সাদিয়াসুলতানামনি
জাওয়াদকে পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগে আরো তিন সপ্তাহের মতো। আর এই পুরোটা সময় তারা বাপ-বেটা ইচ্ছে মতো জ্বালিয়ে মে”রেছে বেচারি পূর্ণতাকে। ডাক্তার পূর্ণতা ও জাওয়াদের পরিবারকে কড়া গলায় বলেছে, জাওয়াদের শুধু গু”লির ক্ষত শুকালেই চলবে না, বরং তাকে দেওয়া বি”ষটার প্রভাব পুরোপুরি কাটানোর জন্য তাকে নিয়মিত তিনবেলা ঔষধ খেতে হবে। একদমই মিস দেওয়া যাবে না।
বলাবাহুল্য, জাওয়াদের গু”লিতে লাগা বি”ষটা এতটাই ক্ষতিকারক ছিল যে, তাকে যদি বিষ মিনিটের মধ্যে হসপিটালাইজড না করা হতো তাহলে তার হার্ট ব্লক হয়ে সে মা”রাও যেতে পারত।
ডাক্তারের নির্দেশনাকে মাথায় রেখে জাওয়াদের পরিবার ও পূর্ণতা উঠে পড়ে লাগে তাকে সুস্থ করতে। জাওয়াদ তার মায়ের সাথে আগের মতো মুখ ফিরিয়ে না রাখলেও, এখনও তার হাতের রান্না খায় না। বরং সে এমন এক বাটপারি পন্থা অবলম্বন করেছে, যার জন্য তাদের দু’জনের সম্পর্কটা আস্তে আস্তে জোড়া লাগতে শুরু করেছে।
হসপিটাল থেকে আসার প্রথম কয়েকদিন জাওয়াদ প্রতিদিন পূর্ণতাকে ইনিয়েবিনিয়ে ডেকে নিজের বাসায় নিয়ে যেতো। পূর্ণতা যেতে না চাইলে জাওয়াদ হুমকি দিয়ে বলত, সে মেডিসিন নিবে না। আর তার এই হুমকিই পূর্ণতাকে দূর্বল করে দিত। এখন জাওয়াদের আর পূর্ণতাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আনানো লাগে না। সে প্রতিদিন বিকেলে অফিস করে জাওয়াদের পেইন্ট হাউজে চলে আসে। আর রাতের রান্না সহ পরের দিন সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার পর্যন্ত রান্না করে যায়। পূর্ণতা যেহেতু জাওয়াদের কাছে আসছেই, তাজওয়াদ তো আসবেই জানা কথা। এভাবেই তাদের সম্পর্কের ছিঁড়ে যাওয়ার দড়িটা একট একটু করে আবারও গাট পড়ছে।
অন্যান্য দিনের ন্যায় আজও পূর্ণতা অফিস করে জাওয়াদকে নিয়ে চলে এসেছে। খানিক সময় রেস্ট নিয়ে তারপর ফ্রেশ হয়ে নেয়। এরপর জাওয়াদ ও তাজওয়াদকে বিকেলের নাস্তা বানিয়ে দিয়ে সে তার রান্নার কাজে লেগে পড়ে।
পূর্ণতা যখন কাটাকুটি করতে ব্যস্ত তখন জাওয়াদ ছেলেকে টিভিতে কার্টুন ছেড়ে দিয়ে চোরের মতো পা টিপে টিপে চলে আসে পূর্ণতার কাছে কিচেনে। অফিসের ফর্মাল ড্রেস পরে রান্নাবান্না করতে কষ্ট হয় বলে, পূর্ণতা তার ব্যাগে করে একসেট বাসায় পরা সুতির থ্রি-পিস নিয়ে এসেছিল। সেটা পরেই ওড়না কাঁধের একপাশে ফেলে রাঁধছে।
রান্নাঘরের গরম পরিবেশে অনেকক্ষণ থাকার কারণে পূর্ণতা ঘেমে গিয়ে তার কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। জাওয়াদ একধ্যানে তাকিয়ে থাকে পূর্ণতার ঘর্মাক্ত মুখের পানে। সেই পাঁচ বছর পূর্বের সময়কার কথা মনে পড়ে যায় তার। সন্তান ধারণের জন্য পূর্ণতার স্বাস্থ্য একটু ভারি হলেও, এখনও সে নজরকাড়া সৌন্দর্যের অধিকারী। ছেলেটাও হয়েছে মায়ের মতোই সুন্দর। শুধু চোখ গুলো পেয়েছে তার মতো মায়াবী। যেকোন সুপুরুষই এই মা-ছেলেকে বিনা বাক্যে নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নিতে চাইবে। কিন্তু জাওয়াদ তা হতে দিলে তো….
জাওয়াদ হঠাৎই একটা বাচ্চামিপূর্ণ কাজ করে ফেলে। সে পূর্ণতার কাঁধের পাশ দিয়ে ঝুঁকে এসে তার মুখে একটা ফু দেয়। আচমকা এমন ফু আসায় পূর্ণতা হকচকিয়ে যায় এবং দূর্ভাগ্যবশত তার বাম হাতের তর্জনী আঙুলটির উপর ছু”ড়ি চলে যায়।
—”আহ্হ্…”
পূর্ণতার আর্তনাদে জাওয়াদ নিজেও ভরকে যায়। সে পূর্ণতার ব্যথায় বিকৃত করে নেওয়া মুখের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে তার হাতের দিকে তাকালে দেখতে পায়, সামান্য র”ক্ত বের হচ্ছে আঙুলটি থেকে। র”ক্তের পরিমাণ খুবই সামান্য হলেও জাওয়াদ বিচলিত হয়ে যায় পূর্ণতাকে আ”হত হতে দেখে।
—”আল্লাহ! আ’ম সরি পূর্ণ। আমি বুঝতে পারিনি এমনটা হবে…স….”
জাওয়াদের কথা শেষ হওয়ার আগেই পূর্ণতা খেঁকিয়ে ওঠে।
—”তা বুঝবেন কেন? মাথায় ব্রেন নামক বস্তুটা আছে নাকি আপনার? থাকতে তো আর আচমকা কানের কাছে এসে ফু দিতেন না….দূর হন সামনে থেকে।”
পূর্ণতা কিছুক্ষণ চিল্লিয়ে সিঙ্কের কাছে গিয়ে ট্যাব ছেড়ে হাতটা ধুয়ে নেয়। জাওয়াদ এই ফাঁকে দৌড়ে গিয়ে ফার্স্টএইড বক্স নিয়ে এসে পূর্ণতার দিকে বাড়িয়ে দেয়। পূর্ণতা মেজাজ দেখিয়ে সেটা নেয়। কাটা আঙুলটায় ছোট একটা ওয়ান টাইম লাগিয়ে পুনরায় কাজ করতে থাকে।
এদিকে জাওয়াদ অপরাধবোধে মনঃকষ্টে ভুগতে থাকে। পূর্ণতা আগের মতোই স্বাভাবিক গতিতে সবজি কেটে সেগুলো ধুতে থাকে। সে যখন নিজের কাজে ব্যস্ত তখন জাওয়াদ মলিন কণ্ঠে বলে–
—”আই এম রিয়েলি ভেরি সরি পূর্ণ। আমি তোমাকে ঘামতে দেখে ভেবেছিলাম, ফু দিলে হয়ত তোমার গরম কম লাগবে।”
পূর্ণতা হাতের কাজ থামিয়ে এমন অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকায়, যেন সামনে জাওয়াদ না কোন এলিয়েন দাড়িয়ে আছে। তার এমন রিয়াকশন দেওয়াও কোন অবান্তর কিছু নয়। কারণ জাওয়াদের ভাবনাটাই তার বয়স অনুযায়ী একট বেশিই বাচ্চামি পূর্ণ। যেখানে তার পাঁচ বছরে ছেলেই এইটুকু নলেজ রাখে যে, মায়ের গরম লাগলে হাত পাখা বা ছোট পোর্টেবল ফ্যান এনে বাতাস দিতে হবে। সেখানে তার আধবুড়ো স্বামী তাকে ফু দিয়ে গরম দূর করছে।
পূর্ণতা হতাশা মিশ্রিত একটা শ্বাস ত্যাগ করে। সে ধরেই নিয়েছে জাওয়াদের মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে, এবং অতি শীঘ্রই তাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। পূর্ণতা তাকে আর কিছু বলে না, শুধু এইটুকু বলে–
—”আচ্ছা সমস্যা নেই। চোট এত বড় না। আপনি ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসুন।”
জাওয়াদ তার কথা শুনে আবদারের সুরে বলে–
—”আমি এখানে আরেকটু থাকি পূর্ণ? প্লিজ… আর কোন ব্লান্ডার করবো না প্রমিজ। “
পূর্ণতা ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলে–
—”এখানে আপনার কি কাজ? তাছাড়া কিচেনে যথেষ্ট গরম। আপনি ইতিমধ্যে ঘেমে গিয়েছেন। এরচেয়ে ভালো হয় ফ্যানের নিচে গিয়ে বসুন।”
—”কোন কাজ নেই, কিন্তু আমার সবচাইতে বড় কাজই তো তোমাকে দেখা আর চোখ দিয়ে আদর করা। যেদিন তুমি আমায় মাফ করে দিবে, সেদিন হাত আর ঠোঁট দিয়েও আদর করব।”
জাওয়াদের এমন ঠোঁটকাটা কথা শুনে পূর্ণতার কান ঝা-ঝা করে ওঠে। লজ্জায় সে হাসফাস করতে থাকে কিছুটা। ইদানীং এমন টাইপ কথা শুনতে শুনতে তার গা সয়ে গেলেও, লজ্জা কমাতে পারছে না কিছুতেই সে।
সে নিজেকে সামলে নিয়ে জাওয়াদকে ঝাঁজ দেখিয়ে বলে–
—”আজাইরা কথা বলার জায়গা পান না? কি আছে আমার মধ্যে এত যে, সবসময় হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে আর বখাটেদের মতো আশেপাশে ঘুরঘুর করতে হবে?”
জাওয়াদ তার তেজস্বী গলা শুনে একটুও কষ্ট পায় না। বরং সে একপা একপা করে এগিয়ে আসতে থাকে পূর্ণতার দিকে। পূর্ণতা তার পূর্বের জায়গাতেই স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে।
জাওয়াদ যখন পূর্ণতার একদম কাছে চলে আসে তখন পূর্ণতা হুট করেই অস্বস্তি আর একধরণের চাপা উত্তেজনা ফিল করে। জাওয়াদের শরীর থেকে আসা ম্যান পারফিউমের সুবাস তাকে এক আলাদা প্রশান্তি দেয়, এটা সে চাইলেও অস্বীকার করতে পারবে না কখনোই।
জাওয়াদ তার দিকে একটি ঝুঁকে এসে কপালের পাশে ঘামে লেপ্টে থাকা চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে, নিজের গালটা পূর্ণতার কপালের একপাশে আলতো করে স্পর্শ করে খুবই ধীরে মোহনীয় সুরে গেয়ে ওঠে–
—”Araam aata hai deedar se tere,
Mit jate hai sare gum…
Hai dua ke tujhe dekhte
Dekhte hi nikal jaaye dum…”
এত দরদ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ছিল জাওয়াদের কণ্ঠে যে, পূর্ণতার বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে। ভালোলাগার প্রজাপতিরা তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার। লোকটার গালের গলা ভীষণ কাঁচা হলেও, তার এই দুই লাইন শুনতে কি যে ভালো লেগেছে সেটা পূর্ণতা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না।
বলাবাহুল্য, হসপিটাল থেকে ফিরে আসার দিন জাওয়াদ পূর্ণতাকে একটা চুমু দিয়েছিল তারপর আর স্পর্শ করেনি কখনো ওমন ভাবে। জাওয়াদ তার কাজ, চাহনি, মাঝে মধ্যে কথা দ্বারাও বুঝায় সে কতটা চায় পূর্ণতাকে।
তারা দু’জন যখন একে-অপরকে অনুভব করায় ব্যস্ত, তখনই তাদের রাজপুত্র আসে হুড়মুড়িয়ে কিচেনে চেঁচাতে চেঁচাতে।
—”পাপা… ও পাপা…সুনো না… তাজেল একতা জিনিস লাগবে।”
জাওয়াদ-পূর্ণতা ছিটকে একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। পূর্ণতা সিঙ্কের দিকে ফিরে পুনরায় সবজি ধুতে থাকে। জাওয়াদ বাম হাত দিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে আসে। তারা বাবা-ছেলে ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় বসার পর, তাজওয়াদ তার বাবার কোলে চড়ে বসে। তারপর সে নিজের ছোট ছোট হাত দু’টো দিয়ে বাবার দুই গালে হাত রেখে কিউট করে বলে–
—”জানো পাপা, টমেল খেলাল জন্য জেরি আছে।”
—”হ্যাঁ বাবা, এটা তো পাপা জানিই।”
—”সিনচেনেল খেলাল জন্য একতা চুতো সিস্টার আছে।”
—”আচ্ছা? তারপর?”
এবার তাজওয়াদ নিজের গোলাপের ন্যায় টকটকে লাল ঠোঁট উঠলে মুখটা দুঃখী দুঃখী করে দুই হাত নাড়িয়ে বলে–
—”কিন্তু তাজেল খেলাল জন্য কেউ নেই। টমেল মতো একটা জেরি নেই, সিনচেনেল মতো একটা কিউট সিস্টার নেই।”
—”কই কেউ নেই সোনা? এই যে পাপা আছি, মাম্মা আছে, তোমার পিপি, দাদাভাই, আলুমামা, টনি আঙ্কেল কত মানুষ আছে তোমার সাথে খেলার জন্য। কে বলেছে তোমার সাথে খেলার জন্য কেউ নেই?”
—”কিন্তু তাজেল একতা কিউট বেবি সিস্টার চাই পাপা। ঐ স্টিটার আমাকে ভাইয়ু বলে ডাকবে।”
এই রে! ছেলের মা তাকে নিজের কাছে ঘেষতে অব্দি দেয় না। এদিকে তার ছেলের কিউট বেবি সিস্টার চাই। জাওয়াদের মন চাইলো ছেলেকে বলতে, “আরে বাপ, তোর মা তো আমাকে নিজের কাছেই যেতে দেয় না। তোর বেবি বোন কি আকাশ থেকে টপকাবে?”
কিন্তু হায়! চাইলেই কি আর সবকিছু বলা বা করা যায়? না। জাওয়াদও পারল না নিজের দুঃখটাকে ছেলের সাথে ভাগাভাগি করতে। সে তাজওয়াদকে বুঝ দিয়ে বলে–
—”বেবি সিস্টার সময় হলেই নিয়ে আসবো। এখন তুমি আমার বুকে চুপটি করে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখো তো। সারাদিন শুধু ছুটোছুটি আর খেলাধুলা।”
তাজওয়াদ ভদ্রবাচ্চার মতো বাবার বুকে মাথা রাখে, অন্য কোন দ্বিরুক্তি করে না। পাপা যখন একবার বলে দিয়েছে বেবি সিস্টার আনবে তার মানে আনবেই।
সেদিন তারা চলে যাওয়ার সময় পূর্ণতা এমন একটি কথা বলে, যা জাওয়াদকে আবারও বিষাদের সাগরে ভাসিয়ে দিতে সক্ষম হয়। সে বলে–
—”আপনি তো এখন মোটামুটি ভালোই সুস্থ, আমি ভাবছি কাল থেকে আর আসব না। প্রতিদিন অফিস করে এখানে আসা আমার জন্য একটু কষ্টকর হয়ে যায়।”
জাওয়াদ মলিন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। পূর্ণতা জাওয়াদের দৃষ্টির সাথে নিজের দৃষ্টি মেলায় না। পাছে সে আরো বেশি জাওয়াদের চোখে মায়ায় পরে যাবে এই ভয়ে। জাওয়াদ থমথমে গলায় বলে–
—”এত কষ্টের কিছু হতো না, যদি না তুমি পার্মানেন্টলি এখানে থেকে যেতে। অনেক তো হলো পূর্ণ, আর কত শাস্তি দিবে আমায়? একটু ক্ষমা কি আমি প্রাপ্য নই?”
—”এখানে ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন জাওয়াদ সাহেব? সেদিন আপনার যেটা ভালো মনে হয়েছে, সেটা করেছিলেন আপনি। এখন আমার যেটা ভালো মনে হচ্ছে সেটাই করতে চাচ্ছি। তাছাড়া আপনি আর কি চান আমার থেকে? সন্তানের অধিকার তো দিয়েছিই।”
—”তোমাকে ভালোবাসা অধিকার চাই। তোমাকে নিয়ে সংসার করার অধিকার চাই। তুমি আর আমি মিলে “আমরা” হওয়ার অধিকার চাই। দিবে আমায় এসব অধিকার?”
পূর্ণতা স্তব্ধ হয়ে যায় জাওয়াদের একের পর এক হৃদয়ে ঝড় তোলা প্রশ্ন গুলো শুনে। এই তিনটা প্রশ্নই একদিন সে জাওয়াদকে করেছিল। কিন্তু সেদিন জাওয়াদও আজকে তার মতোই চুপ ছিল। তার সেই নীরবতা পূর্ণতার হৃদয়কে খুব বাজেভাবে আহত করেছিল। যেমনটা আজ জাওয়াদকে করছে পূর্ণতার নীরবতা।
পূর্ণতা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল–
—”আমি আর আপনি মিলে কখনো “আমরা” হতে পারব না। কথাটি আমার না, খোদ আপনিই বলেছিলেন। সেদিন আপনার উত্তরটি শুনে আমি যতটা না কষ্ট পেয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলাম এটা ভেবে, একদিন আপনিও আমাকে ভীষণ ভালোবাসবেন। ভীষণ করে চাইবেন। নিজের সন্তানের মা বানাবেন। আমার সাথে সংসার করার আকাঙ্খা করবেন।
আজ দেখুন আমার সব ভাবনাই ফলে গিয়েছে। আপনি আমায় ভীষণ করে চাইছেন নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে, আপনার সন্তানের মা-ও হলাম যদিও সেটা নিতান্তই একটা এক্সিডেন্ট ছিল। নাহলে আজ আমার তাজওয়াদ থাকত অন্য এক নারীর গর্ভের অহংকার হয়ে। সেসব কথা বাদ দিন, আজ আমার সব চাওয়া পূরণ হয়ে গেলেও কেন জানি আমি আর চাইছি না এসব।
সত্যি বলতে, আমার সংসার করার স্বাদ মিটে গিয়েছে। মনে হচ্ছে, আমরা মা-ছেলে বেশ আছি তো। সব নারীর তো সংসার হয় না। আমিও সেসব নারীদেরই একজন হয়েই না হয় জীবন কাটিয়ে দিবো। আমি চাইলেও অস্বীকার করতে পারব না যে, তাজওয়াদ শুধু আমার সন্তান। ওর উপর আপনার-আমার সমান অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার আজীবন অটুট থাকুক এই দোয়াই করি আমি।
তাজওয়াদের সাথে আপনি নিয়মিত দেখা করতে যেয়েন সকলকে নিয়ে। আমিও মাঝেমধ্যে পাঠিয়ে দিবো তাজওয়াদকে আপনাদের সাথে সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু আমায় প্লিজ ফোর্স করবেন না। আমি আর আপনি খুব ভালো করেই জানি, জোর করে আর যাই হোক একটা সুন্দর, সুস্থ, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সংসার হয় না।”
কথাগুলো বলে পূর্ণতা কিছুক্ষণ সময় নেয় জাওয়াদের মন্তব্য শোনার জন্য। কিন্তু জাওয়াদ কিছুই বলে না দেখে সে বিদায় নিয়ে চলে যায় ছেলেসহ।
নিজের অফিসের কেবিনে বসে রাগে ফোঁস ফোঁস করছে জাওয়াদ। তার চোখের সাদা অংশগুলো অতিরিক্ত রাগের কারণে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। বলায় হয়ে থাকে, শান্ত মানুষ রাগলে পশুর থেকে অধম হয়ে ওঠে। আজ যেন সেই কথাটিই ফলে গিয়েছে।
কিন্তু কেন সে এত রেগে গেলো জানতে চান? তাহলে শুনুন….
সেদিনের পর আরো পাঁচটি দিন কেটে গিয়েছে। এই পাঁচ দিনে জাওয়াদ নিয়মিত তাজওয়াদের সাথে কথা বললেও, পূর্ণতার সাথে একদিনও কথা বলেনি। অন্যদিকে জাওয়াদের এই অভিমান পূর্ণতাকে ক্ষণে ক্ষণে বিচলিত করে তুলছে। আসলে এতদিন জাওয়াদের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে সেও জাওয়াদের প্রতি অভস্ত হয়ে গিয়েছে।
ঘন্টা দুয়েক আগে টনি তাকে ফোন দিয়ে জানায়, পূর্ণতা ছেলেকে নিয়ে আবারও কানাডা ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামীকাল রাতেই তাদের ফ্লাইট। বলা চলে, একপ্রকার পালিয়েই চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছে সে। এবং সে এবার একেবারেই জন্য চলে যাওয়ার কথা ভেবেছে। টনিকেও নিষেধ করেছিল কাউকে জানাতে, কিন্তু এই প্রথমবার টনি তার কথার অবাধ্যতা করে জাওয়াদকে জানিয়ে দেয়।
পূর্ণতার এমন এক প্ল্যানের কথা শুনে, জাওয়াদ ক্ষোভে ফেটে পড়ে আর তাজওয়াদকে কিডন্যাপ করার মাধ্যমে পূর্ণতাকে তার ভালোবাসা নামক খাঁচায় বন্দি করতে চায়।
জাওয়াদ তার ড্রাইভারকে তাজওয়াদের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় আনার জন্য। এবং ছুটির অজুহাত হিসেবে বলে, পূর্ণতা অসুস্থ। ড্রাইভার গিয়ে জাওয়াদের কথা মতোই কাজ করে। প্রিন্সিপালও ড্রাইভারের কথা বিশ্বাস করে ছুটি দিয়ে দেয়, কারণ মাস দুয়েক আগেই পূর্ণতা হসপিটালাইজড ছিলো অসুস্থতার কারণে।
তাজওয়াদকে নিজের কাছে আনার পর জাওয়াদ জানত, পূর্ণতা খবর পাওয়া মাত্র তাকে বা তার পি.এ.কে ফোন দিয়ে তার অবস্থান জানতে চাইবে। তাই সে হুমায়ূনকে মিথ্যে বলতে বলে পূর্ণতাকে যে, জাওয়াদ আজ সকালে ঢাকার বাহিরে গিয়েছে।
জাওয়াদের ভাবনাই সঠিক হয়। পূর্ণতা তাকে ফোন দিলে জাওয়াদ ধরে না। তারপর সে জাওয়াদের পি.এ-কে ফোন দিয়ে জাওয়াদের কথা জিজ্ঞেস করলে, হুমায়ূন তার বসের কথা মতো কাজ করে।
খেলতে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে জাওয়াদ ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি নিয়ে বলে–
—”আর কয়টা মাস কষ্ট করে একা খেলো সোনা। খুব শীঘ্রই তোমার জন্য ভাই অথবা বোন নিয়ে আসতে চলেছি মাম্মা-পাপা মিলে।”
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন]
শব্দসংখ্যা~২১০০+
চলবে?
[পূর্ণতাকে বকবেন না কেউ, তার এমনটা করার পেছনে কারণ আছে যেটা পরবর্তী পর্বে জানতে পারবেন।
আর হ্যাঁ, আপনারা যা ভাবছেন দ্বিতীয় পর্বে তাই আসতে চলেছে। 😝
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৬.১