আদিল মির্জা’স বিলাভড— ৩৯
‘খুঁজতেসেন কারে কন তো? আপনারে কাইল রাইত থেইকা ইহানে ঘুরতে দেখতাছি।’
মুরব্বির ওমন সন্দিহান প্রশ্নে জিহাদ চমকে ওঠে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চেয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে –
‘কাউকে না, চাচা। আশপাশটা দেখছিলাম। গ্রামটা ভীষণ সুন্দর! চাচার দোকানের বয়স কতো? মনে তো হচ্ছে অনেক বছরের!’
‘তা ত মেলা বছরের। যুবক থাকতে দিসিলাম। তা আপনারে তো আগে দেখি নাই কহনো। মনে তো হইতেসে না এহানকার আফনে। থাকেন কই?’
জিহাদ চায়ের টাকা মিটিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওয়ালেট পেছন পকেটে ভরতে ভরতে সামনে যতটুকু পর্যন্ত চোখ যায়, তাকায়। নদীটা ঘেঁষেই তো জমিদার বাড়ি! সম্ভবত একটু দেখা যাচ্ছে! নাকি? জিহাদের সাহস হলো না এগিয়ে যাওয়ার। হালকা হেসে বলে –
‘ঢাকা। এদিকটা দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আজকের দিনটা কাটিয়ে যাই। আমার আবার গ্রাম ঘুরতে ভালো লাগে। বলতে পারেন ভ্রমণ পিপাসু লোক আমি।’
দোকানটা গ্রামের প্রবেশ পথে। দোকানদার – কাশেম একজন বৃদ্ধা লোক। বয়স আনুমানিক ষাটের ওপর। মানুষ চিনতে তিনি ভুল করেন না। শহুরে এই ছেলের হাবভাব তার ভালো লাগল না। তার কপালের ভাঁজ গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ। সন্দেহ দৃঢ় হচ্ছে আরও। মুখ খুলে জিজ্ঞাসাবাদ চালাতে চায় তবে সেসুযোগ দিলো না জিহাদ। পাশে দাঁড় করানো বাইকে চড়ে বেরিয়ে গেলো সীমানা ছেড়ে। তার এতো তাড়া দেখে কাশেমের সন্দেহ পাকাপোক্ত হলো। লুঙ্গির কুঁচিতে বাঁধা মুঠোফোনটা বের করে কল করল কাউকে।
—
শান্তর গম্ভীরমুখ দেখে জব্বার শিকদার হাহাকার করে উঠলেন। নিজের কপাল নিজেই চাপড়াতে চাপড়াতে বসে পড়লেন চেয়ারে। মাথায় তার তার। এই কী সর্বনাশ করে বসে আছেন! গতকাল কেনো আজ সকাল বেলাতেও যদি ছেলেকে পরিয়ে একটাবার দেখে নিতেন.. তবে কিছু একটা করা যেতো! এখন? নাসির শিকদার ধমকে উঠলেন –
‘কইছিলাম ওরে জিগাইয়া ল। এহন দেখ! গতবছরের মাপ কি এই বছরে হইব? এতটুকুর বুঝ নাই তোর?’
শান্ত বুক ভরে দম ছাড়ল। চওড়া কাঁধে আটকে যাওয়া শেরওয়ানিটা একটানে খুলে ছুঁড়ে মারল বিছানায়। গায়ে সাদা শার্ট চাপিয়ে দায়ছাড়া ভাবে বলল –
‘যা হইসে, হইসে। থামো! এখন কি আহাজারি করলে শেরওয়ানি ফুলে বড়ো হয়ে ঢুকে যাবে শরীরে? তাইলে করতে থাকো। আমি অপেক্ষা করতাসি।’
জব্বার সাহেব আর্তনাদ করেই গেলেন, ‘আব্বা, কী পরবি তাইলে? আমি মুবিনরে পাঠাই বাজারে। তাড়াতাড়ি একখান পাঞ্জাবি আনুক। সময় আছে এহনো।’
শান্ত দু-আঙুল দিয়ে কপাল ঘষল! মাথার ভেতরটা দপদপ করছে। কাজি আসছে, লোকজন বসে আছে। আর এখন নাকি যাবে পাঞ্জাবি কিনতে? আরও কতক্ষণ লাগাবে কে জানে! আদিল মির্জার চোখমুখের কথা ভেবে শান্ত আর সময় নষ্ট করতে চায় না। এমন শেষ মুহূর্তে যদি বস চলে যেতে চায়? বস যে এখনো আছে এইতো তার কল্পনার বাইরে! কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সে থমথমে মুখে বলল –
‘বস ঢাকা ফিরবেন আজই। বিয়েটা সেরে বেরুব। হাতে সময় নাই। ঝামেলায় যাওয়া লাগব না। চলো!’
