ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_১০
[এই পর্বে ২k রিয়েক্ট না হওয়া অবধি আগামী পর্ব আসবে না। তাই যারা পড়বেন অবশ্যই রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন]
বোকা রাহা এখনো ভিহান ভাই এর ঠোঁটে আঙ্গুল চেঁপে অস্থির ভঙ্গিতে দরজার বাহিরে উঁকিঝুঁকি করছে। যেন তার মনে প্রাণের ভাসনা আজ জিততে হবে। জিদান ভাইয়ার থেকে ১০০০ টাকা নিতেই হবে মজা খাওয়ার জন্যে। সে চাইছে কোনোভাবে ওরা এই রুম পর্যন্ত না আসুক তাকে কেউ না দেখুক।
অথচ ব্যাকুল উদ্দীপিত এক জোড়া চোখ তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখায় ব্যস্ত। রাহার কোমল স্পর্শ আর চঞ্চলতা ভিহানের ভেতর আরো ব্যগ্র করছিলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল। যেন এখুনি হৃদয়টা পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। তার শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমশ ছত্রাকের মতো। ভিহান বুঝতে পারছিল, নিজের ভেতরের আ’গুনটা আর চেঁপে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। রাহার সামান্য নড়াচড়া, চুলের গন্ধ, ক্ষীণ ব্যাকুল ভাব সবকিছু মিলিয়ে যেন তাকে এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতর টেনে নিচ্ছিল। রাহার আঙুলের হালকা ছোঁয়াতেই শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো শিহরণ বয়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো ভিহানের। তার আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে উঠল, যেন নিজেকেই থামাতে চাইছে। মনে হচ্ছিল চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেছে শুধু আছে তার দমবন্ধ করা স্পন্দন আর রাহার কাছাকাছি থাকার উষ্ণ অনুভূতি।
তার চোখ অনিচ্ছায় রাহার নিকট আটকে রইল। এই মেয়ে কি বোঝে, তার সামান্য হাসি কিংবা নির্দোষ দুষ্টুমিও কেমন করে ভিহানের ভেতরের সংযমকে টলিয়ে দেয়? নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইলেও অনুভূতিগুলো বারবার বাঁধ ভাঙতে চায়। সীমাহীন অনুভূতি যখন অবাধ্য হয়, সংযম যখন তীব্র ভাবে বাঁধনহারা হয়ে যায় তখন ভিহানের মেজাজও খেঁই হারিয়ে বসে। ধৈর্য হারা হয়ে আপনাআপনি রাগ চলে আসে কেবলি নিজের উপর, নিজের বেসামাল অনুভূতির উপর।
এই যে এই মুহূর্তে নিজেকে নিজের মাঝে নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বুকের ভেতর এক সমুদ্র পরিমাণ অনুভূতি লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিক থাকা হচ্ছে না। মনের চাওয়া পাওয়া গুলি হিশপিস করছে। ইচ্ছারা অবাধ্য হয়ে কিলবিল করছে। এই মুহূর্তে নিজের সংযম ধরে রেখে রাগ না করাও সম্ভব হচ্ছে না।
চোয়াল কঠোর করে ভিহান রাহার চিকন হাতের কব্জিখানা মুঠো ভরে নিলো। আচমকা হাতে শক্ত থাবা পেয়েই হুশ উড়ে যায় অবুঝ রাহার। চকিতে সে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় ভিহান ভাই এর দিকে। ওই তীক্ষ্ণ ধারালো নজর দেখে চোখ বড় হয়। তখনি খেয়াল আসে ভিহান ভাই এর মুখে নিজের হাতের দিকে। সর্বনাশ করেছে। এখন কি করবে সে?
ভিহান ভাই তখনো তার দিকে কেমন ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে। উনার শক্ত চোখ মুখ দেখে আত্মা উড়ে যায় রাহার। নিশ্বাস গলায় পাথরের মতো এসে ঠেকে। নিজেকে বাঁচানোর পথ খুঁজতে থাকে ভীতু রাহা। ভিহান ভাই এর ওই নজর দেখে রাহার সমস্ত কথা গুলে যায়। তার সত্তায় কাঁপন ধরে। কি করলো এটা? কিভাবে ভিহান ভাই এর ঠোঁটে হাত দিলো? ছিঃ ছিঃ এখন এই জাঁদরেল না জানি তাকে কি করে। কেমন হিংস্র ভাবে তাকিয়ে দেখো।
রাহা সমস্ত অস্বস্তি পাশ কাটিয়ে কিছু বলতে চাইলো। অনুভব করলো গলা দিয়ে ক্ষীণ স্বরও বের হতে চাইছে না। পরপর কয়েকবার নেত্রপল্লব ঝাপটিয়ে বলার চেষ্টা করলো,
“ও..ওই লুক..লুকোচুরি খেএলছিলাম..”
আর কিছু বলতে পারলো না। তার আগেই ভিহান ভাই কেমন দাঁত পিষে দরজার পাশের দেওয়ালটায় হুট করে চেঁপে ধরলো রাহা কে। আচমকা এভাবে এনে দেওয়ালের সাথে মিশাতে পিঠে ক্ষীণ ব্যথা পায় মেয়েটা। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। চোখমুখ খিঁচে রইল শুধু। কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আস্তেধীরে চোখের পাতা খুলে সে। অনুভব করে ভিহান ভাই তার পাশে দেওয়ালে এক হাত রেখে সামনের দিকেই ঝুঁকে আছে। মনে হচ্ছে রাহার বুকের ভেতর কেউ হাতুড়ি পেটা করছে। সে কি ভয়াবহ আওয়াজ!
নির্বোধ রাহা পিটপিট করে তাকায় সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ভিহান ভাই এর দিকে। পা দুটি থরথর করে কাঁপছে। ভিহান ভাই কেমন ধারালো নজরে তার দিকে তাকিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখেই তো রাহার কলিজা ভাজা হয়ে আসছে। কি শাণিত চাউনি দেখো! যেন এখনি তাকে ফালাফালা করে দিবে সহস্র আঘাতে।
তারই ভুল। আগেই বুঝা উচিৎ ছিল বাঘের ঢেরায় নিজ থেকে আসলে বাঘের থাবাটাও সহ্য করতে হয়। এমনি এমনি আর এখান থেকে বের হওয়া যায় না।
ভিহান ক্ষিপ্ত গভীর নয়নে তাকিয়ে আছে রাহার পানে। মেয়েটার উষ্ণ নিশ্বাস আর ভয় একটু একটু করে কাবু করে নিচ্ছে ভিহানের কঠিন সত্তা কে। নিজের সংযমের ভীত নড়ে উঠছে। এক প্রলয়কারী তোলপাড় শুরু হয়েছে ভেতরে। এই গাধা টা কি তাকে স্বাভাবিক থাকতে দিবে না? কোন এত তার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়? একবারও কি একটু কল্পনায় আনে এই মেয়ে তার সংযম আর ধৈর্য ছিন্ন হলে কি হবে? কোন ভয়ংকর পরিস্থির সম্মুখীন হবে সে?
দাঁতে দাঁত কেটে নিজেকে সামলাতে চায় ভিহান। রাহা এখনো টিপটিপ করে চোখের পাতা ফেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার এই নিষ্পাপ বোকাবোকা চাউনি দেখে ভিহানের বুক জ্বলে ওঠে। দেওয়ালে রাখা হাতটা আরো শক্ত ভাবে মুঠো করে আনে। চোয়াল দৃঢ় করে গাঢ় নয়নে রাহা কে অবলোকন করতে করতে মনে মনে ভাবে,
“তোকে এতোটা আদুরে হতে কে বলেছে মেয়ে? এত কোমল হতে কে বলেছে তোকে? এতটা মাখন কেন হতে গেলি তুই?”
রাহার ভুবন দুলে উঠল। বুকটা ধড়ফড় করতে লাগলো। মনে হচ্ছিল এই বুঝি ফেটে যায়। এতটা অস্থির হচ্ছে কেন বুকের ভেতরটা? এতটা ব্যাকুল লাগছে কেন ভিহান ভাই এর কাছাকাছি এসে? মনে হচ্ছে উথাল এক সমুদ্র বুকে বইছে। কি সর্বনাশ!
রাহার গলা দিয়ে কথা বের হতে চায় না। এক দৈব্যশক্তি যেন টেনে ধরেছে কন্ঠস্বর। চোখে মুখে কাতর ভীতু ভাব ফুটিয়ে লঘু স্বরে বিড়বিড় করে,
“আ..আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। দ..দয়া করে ছেড়ে দিন না।”
ভিহান দেওয়ালে হাত ঠেকিয়ে চোখ মুদে আনে। ধীর লয়ে ঢোক গিলে। নিজেকে যেন নিজে শাসায় রাহার এমন ফিসফিস কথার ধরনে। এই মেয়ে নির্ঘাত তাকে উন্মাদ করে শান্ত হবে। দাঁতে দাঁত কটমট করে ভিহান মাথা ঝুঁকিয়ে শ্বাস টানে।
“আ..আর এমন করব না। আ..আআপনার কথা শুনবো, ছেড়ে দিন আমায়।”
ভিহান মাথা তুলে তাকায় রাহার পানে। সঙ্গেসঙ্গে কেঁপে ওঠে মেয়েটা। কি অদ্ভুত শিউড়ে তুলা চাউনি। মেয়েটার অবস্থা নাজেহাল হয়ে যায়। নিশ্বাস আটকে আসে এভাবে এত কাছে ভিহান ভাই এর এরকম চোখ দেখে।
ফিসফিস করে বলে ভিহান, “এই দেহে প্রাণ থাকতে তোকে আমি কখনো ছাড়বো বলে তোর মনে হয়?”
রাহার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তালগোল পাকিয়ে যায় তার সব। ভিহান ভাই কি বলছে? এ কেমন সুরে বলা কথা? গায়ে তো তার কাটা দিচ্ছে। রাহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে নিশ্চুপে।
“আমি ভিহান বেঁচে আছি যতদিন তোর ছাড়া পাওয়ার সকল পথ নিষিদ্ধ হয়ে থাকবে ততদিন।”
নির্বোধ রাহা ভিহানের এই কথার গভীর মর্মার্থ বুঝতে ব্যর্থ। তার মস্তিষ্ক যা ধারণা দিলো সে সেটাই মনেমনে বুঝে নিলো। চোখে মুখের অবস্থা আরো করুণ হলো। আদুরে মুখটা আহ্লাদী হয়ে উঠল আরো। কাঁদোকাঁদো ফোলো গাল দুটি দেখে ভিহানের অস্থিরতা আরো আকাশ ছুঁয়ে নিলো। ভেতরের হিংস্র একটা সত্তা বারবার জানান দিতে চাইলো ওই গাল দুটি তোর। ওই গালের একনিষ্ঠ অধিকার কেবল তোর ভিহান। ভেতরের কঠিন সত্তাও আজ বেইমানি করার পায়তারা করছে। পুরুষালি ধৈর্যহীন সত্তা ওই গালের তৃষ্ণা মিটাতে আকুল আবেদন করছে। ভিহানের শিরায় শিরায় আ’গুনের ফুলকি বইতে শুরু করলো। ভেতরের এই আগুন নিভানোর উপায় তার জানা নেই।
“ব..বিশ্বাস করুন ভিহান ভাই। আমি আর কিছু করবো না। আপনার সব কথা শুনবো যা বলবেন তাই করবো। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।”
ভিহান নেশা নেশা চোখ নিয়ে কাঁদোকাঁদো করুণ মুখটার পানে তাকিয়ে। গাধাটা কবে বড় হবে? কবে বুঝতে শিখবে তার অনুভূতির কথা? কবে নিজ থেকে অনুভব করবে তার চোখের ভাষা? এই নির্বোধ বলদটা কি কখনো বড় হবে না আজীবন এই গাধাই থাকবে? ভেবে এর অন্ত পায় না ভিহান।
বাহিরে তখন ওদের ফিসফিস আওয়াজ শুনা যায়। রাহা একেবারে ভিহানের চোখের দিকে তাকায় সরাসরি। ভিহান ভাই এখনো দেওয়ালের এক পাশে হাত ঠেকিয়ে তার থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই অদ্ভুত কেমন করে নজর দিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে।
রাহা বাহিরে সবার কানাকানি শুনে দেওয়ালের সাথে আরো শিটে দাঁড়ায়। ভিহান খুব ভালো করে খেয়াল করে সেটা। কিছু না বললেও চুপচাপ রাহার পুরো মুখ পর্যবেক্ষণ করে।
জিদান ভয় ভয় কন্ঠে বলে, “ভা..ভাইয়া? ভাইয়াআআ?”
ভিহান দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে। দরজাও চাপানো। সামান্য দুই আঙ্গুল কেবল ফাঁকা। ওপাশ থেকে কামিলির ফিসফিস আওয়াজ শুনা যাচ্ছে,
“কি হলো জিদান ভাই বলছো না কেন? এখন মিনে বিড়াল হয়ে গেলে নাকি। জিজ্ঞেস করো উনাকে।”
“চুপ কর বাল পাকনা ছেমড়ি।”
এরপর একটু কেশে উঠল জিদান, “বলছি ভাইয়া? তুমি কি ঘরে? শুনতে পাচ্ছো কথা?”
ভিহান গভীর নজরে তাকিয়ে আছে রাহার পানে। ওই তীব্র ঘোরাচ্ছন্ন চাউনি রাহাতে নিবদ্ধ রেখেই গম্ভীর সুরে বলে ওঠে,
“হোয়াট?”
“বলছিলাম কি ভাইয়া রাহা কি তোমার ঘরে? ও কি এখানে এসেছিলো?”
ভিহান জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রয়। রাহা করুণ মুখে অনবরত মাথা দুলিয়ে না বুঝায়। তার ওই কাতর চাউনিতে ভিহান বুঝে মেয়েটা কি বলতে চায়।
ওপাশ থেকে জিদান বলে আবারও, “ভাইয়া? রাহা কি তোমার রুমে আছে?”
“নো” বলেই ভিহান আরেক হাত দিয়ে সামান্য ফাঁক দরজাটা ঠাসস করে লাগিয়ে নেয়। বাহির থেকে আচমকা দরজা লাগায় সামি রাফি রুশমি কামিলি সহ জিদান কেঁপে ওঠে। আর কেউ না বুঝলেও যা বুঝার জিদান বুঝে নেয়। ওদের সবাই কে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। তবে ভিহান ভাই এর দরজার দিকে মুখ করে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
“বুঝেছি, আজ চোখে অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগালেও রাহা রানি কে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বলছিলাম কি আমি হার মেনে নিলাম বোনু তবুও যেন সিংহের গুহা থেকে বের হওয়া হয়।”
দমবন্ধকর পরিস্থিতি টা সরল গতিতেই কিছুক্ষণ অব্যাহত রইল। মাথা নুয়ে রাহাও রুদ্ধশ্বাসে ঘাপটি মেরে রইল এক কোণায়। ভিহান ভাই এর এক হাত দরজায় আরেকহাত তার পাশ ঘেঁষে দেওয়ালে ঠেকানো। রাহা একবুক অস্থিরতা আর হাঁসফাস নিয়ে একটু একটু করে মাথা তুলল। কোমল চোখের পাপড়ি গুলি আলতো করে ঝাপটিয়ে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে।
ওই খাঁজকাটা দেহ আর সুতীক্ষ্ণ তীব্র চাউনি দেখে রাহার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। সত্যি কি ভিহান ভাই তাকে শাস্তি দিবে? ছাড়বে না কেন বলল? রাহা ঢোক গিলে লম্বা করে চোখের পাতা ফেলে আবারও তাকালো। ভিহান ভাই এর কোনো হেলদোল পাওয়া গেলো না। না নড়লো চড়লো আর না তো তার দিক থেকে ওই নিছক এক দৃষ্টিতে তাকানো থেকে চোখের দৃষ্টি সরালো।
ভয় ভয় কন্ঠে রাহা বলল, “আ..আমি যাবো।”
ভিহান ভাই ওভাবে তার দিকে ঝুঁকেই বাম ভ্রুটা উঁচু করলো। হীম শীতল কন্ঠে আওড়ালো, “তো?”
রাহা ঢোক গিলল। মনে মনে খাডাস লোকটাকে বকলোও। নিজেই দেওয়ালের মতো তাকে বেষ্টনী করে রেখেছে আবার নিজেই বলছে তো। রাহা মনে মনে বলে, “জাঁদরেল একটা। এভাবে আটকে রেখে আবার তো ফলাচ্ছি। বলি না সরলে যাবো কি তোর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে?”
নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, “আ..আপনি সরুন না ভিহান ভাই।”
রাহার আকুতি মেশানো ফিসফিস স্বরে ভিহানের শরীরের রক্ত ছলকে ওঠে। নষ্টালজিয়া চিন্তা মস্তিষ্ক কে বশ করে নেয়। কঠিন ধাঁচের ছেলেটা দাঁতে দাঁত কটমট করে ভাবে, “স্টুপিড একটা। ইডিয়েটা এমন সুরে কথা বলছে যেন জোর করে আমি তাকে আদর করতে যাচ্ছি। ননসেন্স বলদ একটা।”
রাহার আধোআধো চাউনি আহ্লাদী মুখের ধরন আর ওর গা থেকে ভেসে আসা প্রাকৃতিক সাফরানের মিষ্টি সুভাস মাতাল করে দিচ্ছে ভিহান কে।
নিজেই নিজেকে বুঝ দিতে লাগলো সে, “কন্ট্রোল ভিহান কন্ট্রোল। সময় হলে এই মাখন কে খেয়ে ফেলার অধিকার রাখিস তুই।”
“ভি..ভিহান ভাই আ..আমি যাবো।”
“কোথায়?”
“আ..আমার রু..রুমে।”
“তোকে আসতে বলেছিলাম আমি?”
রাহা জবাব দিলো না। দুই ভ্রু তুলে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে না ইঙ্গিত করে।
ভিহান গম্ভীর স্বরে আবারও প্রশ্ন করে, “আসতে বারণ করেছিলাম?”
ঢোক গিলে নিষ্পাপ রাহা উপর নিচ মাথা তুলে হ্যাঁ বোধক জবাব করে।
“তবে আসতে গেলি কেন?”
“আ..আমার ভুল হয়েছে। এবারের মতো মাফ করে দিন না ভিহান ভাই। আর করবো না।”
“তোর এই এক ভুল আর কতদিন মাফ করবো আমি?”
“এবারের মতো শেষ। এই কান ধরেছি আর করবো না। আর আসবোই না আপনার VIP রুমে।”
বলতে বলতে রাহা দুই হাতে কান ধরল। ওর নরম নরম আলতো কান ধরা মুখটা দেখে ভিহানের হঠাৎ হাসি পেলো। কিন্তু তবুও নিজে সংযত করে নিলো সে।
“একটু আগে কি বলেছিস মনে আছে?”
রাহা কৌতূহল বশতো চোখ কুঁচকে তাকালো।
“কি বলেছিলাম?”
“আমি যা বলবো শুনবি বলেছিস।”
রাহা নিজের ঐতিহাসিক বোকা বোকা হাসি হেসে বলল, “আমি তো আপনার কথা শুনিই ভিহান ভাই। আমি সবার কথা শুনি। রাহা গুড গার্ল বলুন?”
ভিহান ঠোঁট চেঁপে হাসি নিবারণ করলো। হিসহিস করে বলল, “শাস্তি ছাড়া এই রুম থেকে বের হতে পারবি না।”
মুহূর্তে হাসি মাখা রাহার মুখটা চুপসে গেলো। করুণ ভাব ফুটিয়ে চেয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে।
“এবারের মতো মাফ করে দিন না ভিহান ভাই। আমি কথা দিচ্ছি আপনার দরজা মুখো আর হবো না।”
“এমন কথা হাজার বার বলেছিস।”
“এটাই শেষ বার।”
“বিশ্বাস করি না।”
ভিহান এবার সরে এলো রাহার থেকে। মেয়েটাকে আড়াল করে মুখ হা করে শ্বাস টানলো। এই মেয়েটা ভিহান আরভিদের একমাত্র অস্থিরতার কারণ। রাহা চোরা চোখে সবটা পরখ করলো। ভিহান ভাই তার পিছু ফিরে টাওয়াল দিয়ে মাথা মুচ্ছে। রাহা নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। সর্তক গলায় আস্তেধীরে বলল, “সত্যি বলছি। একবার বিশ্বাস করুন। আমি আর আসবোই না।”
এই বলে যেই না দরজা খুলে দৌড় দিতে যাবে ওমনি ভিহান পিছু ফিরে রাহার এক হাত চেঁপে ধরে। এক টানে নিজের কাছে এনেই শক্ত হাতে রাহার দুই হাত মুঠোভরে নিয়ে ধারালো সুরে বলল,
“সাহস বেড়েছে না?”
“ও ভিহান ভাই আপনি এমন করছেন কেন? আপনি না ভালো? আপনি না আমার চাচাতো ভাই হোন? আমি তো আপনার চাচাতো বোন হই বলেন।”
রাহার আহ্লাদী কন্ঠে এই কথা শুনে ভিহান রাগে লাল হলো। হাতের বাঁধন শক্ত করে কটমট সুরে বলল,
“এই জীবনে না তোকে বোন বলে মেনেছি আর না মানবো। আর একটা কথাও বললে মাথায় তুলে আছাড় মারবো জাস্ট।”
“বিশ্বাস করুন ভিহান ভাই। আমি আর আপনার রুমের ধারে কাছেও আসবো না। ঢুকা তো দূরের কথা। তবুও যদি আসি তাহলে আমার নাম রাহাই না। আপনি আমার নাম বদলে দিয়েন। এবারের মতো মাফ করে দিন।”
“এখানে এই জায়গায় পুরো আধাঘণ্টা কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি। একটুও নড়বি না। রাইট নাও।”
ভিহান দুই পা এগিয়ে গিয়ে দরজাটা লাগালো। আবারও রাহার কাছে এসে ধমকে উঠল, “কান ধর।”
রাহা এবার সত্যি কেঁদে দিবে। এই ভিহান ভাই টা আসলেই একটা জাঁদরেল পুরো খবিশ। কখনো কোনো কিছুতে একটু ছাড় দেয় না। নির্দয় নিষ্ঠুর লোক।
“কি বললাম তোকে? কান ধর।”
রাহা কাঁদোকাঁদো মুখে কান ধরে ধারালো। আড়চোখে কান ধরা রাহা কে দেখে অদ্ভুত তৃপ্তি পেলো ভিহান। কাঁধের টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে কার্বাডে এগিয়ে গেলো।
টিশার্ট আর টাউজার জড়িয়ে সোফায় গিয়ে বসল ল্যাপটপ নিয়ে। এদিকে রাহা কান ধরে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে। তিক্ত চোখে নজর বুলাচ্ছে বারবার ভিহান ভাই এর ভেনিটির উপর রাখা পারফিউমের দিকে। কখনো চোরাচোখে ভিহান ভাই কে দেখে মনেমনে বকছে। আসলেই খাডাস লোক একটা।
সুদক্ষ নয়নে ভিহান সে সব পরখ করছে। আর মনে মনে হাসছে। এই মেয়ে একদিকে যেমন তার অস্থিরতার কারণ অন্য দিকে প্রশান্তির মহাঔষধ। একই সঙ্গে এই দুই অনুভূতি ধারণের নিখুঁত কারিগর সে নিজেই। স্বয়ং ভিহান আরভিদ খান।
“ভিহান ভাই আপনার পায়ের নিচে ওটা কি দেখুন? সাপ নাকি?”
আচমকা এমন কথায় কেবল কৌতূহল নিয়েই ভিহান নিচের দিকে তাকালো সত্যতা যাচাই এ। এটাই যেন ছিলো ওর ভুল আর রাহার সুযোগ। ওমনি দুষ্টু রাহা কান থেকে হাত সরিয়ে ভো দৌড়। তাকে আর পায় কে?
চলমান……
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা গল্পের লিংক