অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৮ (সারপ্রাইজ শুভ নববর্ষ)
অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৩৮ (সারপ্রাইজ শুভ নববর্ষ)
সকাল সকাল গ্রামের দৃশ্যটা যেন কোনো রঙিন উৎসবের ক্যানভাস। চারদিকে রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা, রিকশার টুংটাঙ শব্দ আর মাইকে বাজতে থাকা বৈশাখের চেনা সুরে চারপাশ মুখরিত। আজ গ্রামে পহেলা বৈশাখ। চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ছে রঙিন পাঞ্জাবি পরা ছেলেদের দল আর লাল-সাদা শাড়িতে সেজেগুজে বের হওয়া চঞ্চল মেয়েরা। কারো হাতে-পায়ে গাঢ় লাল আলতা, কারো এলো চুলে যত্নে জড়ানো সুগন্ধি গাজরা, আবার কারো চুলে পরিপাটি করে বাঁধা লম্বা বিনুনি।
চৌধুরী বাড়িটাও আজ এক অপূর্ব সাজে সেজেছে। শুভ্রা, রিদি, পাখি আর মিহি বাড়ির সব মেয়েরা সকাল সকাল স্নান সেরে সাজসজ্জায় মেতে উঠেছে। সবাই একই রকম শুভ্র সাদা রঙের লাল পাড় দেওয়া সুতি শাড়ি পরেছে। পায়ের গোড়ালি আলগোছে দেখা যায় এমন সামান্য উঁচু করে পরা শাড়িতে ওদের একেকজনকে যেন একেকটা জীবন্ত প্রতিমা মনে হচ্ছে। প্রত্যেকের হাত আর পায়ে আলতার আলপনা আঁকা।
রিদি নিজের লম্বা ঘন চুল দুটোকে যত্ন করে দুটো বিনুনি গেঁথে ফিতা দিয়ে বেঁধে দুই পাশে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ওর এক হাতে একগুচ্ছ ধবধবে সাদা কাঁচের চুড়ি আর অন্য হাতে টকটকে লাল কাঁচের চুড়ির রিনঝিন শব্দ। কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ আর চোখের গাঢ় কাজলে বৈশাখের এই স্নিগ্ধ সকালে রিদি যেন অনন্য এক রূপ ধারণ করেছে। বাড়ির প্রতিটি কোণে আজ নতুন বছরের আনন্দ আর বাঙালি ঐতিহ্যের ঘ্রাণ মিশে আছে।
শুভ্রা অপলক চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে মুগ্ধ গলায় বলল।
“রিদি, বিশ্বাস করবি না, যা লাগছে তোকে! তোকে এভাবে দেখে আমি নিজেই তো শেষ হয়ে যাচ্ছি রে!”
রিদি হাসিমুখে পাল্টা জবাব দিল।
“আর তোকে তো একদম আঙুর ফলের মতো মিষ্টি লাগছে! মনে হচ্ছে টুপ করে খেয়ে ফেলি!”
শুভ্রা নিজের সাজের ওপর হাত বুলিয়ে লাজুক হেসে জিজ্ঞেস করল।
“সত্যি? আমাকে অনেক সুন্দর লাগছে?”
রিদি ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল।
“সুন্দরের চেয়েও বেশি কিছু! যা মুখে বলে বোঝানো সম্ভব না!”
পাশ থেকে মিহি আর পাখি দুজনে ঠোঁট উল্টে একসাথে বলে উঠল।
“আমাদের বুঝি সুন্দর লাগছে না?”
রিদি আর শুভ্রা হেসে ওদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে একসাথেই বলল।
“আরে ধুর! শাড়ি পরলে সব বাঙালি মেয়েদেরই অপূর্ব অপার্থিব লাগে!”
শুভ্রা খুশিতে আত্মহারা হয়ে নিজের একটা বিনুনি ধরে নেচে উঠে বলল।
“আমি আর এক মুহূর্তও ঘরে থাকব না! চল, বাড়ির সবাইকে দেখিয়ে আসি আমাকে কেমন লাগছে!”
বলেই শুভ্রা ঝড়ের বেগে বাড়ির উঠোনে বেরিয়ে পড়ল। উঠোনে তখন লোকে লোকারণ্য। পাড়া-প্রতিবেশীরা গোল হয়ে বসে পহেলা বৈশাখের আড্ডায় মেতেছে। শুভ্রা ওর চপলতা দিয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখল। পাখি আর মিহিও ওর পিছু পিছু গিয়ে সবাইকে নিজেদের সাজ দেখাতে লাগল।
কিন্তু ঘরের দরজার আড়ালে রিদি দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। ওর বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ধকধক করছে। ও তো শাড়ি পরেছে, কিন্তু আজ এই শাড়িটাই ওর ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুভ্র যদি কোনোভাবে ওকে দেখে ফেলে তবে কী হবে? শুভ্র তো কড়াভাবে নিষেধ করেছিল ওকে শাড়ি পরতে। কিন্তু বৈশাখের আমেজ আর বন্ধুদের আবদারে ও সব বারণ ভুলে শাড়িটা পরেই ফেলেছে। এখন কী করবে ও? রিদি একবার জানলা দিয়ে আড়চোখে বাইরে তাকাচ্ছে, আবার নিজের পরনের শাড়ির কুঁচিগুলো টেনে ঠিক করছে। যদি এই মুহূর্তে শুভ্র সামনে চলে আসে, তবে ওর কপালে যে আজ বড় ভোগান্তি আছে সেটা ও হাড়েমাসেই টের পাচ্ছে। ও যেন এক পা সামনে বাড়াতে গিয়েও দশ পা পিছিয়ে আসছে।
আনন্দের আতিশয্যে শুভ্রার হঠাৎ ফুলের কথা মনে হলো। বিনুনিতে একটা টকটকে লাল ফুল গেঁথে দিলে মন্দ হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ। শাড়ির কুঁচি এক হাতে শক্ত করে ধরে ও দৌড় লাগালো ছাদের দিকে। ওর সেই চপল দৌড়ের তালে পায়ের নূপুর আর হাতের কাঁচের চুড়ির রিনঝিন শব্দে যেন পুরো বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠল।
দৌড়াতে দৌড়াতে শুভ্রা যখনই ছাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছাল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ছাদ থেকে ঈশান নামছিল। শুভ্রা উত্তেজনার চোটে নিজের পায়ের গতি আর থামাতে পারল না। ও এমন এক দৌড় দিয়েছে যে সামনে ঈশানকে দেখে থমকে দাঁড়ানোর আগেই সজোরে ধাক্কা খেল ওর সাথে। মুহূর্তের মধ্যে শুভ্রা ভারসাম্য হারিয়ে ‘ধপাস’ করে ছাদের মেঝেতে সোজা ঈশানের ওপর আছড়ে পড়ল।
ঈশান এই আকস্মিক পতনে কোমরের ব্যথায হাত দিয়ে “ওমা গো!” বলে বিকট স্বরে চি-ৎ-কা-র করে উঠল। শুভ্রা ভয়ে আর লজ্জায় নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ও ভাবতেও পারেনি ফুলের খোঁজে এসে এমন এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে। ওদিকে ঈশানের ওপর ওভাবে পড়ে থাকায় শুভ্রার হৃদপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এসেছে।
ঈশান বেশ বিরক্ত হয়ে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওর চোখ দুটো শুভ্রার ওপর পড়ে স্থির হয়ে গেল। মনের ভেতরে থাকা সব কথা যেন নিমিষেই নাড়িতে আটকে গেল ওর। ঈশান একদম হা করে শুভ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রার ওই শান্ত বন্ধ থাকা মুখ, চোখের গাঢ় কাজল, ঠোঁটে আলতো লিপস্টিকের ছোঁয়া আর কপালে থাকা ছোট্ট লাল টিপ সব মিলিয়ে ঈশানের মনে হতে লাগল আসমান থেকে কোনো এক পরী সরাসরি ওর বুকের ওপর এসে পড়েছে। ও বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এটা সেই চঞ্চল শুভ্রা! ঈশানের বারবার মনে হচ্ছে এটা নিশ্চিত কোনো ভুল, এটা শুভ্রা হতেই পারে না, এটা নির্ঘাত কোনো স্বর্গীয় পরী।
শুভ্রাও ধীরে ধীরে ওর চোখের পাতা মেলে তাকাল। চোখ খুলতেই ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ঈশানের চোখের গভীরে। দুজনেই যেন এক পলকে সব ভুলে গেল। ভুলে গেল যে ওরা এই মুহূর্তে ছাদের কঠোর মেঝেতে বিচ্ছিরিভাবে শুয়ে আছে। চারপাশের দুনিয়া যেন ওদের কাছে থমকে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ্রার ঘোর কাটল। ঈশানকে ওভাবে হা করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও প্রচণ্ড লজ্জা পেল। পরিস্থিতি সামাল দিতে শুভ্রা হালকা করে একটা গলা খাঁকারি দিল। সাথে সাথেই ঈশানেরও মোহ ভেঙে গেল, ও যেন বাস্তবে ফিরে আসল। শুভ্রা তড়িঘড়ি করে ঈশানের ওপর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পরনের শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিকঠাক করে নিল। ঈশানও অপ্রস্তুত হয়ে নিজের পিঠের ধুলো ঝাড়তে শুরু করল। শুভ্রা অপরাধী মুখ করে ঈশানের দিকে তাকিয়ে কুণ্ঠিত স্বরে বলল।
“সরি ভাইয়া! ভুল হয়ে গেছে। আসলে আমি খেয়াল করি নাই।”
ঈশান এবার আরও গভীর করে শুভ্রাকে খেয়াল করল। পরনে ধবধবে সাদা আর লাল পাড়ের শাড়ি। দুই পায়ে আর হাতের তালুতে সতেজ আলতার গাঢ় লাল আভা। দুহাতে লাল-সাদা কাঁচের চুড়ির রিনঝিন সজ্জা। সব মিলিয়ে ঈশানের মনে হতে লাগল ও নিজেই যেন কোনো এক মায়াবী ঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারল এখানে বেশিক্ষণ থাকা ওর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঈশান শুভ্রার দিকে তাকিয়ে আলতো এক চিলতে হাসি দিয়ে ছাদ থেকে নামার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। ঠিক তখনই শুভ্রা চপল কণ্ঠে বলে উঠল।
“ভাইয়া দাঁড়ান। আমাকে কেমন লাগছে বলবেন না?”
ঈশান না চাইতেও নিজে নিজে বিড়বিড় করে বলে উঠল।
“সুন্দর। এত সুন্দর যে সেই সৌন্দর্যে জ্বলছি আমি।”
শুভ্রা কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পেল না। ও বেশ কৌতুহল নিয়ে ঈশানের দিকে এগিয়ে এসে বলল।
“হ্যাঁ ঈশান ভাইয়া, কিছু বললেন?”
ঈশান সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল।
“না না। বললাম অনেক সুন্দর লাগছে তোমাকে। এখন আমি আসি?”
ঈশান আবারো যেতে নিলে আচমকা শুভ্রা ওর হাতটা ধরে ফেলল। অনুরোধের সুরে মায়াবী গলায় বলল।
“আসলে ভাইয়া আমি একটা ফুল তুলতে চাই। কিন্তু গাছটাতে অনেক বড় বড় কাঁটা। ভয় লাগে যদি ফুটে যায়। প্লিজ আপনি একটা তুলে দিবেন?”
শুভ্রার সেই নরম হাতের স্পর্শে ঈশানের সারা শরীরে মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকের মতো এক শিহরণ খেলে গেল। ও তড়িঘড়ি করে শুভ্রার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল।
“শুভ্রা আমার কাজ আছে। তুমি তুলো না। তুলতে না পারলে নেমে এসো, তোলার দরকার নেই।”
শুভ্রা সাথে সাথেই অভিমানে মুখটা কালো করে ফেলল। ধরা গলায় বলল।
“এইভাবে বলতে পারলেন? আমি কি মহা বড় কোনো কাজ দিয়েছি? শুধু একটা ফুলই তো তুলে দিতে বলছি। ঠিক আছে লাগবে না, চলে যান আপনি।”
বলেই শুভ্রা ছাদের কোণে থাকা গোলাপ ফুলের গাছটার কাছে চলে এলো। গাছটা বেশ বড় আর তীক্ষ্ণ সব কাঁটায় ভরা। শুভ্রা মনে মনে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে, যদি কাঁটা ফুটে যায়? তবুও সে সাহস সঞ্চয় করে কাঁটার ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা ফুল তোলার চেষ্টা করতে লাগল। ঠিক তখনই ওর হাতটা থমকে গেল। মনে হলো ওর বিনুনিতে কেউ খুব কোমলভাবে কিছু একটা গুঁজে দিল। ও অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে পেছনে ঈশান দাঁড়িয়ে।
ঈশান খুব যত্ন করে শুভ্রার বিনুনিতে একটা ধবধবে সাদা বেলি ফুলের গাজরা সুন্দর করে পরিয়ে দিয়েছে। শুভ্রা কয়েক মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। গাজরাটা লাগানো শেষ করে ঈশান মৃদু স্বরে বলল।
“হুম। এবার সত্যি অনেক সুন্দর লাগছে।”
শুভ্রা বিস্ময় কাটিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল।
“আপনি গাজরা কোথায় পেলেন?”
ঈশান একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল।
“তা তোমার না জানলেও চলবে।”
শুভ্রা এক পলক খুশি হয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে বলল।
“আমার জন্য কিনেছেন?”
ঈশান নির্লিপ্তভাবে শীষ বাজাতে বাজাতে ছাদ থেকে নামতে নামতে বলল।
“আমি কোন দুঃখে তোমার জন্য গাজরা কিনতে যাবো? গাজরা কোত্থেকে আসলো এসব ফালতু চিন্তা ঝেড়ে নিচে নেমে আসো।”
ওদিকে চৌধুরী বাড়ির সবাই মেলায় যাওয়ার জন্য একদম রেডি। শুভ্রও পরিপাটি হয়ে রুম থেকে বের হলো। ও আজ কুচকুচে কালো শার্ট আর কালো প্যান্ট পরেছে। ওর সেই সহজাত শ্যামবর্ণ গায়ের রঙে কালো পোশাকটা যেন এক অদ্ভুত আভিজাত্য এনে দিয়েছে। মনে হচ্ছে কোনো এক গ্রিক দেবতার ভাস্কর্য সজীব হয়ে উঠেছে। ওর বাহুর পেশিগুলো কালো শার্টের ভাঁজে ভাঁজে খেলা করছে। বাঁ হাতে একটা আভিজাত্যপূর্ণ স্মার্ট ওয়াচ, চোখে কালো-নীল শেডের সানগ্লাস। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো আর ওপরের দুটো বোতাম খোলা ওর বুকের খোলা অংশটুকু থেকে যেন এক অদ্ভুত পৌরুষের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে ওকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক রহস্যময়, ধরাছোঁয়ার বাইরের সুদর্শন সিনেমার হিরো।
শুভ্রকে দেখেই রিফাত হাসিমুখে ওর ঘাড়ে একটা চাপড় মেরে বলল।
“কিরে হিরো। মেয়ে পটানোর ধান্দা নাকি?”
শুভ্র চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে নাক-মুখ কুঁচকে চরম বিরক্তির সুরে বলল।
“ডিজগাস্টিং।”
রিফাত টিপ্পনী কেটে বলল।
“হ্যাঁ, তার জন্যই তো একদম হিরো সেজে এসেছিস। বুঝি না শা’লা তুই যে তলে তলে নৌকা চালাস!”
শুভ্র এবার মারমুখী হয়ে বিরক্ত গলায় বলল।
“বেশি কথা বললে থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেবো।”
রিফাত আর শুভ্রের খুনসুটির মাঝেই সোহান চৌধুরী বেশ চিন্তিত গলায় বলে উঠলেন।
“রিদি কোথায়? সবাই রেডি, ও কই?”
ইকবাল এহসান চারদিকে একবার চাতক পাখির মতো চোখ বুলিয়ে নিলেন, কিন্তু রিদিকে কোথাও দেখতে পেলেন না। তিনি শুভ্রার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“শুভ্রা, রিদি না তোমাদের সাথেই রেডি হলো? তাহলে ও কই গেল?”
শুভ্রা নিজেও বেশ অবাক হয়ে বলল।
“হ্যাঁ ফুফাশু, আমিও তো বুঝতে পারছি না ও কোথায় হাওয়া হয়ে গেল!”
চারপাশে একটা চাপা টেনশন ছড়িয়ে পড়ল। শুভ্র এবার ধীরস্থিরভাবে নিজের হাতের স্মার্ট ওয়াচটার দিকে তাকাল। ওর সেই পৌরুষদীপ্ত শ্যামবর্ণ কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো আরও গাঢ় হয়ে ফুটে উঠল। চারপাশের হইচই থামিয়ে ও সবার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গম্ভীর তপ্ত স্বরে বলল।
“আমি দেখছি, তোমরা দাঁড়াও।”
বলেই শুভ্র বাড়ির ভেতরের দিকে পা বাড়াল। ওর ভারি জুতার প্রতিটি কদম যখন মেঝের ওপর পড়ছে, সেই দাপুটে শব্দে মনে হচ্ছে পুরো বাড়িটা যেন এক অজানা থমথমে আতঙ্কে কেঁপে উঠছে। সেই অতি পরিচিত পদধ্বনি রুমে কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকা রিদির কানে পৌঁছাতেই ওর কলিজাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ও এখন নিশ্চিত এই শব্দ শুধু শুভ্রের জুতো থেকেই আসতে পারে। শুভ্র যদি এই মুহূর্তে রুমে ঢুকে ওকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে ফেলে, তবে আজ নির্ঘাত প্রলয় ঘটবে! ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রিদি তড়িঘড়ি করে খাটের নিচের ঘুটঘুটে অন্ধকারে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ও মনে মনে শুধু একটাই দোয়া করছে শুভ্র যেন ওকে না দেখে চলে যায়। শুভ্র বেরিয়ে গেলেই ও আগে এই কাল শাড়িটা গা থেকে নামাবে!
শুভ্র ঘরে ঢুকল। চারপাশটা বাজের মতো তীক্ষ্ণ নজরে একবার ঘুরে দেখল, কিন্তু পুরো ঘর শুনশান খালি। এদিকে খাটের নিচে রিদি কুঁকড়ে একদম দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে, ওর বুকের ভেতর তখন যেন কেউ বিরামহীন ড্রাম পেটাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতেও ওর ভয় হচ্ছে, যদি শুভ্র শুনে ফেলে! ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শুভ্রের সেই পালিশ করা কুচকুচে কালো জুতো দুটো।
শুভ্র ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দার দিকে গেল। না, সেখানেও জনমানবের চিহ্ন নেই। শুভ্রের কপালে অসন্তোষের ভাঁজ পড়ল। ও যখন ব্যর্থ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নেবে, ঠিক তখনই এক পলকের জন্য ওর কানে এক জোড়া কাঁচের চুড়ির অতি ক্ষীণ টুংটাং শব্দ ভেসে এল। রিদি ভয়ে নিজের হাত নাড়াতে গিয়ে অজান্তেই এই বিপদ ঘটিয়ে ফেলেছে। শব্দটা বাতাসের মতো পাতলা হলেও শুভ্রের মতো মানুষের কান এড়াতে পারল না। ও মুহূর্তেই পাথরের মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবার তীরের মতো বিঁধল খাটের নিচের সেই অন্ধকার কোণটায়। শুভ্রের ওষ্ঠাধারে এক চিলতে রহস্যময় কিন্তু কঠিন হাসি ফুটে উঠল।শুভ্র প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বেশ আয়েশ করে দাঁড়াল। ওর ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের শিস, যা এই নিস্তব্ধ ঘরে রিদির কানে তীরের মতো বিঁধছে। সে খুব শান্ত কিন্তু তপ্ত স্বরে বলল।
“নিজে বের হয়ে আসবি, নাকি আমি টেনে বের করব?”
শুভ্রের সেই বরফশীতল কণ্ঠ কানে আসতেই রিদির মনে হলো কেউ ওর বুকের ওপর আস্ত একটা পাথর ছুড়ে মেরেছে। লোকটা বুঝল কীভাবে যে ও এই খাটের নিচেই ঘাপটি মেরে আছে? রিদি তবুও বের হলো না, ভয়ের চোটে খাটের নিচের ঘুটঘুটে অন্ধকারে আরও বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বসে রইল। ওর কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। শুভ্র এবার দরাজ গলায় ঘোষণা করল।
“আমি এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গুনব। এর মধ্যে যদি না বের হোস, তবে আজ তোর কপালে নির্ঘাত চরম ভোগান্তি আছে!”
বলেই শুভ্র ধীরলয়ে গুনতে শুরু করল। প্রতিটি সংখ্যার সাথে সাথে রিদির হৃদপিণ্ড যেন লাফিয়ে গলার কাছে চলে আসছে। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটা যুগ!
“ওয়ান… টু… থ্রি… ফোর… ফাই—”
‘ফাইভ’ বলার আগেই রিদি তড়িঘড়ি করে খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে এল। এক মুহূর্ত দেরি না করে ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ওর পরনের শাড়ির কুঁচিগুলো অবিন্যস্ত, হাতে কাঁচের চুড়িগুলো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ও কাঁপাকাঁপা গলায় এক নিশ্বাসে বলতে শুরু করল।
“বি-বিশ্বাস করুন ভাইয়া! আমি আমি শাড়ি পরতে চাইনি। সবাই অনেক জোর করেছে, তাই মাথা কাজ করেনি, পরে ফেলছি। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত বাইরে পা দিইনি, সত্যি বলছি! আপনি প্লিজ একটু রুম থেকে বের হোন, আমি এখনই শাড়ি খুলে ফেলছি। সত্যি আর কোনোদিন শাড়ি ছোঁব না, এবারের মতো মাফ করে দিন আমাকে!”
বলতে বলতে রিদি ভয়ে একদম কুঁকড়ে গেল। ওর মনে হচ্ছিল শরীর থেকে সবটুকু শক্তি যেন শুষে নেওয়া হয়েছে। সে জড়োসড়ো হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের আঙুলগুলো কচলাতে লাগল। ওর মনে হচ্ছে এই বুঝি শুভ্র তার গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলবে—”তোর সাহস কী করে হলো? আমি বারবার বারণ করার পরও শাড়ি পরার।”
কিন্তু অনেকক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরও শুভ্রর কোনো গর্জন বা শাসন কানে আসলো না। চারপাশটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। হঠাৎ রিদি অনুভব করল, খুব তপ্ত এক জোড়া নিশ্বাস সরাসরি তার মুখের ওপর এসে পড়ছে। সেই উষ্ণ পরশে রিদির চোখের পাপড়িগুলো কেঁপে উঠল। সে অত্যন্ত ধীরলয়ে নিজের চোখের পাতা মেলে তাকাল। আর তাকাতেই দেখল শুভ্রর অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টি, যা যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। শুভ্র ওর একদম কাছে দাঁড়িয়ে আছে এত কাছে যে দুজনের উষ্ণ নিশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে শুভ্র যেন নিজের চোখের সামনে আজ এক অন্য রিদিকে আবিষ্কার করেছে। মায়াবী চোখে লেপ্টে থাকা গাঢ় কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, আর কপালে সেই ছোট্ট লাল টিপ। দুপাশে ঝুলে থাকা লম্বা দুটো বিনুনি আর হাতের লাল-সাদা কাঁচের চুড়িগুলোর মাঝে রিদিকে যেন এক স্বর্গীয় অপ্সরী মনে হচ্ছে। রিদির হাতে-পায়ে আলতার সেই স্নিগ্ধ রঙ দেখে শুভ্রর হৃদস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে কোনো কথা বলতে পারছে না, শুধু একরাশ মোহ আর নেশা নিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল।
শুভ্রর সেই গভীর ঘোর লাগা দৃষ্টি রিদি আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না। লজ্জায় আর আবেশে ও নিজের চোখ জোড়া নামিয়ে নিল। কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল।
“অইভাবে তাকাবেন না আপনি, আমার কেমন জানি লাগছে!”
শুভ্র ওর কথার কোনো উত্তর দিল না। বরং সে আরও এক ধাপ এগিয়ে রিদির একদম গায়ের ওপর এসে দাঁড়াল। রিদি যখন ভয়ে আর অস্বস্তিতে পিছিয়ে যেতে চাইল, শুভ্র তখনই নিজের হাত দিয়ে ওকে কাছে টেনে নিল। রিদির কপালে থাকা টিপটা একটু বাঁকা হয়েছিল। শুভ্র খুব যত্ন করে, পরম মমতায় তার আঙুলের ডগা দিয়ে টিপটা ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল। সেই আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় রিদির সারা শরীরে যেন এক লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু শুভ্রর সেই হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে লাগল।
রিদি একটু অবাক হলো। শুভ্র আজ বড্ড শান্ত, তাকে বকছে না এমনকি চোখে সেই চেনা রাগী আগুনটাও নেই। লোকটা আজ কেমন যেন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে শুধু তাকেই দেখছে। রিদি অপরাধীর মতো কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে প্রশ্ন করল।
“শাড়ি খুলে ফেলব?”
শুভ্র রিদির চোখের মণির দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ওই চোখের গভীরেই ও ডুবে মরতে চায়। গম্ভীর অথচ মোহময় স্বরে বলল।
“আমি কি বলেছি শাড়ি খুলে ফেলতে?”
রিদি না-সূচক মাথা নাড়তে নাড়তে অস্ফুট স্বরে বলল।
“বলেননি, কিন্তু আগে তো বলেছিলেন শাড়ি যাতে না পরি।”
শুভ্র ওর আরও কাছে সরে এলো, এতটাই কাছে যে রিদির বুকের ধকধকানি শুভ্রর গায়ে গিয়ে লাগছে। এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
“বলেছিলাম, কিন্তু তুই কি আমার কথা রেখেছিস?”
রিদি লজ্জায় আর অপরাধবোধে মুখটা একদম নিচু করে ফেলল। শুভ্রর দেহের উত্তাপ আর পারফিউমের কড়া ঘ্রাণে ওর মাথা ঝিমঝিম করছে। শুভ্র তখন আলতো করে রিদির থুতনি ধরে ওর মুখটা উঁচিয়ে ধরল। সেই তীরের মতো তীক্ষ্ণ চাহনি সইতে না পেরে রিদি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চোখের পাতা বুজে ফেলল। ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরজুড়ে শুভ্রর মখমলি কণ্ঠের গুনগুনানি ভেসে এল। রিদি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না যখন শুভ্র গেয়ে উঠল।
“আমি তোর আলতা চুড়ি না,
হাতে-পায়ে পরিস না।
আমি তোর চুলের ফিতা না,
আমাকে বেণি বাঁধিস না।”
রিদি বিস্ময়ে পাথর হয়ে চোখ মেলে তাকাল। শুভ্র গান গাইছে! তাও আবার এমন বুক চিরে আসা দরদ দিয়ে! রিদি ঘোরের মাঝে কিছু ভাবার আগেই শুভ্র আচমকা এক ঝটকায় ওকে উল্টো করে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। পেছন থেকে শক্ত করে রিদির সরু কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে মোহনীয় সুরে আবার গেয়ে উঠল।
“ওরে ভালোই যদি বাসিস আমায় বেঁধে নে তোর মনে,
প্রেম যমুনায় ডুবে মরব তবে রে তোর সনে।”
শুভ্রর সেই উদাস করা কণ্ঠ আর কোমরে ওর হাতের ইস্পাতকঠিন বাঁধনে রিদির হৃৎপিণ্ড যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। শুভ্রর প্রতিটি শব্দের সাথে ওর উষ্ণ নিশ্বাস রিদির ঘাড়ের নরম চামড়ায় আগুনের মতো বিঁধছে। রিদি চোখ বন্ধ করে কাঁপছে এই এক গানে শুভ্র যেন আজ ওর সব অভিমান আর ভয় ধুলোয় মিশিয়ে দিল। শুভ্র আজ রাগী বড় ভাই নয় আজ ও এক উন্মাতাল প্রেমিক, যে রিদির এই অপরূপ রূপের নেশায় পুরোপুরি দিকভ্রান্ত হয়ে গেছে। ওর সেই মজবুত বাহুবন্ধনে বন্দি হয়ে রিদি আজ এক অদ্ভুত, অপার্থিব ঘোরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে লাগল।
রিদি যেন এক ঘোরের জগতে চলে গেছে। শুভ্র আজ সব বারণ, সব রাগ ভুলে এক অন্য মানুষ হয়ে উঠেছে। শুভ্র ধীরলয়ে রিদির চুড়ি পরা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। রিদির নরম আঙুলগুলোর ফাঁকে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে হাতটা উঁচিয়ে ধরল। তারপর অত্যন্ত গভীর অনুরাগে রিদির হাতের পিঠে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই স্পর্শে রিদির সারা শরীরে যেন এক পশলা আগুনের বৃষ্টি বয়ে গেল। শুভ্র সেই ঘোর লাগা কণ্ঠেই পুনরায় গেয়ে উঠল।
“আমি তোর আলতা চুড়ি না,
হাতে-পায়ে পরিস না।”
গানের প্রতিটি শব্দ যেন রিদির রক্তে গিয়ে নাচন তুলছে। শুভ্র ওখানেই থামল না। ও রিদির পিঠের ওপর দুলতে থাকা লম্বা বিনুনির আগায় আঙুল ছোঁয়াল। অতি সন্তর্পণে বিনুনির ফিতাটা ছুঁয়ে দিয়ে নেশাতুর স্বরে আবার গেয়ে উঠল।
“আমি তোর চুলের ফিতা না,
আমাকে বেনে বাঁধিস না।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব সারপ্রাইজ
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৩