নাসির সাহেব আঁতকে ওঠেন। বলতে চাইলেন, ‘কী পইরা যাইবা তাইলে বাপ?’
অথচ তার প্রশ্নের আগেই শান্ত সফেদ লুঙ্গিটার গিঁট বাঁধল কোমরে। এলোমেলো চুল নিয়েই তাকে বেরুতে দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠেন জব্বার সাহেব।
‘বাজান, বাজান রে…এইগুলা কি পইরা বাইরেতছস? আয়হায়! ভাইজান দেহেন, দেহেন পোলার কাণ্ডকারখানা! পাজামা-পাঞ্জাবি তো আছে, যা আছে তাই পর নাইলে।’
শান্ত ইতোমধ্যে বেরিয়েছে। নাসির সাহেব ছুটলেন ভাইপোর পেছনে –
‘হ্যাঁ রে, লুঙ্গি পরে বিয়ে করে ক্যাডা? মানষে কইব কী? পাগল হইছস! পাঞ্জাবি না পরলেও লুঙ্গিটা খুলে একটা প্যান্ট পর অন্তত! নাইলে তুই যেই স্যোট পরস প্রত্যেকদিন, ওডা পর।’
‘ওটা স্যুট আমার চাচাজান। আর লুঙ্গিতে সমস্যাটা কী?’
শান্ত থামল হঠাৎ। ভ্রু দুলিয়ে হেসে বুকটা ফুলিয়ে বলে উঠল –
‘আমি…শান্ত শিকদার। এইবার আমারে দেইখা বলো, সাদা লুঙ্গির সাথে সাদা শার্ট ঠিকাছে নাকি অন্য রঙের শার্ট পরমু?’
আয়েশা বেগম ট্রে নিয়ে এদিকেই আসছেন। ছেলেকে এ-অবস্থায় দেখে চোখজোড়া তার ছানাবড়া প্রায়! হতভম্ব হয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন –
‘তুই এখনো কি পইরা আছস?’
শান্ত এসে সামনে দাঁড়িয়ে ইশারায় বোঝাল খাওয়াতে। আয়েশা বেগম আগে মিষ্টি খাওয়ালেন ছেলেকে। শান্ত মাথা নোয়াতেই, মাথা বুলিয়ে দোয়া পড়ে ফু দিয়ে তাড়া দিলেন –
‘তাড়াতাড়ি রেডি হ। তোর উকিল মামা আইসা পড়ব। তোর কাজী চাচা বইসা আছে।’
জব্বার সাহেব হাহাকার করেন, ‘তোমার পোলা নাকি এম্নে বিয়ে করব! এই জ্বালা কি ভালো লাগে?’
আয়েশা বেগম কিছু বলতেও পারেন না। শান্ত বেরিয়ে এসেছে। প্রাঙ্গনে নামতেই হৈচৈ পড়ে গেলো। কেউই বিশ্বাস করল না সে এভাবে বিয়ে করতে এসেছে। শান্ত গিয়ে বসল চেয়ারে। তাড়া দিলো –
‘কই, বউ কই আমার? ওটারে আনো। তাড়া আছে।’
অদূর থেকে ভেসে এলো পুরুষালী গম্ভীর, রুক্ষ কণ্ঠের প্রশ্নটুকু। যা শোনা মাত্র শান্ত দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুটা নড়েচড়ে ওঠেন নাসির শিকদার।
‘এতো তাড়া কীসের?’
