার আম্মা একদিন স্কুল কইরা বাড়ি ফেরার সময় হাতে কইরা একটা বক্স লইয়া আনছিল। হেই বক্সের উপর লেখা আছিল #ডাকপ্রিয়র_চিঠি। হেরপর থেইক্কা আপনের আম্মার লগে আমার এই ডাকপ্রিয়র চিঠির বাক্সে দিয়া চিঠি আদান-প্রদান হইতো। আমি মূর্খ, পড়াশোনা কম জানা মানুষ আছিলাম, তয় চিঠি পড়ার মতোন পড়াশোনা আমার আছিল। গেরামের প্রাইমারি স্কুল পাস করাই টুকটাক লেখাপড়া জানা আছিল আমার। আপনের আম্মারে চিঠি লেখতে পারতাম কোনো রকম। আমার লগে আপনের আম্মার বিয়া হওনের সময় কোনোদিন ভাবি নাই আপনের আম্মার মতো একজন মানুষ আমারে তার স্বামী বইলা মাইনা লইব। কিন্তু হেই আমারে মাইনা লইছে, সমাজ, পরিবার, হের বন্ধুবান্ধবদের কাছেও আমারে স্বামী বইলা পরিচয় দিত, সম্মান করতো।
আমার দেহা চমৎকার নারী আছিল আপনের আম্মা। আমার আয়েশা।
নূরজাহানের মায়ের কথা বলার সময় হাসানের চোখে মুখে অদ্ভুত খুশি আর তৃপ্তির ঝলক দেখা যায়। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। সে পাশে থাকুক বা না থাকুক তার কথা আমাদের মনে আসতে মুখে অটোমেটিক হাসি চলে আসে। আমাদের মন ভালোবাসার মানুষকে স্মরণ করে অদ্ভুত শান্তি পাই। নূরজাহান হাসানের কাঁধে মাথা রেখে শান্ত স্বরে জানতে চাই…
‘আম্মার চিঠিগুলো কই আব্বা?
‘ আমি জানি না। আপনের আম্মা চিঠিসহ ডাকপ্রিয়র বক্সটা কি করছে, কই ফালাইছে আমি কিচ্ছু জানি না। হেই তো আমার লগে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, ছাইড়া যাইব না বইলাও আমারে ফালাইয়া নিজে চইল্লা গেছে।
হাসান নূরজাহান দুজনের গলা স্বর ভাঙা। চোখ ভেজা। আয়েশার স্মরণে কাঁদছে দুজন। হাসানের চোখের পানি নূরজাহানের হাতের উল্টো পিঠে পরে কয়েক ফোটা। নূরজাহান অপর হাতে স্পর্শ করে বাবার চোখের জল। ভাঙা গলায় বলে…
‘ আম্মা আপনাকে ছেড়ে যেতে চায়নি আব্বা। ওরা আম্মাকে বাঁচতে দেয়নি। আম্মার প্রতিটা চিৎকার, আর্তনাদের সাক্ষী আমি নিজে। আম্মা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। উনি আপনার অপরাধী না আব্বা।
‘ বাপ-বেটির কি কথা হচ্ছে এখানে?
হাতে টর্চ নিয়ে আলেহা পুকুর ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে। টর্চলাইটের আলোয় জ্বলে উঠল হাসান-নূরজাহানের কান্নাভেজা চোখ। দুজন কাঁদছে দুজন থেকে লুকিয়ে। আলেহার উপস্থিতিতে হাসান তাড়াহুড়ো করে দাঁড়িয়ে গেল। আলেহাকে তাড়া দিয়ে বলল—
‘ দেখ তো দেহি কান্ড, না ঘুমাইয়া হগলেই এহানে জাইগা আছত। আয় তাড়াতাড়ি আয়, মেলা রাইত হইছে ঘুমাতে আয়।
হাসান তাড়া দিয়ে চলে যায়। নূরজাহান, আলেহা দুজনই বুঝেছে হাসান নিজের চোখের পানি লুকাতে এখান থেকে পালিয়েছে। হাসান ঘরে না গিয়ে কলপাড়ের দিকে এগোল, হয়তো আয়েশার কবরে যাবে কান্না করতে। আলেহা নূরজাহানের পাশে বসতেই নূরজাহান আলেহার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরল। চোখের জল নীরবে ফেলছে। আলেহা ভারী নিশ্বাসে বলল—
“মাকে মিস করছিস?
আলেহার সামান্য কথাতে নূরজাহান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বুকফাটা আর্তনাদে বলল—
‘সেদিন একটু জন্য আমিও আম্মার মতো ধর্ষণের শিকার হইনি ফুফু। আমার বয়সই বা কত ছিল, ছয় কি সাত? আমার চোখের সামনে ওরা এগারোজন আম্মাকে ধর্ষণ করেছিল। আমার আম্মার আর্তচিৎকারের সাক্ষী আমি নিজে। সেদিন আম্মার আর্তনাদ, ছটফটানি, আর্তচিৎকার কলহ আমাকে এখনো রাতভর জাগিয়ে রাখে, ঘুমাতে দেয় না ফুফু। আমি সেদিন আম্মাকে বাঁচাতে পারিনি। আমার ব্যর্থতা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
#চলিত…..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৫