জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২০
পর্ব সংখ্যা;২০
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
প্রকৃতিকে শীতল করতে ঝড়ো হাওয়া বইছে। হাওয়ার বেগ বাড়তেই কারেন্ট চলে গেলো।
তাতে অন্ধকার ঘরে আধ পরা শাড়িটা নিয়ে বেশ ফ্যাসাদে পড়লো তরী। বিয়ে বাড়িতে এখনো জেনারেটর চলছে না কেন তাই বুঝলো না সে। বারান্দা ছাড়িয়ে বাতাস এসে তরীর শরীর ছুঁয়ে দিতেই; কেঁপে উঠলো সে। হঠাৎ, দরজার কাছে মোমের লালচে আলো পড়তেই সস্থির শ্বাস ফেললো তরী। দরজা ঠেলে মোমবাতি হাতে তরঙ্গ রুমে প্রবেশ করলো। তাকে দেখে ফের অস্বস্তিতে পড়ে গেলো তরী। বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে মোমবাতিটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে দিলো তরঙ্গ। মোমবাতি রেখে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় এসে পা ঝুলিয়ে শুয়ে পড়লো সে। চোখ বন্ধ করে তরঙ্গ বললো,
–” জলদি তৈরি হ। সবাই ডাকাডাকি করছে।”
–” কারেন্টের কি হয়েছে?”
–” চলে গেছে।”
–” জেনারেটর?”
–” সমস্যা হয়েছে। ঠিক করছে।”
দুজনের মাঝে আবার নীরবতা ভর করলো। মোমের আলোয় তরঙ্গের আনা শাড়িটা কোন রকম পরে নিলো তরী। নতুন শাড়ি হওয়ার দরুন। কুঁচি গুলো ঠিক করতে পারলো না সে। তখনি জেনারেটর চালু হয়ে গেলো। আলো ফিরতেই তরঙ্গ উঠে পড়লো। ব্যাগের পোশাক গুলো সে আলমারিতে গুছিয়ে রেখে ছিলো। সেখান থেকে রুমার দেওয়া হলুদের জন্য বরাদ্দকৃত হলুদ পাঞ্জাবি টা বের করে নিলো। টাওয়াল নিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়তেই সস্থির শ্বাস ফেললো তরী। তড়িঘড়ি করে শাড়ি পরা শেষ করে। চুলে চিরুনি করে নিলো।
চিরুনি রেখে হাত খোঁপা করতেই তরঙ্গ বেরিয়ে এলো। চুলে টাওয়াল ঘষতে ঘষতে তরীর পাশে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো সে। আড়চোখে তরঙ্গ কে দেখে অবাক হলো তরী। ছেলেটা আবার শাওয়ার নিয়েছে? কি আজব। এখন তো আর আগের মতো গরম পড়ছে না। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বললো না তরী। তরীর রাখা চিরুনি টা নিয়ে চুলে ব্যাকব্রাশ করে নিলো তরঙ্গ। কাজ শেষে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে; হুট করে ডান হাত বাড়িয়ে তরীকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো সে। তরঙ্গের এহেন কান্ডে হতবাক তরী।
ঘটনার আকস্মিকতায় তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। তরঙ্গের শরীরের শীতলতা শরীরে অনুভব হতেই সারা দেহে কাঁটা ফুটলো তার। অদ্ভুত অনুভূতির দোলাচলে চমকে তাকিয়ে রইলো তরঙ্গের মুখ পানে। তা দেখে এক ভ্রু কুঁচকে তরঙ্গ বললো,
–” কি দেখছিস?”
–” কই?”
–” আমি মাত্র দেখলাম, তুই আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছিস।”
–” ছাড়ুন,”
–” না ছাড়লে কি করবি?”
–” চিৎকার করবো!”
–” হোয়াট দ্যা ফা*ক। কর চিৎকার, দেখি কে আসে!”
নিজের কথায় আর তরঙ্গের রিয়েকশনে তরী অবাক। সে না হয় বোকামি করে; কথার খৈই হারিয়ে বলেছিলো চিৎকার করবে। কিন্তু তরঙ্গ তো ইচ্ছে করে এই কথা বললো।
–” অসভ্য মুখ সামলে কথা বলুন। চাচি কি খেয়ে আপনাকে জন্ম দিয়েছে? এতো অসভ্য কেন আপনি?”
–” আমার মা যে চাল জানে। কিছু খেয়ে আমাকে জন্ম দেওয়া লাগেনি। আমি নিজে নিজেই এমন হয়ে গেছি।”
কথা শেষ করে, মাথা নামিয়ে কপালের একপাশ চুলকে। অসম্ভব সুন্দর করে হাসলো তরঙ্গ। মাথা ঝাঁকানোর দরুন, তরঙ্গের ঝাঁকড়া চুল গুলো কপালে এসে পড়লো। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে, তরীকে ড্রেসিং টেবিলের সাথে চেপে ধরলো তরঙ্গ। ঠোঁটে দারূন হাসি এঁটে সুধালো সে।
–” কাল লাল শাড়িটা পরলি না। আজ তবে এই শাড়িটা পরলি যে?”
–” শাড়ির টান পড়েছিলো। তাই পরেছি। এমনিতে আপনার আনা শাড়ি প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
বিশেষ কায়দায় এক ভ্রু – কুঁচকে নিলো তরঙ্গ। আরেকটু এগোলো সে। তীক্ষ্ম কন্ঠে সুধালো সে;-
–” ইন্টারেস্ট নেই?”
কথা জড়িয়ে এলো তরীর। তরঙ্গের পুরুষালি পারফিউমের তীব্র সুভাষ তাকে ঘেঁটে দিচ্ছে।
–” না,”
–” আমার আনা শাড়ির প্রতি তোর ইন্টারেস্ট থাকাও লাগবে না। আমার প্রতি থাকলেই হবে। শাড়ি দিয়ে আর কি-ই বা হবে। ওটা তো আর তোকে ভালোবাসবে না।”
হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। গ্রামের মানুষ আর আত্মীয় স্বজনের আনা গোনায় উঠোনে পা ফেলার মতো জায়গা নেই।
বাহারি রঙের শাড়ি পরে মেয়েরা এদিক – ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। চার দিকে হালকা বাতাস বইলে ও, ভিড়ের চাপে উঠোনে বসে থাকা মানুষজন ঘেমে একাকার। কয়েকটা ফ্যান ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের তুলনায় তা একে বারেই অপ্রতুল। সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর, গুমোট পরিবেশ। রুমার খালাতো – মামাতো বোনেরা মাথার ওপর ওড়না ধরে তাকে স্টেজে নিয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই হুলস্থুল এড়াতেই এতক্ষণ দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল তরী। এত মানুষ, এত ভিড়; কোনো দিনই তার ভালো লাগেনি। সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই স্বস্তি পায় সে।
তার ওপর কালকের ঘটনার পর পরিস্থিতি যেন আর ও ভারী হয়ে উঠেছে। সামনে কেউ কিছু না বললে ও, পেছনে যে তাদের নিয়ে কথা হচ্ছে— তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তরীর। বুসরা তো কাল রাত থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাহনারাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দু’জনে চুপচাপ বসে ছিল সারাদিন। এসব ভেবে আর ও অস্থির হয়ে উঠছে তরী। চাচি দু’চারটা কথা শোনালে বরং স্বস্তি পেত— এই নীরবতা তার সেই তিক্ত কথা গুলোর চেয়ে ও বেশি অস্বস্তিকর। অবশ্য সকালে সুযোগ পেয়ে কথা শুনিয়েছে সাহনারা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোতলা থেকে নিচে নামল তরী। ভিড় এড়িয়ে একপাশে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। এদিকটায় মানুষ তুলনা মূলক কম। সামনে স্টেজে জোড়ায় জোড়ায় সবাই উঠছে— বিবাহিতরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে, আর সিঙ্গেলরা কাজিনদের সঙ্গে।
–” আপনি রুমার কি হোন?”
সহসা পাশ থেকে হাসৌজ্জ্বল পুরুষালি কন্ঠ পেতেই ফিরে তাকালো তরী। আলো আঁধারিতে ভেসে উঠেছে, লম্বা গড়নের সুদর্শন এক পুরুষের প্রতিচ্ছবি। টান টান সিনায় হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। তরী চিনে না মানুষটাকে।
–” আমি?”
–” আপনি ছাড়া আর কেউ আছে এখানে?”
আরেক ধাপ অস্বস্তিতে ডুবলো তরী। ফিসফিস কন্ঠে বললো সে,
–” রুমার ফুফুর জায়ের মেয়ে।”
–” আচ্ছা, পাশে বসতে পারি?”
–” বসুন।”
–” ধন্যবাদ, একা বসে আছেন কেন?”
কথা শেষ করে পুরুষটি মাথা নামিয়ে তরীর মুখখানা দেখলো। পর পর মুচকি হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। তরী হাসার চেষ্টা করলো।
–” মাত্র ই নিচে এসেছি। আমি একটু উপরে যাবো। আসি,”
–” মাত্র এসেছেন বললেন। তবে আবার যাবেন কেন?”
–” একটু কাজ আছে।”
বাক্য সমাপ্ত করে তরী দাঁড়িয়ে পড়লো। দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করার আগেই আবার সেই কন্ঠ ভেসে এলো।
–” নামটা তো বলে যাবেন মিস…?
–” তরী।”
পুরুষটির কাছ থেকে অদৃশ্য এক তাড়নায় প্রায় জোর করেই নিজেকে মুক্ত করে আনলো তরী। পেছনের অস্বস্তিকর উপস্থিতিকে ফেলে দ্রুত পা বাড়িয়ে উঠোনের অপর প্রান্তের গাঢ় অন্ধকারে এসে থামলো সে। চারপাশে আবছা অন্ধকারের আবরণ, এর মধ্যে তার হৃদস্পন্দন অস্থির গতিতে ধুকপুক করছে। দু’য়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘ, স্থির নিশ্বাস ছাড়লো তরী।
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথোপকথন তার স্বভাবের সঙ্গে কখনোই মানানসই ছিল না। আর সেই মানুষটি যদি হয় একজন পুরুষ— তবে তো তার সংকোচ, অস্বস্তি আর অদৃশ্য দূরত্ব সব এক সঙ্গে জেগে ওঠে। মনে হয়, প্রতিটি অচেনা দৃষ্টি যেন তাকে অকারণে আবদ্ধ করে ফেলতে চায়, আর সেখান থেকে পালিয়ে আসা তার একমাত্র বাঁচার উপায়।
অনুষ্ঠান শেষ হয়নি। তবুও অল্প করে খেয়ে উপরে চলে এসেছে তরী।
ক্লান্ত শরীরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালো সে। শাড়িটা এলোমেলো হয়ে গেছে। এই এলোমেলো শাড়িতে ও নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলো তরী। তরঙ্গের পছন্দের তারিফ করতে হয়। ছেলেটার পছন্দ বরাবর ই সুন্দর। যেমন এই শাড়িটা। হলুদ, সবুজ আর লাল সুতোর সংমিশ্রণে কাজ করা। সাথে সবুজ ব্লাউজ। শ্যামবর্ণের তরীর গায়ে শাড়িটা বেশ মানিয়েছে। মুচকি হাসি ফুটে উঠলো তরীর ওষ্ঠে।
–” নিজেকে এতো খুঁটিয়ে দেখার কিছু নেই। তরঙ্গ দেওয়ানের পছন্দ বরাবর ই বেস্ট।”
নিজের মনের কথা তরঙ্গের মুখে শুনতে পেয়ে লজ্জায় র*ক্ত জমলো তরীর গালে। আয়নার সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেলো সে।
–” আপনার পছন্দ খুব বাজে।”
স্মিত হেসে কয়েক পা এগিয়ে এলো তরঙ্গ।
–” কে বললো?”
–” ঢং করছেন কেন?”
–” বউয়ের সাথেই তো ঢং করবো।”
চুপ করে রইলো তরী, তরঙ্গ কিছু মনে করার ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলো।
–” এই টেমা আমাদের বিয়ের কথা জানে না?”
“আমাদের বিয়ে” শব্দ দুটো খুব কানে বাজলো তরীর। চিকন আঙুল গুলোর ডগায় শাড়ি খাবলে ধরলো সে।
–” কি..সের বিয়ে, আমি মানি টানি না এসব।”
তরঙ্গ শেষ দূরত্ব টুকু মাড়িয়ে তরীর নিকট এলো। টেনে ধরলো তার লম্বা বেণুণি টা।
–” খুব বাড় বেড়েছিস তো তরকারি জান। চাচি থাকলে তাকে আমি কি বলতাম জানিস?”
–” কি?”
–” ও টুনির মা,
তোমার টুনি কথা শোনে না।
যার তার লগে ডেটিং মারে।
আমায় চেনে না।”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
আজকের পার্টটা খুব ছোটো। আমি নিজেই স্বীকার করলাম। সারাদিন খুব অসুস্থ ছিলাম। খাইনি পর্যন্ত, শুয়ে ছিলাম। ইদানীং নার্ভ খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই সহজে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আপনাদের এসব বলতে আমার ও ভালো লাগে না। কিন্তু তবুও না বললে আপনারা ভুল বুঝবেন। রিচেক দেইনি।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
She is my Obsession পর্ব ১৯
-
জল তরঙ্গের প্রেম গল্পের লিংক
-
She is my Obsession পর্ব ১১
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ৯
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২