Golpo romantic golpo প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা

প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ৭


ইরিন_নাজ

পর্ব_৭

সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই নিজেকে কারোর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ পেলো তোহফা। প্রথম প্রথম ঘুমের ঘোরে মানুষটাকে আরেকটু আহ্লাদ করে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুজলো সে। কিন্তু মস্তিষ্ক সচল হতেই শিরদাঁড়া বেয়ে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে কারোর বুকে, তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ! তাই তো! চমকে একই অবস্থায় থেকে মাথা উঁচু করল তোহফা। নিজের এত কাছে, দেহের সংস্পর্শে আরসালানকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকাল। পরোক্ষনেই রুম কাঁপিয়ে দিলো এক চিৎকার। ছিটকে দূরে সরে যাওয়ার প্রয়াস করল। কিন্তু আরসালানের পেশিবহুল হাত কোমর জড়িয়ে আছে বিধায় সরতে পারল না সে। কেবল রাগে ফুসতে লাগল।

তোহফার হঠাৎ চিৎকারে এবং মোচড়ামোচড়িতে ঘুম ভাঙল আরসালানের। বিরক্ত হলো বড্ড। ভ্রু কুঁচকে ঘুম জড়ানো চোখে তোহফার মুখপানে তাকিয়ে ওকে ফুসতে দেখে যেনো সহজেই কাহিনী কি ঘটেছে বুঝে ফেলল। তোহফাও আরসালানকে জাগতে দেখে আরও ক্ষেপে উঠল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফুসতে ফুসতে আরসালানের কলার চেপে ধরে বলল,

“বলেছিলাম না লাইন ক্রস না করতে। অথচ আপনি, আপনি লাইন ক্রস করেছেন। আবার আমাকে এভাবে, এভাবে স্পর্শ করছেন। লম্পট, অসভ্য, লুচু লোক একটা…”

আরসালানের মেজাজ টা বিগড়ানোর জন্য তোহফার উচ্চারিত লাস্ট কয়েকটি শব্দই যেনো যথেষ্ট ছিল। ওর বলা ওই শব্দগুলো মুহূর্তেই মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলো তার। সে এক ঝটকায় তোহফাকে উল্টো ঘুরিয়ে বিছানার সাথে চেপে ধরল। আঙুলের শক্ত চাপ পড়ল তোহফার কোমল কোমরে। মুখটা নিয়ে আসলো তোহফার মুখের খুব কাছে। এতটাই কাছে যে দুজনের নাক ছুঁই ছুঁই।

আরসালানের রক্তিম চোখ, শক্ত মুখ দেখে তোহফার রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ভয়ে ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। কোমরের দিকটায় চাপ বাড়তেই ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল সে। আরসালানের কাছ থেকে দূরে সরার জন্য ছটফট করতে লাগল। সেটা না পেরে আরসালানের বুকে ধাক্কা দিতে দিতে ছলছল চোখে তাকিয়ে কম্পিত স্বরে বলল,

“কি, কি করছেন? ছাড়ুন আমাকে। দূরে, দূরে সরুন।”

আরসালান তোহফাকে ছাড়ল না। উল্টো ওর হাত দুটো নিজের এক হাতের মাঝে আবদ্ধ করল। সেটা মাথার উপর টেনে চেপে ধরল বিছানার সাথে। ওর কানের কাছে শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,

“কি করছি জানতে চাইলে না! যেটা রাতে করি নি, সেটাই করছি। একটু আগে বললে না আমি লম্পট, অসভ্য! তো লম্পট, অসভ্যের মতো কাজ না করে কিভাবে ছেড়ে দেই, হু!”

কথাগুলো বলে আরসালান আরও ঘনিষ্ট হলো তোহফার সাথে। নাক স্পর্শ করল তোহফার গলার কাছটায়। আরসালানের কথায়, কাজে, সব মিলিয়ে আর টিকতে পারল না তোহফা। ভয়ে, আতঙ্কে ঠোঁট উল্টে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। থামল আরসালান। শক্ত চোখে তাকাল তোহফার মুখপানে। তোহফাও ভেজা চোখে তাকাল। চোখেচোখি হলো দুজনার। আরসালান একবার কঠিন দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করে চোখ ফিরিয়ে নিলো। ছেড়ে দিলো তোহফার হাত। বিছানা ছেড়ে গটগট পায়ে চলে গেল ওয়াশরুমে।

