অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৪৪
কেটে গেছে গুনে গুনে ৮ টা মাস। এই ৮ মাসে বদলে গেছে অনেক কিছু, পিছনে ফেলে রেখে গেছে হাজারো অতীত, হাজারো কারো কষ্টের কান্না। বদলে গেছে মানুষ, পরিবর্তন হয়েছে মানুষের স্বভাব আর বেঁচে থাকার ধরণ। সময় কারো জন্য থমকে থাকে না, জীবন ঠিকই তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে, শুধু মাঝপথে কিছু মায়া আর স্মৃতি হৃদপিণ্ডের দেয়ালে ক্ষত হয়ে জমে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর দেশ কুয়েত। এখানকার আকাশটা যেন বাংলার আকাশের মতো মায়াবী নয়, বরং এক বিশাল ধূসর ক্যানভাসের মতো স্থির। মাথার ওপর গনগনে সূর্যটা মরুভূমির বুক চিরে আগুনের হল্কা ঢেলে দিচ্ছে। চারদিকে ধুধু বালুরাশি আর তার মাঝেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক স্থাপত্যের সব আকাশচুম্বী অট্টালিকা। এখানে রাস্তার দুপাশে সারি সারি পাম গাছ আর মরুভূমির তপ্ত বাতাস এক অদ্ভুত রুক্ষতা তৈরি করে রেখেছে।
শহরের একপাশে নীল পারস্য উপসাগর। মরুভূমির আগুনের পাশে এই সমুদ্রটা যেন এক টুকরো প্রশান্তি। সাগরের নীল জলরাশি তীরের পাথুরে দেয়ালে আছড়ে পড়ছে অবিরত। এখানকার সমুদ্রের ঢেউগুলো খুব একটা উত্তাল নয়, তবে এক গভীর গম্ভীরতা আছে তার অন্তরে। তীরের ম্যারিনাগুলোতে বিলাসবহুল সব ইয়ট নোঙর করা, আর সমুদ্রের নোনা বাতাস মরুভূমির উষ্ণতার সাথে মিশে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে।
বিকেলের পড়ন্ত রোদ যখন পারস্য উপসাগরের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় সাগরের বুকে কেউ হাজার হাজার হীরা ছড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রের এই বিশালতা আর মরুভূমির এই নিঃসঙ্গতা যেন একে অপরের পরিপূরক। ঠিক যেমন কারো বুকের ভেতরটা হাহাকারে পুড়তে থাকা মরুভূমি, আর চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু সেই দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্র।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আজ যেন শুভ্রর পায়ের তলায় এসে আছড়ে পড়ছে। সমুদ্রের লোনা জলরাশির হাঁটু পানিতে দু-হাত পকেটে ঢুকিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে ধবধবে সাদা রঙের দামী টি-শার্ট আর সাদা প্যান্ট, চোখে ডার্ক সানগ্লাস। সমুদ্রের অবাধ্য ঢেউগুলো বারবার ওর হাঁটু ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু শুভ্রর সেদিকে খেয়াল নেই। ওর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে দিগন্তজোড়া সেই জলরাশির ওপর। ডার্ক সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখ দুটি আজ ভীষণ তৃষ্ণার্ত, যা এই বিশাল নীল সমুদ্রের সাথে কোনো এক অজানায় বিলাপ করে চলেছে।
গুনে গুনে আটটা মাস। এই দীর্ঘ সময়ে শুভ্র না গেছে নিজের দেশে, না নিয়েছে নিজের রক্তের সম্পর্কের কারো খোঁজ। নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার এক অদ্ভুত খেলায় মেতেছিল সে। জেদ আর অভিমানের বশবর্তী হয়ে পাষাণের মতো নিজের ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে, ব্যবহার করছে নতুন এক বিদেশি সিম। কিন্তু এই একাকীত্ব কতদিন? ফিরতে তো তাকে হবেই। ওই সুদূর বাংলাতেই তো মিশে আছে তার প্রাণ। প্রাণহীন দেহ নিয়ে হয়তো জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু জীবন কাটানো যায় না। শুভ্রও যেন এই কটা দিন এক নির্জীব অস্তিত্ব হয়ে ছিল। না হেসেছে মন খুলে, না কেঁদেছে বুক ফেটে। শুধু একটু একাকীত্বের জন্য নিজের মনটাকে পাথরের মতো শক্ত করে আগলে রেখেছিল।
সমুদ্রের নীল জলরাশি আজ উৎসবে মেতেছে। শত শত মানুষ স্নান করছে, কেউবা ঢেউয়ের ওপর শরীর ভাসিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে। বালুচরে পর্যটকদের ভিড়, সবাই যার যার নিজস্ব অনুভূতিতে ব্যস্ত। কারো মুখে হাসি, কারো চোখে বিস্ময়। ঠিক এই রঙিন ভিড়ের মাঝে শুভ্র এক ধূসর নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ শুভ্রর কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল মুহূর্তেই। শুভ্র ধীরগতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল হিয়াদ দাঁড়িয়ে আছে। কুয়েত আসার পরই এই হিয়াদের সাথে পরিচয় হয়েছে ওর। হিয়াদও বাংলাদেশি, জীবিকার তাগিদে এই প্রবাসে পড়ে আছে। হিয়াদ হাসিমুখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল।
“চুপচাপ এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? পানিতে নামবে চলো, একটু গা ভেজাই।”
শুভ্র পুনরায় সামনের দিকে, সেই অতল জলরাশির দিকে তাকাল। খুব নিস্পৃহ কণ্ঠে জবাব দিল।
“ইচ্ছে করছে না।”
হিয়াদ একটু অবাক হলো। শুভ্রর গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে শুধাল।
“কী ব্যাপার? মন খারাপ?”
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। শীতল গলায় বলল।
“না।”
“তাহলে?”
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সমুদ্রের তপ্ত বাতাসের সাথে সেই দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“ভীষণ মনে পড়ছে হিয়াদ। ভীষণ মনে পড়ছে!”
হিয়াদ শুভ্রের কাঁধের ওপর হাতের ভর বাড়িয়ে দিল। সামনে বয়ে চলা অন্তহীন জলরাশির দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল।
“তুমি পোলা বড্ড জেদি! ‘ইউ আর সো স্টাবর্ন শুভ্র’। মিসও করবা আবার ফিরেও যাবা না, এ কেমন স্বভাব তোমার?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতা যেন সমুদ্রের গর্জনের চেয়েও বেশি ভারী। হিয়াদ পুনরায় সুধাল।
“খুব বেশি মনে পড়ছে?”
শুভ্র এবার নোনা বাতাসের সাথে নিজের দীর্ঘশ্বাসটুকু মিশিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল।
“প্রকাশ করার মতো না।”
হিয়াদ এবার শুভ্রর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। একটু জোর দিয়েই বলল।
“তাহলে ফোনটা খোলো না ভাই। অন্তত কথা তো বলো।”
শুভ্রর চোখে তখনো সেই তপ্ত চাহনি। সে শান্ত গলায় জবাব দিল।
“খুলব।”
হিয়াদ এবার কিছুটা অবাক হয়েই বলল।
“আরে কী বলো! খুলে রাখো। যদি সে ফোন দেয়? একবার ভাবো তো সেই মানুষটার কথা, যে হয়তো ওপারে তোমার একটা ফোনের অপেক্ষায় দিন গুনছে।”
শুভ্রর ঠোঁটে এক বিষাদমাখা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় বলল।
“আমাকে সে ফোন দেবে না। ‘শি ইজ অ্যাফ্রেড অফ মি’। সে আমায় বড্ড ভয় পায়।”
হিয়াদ এবার শুভ্রর বাহুতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল।
“তুমি খুলে রাখো। আর কতদিন এভাবে নিজেকে খাঁচায় বন্ধ রাখবে? অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না শুভ্র, জানো তো? ‘এক্সেস অফ এনিথিং ইজ ব্যাড’। ফোনটা অন করো।”
শুভ্র একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে। কোনো কিছু না ভেবেই পাওয়ার বাটন চেপে ফোনটা অন করল এবং স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই দ্রুত পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। আট মাস পর ফোনের সেই চেনা ভাইব্রেশনটা যেন শুভ্রর হৃদপিণ্ডে গিয়ে আঘাত করল। হিয়াদ এবার শুভ্রর পিঠ চাপড়ে চনমনে গলায় বলল।
“ব্যস, এই তো।চলো এবার ক্লাবে যাই গান গাইতে। কাউকে খুব বেশি মনে পড়লে জোরে জোরে গান গাইতে হয়, এতে মনটা ফ্রেশ লাগে। ‘মিউজিক হিলস এভরিথিং’। চলো যাই!”
শুভ্র ক্লাবে যেতে চাইল না, কিন্তু হিয়াদ এক প্রকার জোর করেই ওকে টেনে নিয়ে আসল। কুয়েতের এই অভিজাত ক্লাবগুলো রাতের বেলা এক অন্যরকম মায়াবী রূপ নেয়। চারদিকে নিয়ন আলোর ঝলকানি, ভারী মিউজিকের বেস যেন ফ্লোরের প্রতিটি ইঞ্চিতে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ক্লাবভর্তি মানুষের ভিড়, কেউ দামী পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, আবার কেউ রিদমিক মিউজিকে গা ভাসিয়ে নাচছে। চারদিকে পারফিউম আর ধোঁয়ার এক নেশালো গন্ধ।
হলের ঠিক মাঝখানে বিশালাকার এক মিউজিক স্টেজ। সেখান থেকে লেজার লাইটগুলো সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে সারা ঘরে খেলে বেড়াচ্ছে। হিয়াদ শুভ্রের কাঁধে চাপ দিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল।
“যাও উঠে গিয়ে গান গাও। ‘আই ওয়ান্ট টু সি ইউ রক দিস স্টেজ’। দেখতে চাই কেমন মঞ্চ কাঁপাও তুমি।”
শুভ্রর মেজাজ তখনো খিটখিটে। সে বিরক্তি নিয়ে চারপাশের হট্টগোল দেখছিল। সে শীতল গলায় জবাব দিল।
“ইচ্ছে করছে না। ‘আই এম লিভিং রাইট নাও’। আমি বরং চলে যাই।”
বলেই শুভ্র ঘুরে যেতে নিলে হিয়াদ খপ করে ওর হাত টেনে ধরল। এক প্রকার মিনতি করে বলল।
“আরে ব্রো, এইটা কোনো কথা? তুমি একবার যাও, জাস্ট একটা গান বলো। ‘ইট উইল মেক ইউ ফিল বেটার’। দেখবে তোমার মনটাও ফ্রেশ লাগবে।”
হিয়াদ এবার আর কোনো কথা না শুনে শুভ্রকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই স্টেজের ওপর উঠিয়ে দিল। শুভ্রের মতো সুদর্শন আর লম্বা একজন যুবককে মঞ্চে উঠতে দেখে ক্লাবের মেয়েরা হইহই করে উঠল। চারদিকে হাততালির শব্দে কান পাতা দায়। শুভ্র প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করলেও হঠাৎ ওর ভেতরে এক জেদ চেপে বসল। বুকের ভেতরে জমে থাকা আট মাসের সেই হাহাকারগুলো যেন আজ চিৎকার করে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
শুভ্র পাশ থেকে একটা ইলেকট্রিক গিটার তুলে নিল। স্ট্র্যাপটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে সে একদম শান্ত হয়ে দাঁড়াল। মাথার ওপর স্পটলাইটগুলো লাল-নীল হয়ে ওর চেহারায় বিচ্ছুরিত হচ্ছে। শুভ্র একবার লম্বা দম নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। পরক্ষণেই গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল সে।
‘টুং-টাং’ শব্দে গিটারের ঝংকার উঠতেই পুরো ক্লাব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুভ্র তার সমস্ত রাগ আর অভিমান ঢেলে দিয়ে গিটার বাজাতে লাগল। ওর আঙুলের প্রতিটি ছোঁয়ায় যেন এক একটা না বলা যন্ত্রণার সুর বেজে উঠছে। স্পটলাইটের তীব্র আলো শুভ্রের সাদা টি-শার্ট আর ঘামতে থাকা কপালে এসে বারবার আছড়ে পড়ছে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুভ্র তখন এক রহস্যময় জাদুকর, যে সুরের মায়ায় চারপাশকে পাথর করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখল।
শুভ্র চোখ দুটো বন্ধ করল। অন্ধকারের বুক চিরে রিদির সেই অভিমানী, মায়াবী হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠল। সেই চিরচেনা গাল বেয়ে পড়া পানি আর মিটিমিটি হাসির এক অদ্ভুত মিশেল। শুভ্রর আঙুলগুলো তখন গিটারের তারে এক উন্মাদনার ঝড় তুলল। সে ধীর কিন্তু নেশালো এক কণ্ঠে গাইতে শুরু করল।
~রাতেরই আঁধারে অজানা ছোঁয়া~
~মায়াবী চোখে কি মায়া~
~যেন গোধূলি আবির মাখা~(২)
শুভ্র এবার গিটারের রিদমে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটালো। স্টেজজুড়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আর লেজার লাইটের খেলা তখন চরমে। শুভ্র এবার সমস্ত বুক চিরে চি-ৎ-কা-র করে গেয়ে উঠল।
~কি নেশা ছড়ালে~
~কি মায়ায় জড়ালে~ (২)
শুভ্র এবার সপাটে চোখ খুলল। ওর সেই নেশাতুর আর বিধ্বংসী চোখের চাহনিতে যেন এক মরণঘাতী আকর্ষণ। গিটার বাজাতে বাজাতে ও পুরো স্টেজজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। ওর প্রতিটি স্টেপ, ওর চুলের অবিন্যস্ত ভাঁজ আর ঘামাচি ললাট দেখে ক্লাবের মেয়েরা কার্যত উন্মাদ হয়ে গেল। কেউ ভিডিও করছে, কেউ বা সুরের তালে পাগলের মতো নাচছে। হিয়াদ নিচে দাঁড়িয়ে মনের সুখে শিস দিচ্ছে আর দুই হাত তুলে নাচছে। শুভ্র আজ সত্যি সত্যিই মঞ্চের রাজা হয়ে রাজত্ব করছে। ‘হি ইজ লিটারালি রকিং দ্য স্টেজ’!
শুভ্র স্টেজের কিনারায় এসে নিচু হলো। সামনের সারিতে থাকা পাগলপ্রায় দর্শকদের দিকে তার তী-ক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে পুনরায় গেয়ে উঠল।
~চোখে চোখে চেয়ে একা একা~
~কবে হবে বলো কথা বলা~
~আবেগী মন বাঁধা মানে না~
~তুমি ছাড়া কিছু চাই না~(২)
শুভ্র এবার গিটারটা হাঁটুর ওপর ঠেকিয়ে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে সজোরে গেয়ে উঠল।
~কি নেশা ছড়ালে~
~কি মায়ায় জড়ালে~ (২)
‘আই অ্যাম রিয়েলি ক্রেজি ফর ইউ রিদি’! ‘আই জাস্ট কান্ট স্টপ থিংকিং অ্যাবাউট ইউ’
সে আবারো চোখ বন্ধ করল। মানসপটে ভেসে উঠল রিদির সেই আকুলতা, সেই শেষ বিকেলের করুণ মিনতি। শুভ্রর সুর এবার আরও প্রগাঢ় আর রুক্ষ হয়ে উঠল। সে গিটারের রিদমে নিজের সবটুকু ঘৃণা আর ভালোবাসা মিশিয়ে দিয়ে গাইতে লাগল।
~ জানি তুমি আছো একা ~
~তবে কেন বলো দূরে থাকা~
~সময় তো থেমে থাকে না~
~দ্বিধা ভেঙে কাছে এসো না~(২)
শুভ্র আবারো ডান হাতটা আকাশের দিকে উঁচিয়ে, গলার শির ফুলিয়ে চি-ৎ-কা-র করে গেয়ে উঠল।
~কি নেশা ছড়ালে~
~কি মায়ায় জড়ালে~ (২)
গানটা শেষ হতেই এক অদ্ভুত শূন্যতা ওকে গ্রাস করল। আট মাসের এক দীর্ঘ লড়াই যেন এই কয়েক মিনিটের গানে ওকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছে। শুভ্রর শরীরটা হঠাৎ ছেড়ে দিল, সে ক্লান্তিতে আর মানসিক দহনে মঞ্চের মাঝখানেই ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। গিটারটা তার কোলের ওপর আলগা হয়ে পড়ে রইল।
পুরো ক্লাব তখন নিস্তব্ধ। কয়েক সেকেন্ড পর যেন সেখানে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটল। মেয়েরা চিল্লাচিল্লি আর হাততালিতে হলরুম ফাটিয়ে ফেলছে। কেউ কেউ স্টেজ লক্ষ্য করে হার্ট ইমোজি দেখাচ্ছে, কেউ বা পাগলের মতো শুভ্রের নামটা জেনে তার নাম ধরে চিৎকার করছে। কিন্তু শুভ্রর কানে তখন কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। তার কানে তখন রিদির সেই অস্ফুট স্বরে বলা শেষ কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
অনেকক্ষণ পর শুভ্র উঠে দাড়াল। স্টেজ থেকে নামার আগেই একঝাঁক বিদেশি তরুণী শুভ্রকে ঘিরে ধরল। ওদের চোখেমুখে তখন উন্মাদনা, মনে হচ্ছে এই মাত্র মঞ্চ থেকে কোনো গ্রিক গড নেমে এসেছে। সবার হাতে দামী স্মার্টফোন, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে শুভ্রর চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার অবস্থা। কিন্তু তার চেহারায় কোনো হেলদোল নেই, যেন সে এই জগতের বাইরের কেউ।
এক কুয়েতি তরুণী, পরনে গর্জিয়াস ওয়েস্টার্ন ড্রেস, ভিড় ঠেলে একদম শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। তার দুচোখে মুগ্ধতা উপচে পড়ছে। সে শুভ্রর পথ আগলে ধরে ইংরেজিতে বলল।
“ওহ মাই গড! ‘ইউ আর সো আমেজিং’। তোমার কন্ঠে কী যেন একটা জাদু আছে! আমরা কি একটা সেলফি তুলতে পারি?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নিশ্চুপ থাকাটা যেন মেয়েদের আরও বেশি পাগল করে তুলল। পাশ থেকে আরেকজন আমেরিকান তরুণী তার হাত ছুঁতে গিয়ে চিল চিৎকার করে উঠল।
“হে লাভ! ‘ইউ জাস্ট রকড দ্য স্টেজ’। তোমার গিটার বাজানো দেখে আমি জাস্ট স্পিচলেস। প্লিজ, আমার সাথে একটা ছবি তোলো।”
শুভ্র এক পলক মেয়েটার দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে কোনো আবেগ নেই, কোনো ভালো লাগা নেই। সে যেন এক জীবন্ত বরফের টুকরো। ও শীতল গলায় হিয়াদের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলল।
“চলো হিয়াদ। ‘লেটস গেট আউট অফ হেয়ার’। আমার দম বন্ধ লাগছে।”
হিয়াদ ততক্ষণে মেয়েদের ভিড় সামলাতে ব্যস্ত। সে হাসিমুখে মেয়েদের সামলাতে সামলাতে শুভ্রকে ইশারা করল। কিন্তু মেয়েরা তো নাছোড়বান্দা। এবার এক অ্যারাবিক তরুণী শুভ্রর একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তার গা থেকে আসা দামী পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ শুভ্রর নাকে আছড়ে পড়ল। মেয়েটি আলতো করে শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে ফোনের ক্যামেরাটা অন করল।
“জাস্ট ওয়ান পিকচার! ‘ইউ আর সো হ্যান্ডসাম’। তোমার নামটা কি জানা যাবে?”
শুভ্র এবার মেয়েটির হাতটা খুব শান্তভাবে নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ডার্ক সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখ দুটিতে তখন বিরক্তির আভা। সে নিচু স্বরে বলল।
“সরি। ‘আই এম নট ইন দ্য মুড’। রাস্তা ছাড়ুন।”
মেয়েরা যেন আকাশ থেকে পড়ল। কুয়েতের মতো জায়গায় এরকম একজন হট অ্যান্ড হ্যান্ডসাম ছেলে তাদের রিজেক্ট করছে, এটা যেন ওদের কল্পনার বাইরে। এক তরুণী তো বলেই বসল।
“হেই, ‘ডোন্ট বি সো রুড’! আমরা তো শুধু একটা ছবি চাইছি।”
শুভ্র আর কারো কোনো কথা শুনল না। সে সোজা ভিড় ঠেলে দরজার দিকে হাঁটা দিল। পিছন থেকে ভেসে আসা মেয়েদের চিৎকার, শিস আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কোনো কিছুই ওকে থামাতে পারল না। ক্লাবের এই চড়া আলো আর পারফিউমের গন্ধের চেয়ে তার কাছে এখন পারস্য উপসাগরের সেই নোনা বাতাস অনেক বেশি প্রিয়। কারণ ওই বাতাসের ওপাড়ে কোথাও তার প্রাণের টান মিশে আছে।
হিয়াদ দ্রুত শুভ্রর পিছু নিল। ক্লাবের বাইরে আসতেই তপ্ত রাতের হাওয়া শুভ্রর মুখে এসে লাগল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পকেটে থাকা ফোনটা তখনো অন। শুভ্র জানত না, এই এক ফোন অন হওয়াটাই ওর আট মাসের শান্ত জীবনে এক বিশাল ঝড় নিয়ে আসতে চলেছে।
হিয়াদ শুভ্রের কাঁধে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল।
“ফিরে যাও তুমি।”
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল হিয়াদের দিকে। তার দৃষ্টিতে একরাশ প্রশ্ন। হিয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় আওড়াল।
“হুম, চলে যাও। আর নিজেকে এইভাবে এই পাথুরে মরুভূমিতে বন্দি করে রেখো না। পৃথিবীর সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা রাখলেও ভালোবাসা থেকে আলাদা থাকা বড্ড কষ্টকর রে ভাই। আমি তো অবাক তুমি এতদিন থাকো কীভাবে! আমি হলে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম, জীবনেও পারতাম না।”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল বুক চিরে একটি লম্বা শ্বাস টানল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ শুভ্রের পকেটে থাকা ফোনটা সজোরে ভাইব্রেট করে বেজে উঠল। তোকে প্রাণের চেয়ে বড় বেশি ভালোবাসি৷ আট মাস পর সেই চেনা সুরটা শুনে শুভ্রের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হিয়াদ একটু ঝুঁকে এসে বলল।
“ওই যে কল এসেছে। দেখো, কে কল দিয়েছে।”
শুভ্রর হাত দুটো সামান্য কাঁপছে। সে ধীরস্থিরভাবে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ‘ঈশান’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। শুভ্র শুকনো ঢোক গিলল। এক অদ্ভুত অজানা ভয় যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল। ওপাশ থেকে ঈশানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। খুব স্বাভাবিক কিন্তু কেমন যেন এক রহস্যময় গাম্ভীর্য মেশানো।
“তাহলে বস, ফোনটা অবশেষে খুলেই ফেললেন? ‘ইউ আর রিয়েলি আনপ্রেডিক্টেবল’। আপনি সত্যি বড্ড অদ্ভুত! মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় আমি আপনাকে একদমই চিনি না। বড্ড রহস্যময় মনে হয় আপনাকে।”
শুভ্র নিজেকে সামলে নিয়ে সামান্য থিতু হয়ে বলল।
“কেমন আছো ঈশান?”
ঈশান একটু থেমে উত্তর দিল।
“ভালো। আপনি?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার নীরবতাই ঈশানকে সবটুকু বুঝিয়ে দিল। সে এবার গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল।
“বস, ফিরে আসেন। অনেক তো হলো, এবার ফিরে আসেন।”
শুভ্রর বুকের স্পন্দন এবার বেড়ে গেল। সে কিছুটা অস্থির হয়ে সুধাল।
“ঈশান, সবকিছু ঠিক আছে তো?”
ওপাশ থেকে ঈশান আর কোনো উত্তর দিল না। ফোনের ওপারের নিস্তব্ধতা যেন শুভ্রকে গিলে খেতে চাইছে। শুভ্র ফের ব্যাকুল হয়ে উঠল।
“কী হলো ঈশান? কথা বলছো না কেন? বাড়ির সবাই ঠিক আছে তো? কারো কিছু হয়েছে?।”
হিয়াদের কথাগুলো শুভ্রর কানে ঢুকছিল কি না জানা নেই, কিন্তু ঈশানের ওই নীরবতা তার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ঈশান তবুও কিছু বলল না। শুভ্র এবার সমস্ত ধৈর্য হারিয়ে চি-ৎ-কা-র করে উঠল।
“ঈশান কথা বলো! ‘ইজ এভরিওয়ান অলরাইট’? সবাই ঠিক আছে তো?”
ঈশান এবার প্রায় কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জবাব দিল। তার গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে সে কোনো এক কঠিন সত্যের ভার বইতে পারছে না।
“সবাই ঠিক এবং একদম সুস্থ আছে, শুধু… শুধু…”
শুভ্রর কপালে ঘাম জমে উঠেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“শুধু কী? ‘স্পিক আউট ফাস্ট’! জলদি বলো!”
ঈশান ওপাশ থেকে তোতলাতে লাগল।
“শুধু… শুধু… ব-বস… রি-রি… রিদি!”
রিদি নামটা শোনা মাত্রই শুভ্র যেন আরও অস্থির হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। সে আর্তনাদ করে বলল।
“ঈশান ‘টেল মি ফাস্ট’ কী হয়েছে! রিদি ঠিক আছে তো? ‘ইজ শি ওকে’?”
ঈশান এবার হঠাৎ চি-ৎ-কা-র করে কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল।
“না, ঠিক নেই! ‘রিদি গট ম্যারিড’! রিদির বিয়ে হয়ে গেছে বস! পারলে ফিরে আসুন।”
বলেই ঈশান কলটা কেটে দিল। শুভ্রর হাত থেকে দামী স্মার্টফোনটা পাথুরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তার চারপাশের দুনিয়াটা যেন এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল। পুরো পৃথিবীটা মাথার ওপর দিয়ে বনবন করে ঘুরে উঠল।সব কিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে এক টুকরো কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১০