ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
মধ্যরাতে প্রকৃতি গুমোট হয়ে আছে। হঠাৎ করেই নিজের রুপ বদলেছে আকাশ। সুন্দরী শশী ঢাকা পড়ে আছে কালো কুচকুচে নিরদের আড়ালে। ক্ষণে ক্ষণে আলোর রেখা দাগ কেটে যাচ্ছে অম্বর চিরে। বইছে ঝিরঝিরে হাওয়া। প্রকৃতি বৃষ্টির আগমনী বার্তা দিলেও নিশ্চয়তা সীমিত। মানুষের মতো সবকিছুই আজকাল আশা দিয়ে ছলনা করছে।
শেখ বাড়ির ছাদে কার্নিশ ঘেঁষে বসে আছে আরুষ। হাতে লাল টকটকে একখানা শাড়ি। বিদ্যুৎ ঝলকানির আলোয় রংটা বড্ড আবেদনময়ী দেখাচ্ছে। নগর থেকে গুঞ্জরিকার শেষ আবদার রাখতে এটাই কিনে এনেছিল আরুষ। শাড়িটা সঙ্গে নিয়ে কতশত কল্পনা এঁকেছিল মন কুঠুরিতে। তাকে ছোঁয়ার আশা ছিল না। কেবল মন ভরে চোখের সবটুকু তৃষ্ণা মিটিয়ে একরাত দেখতে চেয়েছিল। দেহের চাহিদার থেকে আরুষের মনের চাহিদা বেশি ছিল। কিন্তু ধেয়ে আসা কালবৈশাখীতে সব হারিয়ে পথের পথিক হয়ে বসল ছেলেটা। মানুষ সবচেয়ে বড়ো বোকা সেখানে বনে যায় যেখানে শত্রুপক্ষ থাকে নিজের বিশ্বস্ত কাছের কেউ। যারা প্রকাশ্যে খারাপ তাদের থেকে আমরা নিজেদের গুটিয়ে রাখি কিন্তু যারা মাকাল ফল তাদের বেলায় আমরা অসহায় থাকি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের নিক্ষেপ করা ছুরিটা আমাদের ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে যায়। আরুষের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
রাত গভীর হচ্ছে। আরুষ সিক্ত নয়নজোড়া নিয়ে একদৃষ্টে হাতে থাকা লাল শাড়িটার দিকে চেয়ে আছে। চোখদুটো নিষ্প্রাণ। ভেতরে যে গুমোট তুফান বয়ে চলছে তার সাক্ষী দিচ্ছে ওই নির্ঘুম রক্তাক্ত নেত্র যুগল। অব্যক্ত কথাগুলো যেন চোখের ভাষাতেই বোঝা সম্ভব। কী হৃদয়বিদারক চাহনি! ঠিক কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে ওই নিষ্প্রভ আঁখি জোড়ায় তা যেন বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এই পর্যায়ে দুয়েক ফোটা নোনা জল টপ টপ করে ঝরে পড়ল শাড়িটার আঁচলে। পরক্ষণেই শোনা গেল ভঙ্গুর শীতল পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“তুমি আমার হলে এই পৃথিবীর সবকিছুতে বড়ো অনিয়ম হয়ে যেত। চাঁদ, সূর্য, নক্ষত্র বোধহয় নীরব যুদ্ধ ঘোষণা করত পৃথিবীর বিরুদ্ধে। তাই হয়ত তুমি আমার হওনি, গুঞ্জন।”
পরপরই শাড়িটা নিজের দুই কাধের উপর রাখল আরুষ। বুকচিরে পাঁজর ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। নীরবে নিভৃতে একাকী বসে রইল ছেলেটা। এই জীবন নিয়ে তার আফসোসের শেষ নেই। হাহ্! সে যদি এই শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ না করে একটা ফকিরের ঘরেও জন্মাত তবুও তার এতখানি আক্ষেপ থাকত না। মনে শান্তি না থাকলে ধনসম্পদ দিয়ে কী হবে? মানসিক শান্তির উপরে যে আর কিছু নেই। আরুষের খুব করে মা নামক মানুষটাকে জিজ্ঞাসা করতে মন চায়,
“একটা নিষ্পাপ শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখতে দিলে খুব কি ক্ষতি হতো, আম্মা? সে তো আপনার ছেলেরও অংশ ছিল। তার শরীরে গরীবের রক্তের পাশাপাশি এই বিত্তশালী পরিবারের ও রক্ত ছিল। তাহলে তাকে কিসের শাস্তি দেওয়া হলো?”