আরসালান দৃষ্টি সীমানার বাহিরে যেতেই উঠে বসল তোহফা। নিজের দুহাত ডলতে ডলতে ফুঁপিয়ে উঠল সে। ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা ফাঁকা গালি ছুড়ল। কিন্তু বিছানার দিকে খেয়াল করতেই চক্ষু চরকগাছ হলো তার। কান্না আটকে গেল। বুঝতে আর বাকি রইল না আরসালানের রাগের কারণ। আরসালান নয়, বরং সেই লাইন ক্রস করেছে। নিজের জায়গা ছেড়ে এসে আরসালানের জায়গা দখল করেছে। সারারাত জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে। লোকটার যে মেজাজ! তাকে যে লাথি দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দেয় নি, এই তো বেশি। আবার তাকেই কিনা উল্টো সে লম্পট, অসভ্য, লুচু লোক বলেছে! আসলে সে নিজেই হচ্ছে এসবের ফিমেল ভার্সন। ছিঃ!

তোহফা একবার ভাবলো সরি বলবে। কিন্তু পরোক্ষনেই মুখ বাঁকা করল সে। হাত ডলতে ডলতে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“উনি যে আমার সাথে এমন করলেন! আরেকটু হলে হাতটা আমার ভেঙেই যেতো বোধহয়। কিসের সরি! বলব না, হুহ। রাক্ষস, জল্লাদ পুরুষ একটা।”

কথাগুলো বলতে বলতেই কোমরের কাছটা চিনচিন করে উঠল তোহফার। শার্ট একটু সরাতেই সে দেখতে পেলো জায়গাটা লাল হয়ে আছে। তোহফার মনে পড়ে গেল কিছুক্ষন আগের মুহূর্ত। আরসালানের স্পর্শ, কথাগুলো। লজ্জায়, ব্যথায় মুখ কুঁচকালো সে। সরি বলবেই না সে ওই লোককে। কিছুতেই না।

তোহফার ভাবনা চিন্তার মাঝে ফ্রেশ হয়ে বের হলো আরসালান। কিন্তু একবারের জন্যও তোহফার দিকে তাকাল সে। কাবার্ড থেকে কি কি যেনো নিয়ে চুপচাপ রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কপাল কুঁচকালো তোহফা। লোকটা কি বেশি রাগ করল! ভাবল সে। কিন্তু পরমুহূর্তেই এই চিন্তাটাকে উড়িয়ে দিলো। রাগ করলে করুক। তার কি!


ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছে তোহফা। চিন্তায় দাঁত দিয়ে নখ কামড়াচ্ছে। তার চিন্তার কারণ হলো পোশাকের অভাব। পোশাকের অভাবে বাহিরে যেতে পারছে না সে। এভাবে তো আর বাহিরে যাওয়া যায় না! আবার আরসালানও এখনো রুমে আসে নি। আসবেও কিনা, কে জানে! রাগ করে নাও তো আসতে পারে! কি দরকার ছিল তার সিচুয়েশন না বুঝে বাজে বকার! এখন কি করবে সে! কাকে বলবে তার দুঃখের কথা! ভেবেই কান্না পেলো তোহফার।

দরজা খোলার শব্দে নড়েচড়ে বসল তোহফা। ভাবল আরসালান এসেছে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করে রুমে আসলেন মিসেস তাবাস্সুম। উনার হাতে খাবারের প্লেট এবং শাড়ি সম্ভবত। উনাকে দেখে অপ্রস্তুত হলো তোহফা। কারণ এই মুহূর্তে সে আরসালানের জামাকাপড় পড়ে পাগল-ছাগলের মতো বসে আছে।

মিসেস তাবাস্সুম মিষ্টি হেসে বসলেন তোহফার পাশে। মাথায় হাত বুলিয়ে শুধালেন,

“কেমন আছো, মা?”

“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি মামনি।”

লজ্জায় নিজেকে সামান্য গুটিয়ে জবাব দিলো তোহফা। মিসেস তাবাস্সুমের সাথে ভালো সম্পর্ক তোহফার এবং সেটা ছোটকাল থেকেই। ভদ্রমহিলা নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করে তাকে। আর সেও মামনি ডাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে অস্বস্তি হচ্ছে তোহফার এভাবে উনার সামনে বসে থাকতে। আরও একটা কারণ হলো সে হুট করে বাবা-মায়ের উপর জিদ দেখিয়ে এবাড়িতে এসে উঠেছে। না জানি কি ভাবছেন উনি!

তোহফার মনোভাব যেনো বুঝতে পারলেন মিসেস তাবাস্সুম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে উঠলেন,

“দেখেছো আমার ছেলের কান্ড! তোমাকে নিয়ে এসেছে, অথচ আমাকে রাতে জানায় নি। এখন জানালো। রাতে বলা উচিত ছিল না বলো! দেখি হা করো তো দেখি, মা। আমার মেয়েটার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই!”

বলতে বলতে খাবার তোহফার মুখের সামনে ধরলেন মিসেস তাবাস্সুম। তোহফা চুপচাপ হা করল। কিন্তু মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। চোখের কোণে পানি জমলো তার, যা সে অতি সাবধানতার সাথে মুছে ফেলল। মিসেস তাবাস্সুম টুকটাক এটা সেটা বলতে বলতে সম্পূর্ণ খাবার খাইয়ে দিলেন তোহফাকে। অতঃপর হাত ধুয়ে প্লেট পাশে রেখে মুখোমুখি হলেন তোহফার। ওর হাত দুটো নিজের হাতের মাঝে নিয়ে অনুতপ্ত কণ্ঠে বললেন,

“গতকাল যা হয়েছে, তা আসলেই ঠিক হয় নি মা। আমাদেরই ভুল হয়েছে। এত দ্রুত, ওভাবে বিয়ের ব্যাপারটা এগোনো ঠিক হয় নি। আমাদের উচিত ছিল আরও সময় নিয়ে সবটা করা। কিন্তু হুট করে তোমার উপর একটা ডিসিশন চাপানো হয়ে গেছে। এতে আসলে ভাই-ভাবীর তুলনায় আমাদের দোষটাই বেশি ছিল। আমরা বেশিই প্রেশার দিয়ে ফেলেছি। আমরা সত্যিই দুঃখিত।”

মিসেস তাবাস্সুমের কথাগুলো শুনে তোহফার মনটা পুনরায় বিষিয়ে উঠল। মিসেস তাবাস্সুম যতই বলুক, তোহফার মনে হয় এসবে তার বাবা-মায়ের দোষটাই বেশি। উনারা চাইলেই তো ব্যাপারটা অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে পারতেন। অন্তত একটু সময় চাইতেই পারতেন। তোহফা জানে উনারা তোহফার ভালোই চেয়েছেন, চান। কিন্তু এভাবে নিজেদের ইচ্ছা তার উপর, তাও হুট করে না চাপিয়ে সময় নিয়ে উনারা পারতেন তাকে বুঝাতে। হয়তো তোহফা বুঝতো, নিজের ইচ্ছাতেই বিয়েটা করতো। আবার হয়তো করতো না। সেটাও উনাদের মেনে নেয়া উচিত ছিল। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কেনো প্রাধান্য দেয়া হলো না! সে কি এতটাই তুচ্ছ! তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কি কোনো দাম নেই! অন্তত সে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে কখনো এমন আচরণ আশা করে নি। আর এটার জন্য সে এত জলদি বাবা-মাকে মাফ করবে না। উনারাও বুঝুক তার ঠিক কেমন অনুভূতি হয়েছিল।

সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তোহফা। মিসেস তাবাস্সুমের পানে তাকিয়ে বিষণ্ণ স্বরে বলল,

“আমার সাথে যা হয়েছে, ঠিক একই জিনিসটাই তো উনার সাথেও হয়েছে। উনি, উনি তো আমাকে একটুও পছন্দ করেন না। নিজের অযোগ্য মনে করেন। অথচ আমার সাথেই কিনা তোমরা উনার লাইফটা জড়িয়ে দিয়েছো। এই সম্পর্ক আদোও কোনোদিন স্বাভাবিক হবে?”

মিসেস তাবাস্সুম কিছু একটা ভেবে মনে মনে সামান্য হাসলেন। তোহফার গাল হালকা টেনে দিয়ে বললেন,

“সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে, মা। এখন আসো তো দেখি এই শাড়িটা পড়িয়ে দেই। আপাতত তোমার মামনির শাড়িই পড়ো। লাঞ্চের পর আমরা শপিং করতে যাব। ঠিক আছে?”

তোহফা সামান্য হেসে মাথা ঝাকাল। মিসেস তাবাস্সুমও আর কথা না বাড়িয়ে সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দিলেন তোহফাকে। অতঃপর মুগ্ধ হয়ে ‘মা শা আল্লাহ’ বললেন বেশ কয়েকবার। প্রশংসা পেয়ে লজ্জায় লাল হলো তোহফা। যা দেখে হেসে ফেললেন উনি। রুম ছেড়ে বেরোনোর আগে তোহফার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,

“আমার মেয়েটা…”

চলবে,

(রেসপন্স করবেন ভাইসব। পড়ে ইগনোর করবেন না দয়া করে। আর রিচেক দেয়া হয় নি। তাই ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।)

পেজ লিংক :
https://www.facebook.com/profile.php?id=100084228455276

গ্রুপ লিংক:
https://www.facebook.com/groups/793917018458290/?ref=share

আইডি লিংক:
https://www.facebook.com/profile.php?id=100078880801895

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply