জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;১৮
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
দুপুরের রোদের তাপ বেড়েছে। সূর্যের তেজের কারণে খালি চোখে আকাশের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
বেলা সাড়ে বারোটা বাজতে চলেছে। এখনো রুমাদের মেহেদি অনুষ্ঠান শেষ হয়নি। মেয়ে দুটো রুমার হাতের উপর পৃষ্ঠে মেহেদী লাগিয়ে দিচ্ছে। তালুর মেহেদী দেওয়া শেষ। তরীর হাতে মেহেদী দেওয়া শেষ হতেই ভাবি মাথা তুললো। সূক্ষ্ম চোখে পরোখ করলো তরীর হাত। ডিজাইনে কোথাও সমস্যা আছে কিনা দেখে নিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। যাক অবশেষে শেষ হলো।
–” কেমন হয়েছে বলো?”
–” খুব সুন্দর হয়েছে। আমি এবার একটু উঠি ভাবি। কোমর ধরে গেছে।”
–” যাও বাপু। তবে এখনি পানি লাগাবে না হাতে। রঙ দেখিয়ে যাবে আমাকে। কেমন?”
–” আচ্ছা।”
আসর ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তরী। এতক্ষণ বসে থাকার দরুন সে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরিয়ে উঠলো। উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতেই সাহনারার সামনে পড়লো তরী। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে এলো তার। এখন ভরা মজলিসে অপমানিত না হলেই হয়। অবশ্য কাল যা ঘটেছে, তাতে চাচি কথা শুনাবেন না এটা স্বপ্নে ও কল্পনা করতে পারছে না তরী। তীক্ষ্ম চোখে, মুখ শক্ত করে তরীর দিকে তাকালেন সাহনারা। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত অগ্নি চোখে পরোখ করে তরীর নিকট এগিয়ে এলেন।
–” রঙ ঢঙ দেখছি উতলে উঠছে তোর। আমার চাঁদের টুকরো ছেলেকে ফাঁসিয়ে এখন রঙ করা হচ্ছে। আরো কতো রঙ যে দেখা বাকি। এখনি শাড়ি, চুড়ি, মেহেদী পরে বউ সেজেছেন তিনি। তোর রঙে তেনাদের নজর পড়ুক। কেউ এসে তুলে নিয়ে যাক।আমি ই বা বলি কি। কালিদের আবার তেনারা নেয় নাকি।”
চাচির ঝাঁঝালো কথায় তরীর চোখ টলমল করে উঠলো। তাকে এতোটা ঘৃণা করে চাচি? যে ভূত-প্রেত তাকে তুলে নিয়ে যাক? এমন প্রার্থনা করছেন তিনি। সে তো কিছুতেই ছিলো না। না চাচিদের প্ল্যানে! না তরঙ্গের! শুধু শুধু মাঝ দিয়ে এই বিয়েটা হয়ে গেলো। কাল রাতে সবার সামনে অপমান করেছেন। তার চরিত্রের দিকে ও আঙুল তুলেছেন। এতোটা কথা শুনিয়ে ও ওনার মন ভরেনি? তরীকে চুপ থাকতে দেখে সাহনারা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
–” কাল রাতে নাকি তরঙ্গের সাথে শুয়ে ছিলি? শরীরের এতো উত্তাপ কিসের রে? বিয়েতে রাজি না থাকলে কেউ এমন বিছানায় শুয়ে পড়তে পারে?”
আর সহ্য হলো না তরীর। সে তো ইচ্ছে করে তরঙ্গের ঘরে যায়নি। জোর করে তাকে নিয়ে গিয়েছিল তরঙ্গ।
–” দোহাই লাগে, থামো চাচি। আমার আর সহ্য হচ্ছে না এসব কথা। তোমার ছেলের কাছে আমি যাইনি। সে শুধু পাশে শুয়ে ছিলো। আমি তার হাতটা ও ছুঁইনি।”
–” প্রমাণ কী আছে? তুই যে মিথ্যে বলছিস না। তার নিশ্চয়তা কী?”
কথাটা শুনে ভিতর থেকে কেঁপে উঠলো তরী। লজ্জা আর অপমানে শরীরটা রি রি করে উঠলো তার। গুরুজন হয়ে চাচি এমন প্রশ্ন করবেন। এটা সে কল্পনা ও করেনি।
–“মানে? আমি এখন তোমাকে কীভাবে প্রমাণ দেবো?”
কথা গুলো বলতে গিয়ে ও গলা কেঁপে উঠলো তরীর। চোখের কোণ ঘেঁষে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো অজান্তেই।
–” সাহনারা এদিকে আসো তো। ওখানে কি করছো তুমি? দেখে যাও, মুরগি টা হয়েছে কিনা।”
তরঙ্গের মামীর ডাকে দু’জনেই রান্না ঘরের দিকে তাকালো। চাচি অন্যমনস্ক হতেই সেই সুযোগে সিঁড়ির দিকে ছুটলো তরী। সময় নিয়ে শাড়ি সামলে উপরে এলো সে। তরঙ্গের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ইচ্ছে না থাকা শর্তে ও সেদিকে এগিয়ে গেলো। তার সব জিনিসপত্র ওই ঘরে। রুমে ঢুকে সস্থির শ্বাস টানলো সে। তরঙ্গ ঘরে নেই। সকাল থেকে দুজনের একবার ও দেখা হয়নি। যতক্ষণ তরী তার চোখের আড়ালে থাকবে ততোই শান্তি। অন্তত চাচির কটু কথা থেকে বাঁচা যাবে। ওমন নোংরা ইশারা – ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলবে না।
দু’হাত সাবধানে রেখে, বিরক্তি নিয়ে বেডের হেড বোর্ডে পিঠ এলিয়ে দিলো তরী। ফ্যানের বাতাসে চোখ বুঁজে এলো তার। এতক্ষণ গরমে বসে থাকায় শীতল বাতাস পেতেই মাথার চিন্তারা সরে; চোখে ভর করলো একরাশ ঘুম।
তরঙ্গের শাওয়ার সবে শেষ হয়েছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ভেজা চুল গুলো টাওয়াল দিয়ে আলতো করে মুছে, টাওয়ার গলায় ঝুলিয়ে নিলো সে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে উদোম শরীরে বডি স্প্রে করে নিলো। পুরুষালি পারফিউমের তীব্র সুভাষ মূহুর্তে সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো। বেলি ফুলের ঘ্রাণ মৌ মৌ করে উঠলো। হঠাৎ, আয়নায় চোখ পড়তেই তার দৃষ্টি সেদিকে থেমে গেলো। বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা তরীকে দেখে মিটি মিটি হেসে উঠলো তরঙ্গ। পারফিউমটা যথা স্থানে রেখে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এলো সে।
কিন্তু তরীর হাতের দিকে চোখ পড়তেই দ্বিতীয় বারের মতো থমকালো তরঙ্গ।
–” মেয়েটা মেহেদি পরেছে?”
শেষ তিন বছরে তরীর হাতে মেহেদির কোনো চিহ্ন সে দেখেছে; এমন স্মৃতি তার মনে পড়ছে না। তরঙ্গ লাফিয়ে এসে তরীর পাশে বসে পড়লো। হাত দুটো টেনে নিলো নিজের কোলে। হন্যে হয়ে তরীর মেহেদীতে রাঙানো দু’হাতে নিজের নাম খুঁজলো সে। তীক্ষ্ম চোখে পরোখ করে ও নাম না পেয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তরঙ্গের।
–” কি দেখছেন আপনি?”
তরীর প্রশ্নে, থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করলো তরঙ্গ;-
–” আমার নাম কই?”
–” কোথায়?”
–” তোর হাতে! খুঁজে পাচ্ছি না কেন?”
বিরস মুখে তরী জবাব দিলো।
–” লিখিনি।”
–” মানে?”
–” লিখিনি মানে লিখিনি। এর অবার আলাদা মানে হয় নাকি?”
–” দূর, তুই একটা পাষাণ মহিলা। আমাকে একটু ও ভালোবাসিস না।”
–” আমি কখনো আপনাকে বলিনি। যে আমি আপনাকে ভালোবাসি। বেশি বুঝলে যা হয়।”
–” বেশি বুঝি, আর কম বুঝি। সে তো আমার ই বউ তুই।”
তরঙ্গের কথায় থ হয়ে গেলো তরী। সে ততক্ষণে উঠে বসেছে। নামতে গিয়ে শাড়িতে টান লাগলো তার। তরঙ্গ তার আচঁলের উপর বসে আছে। এদিকে তার পারফিউমের মিষ্টি সুভাষে তরীর ঘা শির শির করে উঠছে। বেহায়া নিঃশ্বাসেরা সেই ঘ্রাণ ভেতরে শুষে নিতে ব্যস্ত। দু’জনের মাঝের দূরত্ব এক হাতের থেকে কম। যার দরুন বার বার তরীর নাসারন্ধে এসে সুভাষের ধাক্কা খাচ্ছে। সহ্য করতে না পেরে তরী বললো,
–” আচঁল ছাড়ুন।”
–” ছাড়বো না।”
শীতল চোখে তরঙ্গের মুখের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে ” অসভ্য ” আওড়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো তরী। তরঙ্গ তখনো আচঁল টা ছাড়েনি। বরং হাঁটুর নিচে থেকে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো তা। আচঁল টা নাসারন্ধে রেখে গভীর শ্বাস টানলো তরঙ্গ। এইতো তরী তরী সুভাষ। এটাই সেই মিষ্টি সুভাষ টা। যা তরীর আশেপাশে থাকলে তার শরীর থেকে আসে। সুভাষটা তরঙ্গ কে মাতাল করতে সক্ষম। মেয়েটা শাড়িটা না পরতেই তরী, তরীময় হয়ে গেছে।
তবে তাকে জড়িয়ে ধরলে ও কি মেয়েটার সুভাষ আসবে তার শরীর থেকে? ভাবনা গুলো মাথায় ঘুরপাক খেতেই হাসি গাড়ো হলো তার। আচঁলটা আরেকটু চেপে ধরলো নাকের সাথে। তা দেখে বিরক্ত হলো তরী। আবার শুরু হয়েছে। দ্রুত পায়ে সামনে এগোতে গিয়ে কুঁচিতে পা লেগে দপ করে শাড়িটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। ঘাড় বাঁকিয়ে তা দেখে অবাকের সাথে বেশ মজা ও পেলো তরঙ্গ। তড়িৎ গতিতে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে।
–” খুলে ফেললি তো শাড়িটা? এখন সকলে কি ভাববে বল তো! যে তরঙ্গ একটা কন্ট্রোললেস ছেলে। যখন তখন বউয়ের শাড়ি ধরে টানাটানি শুরু করে।”
তরঙ্গের এমন লাগামহীন কথায় তরী চমকে নিজের দিকে তাকালো। পরণের শাড়িটা মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। শাড়ির কুঁচি গুলো খুলে যাওয়াতে আঁচল টা লম্বালম্বি ভাবে পা অব্দি পড়ে গেছে। আচঁলের কারণে শরীরের অপ্রত্যাশিত অঙ্গ গুলো তরঙ্গের দৃষ্টি গোচরেই। তবুও বজ্জাত ছেলেটা তাকিয়ে আছে। হাতে একটু আগেই মেহেদি দেওয়াতে হাত আটক। তাই শাড়িটা ধরতে ও পারছে না। মিটিমিটি হেসে তরঙ্গ বললো;-
–” আমাকে লোকে নির্লজ্জ বললে বলুক। তোকে পাওয়ার জন্য পৃথিবীর সব খারাপ উপাধিই আমি নিজের নামের পাশে জড়িয়ে নিতে পারি। আর মজার ব্যাপার কি জানিস? এভাবে ও তোকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে… টু মাচ হট।”
–” বেয়াদপ ছেলে, একটা থাপ্পড় দিবো।”
গাল বাড়িয়ে দিলো তরঙ্গ।
–” সিওর ম্যাম, আপনার ওই কোমল হাতের স্পর্শ আমার দেহে ছড়িয়ে আমাকে ধন্য করুন। ইচ্ছে হলে পিঠে ও খামচি, টামচি দিতে পারিস। আই ডোন্ট মাইন্ড।”
তরঙ্গের ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় চোখ পাকালো তরী। ওভাবেই ওয়াশরুমের দিকে এগোতে নিতেই তরঙ্গ ছুটে এসে পথ আগলে দাঁড়ালো।
–” কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
–” মেহেদী উঠাবো। তারপর শাড়ি পড়বো।”
–” প্রয়োজন নেই। আমি পরিয়ে দিচ্ছি তো। শাড়ি পরাতে পারি আমি।”
–” দরকার নেই।”
–” চুপ করে দাঁড়া।”
তরঙ্গের ধমকে মৃদ্যু কেঁপে উঠলো তরী। তা দেখে মুচকি হাসলো সে। বাহ, বউটা তার ধমকে কেঁপে উঠছে। ভালোই লাগছে। তরীর সুঠিল বাঁকানো কোমরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো তরঙ্গ। এগিয়ে এসে তরীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সে। মেঝেতে লুটিয়ে থাকা শাড়ির অংশটা আলতো করে তুলে দক্ষ হাতে কুঁচি করতে লাগলো সে।
কুঁচি গুঁজতে যেতেই হঠাৎ এক অপ্রস্তুত মুহূর্তে তরঙ্গের দীর্ঘ, পুরুষালি আঙুল ছুঁয়ে গেল তরীর মসৃণ, মেদহীন পেট। স্পর্শটা খুব ক্ষণিকের হলে ও; দু’জনের মাঝেই অদ্ভুত এক শিহরণ ছড়িয়ে দিলো। তরঙ্গের দৃষ্টি অজান্তেই থেমে রইলো সেখানে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায় অবাক হলো তরী। সেও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকাতেই লজ্জা আর বিরক্তির মিশেলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠাস করে একটা গাট্টা মারলো তরঙ্গের মাথায়।
–” অসভ্য লোক।”
বাম চোখে টিপুনী কাটলো তরঙ্গ।
–” একটু অসভ্যতামি করে তরকারি জান? তারপর শুধু অসভ্য ডাকা লাগবে না। পাশে প্লাস ও বসাতে পারবি।”
–” সর, সর সামনে থেকে।”
তরঙ্গ হেসে মাথা চুলকে আবার কাজে মন দিলো। তবুও তার চোখের কোণে লেগে থাকা দুষ্টুমি আর ঠোঁটের কোণের ফিচেল হাসিটা একটুও ম্লান হলো না। বরং, সেটাই যেন আর ও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আর তাতেই তরতর করে বেড়ে চললো তরীর অস্বস্তি। কুঁচি ঠিক করতে করতে বির বির করে গেয়ে উঠলো তরঙ্গ;-
–” তোকে একারে, দেখার লুকিয়ে কি মজা!
সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না।
তোকে চাওয়ারা পাওয়ারা নয় রে সোজা,,
সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না!”
চলবে
প্রিয় চড়ুই মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! বড় একটা পর্ব দিয়েছি। ১৪০০ শব্দ, পড়া শেষে মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না। আপনারা মন্তব্য জানালে লিখতে আগ্রহ পাই।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৫
-
She is my Obsession পর্ব ২৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৯
-
She is my Obsession পর্ব ২৫
-
She is my Obsession পর্ব ১৫
-
She is my Obsession পর্ব ১৩
-
She is my Obsession পর্ব ৩০