কিন্তু আরুষ জিজ্ঞাসা করতে পারে না। মা নামক মানুষটার প্রতি জন্ম নেওয়া আকাশসম বিতৃষ্ণার অন্তরালে এই কথাগুলো চাপা পড়ে যায়। যার কাছে নিজের মূল্য নেই তাঁর কাছে কী জিজ্ঞাসা করবে? মানুষ প্রশ্নবিদ্ধ তো কেবল আপনজনদের করে। কমলিকা না বললে হয়ত এত বড়ো সত্যটা আরুষের নিকট অজানাই থেকে যেত।
.
চারপাশে সবে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকারের অস্তিত্ব খুব একটা গাঢ় নয়। গ্রাম গঞ্জের মানুষ লাঙ্গল হাতে চলেছে মাঠের দিকে। বড়ো একটা নদী। তরঙ্গে তার বিষাদের সুর। শীতল বাতাসে সর্বস্ব হারানোর হাহাকার। তটিনীর একুল কাঁপিয়ে দূর থেকে লঞ্চের শব্দ ভেসে আসছে। একটা আলো ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা যাচ্ছে না সেদিকে। নদীর ঘাটের পাশে মানুষের ঢল নেমেছে। পুরুষের সংখ্যা নারীর তিনগুণ। সেই ঢলে দেখা যাচ্ছে গুঞ্জরিকাকে। সবসময়ের মতোই শাড়ি দ্বারা আবৃত করে রেখেছে নিজেকে। হাতে স্বল্প টাকা ছিল। তাই নিয়েই জীবনের নতুন গন্তব্যে রওনা দিয়েছে। সঙ্গে কেবল একটা পুঁটলি আছে। সেখানে টুকটাক প্রয়োজনীয় কিছু আছে।
বিগত কয়েকদিন আড়তে কাজের সময় মালিকের থেকে সুদূর নগর ঢাকা যাওয়ার সবটা জেনে নিয়েছে গুঞ্জরিকা। আজ সেই মোতাবেক মধ্যরাতের পরে রওনা দিয়েছিল। ছোট্ট একটা শাখা নদী পেরিয়ে এই বড়ো নদীর ঘাটে এসে উপস্থিত হয়েছে। নাও পারাপারের পুরোটা সময় অবাধ্য চোখদুটো বর্ষণ নামিয়ে নিজেদের সিক্ত করেছে। পাওয়া না পাওয়ার খেলায় কিসের এত মায়া? আমরা কেন পারিনা মনের বিরুদ্ধে যেয়ে কিছু করতে? সব কষ্ট কেবল প্রিয়জনদের থেকেই কেন পেতে হয়? ধরণির নিয়ম উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কেন? জাত পাত নিয়ে কেন এত ভেদাভেদ?
গুঞ্জরিকা যখন একাধিক প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে মরিয়া তখন আস্তে ধীরে লঞ্চটা এসে ঘাটে থামল। কিছু যাত্রী নামল। এবার অপেক্ষারত যাত্রীরা লঞ্চে ওঠার জন্য তাড়াহুড়ো করে সারি ধরল। গুঞ্জরিকার অবশ্য এত তাড়া নেই। তার দেহটা কেবল যন্ত্রের ন্যায় চলছে। মন তো সেই শেখ বাড়িতে তার না হওয়া সংসারে পড়ে আছে। হঠাৎ করেই গুঞ্জরিকার স্মরণ হলো আরিকার কথা। কাঁধেই তো ছিল। অকস্মাৎ কোথায় চলে গেল? উঠতে হবে তো লঞ্চে। মনে মনে নাম নিতেই কোথায় থেকে উড়ে এসে কাঁধে বসল আরিকা পাখি। গুঞ্জন ওর দিকে চেয়ে শুধাল,
“কোথায় গিয়েছিলিস? এভাবে হুটহাট কোথায় চলে যাস?”
গুঞ্জরিকার কণ্ঠস্বর বড্ড মলিন শোনাল। মায়ের এমন ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথাতে আরিকা চুপ রইল। মায়া ভরা চোখে ঘোমটার দিকে তাকিয়ে রইল। গুঞ্জরিকা আর বিশেষ কিছু বলল না। লঞ্চে পা দিতে নিয়ে বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। মন চাইল, লঞ্চে উঠিস না গুঞ্জ। তোর শেখ বাবুর ছায়া বিহীন জীবন এত সহজ নয় রে। ওই লাখো মানুষের বসবাসরত ঢাকাতে তুই একা টিকে থাকতে পারবি না। অপরদিকে সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক বিরোধীতা করে বসল, তুই যা গুঞ্জ। এত ফেলনা ব্যক্তিত্বে তোকে মানায় না। যাদের জন্য তুই সব ত্যাগ করলি দিনশেষে তারা তোর জন্য কী করল? কী প্রতিদান দিল? পেলি তো কেবল এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতা।
গুঞ্জরিকা তাচ্ছিল্য হাসল। আবেগ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রেম ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না। একজন মানুষ বাঁচে কেবল সম্মানের মাঝে। গুঞ্জরিকা শুনল মস্তিষ্কের কথা। কোমরে পুঁটলি আর কাঁধে আরিকাকে নিয়ে লঞ্চে উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই সময় আরিকা বলে উঠল,
“বাব্বা, বাব্বা।”
গুঞ্জরিকার বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। একবার পিছু ফিরে দেখল। আর কখনো এখানে আসা হবে না। নিজের গ্রামে আর কখনো বুকভরে শ্বাস নেওয়া হবে না। ওর ক্ষেত্রে জীবন এমন কঠিন কেন হলো? গাল বেয়ে পুনরায় বারিধারা নামল। গুঞ্জরিকা বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আপনাকে ভালোবেসে শাস্তি স্বরূপ আমি দেশান্তরী হলাম, শেখ বাবু। আপনি ছিলেন এই নদীর ঢেইয়ের মতোই। কেবল আমাকে ছুঁয়ে গেছেন কিন্তু আমার হয়ে থাকেননি।”
.
ঘড়ির কাঁটা ঘুরে নিজের ঘাঁটি স্থাপন করেছে সাতটার ঘরে। শাহরিয়ার বসে আছে ঘরের দাওয়ায়। একটু দূরে উঠানে রান্নাঘরে রান্না করছে কমলিকা। শাহরিয়ার রান্না করা খাবার নিয়ে খালার বাড়িতে যাবে। ববিতা শাহ্ গেছেন বোনের বাসায়। শাহরিয়ার এর খালাতো ভাই এসে নিয়ে গেছে সপ্তাহখানেক আগে। এত বড়ো সুখবরটা এখনো জানানোর সুযোগ হয়নি তাঁকে। মাকে নিয়ে আসার জন্য আজ কাজ থেকে খুব কষ্টে সময় বের করেছে আরুষ। এই অবস্থায় কমলিকার একা হাতে সংসারের সব কাজ করা ঠিক হবে না। অনাগত সন্তান নিয়ে কোনোপ্রকার ঝুঁকি নিতে চায় না শাহরিয়ার। তবে রোযা রাখার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। শরীরে কুলালে করবে। অনুমতি পেতেই কমলিকা না করেনি। রোযা রাখছে। এতে ভালো বই মন্দ নেই। আল্লাহর একনিষ্ঠ হতে পারলে জীবন এমনিতেই সহজ হয়ে যায়। শাহরিয়ার একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কমলিকার দিকে। এইত সেদিন ছোট্ট একটা পুতুল বিয়ে করে এনেছিল। প্রথম প্রথম শাহরিয়ার কাছে যেতে চাইলে মেয়েটা ভয়ে গুটিয়ে নিত নিজেকে। কেঁদে দেওয়ার উপক্রম হতো। শাহরিয়ার এই নিয়ে বারকয় অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল। এত বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে তাকে বেশ কয়েকমাস অভুক্ত থাকতে হয়েছিল। অথচ এখন নাকি সেই বাচ্চা মেয়েটার গর্ভে ওর অংশ বেড়ে উঠছে! কী আশ্চর্য! আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এটাই ছিল। শাহরিয়ার এই খুশি কখনো কাউকে বোঝাতে পারবে না।
কমলিকা বাড়ি পোষা রাজহাঁসের মাংস রান্না করছে। চুলোয় সেটাই হচ্ছে। আর হাতে রুটি বেলছে। এইপর্যায়ে তাকাল শাহরিয়ার এর দিকে। অনুরোধের সুরে বলল,
“মা গেছে ওখানে। থাকুক কয়েকদিন। আমি তো ঠিকই আছি এখন। পারব সবটা সামলিয়ে নিতে।”
শাহরিয়ার তখনো চেয়ে আছে কমলিকার দিকে। গম্ভীর কণ্ঠস্বরে জবাব দিল,
“পারবে সেটা আমিও জানি কমলারানী। কিন্তু কথা হচ্ছে তোমাকে বাড়িতে একা এভাবে রেখে আমি কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারব না। কসম সব কাজ ভুলভাল করে রাখব। পরবর্তীতে বড়ো অঙ্কের টাকা বাঁশ খাব। তুমি কি এটা চাও?”
কমলিকা ভেংচি কাটল। দৃষ্টি সরিয়ে কড়াইয়ে রাখল। খুন্তি দিয়ে মাংস নেড়ে বলল,
“ঢং দেখলে বাঁচি না। আর কারোর বউ যেন সন্তানসম্ভবা হয় না।”
শাহরিয়ার মুচকি হাসল। অকপটে বলে বসল,
“অন্যদের বউয়ের সময় তো আমি অভিজ্ঞতা পাইনি, ভালোবাসা আমার। কারণ আমার বিয়ে করা একমাত্র বউ তুমি। এত চমৎকার অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবটা তুমি দিচ্ছ। দশমাস সময় নিয়ে একটু একটু করে তোমার গর্ভে বেড়ে উঠবে আমার খুকি। তাহলে সামান্য এতটুকু যত্ন কি তোমার প্রাপ্য নয়? বউয়ের শাড়ির আঁচল ধরে না ঘুরলেও তাকে তার প্রাপ্য টুকু দিতে জানি, হুহ্!”
কমলিকা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে শাহরিয়ার এর দিকে। মানুষটা বাবা হওয়ার খুশিতে পাগল টাগল হলো নাকি? কেমন বেফাঁস কথাবার্তা বলছে! যদিও এটা তার পুরোনো অভ্যাস। তবে ইদানিং কোনো রাখঢাক নেই। কমলিকা ওদিকে আর গেল না। কারণ ভদ্রলোকের সাথে সে কথায় পারবে না। মুখে বলল,
“পানি তোলা আছে। গোসল করে নিন। আমার রান্না হয়ে এল।”
শাহরিয়ার একবাক্যে মেনে নিল। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ঘরের ভেতরে চলে গেল গামছা নেওয়ার উদ্দেশে। কমলিকার অধরযুগলে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কমলিকার ছোট্ট সাধারণ জীবনটা ঠিক ওই মানুষটার সান্নিধ্যে পরিপূর্ণ।
.
‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’
একটা বাক্য গ্রামাঞ্চলে ভীষণ প্রচলিত আছে। সাধারণত কষ্টের উপর কষ্ট বা বিপদের পর কেবল বিপদ এলে মানুষেরা এই বাক্যটা বলে থাকে। রোকেয়া শেখের অবস্থাটা ঠিক এমনই এখন। আজ ভোররাতে আয়েশা শেখ না থাকার উপরে ছিলেন। আল্লাহর নাম কানে দেওয়া অবধি হয়েছিল। সেই সময়ে দিকবেদিক ভুলে অতি পাকনামি করে দোতলায় অদিতিকে ডাকতে গিয়েছিলেন রোকেয়া শেখ। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ব্যথিত কোমর নিয়ে লাঠির ভারসাম্য হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন। নাক মুখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল। ওনার চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এরকম ভয়াবহ অবস্থা দেখেছিল। কারোর তো ধড়ে প্রাণ ছিল না তখন। আরুষ সেই ভোরেই ডাক্তারের কাছে ছুটেছিল। ডাক্তার এরকম বিপদে হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। আরুষের সাথেই এসেছিলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন, হয়ত কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। আঘাত জোরাল। এই বয়সে হাড় ভাঙলে নিরাময় সম্ভব হবে কিনা সেই নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। নগরে নিয়ে যেয়ে ভালো ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন। এবং আঘাতপ্রাপ্ত মুখমণ্ডলের ব্যথা ও ক্ষত নিরাময়ের জন্য মলম এবং ঔষধ দিয়ে গেছেন তিনি।
সেই সকাল থেকে একপ্রকার আতঙ্কে আছেন রোকেয়া শেখ। কেঁদে কুটে সম্পূর্ণ বাড়ি মাথায় তুলছেন। শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে নিজের মনের ভয় ওনাকে কাবু করে ফেলছে। বারবার শাশুড়ির পঁচা গলা দেহের করুণ দৃশ্য চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে। এই কোমর যদি ঠিক না হয় তাহলে উনি আর কখনো হাঁটতে পারবেন না। তাহলে কি শেষ সময়ে ওভাবেই এই দেহ পঁচে যাবে? নিজের করা পাপ থেকে কীভাবে বাঁচবেন তিনি? পাশে বসা অদিতির হাত শক্ত করে ধরে একমনে কেঁদে চলেছেন। বিচক্ষণ অদিতি মায়ের মনের অবস্থা ঠিকই বুঝেছে। তাই নিজেও মায়ের কক্ষ থেকে কোথাও যায়নি।
সালেহা শেখ এবং সারথী আছেন আয়েশা শেখের কাছে। ওই যে সবাই সঙ্গ ত্যাগ করলেও মেয়েরা পারেনা মাকে ছেড়ে দিতে। রোকেয়া শেখের নিকট আসমান শেখ, আরুষ, অদিতি এবং চন্দ্রা আছে। আসমান শেখ এবং আরুষ নগরে যাওয়ার বিষয় নিয়ে কথা বলছে। তাদের কথার মধ্যে ফোড়ন কাটলেন রোকেয়া শেখ। ক্রন্দনরত গলায় বললেন,
“আমাকে কখন নিয়ে যাবে তোমরা? আমি সুস্থ হতে চাই। এভাবে থাকতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে।”
আসমান শেখ কথা থামিয়ে অসহায় চোখে তাকালেন প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে। মানুষটাকে বড়ো ভালোবাসেন তিনি। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল তাদের। আসমান শেখের প্রথম ভালোবাসা তার স্ত্রী। তাইতো এত অপরাধের পরেও পারেননি তাকে ছেড়ে দিতে। আরুষ হিমশীতল গলায় প্রত্যুত্তর করল,
“সন্ধ্যায় যেই লঞ্চটা আছে ওইটাতে আমরা যাব আম্মা। আসরের নামাজ পড়ে এখান থেকে রওনা দেব।”
এত সময়! আয়েশা শেখের তো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শরীরে পচন ধরেছিল। ওনারও যদি এইসময়ে ওরকম হয়ে যায়। রোকেয়া শেখের কান্নার আওয়াজ ক্রমশ বাড়ল। চোরের মন পুলিশ পুলিশ বলে একটা কথা আছে বৈকি। অদূরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে চন্দ্রা। দৃষ্টি নির্লিপ্ত। এই মহিলার কান্নায় বেজায় বিরক্ত সে। চোখ মুখ দেখেই তা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে। অদিতি চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসল। শুধাল,
“তুমি কি কোনো কারণে বিরক্ত হচ্ছ ভাবী?”
চন্দ্রা চোখ ফিরিয়ে অদিতির দিকে দেখল। নিঃস্পৃহ গলায় বলল,
“আম্মা অযথা কাঁদছে এত। সামান্য পড়েই তো গেছে। এক কলসি পাপের বিনিময়ে এতটুকু প্রাপ্য থাকে। তবুও তো ডাক্তার দেখালে ঠিক হয়ে যাবে। দাদীর অসুস্থতার মধ্যে এরকম মরা কান্নার প্রয়োজন দেখছি না।”
রোকেয়া শেখ চকিতে ফিরে তাকালেন চন্দ্রার দিকে। যাকে নিজে পছন্দ করে এই পরিবারের রানী করে এনেছিলেন তার মুখ থেকে উচ্চারিত এই কথা ঠিক হজম করতে পারলেন না। অতি বিস্ময়ে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। আরুষের কপালে গুটিকয় ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। আসমান শেখ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অদিতির মুখের হাসি বাড়ল,
“তাহলে তিনটা প্রাণ হত্যার অপরাধে তোমাকেও নিশ্চয় ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে ভাবী? আম্মা আর তোমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তোমরা কেউ মন হত্যা করেছ কেউবা জলজ্যান্ত প্রাণ।”
আরুষ আড়চোখে তাকাল অদিতির দিকে। অদিতি তাকিয়ে ছিল ভাইজানের দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল কিয়ৎসময়ের জন্য। মেয়েটা কথাটা দুজনের নাম নিয়ে বললেও আরুষের দিকে ঠিকই ঠেস মেরেছে। চন্দ্রার হঠাৎ রাগ বাড়ল। এই মহিলার সাথে তাকে কীভাবে তুলনা দিল! উঁচু গলায় বলে উঠল,
“আমাকে তুমি ওই মহিলার সাথে তুলনা দিতে পারো না অদিতি। আমি পরিস্থিতির শিকার ছিলাম কিন্তু তিনি? স্বেচ্ছায় একটা নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ নিয়েছে। ঘৃণা করি ওই মুখটাকে। তিনি একজন নারী হয়েও পারেনি আরেকজন নারীর ঢাল হতে। বসে বসে মজা নিয়েছে শুধু। আমার জীবন নষ্টের পিছনে তিনিও আছেন”
আসমান শেখ কথার আগামাথা খুঁজে পেলেন না। কেবল হত্যার বিষয়টুকুই বুঝলেন। তিনি সবটা জেনেছেন এইত কিছুদিন আগে। অদিতি সবটা বলেছিল তাঁকে। কিন্তু বাকি সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। রোকেয়া শেখের অবস্থাটা একই। ইতোমধ্যে ওনার কান্না থেমে গেছে। আরুষ এতক্ষণ নীরব দর্শক ছিল। এইপর্যায়ে শ্লথগতিতে হেটে যেয়ে চন্দ্রার মুখোমুখি দাঁড়াল। কিন্তু চন্দ্রার দিকে তাকাল না। মেঝেতে দৃষ্টি নিবিষ্ট রইল। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“আপনি আমার আশ্রয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। আমি দিয়েছিলাম আপনাকে সেই আশ্রয়। কারণ আমি জানতাম আপনি অনাথ। কিন্তু এখন জেনেছি ঘটনা ভিন্ন। আপনি এই পরিবারের সদস্য। আমার ছোট আব্বুর একমাত্র কন্যা চন্দ্রা শেখ। এই পরিচয়ের চেয়ে বড়ো আর কোনো পরিচয় হতে পারে না। আপনি শেখ বংশের সবকিছুতে প্রাপ্য ভাগ টুকু পাবেন। এবং আশারাখি সেটা দিয়ে একজীবন বসে খেতে পারবেন। কারোর আশ্রয় আপনার প্রয়োজন পড়বে না।”
একটু থামল আরুষ। আসমান শেখ এবং রোকেয়া শেখ তব্দা খেয়ে লোচন দ্বয় বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছেন। এতটা অপ্রত্যাশিত কথা হজম হচ্ছে না তাদের। চন্দ্রা আটকে আছে আপনি সম্বোধনে। তুমি থেকে আপনি! আরুষ ফের বলতে শুরু করল,
“যেই ইসলামকে সাক্ষী রেখে আপনাকে গ্রহণ করেছিলাম আজ সেই ইসলামের নিয়ম অনুসারে আপনাকে ত্যাগ করছি অর্থাৎ তালাক দিচ্ছি। তালাক, তালাক, তালাক। আপনি ভালো থাকুন, তাইমুরের চন্দ্রাবতী।”
মুখের কথাতে ইতি টেনে হনহনিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আরুষ। একখণ্ড বজ্রপাতের ন্যায় সবটা ঘটে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবটা হাতের নাগালের বাইরে চলে গেল যেন। অদিতি নির্বাক হয়ে বসে আছে। ভাইজান এমন কিছু করবে কিংবা করতে পারে সবটা কল্পনাতীত ছিল। চন্দ্রা ধপাস করে ওখানেই বসে পড়ল। মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোল না। পাথরের ন্যায় চুপচাপ বসে রইল। তাইমুরের চন্দ্রাবতী সম্বোধন যেন ধোঁয়াশা সবকিছু পানির মতো স্বচ্ছ করে দিল। আরুষ যখন দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেল তখন দুয়ারের দিকে তাকাল চন্দ্রা। রাগে কষ্টে দুহাতে খামচে ধরল মাথার চুলগুলো। তৎক্ষণাৎ অদিতির কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কথাটা বলল রোকেয়া শেখের উদ্দেশে,
“তোমার আঙ্গুলের ইশারায় নাচা বিড়াল দেখি সিংহ হয়েছে। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে শিখেছে। মনে হচ্ছে তাকে হুমকি দিয়ে আর কাজ হবে না। এখন তোমার কী হবে? কার উপর নিজের দখলদারিত্ব চালাবে? শেখ বংশ কীভাবে বাড়াবে? কাকে দুটো বিয়ে দেবে, আম্মা? বাবাকে?”
রোকেয়া শেখ এবং আসমান শেখের নেত্র যুগল বড়ো বড়ো হয়ে এল। এত কষ্টের মাঝেও চন্দ্রার হাসি পেল। চোখ মুখে হাসল মেয়েটা। আসমান শেখ ইতস্ততবোধ করলেন। পায়ে পায়ে হেঁটে কক্ষ ত্যাগ করলেন। রোকেয়া শেখ কেমন যেন পাথর বনে গেলেন। চেয়েও মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারলেন না।
চলবে
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন পাঠক। আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ২৪
-
পরগাছা পর্ব ৬
-
পরগাছা পর্ব ১৩
-
পরগাছা পর্ব ১৭
-
পরগাছা পর্ব ৩২
-
পরগাছা পর্ব ১৯
-
পরগাছা পর্ব ২০
-
পরগাছা পর্ব ৯
-
পরগাছা পর্ব ১৬
-
পরগাছা পর্ব ১