অতিথি ভরতি জায়গাটা মুহূর্তে বডিগার্ড দিয়ে ভরে গেলো। আদিল এগিয়ে আসছে। পরনে বেইজ রঙের স্যুট। সাদা শার্টের ওপরে বেইজ রঙের ভেস্ট। ভেস্টের নিচে বেইজ রঙের টাই। বেইজ রঙের কোট-টা পেছনে থাকা এলেনের হাতে। শুভ্র রঙা জুতো গুলোর একেকটা কদম বাড়াতেই সোফাটা ফাঁকা করে দিলেন জব্বার সাহেব। আদিল এসে বসল সোজা। শান্তকে ওমন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতের ইশারায় বোঝাল বসতে। শান্ত ধপ করে বসল। আদিল ঘড়ি দেখে আওড়াল –
‘কতক্ষণ লাগবে? বিয়েটা শেষ করে বেরোব। তুই থাকিস, কিছুদিন লিভ নে। ইটস ওকে।’
শান্ত মাথা নাড়িয়ে দ্রুতো বলল, ‘বস, ঝুমুরকে নিয়ে আজই ঢাকা ফিরব। আমার বলা আছে।’
আদিল ইশারা করতেই এলেন ছোটো ব্রিফকেসটা নিয়ে এগুল শান্তর দিকে। ওর কোলে দিয়ে চোখ টিপ মারল লুকিয়ে। শান্ত ব্রিফকেস খুলে দেখল দলীলের কাগজপত্র, চাবি সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র। থতমত খাওয়া মুখে তাকাল বসের দিকে। আদিল বলল –
‘আ ওয়েডিং গিফট ফর ইউ। তোর পছন্দের ফ্ল্যাটটা রেডি। ফিরেই উঠতে পারবি।’
শান্তর ঠোঁট নড়ে। গলা পাকানো অনুভূতিটা গিলতে সময় লাগল। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে দৃষ্টি নামিয়ে রাখল। অবশেষে আস্তে করে বলল –
‘থেংকিউ বস।’
প্রত্যুত্তরে আদিলের ভাসা ‘হুমম’ শোনা গেলো। শান্ত ব্রিফকেস কোলে চুপচাপ বসে আছে। এলেন কতক্ষণ ওকে দেখে কুঁইকুঁই করল। শান্তর ওমন ইমোশনাল মুখটা বিষ লাগল তার কাছে। বস সম্পর্কিত ব্যাপারে এই ছেলে পারে না ভ্যাঁভ্যাঁ করে কাঁদতে! ষ্টুপিড একটা! ও ভীষণ সন্তর্পণে বার কয়েক তাকাল আদিলের দিকে। দৃষ্টি অনুভব করে আদিল ভ্রু তুলতেই এলেন চোখের পাপড়ি ঝাপটে ঝাপটে কিছু বোঝাল। আদিল বুঝল বোধহয়। অনুমতিও বুঝি দিলো। এলেন চওড়া গলায় আদেশ করল –
‘অ্যাই ডিজে, লাগাও গান।’
নিরিবিলি পরিবেশ ভাঙল গানের আওয়াজে। সম্ভবত ওদের মধ্যে আগেই একদফা আলাপ হয়েছে। নাহলে এতোটা সামঞ্জস্যতা কীভাবে এলো? এইযে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে একগাদা বডিগার্ডস। তাদেরসরিয়ে পেছন থেকে ড্রামাটিক ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো এলেন। পরনে সেই বডিগার্ডের কালো থ্রিপিস স্যুট। এখন মাথায় একটা লাল ওড়না আছে। ওটাকে গায়ে পেঁচিয়ে নিতে নিতে চেয়ারে বসা শান্তর দিকে ভীষণ আবেদনময়ী ভঙ্গিতে এগুচ্ছে। মিউজিক বক্সে বাজা গানের সুরে সুর মেলাল ও –
‘গোলাপী চোখে জাদু,
আকাশী গাল আমার…
অলরেডি বসে আছি, হবো রানি তোমার।’
শান্ত কঠিনভাবে ভড়কাল। তড়াক করে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আতঙ্কে বাকরুদ্ধ, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুউউল্লাহ। বস বস!’
এলেনের পাশাপাশি রাদিন, স্বপণ সহ আরও কয়েকজন হাজির। ওরা হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল –
‘আরে আয় না হ্যান্ডসাম…
প্রেমের এনথাম…দেখলে বাজে মনে,
তোকে নিয়ে পালাতে চাই আঁধার কোনো বনে।’
শান্ত ভীষণ নাটকীয় ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠল, ‘নাউজুবিল্লাহ্! নাউজুবিল্লাহ্! বওওওওস!’
অথচ কর্মকাণ্ড ভিন্ন। ও লুঙ্গি তুলে এগিয়ে এসেছে। পরের লাইনটুকু ও গাইতে গাইতে ওদের সাথে উড়োধুড়ো নাচল –
‘ও আমার বিলেত রাজা, প্রেমেরই ডালা সাজা…
কাছে আয় খেলবো আজ তোর মনেরই… মাঠে প্রেমের কুত কুত কুত,
কী নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে, মাইনাসে না পেলাসে…’
নাসির শিকদার সহ – তারা ভাইয়েরা হেসে কুটিকুটি। জব্বার শিকদার তো নিজের ফোনে ভিডিও করলেন পুরো ব্যাপারটা। সাথে কয়েকজন এসে যোগ হয়েছে নাচগানে। প্রাঙ্গণ জুড়ে তখন এলাহি কাণ্ড। গান থামতেই শান্ত নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। এলোমেলো লুঙ্গিটা ভালোভাবে সামলে গিয়ে বসল ফের। ওপাশ থেকে গুঞ্জন ভেসে আসছে। কনের লোকজন আসছে, বোঝা গেলো। ঝুমুর এসে পৌঁছাতেই বিয়ে পরানো শুরু হলো।
.
ঘরের আলো নিভুনিভু। বিছানার এককোণে বসে আছেন জাহানারা বেগম। তার সামনে রোযা। আলতোভাবে ধরলেন রোযার সুন্দর হাত দুটো। মুঠোয় নিয়ে ডাকলেন –
‘নাতবউ!’
রোযা সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘দাদিমা…’
জাহানারা বেগমের চোখজোড়া ভিজে এলো হঠাৎ। চমকাল রোযা! কী বলবে বা করবে বুঝতে পারল না! ওর অসহায় চোখমুখ দেখে অল্প হাসেন বৃদ্ধা। সময় নিয়ে বলেন –
‘ভাবছিলাম হয়তো আরও একটাদিন অন্তত থাকবা। তা আর সম্ভইব না। শান্ত কইল আজই রওনা দিবা। তোমাগোরে আমি মনে করমু অনেক।’
রোযার ভীষণ খারাপ লাগল। দুদিনের পরিচয়ে বুঝি মানুষ এতোটা আপন হয়? হয়তো! জাহানারা বেগম বলে গেলেন –
‘নাতবউ, আমার নাতিডা…’
গলাটা বসে গেলো জাহানারা বেগমের। কিছু সম্পর্কের নাম থাকে না। ভালোবাসার কারণও বোধহয় থাকে না। তিনি না দেখে, না চিনে..সবসময় আদিল মির্জা নামক ছেলেটাকে নাতিই ভেবে রেখেছেন। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। তিনি দিতে পারবেন না। শুধু জানেন, তিনি ভালো চান। তিনি চান নাতি তার সুখে থাকুক। ভালোবাসায় ভরে উঠুক জীবন। তিনি নিজেকে সামলে ধীরে বলে গেলেন –
‘আমি জানি নাতবউ, তোমার সাথে যা হইছে তা ভালো হয় নাই। উচিত করে নাই আদিল। জোর করে সংসার হয় না, ভালোবাসা পাওয়া যায় না। কিন্তু নাতবউ…’
রোযা চমকে তাকাতেই জাহানারা বেগম চোখে চোখ রেখে বললেন –
‘সামর্থ্য থাকলে কি কেউ নিজের ভালোবাসা ছাইড়া দেয়?’
রোযার ভেতরটা ধক করে উঠল। কাঁপল চোখের পাপড়ি। জাহানারা বেগম বলে গেলেন –
‘বুঝদার মাইয়া তুমি। সবইতো বোঝো, জানো।’
রোযা থমকে থাকল। জাহানারা বেগম ছলছল চোখে চেয়ে বলে চললেন –
‘যে তোমারে কই রাখব বুঝে পায় না…মাথার মুকুট কইরা নাকি বুকের পিঞ্জরে বন্দী কইরা…তারে ভালো না বাসলেও করুণা কইরো। ছাইড়া যাইও না।’
রোযার ঠোঁট নড়ল। আড়াল করল দৃষ্টি। জাহানারা বেগম দম নিয়ে বলেন ফের –
‘আমি বড়ো স্বার্থপর নাতবউ। নাতির লইজ্ঞাই চাইতেসি, এই বুড়ির একটাই চাওয়া।…তোমারে সে মেলা চায়। পাশে থাইকো। এই জীবনের লাইগা থাইকা যাইও তার হইয়া।’
রোযা একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। বুকের ভেতরটা এমন বাজেভাবে মুষড়ে গেলো যে ওর দমবন্ধ হয়ে এলো। কেনো এতো দমবন্ধ লাগল ও জানে না। হৃদির কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। তাকে খুঁজছে, ডাকছে। জাহানারা বেগম চোখ মুছলেন। হেসে গলা তুলে ডাকেন –
‘এইদিকে আহো বড়ো মা। এইদিকে!’
হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রবেশ করল, ‘মম, মম…উইল বি গোয়িং ব্যাক।’
ধেয়ে আসা শরীরটা বুকে নিলো রোযা। নিজেকে স্বাভাবিক রাখল। আওড়াল, ‘হুম।’
পরপর হৃদিকে ঠেলে দিলো জাহানারা বেগমের দিকে। জাহানারা বেগম হৃদির মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ালেন। খুব কাছ থেকে দেখলেন চোখজোড়া, মুখখানা। কতো মিল! কতো! খোদাতায়ালার কী চমৎকার সৃষ্টি! হৃদি হেসে বলল –
‘বড়ো মা, ঢাকা আসবে ওকে?’
হাসলেন জাহানারা বেগম। বললেন, ‘গেলে আবার ভাইগাইয়া দিবা না তো এই বুড়িরে?’
হৃদি তাকাল মায়ের মুখে। থেমে থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘ভ্যাগায়া? হোয়াট ডাজ্ দ্যাট মিন, মম?’
‘ইট মিনস, তাড়িয়ে দিবে না তো তোমার বড়ো মাকে?’
হৃদি ফিরে তাকাল জাহানারা বেগমের দিকে। হাত ছুঁয়ে দ্রুতো বলল –
‘নো বড়ো মা। উই হ্যাভ্ আ বিগ হাউজ। তুমি থাকতে পারবে অ্যাজ লং অ্যাজ ইউ ওয়ান্ট। রাইট মম?’
‘রাইট।’
জাহানারা বেগম কী বুঝলেন কে জানে! হৃদির গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলেন, ‘যামু, ইনশাআল্লাহ্।’
বলতে বলতে ভদ্রলোক পেছনে চেয়ে আশ্চর্য হয়ে ডাকেন –
‘কীরে, তুই এহানে?’
কাজল খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও আস্তে করে বলল, ‘দেহা করতে আইলাম। তারা নাকি আইজ ফিরা যাইব?’
জাহানারা বেগম তপ্ত শ্বাস ফেলে মাথা দোলালেন। রোযা আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে। সে খেয়াল করেছে, এই মেয়েটার অদ্ভুৎ আচরণ। সবসময়ই কেমন ভাবে যেন তাকে দেখতো, এড়াতো। দৃষ্টিতে কী হিংসে দেখছে ঠিকঠাক? নাকি অন্যকিছু? রোযা অবশ্য এতকিছু ভাবল না। হৃদিকে জাহানারা বেগমের কাছে রেখে উঠে দাঁড়াল। কাজলকে ডেঙে বেরুবে তখুনি মেয়েটা ফিসফিস করে আওড়ায় –
‘আপনার লগে আমার একটু কথা ছিলো। শুনবেন?’
রোযার কপালে ভাঁজ পড়ে কয়েক। বলে, ‘এখানেই বলুন! কী ব্যাপার?’
‘ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। একলা কইতে চাইতেসিলাম।’
রোযা অনাগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটার সাথে বেরোয়। কাজল আগে আগে হাঁটছে। আশেপাশে তাকাচ্ছে বারে বারে। যাচ্ছে সেই পেছনের বারান্দার দিকে। যেখান দিয়ে জঙ্গলে যাওয়া যায়। অথচ রোযা মোটেও ওদিকে যাবে না। বারান্দায় পৌঁছে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। বুকে দু-হাত ভাঁজ করে বলল –
‘এবার বলুন।’
কাজল দেখাল জঙ্গলটা। বলল, ‘আর একটু ওদিকে…’
রোযা ভ্রু তুলে স্পষ্ট করে প্রশ্ন করে গেলো –
‘কী করতে চাইছেন ঠিক? ওখানে নিয়ে আমাকে গুম করতে চাচ্ছেন বুঝি? নাকি ক্ষ তি? আপনার কী অবস্থা হতে পারে আইডিয়া আছে? ভেবেছেন? শান্তর কাজিন দেখে কিন্তু ছাড় পাবেন না। হি’জ ক্রেজি। মে রে ফেলবে আপনাকে!’
কাজল ঢোক গেলে। শাড়ির আঁচলে ঢাকা হাত দুটো থরথর করে কাঁপে। গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। বাড়ে বুকের ওঠানামার গতি। ধড়ফড় করছে হৃৎপিণ্ড। যতটুকু সাহস জুগিয়েছিল এইমুহূর্তে তা হাওয়ায় ভেসে গেলো। একটা মুখ চোখে ভাসতেই এযাত্রায় প্রেম, আবেগের বৌদলতে ভয় বিরাজ করল। মুখ খুলতে চাইল কিন্তু কাঁপল ঠোঁট। রোযা কদম বাড়াল ফিরবে তখুনি চোখ গেলো সামনে। চমকে উঠল ও। ভীষণ চেনাপরিচিত একজোড়া চোখ চেয়ে আছে ওর দিকে। পরনে বোরকা। মুখে নেকাব। এযাত্রায় জিহাদ নেকাবটা খুলে ডাকল –
‘রোযা!’
রোযা হতবিহ্বল। পরমুহূর্তেই তড়াক তাকাল চারিপাশে। আঁতকে উঠে বারান্দা থেকে নামতে নামতে বলল –
‘তুই কি ম রতে চাস প্রতারকের বাচ্চা? জানের ভয় নেই? এখানে কী করছিস! পালা, বাঁচতে চাইলে পালা।’
জিহাদের চোখজোড়া ছলছল করল। ও সব বাদ রেখে দ্রুতো বলে গেলো –
‘আমি প্রতারক নই রোযা। আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। সবকিছুর পেছনে ভয়ংকর একজন আছে। সব তার চাল।’
রোযা বারবার তাকাচ্ছে পেছনে। ওই কাজল নামের মেয়েটা আর নেই। রোযার হৃৎপিণ্ড খামচে ধরে কেউ! চোখ বুজে দৃঢ় গলায় বলল –
‘এখনো সময় আছে জিহাদ। পালা…যেভাবে এসেছিস বেরিয়ে যা।’
জিহাদ দু-চোখ ভরে দেখতে থাকল রোযাকে। মনে হচ্ছে শত যুগ পর দেখছে! এগুতে এগুতে পাগলের মতো বিলাপ করে গেলো –
‘রোযা..রোযা আমি প্রতারক নই। আমি কখনো তোকে ছাড়া কারও কথা ভাবতে পারি না। আম..আমি নিজের চেয়েও তোকে ভালোবাসি।’
রোযা চোখ বুঝল। পরমুহূর্তেই চমকাল জিহাদের কাণ্ডে। ও খপ করে ধরেছে হাতটা –
‘আমি কতটা পাগল তোর জন্য তা কি তোর অজানা? আমি কীভাবে এমন করতে পারি বল? আমাকে উস্কিয়েছে! তোমার থেকে আমাকে দূরে সরানোর স্বরযন্ত্র করা হয়েছে। বিশাল স্বরযন্ত্র! এই স্বরযন্ত্রের পেছনে স্বয়ং আদিল মির্জা আছে। ভাবতেও পারবে না ওই লোক..ওই লোক কতটা ডেঞ্জারাস। কতটা নিচে নেমেছে। তুমি কি জানো এই লোক….’
গু লির তীব্র শব্দ! পরমুহূর্তেই রোযার হাত ছেড়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল জিহাদ। গলগল করে র ক্ত বেরুচ্ছে পা থেকে। মুহূর্তে বডিগার্ডস দিয়ে ভরে গিয়েছে জায়গাটুকু। পি স্তল হাতে আদিলের চোখ দেখে ধক করে ওঠে রোযার বুক। আনমনা ও দু-কদম পিছিয়ে যায়। জিহাদ থামল না। গু লি খেয়েও ও বলতে চাইল –
‘রোযা এই আদিল মির্জা টা…’
ঝড়ের বেগ যেন ছুঁয়ে গেলো জিহাদকে। আদিল ওক একহাতে তুলে দেয়াল মুখ বরাবর বাড়ি খাওয়াতেই র ক্তে ভেসে গেলো পুরো দেয়াল। রোযা চিৎকার করে উঠল ওমন নৃশংস দৃশ্যে। সমানে কাঁপল ওর হাত। অথচ তারপরও ছুটে গেলো। আদিল পুনরায় ওর মাথাটা দেয়ালে বাড়ি মা রতেই রোযার মুখ নীল হয়ে গেলো। আতঙ্কে চিৎকার করে বলল –
‘মার বেন না ওকে। প্লিজ ছেড়ে দিন..ছেড়ে দিন..’
বলতে বলতে ও দৌড়ে গিয়ে টেনে ধরল আদিলের র ক্তাক্ত হাত। টেনে সরাতে চেয়ে মিনতি করল –
‘ও ম রে যাবে, ম রে যাবে। প্লিজ ছেড়ে দিন।’
জিহাদ গুঙিয়ে ওঠে, ‘রোয…’
জিহাদ পুরোপুরি ডাকতে পারে না। শক্তপোক্ত বড়ো সুবিশাল হাতটার ঘুষি পড়তেই জিহাদ ম রা মতো চুপ করে যায়। রোযার চোখ ভিজে উঠল ওমন করুণ দৃশ্যে। আর্তনাদ করে উঠল –
‘জিহাদ, জি…’
রোযা নামটা দ্বিতীয়বার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারে না। একটা হাত থাবা বসায় ওর সংবেদনশীল গলায়। আদিল গলা চেপে ধরেছে ওর। রোযার দমবন্ধ হয়ে আসে। মুখ লাল হয়ে ওঠে র ক্তশূন্যতায়। যখন ভাবল ও ম রেই যাবে, তখুনি ঢিল হয় থাবাটা। তারপরও সরেনি গ লা থেকে। রোযা প্রাণভরে দম নিলো। ছলছল চোখে তাকাতেই শ্বাস আটকাল গলায়। আদিলের মুখটা ওর খুব কাছে। র ক্তিম চোখজোড়া থেকে আগু ন বেরুচ্ছে মনে হলো। কণ্ঠ শোনালো সমুদ্রের গভীরের মতো ভয়ংকরী –
‘আরেকবার উচ্চারণ করো, আই’ল ডিস্ট্রয় এভ্রিথিং।’
রোযা তখনো দুর্বল ভাবে শ্বাস নিচ্ছে। তারপরও অনুনয় করে গেলো, টেনে ধরল গলায় থাবা বসানো আদিলের হাতটা –
‘ছেড়ে দিন। ওর একটা অনাগত সন্তান আছে। ও ওর বাবা-মায়ের একটামাত্র সন্তান। তারা বৃদ্ধ। ওকে মার বেন না প্লিজ। যেতে দিন।’
আদিল দাঁতে দাঁত পিষে তাকিয়ে থাকল। হাতটা সরাতেই দেখল ধবধবে ফর্সা গলায় পাঁচ আঙুলের ভয়ানক দাগ বসে আছে। ওই দৃশ্যে যেন কিছু আছে! আদিলের হাত কাঁপে। পরমুহূর্তেই বুকের সাথে পিষে ফেলে শরীরটা। ক্রমাগত ঠোঁট ছোঁয়ায় আঙুলের দাগ গুলোর ওপর। আদেশ ছোড়ে –
‘গাড়ি আন।’
শান্ত দাঁড়িয়ে ছিলো সামনেই। ওর গলায় তখনো বিয়ের মালা। রাদিনকে নিয়ে ছুটেছে গাড়ি ড্রাইভ করে এদিকে আনতে। রোযার মনে হচ্ছে ও চোখে সব ভাসা দেখছে। দুর্বল গলায় পুনরায় আওড়ায় –
‘আদিল, ওকে ছেড়ে দিন প্লিজ। আমার কসম লাগে, যেতে দিন।’
মুহুর্তে অবশ হয়ে আসে ওকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা শরীরটা। থমথমে নীরবতা নামে চারিপাশ জুড়ে। রোযার চোখজোড়া ততক্ষণে বুজে গিয়েছে। ওর মাথাটা হেলে পড়েছে আদিলের শক্ত, প্রসস্থ বুকের মাঝে। গাড়ির শব্দে আদিলের টনক নড়ে। কানে বেজে যায় ডাকটা –
‘আদিল, আদিল..আদিল!’
শান্ত এসে ডাকল আস্তে করে, ‘বস!’
আদিল তখুনি জবাব দেয় না। নিষ্প্রাণ মুখে চেয়ে থাকে। অনেক.. অনেকটা সময়। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে পরমুহূর্তেই ওকে পাজাকোলে তুলে নিলো। বুকের সাথে মিশিয়ে এগুলো গাড়ির দিকে। এলেন ব্যাকডোর মেলে ধরেছে। আদিল রোযাকে শুইয়ে দিলো পেছন সিটে। এলেন এগিয়ে দিলো আদিলের কোটটা। আদিল ওটা দিয়ে রোযার শরীর ঢেকে পুনরায় তাকাল মুখের দিকে। তারপর ঠোঁট! সরে এলো। জিহাদ তখনো কাতরাচ্ছে। অর্থাৎ বেঁচে আছে। আদিল এগিয়ে এলো, বসল দু-পায়ের পাতায় ভর দিয়ে। র ক্তে মাখোমাখো চোখমুখে জিহাদ তাকাতে চাইল। কিছু বলতে চাইল, পারল না। আদিলই বলল নির্বাক কণ্ঠে –
‘চরিত্রের জাস্টিফিকেশন দিতে চাচ্ছিলি? মাদারফাকার, তোকে জোরপূর্বক শোয়ানো হয়েছে নাকি জোরপূর্বক ড্রিংক করানো হয়েছিল? দ্যাট ওয়াজ ইউর চয়েজ। দিস উইল বি ইয়োর লাস্ট চ্যান্স টু লিভ। পরেরবার সোজা বুকে বু লেট ঢোকাব।’
আদিল উঠে পড়েছে। গাড়িতে ওঠার আগে বলে গেলো –
‘ওই মেয়ে তোর কাজিন। জান নিতে বলব না। গিভ হার আ টেস্ট।’
শান্ত দ্রুতো বলল, ‘যা বলবেন।’
চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৫
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩২
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩০